সেদিন মুষুলধারে বৃষ্টি ছিল পর্ব-০১

0
893

#সেদিন_মুষুলধারে_বৃষ্টি_ছিল
Part–1
Arishan_Nur (ছদ্মনাম)

— তোমাকে বিয়ে করছি কেবল একটা সন্তানের জন্য। আর কোন ভ্যালিড রিজন কিন্তু নেই। ভালোবাসা-বাসির বিয়ে-শাদি না এটা। বাচ্চা হওয়ার পরই তোমার প্রয়োজন ফুরায় যাবে আমার জীবন থেকে। তখন কি করবে তুমি?

সেজুতি থ মেরে দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মতো। কোন নড়চড় করলো না।

মুহিব রুমের বাইরে থেকে কথাগুলো বলে, সেজুতির রুমে সোজা ঢুকে পড়ে অবলীলায়।এরপর দরজা আস্তে করে কোন প্রকার শব্দ না করে লাগিয়ে দিলো।

সেজুতি চোখ বড় করে ফেলে। এবং কাপাস্বরে বলে উঠে, গেট কেন আটকালেন? দয়া করে গেট খুলে দিন।

সেজুতির কথায় কোন ভাবান্তর নেই মুহিবের।

সে আবারো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে উঠে, আমাদের বংশের একটা প্রদীপ চাই। তাই সেই উছিলায় তোমাকে বিয়ে করছি। আমি অন্যকারো ছিলাম আর আগামীতেও থাকব।

সেজুতি কাঠ গলায় বলে উঠে, তাহলে সেই অন্যকাউকে বিয়ে করেই তো এই বংশের প্রদীপ আনতে পারেন! শুধু শুধু আমাকে বিয়ে করে ঝামেলা বাড়াচ্ছেন,,,,,

মুহিব সেজুতির দিকে আগুন দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর পকেটে হাত গুটিয়ে বলে উঠে, আমার বিয়ের করার ইচ্ছা পূরণ হচ্ছে তোমার, তাই না? এটাই তো চাও তুমি।

— আমার আপনাকে বিয়ে করার কোন ইচ্ছা নেই মুহিব ভাই। এখনো চাই না কিন্তু,,,,,,,

মুহিব দাতে দাত চেপে বলে উঠে, বিয়ে করতে চাও না তবে রাজী হলে কেন? হুয়াই? এন্সার! (হুংকার করে উঠে)

আচমকা চেচিয়ে উঠবার জন্য সেজুতি ভয় পেয়ে যায়। সে শুকনো ঢোক গিললো।

মুহিব অনেকটা কাছে চলে আসে সেজুতির। সেজুতি থমথমে খেয়ে যায়।

মুহিব তার অতি নিকটে চলে আসায় সেজুতির নিশ্বাস আটকে যেতে লাগলো। মুহিব ভাইয়ের কড়া পারফিউমের বোটকা গন্ধে সেজুতি নাক কুচকালো। ঘামের গন্ধের সাথে পারফিউমের গন্ধের মিশ্রনে খুব বাজে একটা গন্ধ বের হচ্ছে মুহিব ভাইয়ের গা থেকে। সেজুতি ভাবতে লাগে, মুহিব ভাই কি গায়ে সাবান মেখে গোসল সাড়ে না? ইশ!কি বিশ্রি গন্ধ বের হচ্ছে। সেজুতি আর পাচ মিনিট এভাবে থাকলে ফর সিউর বমি করে দিবে। অসহ্য লাগছে সেজুতির। এতো কাছে কেন আসবে সে?

মুহিব সেজুতির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। সেজুতির মাথা নিচু করা বিধায় সে মুহিবকে দেখতে পারছে না।

মুহিব তার ডান গালে নিজের বাম হাত রেখে মৃদ্যু গলায় বলে উঠে, আমাকে বিয়ে করার অনেক বেনিফিট আছে তোমার । একে তো আমি ঢাকার বড়লোক বিসনেসম্যান সেই সঙ্গে আমার পরিবার বংশ পরম্পরায় বড়লোক, সম্মানিত। আর বাকি রইল চেহারার কথা তাইলে আমি তো বোধহয় রাজকুমার! আমার মতো হ্যান্ডসাম ছেলের জন্য যেকোনো মেয়ের মাথা পাগল হতে পারে।

এটুকু বলে দম ছাড়লো মুহিব। সে একদৃষ্টিতে সেজুতি কে দেখছে। বিয়ের আগের দিন থেকে নাকি কনের রুপ হুহু করে বেড়ে যায় সেটাই লক্ষ্য করছে সে। সেজুতির কি রুপ বেড়েছে? যে বিয়ে কেবল বাচ্চা-কাচ্চার জন্য করা হচ্ছে, এক প্রকার বাধ্য হয়ে সেই বিয়ের কনের উপরও কি এই একই সূত্র প্রয়োগ হবে? কে জানে কি? অবশ্য লজিক্যালি মানুষ বাচ্চা-কাচ্চার আশাতেই বিয়ের পীড়িতে বসে। তবুও তার ব্যাপার টা কিছুটা ব্যতিক্রম। তাকে সেজুতিকে বিয়ে করতে হবে এবং আল্লাহর রহমতে ঘর আলোকিত করে তাদের বংশের প্রদীপ চাই তার। নাহলে তো তার পরিবার নির্বংশ হয়ে পড়বে।

মুহিব ভাইয়ের শেষের লাইনগুলো শুনে সেজুতির হাসি পেয়ে গেল। সে অনেক কষ্টে নিজের হাসি দমিয়ে রাখে।

বিয়ের আগের দিন শব্দ করে হাসতে নেই।

মুহিব আরো একটু কাছে আসে সেজুতির। এতে সেজুতির মধ্যে কম্পন সৃষ্টি হয়। সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। লাভ হচ্ছে না। তার হাত কাপতে লাগে। মনের ভেতর ভয় কাজ করছে তার।

মুহিব তার অতি নিকটে এসে থেমে গেল। গাল থেকে হাত সরিয়ে তার পানে চেয়ে থাকে। এই চেয়ে থাকার মধ্যে না আছে রাগ, না খারাপ কোন কামনা,আর না আছে ভালোবাসা বা ভালোলাগে। অদ্ভুত এক দৃষ্টি এ যেন!

সেজুতি ঘাবড়ে যাচ্ছে। তার ঠোঁট ও কাপছে।ঢোক গিলতে পারছেনা সে।

মুহিবের আছড়ে পড়া গরম নিশ্বাস সেজুতির মুখে এসে পড়তেই তার মনে হতে লাগে সমস্ত পৃথিবী ঘুরছে। কি একটা অবস্থা!

মুহিব বলে উঠে, আমি একজন কে গভীর ভাবে ভালোবাসি। এটা জানিয়ে দিলাম। যেন পরে না বলতে পারো আমি তোমাকে সত্য বলিনি।

সেজুতি কিছু বলল না। তার ভয় হচ্ছে। বাসায় সবাই নিশ্চয়ই জেনে গেছে। মুহিব ভাই তার বাসার এসে রুমে গিয়ে গেট লাগিয়ে দিয়েছে। বাবা জানলে কি ভাববে? ছিঃ মানুষটার বিবেক বলে কিছু নেই কি?

সেজুতির উত্তর না পেয়ে সে সিগারেট ধরায়।

সেজুতি কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে।ইতিমধ্যেই বাইরে থেকে হাসাহাসির শব্দ ভেসে আসছে। বাড়িতে গাদা গাদা মানুষ। মুরুব্বি মানুষ-জন আছে।সবাই কি ভাবছে কে জানে? বাইরে থেকে তার কাজিনরা হাসাহাসি করছে। ওদের হাসির আওয়াজ কানে ভেসে আসতেই সেজুতির মাটিতে মিশে যেতে মন চাচ্ছে। অথচ এই ব্যাটা আয়েশ করে সিগারেট ধরালো। মুহিব ভাইয়ের আইকিউ এতো কম কেন? এত্তো নির্বোধ কেন সে?

মুহিব সিগারেট টানতে গিয়ে লক্ষ্য করে তার দেওয়া হলুদের শাড়িটা মেঝেতে পড়ে আছে। মুহিব দাতে দাত চেপে এই অপমান হজম করল। আজকে অন্যদিনের চেয়ে সিগারেট টানতে বেশী মজা লাগছে কাজেই এস এ চেইন স্মোকার, সে সিগারেট খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। বাকি সব ভেস্তে যাক!

এরপরে সে সেজুতির দিকে তাকিয়ে বলে উঠে, প্রেম করতে নাকি?

সেজুতি মাথা তুলে অবিশ্বাসের চোখে মুহিবের দিকে তাকালো।

মুহিব সিগারেট টানতে টানতেই সহজভাবে বলে উঠে, বয়ফ্রেন্ড আছে? কোন এক্স আছে?

সেজুতি প্রথমে না বলতে চাইলো পরক্ষন ভাবলো, মুহিব ভাইকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন আছে। কি সুন্দর করে নিজের বউয়ের সামনে বলে আমি অন্যকারো! সেজুতি যে এই ছেলের মাথা ফাটায়নি এটাই তার পরম সৌভাগ্য। তার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চেপে গেল।

সে বাকা হেসে জবাবে বলে, জি মুহিব ভাই। আমি একজনকে খুব করে ভালোবাসি। বলতে পারেন সে আমার প্রাণভোমরা! আমার বুক থেকে মনটা অপারেশন করে তার বুকে লাগিয়ে দিয়েছি।

তারপর মুহিবের চোখে চোখ রেখে তীক্ষ্ম স্বরে বলে, সে একান্ত আমার!

— তার মানে বলতে চাচ্ছো তুমি মনহীন হয়ে আছো?

— মানে?

— মানুষের মন তো একটাই এস ফার আই নো। নাকি কিডনির মতো দুইটা মন মানুষের?

— একটাই মন একজন মানুষের।

— তোমার মন অপারেশন করে ডোনেট করলে, এখন তো তুমি মনহীন এক নারী বটে!

সেজুতি মুহিবের দিকে তাকিয়ে বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, সে কি তাকে নিয়ে মজা করছে কিনা? তারপর চোখ ছোট ছোট করে জবাব দেয়, যাকে মন দিয়েছি তার মনটা ইন রিটার্ন নিজের বুকে লাগিয়ে দিয়েছি।

মুহিব তার মাথা থেকে পা অব্দি একবার দেখে নেয়। মুহিবের নজর পুনরায় মেঝেতে পড়ে থাকা তার দশ হাজার টাকা দিয়ে কেনা শাড়িতে গেল। সে ছোট্ট করে দম ফেলে। যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে কেনা শাড়ি অথচ ফেলা রেখেছে মেঝেতে।এই মেয়ে তার ঘাম ঝড়ানো টাকার কদর করছে না। নাকি শাড়ি ভালো লাগে নি? জিজ্ঞাসা করবে কি? কিন্তু এটা জিজ্ঞেস না করে বলে উঠে,

— তুমি তো দেখি মাছ বিক্রেতা! (সিগারেটের ধোয়া উপরে উড়িয়ে বলে)

— মানে? ( ভ্রু কুচকে)

— সেলফিস! ইন রিটার্ন কিছু পাওয়ার আশা বাদে এক পা নড়ো না ।

সেজুতি হা হয়ে যায়। মুহিব হুট করে তার কাছ এসে তার মুখে সিগারেটের ধোয়া ছাড়লো। এই কাজটা করতে মুহিবের খুব ভালো লাগে।

সেজুতি খুকখুক করে কাশতে লাগে।

মুহিব হুট করে সেজুতির কাছে চলে এলো এবং তার কপালে লেপ্টে থাকা ছোট চুল গুলো কানে গুজে দিয়ে, নিজের মুখটা তার কানের কাছে এনে স্লো ভয়েজে বলে উঠে,

Happy body yellow day! এই শুভ দিনে আমাকে কিছু উপহার দেওয়া উচিত! ইন রিটার্ন আমিও দিব।

চলবে?