#অনুবদ্ধ আয়াস
#ইফা আমহৃদ
পর্ব:০৭+০৮
অফিসে বসের আসনে নিজের বরকে দেখে মাথা ঘুড়ছে আমার। চারদিকে এতো আলোর মাঝেও দুচোখে ধোঁয়াশা ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি। রৌধিককে মোটেও আশা করি নি এখানে। হুট করে তাকে দেখে চমকে গেলাম। রৌধিক এখনো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।রৌধিক তার প্রত্যুত্তর না পেয়ে কঠোর স্বরে বললেন, “ওয়াট ইজ ইউর নেম মিস্ ওর মিসেস?”
কেঁপে উঠলাম আমি। নিজের ভেতরে ফিরলাম। আমাকে স্তব্ধ হয়ে থাকতে দেখে ম্যানেজার সাহেব বললেন, -” মিস্ জোনাকি। ও, ও জোনাকি!”
রৌধিক টেবিলে আঘাত করে বলল,
” আপনাকে আমি জিজ্ঞাসা করছি? যাকে জিজ্ঞেস করেছি, সেই বলুক। অহেতুক কথা বলা আমি পছন্দ করি না, ম্যানেজার সাহেব। তাছাড়া আপনাকে আমি কিছু জিজ্ঞাসা করেছি? করি নি। এভাবে আগ বাড়িয়ে কথা বলা আমি পছন্দ করি না। আশা করি নেক্সট টাইম থেকে মনে রাখবেন কথাটা। আপনি আপনার কাজে যান! আর আপনি..
সারাদিনে মাত্র ৮ ঘন্টা অফিসে আজ করেন। তার উপরে এতো দিন আসেন নি কেন? কোনো ছুটি নিয়েছিলেন? জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন নি কেন?”
রৌধিকের কড়া প্রশ্ন। আমি মুখ ফুটে কিছু বলতে চাইলে ধমকে উঠলেন তিনি। ফাইল টা ছুঁড়ে ফেলে বললেন,-” আশ্চর্য! এখনো দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও এখান থেকে আর এই ফাইলটা চেক করে তবে তুমি বাড়িতে যাবে। নাও আউট!”
আমি ফাইলটা তুলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলাম। নিজের টেবিলে বসে কাজ করতে লাগলাম। লাঞ্চ টাইমে আহির, সারা খেতে ডেকেছিল। কাজের কারণে খাওয়া হয়ে উঠেনি। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল। রাত আটটা বাজলো। অফিস ছুটি হয়ে গেল। আমি তখনও নির্বিকার ভাবে কাজ করে চলেছে। রাত বাড়তে লাগলো। হুট করে আলো বন্ধ হয়ে গেল। দৃষ্টি ফিরে চাইলাম আমি। সবকিছু ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারদিকে কেউ নেই। অন্ধকারে কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কানে অস্পষ্ট নুপুরের শব্দ শ্রবণ হচ্ছে। হুট হাট শব্দ গুলোতে আমার ফোবিয়া আছে। অন্ধকারে ব্যাগ হাতরে ফোন খুঁজলাম। নিভু নিভু আলো। চার্জ নেই। দরজার কাছে গেলাম। বাইরে থেকে বন্ধ। কিছু স্টার্ফরা নিচ তলায় রাতে কাজ করে। সেখান থেকে আওয়াজ আসছে। গরমে ঘেমে গেছি আমি। বাম হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে ফেললাম। পেছনে ঘুরতেই হাত থেকে ফোনটা নিচে পড়ে আলো নিভে গেল। বসে পড়লাম নিচে। হাতরে ফোন খোঁজার চেষ্টা করলাম। পেলাম না। ভাঙা ভাঙা কয়েক টুকরো হাতে এলো। ঠাস করে মাথায় কিছু একটা পড়লো। জিম ধরে রইলো মস্তিষ্ক। ধীরে ধীরে ঝাঁপসা হয়ে এলো চোখজোড়া। বুঝতে পারলাম জ্ঞান হারাচ্ছি।
.
চোখের পাতায় পানির কণা পড়তেই নিভু নিভু চোখে অবলোকন করলাম। সর্বপ্রথম দর্শন হলো রৌধিকের মুখশ্রী। পানির বোতল ঠোঁটের কোণে রেখে হেলিয়ে দিলো মুখে। পানির সাহায্যে গলা ভিজিয়ে নিঃশ্বাস নিলাম। নিজের সাথে মিশিয়ে নিল আমায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
” আর ইউ ওকে?”
“হম।”
রৌধিক আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাকিদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপনারা কেমন দায়িত্ব পালন করেন, আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না। স্টার্ফরা ফ্লোরের ভেতরে আছে কি নেই, সেটা চেক না করেই লক করে দিচ্ছেন। তাহলে আপনাদের কেন রাখা হয়েছে। স্পিক আপ..
আমিই তো যাওয়ার সময় লক করে যেতে পারি। কালকে এসেই আমার সাথে দেখা করবেন। ”
সবাই মাথা নিচু করে আছে। রৌধিক আমাকে কোলে তুলে নিলেন।
_______
দুজনের মাঝে আকাশ পাতাল দূরত্ব। রৌধিক ড্রাইভ করছে আমি বসে আছি। বাবা আর বোনের কথা খুব মনে পড়ছে। ব্যাগটা রেখে এসেছি। ফোনটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। নেই বললেই চলে। রৌধিক আঢ় চোখে আমার দিকে তাকালো। আমি তখনও ফোন চালু করার চেষ্টা করছি। নিজের ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে নমনীয় স্বরে বলল,
” চাইলে আমার টা দিয়ে ট্রাই করতে পারো।”
কোনো প্রত্যুত্তর না করে ফোনটা নিলাম। সর্বপ্রথম নজরে এলো সময়। বারোটা আটচল্লিশ। বাবার নাম্বারে ডায়াল করলাম। দুইবার দিতেই রিসিভ হলো। জয়া ফোন তুলে হ্যালো বলল। ঘুম ঘুম তার কন্ঠস্বর।
” আমি জোনাকি। তোরা কেমন আছিস এখন?”
“বাবা ভালো আছে আপু। তুই ভালো আছিস তো আপু?”
” হ্যাঁ। আমি ভালো আছি। ঘুমিয়েছিলি বুঝি?”
-” হ্যাঁ আপু। আপু..
থেমে গেল জয়া। আমি সন্দিহান স্বরে বললাম,” কিছু বলবি?”
” বলতে চেয়েছিলাম! আসলে ডাক্তার কালকে বাবাকে রিলিজ করে দিবে। আগের সব টাকা তো পরিশোধ করা আছে। তবে দুদিনের হসপিটালের বিল, ওষুধ পত্রের টাকা পাবে। পঁয়ত্রিশ হাজারের মতো হয়েছিল। আমি ডাক্তারকে বলে ত্রিশ হাজারে ম্যানেজ করেছি। কালকে সকাল দশটার মধ্যে বাবাকে বাড়িতে নিতে না পারলে কালকের বিলটাও দিতে হবে।”
নিশ্চুপ আমি। আমার কাছে এক টাকায়ও নেই। কালকে সকালের মাঝে কিভাবে এতোগুলো টাকা ম্যানেজ করবো? টাকার অভাবে নিজেকেই তো বিক্রি করে দিলাম। ধ্যান ভাঙল জয়ার কথায়,
” আপু দুদিন পর আমার পরীক্ষা শুরু হবে। স্কুলের বেতন পরীক্ষার ফ্রি।”
” চিন্তা করিস না। ঠিক যোগার হয়ে যাবে। রাখছি! বাবার যত্ন নিস।”
ওপাশের উত্তরের অপেক্ষা না করে রেখে দিলাম ফোন। ফোন নাম্বার টা কেটে স্টেয়ারিং এর উপর রাখলাম। রৌধিক ফোনের দিকে চেয়ে বলল,”ফোন নাম্বারটাও ডিলেট করে দিলে।”
কিছু না বলে সিটে গাঁ হেলিয়ে দিলাম। চোখজোড়া বন্ধ করে রইলাম। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত ঠেকছে। কিয়ৎক্ষণ অতিবাহিত হলো। রৌধিকের কন্ঠ শোনা গেল।
“জোনাকি, আমরা এসে পড়েছি।”
ফট করে উঠে বসলাম। আমি আলতো চোখে চাইলাম। বললাম,
“ক-কি?”
“কুল। আস্তে। উত্তেজিত হওয়ার মতো কিছু হয়নি। আমরা বাড়িতে এসে গেছি।”
ওহ্ বলে সিট বেল্ট খুলে ফেললাম। দরজা খুলে পা রাখার আগেই রৌধিক এসে হাজির। আমাকে পুনরায় পাঁজাকোলা করে বের করলো। পা দিয়ে ঠেলে দরজা বন্ধ করে দিল। হাঁটতে শুরু করলো। আমাই তার গলা পেঁচিয়ে ধরে বললাম,
“আমাকে নামান। আমি পারব।”
“আই নো, ইউ ক্যান। ইউ হ্যাভ দ্যাট পাওয়ার। বাট আই ডোন্ট হ্যাভ দ্যাট পাওয়ার টু ট্রাস্ট ইউ। দ্যান আই হ্যাভ নার্সিং টু ডু।”
ধীরে ধীরে আমাকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন হাওয়ার বেগে। রাত বেশি হওয়াতে কেউ জেগে নেই। ঘুমিয়ে পড়েছে। সিঁড়ি পেরিয়ে আঠাশ কদম ফেলে নিজের ঘরে ঢুকলেন। মনে হলো এই বাড়ির সবকিছু তাঁর চেনা জানা। বেডের উপর বসিয়ে দিলেন। একদম বেডের মাঝ বরাবর। আমি মনে করেছিলাম, নিচে ফেলবে। কিংবা ভুলবশত নিচে রেখে দিবে। কিন্তু তেমন কিছু হলো না। অর্থাৎ তিনি যেমন মেপে মেপে কথা বলে, তেমন মেপে মেপে কাজ করেন।
আলো জ্বেলে দিলো। আলোক হীনতায় গিজগিজ করা ঘরটা আলোয় ভরে উঠলো। তীর্যক আলো চোখে পড়তেই চোখ কুঁচকে এলো। সময় নিয়ে চোখ মেলতেই রৌধিককে অনুপস্থিত দেখতে পেলাম। ভেবে নিলাম, রৌধিক তার কক্ষে আছে। আমাকে আমার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে রেখে গেছে। এবারও আমাকে ভুল প্রমাণিত করল। ওয়াশরুম থেকে পানির আওয়ামী শ্রবণ হলো। সে দিকে তাকালাম। ভেতরে আলো জ্বলছে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আশে পাশে অবলোকন করে বুঝতে পারলাম এটা রৌধিকের ঘর। ততক্ষণে রৌধিক বেরিয়ে এসেছে। কাবার্ড হাতরে টাওয়াল নিয়ে মুখ, হাত পা মুছে সোফার হাতলে মেলে দিলেন। তার কান্ড দেখে বললাম,
“ক, কি করছেন আপনি? রং উঠে যাবে তো?”
রৌধিক তদানীং বেডের মাঝ বরাবর শুয়ে পড়েছে। আমার দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“তো! আমার ঘরে প্রতিটি জিনিস এক মাস অন্তর অন্তর চেঞ্জ করা হয়। পুরোনো কিংবা ফেটে যাওয়া জিনিস আমার পছন্দ নয়। আই ডোন্ট লাইক ইট।”
“আমিও তো কিছুদিন পর পুরোনো হয়ে যাবো। অলরেডি ফেটে গেছি। আ’ম মিন কপাল কেটে গেছে। এবার কী আমাকেও চেঞ্জ করবেন?”
“স্যরি আমি তো ভুলেই গেছি!”
শব্দ করে উঠে বসলেন রৌধিক। কপালের দিকে চেয়ে মেডিসিন বক্স বের করলেন। তুলোয় স্যাভলন লাগিয়ে কপালে ঘসে দিতে দিতে বললেন,
” সবকিছু কি এক জোনাকি?”
“হ্যাঁ। একই তো? আমি পুরোনো হয়ে গেছি, তাই সেদিন পাবলিক প্লেসে..। আমি পুরোনো হয়ে গেছি, তাই আমার খোঁজ নেন নি দুদিন।”
“জোনাকি, তুমি কি আমার অভিমান বুঝতে পারো না? তুমি আমার অনুমতি না নিয়ে ঘর থেকে চলে গেছো, আমার কি কষ্ট হয় না। এই দুদিনে একবারও কী আমার খবর নিয়েছো?”
চুপ করে রইলাম আমি। জবাব নেই আমার কাছে।রৌধিক নিজের কাজ করছে। একবারও জিজ্ঞাসা সূচক দৃষ্টি দিচ্ছে না। বড়ই অদ্ভুত সে।
“আমি জানি আমি দেখতে সুন্দর। মেয়েরা আমার দিকে সবসময় চেয়ে থাকত। আমি তো তোমারই, তুমি কেন চেয়ে আছো?”
ধ্যান ভাঙল আমার। সরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। রৌধিক বাহু টেনে ধরলো। ইশারায় প্রখর চাওনি দিলো। থেমে গেলাম আমি। মলম লাগিয়ে দিয়ে সরে বসলেন। জানালা মেলে দিলেন। পর্দাগুলো দুই পাশে গুটিয়ে রাখলেন। হাওয়া প্রবেশ করলো। কাবার্ড থেকে চুড়িদার বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। ঝাঁপসা কন্ঠে বললেন,
“যাও চেঞ্জ করে নাও।”
তখনও ঘোরের ভেতরে রয়েছি আমি। আনমনে বলে ফেললাম,” ভালোবাসেন আমায়?”
রৌধিকের শান্ত চাওনি। কেমন অজানা অচেনা অনুভূতি তার মনে। কোনো প্রত্যুত্তর করলেন না। আমার কথা তার কর্ণপথে পৌঁছেছে কী না জানা নেই। না শোনার মতো করে বললেন,” যাও জামা কাপড় ছেড়ে নাও!”
“আমি কিছু বলছি আপনাকে? ভালোবাসেন আমায়?”
“যদি বলি না!” একরোখা জবাব দিলো রৌধিক।
ভাষাগুলো হারিয়ে গেছে অজানায়। এরুপ কথার জবার হিসেবে কী বলা উচিত, সত্যিই জানা নেই আমার। পায়ের শব্দ শোনা গেল। রৌধিক বড় বড় পা ফেলে প্রস্থান করলো। হতাশা ভরা দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রইলাম। যদি ভালোই না বাসে তাহলে এতো কেয়ারিং কিসের? বেডের উপর রাখা লাল রঙের চুড়িদার টা নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করলাম।
.
নিজেকে সংযত করে মিনিট বিশেক পর বেরিয়ে এলাম। রৌধিক খাবার খাচ্ছে। ভেজা পা জোড়া ফেলতেই পানির ছোপ ছোপ শব্দ হচ্ছে। সাথে যোগ হলো নুপুরের শব্দ। মাত্র দু থেকে তিন টা ঝুনঝুনি রয়েছে। পানির ফলে একটু বেশি জোরে বাজছে। পা ভেজানোর পরেই এই শব্দ হয়। আমি সোফার উপর মেলে রাখা টাওয়াল টা চুলে পেঁচিয়ে নিলাম। চুলের তুলনায় অনেক বড়। আমার মতো একজন মানুষকে নিমেষেই কাবু করতে সক্ষম। মিনমিনে স্বরে বললাম,
“আমার এখন ঘরে যাওয়া উচিত।”
“তুমি কি এখন বাইরে আছো!”
“আমি আমার ঘরে যাওয়ার কথা বলছি।”
“এই বাড়িতে, তোমার নিজস্ব ঘর বলতে কোনো ঘরে নেই। আমার ঘরই তোমার ঘর। বুঝতে পেরেছ তুমি?”
“কিন্তু আমার মতে আমার নিজস্ব কোনো ঘর নেই। দু’দিনের জন্য ঐ ঘরটা আমাকে দেওয়া হয়েছে। মাত্র তো ছয়মাস। তারপরে তো চলে যাবো।”
রৌধিক সন্দিহান চোখে চাইলো। আমার হাত ধরে বেডের উপর বসিয়ে দিলো। নিজের প্লেট থেকে এক লোকমা খাবার তুলে আমার মুখে পুড়ে দিল। খাবারটা চিবিয়ে কথা বলতে নিলে আরো এক লোকমা খাবার পুড়ে দিল। গ্লাসের পানি টুকু হাতে না দিয়ে নিজেই খাইয়ে দিল। হাত ধুয়ে নিলো। এঁটো প্লেটটা টেবিলের উপর উপর রাখল। ঝাঁ’টা দিয়ে ঝেড়ে দিল বিছানা। ভেজা ফ্লোরের পানির ধারা মুছতে মুছতে বললেন,
“ভালোবাসি না বলেছি বলে আকাশে মেঘ জমেছে, তাই তো?”
আমি নিজেই জানি না, কেন আমার মন খারাপ। মৃদু স্বরে বললাম,
“না! হয়তো বা তাই। আপনি আমাকে ভালো না বাসলে এতো কেয়ারিং কেন দেখান। শুভের সাথে দেখার পর, আমার গায়ে হাত তুলছেন। আমি মেনে নিয়েছি। সেদিন রাতে আমাকে বউ বলে সম্বোধন করেছেন, সেটাও মেনে নিয়েছি। এখন বলছেন ভালোবাসি না। আবার বলছেন, আমার উপর অভিমান করেছেন। মানুষ তো তার উপরই অভিমান করে, যাকে সে ভালোবাসে। আমি গিরগিটি দেখেছি, কিন্তু আপনার মতো গিরগিটি দেখি নি।”
রৌধিক সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। জানালার পর্দার সরিয়ে বাইরে অদূরে। শক্ত গলায় বললেন,
“তুমি আমার ওয়াইফ। এই কেয়ার টুকু করা আমার দায়িত্ব। তোমাকে আমি ছাড়া অন্য কেউ স্পর্শ করবে, এটা আমি মানতে পারি না। অহেতুক তোমার উপর অভিমান করে বসে ছিলাম।”
নিজেকে কেমন ছোট মনে হলো। শুধু ওয়াইফ বলেই তিনি আমার যত্ন করছেন। আমি যেটাকে ভালোবাসা মনে করেছিলাম, সেটা শুধু দায়িত্ব। মৃদু স্বরে আওড়ালাম,
” আমি শুধুই আপনার ওয়াইফ।”
“জোনাকি তোমার সাথে আমার পরিচয় মাত্র কয়েক দিনের। এই কয়েকদিনে কাউকে ভালোবাসা কী আদোও সম্ভব? তাহলে? আমি কর্তব্য থেকে সবকিছু করছি, জোনাকি।
শেফা আমার ভালোবাসা হলেও ওর প্রতি আমার কোনোদিন তেমন ফিলিং ছিলো না। শেফার থুতনিতে জায়গায় তিল ছিল কাকতালীয় ভাবে তোমারও সেম জায়গায় তিল রয়েছে..
আমার হাত গিয়ে ঠেকলো থুতনিতে। আমি বসে আছি। রৌধিক বলেই চলেছে। তার কন্ঠস্বর আমার কানে যাচ্ছে না। আমি বালিশ টেনে শুয়ে পড়লাম এক কোণে। সত্যি তো একটা ছেলে ডিপ্রেশনে ছিল, সে কিভাবে আরেকজনকে ভালোবাসতে পারে। তাহলে যে তার ভালোবাসা টাই মিথ্যা। রাজ্যের ঘুম এসে তলিয়ে দিলো নিদ্রার অতলে।
ভোরের দিকে তাপমাত্রা হ্রাস পেয়েছে। শিশিরের বিন্দু বিন্দু জলকণা ঘাসের উপর পড়ছে। আবার জমাট বেঁধে তুষার ন্যায় শূন্যতায় ভেসে বেড়াচ্ছে। আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে চারদিকে। নিজেকে দৃঢ় বাঁধনে আবিষ্কার করলাম। নিভু নিভু চোখ মেলে তাকাতেই নজরে এলো ফর্সা পুরুষালী লোমহীন বুক। তীব্র পারফিউমের গন্ধ। মাথা তুলতেই কপালে আঘাত পেলাম। ধরে উঠলো মাথা। মাথায় হাত দিয়ে ধীরে ধীরে সরে আসার চেষ্টা করলাম। রৌধিক আমাকে নিজের সাথে পেঁচিয়ে ঘুমিয়ে আছে। মুখে তৈলাক্ত আভা ফুটে উঠেছে। ঘুমের মাঝেও ভ্রু নড়ছে। এই বাড়িতে এসে আর কিছু পারি আর না পারি ভ্রু নাচাতে পারি। বামটা। ডানটাও শিখতে হবে। রৌধিক নড়েচড়ে আরো দৃঢ় করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলেন আমায়। অতিবাহিত হলো আরো কিয়ৎক্ষণ। ভারী নিঃশ্বাস পড়ছে রৌধিকের। মুখের সামনে শূন্যতায় হাত দেখিয়ে সরে গেলাম। অজু করে জায়নামাজে এসে দাঁড়ালাম। নামাজ আদায় করে বেলকেনিতে গিয়ে একটু দাঁড়ালাম। অনেকদিন ভোরের উষ্ণ আকাশ দেখা হয় না।
বাবাকে আজকে রিলিজ করে দেওয়া হবে। দশটায় অফিসে যেতে হবে। আটটার দিকে বাড়ি থেকে বের হতে হবে। ছোট বেলার স্মৃতি হিসেবে, একটা লকেট ছিল। সেটা বিক্রি করে হসপিটালের বিশ পে করতে হবে। নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে পা বাড়ালাম। পায়ের সাথে কিছু বেঁধে পড়ে যেতে নিলাম। মাঝপথে থেমে গেলাম। নিজেকে সামলে নিচের দিকে তাকালাম। রৌধিকের টি শার্ট পড়ে আছে। এটা গতকাল রৌধিকের পড়নে ছিলো। একবার রৌধিকের দিকে অবলোকন করলাম। গুটি শুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। আমি আর কারো দয়া চাই না। মুক্ত হয়ে বাঁচতে চাই। পায়ের কাছে গুটিয়ে রাখা ব্লাঙ্কেট টা গলা পর্যন্ত টেনে দিলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে এলো।
________________
সময় নয়টা বিশ। হসপিটালের ঝামেলা মিটিয়ে মিনিট বিশেক হয়েছে বাড়িতে এসে পৌঁছেছি। নিজের প্রিয় লকেট টা পয়ত্রিশ হাজারে বিক্রি করেছি। বাবা হসপিটালে বিলের ত্রিশ হাজার চারশো নব্বই টাকা শেষ। এখনো কয়েকটা দিন বাকি।
দুই রুমের ঘর। একটাতে আমি আর জয়া থাকতাম। অপর টাতে বাবা একা।
এসেই সকালের নাস্তা তৈরি করেছি। জয়ার আবার পরীক্ষা দুদিন পর। বাবার শুয়ে আছে। নাস্তা নিয়ে টেবিলের উপর রাখলাম। বাবার পাশে বসে ধীরে ধীরে ডাক দিলাম,
“বাবা, ঘুমিয়ে গেছো। ওঠ। ওঠে নাস্তা খেয়ে ওষুধ খেয়ে নাও।”
বাবা এক চোখ মেললেন। বেশ গম্ভীর তার চাওনি। জয়া রেডি হয়ে এসেছে। স্কুলের টাই বাঁধতে বাঁধতে এসে বলল,
” আপু, আমার লেট হয়ে যাচ্ছে। এটা একটু বেঁধে দে তো?”
টাই বেঁধে গাল ধরে টান দিলাম। অতঃপর দু’জনে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলাম। হুট করেই জয়া আমাকে জ’ড়িয়ে ধরে বলল,
“তোকে খুব মিস্ করছিলাম রে আপু।”
জয়ার চোখে পানি। আলতো করে মুছে দিয়ে বললাম,
“আমিও মিস্ করছিলাম।”
জয়া সবে ক্লাস ফাইভে পড়ে। পড়াশোনায় বেশ মেধাবী।
বাবা উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বলল,
“আমি তোদের দুজনকে খুব বিপদে ফেলে দিয়েছি, তাই না?”
জয়া তেঁতে উঠলো। বিরাগী কন্ঠে বলল,
” লে, শুরু হয়ে গেছে।”
“এটা কোন ধরনের কথা জয়া।”
ধমকে বললাম আমি। বাবার পাশে বসলাম। নাস্তা খাইয়ে দিলাম। মেডিসিন খাইয়ে দিলাম। বাবার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে। হতাশা ভরা কন্ঠে বললেন,
“আমি বেঁচে থেকে তোদের খুব বিপদে ফেলেছি। বোঝা হয়ে আছি। আমি ম’রে যাওয়ার জন্য ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু খরচ আরো বেড়ে গেল।
তোদের দুইবোনের বিয়ে হয়ে গেলে আমি শান্তি পাবো। তোদের মায়ের কাছে চলে যাবো।”
এদিকে জয়া রাগে ফুঁসছে। বাবা মাঝে মাঝেই এভাবে কথা বলে, জয়া প্রতিবারই রেগে যায়। ফোঁস ফোঁস করতে করতে চলে গেল। বলছে,
“দেখেছিস আপু, একটু সুস্থ হয়ে শুরু হয়ে গেছে। হসপিটালে বসেও এগুলো বলছিলো। তাই যতক্ষন বাবা ঘুমিয়ে থাকতো ততক্ষণ সেখানে থাকতাম। ঘুম ভাঙলেই বাড়িতে।”
প্রবেশ ঘটল চতুর্থ ও পঞ্চম ব্যক্তির। শুভ আর তার মা এসেছে। শুভ এসেই বাবাকে সালাম জানিয়ে বসে বসে বাবার খবর নিচ্ছে। ভয়ে ক্রমাগত ঘামচি আমি। বাবাকে এখনো কিছু জানাইনি। আর কয়েকটা দিন পরে জানাতে চেয়েছি। হুট করে ধা’ক্কা সহ্য করতে পারবে না।
[চলবে..ইনশাআল্লাহ]