#অনুভবে_তুমি
#পর্ব_৪
#লেখনীতে_মুগ্ধ_ইসলাম_স্পর্শ
আজ তিন বছর পর আবার নিজ শহরে পা রাখছি। পরনে পুলিশের উর্দি। পদবীটা পেয়েছি ওসি সাহেবের।
নিজের শহরে পা রাখতেই পুরনো দিনের কথাগুলো লাফিয়ে উঠলো মাথায়। শিখাকে দেখার অদম্য ইচ্ছা জাগলো মনে। কিন্তু যেটা হারিয়ে যাবার সেটা তো হারিয়ে গেছেই। তাই নিজের ইচ্ছেটাকে মাটিচাপা দিয়ে থানায় চলে গেলাম। সবাই খুব সুন্দর করে সম্মান জানালো।
আমাকে আমার আসন দেখিয়ে দেওয়া হলো। আমি আরামসে সেখানে বসলাম।
কিছুক্ষণ পর একটা মেয়ের কণ্ঠ শুনে মাথা তুলে তাকালাম। মেয়েটি আমাকে দেখে অবাক হয়েছে মনে হল। নেমপ্লেটে লেখা উপমা। নামটা দেখে আমিও ভরকে গেলাম। এটা কি সেই উপমা, যেই উপমাকে আমি অনেকদিন যাবত খুঁজছি? পরক্ষণেই ভাবলাম,
‘- আরে ধুর এটা তো কখনোই হতে পারে না কারণ যে উপমা আমাকে বাঁচিয়েছে সে একটু মোটা ছিল কিন্তু এই মেয়েটা তো একেবারেই চিকন।
‘- স্যার আমি উপমা। এই থানার এস আই। আপনার সাথেই আমার ডিউটি দেওয়া হয়েছে।
যাক শুনে ভালো লাগলো একটা সুন্দরী মেয়ের সাথে ডিউটি করতে পারবো।
কেটে গেল এক মাস।
এই একমাত্রে কতশত বার যে তাকে খুঁজেছি।
হ্যাঁ মনে পড়েছে। সে বলেছিল সে প্রতিদিন রাতে ওই চা ওয়ালা চাচার দোকানে গিয়ে চা খায়। একবার সেখানে গিয়ে খোঁজ করলে মন্দ হয় না।
গেলাম রাত দুটোর সময়। কিন্তু হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। দোকান খোলা ছিল ঠিকই কিন্তু উপমা নেই। আশেপাশে তাকিয়েও লাভের লাভ কিছু হলো না।
চাচার কাছে এককাপ চা চাইলাম৷ চাচা সাধারণভাবেই তাকায় আমার দিকে। হয়তো চিনতে পারেনি৷ একদিনের দেখায় কি আর এতদিন মনে থাকে। তার তো বয়স হয়েছে।
চা খেতে খেতে চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম,
‘- চাচা ওই মেয়েটা কি এখন আর এখানে আসে না?
চাচা হয়তো আমার কথা বুঝতে পারেনি।
‘- কার কথা কও বাজান?
‘- আরে, যেই মেয়েটা প্রতিদিন রাত দুটোর সময় এখানে এসে চা খেতো। সাথে কালো বাইক নিয়ে আসে।
কথাটা শুনে চাচার মনটা খারাপ হলো মনে হচ্ছে।
‘- কী হলো চাচা আপনি মন খারাপ করলেন কেন?
‘- বাজান, মাউয়াডা আহে না অনেক দিন। খুব দেখবার মনে চায়। বাপের মতো ভালোবাসতো আমারে৷
বলেই চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
চাচার কাঁধে হাত রেখে বললাম,
‘- মন খারাপ করবেন না চাচা। সে একদিন আসবেই। মেয়ে কি কখনো তার বাবাকে ছেড়ে যেতে পারে? চিন্তা করবেন না। আর আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যেন তাকে খুঁজে পাই।
চাচার বিল দিয়ে চলে আসি৷
সকালে ঘুম থেকে উঠে পার্কে গিয়ে একটু শরীরচর্চা করলাম।
তারপর বাসায় দিকে রওনা হলাম। বাসার সামনে এসেই আমি অবাক। উপমা গেটের ভিতর।
‘- আরে মিস উপমা আপনি এখানে কি করছেন?
‘- স্যার কালকেই শিফট হয়েছি এখানে।
কেটে গেল আরও কয়েকদিন। একদিন রাতে উপমা এবং আমি একসাথে ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ মনে হলো সেই ব্রীজের কথা। ইচ্ছে হলো সেখানে যেতে। তাই সাতপাঁচ না ভেবে গেলাম সেখানে।
‘- একি স্যার এখানে নিয়ে এলেন যে?
‘- একজনকে খুঁজতে।
‘- খুঁজে পেলেন?
উপমার কথাগুলো বড়ো অদ্ভুত। কেন যেন মনে হয় জেনেও না জানার ভান করে।
‘- সে যে ছুটে বেড়ায় শুধু। ধরা দিতেই চায় না।
‘- আচ্ছা স্যার একটা প্রশ্ন করব?
‘- হ্যাঁ করুন৷
‘- আপনি কি বিবাহিত?
একটা মুচকি হেঁসে জবাব দিলাম,
‘- বিয়ের কথা কখনো চিন্তা করা হয়নি।
আমার কথা শুনে মেয়েটি মনে হয় খুশি হলো। সে আবারও প্রশ্ন করে,
‘- কাউকে ভালোবাসেন?
তার কথা শুনে মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল। মনে পড়ল পুরনো দিনের সেই স্মৃতি গুলো। একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললাম,
‘- একজনকে ভালোবাসতাম। কিন্তু সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে তার সুখের ঠিকানায়। যেখানে গেলে সে ভালো থাকবে৷
‘- এখন আর কাউকে ভালোবাসেন না?
‘- সেদিকে আর পা বাড়ানো হয়নি। তবে একজনকে খুব করে অনুভব করি। অদ্ভুত বিষয় হলো সেই মেয়েটির নামও উপমা।
‘- আপনার এক্স কে খুব ভালোবাসতেন?
‘- বাদ দিন না৷ সে সুখে আছে এই তো অনেক। আমার ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি তো কি হয়েছে? সে সুখী হলেই হলো। তাকে তো আমি আমার সাথে সুখী দেখতে চেয়েছিলাম, আর সে সুখেই আছে। শুধু মানুষটাই আলাদা। এতে ক্ষতির কী?
আমার কথা শুনে মেয়েটি একটা লম্বা শ্বাস ছাড়লো।
‘- আপনার আবার কী হলো?
উপমা হেঁসে দেয়।
‘- ভাবছি স্যার।
‘- কি ভাবছেন।
‘- আপনি মানুষটা বড়ো অদ্ভুত। সাধারণ মানুষ তার প্রেমিক বা প্রেমিকাকে হারালে বা ছেড়ে গেলে অনেক অভিশাপ দেয়। কিন্তু আপনি পুরোই উল্টো।
‘- হা হা হা। বাদ দিন।
‘- আরেকটা কথা বলি?
‘- এটা থানা নয় যে বারবার অনুমতি নিতে হবে।
‘- সেটা বললেই হয়। এতো ঝাঁজ দিয়ে কথা বলেন কেন?
আরেহ, উপমা আমার সাথে রেগে কথা বলছে। সাহস তো কম নয়।
‘- আপনার সাহস তো কম নয় আমার সাথে রেগে কথা বলেন। এতো বড়ো সাহস কে দিল আপনাকে?
উপমা তার মুখটা একদম আমার কাছে এনে বলে,
‘- এটা থানা নয় যে আপনাকে ভয় পেয়ে কথা বলব।
বাপ্রে, মেয়ে তো একেবারে আগুন। এস আই হয়ে ওসিকে ফাপর দেয়। আমার দাম থাকলো? 😵🤒
‘- যাইহোক বলে ফেলি৷ আপনি যাকে অনুভব করেন তাকে যদি খুঁজে পান তাহলে কি করবেন?
‘- একেবারে বিয়ে। যদি সে রাজি হয়।
উপমা মনে হয় আমার কথা শুনে খুশি হলো।
‘- এটা ভালো বলেছেন৷ প্রিয় মানুষকে হারিয়ে যেতে দিতে নেই। একবার হারিয়ে গেলে সারাজীবন আফসোস নিয়ে কাটাতে হয়৷
‘- নিয়তি বড়ো অদ্ভুত। কেউ কি আর ইচ্ছে করে তার প্রিয় মানুষটিকে হারায়? তারা নিজের রঙ বদলিয়ে নতুন রঙের ছোঁয়ায় ডুবে যায়। হারিয়ে যায় সেই রঙের অতল গহ্বরে।
জীবনটাই কেটে গেল কষ্টের সাগরে ভেসে৷ সব সয়ে গেছে।
‘- কষ্ট পাবেন না। জীবন এমন একটা মুহূর্ত আসবে, তখন শুধু সুখ আর সুখ। দেখবেন একদিন সুখের রাজ্যে ভাসছেন। কারণ দুখের পরেই আসে সুখ। দুঃখ তো একটা পরীক্ষা মাত্র।
‘- আপনার কথাগুলো খুব পরিচিত মনে হচ্ছে।
‘- হতেও পারে। আচ্ছা সেই মেয়েটা যদি দেখতে কুৎসিত হয় তবুও তাকে বিয়ে করবেন?
‘- হা হা হা। চেহারা দিয়ে আর কি করব? যদি মনটাই হয় বিষাক্ত। সে কুৎসিত হোক না সুন্দর এতে আমার আসে যায় না। তার মনটা অনেক সুন্দর। একটা মানুষ কতটা ভালো হলে একজনের প্রাণ বাঁচিয়ে তাকে বাঁচতে শেখায়৷ সে আর যাইহোক, আর পাঁচটা মেয়ের মতো বেইমান হবে না। যদি সে কুৎসিত হয় তাহলে আমার জন্য ভালোই হবে।
উপমা অবাক হলো শেষের কথাটি শুনে।
‘- কুৎসিত হলে ভালো হবে কেন?
‘- কেননা, আজকের দিনে পরকীয়া এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এগুলো সুন্দরী মেয়েরাই করে বেশি। আর বিশেষ করে, বউকে নিয়ে বাইরে বের হলে রাস্তার কিছু কুকুরের বাজে নজরে যেতে হয়। কুৎসিত হলে কেউ সেভাবে তাকাবে না।
‘- আপনার কথা শুনে ভালো লাগলো। আচ্ছা আপনি যদি তাকেও না পান তাহলে কি আবারও আত্মহত্যা করবেন?
উপমার কথা শুনে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলাম। আমি যে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম সে জানলো কিভাবে? আমি তো তাকে কখনো বলিনি৷
‘- আপনি এসব জানলেন কিভাবে?
‘- বলছি একটু অপেক্ষা করুন। আমি আসছি। আর যতক্ষণ না আসছি ততক্ষণ এখান থেকে এক পাও সরবেন না৷ নাহলে পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব।
এই বলে গাড়ি নিয়ে চলে গেল। বুঝলাম না হঠাৎ তার কী হলো। মেয়েটি আজ বড়ো অদ্ভুত আচরণ করছে।
দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর বাইকের শব্দ শুনলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি সেই পুরনো দিনের মেয়েটি। কালো হুডি পড়া, কালো মাস্ক, হুডির টুপি মাথায় দেওয়া, কালো বাইক। সে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো৷ আমি শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। স্বপ্ন দেখছি না তো?
চলবে ইনশাআল্লাহ,,,,,
কেমন হয়েছে সবাই জানাবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে।