অনুভবে তুমি পর্ব-০২

0
839

#অনুভবে_তুমি
#পর্ব_২
#লেখনীতে_মুগ্ধ_ইসলাম_স্পর্শ
রাত দুটোর সময় অচেনা একটা মেয়ের হাতে থাপ্পড় খেয়ে আত্মহত্যার চিন্তা আপাতত মঙ্গল গ্রহে চলে গেছে। গালে হাত দিয়ে চিন্তা করছি আমাকে থাপ্পড় মারার কারণ।
লাফ দিতেই যাচ্ছিলাম তখনই কে যেন পা জড়িয়ে ধরে। তাই আর লাফ দেওয়া হয়নি। মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখি কালো জিন্সের প্যান্ট, কালো হুডি, কালো একটা মাস্ক। হুডির টুপি মাথায় দেওয়া। সবকিছুই কালো। সামনে যে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটাই বোঝা যাচ্ছে না ঠিকমতো। আবার পাশে একটা কালো বাইকও রয়েছে।
মেয়েটি আমার মুখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলল,
‘- এইযে হ্যালো বোবা হয়ে গেলেন নাকি এভাবে চুপচাপ কি দেখছেন?
এতক্ষণে হুশ হলো আমার।
– তার আগে আমাকে বলেন! আপনি আমাকে মারলেন কেন?
‘- আত্মহত্যা করছিলেন তাই! জানেন না আত্মহত্যা মহাপাপ?
– জানি। তবে আপনার সাহস দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। এতো রাতে একা একটি মেয়ে হয়ে একটা ছেলেকে মারলেন। এখন যদি আমি আপনার কোনো ক্ষতি করি?
মেয়েটি বোধহয় হাসলো। হাসির কি বললাম?
– আপনি হাসছেন? হাসার মতো কিছু বলেছি কি?
‘- আপনি বোকার মতো কথা বলেন। মানুষ এতটাও অকৃতজ্ঞ নয় যে তার জীবন বাঁচিয়েছে তারই ক্ষতি করার চিন্তা করবে।
বাহ চমৎকার কথা বলেছে তো মেয়েটা৷
– আপনার বুদ্ধি আছে বলতে হয়।
‘- এতটুকু বুদ্ধি নিয়ে চলতে হয়। যাইহোক এখন বলুন বলদের মতো মরতে কেন যাচ্ছিলেন?
আরে মেয়েটা তো আজব। আমাকে বলদ বলল!
সোজাসাপটা উত্তর দিলাম,
– আমার প্রেমিকার বিয়ে হয়েছে, সে বেইমানি করেছে আমার সাথে।
আজিব ব্যপার। মেয়েটি খিলখিল করে হাসছে। আমার কষ্টের কথা শুনে সে হাসছে। মনে কি মায়া বলে কিছু নেই?
‘- ব্যস এটুকুই? এই সামান্য কারণে আপনি জীবন’টা শেষ করতে যাচ্ছিলেন?
মিষ্টি চাঁদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে বললাম,
– আরও কারণ আছে। সে আমার বড় ভাইকেই বিয়ে করেছে। আর পরিবারের সবার কাছে আমি অবহেলার পাত্র। মা বাবা জানতো আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে। তারপরও তারা বিয়েটা আটকায়নি। আমার অনুপস্থিতিতে বিয়ে দিয়ে দেয়।
এবার মেয়েটিও লম্বা একটা শ্বাস ছাড়লো। তার কণ্ঠও শীতল হয়ে এলো।
‘- চলুন সামনে হাঁটা যাক।
– হাঁটবেন? আচ্ছা চলুন।
আমরা হাঁটা ধরি। এখন পর্যন্ত কেউ কারো নামই জানলাম না। হঠাৎ সে বলে ওঠে,
‘- সত্যিই পরিবারের কাছে এমন ব্যবহার পাওয়া খুব কষ্টের। এর থেকে মৃত্যু যন্ত্রণাই শ্রেয়। কিন্তু মা বাবা কি করে হতে পারে সন্তানের উপর এতটা কঠোর? তারা কি সত্যিই আপনার,,,
– জ্বি ঠিকই ধরেছেন। তারা আমার আপন মা বাবা নয়। শুনেছি যখন ছোট ছিলাম তখনই দত্তক নিয়েছিল আমায়। আমি তো এটাও জানি না যে আমার আসল মা বাবা কি আদৌও বেঁচে আছে কি-না মরে গেছে। ছোটবেলায় সবাই খুব ভালোবাসতো। বিশেষ করে মায়ের ভালোবাসাটা পেতাম সবচেয়ে বেশি। আস্তেধীরে যখন বড় হতে শুরু করি, তখন আমার প্রতি মায়ের ভালোবাসা দেখে বড় ভাই হিংসায় জ্বলে যেত। আমি তাকে আপন ভাই ভাবতাম ঠিকই কিন্তু তার চোখে আমি নিতান্তই উটকো একটা ঝামেলা। তাই সে উঠতে বসতে বাড়ির সকলের চোখে আমাকে যে কোনো মূল্য অপরাধী সাজাতো। আমিও কখনো তাকে কিছু বলতাম না। তাদের নুন খেয়েছি। ছোট থেকে বড় করেছে। এই তো অনেক। এগুলো তো নিজের মা বাবাও করতে পারতো। তাই কখনো অকৃতজ্ঞ হয়ে ওঠা হয়নি। আস্তে আস্তে পরিবারের চোখে সবচেয়ে বাজে মানুষ হয়ে গেলাম। সন্তানের মতো ভালোবেসেছিল। ফেলে তো আর দিতে পারে না। তাই বাড়ির এক কোণে ফেলে রাখতো আমাকে। আমার প্রেমিকা ছিল বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে। আর ছেলেও মস্ত বড়ো অফিসার। মাস শেষে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করে। এদিকে আমি এক বেকার ব্যর্থ প্রেমিক। বিয়ে না দেওয়ার কোনো কারণ ছিল না। আমি আমার মা বাবাকে কখনোই ক্ষমা করব না।
ইতিমধ্যেই চোখের কোণে পানি এসে জমাট বেঁধেছে। চোখের পলক ফেলতেই টুপ করে মাটিতে পড়ে গেল দুফোঁটা পানি।
‘- কাঁদবেন না। সময় এবং পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে চলার নামই হচ্ছে জীবন। সেটা হোক সুখের কিংবা দুখের। সময় আর পরিস্থিতি তো বুঝে না আপনি বা আমি সুখে আছি নাকি কষ্টে দিন পাড় করছি। ভাগ্য নিজেকেই পরিবর্তন করে নিতে হয়। জীবনে যুদ্ধ না করলে জীবনটাকে কখনো উপলব্ধি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
– খুব সুন্দর করে কথা বলেন আপনি।
‘- দেখবেন আবার প্রেমে পড়বেন না যেন।
মেয়েটির কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
– মুখের উপর কেউ এভাবে বলে?
‘- জ্বি সবকিছু মুখের উপর বলার চেয়ে উত্তম আর কিছু নাই। মনের ভিতর এক মুখে আরেক। এমন মানুষের মতো ভয়ংকর পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।
মেয়েটির কথা যতই শুনছি ততই অবাক হচ্ছি। সবকিছু কতটা গভীরভাবে চিন্তা করে। এভাবেও চলা যায়?
‘- আত্মহত্যা করলেই কি সবকিছুর সমাধান হয়ে যায়?
মেয়েটির প্রশ্নের কী জবাব দেবো ভাবতে পারছি না।
‘- চুপ যে বড়ো?
– জানি না। তবে সবার থেকে নিজেকে আড়াল করে নিতে চেয়েছিলাম।
‘- হাহাহা আপনি বড্ড বোকা। যার জন্য মরতে গেছিলেন সে কিন্তু একবারো আপনার জন্য চোখের পানি ফেলতো না। সে তো তার জন্য একটা পারফেক্ট জীবনসঙ্গী খুঁজছিল। সেটা পাওয়া হয়ে গেছে। তাহলে সে কেনো ভাববে তার অতীত নিয়ে? বেইমানরা কখনো কাঁদে শুনেছেন?
– নাহ।
‘- তাহলে বোকার মতো কেন মরতে বসেছিলেন? শক্তি রেখে যারা চলে তারা কখনো হারে না। ব্যর্থতা একটা পরীক্ষা মাত্র। স্বীকার করুন। কি ঘাটতি রয়েছে দেখুন। পূরণ করুন। যতক্ষণ না সফল হোন, শান্তির ঘুম ত্যাগ করুন, লড়াই করুন। সফলতা হেঁটে হেঁটে আপনার কাছে আসবে৷ আমরা যখন ছোট ছিলাম। হাঁটার পথে হাজারবার হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছি। তখন কি আমরা পড়েই ছিলাম? না! উঠে দাঁড়িয়ে আবারও হাঁটতে শুরু করেছি। তাই তো আজ এখন নিজে হাঁটতে পারি। তখন যদি চেষ্টা না করে ব্যর্থ হয়ে পড়ে থাকতাম তাহলে আজ সমাজের কাঁধে বোঝা হয়ে থাকতাম। চলতি পথে হোঁচট খেয়েছেন। ঘাবড়াবেন না। উঠে দাঁড়ান, দরকার হলে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে আবার চলতে শুরু করুন। থেমে গেলে সফলতার দারে পৌঁছবেন কিভাবে?
বেইমানদের জন্য নিজেদের কষ্ট দেয় তো বোকারা। অন্যের জন্য নয়, নিজের জন্য বাঁচুন। বাঁচার জন্য লড়াই করুন। নিজেকে এমনভাবে তৈরি করুন, যাতে আপনাকে যারা অসফল দেখতে চায়, যারা আপনার কষ্টের কারণ, তারা যেন জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যায়।
জানি না মেয়েটা কে! তবে তার অনুপ্রেরণার বার্তা পেয়ে খুব করে বাঁচতে ইচ্ছে করছে। সাধ জাগছে পুনরায় পৃথিবীটাকে জানবার। হ্যাঁ আমি বাঁচবো। নিজের জন্য হলেও বাঁচবো। এভাবে যদি সবাই ভাবতো তাহলে বিচ্ছেদের পর হয়তো মৃত্যুর হার বাড়তো না।
‘- আপনার মনটা ভীষণ খারাপ। চলুন আপনাকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি। যদি মন ভালো হয়।
মেয়েটি বাইকে উঠে স্টার্ট দিল। আমিও সাতপাঁচ না ভেবে উঠে পরলাম। জানি না সে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তবে ভালো লাগছে ভীষণ। আমি ভাবছি। প্রচুর ভাবছি। কি ভাবছি সেটাও জানি না। তবে ভাবতেও ভালো লাগছে৷ অগোছালো চিন্তাগুলোকে গুছিয়ে নিলাম খানিকক্ষণের মধ্যেই।
হঠাৎ সে বাইক থামায়। ঝাঁকুনি খেয়ে ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলাম। সামনে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান।
দু’জনে নেমে দোকানের টংয়ে বসলাম।
‘- চাচা কড়া করে দুইকাপ চা দাও তো।
‘- তোমরা বইসা পড়ো আমি দিতাছি।
তাদের কথোপকথন শুনে বুঝার অবকাশ থাকে না তারা পূর্বপরিচিত।
দোকানদার চাচার চুল দাঁড়ি সব পেকে গেছে। সেও হয়তো দুনিয়ায় বুকে এক যাযাবর। ঘরে বউ নাই। থাকলে কি আর এতো রাতে দোকান খুলে বসতো?
চাচার চা খেয়ে মুড’টা ফ্রেশ হয়ে গেল।
– চাচা চা’টা কিন্তু অনেক সুন্দর হয়েছে।
ঘটা করে কথাটি বললাম চাচাকে।
‘- হ্যাঁ। তাই তো প্রতি রাতে এখানে এসে চা খেয়ে যাই। এখন চায়ের টাকা টা দিন।
মেয়েটির কথা শুনে আহাম্মক হয়ে গেলাম। নিজে নিয়ে এসে চা খাইয়ে টাকা দিতে বলে।
‘- এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই। ভাবছেন আমি নিয়ে এসে টাকা কেন দিতে বলছি! ভেবেও লাভ নাই। কারণ একটা ছেলের সামনে একটা মেয়ে বিল দেবে এটা ছেলেটার জন্য সম্মানহানির থেকে কম না।
বেশি কিছু না ভেবে চাচার দিকে একটা একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিলাম। সে হাসছে৷
‘- বাজান আমার কাছে ভাঙতি নাই।
– বাকিটা দিতে হবে না চাচা। রেখে দিন।
তারপর আবার হাঁটা ধরি।
– আচ্ছা আমি নাহয় প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যর্থ হয়ে মরতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনি এতো রাতে বাইরে কি করেন?
মেয়েটি মুহূর্তের মধ্যেই উত্তর দিল,
‘- ওইযে, নিজের জন্য বাঁচতে। সুখের খোঁজে ছুটে চলা এক গন্তব্যহীন পাখি আমি।
– মানে ঠিক বুঝলাম না।
‘- ছোটবেলায় মা’কে হারাই। তারপর বাবা আমার দেখাশোনার জন্য আরেকটা বিয়ে করে। কিন্তু সৎমায়ের চোখে আমি সৎ-ই রয়ে গেলাম। বাবার অগোচরে আমার উপর অত্যাচার করতো। বড় হওয়ার সাথে সাথে নিজেকে পরিবর্তন করে নিলাম। আপনার মতোই আমার জীবনটা। এখন আমিও আপনার মতো বাবার চোখে বাজে মেয়ে। তাদের কথা রাতবেরাতে ঘুরে বেড়াই। কোথায় না কোথায় নষ্টামি করি। তাই সারাদিন বাইরে ঘুরে বেড়াই। বাড়িতে গেলেই হাজারো প্যানপ্যানানি সহ্য করতে হয়। তাই শেষরাতে বাড়ি ফেরা হয়। আমার সঙ্গী ওই বাইকটাই।
যার মা নেই সেই বুঝে মা না থাকার কষ্ট। (আল্লাহ পৃথিবীর সকল মা’কে হাজার বছর বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন)
মেয়েটি আমাকে বাড়ির সামনে এসে নামিয়ে দিল। আজ সে আমাকে না বাঁচালে পৃথিবীর স্বাদটা হয়তো পেতামই না। আল্লাহ সঠিক সময় সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষকেই প্রেরণ করে। এটাই তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে আমার মনে।
– আপনার সাথে দেখা হয়ে অনেক ভালো লাগলো।
মেয়েটি মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল,
‘- ভালো থাকবেন। আর নিজের খেয়াল রাখবেন। আজ আসি।
এই বলে স্টার্ট দিল।
আমি পিছু ডাক দিলাম।
– আমি মুগ্ধ। আপনি?
সে একটু জোরেই বলল,
‘- উপমা হাসান রুহি।
বলেই টান দিয়ে চলে গেল।
বাহ চমৎকার নাম৷ উপমা হাসান রুহি ! কি মিষ্টি লাগে শুনতে। যেমন মিষ্টি মনের মানুষ, তেমনি মিষ্টি তার নাম।
চলবে ইনশাআল্লাহ,,,,,
কেমন হয়েছে সবাই জানাবেন। দয়া করে কেউ সাইলেন্ট থাকবেন না। কিছুটা সময় নিয়ে যেহেতু গল্পটা পড়তে পেরেছেন তাই আর একটা মিনিট সময় নিয়ে নাহয় একটা সুন্দর মন্তব্য করুন। এতে আমি অনুপ্রেরণা পাবো।
ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
নামাজ কায়েম করুন।
ধন্যবাদ সবাইকে।