অথৈ জলের পুষ্পমাল্য পর্ব-০৩

0
603

#অথৈ জলের পুষ্পমাল্য

কামরুন নাহার মিশু

যাকগে হয়তো জোরেই আওয়াজ করেছে। মধ্যরাতে রাতের নিস্তবদ্ধতা ভেদ করে ছোট খাট আওয়াজও বেশ প্রকট মনে হয়। আজ অবশ্য অত গরমও নেই। সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি হয়েছে, তারপর থেকে ঠান্ডা ঠাণ্ডা একটা ভাব। সীমাপার হয়তো রুমের ফ্যান বন্ধ ছিল। মা তো কখনো ফ্যানের বাতাস সহ্য করতেই পারেন না।

রীমার অবশ্য গরম বেশি। সে ফ্যান বন্ধ করে রাখতে পারে না। রুপাই বুকের দুধ খায়। বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চার মায়েদের মনে হয় গরম বেশি। না হয় সবাই যখন ঠাণ্ডা ঠান্ডা বলে তখনও রীমা গরমে দরদর করে ঘামতে থাকে।

৩)

রীমা আজ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে। না উঠে উপায় নেই। শাশুড়ি মা বাসায় আছেন। বলা তো যায় না সামান্য একটা অজুহাতে হয়তো তিনি আবারও কথা শুনাতে শুরু করে দেবেন সীমাপার সামনে। তখন মান-সম্মান বলে আর কিছুই থাকবে না।

রীমার ইচ্ছে ছিল আজ সবার আগে উঠে শাওনকে “গুড মরনিং” জানিয়ে চমকে দেবে। রুপাই আর মা ঘুমে থাকতে থাকতেই রাতের অবশিষ্ট কাজটা সেরে দুজনে একসাথে শাওয়ার নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকবে। তারপর হাতে হাতে দুজনে মিলে সকালের নাস্তাটা রেডি করে ফেলবে, যেমনটা করত বিয়ের পর। রীমাকে রান্নাঘরে দেখলে মা হয়তো খুশি হবেন। দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে নিজেদের মধ্যে সে অভিমানে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো হবে না, সে দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টাও করতে হবে নিজেদেরকেই।।

রীমা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চোখ ভর্তি করে গাঢ় কাজল পরল। গতরাতের বাসি কাপড় খুলে শাওনের পছন্দের থ্রি-পিসটা পরে হালকা পারফিউম লাগাল।
আজ সকাল সকাল শাওনের মাথাটা ঘুরিয়ে দিতে হবে। ব্যাটা বদের হাড্ডি! নানান অজুহাতে দূরে থাকছে। আজ সব দূরত্ব গোছাবে।

রীমা গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে নিজের রুমের দরজা খুলে বাহিরে এলো। সীমাপা এখনো ঘুমাচ্ছে নিশ্চয়ই। রাত জেগে বই পড়েছিল যখন। আজ আর এত সকালে সে জাগবে না। রীমা প্রথমে সীমার রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে, তাকাল মায়ের রুমের দরজার দিকে। মায়ের রুমের দরজা খোলা। মা সুর করে কুরআন পাঠ করছেন। এখনো হয়তো রুম থেকে বের হননি।

রীমা এবার এগিয়ে গেল শাওনের রুমের দরজার দিকে। দরজা চাপানো। রীমা হাত রাখার সাথে সাথে খুলে গেল। তার মানে শাওনও উঠে পড়েছে । রীমা দেওয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলে সকাল ছয়টা পনেরো মিনিট। এত তাড়াতাড়ি শাওন কখনো ঘুম থেকে উঠে না। আজ আবার কি হলো। রীমা চুপিচুপি রুমে উঁকি দিলো। শাওন বিছানায় নেই।

কোথায় যেতে পারে!

রীমা এক ছুটে বারান্দায় গেল। না শাওন বারান্দায় নেই। ওয়াশরুমেও নেই। রীমার মন খারাপ হয়ে গেল। কোনো কিছুই পরিকল্পনা মতো হয় না। রুপাই হওয়ার পর প্রায় ছয়মাস রীমা রাত জাগার কারণে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারত না। সকালের নাস্তা তাই সীমাপাই রেডি করে, সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলত। সবাই আর কে? রীমা, শাওন আর মাঝেমধ্যে বেড়াতে আশা শাওনের মা।

ইদানিং সীমা আপাকে সকাল সকাল উঠে নাস্তা বানাতে বলতে রীমার বিবেকে বাধে। সীমাপা তো আর এবাসার কাজের লোক না যে রোজ রোজ একই কাজ করবে।
তারপরও সে অনেক উপকার করেছে। সীমাপা না থাকলে রীমার পক্ষে কখনোই এত সহজভাবে মাতৃত্বকালিন ধকল সামলানো সম্ভব হতো না।

তাই গত কয়েকদিন রীমা শাওনকে ফ্রোজেন করে রাখা পরোটা, পাউরুটি, ডিম দিয়ে কোনো রকম নাস্তাটা সারে। আজও ফ্রোজেন করা পরোটাই দিত। কিন্তু মা হয়তো বাসি পরোটা দিয়ে নাস্তা করতে রাগ করবেন। তাই রীমা উঠে পড়েছে নাস্তা বানানোর জন্য। ফ্রিজে গরুর মাংশ রান্না করা আছে, মা গ্রামের বাড়ি থেকে খেজুরের তরল গুড় এনেছেন। সাথে খোলা পিঠা আর লাচ্ছি পরোটা বানিয়ে দিলেই হবে। রাতেই রীমা সব পরিকল্পনা করে রেখেছে।

হঠাৎ রান্নাঘরের কল থেকে পানি পড়ার শব্দ শুনে রীমা ভাবল,

আচ্ছা,জনাব তাহলে চা বানাতে রান্নাঘরে গেছেন। রীমার মনে দুষ্ট বুদ্ধি এলো, পেছন থেকে চোখ টিপে শাওনকে ভয় পাইয়ে দেবে। তাই রীমা পা টিপে টিপে রান্নাঘরে উঁকি দিল। শাওন রান্নাঘরে আছে ঠিকই তবে সে একা নয় সীমাপাও আছে। সীমাপা চা বানাচ্ছে, শাওন চায়ের কাপ ধুচ্ছে। শাওনের পরনে নতুন টাউজার, গায়ের উপর একটা টাওয়েল প্যাঁচানো, চুল ভেজা তারমানে সে গোসলও করে ফেলেছে।

কী সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দুজনে কথা বলছে! কেন জানি দৃশ্যটা রীমার কাছে মোটেও ভালো লাগেনি। মা সীমাপাকে শাওনের সাথে রান্নাঘরে দেখলে রাগ করতে পারেন।

শাওনের চা খেতে ইচ্ছে করলে সে রীমাকে ডাকতে পারত, সীমাপা কেন?

রীমা তো ভালো করেই জানে, শাওন সীমাপাকে বড় বোনের দৃষ্টিতে দেখে, কিন্তু মা তো এসব বুঝতে চাইবেন না। বুঝবেন কেন? আজ সীমাপার জায়গায় অন্য কেউ হলে সমস্য থাকত না, এখন সমস্যা একটাই সীমা রীমার বোন।

রীমার খুব অভিমান হলো। ভেবেছে রাগ দেখিয়ে চলে যাবে। কিন্তু কার উপর রাগ করবে? কেন রাগ করবে? সীমাপা তার বড় বোন। অনেক মধুর ও বন্ধুত্বপূর্ণ তাদের সম্পর্ক। মায়ের কারণে সে তার প্রিয় বোনকে কষ্ট দেবে না-কি!

শাওন বেচারার দোষ দিয়েই বা লাভ কি! চা খেতে ইচ্ছে করলে সে বউকে না পেলে যাকে সামনে পাবে তাকেই তো বলবে! এদিকে ছেলের কারণে তো সত্যি সত্যি স্ত্রী হিসাবে স্বামীর পরিপূর্ন দায়িত্ব পালন করতে পারেনি রীমা।

রীমা নিজেকে সংযত করে বলল,

” কী করছ তোমার?”

” মহারানীর জন্য চা বানাচ্ছি।”

শাওনেরর কণ্ঠে কিছু একটা ছিল। রীমার মোটেও তার কথা ভালো লাগেনি, তাই কিছুটা রাগ করে বলল,

” মহারানী কি তোমাদের থেকে চা খেতে চেয়েছে?”

” আপনি চা খাবেন কেন? আপনি তো কফি খান।”

সীমাপা এবার বলল,

“শাওন রীমাকে রাগাচ্ছ কেন? যাও তোমরা রুমে, আমি তোমাদের জন্য চা, নাস্তা নিয়ে আসছি। খালাম্মা আছেন। উনাকেও চা দিতে হবে।”

সীমাপার মুখে শাওন ডাকটাও আজ বড্ড বেমানান লাগছে। শাওনকে অধিকার নিয়ে নাম ধরে ডাকবে রীমা। অন্য কেউ নয়।

সীমাপার কাথায় বাধ্য ছেলের মতো শাওন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

” কী হলো মুড অফ কেন তোমার? রাতে কি ঘুমাতে পারনি? তাহলে উঠছ কেন এত ভোরে? ছেলে তো ঘুমাচ্ছে। তুমিও সেই সুযোগে একটু ঘুমিয়ে নিতে। মা আছেন, সীমাপা আছে। তারা দুজনে মিলে একটা নাস্তার ব্যবস্থা করে নিলেই হতো।”

রীমার বলতে ইচ্ছে করল, জগৎ সংসারের আর কয়টা খবরই তুমি জানো! তোমার মা কি এখন আর আগের মতো সহজ মানুষ আছেন? যে বউয়ের অনুপস্থিতিতে ছেলের বাসায় নাস্তা বানাবে।

কিন্তু সেসব কথা না বলে রীমা অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে বলল,

” তুমি কি গোসল করে ফেলেছ।”

” কী আর করব! রাতে করতে চেয়েছিলাম। অথচ কেউ সুযোগ করে দেয়নি। তাই সকালে তো করতেই হবে। ”

” সুযোগ কি তুমি কাউকে দিয়েছ? ”

” সরি বেবি, রাগ করো না। ঘুমিয়ে পড়েছি। আজ একটু আর্লি অফিসে পৌঁছাতে হবে। আজ অফিসে অডিট আসবে।”

” কাল বলনি কেন, আজ তোমাকে তাড়াতাড়ি অফিসে যেতে হবে। আমি তাহলে আরও আগে উঠে যেতাম। ‘

” সুযোগ পাইনি বলার। মায়ের সাথে কথা শেষ করেই শুতে চলে গেলাম। রাগ করো না প্লিজ সোনা।”

” শুধু শুধু চা বানানোর জন্য সীমাপাকে কেন কষ্ট দিলে? কাল রাতে সে ঘুমায়নি। বই পড়েছে।”

” না আসুবিধা নেই। আমি উঠার আগেই মা আর সীমা আপা উঠে গিয়েছে। আমি বলিনি, সে নিজেই চা বানাতে রান্নাঘরে এলো।”

” ও আচ্ছা। সীমাপা আমাদের মেহমান। কিছু লাগলে আমাকে বলবে, সীমাপাকে বিরক্ত করবে না।? মা পছন্দ করেন না। ”

” ওকে জনাবা। মহারানীর আদেশ শিরোধার্য।”

শাওনের দুষ্ট মিষ্টি কথায় রীমার মন ভালো হয়ে গেল। রীমা ঝুঁকে শাওনকে কপালে চুমু দিয়ে বলল,

” লাভ ইউ।”

এবার শাওন রীমাকে বুকে জড়িয়ে বলল,

” লাভ ইউ টু। আজ তোমাকে ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছে। অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু যেতে তো হবেই।”

” তবে রে! দুষ্টামি হচ্ছে না! বাসায় কিন্তু মা আছেন!

” তো কি হয়েছে? মা কি কিছু জানে না। ছেলে আর ছেলের বউ রোমাঞ্চ না করলে নাতি পুতিতে ঘর ভরবে কিভাবে?”

এমন সময় ট্রে হাতে নিয়ে সীমা আপা হাজির। মুহূর্তে সে চা, নাস্তা সব রেডি করে ফেলেছে।
লজ্জা পেয়ে শাওন দ্রুত রীমাকে আলিঙ্গন মুক্ত করে সামনে থেকে সরে গেল।

নাস্তার টেবেলে বসেই শর্মিলি প্রথমে আক্রমন করলেন রীমাকে,

” তুমি কি এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলে?”

” না মা ঠিক এই এইমাত্র না!”

” শোন মেয়ে! নিজের সংসার নিজেকে সামলে রাখতে হয়। অন্যের উপর ঠেস দিয়ে পড়ে থাকলে একদিন দেখবে, তুমি সংসারের অতিথি ছাড়া আর কিছুই না। সংসার অন্যের দখলে চলে যাবে।”

মায়ের কথা কেউ কিছু বুঝল বলে মনে হলো না। শাওন কেবল উঠে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

” নিস্চয়ই আমার লক্ষ্মী মায়ের রাতে ভালো ঘুম হয়নি। না হয় পুকুরের মতো শান্ত মেয়েটা এমন সমুদ্রের গর্জন দিচ্ছে কেন?”

চলবে…..