অতঃপর প্রেমের গল্প পর্ব-১৩+১৪

0
403

#অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤
#কায়ানাত_আফরিন
#পর্ব_১৩
ফারহানকে হঠাৎ সেই মেয়ের দিকে এতটা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখজোড়া ক্রমশ যেন ছোট হয়ে আসলো সাব্বির আর শামসুর। কেননা ফারহানের এমন দৃষ্টির সাথে দুজনেই অপরিচিত। বলা বাহুল্য , ফারহান গম্ভীর ধাঁচের মানুষ। নিজের কাজে আত্ননিয়োগ করতেই ও সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। মানুষদের প্রতি নজর দেওয়ার মতো ফুরসত যেন এই সুদর্শন যুবকটির নেই। শামসু সন্দিহান কন্ঠে সাব্বিরকে বললো,

-এই সাব্বির! ভাইয়ের কি হইলো আবার?

-কে জানে?আমি নিজেও তো বুঝতেসি না।

আফরা তখন এখানকার সব জনপ্রিয় খাবারগুলোর বিষয় নিয়ে ফাহিমের সাথে মশগুল ছিলো। হঠাৎ এক কোণে চোখ পড়তেই আফরার আলাপচারিতা বন্ধ হয়ে যায়।এত শোরগোল আর এত মানুষের ভীড়ে মানুষটার অবাকমিশ্রিত তীক্ষ্ণ চাহিনী সহজেই নজর কাড়ার মতো। মানুষটা ফারহান। শ্যামবর্ণের গায়ে কালো শার্টের আবরণ , উপরের দুটো বোতাম খুলে সানগ্লাস ঝুলিয়ে রেখেছে। হাতে মোটা বেল্টের খয়েরি ঘড়ি,আর বরাবরের মতোই কানে ব্লুটুথ ইয়ারফোন। ঠোঁটকোলের স্মিত হাসি আর এমন রূপ দেখে আফরা অনুভব করলো ওর বুকের দ্রিম দ্রিম শব্দ যেন ক্রমশই বেড়ে চলছে।ফাহিম আফরাকে এতটা অন্যমনষ্ক হতে দেখে বললো,

-এনি প্রবলেম আফরা?

ফাহিমের কথার দিকে আফরার ধ্যান নেই। সে বিস্ময় নিয়ে ফারহানের উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়ে ‘হ্যালো’ বলে। এদিকে দুদিকে বসে থাকা শামসু আর সাব্বির তো খুশিতে আটখানা। দাঁত কেলিয়ে শামসু সাব্বিরকে বললো,

-ঐ সাব্বির দেখ ! মাইয়্যাটা আমায় ‘হ্যালো’ বলসে…….

-আরে না। আমারে হ্যালো বলছে সে। তোর যেই চেহারা……তোরে ভালোমতো দেখলে তো মাইয়্যা ডরে পালাইবো।

ঠোঁট টিপে হাসলো ফারহান। দুজনের কথাবার্তা শুনে চোখে-মুখে ব্যাঙ্গাত্নের ছাপ। এই গর্দেভ দুটো বুঝতে পারিনি যে অপরূপ সুন্দরী এই মেয়েটি ফারহানের উদ্দেশ্যে সম্বোধন করেছে। তবুও ফারহান কিছু বললো না। সেও ঠোঁট চেপে হাত নাড়িয়ে অভিবাদন জানালো আফরাকে যা সাব্বির-শামসু খেয়াল করেনি আফরার দিকে তাকিয়ে থাকার কারনে।

আফরার হাত নাড়ানো দেখে পেছনে ফিরলো ফাহিম আগন্তুকটিকে দেখার জন্য। সেখানে ফারহানকে দেখে সেও স্মিত হাসলো। প্রফুল্লস্বরে বললো,

-আরে ফারহান ! তুমি এখানে হঠাৎ?

-লাঞ্চ করতে এসেছিলাম।

ফারহানের শীতল প্রতিউত্তর। এদিকে আফরা নামের অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটার সাথে ফারহানের ছয় মাসের ছোট কাজিন ফাহিমকে দেখে মুখ কালো হয়ে গেলো শামসু আর সাব্বিরের। সাব্বির হাহাকার করে বললো,

-ইয়া মাবুদ! এই ছোকরা এদিকে কি করে?

-ওই আস্তে বল…….ফারহান ভাই যদি শোনে , তুই ফাহিম ভাইকে ছোকরা কইছস , তোরে ধইরা পিটাইবো।

ফিসফিস করে বললো শামসু।ফাহিম কিছু বলার আগেই আফরা মৃদু স্বরে ফারহানকে বললো,

-যদিও আমাদের লাঞ্চ শেষ পর্যায়ে,,,,,,,,,আপনিও চাইলে জয়েন হতে পারেন ফারহান।

-ইটস ওকে। আমরা এখানেই ঠিক আছি।

হঠাৎ শামসু-সাব্বির ফিসফিসিয়ে বললো,
-ভাই না কইরেন না। এত সুন্দর মেয়ে আপনাকে লাঞ্চের জন্য ডাকছে আর আপনি?আমি থাকলে সাথে সাথেই রাজি হয়ে যেতাম।

ফারহানের মজা লাগছে ওদের এমন কান্ড দেখে। যদি এই দুই সাগরেদ জানে যে আফরা মেয়েটা আজ ওর বাসায় ডিনার করতে আসবে তবে তো পাগলই হয়ে যাবে। তবুও ফারহান মৌনতা কেটে বললো,

-ঠিক আছে। আপনার কথা রাখলাম আফরা।

-থ্যাংক ইউ। আর এইযে,,,,,,দুই সিপাহী!আপনারাও আসেন।

শামসু আর সাব্বিরের খুশি আর দেখে কে। তারপর কথামতো ওরা তিনজন বসে পড়লো ফাহিম আর আফরার সাথে। আফরা লাঞ্চ শেষ করে ডেজার্ট হিসেবে একটা চীজ কেক অর্ডার দিলো। ফারহান কথাবার্তা না চালিয়ে লাঞ্চ করছে শান্তভাবে। ফাহিম এবার ফারহানের উদ্দেশ্যে বললো,

-তো ফারহান! ইদানীং তো দেখাই যায় না তোমায়। দিনকাল কেমন যাচ্ছে?

-এজ অলয়েজ যেমন যায়।

-স্ট্রাইক নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়নি?

কথাটি একটু আস্তে বললো ফাহিম যাতে আফরা নজর দিতে না পারে। ফারহান বুঝতে পারলো ফাহিমের চিন্তিত হওয়ার কারন। ব্যস্ততার জন্য খুবই কম কথা বলার সময় পায় ফাহিম আর ফারহান। বাড়িতেও পারিবারিক সংঘর্ষ আর মিসেস নাবিলার ক্রোধের শিকার হয়ে দুজন কথা বলতে পারে না। স্ট্রাইক বা অন্য কোনো ঝামেলা হলে ফারহান প্রায়ই আঘাতপ্রাপ্ত হয়…দিনের সময়ে ফারহান অনায়াসে ফাহিমের চেম্বারে গেলেও মধ্যরাতে ফারহানকে জানালা টপকে ফাহিমের ঘরে যেতে হয়। সেরাত স্ট্রাইকে পুলিশের আঘাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ফারহান জানালা টপকে ফাহিমের কাছে আসতে চেয়েছিলো কিন্ত দেখা হয়ে যায় আফরার সাথে। ফাহিম হয়তো কোনোভাবে জেনে গিয়েছে যে সেরাতে ফারহান আঘাত পেয়েছিলো। তবে আফরার কথাটি এড়ানোর জন্য ফারহান শীতল কন্ঠে বলে,

-রিলেক্স ফাহিম। আমি সেরাত ডক্টরের কাছে চলে গিয়েছিলাম।

ফারহানের কথা শুনে তপ্ত শ্বাস ছাড়লো ফাহিম।মাঝে মাঝে নিজের মায়ের অদ্ভুত সব কাজকর্মের জন্য এই মানুষটার সঙ্গে দুরত্ব হয়ে গিয়েছে ওর। এতটাই দুরত্ব…….যা কখনোই কাটিয়ে তোলা যাবে না।
.
.
লাঞ্চ সেড়ে সবাই বেরিয়ে এলো রেস্টুরেন্ট থেকে।দুপুরের কড়া প্রহর ঢলে বিকেল নেমেছে। তরতাজা বাতাসের সমন্বয়ে মোহময় পরিবেশ। ফারহান মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললো,

-আমি তাহলে এবার আসছি…..

-কোথায় যাচ্ছো ফারহান?
ফাহিম জিজ্ঞেস করলো।

ফারহান মৃদু প্রতিউত্তরে বললো,
-ব্যাংকে যাচ্ছি টাকা তুলতে।

ফাহিম এবার আর কিছু বললো না ফারহানকে। আফরার উদ্দেশ্যে বললো,

-তো চলুন এবার। আপনাকে বাসায় ড্রপ করে চেম্বারে চলে যাবো।

-ওকে। আপনি পার্কিং লট থেকে গাড়ি নিয়ে আসুন। আমি এখানেই দাঁড়াই।

ফাহিম তাই চলে গেলো গাড়ি আনতে। সাব্বির আর শামসুও ইতিমধ্যে সেখানে গিয়েছে। রেস্টুরেন্টের এক কোণের এই ভিউ পয়েন্টটি এককথায় চমৎকার। দমকা বাতাসে আফরার খোলা চুলগুলো আলোড়ন সৃষ্টি করছে ফারহানের মনে। তবুও প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে। আনমনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে সাব্বির আর শামসুর আসার অপেক্ষা করতে লাগলো। আফরা ঠোঁটে সুক্ষ্ণ হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। হাত জোড়া পেছনে আকড়ে বারবার দেখছে ফারহানকে। একপর্যায়ে ধৈর্যহীন হয়ে বললো,

-এইযে মিঃ কমরেড?

জনসমাগমে আফরার এভাবে কমরেড ডেকে ওঠাতে ফারহানের চোখজোড়া ক্রমশ সুক্ষ্ণ হয়ে এলো। তাই মোবাইল পকেটে গুজে তীক্ষ্ণ গলায় বললো,

-এভাবে সবার সামনে কমরেড ডাকার মানে কি?

-তো কমরেড কে কমরেড বলবো না তো কি অন্যকিছু বলবো? যদিও আপনার আরেকটা আছে। রেইনকোর্টম্যান!

আফরার চোখেমুখে দুষ্টু হাসি। ফারহান হাল ছেড়ে দিলো। এই মেয়ের সাথে কথায় পেরে ওঠা বড়ই দুষ্কর । আফরা এবার কিছু একটা ভেবে এগিয়ে এলো ফারহানের কাছাকাছি। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো,

-রাতে কিছু আপনার হন্টেড হাউজে আসছি মিঃ কমরেড।

ফারহানের মেরুদন্ড দিয়ে যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো আবার। হৃদস্পন্দন ক্রমশই যেন বেড়ে যাচ্ছে। ফাহিম গাড়ি নিয়ে আসাতে আফরা মৌনভাবে চলে গেলো এবার। যাওয়ার আগে ফারহানের দিকে তাকিয়ে গেলো একপলক। ফারহান স্মিত হাসে আফরার এমন কাজে।

——–
চারিদিকে নিরবিচ্ছিন্ন অন্ধকার। ওপাশের বাশঝাড় থেকে কেমন যেন ভুতুড়ে শব্দের উৎপত্তি হচ্ছে। দরজাটা খোলা রেখেছে ফারহান। তাই পূব দিকের হাওয়া দরজা বরাবর বারি খেতে মগ্ন। পর্দা উড়ে চলছে হালকাভাবে। ফারহান নিজের দৈনন্দিন কাজ শেষ করে দ্রুত বাড়ি ফিরে এলো আজ। একটা ঠান্ডা গোসল সেরে জলপাই রঙের টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার পড়ে নিলো। ফারহান যদিও গোছালো মানুষ তবুও অতিথি আসবে বসে দুই রুমের এই ছোট ঘরটি আবার গুছিয়ে নিলো।রাতের খাবারের জন্য রান্না করেছে অনেক ধরনের খাবার। ফারহান জানেনা যে আফরা বাঙালি খাবারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে কি না তাই সে ইটালিয়ান ফুড রান্না করলো। টমইয়াম স্যুপ সাথে বেড ক্রাম্ব আর ইটালিয়াল রেড সস পাস্তা। আজ একা থাকে বলেই এত ধরনের রান্না জানে সে। হঠাৎ মিসেস নাবিলাকে ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছে করলো এই প্রসঙ্গের জন্য।

-আসতে পারি মিঃ কমরেড?

মেয়েলি সুরে পিছনে ফিরে দরজার দিকে তাকালো ফারহান। আফরা দাঁড়িয়ে আছে। একটা হালকা গোলাপি রঙের কূর্তি পড়াতে সুন্দর লাগছে তাকে। ফারহান মৃদু হেসে বললো,

-অবশ্যই।

আফরা প্রবেশ করলো ছোট্ট কুটিরটিতে। ওর নিজের ভাষায় যেটাকে বলে হন্টেড হাউস।ফারহান টিশার্টের ওপর এপ্রোন পড়ে আছে। রোদে পোড়া সবল শ্যামবর্ণের চেহারা। শক্ত চোয়াল। ঘামের কারনে কপালে কালো নরম চুলগুলো দূর্বাঘাসের মতো লাগছে। আফরার মন উথাল-পাতাল করছে এমন অবর্ণণাতীত সৌন্দর্য দেখে। অজান্তেই মানুষটার চুলগুলোতে হাত ছোয়ার মতো ভয়ঙ্কর ইচ্ছে চলে আসছে বারবার। ফারহান আসলেই নিঃসন্দেহে ভীড়ের মাঝে এক নজর কাড়ার মতো ব্যাক্তিত্ব। ভাবতেই আফরার মনে এবার অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করতে থাকলো।

.
.
.
.
#চলবে……..ইনশাআল্লাহ

#অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤
#কায়ানাত_আফরিন
#পর্ব__১৪
আফরা প্রবেশ করলো ছোট্ট কুটিরটিতে। ওর নিজের ভাষায় যেটাকে বলে হন্টেড হাউস।ফারহান টিশার্টের ওপর এপ্রোন পড়ে আছে। রোদে পোড়া সবল শ্যামবর্ণের চেহারা। শক্ত চোয়াল। ঘামের কারনে কপালে কালো নরম চুলগুলো দূর্বাঘাসের মতো লাগছে। আফরার মন উথাল-পাতাল করছে এমন অবর্ণণাতীত সৌন্দর্য দেখে। অজান্তেই মানুষটার চুলগুলোতে হাত ছোয়ার মতো ভয়ঙ্কর ইচ্ছে চলে আসছে বারবার। ফারহান আসলেই নিঃসন্দেহে ভীড়ের মাঝে এক নজর কাড়ার মতো ব্যাক্তিত্ব। ভাবতেই আফরার মনে এবার অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করতে থাকলো।
.
.
-কি ভাবছেন এতো?

ফারহানের কথার পরিপ্রেক্ষিতে ধ্যান ভাঙলো আফরার। তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললো,

-না,,,,,তেমন কিছু ভাবছি না।তো আপনি কি এপ্রোন পড়ে থাকবেন সারারাত?

-আরে না। সবে মাত্র ডিনার তৈরি শেষ করলাম। ওয়েট,,,,আমি খুলে আসছি।

বলেই কিচেনের দিকে চলে গেলো ফারহান। আফরা একপাশে আয়েশ করে বসলো সোফার নরম গদিতে। লেমন ফ্লেভারের রুম স্প্রের ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে সারা ঘর। আফরা ইতিমধ্যে খেয়াল করলো সোফার পাশে বিশাল বুকশেলফ,,,,,ষেখানে বই কম ; মামলা-মোকাদ্দমার কাগজপত্র বেশি। হাতে গোনা কয়েকটা ইংরেজী গল্পের বাংলা অনুবাদ বই আছে,,আরও আছে কয়েকটা ল’বুক। ইতিমধ্যে ফারহান এসে জিজ্ঞেস করলো ,

-এখন ডিনার করবেন নাকি আরও কিছুক্ষণ পরে?

-এখনই করি। সেই দুপুরে লাঞ্চের পর আর কিছুই খাই নি।

মৃদু হাসলো ফারহান। তারপর ডাইনিং টেবিলে আফরার উদ্দেশ্যে চেয়ার খুলে মৌনস্বরে বলে ওঠলো,

-বসুন।

কথামতো তাই করলো আফরা। আজ ওর মনে কাজ করছে অন্যরকম এক প্রশান্তি। ওর বরাবর বসে পড়লো ফারহান। রাতের নিরঙ্কুষ আধার। এর মধ্যে ডাইনিং টেবিলের ওপর বরাবর হলদে লাইটের সংমিশ্রনে মোহাচ্ছন্ন লাগছে বেশ। আফরা চামচ নিয়ে আরামসে স্যুপ খেতে লাগলো। ফারহান আড়চোখে আফরাকে দেখছে বারবার। আসলে আফরার খাবার সম্পর্কে মন্তব্যের জন্যই ফারহান অপেক্ষা করছে। আফরাকে চুপ থাকতে দেখে ফারহানই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-কেমন লাগলো ?

-উমমম……ট্যু গুড। তবে আপনি এত ভালো রান্না পারেন,,,,আগে তো বলেননি!

-আগে কি এ ব্যাপারে কোনো কথা হয়েছিলো আমাদের মাঝে?

ফারহান ভ্রু নাচিয়ে বললো। আফরা হেসে দিলো এবার। প্রতিউত্তরে বললো,

-তাও ঠিক। বাই দ্য ওয়ে ,,,,,থ্যাংকস এত ভালো রান্না সার্ভ করার জন্য।

-ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।

মৃদু কন্ঠে বললো ফারহান। আফরা আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে ফারহানের কার্যকলাপ। ফারহান ডিসেন্টলি খাবার খেয়ে যাচ্ছে। আশেপাশে তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মাঝে মাঝে আফরার সাথে দু’তিনটা কথা বলছে। ফারহানের লালচে ঠোঁটজোড়ার অনাবিল সৌন্দর্যেরর দিকে না চাইতেও তলিয়ে যাচ্ছে আফরা। মাঝে মাঝে নিজের বোকামি কাজগুলো দেখে অবাক না হয়ে পারেনা সে। কেননা চুপচাপ ধরনের মানুষ বরাবরই অপচ্ছন্দ আফরার। অ্যামেরিকায় এ পর্যন্ত অনেকের সাথে ডেট করার অভিজ্ঞতা ওর আছে , আর যেই ছেলে একটু বেশি গম্ভীর ধরনের ছিলো তার সাথে আর কথা বাড়াতো না আফরা। তবে ফারহানের ক্ষেত্রে আফরা হয়ে গেলো ব্যাতিক্রম। ওর গম্ভীরতা আর সল্পভাষী ব্যক্তিত্বের মোহেই দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে আফরা। ফারহান হঠাৎ খাওয়ার মাঝে খেয়াল করলো আফরা ড্যাবড্যাব করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো সে। মিহি স্বরে বলে ওঠলো,

-এভাবে তাকিয়ে আছেন যে?

-আপনাকে দেখছি।

শুকনো কাশি দিলো ফারহান। আফরা বসে আছে ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে । আবারও তাই বললো,

-রিলেক্স ফারহান। বি নরমাল। আপনাকে আমি জাস্ট দেখছি। খেয়ে ফেলি নি।

এমন মেয়ে ফারহান আদৌ দেখেছে কিনা ওর মনে পড়ে না। কেমন নিঃসংকোচ মেয়েটার কথাবার্তা। কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইলো ফারহান। অতঃপর খাওয়া শেষ করে বললো,

-আমার খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছে। বারান্দায় বসবেন?

-বসতে পারি।

-তাহলে আপনি হাত ধুয়ে আসুন। আমি বারান্দায় চেয়ার নিয়ে যাচ্ছি।

বলেই ফারহান বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলো। হাত ধুয়ে আফরাও চলে গেলো সেখানে।
.
.
আকাশটা আজ ঘোলাটে। মেঘের আবরণে রাতের আকাশটা অনন্য লাগছে। একটা তীব্র ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে আফরার নাকে। আফরা চেয়ারে আরামসে বসে আনমনে সে ঘ্রাণ নাকে টেনে নিলো। ফারহানও বসে আছে পাশে। নিশিরাতের মায়াবী আলোতে মানুষটাকে লাগছে এককথায় অনন্য।আফরা এবার বলে ওঠলো,

-আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য আপনার মনে আছে?

মৃদু হাসলো ফারহান। আড়ষ্ট গলায় বললো,

-মনে আছে। আপনার ভাষ্যমতে আমি নাকি আপনার সম্পর্কে কিছুই জানি না। তাই আপনি চান আপনার সম্পর্কে নিজ থেকে আমায় বলতে।

-যাহ্! আপনার তাহলে মনে আছে।আচ্ছা, আপনি তাহলে বলুন তো আমার সম্পর্কে আপনি আসলে কি কি জানেন?

কিছু একটা ভেবে নিলো ফারহান। তারপর আফরাকে বললো,

-আপনি চাচুর দূর সম্পর্কের বোনের মেয়ে। পারিবারিক আর জন্মসূত্রে অ্যামেরিকার নিউইয়র্কেই বড় হয়েছেন। ছুটি কাটাতে দু’মাসের জন্য এসেছেন শ্রীমঙ্গলে।

চোখ ছোট হয়ে এলো আফরার। মুখ কালো করে বললো,

-ব্যস এতটুকুই জানেন?

-হ্যা! এর থেকে আর বেশি কি জানবো?

-মানে একটু চেষ্টাও করেননি আমার সম্পর্কে জানার?

আফরা কড়া স্বরে বললো।ফারহান নির্বিকারে প্রতিউত্তর দিলো,

-না।

অপমানে থমথম করছে আফরার মুখশ্রী। খোলা চুলগুলো তুলি দিয়ে আটকে রাগ নিয়ে বললো,

-আমার থেকে কিছু শেখা উচিত আপনার। আপনাকে দেখার পরপর আমার অনুমান আর চেষ্টার পরই আপনার সম্পর্কে জানতে পেরেছি।

-কি জানতে পেরেছেন একটু শুনি?

সন্দিহান কন্ঠ ফারহানের। আফরা অগোচরে একটা দুষ্টু হাসি দিলো। এইতো সুযোগ পেয়েছে ফারহানকে জব্দ করার। চেয়ার টেনে আরও কাছে গিয়ে বসলো আফরা। ফারহানের নিঃশ্বাস এবার যেন ক্রমে বন্ধ হয়ে আসছে। আফরা ফারহানের কাছে ঝুকে বললো,

-এইযে.,,,,আপনার এরোগেন্ট ক্যারেক্টারের জন্য এখানকার মেয়েরা নাকি আপনার জন্য পাগল। যারা জীবনেও কলেজে যায় না তারাও নাকি তখন কলেজে যায় যখন আপনি স্টুডেন্টসদের নিয়ে কলেজে স্ট্রাইক বা অন্য কোনো কাজ করতে যান। একবার এক মেয়ে নাকি আপনার বিয়ে করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলো। আপনি যেই চড় দিয়েছিলেন,,,,,,মেয়ে নাকি সুসাইড করতে চেয়েছিলো।

ফারহান শান্ত ভাবে বসে আছে। গম্ভীর গলায় বললো,

-এসব আপনাকে কে বলেছে?

-তা না জানলেও চলবে মিঃ কমরেড।

আফরার মুখে চাপা হাসি। ফারহান কথাটি অন্যদিকে ঘুরানোর জন্য বললো,

-আপনি কি করেন অ্যামেরিকাতে?

-ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন থেকে গ্রাজুয়েটেড। জব করতে চেয়েছিলাম। পরে মম জোর করে বিডিতে পাঠিয়ে দিলো। বললো দু’মাস এখানে থাকতে। তারপর নাহয় ওয়াশিংটন এ ফিরে গিয়ে জব করবো।

-আপনি আর আপনার মম-ড্যাড কি একসাথেই থাকেন?

-উহু! অ্যামেরিকায় ১৮ বছর হওয়ার পরই ছেলে মেয়েরা আলাদা থাকতে শুরু করে। আমিও তারপর জ্যাকসন হাইটস ছেড়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে শিফ্ট হয়ে যাই।

-উনাদের মিস করেন না?

গম্ভীর হয়ে গেলো আফরা। এতক্ষণের প্রাণোচ্ছল মুখটি নিমিষেই যেন অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। বাইরে বহমান শীতল বাতাস। নীরব মোহময় পরিবেশ। আফরা মৃদু স্বরে বললো,

-আমি তাদের মিস করতে চাই না ফারহান। তারা এমন মানুষ যারা আমারসবদিক খেয়াল রাখলেও কখনও ভালোবাসা দিতে পারেনি। এমনকি আমায় বাংলায় কথা বলতে পারার ক্রেডিটটাও আমার মমকে আমি দেই। তবে,,,,,,,,,সে কখনোই আমায় ট্রাস্ট করেনি। তার ভাষ্যমতে, আমি হলাম বিগড়ে যাওয়ার সন্তান। আমার একটা ছোট্ট ভুলের জন্যই উনি শাস্তিস্বরূপ আমায় বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।

ফারহান নীরবতায় সাথে শুনলো আফরার এক একটি কথা। কোনো একটি কারনে মেয়েটার প্রচন্ড অভিমান জমে আছে ওর মায়ের প্রতি। ফারহানের হঠাৎ কি হলো ও জানেনা। আফরার চোখের কার্নিশ বেয়ে যে অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়েছিলো নিমিষেই তা হাত দিয়ে মুছে দিলো সন্তর্পনে। আফরা হতবাক। ফারহানের মতো আবেগহীন মানুষ যে এমন একটা কাজ করবে আফরা তা ভাবতেও পারেনি। ফারহান হঠাৎ আফরার উদ্দেশ্যে বললো,

-এবার আমি কিছু কথা বলবো। আপনি মনোযোগ দিয়ে শুনবেন তো?

ফারহানের কন্ঠে অদ্ভুত এক মাদকতা । সম্মোহিত হয়ে পড়লো আফরা। জড়ানো গলায় বলে ওঠলো,

-হুম।

-তাহলে শুনুন। বাবা-মা যা করে তা কখনোই খারাপের জন্য করে না। হয়তো বা সবার সন্তান লালন পালনের প্রক্রিয়া এক না । তবে কোনো বাবা-মা ই তার ছেলে মেয়ের খারাপ চায়না। আপনি জানেন,,,,আপনার মতো লাইফ লিড করার জন্য কত মানুষ হাহাকার করে? জানেন কত মানুষ বাবা-মা এর একদন্ড ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ওত পেতে বসে থাকে? কিন্ত হতভাগা সেসব মানুষের কপালে সেই ভালোবাসাই জুটে না। বড় হয় নিঃসঙ্গ মানুষের মতো। আজ আপনার বাবা-মা আছে। তাই আপনার কদর নেই। যদি আমার মতো এতিম হয়ে বড় হতেন,,,,,,,তবেই বুঝতেন বাবা-মা কি জিনিস!

-হুশশশ!

ফারহানকে কোনো কথা না বলতে দিয়ে হঠাৎ ওর মুখে আঙুল চেপে ধরলো আফরা।ফারহানের কথাগুলো বজ্রপাতের ন্যায় প্রতিটি কথা ওর কর্ণকুহরে বাজছে। হ্যাঁ, আফরার মনে প্রচন্ড অভিমান ওর বাবা-মা এর জন্য। কিন্ত ফারহানের কথার পরিপ‍েক্ষিতে এমন কিছুই ভাবেনি ও। মানুষ আসলেই অদ্ভুত। যা পায় তার থেকেও দ্বিগুন বেশিই চায়। আফরা মিহি কন্ঠে বলে ওঠলো,

-বারবার নিজেকে নিঃসঙ্গ বলবেন না ফারহান। বিশ্বাস করেন, এই কথাটি একেবারে বুকে গিয়ে লাগে আমার।

ফারহানের মনে হঠাৎ উথাল-পাতাল ঝড় শুরু হলো আফরার কথায়। শান্ত হয়ে বসে আছে সে। আফরা সংযত করে নিলো নিজেকে। আবহাওয়াটা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে তাই বলে ওঠলো,

-আমি তাহলে এবার আসি ফারহান।

ফারহান তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়লো । সম্ভীহান গলায় বললো,

-ঠিক আছে।

-থ্যাংক ইউ এত সুন্দর একটা ট্রিট দেওয়ার জন্য । সী ইউ এগেইন। গুড নাইট!

-গুড নাইট।

আফরা কুটির ছেড়ে এবার পা চালালো বাংলো বাড়িটির দিকে।

—————

রুমে এসেই আফরা বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো। ফারহানের সাথে কাটানো কিছু মুহূর্তের কথা স্মরণ করতেই শরীরে টানটান উত্তেজনা কাজ করছে মনে। হৃদয়ে অদ্ভুত সব অনুভূতি গ্রাস করে নিয়েছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠছে ফারহানের চেহারা। ইসসস! এই অনুভূতির নাম কি বলা যায়?

ইলাও তখন বালিশ নিয়ে আসলো আফরার ঘরে। আজ কথা ছিলো সারারাত আফরার সাথে শুয়ে শুয়ে গল্প করবে। কিন্ত আফরাকে এতটা ভাবনায় মশগুল হয়ে দেখে বিস্ময়ে ছেয়ে গেলো ইলার মুখ। আফরা খাটে শুয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। ইলা বসে পড়লো আফরার কাছে। মিহি গলায় বলে ওঠলো,

-আফরা আপু?

আফরার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। ইলা বারকয়েক পুনরায় ডাকলো তবে তা খেয়াল করলো না আফরা। সে তো নিজের ভাবনায় মগ্ন। ইলা বুঝে ওঠতে পারছে ওর কি হয়েছে। তাই বিড়বিড়িয়ে বলে ফেললো , প্রেমে-ট্রেমে পড়েছে নাকি এই মেয়ে?
.
.
.
.
#চলবে……..ইনশাআল্লাহ