#অনুবদ্ধ প্রণয় 💛
#ইবনাত_আয়াত
~ পর্ব. ১০
চিলেকোঠায় অবস্থিত ছোট্ট চৌকি তে বসে আছি। সামনে চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছেন তাহমিদ। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি৷ আজ সে আমার থেকে পার পাবে না। আজ তাকে সব বলতেই হবে। সব বলতে হবে।
কিছু প্রহর পূর্বে…
চিলেকোঠার রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ালাম। এসব কী?
পুরো দেওয়াল জুড়ে এক অজানা মেয়ের ছবি টাঙানো। প্রায় ত্রিশ টারও বেশি ছবি সেখানে। ছোট থেকে বড় ফ্রেমে বন্দি সব ছবি। এসব কার?
তাহমিদের সঙ্গেও সেই মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছি। ছোট্ট আলমারি টা খুলতেই কিছু সুন্দর শাড়ি/কাপড় দেখতে পেলাম। থমকালাম আবারো। কেঁপে উঠল বুক টা। বসে পড়লাম ধপ করে। ততক্ষণে তাহমিদ হাজির হয়েছেন সেখানে এসে। আমাকে এভাবে চিলেকোঠার ঘরে বসে থাকতে তিনি শিওর হলেন আমি দেখে ফেলেছি। তিনি ধীরে ধীরে পা ফেলে এলেন আমার সামনে। তার দিকে এক আশাহত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। সে চারপাশ টা একবার অবলোকন করলেন। আমি বললাম, ‘আজ আপনি পার পাবেন না। সব বলতে হবে আমায়।’
‘ইয়ানাত! প্লীজ..’
‘ঠিক আছে। জানাবেন না তো? ফাইন! আজ আটকাতে পারবেন না আমাকে। কোন দরকার নেই শুধু শুধুই এই বাড়িতে পড়ে থাকার।’
উঠে বেরিয়ে আসতে নিলেই তিনি হাত টেনে ধরলেন, ‘ইয়ানাত! কোথায় যাচ্ছ?’
‘চলে যাচ্ছি।’
‘মানে? কেন?’
‘কী প্রয়োজন এখানে থাকার? কেন থাকব এখানে আমি? যেখানে আমার চাহিদার কোন মূল্যই নেই। এত বার আপনাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলাম, একবারো আপনি আমায় জানাতে চেষ্টা করেছেন?’
তিনি করুন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। আমি হাত ছাড়িয়ে যেতে নিলেই তিনি বলে উঠেন, ‘বলছি ইয়ানাত! আমি সব বলছি।’
___________
‘বলুন। সব বলুন তাহমিদ। কে এ? কার ছবি এসব? এসব জিনিস কার? আজ যদি আপনি না বলেন, তাহলে আমাকে আর আপনি দেখতে পাবেন না।’
তাহমিদ চুপ করে রইলেন। উত্তরের আশায় চেয়ে আছি। হতাশ হলাম আবারো৷ কিছু বলার পূর্বেই তিনি বলতে শুরু করলেন,
___ 🌿
সাল টা ২০২০। তাহমিদের বড় বোন তানসীবার বিয়ে হচ্ছিল৷
বিশাল বিয়ের আয়োজন। রুমের আনাচে-কানাচে, কোনায় কোনায় মেহমান গিজগিজ করছে। এদিক সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে বাচ্চা-কাচ্চা আর কিশোর-কিশোরী’দের দল।
তাহমিদের মা মেহমান সামলাতে ব্যস্ত। আর বিয়ে বাড়ি হতে হালকা দূরে আঁধারের মধ্যে রাস্তার পাশে বৈঠক খানায় বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতে আছে তাহমিদ। তন্মধ্যে এক যুবতির দেখা মেলে। তাকে উত্যক্ত করছে কিছু ছেলে। ব্যাপারটা তাহমিদের মোটেও ভালো লাগল না। দুই বন্ধুকে নিয়ে এগিয়ে গেল তাদের দিকে। বেধরক মা’রল তিন জনকে। তারপর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে। পরিচয় জানতে চাইলে যুবতি মেয়ে টি বলে তার নাম অবন্তীকা। তাদের মাঝে আলাপ শুরু হলে জানতে পারে অবন্তীকা তারই দুঃসম্পর্কের ফুঁপাতো বোন।
তাহমিদের দুই বন্ধু তাদের একা ছেঁ’ড়ে নিজেদের মাঝে কথা বলতে বলতে চলে যায়। শুরু হয় দুই যুবক যুবতির পরিচয়-কথন।
আস্তে আস্তে নিজেদের সম্পর্কে জানল, ভালো বন্ধুত্বে পরিণত হলো। অবন্তী তার চেয়ে চার বছরের জুনিয়র।
বিয়ের রাত টা তাদের দু’জনেরই একসাথে কাঁটে।
প্রায় এক সপ্তাহ পেরোয়৷ আসা যাওয়া চলতে থাকে তাদের মাঝে। বাসাও বেশি দূরে না হওয়ায় তাহমিদ কর্মক্ষেত্রে গেলে, আর অবন্তী ভার্সিটি তে গেলে দেখা হতো তাদের মাঝে৷ একসময় বিষয় টা ভালোবাসা অবদি গড়ায়। কিন্তু তাহমিদের ফ্যামিলি রাজি ছিল না। তাহমিদ রাগ দেখিয়ে নিজের ক্ষ’তি পর্যন্ত করেছিল। শুধুমাত্র অবন্তীকে পাওয়ার জন্য৷ শেষ পর্যন্ত ছেলের পাগলামী সহ্য করতে না পেরে তারা রাজি হয়। তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বেশ ভালোই দিন কাল যাচ্ছিল।
একটা সময়, সব শেষ হয়ে যায়। ভালো সময় গুলো খুব তাড়াতাড়িই কে’টে যায়। সেটাই হয়।
২০২১ এর লাস্টের দিকে, মর্মা’ন্তিক অ্যাক্সিডেন্ট ঘ’টে অবন্তীর। তার দেহ পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। তার চেহারা চিনারও উপায় ছিল না। নিঃস্ব হয়ে যায় তাহমিদ। খুব ভে’ঙে পড়ে সে। অবন্তীর মৃত্যু যেন মানতে মন চাচ্ছিল না।
চিলেকোঠায় অবন্তীর সব স্মৃতি ফ্রেম বন্দি করে রেখেছে৷ মন খারাপ হলে এখানে এসেই সময় কাঁটাতো। প্রায় সময়ই সে তার কবরের সামনে বসে থাকত৷ তার কসমেটিকস আর কাপড় গুলো জড়িয়ে ধরে কাঁদতো৷ চোখের পানি শুকিয়ে গেছে৷ আর কান্না পায় না তার। ভেতর টা একদম ভে’ঙে চুরমার হয়ে গেছে তার। উপর থেকে সে কঠোর দেখালেও ভেতরে সে এক ভা’ঙা ঘর!
থামলেন তাহমিদ। ইতোমধ্যে অসংখ্য অশ্রুকণা তার গাল বেয়ে গড়িয়ে মাটিতে পড়েছে৷ করুন দৃষ্টিতে চাইলাম তার দিকে। মায়া হলো লোকটার জন্য। বললাম, ‘কেন ওই ধূসর স্মৃতি নিয়ে পড়ে আছেন? এগিয়ে যান। অনেক লম্বা সময় পড়ে আছে আপনার।’
তিনি কিছু বললেন না। মাথা নিচু করে রইলেন। আমি আবারো বললাম, ‘নিঃস্ব মনে করছেন নিজেকে? দেখুন আপনার পাশে অনেকে আছে। আপনার বাবা আছে, মা আছে, বোন আছে, বন্ধুও আছে, সবাই আছে।’
তিনি মাথা তুলে তাকালেন, ‘তুমি নেই?’
থেমে গেলাম। ধীর কন্ঠে শুধালাম, ‘আমি হয়তো কিছুদিনের অতিথি এখানে।’
‘মানে?’
‘হয়তো আর কিছুদিন আছি এখানে। একদিন তো চলে যেতে হবে।’
‘মানে? কোথায় যাবে তুমি? বলো কোথায় যাবে? অবন্তীর মতো চলে যাবে?’
অবাক নজরে চেয়ে রইলাম। এই লোকের উদ্দেশ্য কিছুই বুঝতে পারছি না। কিছু না বলে উঠে নিচে চলে এলাম। কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। তার জীবনে কেউ ছিল, এটা মানতে ইচ্ছে করছে না। হ্যাঁ হয়তো ছিল। কিন্তু এখন কেন? ওকে নিয়েই কেন পড়ে আছেন? ভুলে আমাকে আপন করতে পারছেন না?
হাহা! তুই এত বোকা হলি কেন ইয়ানাত? তোকে তাহমিদ আপন করবে? ভুলে যা।
না নাহ্। ভুলে যাব কেন? ওনাকে ওই অবন্তীকার স্মৃতি থেকে সরিয়ে আনতে হবে। যে করেই হোক তাকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। এখন আমি তার স্ত্রী। আর সে আমাকে ফেলে আগের টা কে নিয়ে পড়ে থাকবে? এটা আমি হতে দেব না। কিছুতেই না।
__________
নিয়ম অনুযায়ী আমাকে তিন দিনের জন্য বাপের বাড়ি পাঠানো হলো।
ইফা আপু, দাদু আর আঙ্কেল খালামণিও এসেছে। সবাই আমাকে নিয়েই ব্যস্ত। কেমন কাটল, সবাই কেমন, বাড়ি কেমন, ঘর কেমন এসব নিয়ে প্রশ্ন করতে করতে শেষ করে দিচ্ছে আমাকে।
কোনমতে এসব থেকে রেহায় পেয়ে ইফা আপু আর ভাইয়ার কাছে গেলাম। দু’জনকে বসালাম এক নির্জন জায়গায়। তাদের সামনে বসে বললাম, ‘আজ আমি কাউকে ছাড়ছি না। তাহমিদকেও ছাড়িনি। তোমাদেরও ছাড়ব না। তাহমিদের থেকে সব রহস্য আমি জেনে ছেড়েছি। বলো কী লুকোচ্ছ আমার থেকে? আট বছর, ছয় বছর এসব কী? দাদু প্রায় সময় আট বছর আগের বিষয়ে একটা কথা বলতো। বলতো, ইশ! আট বছরের আগের প্লান টা যদি সফল হতো, আজ তুই সুখে থাকতি। আর এদিকে তাহমিদ বলে ছয় বছর আগে আমায় দেখেছে সে। হোয়াট ইজ ইট? কীভাবে দেখেছে আমায়? আট বছর আগের রহস্য? কী সেটা?’
ইফা আপু আর ভাইয়া অবাক নজরে চেয়ে রইল আমার দিকে। ভাইয়া বলল, ‘কী বলছিস এসব বোন? কী মানে..’
‘চুপ করো। যা বলছি তার উত্তর দাও নাহয় আমি.. আমি.. [অতঃপর আশেপাশে তাকিয়ে] নিজেই নিজেকে শেষ করে দিব। আর ভালো লাগছে না এসব।’
ব্লেড পেয়ে তা হাতের দিকে তাক করে বললাম। তারা দু’জন বেশ ভয় পেল। তারা জানে আমি কী পরিমাণ রাগী আর জেদি। ভাইয়া বলল, ‘বোন বোন বোন শান্ত হ, শান্ত হ! আমরা বলছি সব বলছি। প্লীজ তুই শান্ত হয়ে বস।’
‘আগে বলো। তারপর যা হওয়ার হবে। বলো!!!’
‘বলছি ইয়ানু বলছি তো। প্লীজ আগে তুই বস নাহয় বলব না কিন্তু।’
বসলাম। কিন্তু ব্লেড টা ফেললাম না। ভাইয়া বলল, ‘আসলে তাহমিদ শুধু আমার ফ্রেন্ডই নয়, তার বাবা, ইফার বাবা আর আমাদের বাবা বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলেন। আর আমরাও ছোটবেলা থেকেই ফ্রেন্ড ছিলাম। ইফা আমি আর তাহমিদ। যদিও ইফা বয়সে ছোট ছিল। আর তোর বয়স তখন চৌদ্দ কী পনেরো বছর ছিল। তাহমিদের মা তোকে পছন্দ করেছিল। আর তাহমিদ আর তোর দেখা একবারই হয়েছিল। তুই প্রায় সময়ই তো নানুর বাড়ি থাকতি তখন।
তিন বন্ধু মিলেই তোদের বিয়ে ঠিক করেছে। কিন্তু দু’বছরের মাথায় তাহমিদ তার খালার কাছে কানাডায় চলে যায়। সেখানেই সে তার পড়াশোনা কমপ্লিট করে। আর দেশে এসে তাদের সব প্লানে জল ফেলে সে একজনকে বিয়ে করে নেয়। আর সে… মা’রা যায়। আর.. তার পর জানিস।’
থমকালাম। আমার সাথে তাহমিদের বিয়ে ঠিক ছিল? তাও আট বছর আগে? এসব কী….
‘ইয়ানাত! আমি জানি না তুই কেমন ভাবে নিবি। তাহমিদ ট্রমাটাইজড। হয়তো তোর সাথে ভালো ব্যবহার করে না। কিন্তু.. ওকে তুই ফিরিয়ে আনতে পারিস যদি তুই চাস। ও খা’রাপ ছেলে নয় ইয়ানাত।’
মাথা নাড়লাম। ভাবনায় মত্ত তখনো আমি। আমার অন্যমনস্ক ভাব দেখে তারা কৌশলে ব্লেড টা কেড়ে নেয় আর বলে, ‘এভাবে নিজের ক্ষ’তি করে কিছু হবে না বোন। যুদ্ধে নেমে পড়।’
[চলবে.. ইন শা আল্লাহ্]