অনুভবে তুমি পর্ব-০১

0
1703

#অনুভবে_তুমি
#পর্ব_১
#লেখনীতে_মুগ্ধ_ইসলাম_স্পর্শ

ভাইয়ের বাসর ঘরে নিজের প্রেমিকা শিখা’কে দেখে ভরকে গেলাম। এক মুহূর্তের জন্য নিজের চোখ’কে অবিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম। মনকে শান্তনা দিয়ে বললাম ‘- ধুর সে’তো আমায় অনেক ভালোবাসে। এমনটা করতেই পারে না।
হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখদুটো ডলে আবার ভালো করে তাকালাম।
কিন্তু চেহারার কোনো পরিবর্তন আসলো না।
বাড়ির সকলেই আমার দিকে ভয়ার্ত চাহনি নিক্ষেপ করেছে। রাগে আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে। হঠাৎ গলা ফাটিয়ে গগন ফাটানো চিৎকার বলে বললাম,
– এসব কি হচ্ছে এখানে?
আমার চিৎকার শুনে বিছানায় বসে থাকা আমার প্রেমিকা ভয়ে কেঁপে ওঠে। কেউ কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। আমি সোজা ভাইয়ার কাছে গিয়ে তার কলার পাকড়ে ধরলাম।
– এসব কি দেখছি আমি?
তৎক্ষনাৎ সবাই এসে ভাইয়াকে আমার থেকে সরিয়ে নেয়।
আমি আবারও চিৎকার করে বলতে শুরু করি,
– তোমরা জানতে না শিখা’কে আমি ভালোবাসি? ও আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল? তারপরও এই কাজটা তোমরা কিভাবে করতে পারলে?
‘- কারণ আমি তোমাকে ভালোবিসিনি।
পিছন থেকে শিখার বাক্যটি শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম।
আড়াই বছরের সম্পর্ক আমাদের। আর সে এতো সহজেই বলে দিল আমি তোমাকে ভালোবাসিনি৷
– তাহলে কী এতদিন সব তোমার অভিনয় ছিল?
– হ্যাঁ।
অবাক করার বিষয় হলো শিখার মুখে অনুশোচনার কোনো ছাপ নেই পর্যন্ত।
আমি দিকবিদিক হারিয়ে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে শিখার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেই। এতে সে বসা থেকে শুয়ে পরে। এটা দেখে ভাইয়া আমাকে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করে। সাথে লাথি তো আছেই। এখন ভাইয়াকে কেউ আটকাচ্ছে না। এরপর বাবা এসে থাপ্পড় মেরে বলল,
– তুই এতটা বিগড়ে যাবি তা কখনো ভাবিনি। নিজের ভাবির গায়ে হাত তুলিস। ছিঃ ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে তোর প্রতি। চোখের সামনে থেকে চলে যা।
ভাইয়ার ঘর ত্যাগ করার পূর্বে শিখাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
– যেখানে নিজের পরিবার আমার মন বুঝলো না, যেখানে হাজার টাকা দিয়ে কাপড় কিনে রঙের গ্যারান্টি পাই না, আর তোকে ফ্রী’তে পেয়েছিলাম। সেখানে রঙ বদলানো টা খুব কঠিন কিছু নয়। সময় একদিন ঠিকই এর বিচার করবে। পৃথিবীতে সবকিছু বেইমানি করলেও সময় কখনো বেইমানি করে না।
এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের ঘরে চলে আসলাম।
ঘরে এসে বিছানায় শরীর টা এলিয়ে দিয়ে সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে ঠোঁটে দিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে ভাবনার জগতে ডুব দিলাম।
‘- একটা মানুষ কিভাবে এতটা পরিবর্তন হতে পারে, সেটা ভাবলেই মনটা কেমন যেন ছন্নছাড়া হয়ে যায়। আড়াই বছরের সম্পর্ককে সে কয়েকদিনেই ভুলে গেলো। পুরনো দিনের কথাগুলো ভাবলেই ঠোঁটের কোণে হাসি চলে আসে৷ একটা সময় ছিল যখন শিখা আমার জন্য পাগল প্রায়। যে মানুষটা আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারত না আজ সেই মানুষটাই আমাকে বলছে কিনা সে আমাকে ভালোবাসে না। আজ খুব করে মনে পড়ছে তার মিষ্টি মিষ্টি আবদার গুলো। রাত দুটোর সময় আমি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকতাম তখন সে ফোন দিয়ে বলতো,
‘- মুগ্ধ! আমার খুব আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে! একটু এনে দাওনা।
তার সেই মিষ্টি সুরের আবদার গুলো আমি এড়িয়ে যেতে পারতাম না। সারাটা শহর ঘুরে হলেও তার জন্য আইসক্রিম কিংবা চকলেট নিয়ে যেতাম। সে যখন অসুস্থ থাকতো, গভীর রাতে গাছ বেয়ে উঠে তার ব্যালকনি দিয়ে তার ঘরে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম। যখন সে বলতো আমার মন খারাপ তখন ছুটে যেতাম তার কাছে রাতভর গল্প করতে।তাকে হারানোর ভয় যখন আমাকে এতটাই ভাবাতো, তখন সে আমাকে বলতো তুমি একদম চিন্তা করো না, আমি তোমাকে ছাড়া কোথায় যাব না। আমি সারাজীবন তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে চাই। আর আজ থেকে সেই মেয়েটাই কিনা আমার বড় ভাইয়ের বুকে ঘুমোবে৷ নিয়তির কি বিচিত্র খেলা।
চাকরির ইন্টারভিউ দিতে কিছুদিনের জন্য ঢাকা গিয়েছিলাম৷ সেখানে থাকতে হয়েছে কিছুদিন। এই কয়দিনে ঠিকমতো কথা হয়নি শিখার সঙ্গে। আর এতটুকু সময়েই সে নিজেকে এতটা পরিবর্তন করতে গেলো। মজে গেল আমার ভাইয়ের মোহে। আর মজবেই না বা কেন? কতবড় অফিসার সে। মাস শেষে লাখ টাকা উপার্জন করে। আর আমি তো একটা বেকার ছেলে। ঢাকা থাকা অবস্থায় শুনেছি ভাইয়ার বিক্রি। ভেবেছিলাম তারা হয়তো আমার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে তারপর বিয়ে হ। কিন্তু আমার পরিবারের কাছে আমি এতটাই অবহেলার পাত্র ছিলাম যে তারা আমার অনুপস্থিতিতে ভাইয়দর বিয়ে দেয়। তারা ভাবতো আমি থাকলে যদি কোনো সমস্যা বাঁধিয়ে ফেলতাম। ভাইয়া জানত না যে আমি শিখাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু মা বাবা তো জানতেন। হঠাৎ হাতে গরম কিছুর ছোঁয়া টের পেয়ে হাতের দিকে তাকালাম। সিগারেট টা পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে গেলাম। সেখানে আরও একটা সিগারেট ধরালাম। মনের সুখে সিগারেটে টান বসালাম। পৃথিবীতে সিগারেটই হচ্ছে একমাত্র খাবার যেটা মনের অতল গহ্বরে লুকিয়ে থাকা কষ্টকে টেনেহিঁচড়ে বের করে উড়িয়ে নিয়ে যায় নিজের সাথে। ঘুরে বেড়ায় পথহারা পথিকের মতো। এভাবে কয়েকটা সিগারেট শেষ করার পর বাড়ি থেকে বের হলাম বাড়ির পাশে থাকা ব্রীজের উদ্দেশ্য। হাঁটছি আর সিগারেটের ধোঁয়া উড়াচ্ছি। কিছুক্ষণ সেই কাঙ্খিত জায়গায় পৌঁছলাম। এই মুহূর্তে নিজের জীবনটাকে খেলনা মনে হচ্ছে। উদ্দেশ্য ব্রীজ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করব। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অনেক ভয় করছে এতদূর থেকে লাফ দিলে কি আদৌও বেঁচে থাকব? পরক্ষণেই ভাবলাম আরে আমিতো মরার জন্য লাফ দেবো, তাহলে মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করছি কেন? ইতিমধ্যে হাতে থাকা সিগারেট টাও শেষ হয়ে গেছে। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে দেখি সিগারেট শেষ। প্যাকেট’টাকে মুখের সামনে তুলে ধরে বললাম,
– শেষে তুইও আমাকে ছেড়ে যাচ্ছিস। আর যাবিই না বা কেন?যেখানে নিজের পরিবার পাশে রইলো না সেখানে তোকে কাছে পাওয়া বিলাসিতা মাত্র। এই পৃথিবীর সবাই স্বার্থপর রে। নিজের স্বার্থ হাসিল করে সবাই একা করে চলে যায়। দিনশেষে বেইমান গুলোই সুখে থাকে। আর কষ্টে মরে বোকা মানুষগুলো। আমরা যাকে নিজের থেকেও বেশি আপন ভাবি একদিন সেই মানুষটাই পর করে চলে যায়। কেন এমন হয় বলতে পারিস? যাহ তোকেও মুক্তি দিয়ে দিলাম। বলেই প্যাকেটটা পানিতে ফেলে দিলাম। মুহূর্তেই হারিয়ে গেল প্যাকেটটি। ভাবছি এভাবেই আমিও হারিয়ে যাব সবার আড়ালে। ব্রীজের রেলিঙের উপর দাঁড়িয়ে দিলাম লাফ,,,,,,
চলবে ইনশাআল্লাহ,,,,