অদ্ভুত তোমার নেশা পর্ব-০৩

0
1507

#অদ্ভুত_তোমার_নেশা
#লেখিকা_লায়লা_আঞ্জুমান_ইতি
#পার্ট________০৩




তারপর কুহু বলল,,,,,ঠিক আছে চলে যাব কিন্তু আপনার হাত কেটে গেছে রক্ত পড়ছে মেডিসিন লাগাতে হবে।বিভোর রেগে বলল,,,,কোনো প্রয়োজন নেই। কুহু বলল,,,,আপনি না ডক্টর এই সম্পর্কে তো আমার থেকে আপনি ভালো জানেন, ওওহহহ আপনি মনে হয় গরুর ডাক্তার তাই না। কুহুর এমন অদ্ভুত কথায় বিভোর অবাক হয়ে গেল, কুহু বিভোরের মুখ দেখে খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল।কুহুর হাসি দেখে বিভোরের রাগ সব পানি হয়ে গেল বিভোর আবার ঘোরে হারিয়ে গেল।

কুহু বিভোরের হাত ধরে বিভোরকে সোফায় বসিয়ে দিল তারপর হাতে মেডিসিন লাগিয়ে দিতে লাগলো,বিভোর চুপ হয়ে রয়েছে,কুহু বিভোরের হাতে মেডিসিন লাগিয়ে দিল।তারপর বিভোরকে কিছু বলার আগে বিভোর বলে উঠল,,,, প্লিজ এই বিষয়ে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করবে না। কুহু বলল,,,,ঠিক আছে কিছু জিজ্ঞেস করব না কিন্তু অন্যের উপর রাগ করে নিজের ক্ষতি করা বোকামি আপনাকে দেখে ভালোই চালাক মনে হয় তাহলে বোকার মতো নিজেকে আঘাত করলেন কেন।

কুহুর কথা শুনে বিভোর অবাক হয়ে তাকালো কুহুর দিকে আসলেই তো অন্যের উপর রাগ করে কেন ও নিজের ক্ষতি করছে।কুহু বসা থেকে উঠে জায়গাটা পরিষ্কার করতে লাগলো,বিভোর বলল,,,,ওই সব তুমি পরিষ্কার কর না তোমার লেগে যাবে।কুহু বলল,,,,না কিছু হবে না আমার কাজ করে অভ্যাস আছে। দেখতে দেখতে কুহু গুছিয়ে গুছিয়ে সুন্দর মতো পুরোটা রুম পরিষ্কার করে ফেলল,সব কিছু গুছাতে গিয়ে কুহু একটা অ্যালভাম পেলো বিভোরকে দেখিয়ে বলল,,,,এটা কি আপনাদের ফ্যামেলি অ্যালভাম।বিভোর বলল,,,হ্যা।কুহু বলল,,,,দেখতে পারি।বিভোর বলল,,হুম।কুহু খুলতেই একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে দেখতে পেলো, এটা দেখে কুহু বিভোরকে বলল,,,,এরা কারা।বিভোর দেখে বলল,,আমার বাবা মা।বিভোর নিজের বাবা মার ছবি দেখে উৎফুল্ল হলো, তারপর বলল,,এটা বাবা মার প্রথম বিবাহ বাষিকী এর ছবি।কুহু বলল,,,,,
– ওহ দুজনকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে
– হুম
– আর উনিকে
– আমার দাদু আর দিদিভাই,দাদুর একমাত্র ছেলে আমার বাবা ছিল, আর আমার বাবার একমাএ ছেলে আমি,আমার আর একটা ভাই বোন হলে খুব ভালো হতো অন্তত এই বাড়িতে একা থাকতে হতো না।
– বিয়ে করে ফেলেন
– আমি বিয়ে করব না
– কি হিহিহিহিহি
– হাসছো কেন
– এমনি হিহিহিহিহি আচ্ছা বাদ দেন এই ছোট বাচ্চা টা কে
– এটা আমি
– কি ওয়াও কত কিউট দেখাচ্ছে, আপনার রুপের রহস্য কি হুম
– কি???? (বিভোর অবাক হয়ে কুহুর দিকে তাকালো কুহুর পাগলের মতো কথা শুনে বিভোরের খুব হাসি পাচ্ছে এই মেয়েটা আসলেই ম্যাজিক জানে বিভোররের মন ভালো করে দেয়)

বিভোর আর কুহু অনেকখন ধরে গল্প করছে ঘড়িতে তখন মাঝ রাত ৩ টা বেজে ৪৬ মিনিট।কুহু কথা বলতে বলতে এক পর্যায় ঘুমিয়ে পড়লো,বিভোর কুহুর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে,মেয়েটা আসলেই চমৎকার দেখতে, মেয়েটার কোমড় ছাড়ানো লম্বা সিল্কি চুল
যেন এক রেশ ছড়িয়ে দেয় চারপাশে,বড় চোখ আর ঘন কালো পিসি বার বার নাড়িয়ে যখন কথা বলে তার চোখে এক মায়ার রাজ্য ভির করে,তার পাতলা ঠোঁটের মিষ্টি হাসি যেন মন ভালো করে দেওয়ার মতো।বিভোর কুহুর দিকে আর বেশিখন না তাকিয়ে থেকে কুহুকে বিছানায় ঠিক মতো শুয়িয়ে দিল,বিভোর ওর সামনে থেকে যখন যেতে নেবে তখনি কুহু বিভোরের হাত জরিয়ে ধরলো ঘুমের মাঝে,বিভোর আস্তে করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল,তারপর বারান্দায় চলে গেল,একটা সিগারেট ধরিয়ে খেতে লাগলো,ব্যথের চেয়ারে বসে
পড়লো, খোলা আকাশের দিকে তাকালো,আবার তার মন ভারী হয়ে উঠলো,চোখ দুটো লাল বর্ণ ধারণ করলো চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু পানি জোরো হলো,ড্রিংক এর বোতল খুলে গ্লাসে নিয়ে খেতে গিয়ে থেমে গেলো,একবার রুমের ভিতরে তাকালো ঘুমন্ত কুহুকে দেখে আর ড্রিংক করলো না, কারণ বিভোর ড্রিংক করলে ওর মাথা ঠিক থাকে না কখন কি করবে পরে নিজেই মনে করতে পারে না তাই আর ড্রিংক করলো না,কিন্তু এই মূহুর্তে বিভোর রেগে আছে তার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে সে রাগটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য জ্বলন্ত সিগারেট টা নিজের হাতে চেপে ধরলো আর নিজের চোখ বন্ধ করে নিলো।

কুহু ঘুমের মাঝে অনুভব করছে কে যেন ওকে ডাকছে, কুহু ধিরে ধিরে চোখ খুলে দেখে একটা সুন্দরী মেয়ে, কুহু মেয়েটাকে এর আগে দেখে নিই তাই ভয়ে পেয়ে দূরে সরে গেলো,কুহুর ভয় পাওয়া দেখে মেয়েটা মুচকি হেসে বলল,,,,,ম্যাম ভয় পাচ্ছেন কেন আমার নাম বিভা আমাকে বিভোর স্যার বলেছে আপনার সাথে থাকতে সারা দিন।কুহু নিজে সাভাবিক করে বলল,,,,ওহ আমি ভয়ে পেয়ে গিয়ে ছিলাম।বিভা বলল,,,,ম্যাম আপনার রুমে আপনার ড্রেস রাখা আছে ফ্রেশ হয়ে ব্রেক ফাস্ট করে নিন।কুহু নিজের রুমে গিয়ে দেখে ওর রুমে কোনো ড্রেস নেই, কুহু ভাবতে লাগল,,,,একটু আগে তো বলল আমার রুমে ড্রেস আছে কিন্তু কই কিছুই তো নেই।কুহু ভাবতে ভাবতে কি ভেবে যেন আলমারি টা খুললো, আলমারি খুলে কুহুর চোখ বড় হয়ে গেলো পুরো আলমারি কাপড় দিয়ে ভরা সব গুলো ড্রেস খুব সুন্দর, কুহু বেবি পিনক কালারের একটা থ্রি পিস বের করলো তারপর পরে বাহিরে গেল, ওখানে বিভা দাড়িয়ে আছে, বিভা কুহুকে দেখে বলল,,,ম্যাম আপনাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে আসুন কিছু খেয়ে নিন।কুহু ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলো, তারপর বিভাকে বলল,,,আপনিও আমার সাথে খান।বিভা হেসে বলল,,,
– না ম্যাম আমি খেয়েছি
– ওহ,,আপনি প্লিজ আমাকে ম্যাম বলবেন না, আপনি তো আমার বড় আমাকে কুহু বলেই ডাকুন
– না স্যার শুনলে রাগ করবে
– আরে কিসের রাগ করবে কিছু বলবে না, আপনি আমাকেই কুহু বলেই ডাকবেন আর আমি আপনাকে আপু বলে ডাকতে পারি
– ঠিক আছে
– হুম

কিছুখন পর একজন মধ্যে বয়স্ক মহিলা আসলো আর দুজন লোক,মহিলা টা এখানে কাজ করে রান্নার কাজ বাড়ী পরিষ্কার করার কাজ করে, আর একজন হলো দারোয়ান চাচা, আরেক জন সবুজ ভাই যে বাগান দেখাশোনা করে সবার সাথে কুহুর খুব ভালো পরিচয় হয়ে গেলো।
কুহু আর বিভা বাগানে চেয়ারে বসে আছে, কুহু বিভাকে বলল,,,,আচ্ছা আপু একটা কথা বলি।
বিভা বলল,,,,
– হ্যা বল
– না মানে তোমরা আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করলে না যে আমি এখানে কি করছি বা….
– স্যার তোমার কথা সব বলে দিয়েছে আমাকে তাই জিজ্ঞেস করার কিছু নেই
– ওহ আচ্ছা উনি মানুষ টা খুব ভালো, একটা অজানা অচেনা মেয়েকে সাহায্য করছেন
– হুম স্যার খুব ভালো মানুষ কিন্তু রাগটা প্রচুর, আগে আমি স্যারের সাথেই থাকতাম কিন্তু স্যার সকালে বলল এখন থেকে তোমার খেয়াল রাখতে হবে আমাকে।
– আমি বাচ্চা নাকি
– হুম তা তো
– কি বললা আপু
– হা হা হা থাক বাদ দেও।

রাতের দিকে,,,বিভোর ক্লান্ত হয়ে বাড়ীতে আসলো, কিন্তু কুহুকে কোথাও দেখতে পেল না বিভোর, বিভোর নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয় নিলো,তারপর নিচে নামলো ডাইনিং টেবিলের সামনে গিয়ে দেখে একটা মেয়ে প্লেট ঠিক করছে,পড়নে হলদে রঙের থ্রি পিস পড়া,চুল গুলো ছাড়া ছোট একটা কাকড়া দিয়ে সামনের অল্প কিছু চুল আটকানো, কুহু পিছনে বিভোরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল,,,খেতে বসুন।বিভোর কুহুর ঠোঁটের মিষ্টি হাসি দেখে এক অদ্ভুত ঘোরে হারিয়ে গেছে, এই হাসিটা দেখে বিভোরের সারা দিনের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল,একটা মানুষের হাসিতে এতটা মুগ্ধতা কিভাবে থাকতে পারে।কুহু আবার বলল,,,,কি হলো আসুন।বিভোর নিজেকে সাভাবিক করে গিয়ে চেয়ার টেনে বসল, কুহু সার্ভ করে দিল,বিভোর কুহুকে বলল,,,,,,,
– তুমি খেয়েছো
– না
– তাহলে খেতে বসো
– ওকে
– বিভা তোমার খেয়াল রাখছে ত…………
– বিভা আপু খুব ভালো, আর আপনাকে আমার জন্য এত করতে হবে না
– মানে
– মানে হলো এই যে আপনি আমার এত খেয়াল রাখছেন
– দেখো যেহেতু তুমি আমার কাছে আছো সেহেতু তুমি এখন আমার দায়িত্ব
– কিন্তু আপনি কেন আমার জন্য এত কিছু করছেন
-………………………………………………
– কি হলো বলুন
– জানি না
– হিহিহিহি আপনার কথা মাঝে মাঝে আমার মাথায় ঢোকে না বাদ দেন,কিন্তু আমি এভাবে আপনার কাছ থেকে ফেভার নিতে পারব না
– কেন
– হুম আপনি আমাকে কোনো কাজ দেন
– তোমাকে কিছু করতে হবে না
– না আমাকে কাজ দেন প্লিজজজ
– ঠিক আছে, কাল থেকে তুমি ভার্সিটি যাবে
– এটা কি কোনো কাজ হলো তা ছাড়া ভার্সিটির খরচ কোথ থেকে পাব আর আমি কিছু না করে আপনার কাছ থেকে কোনো ফেভার নেবো না
– ওকে তাহলে তোমার ভার্সিটি ছুটি হবার পর তুমি আমার অফিসে চলে যাবে, ওখানে আমার পিএ আকাশ এর এ্যাসেসটেন্ট হিসেবে কাজ করবে, এটা তোমার পার্টটাইম জব ভেবে নেও
– সত্যি থ্যাংক ইউ সো মাচ
– এখন চুপচাপ খাও

কুহু আর বিভোর খাওয়া শেষ করলো, তারপর যে যার রুমে চলে গেলো, কুহুর আজ এত আনন্দ লাগছে যে সে বলে বুঝাতে পারবে না, জীবনের এক সুন্দর অধ্যায় শুরু হতে চলেছে কুহুর, সে আবার নিজের স্টাডি ক্যান্টিনিউ করতে পারবে তার থাকার জন্য একটা জায়গা হয়েছে কিন্তু কত দিন পযন্ত সে জানে না, আর সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো সে জব পেয়ে গেছে, আজ কুহুর ঘুমই আসছে না শুধু এপাশ ওপাশ হচ্ছে, কিন্তু ঘুমাতে তো হবেই নইলে সকালে উঠতে পারবে না,তাই জোর পূর্বক চোখ দুটো বন্ধ করে নিল।

অন্যদিকে,,,, বিভোর রুমে বসে ড্রিংক করছে, এর মাঝে বিভোরের ফোন বেজে উঠল,,, বিভোর তাকিয়ে দেখে ওর দাদু,বিভোর ফোন রিসিভ করে বলল,,,,,,,
– হ্যালো দাদু কেমন আছো
– ভালো তুই কেমন আছিস দাদু ভাই
– আছি, তুমি আমার কাছে চলে আসো না দাদু তোমাকে ছাড়া ভালো লাগে না
– এখন না দাদুভাই
– ঠিক আছে রাত হয়েছে বায়
– আরে বায় মানে অভিমান করলি বুঝি এই বৃদ্ধ লোকটার উপর, আর কত দিনই বাচবো
– দাদু তুমি আবার এইসব কথা শুরু করেছো তুমি চলে গেলে আমাকেও সাথে করে নিয়ে যাবে এই পৃথিবীতে আমি একা থাকতে পারব না
– আরে কি বলছিস তোর তো এখনো আরও কত সময় পড়ে আছে, কবের থেকে বলছি বিয়ে করে ফেল তোকে সুখি দেখে আমিও একটু শান্তি পাব
– না দাদু আমি বিয়ে করব না
– দাদু ভাই জীবন এত সহজ না, একবার কষ্ট পেয়েছিস তার মানে তো আর এটা না যে আবার কষ্ট পানি হয় তো আল্লাহ তোর জীবনে সঠিক কাউকে পাঠিয়ে দেবে
– আশা করি না, বাদ দেও তুমি ঔষধ খাচ্ছো তো
– হ্যা রে দাদুভাই ঠিক মতো খাচ্ছি, আচ্ছা রাখি
– আচ্ছা কাল আবার ফোন করব

বিভোর ফোন কেটে দিল।আবার ড্রিংক এর গ্লাস হাতে নিয়ে খেতে লাগলো,পুরোনা ব্যথা আর অনুভব করতে চায় না বিভোর, এর মাঝে আবার ফোন বেজে উঠলো বিভোরের ফোনের স্কিনে মিমি নামটা দেখে বিভোর রেগে ফোনটা কেটে দিল, আবার ফোন আসলো বিভোর রেগে ফোন রিসিভ করলো আর বলল,,,,,
– কেন ফোন করেছো
– প্লিজ বিভোর ট্রায় টু আন্ডারস্টেন্ড
– আমি কোনো কিছু বুঝতে চাই আর ফোন করবে না
– আই লাভ ইউ বিভোর প্লিজ সে ইউ লাভ মিই
– নো আই হেট ইউ, ইউ আর চিটার
– আই এম সরি বিভোর প্লিজ আমাকে মাফ করে দেও
– নো ওয়ে, আর কখনো কল করবে না, নইলে ভালো হবে না বলে দিলাম
– আই ডোন্ট কেয়ার, প্লিজ বিভোর আই লাভ ইউ
– আই জাস্ট হেট ইউ মিমি, আই জাস্ট হেট ইউ

বলেই বিভোর ফোন কেটে দিল,বিভোর রেগে ড্রিংক এর গ্লাসটা ফ্লোরে আছার দিল।

চলবে…………..
ভুলক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন 💙