অন্তরালে কুয়াশার ধোঁয়া পর্ব-১০

0
779

#অন্তরালে_কুয়াশার_ধোঁয়া
#পর্ব_10
Writer:: Shaanj Nahar Sanjida


কি গুড আঙ্কেল?বের করে দিলো তো?(ঝুম টিভি দেখতে দেখতে)

হুম।(অভ্র মনমরা হয়ে বসে)

আগেই বলেছিলাম উনাকে বিরক্ত করতে না।রান্না আম্মুর প্রাণ।সেখানে গিয়ে নাক গলালে আম্মু বাঘিনী হয়ে যায়।(ঝুম)

তুমি ভালো বাংলা কথা বলা শিখেছো?(অভ্র বাকা চোখে তাকিয়ে)

ইউটিউব থেকে শিখছি।(ঝুম দাত বের করে হেসে)

আমি রান্না ঘর থেকে চিল্লিয়ে বললাম
ঝুম,টিভি বন্ধ করে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।আর মিস্টার অভ্র আপনিও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন।

ওকে ম্যাম।
বলেই অভ্র আর ঝুম একটা হাসি দিয়ে যে যার যার কাজে চলে গেলো।


দুপুরে
সবাই টেবিলে বসে খাবার খেতে শুরু করলো।

আপনার কোনো তুলনাই হয় না।এতো ভালো রান্না করেন যে মনে হয় খেতেই থাকি।(অভ্র আঙ্গুল চেটে পুটে খেয়ে লাগলো)

ধন্যবাদ।প্লিজ এখন আমার প্লেট খাবেন না কিন্ত।(আমি)

হ্যা হ্যা ভেরি ফানি।(অভ্র মুখ বেকা করে)

আমার আম্মু বেস্ট শেফ।(ঝুম গর্ব করে)

আপনার অফিস নেই আজ?(আমি)

না ভাবছি কালকে থেকে জয়েন করবো।(অভ্র)

আমি উনার দিকে তাকিয়ে আছি।উনি খুব অল্প সময়ের জন্য আমার পরিবারের সাথে কি সুন্দর করে মিশে গেছে।কিন্তু আমি উনাকে তেমন ভালো করে চিনিও না।উনার সম্পর্কে কিছু জানি না এক মাত্র উনার নাম আর উনার বাসা ছাড়া।কোনো দিন জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন পড়েনি।আচ্ছা উনাকে কি একবার জিজ্ঞেস করবো উনি কে?উনি কিছু মনে করবেন না তো?করলে আর কি করার?আমি তো জানি না দেখেই জিজ্ঞেস করবো?(আমি উনার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কথা গুলো ভাবছি তখনই উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললো)

কোনো হ্যান্ডসাম সুপুরুষকে খেতে দেখেন নি কখনো? এতো হা করে কি দেখছেন?(অভ্র খেতে)

হ্যা?(আমি ভ্রু কুঁচকে)

কেনো তাকিয়ে আছেন?আমার কি লজ্জা করে না?(অভ্র নেকামি করে)

আমি মুখ ভেংচি দিয়ে খেতে শুরু করলাম।উনার সাথে অযথা তর্ক করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।

তখনই উনি আবার জিজ্ঞেস করলো,,,
কি চলছে মনে তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন?জানার ইচ্ছে গুলোকে ভিতরে লুকিয়ে রাখতে নেই।

আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখি
উনি কি করে জানলো আমার মনের কথা?উনি কি করে জানলো আমি উনার সম্পর্কে জানতে চাই?আশ্চর্য লোক।

কি হলো?বলুন।(অভ্র)

আমি আপনার ব্যাপারে জানতে চাই।আপনি কি করেন?আপনার পরিবারে কে কে আছে?এইসবই।আমি আপনার ব্যাপারে কিছুই জানি না।কিন্তু আপনি তো সব জানেন।(আমি খাবার নিয়ে নাড়া চাড়া করতে করতে)

ওহ।আচ্ছা। তা জিজ্ঞেস করলেই তো হয় হাম্বকের মত তাকিয়ে থাকার কি হলো?আমার মুখের মধ্যে কি লিখা আছে,যে আমি কোথায় কাজ করি?(অভ্র আমাকে রাগানোর চেষ্টা করছে)

বললে বলুন,না বললে নাই। এতো কথা শুনানোর তো কিছু দেখছি না।যতসব।(আমি রাগে খেতে খেতে)

আরে আমি কখন বললাম যে,আমি কিছু বলবো না।তাহলে শুনুন আমি একটা কোম্পানির CEO,, বয়স 30 বছর। গত বছর একটা ক্যার অ্যাকসিডেন্ট এ আমার বাবা মা দুজনই মারা যায়।পরিবার বলতে বাবা মা ছাড়া আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে।(অভ্র মুচকি হেসে)

ডোন্ট ওরি গুড আঙ্কেল।আমরা তোমার ফ্যামিলি।আজ থেকে আম্মু আর আমি তোমার পরিবার,ওকে?(ঝুম অভ্রর পিঠে হাত বুলিয়ে)

আমি ওদের দেখে মুচকি হাসছি।

ওকে চাম্প।তোমার আম্মুর খবর তো জানি না।কিন্তু তুমি আমার পরিবার হলে আমি অনেক খুশি হবো।
অভ্র আবারও আমাকে রাগানোর চেষ্টা করে।আসলে এই লোকটা কোনো সুযোগ হাত ছাড়া করে না আমাকে রাগানোর।খালি সুযোগ খুঁজে আমার সাথে ঝগড়া করার জন্য।যতসব।তবে যাই হোক।আজকে উনাকে ছাড় দিলাম।

ঝুম।খাবার শেষ হাত ধুয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।তোমার শরীর দূর্বল।(আমি)

ওকে।আম্মু কিন্তু তুমি ঘুমাবে না?(ঝুম হাত ধুতে ধুতে)

আমি এইগুলো সাবধান করে আসছি।(আমি প্লেট গুলো গুছিয়ে)

ওকে আম্মু।তুমি কিন্তু মেডিসিন নিতে ভুল করো।(ঝুম)

ওকে আমার বাবা।এখন যাও।
বলেই ঝুমের কপালে একটা চুমু দিলাম।

ঝুমও আমার গালে একটা চুমু দিয়ে দৌড় দিয়ে চলে গেলো বিছানায়।


এদিকে অভ্র আমাকে কিচেনের কাজে সাহায্য করছে।আমি রুমের ভিতরে ঔষুধ খাওয়ার জন্য গিয়ে দেখি ঝুম একদম ঘুমিয়ে পানি।বেঘোরে ঘুমাচ্ছে ও।আর একটা অভ্যাস ঘুমালে ওর দুনিয়ার হুশ থাকে না।হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাবে।আর জোড়ে জোড়ে শব্দ করলেও ওর ঘুম সহজে ভাঙ্গে না।প্রতিদিন সকালে ওকে উঠাতে আমার খুব বেগ পেতে হয়।


আমি ঔষুধ খেয়ে কিচেনে গিয়ে দেখি অভ্র সব প্লেট হারি পাতিল ধুয়ে কিচেন পরিষ্কার করে চকচক করে ফেলেছে।

বাহ!রান্না করার সময় তো কোনো কাজ আসলেন না।কিন্তু এখন দেখি পরিষ্কার করার জন্য আপনাকে নোবেল প্রাইজ দেয়া উচিত।(আমি ভ্রু উচুঁ করে)

অভ্র আমার কাছে এসে বললো
তাই নাকি?তাহলে কিন্তু আমার নোবেল নয় অন্য কিছু চাই বলেই উনি আমার কাছে এগুতে লাগলো,,

আমি হাত দিয়ে উনাকে সেখানেই আটকে বললাম,,
যথেষ্ট হয়েছে আর আসতে হবে না আপনার।দেখি সরুন।আমি দেখি জিনিস গুলো ঠিক জায়গায় রেখেছেন কি না?
বলেই উনাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আমি ভিতরে গেলাম।

ঝুমুর?(অভ্র)

হুম?(আমি জিনিস গুলো ঠিক জায়গায় রেখে)

ঝুমের বাবা কে?কোথায় আছে?(অভ্র আমার দিকে তাকিয়ে)

আমি অভ্রর দিকে তাকিয়ে দেখি উনি আমার দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে।আমি উনার চোখ থেকে চোখ ফিরিয়ে বললাম,,
ঝুমের বাবা মারা গেছে ঝুম জন্মের আগেই।

আপনি আমাকে মিথ্যা কথা বলছেন। যাই হোক যেহেতু আপনি আমাকে সত্যিই কথাটা বলতে চান না।আমিও আপনাকে জোর করবো না।কিন্তু একটা কথা আমি নিশ্চিত বলতে পারি যে আমি আপনার প্রতি দূর্বল।জানি না কেনো? কবে হয়েছে!তবে এইটাই সত্যিই।আর আমার ঝুমের সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে।আমি সব সময় আপনাদের পাশে থাকতে চাই।বাকিটা আপনার হাতে।
বলেই অভ্র সেখান থেকে চলে গেল।

আমি অবাক হয়ে উনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি।
তবে উনি গেলো তো গেলো,এইটা পরিষ্কার করে গেলো না যে উনি আমাকে কি প্রপোজ করলো নাকি?লোকটা আমার থেকে বেশি কনফিউসন তৈরি করে।


তিন মাস পর
আমার আর ঝুমের জীবন আবার শান্তি পূর্ণ ভাবে চলছে।মিতালী মৃত্যুর পর আঙ্কেল আন্টি দেশের বাহিরে চলে গেছে।যাদের হাত ধরে আমি দেশে এসেছি তারা আজ দেশ ছেড়ে চলে গেছে।ঝুম এখন খুব ভালো বাংলা বলতে পারে।ওর এখন অনেক বন্ধু হয়েছে।ওর স্বভাবের মধ্যে মিশুক ভাবটা চলে এসেছে খুব তাড়াতাড়ি এখন ও মানুষের সাথে মিশতে পারে।তবে এই ধন্যবাদ যায় অভ্রকে।কারণ অভ্র ওর মধ্যে মানুষদের সাথে মেশার আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে।
আর অভ্র,উনার কথা তো বাদই দিলাম।উনি এই তিন মাস যেনো আমার বাড়িতেই বাবুই পাখির মতো বাসা বেধেছে।খাওয়া থেকে শুরু করে সব আমার বাড়ি।নিজের বাড়িতে শুধু রাতে ঘুমাতে যায়।তাও অনেক কষ্ট করে,ধমক দিয়ে পাঠাতে হয়।উনি আর ঝুম যেনো টীম হয়ে গেছে।
এই তিন মাসে উনি অনেক ভাবে আমাকে প্রপোজ করেছে।কিন্তু আমি সব সময়ই রিজেক্ট করে দিয়েছি। ঝুমের সাহায্য নিয়েও উনি অনেকবার আমাকে প্রপোজ করেছেন কিন্তু আমি তখনই রিজেক্ট করে দিয়েছি। তবে উনার প্রতি কেমন যেনো ভালো লাগা শুরু করেছে।হয়তো কোথাও আমিও উনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তাইতো আজ ঠিক করেছি উনাকে সব বলবো। ঝুমের ব্যাপারে আর আমার ব্যাপারে তারপর দেখবো উনি কি সিদ্ধান্ত নেন।আজ সকালে ঝুমকে স্কুলে দিয়ে আমি রেস্টুরেন্ট এ গেলাম।তারপর সেখান থেকে সোজা উনার অফিসে গেলাম।


অভ্রর অফিসে
আচ্ছা মিস্টার অভ্র আহমেদের কেবিনটা কোথায়?(আমি রিসেপশনে দাড়িয়ে)

আপনি কি মিস ঝুমুর?(রিসেপশনিস্ট)

জ্বি!(আমি অবাক হয়ে)

ওয়াও।(রিসেপশনিস্ট অবাক হয়ে)

আপনি এতো অবাক হচ্ছেন কেনো?কারণটা কি জানতে পারি?(আমি কৌতূহল নিয়ে)

আসলে স্যার বলেছে যদি মিস ঝুমুর ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে স্যারের সাথে দেখা করতে আসে তাহলে যেনো না করে দেই।আসলে স্যারকে লাইন মারার জন্য অনেক মেয়ে লেগে থাকে তো।(রিসেপশনিস্ট)

আমি মুচকি হেসে মনে মনে বললাম,,
পাগল একটা।

ম্যাম।আপনি লিফটে উঠে সোফা 15 তলায় চলে যান।সেখানে কাউকে বললেই সে আপনাকে স্যারের কেবিন দেখিয়ে দেবে।(রিসেপশনিস্ট)

ঠিক আছে ধন্যবাদ।
বলেই আমি চলে গেলাম লিফটের দিকে।


15 তলায় উঠে একজনকে জিজ্ঞেস করতেই উনি আমাকে অভ্রর কেবিনটা দেখিয়ে দিলো।আমি গিয়ে অভ্র কেবিনের দরজায় টোকা দিলাম।

আসতে পারি?(আমি)

গলাটা চেনা চেনা লাগছে।(মনে মনে)
অভ্র ভ্রু কুঁচকে বললো
আসুন।

আমি হাসিমুখে রুমে ঢুকলাম।

আমাকে দেখেই অভ্র ভুত দেখার মত হা করে রইলো।উনি চেয়ারে বসে আছেন হাতে একটা ফাইল ছিলো।হয়তো ঐটাই আমি আসার আগে দেখছিলেন কিন্তু আমি আসার পর আমাকেই দেখতে শুরু করলো।

মিস্টার অভ্র?দেখা হয়ে গেছে?(আমি উনার সামনে তুরী বাজিয়ে)

হূহ?আপনি এখানে কি করছেন?(অভ্র অবাক হয়ে)

আপনার সব প্রশ্নের জবাব দিতে এসেছি।বসতে বলবেন না।(আমি মুচকি হাসি দিয়ে)

হুম।বসুন।(অভ্র)

আমি বসেই বলতে শুরু করলাম
দেখুন মিস্টার অভ্র।আমার জীবন অনেক অগোছালো।কেমন যেনো ছন্নছাড়া।

সমস্যা নেই।আমি গুছিয়ে দেবো।আপনিই তো বলেন আমি নাকি খুব ভালো গুছাতে পারি।আর আমি এলে আপনার জীবনে ছন্দ নিয়ে আসবো।তাহলে ছন্নছাড়া লাগবে না।(অভ্র মুচকি হেসে)

আমি তাচ্ছিল্য হেসে বলতে শুরু করলাম,,
তাহলে শুনুন আমার জীবনের অন্তরালে কুয়াশার ধোঁয়া কতটা গভীর।
পরেই আমি আমার ভেতরের সব কথা অভ্রকে বললাম।


উনি সব শুনে এখন চুপ করে আছে।আমি জানি না উনি কি সিদ্ধান্ত নেবেন!তবে যাই নিবেন তাই আমি মানবো।

অভ্র একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বললো
চলুন বিয়ে করে ফেলি। ঝুমকে একটা বাবার ভালোবাসাও দেয়া উচিত।তাই না?

আমি অভ্র কথা শুনে অবাক হবো না খুশি হবো তা জানি না।


চলবে,,,,