#অনুভববে_তুমি
#পর্ব_৭
#লেখনীতে_মুগ্ধ_ইসলাম_স্পর্শ
আজ আমার আর উপমার বিয়ে। কতো সুন্দর করে সাজানো হয়েছে বিয়ে বাড়ি। চারিদিকে কত সুন্দরী রমণী ঘুরছে কিন্তু কাউকেই দেখতে পারছি না। বউয়ের সোজা কথা, কোন মেয়ের দিকে তাকালে বাসর ঘরে খাটের তলায় থাকতে হবে। সেই ভয়ে আর কোন মেয়ের দিকে তাকাতে পারছিনা।
বিয়ে বাড়িতে উপমার পরিবারের সকলেই রয়েছে। শুধু নেই আমার কেউ। এ নিয়ে আত্মীয়রা কত কানাঘুঁষা করছে।
কারো কথাতেই কান দেয়নি। কারণ সমাজের লোকেদের কাজই হচ্ছে মানুষকে কিভাবে ছোট করা যায় সেই চিন্তা করা। আজ আমার পরিবারের কেউ নেই বলেই কথাগুলো শুনতে হচ্ছে। যদি এখানে আমার পরিবার থাকতো তাহলে হয়তো কথাগুলো শুনতে হতো না।
এর দোষ আমি কাকে দেব? নিজেকে নাকি নিজের কপাল’কে? সমাজের কথা চিন্তা করা তো সেদিনই ছেড়ে দিয়েছি সেদিন বুঝেছিলাম সমাজ কখনো আমার আপন নয়।
আপনি রাস্তায় পড়ে থাকুন দেখবেন কেউ ওঠাতে আসবে না আপনাকে। আর একটু উপরে উঠুন! দেখবেন নিচে নামানোর লোকের অভাব হবে না।
দু’দিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকুন দেখবেন কেউ দেখতে আসবে না। আর এলেও তাদেরকেই এক কাপ চা তৈরি করে দিয়ে বলতে হয়, ‘- চা টা খেয়ে যান৷
সমাজকে আপনি খুব কাছে পাবেন তখনই! যখন সুখ আপনার জীবনের প্রতিটি কোণায় ভাসবে।
তাই এখন শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবতে ভালোবাসি। অন্যকে নিয়ে ভাবতে গেলে নিজের প্রতি নিজের ভালোবাসা হারিয়ে যাবে।
অবশেষে উপমাকে বউ সাজিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। কিন্তু সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। এখনো পায়ের কাটা জায়গা শুকোয়নি। আসতে এখনো অনেকটা পথ বাকি। আমি তাকে ইশারায় ওখানেই দাঁড়াতে বলি। সেও তাই করে। আমি আর বিলম্ব না করে উপমার কাছে গেলাম। সবাই শুধু তাকিয়ে দেখছে। আচমকা উপমাকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করি। সবাই আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রয়েছে। কেউ কেউ বলছে, ‘- দেখলছিস ছেলেটার লজ্জা বলতে কিছু নেই। এতগুলো মুরুব্বিদের সামনে কিভাবে বেহায়ার মতো বউকে কোলে তুলে নিল।
সেদিকে কর্ণপাত করিনি৷ আমার কাছে আমার ভালোবাসার মানুষটার প্রাধান্য সবার আগে। আমি থাকতে আমার প্রিয় মানুষটি কষ্ট পাবে তা কি করে হয়? আমি যদি তার কষ্টটাকে মোচন করতে পারি তাহলে সে কেন কষ্টটাকে আলিঙ্গন করবে? কিছু কিছু সময় বড়দের কাছে বেয়াদব হতে হয়। নাহলে বুঝবেন না সে আপনার জন্য তার মনে কি চিন্তা পূষন করে রেখেছে। উপমাকে আমার পাশে বসিয়ে দিলাম।
লাল রঙের লেহেঙ্গা। মুখে হালকা মেক-আপের প্রলেপ। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক৷ সবমিলিয়ে আমার কাছে সে চান্দের পরী৷
আমার পাশে বসে একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিল উপমা৷ আমিও মুচকি হেসে তাকিয়ে রইলাম উপমার মুখপানে। কি মিষ্টি লাগছে আমার বউটাকে।
কিছুক্ষণ পর কাজী ও হুজুর এসে বিয়ে পড়িয়ে দিল। অবশেষে আলহামদুলিল্লাহ ও কবুল বলে ছোট্ট পৃথিবীটাকে আপন করেই নিলাম। যখন উপমাকে বলা হয়েছে ‘- বলো মা কবুল! তখন সে কি যে খুশি মনে কবুল বলেছে। সে দৃশ্যটি দেখলেই মনে শান্তির জোয়ার ভাসে। বুঝা গেছে আমার প্রতি তার ভালোবাসার টান কতটুকু।
বাসর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হাতে একটা বিরিয়ানির প্যাকেট। এই দিনে মেয়েরা খুব সম্ভবত খাবার ঠিকমতো খায় না। আপনার বিয়েটা যখন পারিবারিক ভাবে হবে। তখন মেয়েটা থাকে একেবারেই অচেনা। যদি শুরু থেকেই মেয়েটির মন পেতে চান তাহলে বাসর ঘরে এক প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে যান। বউকে সুন্দর করে খাইয়ে দিন। দেখবেন আল্লাহর তরফ থেকে তার মনে আপনার জন্য একটা সুন্দর ভাবনার সৃষ্টি হবে। সে বুঝতে পারবে, আমি ভরসা করার মতো একটা মানুষ পেয়েছি। যে মানুষটা শুরুতেই আমার কেয়ার করছে, অবশ্যই বাকি জীবনটাও তার সর্বোচ্চটা দিয়ে আগলে রাখবে। আপনার এই আচরণে মডার্ন মেয়েটাও নুয়ে যেতে পারে। আল্লাহর নাম নিয়ে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করি।
আমাকে দেখে উপমা মিষ্টি কণ্ঠে সালাম দিল,
‘- আসসালামু আলাইকুম।
মুচকি হেসে উত্তর দিলাম,
‘- ওয়ালাইকুমুস সালাম।
প্যাকেটা বিছানায় রেখে বউয়ের পাশে গিয়ে বসি। বউ ইয়া লম্বা ঘোমটা টেনে বসে আছে। ঘোমটা তুলে উপমার কপালে ও দুই চোখের পাতায় আদর দিলাম।
ওর চোখেমুখে হাসির ঝলকানি। ও হাসলে যেন হেঁসে দেয় পৃথিবী।
হাত ধুয়ে এসে প্যাকেট টা খুলে খাবার হাতে নিয়ে বললাম,
‘- সারাদিন তো বোধহয় কিছু খাওনি। না হাঁ করো।
‘- এসবের কি দরকার ছিল? আমার তো খিদে পায়নি৷
‘- তাহলে ফেলে দিয়ে আসি।
‘- আরে রাগছো কেন। আজ তোমাকে একেবারে নিজের করে পাবো এই খুশিতেই তো মন আর পেট দু’টোই ভরে গেছে হিহিহি। আর তুমি এতটা ভালোবেসে নিয়ে এসেছ আমি না খেয়ে পারি? এখন খাইয়ে দাও।
মেয়েটার উপর কোনভাবেই রাগ করা যায় না। হিহিহি করে যখন হেঁসে দেয় তখন মনে হয় চাঁদটা হাসছে। যার হাসি এতটা মায়াবী, যার মনটা বাচ্চাদের মতো কোমল। তার উপর কী আদৌও রাগ করে থাকা যায়? তার উপর তো একটা কঠিন মনের মানুষও নরম হতে বাধ্য।
উপমাকে খাইয়ে দিলাম। সে অনেক তৃপ্তি নিয়ে খেলো। বুঝতে বাকি ছিল না সে সারাদিন এতো মানুষের ভিড়ে কিছু খায়নি। সেও আমাকে খাইয়ে দিয়েছে।
‘- চলো না একটু ছাদে গিয়ে ঘুরে আসি।
আমি কোনো কথা না বলে উপমাকে কোলে তুলে নিয়ে ছাদে গেলাম। দোনলায় বসে উপমাকে কোলে বসিয়ে নিলাম। সে পরমানন্দে আমার বুকে মুখ গুঁজলো।
আমি উপমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
‘- দেখো আজকের চাঁদটা কতো সুন্দর করে তার কিরণ ছড়াচ্ছে।
উপমার কথায় চোখের দৃষ্টি আকাশের দিকে নিক্ষেপ করলাম। সত্যিই আজ চাঁদটা একটা গোল থালার আকৃতি ধারণ করেছে৷ যার কারণে আলো টা একটু বেশিই ঠিকরে পড়ছে।
‘- জানো চাঁদটা আজ এতো বেশি আলো দিচ্ছে কেন?
উপমা থুতনি টা আমার বুকে ঘষে বলে,
‘- কেন?
‘- কারণ তার জ্বালা হচ্ছে তাই। চাঁদটা আমায় অনেক ভালোবাসে। কিন্তু আমি তাকে প্রত্যাখান করে আরেকটা চাঁদকে বিয়ে করেছি। তাই সে কষ্ট সইতে না পেরে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।
‘- ইশ তুমিও না বাড়িয়ে বলো সবসময়।
হাহাহা লজ্জা পেয়েছে আমার বউ রাণী’টা
‘- বাড়িয়ে বলব কেন? চাঁদ আমার চারিদিকটা আলোকিত করলেও আমার জীবনটা তো আলোকিত করতে পারেনি। কিন্তু উপমা হাসান রুহি নামক মিষ্টি মেয়েটা আমার জীবনকে আলোকিত করেছে। তাহলে তুমিই বলো আমার কাছে কে বেশি দামি হবে?
‘- হিহিহি। এই চলো না একটু হেঁটে আসি এই নিশি রাতের পিচঢালা রাস্তায়।
‘- হাঁটতে গেলে পায়ে ব্যাথা হবে। তাই যখন সুস্থ হবে তখন তোমায় নিয়ে হাঁটবো।
‘- না না আমার ব্যাথা হবে না। তোমার কাঁধে হাত রেখে হাঁটবো। আর তুমি তো আমাকে ধরেই রাখবে। আমি আজকেই হাঁটবো প্লিজ প্লিজ প্লিজ।
উপমার এই ইনোসেন্ট মুখটা দেখে একেবারেই ঘায়েল হয়ে গেলাম।
‘- আচ্ছা চলো।
খুশিতে উপমা আমার গালে আদর দিয়ে বসে। খুব ভালো লাগে প্রিয় মানুষের এই মিষ্টি আবদার ও পাগলামি গুলো।
মেয়েদের বলছি। বিয়ের পরে স্বামীর ভালোবাসা যদি বেশি পেতে চান তাহলে একটু ন্যাকা হবেন। হালকা ন্যাকা সুরে তার কাছে আবদার করবেন, পাগলামি করবেন। দেখবেন সেও আপনার আবদার গুলোকে আপন করে নেবে৷ তবে এতটাও বেশি ন্যাকামি করবেন না। যাতে সে বিরক্ত হয়ে কানের দুই ইঞ্চি নিচে বুলডোজার চালিয়ে দেয় 🥴🤒😀।
রাত বাজে দু’টো। ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলোয়া কচ্ছপের মতো হাঁটছি আমরা। উপমা আমার কাঁধে হাত রেখে হাঁটছে। আর আমি ওর পিঠ দিয়ে হাত দিয়ে ওর বাম হাত ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
প্রিয় মানুষটা যখন হাতে হাত রেখে হাঁটে। তখন সেই অনুভূতির প্রকাশ করা যায় না।
( তৈরি থেকো প্রিয়! কোনো এক নিশি রাতে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হাতে হাত রেখে হাঁটবো দু’জন! চান্দের পরী’টা।)
‘- আইসক্রিম খাবে?
‘- এত রাতে আইসক্রিম কোথায় পাবে?
‘- সামনেই একটা দোকান খোলা রয়েছে। তুমি এখানেই একটু দাঁড়াও আমি তাড়াতাড়ি নিয়ে আসছি।
উপমাকে মাঝরাস্তায় রেখে আইসক্রিম কিনতে গেলাম। এত রাতে কোনো গাড়ি আসবে না। তাই আর কোনো চিন্তা নেই। উপমাও আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে।
আইসক্রিম নিয়ে পিছনে ফিরে চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। একটা গাড়ি ফুল স্পিডে ধেয়ে আাসছে উপমার দিকে। উপমাও আপ্রাণ চেষ্টা করছে সরে যেতে। হঠাৎ বুকের ভিতরটা ধুক করে ওঠে। আইসক্রিম দু’টো ফেলে দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দৌড় দিলাম। উপমা আমার দিকে এগিয়ে আসছে আর আমি তার দিকে।
চলবে ইনশাআল্লাহ,,,,,,