Home "ধারাবাহিক গল্প অপরিচিত প্রিয়জন অপরিচিত প্রিয়জন পর্ব-২০+২১

অপরিচিত প্রিয়জন পর্ব-২০+২১

0
অপরিচিত প্রিয়জন পর্ব-২০+২১

#অপরিচিত_প্রিয়জন
#পর্ব_২০
#এম_এ_নিশী

এসি রুমে বসেও দরদর করে ঘামছে ওয়াহাব। হাত পা ঠকঠক করে কেঁপে উঠছে। থেকে থেকে শরীরেও কাঁপন ধরছে তার। স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে সে। তার সামনে বসে আছেন খন্দকার ইদরীস আহমেদ। মুনমুনের বাবা। থমথমে মুখ নিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন তিনি ওয়াহাবের মাথা থেকে পা পর্যন্ত। ছেলেটা বেশ ঘাবড়ে আছে বোঝায় যাচ্ছে। ঘাবড়ানোর ই কথা। কারণ একটু আগে গড়গড় করে এক নিঃশ্বাসে সে তার ও মুনমুনের সম্পর্কের কথা ইদরীসের সামনে তুলে ধরে। কথাগুলো শোনার পর ইদরীস কোনো জবাব দেয়নি। ওয়াহাবকে দেখেই যাচ্ছেন। বেশ কিছু সময় চুপ থেকে সামনে থাকা পানির গ্লাসটা ওয়াহাবের দিকে এগিয়ে দেন ইদরীস। ওয়াহাব তা দেখে জোরপূর্বক মুখে ভদ্রতার হাসি ফুটিয়ে দ্রুত গ্লাসটি তুলে নেয়। ঢকঢক করে সবটা পানি গলাধঃকরণ করে ঠাস করে গ্লাসটা টেবিলে রাখে। গ্লাস রাখার আওয়াজটা একটু বেশিই জোরে হয়ে গেছে ভেবে বোকা বোকা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে তাকিয়ে থাকে সে ইদরীসের দিকে। ইদরীস বাঁকা হাসে। সামনে ঝুঁকে বসে সোজাসুজি ওয়াহাবের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

–তুমি যেন কি করো বললে?

–জি আমি বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আপাতত একটা এনজিওতে কাজ করছি।

–আচ্ছা আচ্ছা।

বলতে বলতে ইদরীস আবার পিছনে হেলান দিয়ে বসেন। বাঁকা চোখে ওয়াহাবকে আরো একবার আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে পুনরায় সামনে ঝুঁকে এসে বলেন,

–আমার কেবিনে চা আনা নেওয়া করা লোকটার অবস্থানও সম্ভবত তোমার চেয়ে বেটার হবে। কারণ তার বেতনও তোমার বেতনের তুলনায় একটু হলেও বেশি।

দপ করে নিভে গেলো ওয়াহাবের মুখে ফুটে থাকা সৌজন্যমূলক হাসি। তাতে দেখা দিলো একরাশ অন্ধকার। ইদরীস কি বোঝাতে চাইছেন তা বুঝতে ওয়াহাবের একটুও অসুবিধা হয়না। সে কোনো জবাব খুঁজে পায় না। চুপ করেই বসে থাকে তাই। ইদরীস কোনো জবাবের অপেক্ষাও করেনা। সে পুনরায় বলতে থাকে,

–তোমাদের ফ্যামিলি স্ট্যাটাস কোনোকালেই আমাদের ধারেপাশে ঘেঁষার যোগ্য ছিলো না। আমার বড় মেয়ে মারিয়ার বিয়েটা তোমার বড় ভাই এর সাথে দেওয়ার বিন্দু মাত্র কোনো ইচ্ছে আমার ছিলো না। তবে ভাইজানের ইচ্ছে, তার বাল্যকালের বন্ধুর ছেলের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ ছিলো এটি। যা তিনি হাতছাড়া করতে চাননি। তাই বাধ্য হয়ে আমাকেও মেনে নিতে হলো। তবে ভাবলে কি করে এই ভুল আমি দ্বিতীয় বারও করবো?

ওয়াহাব নিশ্চুপ। ইদরীসের এমন তীক্ষ্ণ কথার জবাবে সে কোনো শব্দ খুঁজে পায়না। মাথানিচু করে চুপ থাকাটাই আপাতত তার কাছে শ্রেয়।

ইদরীস শান্ত স্বরে শেষবাক্যটি উচ্চারণ করেন,

–ইফাদের সাথেই মুনমুনের বিয়েটা হচ্ছে। দরকার পড়লে আজই। তুমি এখন যেতে পারো।

ওয়াহাবের জবাব দেওয়ার মতো আর কিছুই রইলো না যেন। সে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো ইদরীসের কেবিন থেকে। সত্যিই তো মুনমুনদের পরিবারের তুলনায় ওরা কিছুই নয়। এক মেয়েকে বাধ্য হয়ে দিয়েছেন তাই বলে দ্বিতীয় জনকেও দিবেন তা তো হতে পারে না। কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে এলোমেলো পায়ে বাড়ির পথে ফিরছে ওয়াহাব। সে আজই গ্রামের বাড়ি চলে যাবে। এই শহর হয়তো আর তার জন্য নয়। তবে মুনমুন? মুনমুনের সেই ক্রন্দনরত মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই ধপ করে বসে পড়ে সে ফুটপাতের ওপরেই। ঝিম ধরে বসে থেকে হুট করেই ফুঁপিয়ে উঠে সে। তার ভালোবাসা বুঝি অসমাপ্তই রয়ে গেলো….

—–

খন্দকার ইউনুস আহমেদের মাথার কাছে শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে ইফাদ। ওমন একটা বিপদ থেকে রূপসীকে নিয়ে উদ্ধার হয়ে এলেও বাড়িতে এসে কাঁধে চেপে যায় আরেক বিপদের পূর্বাভাস। গতকাল রাতেই তার বাবা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ডক্টর বলেছেন হার্ট অ্যাটাক হতে হতে বেঁচে গেছেন। তবে সতর্ক করে গেছেন। সাবধানে রাখতে। আফিয়া ঘরে ঢুকেই ইফাদকে বসে থাকতে দেখে কাছে এগিয়ে এসে বলেন,

–একটু বাইরে আয়।

ইফাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে শুকনো মুখে কান্নার ছাপ তারপরও তাতে গাম্ভীর্যতা এঁটে রেখেছেন। কন্ঠে রুক্ষতা। কিন্তু কেন? কিছু বলার আগেই আফিয়া ইফাদকে আরো একবার বাইরে আসার তাগিদ দিয়েই হনহন করে বেরিয়ে গেলেন নিজে। ইফাদ একবার ঘুমন্ত বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দরজা হালকা ভেজিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখে শেষের দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন আফিয়া। ইফাদ শান্ত পায়ে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। অতঃপর নম্র কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

–কি হয়েছে মা?

আফিয়া ঝট করে ফিরে তাকান। ছেলের চোখে চোখ রেখে কঠোর গলায় বলেন,

–তুই আজই মুনমুনকে বিয়ে করবি।

মায়ের মুখে হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত এমন কথা শুনে দু পা পিছিয়ে যায় ইফাদ। বিস্ফোরিত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। বোঝার চেষ্টা করে মা কি তার সাথে মজা করছে?
আফিয়া ছেলের এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে অসহায় কন্ঠে বলেন,

–প্লিজ বাবা তুই না করিস না। দোহাই লাগে, তুই রাজি হয়ে যা। বিয়েটা করে নে। মুনমুন তো খারাপ নয় বাবা। ও তোকে খুব ভালো রাখবে। তুই না করিস না বাবা, না করিস না প্লিজ।

ইফাদ মায়ের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠে,

–এসব কি বলছো মা? তুমি এ ধরনের কথা ভাবলেই বা কি করে? এতোটা অসম্ভব এক আবদার তুমি কি করে করলে মা?

আফিয়া চোখের পানি ছেড়ে আগের মতোই অসহায় কন্ঠে বলতে থাকেন,

–আমি তোর ভালো ভেবেই বলছি বাবা। তুই ফিরিয়ে দিস না প্লিজ।

–অসম্ভব মা। এটা জাস্ট অসম্ভব।

–কেন অসম্ভব? কিসের এতো বাঁধা তোর?

–মা, আমি মুনমুনকে তো দূর আমি কাওকেই বিয়ে করতে পারবো না। ইনফ্যাক্ট আমি বিয়েই করতে পারবো না।

–কেন পারবি না তুই? কি এমন সমস্যা তোর? কেন এভাবে বিয়ে থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস? বল?

–ওহহহহ মাআআআ! কারণ আমি অলরেডি ম্যারিড। আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, আমি কিভাবে আরেকজনকে বিয়ে করতে পারি?

ইফাদের কথা শুনে আফিয়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তার ছেলে? ইফাদ? বিয়ে করেছে? অথচ সে মা তাও কিছু জানে না। বিস্ময়ে হতভম্ব হয়েই আফিয়া প্রশ্ন করেন,

–কার সাথে বিয়ে হয়েছে তোর? কখন? কিভাবে হলো?

ইফাদ নিজেকে শান্ত করে। তপ্ত শ্বাস ছেড়ে রেলিং এর ওপর দুহাত রেখে মাথা নীচু করে দাঁড়ায়। ধীর কন্ঠে রূপসীর সাথে দেখা হওয়া থেকে বিয়ে সবটা গুছিয়ে বলে নিজের মাকে। সব শুনে আফিয়ার বিস্ময় বেড়ে আরো কয়েকগুণ হলো। তিনি বেশ কিছুটা সময় থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। হুট করেই ছেলের মুখ থেকে শোনা আরেকটি ভয়ংকর বাক্য তাকে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে তোলে।

–আমি রূপসীকে ভালোবাসি মা। ভিষণ ভালোবাসি। ওকে ছাড়া একটা মুহুর্ত কল্পনা করা আমার পক্ষে সম্ভব না।

আফিয়া ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন এক ধ্যানে। আচমকা তিনি ইফাদের এক হাত টেনে তার মাথার ওপর চেপে ধরেন। দৃঢ় কঠোরতা নিয়ে বলে উঠেন,

–ইফাদ তোকে আমার কসম তুই আজই মুনমুনকে বিয়ে করবি। নইলে মায়ের লাশ দেখবি।

ইফাদ আর্তনাদ করে বলে উঠে,

–মাআআআ!

আফিয়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। দ্রুত বেগে প্রস্থান করেন। ইফাদ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে মায়ের চলে যাওয়া দেখে।

শাড়ি, গয়না দিয়ে ভরিয়ে রাখা বিছানার ওপর। মুনমুন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেসবের দিকে। তাকে কড়া ভাষায় জানিয়ে গেছে তার বাবা, আজই ইফাদের সাথে তার বিয়ে। আশা ছিলো ইফাদ রাজি হবে না। তবে একটু আগে আফিয়া এসে ইফাদের রাজি হওয়ার কথা জানিয়ে গিয়ে সেই আশাটুকু ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে গেলো। সন্ধ্যার পরই বিয়ে। ফোনটা হাতে নিয়ে পরিচিত সেই নম্বরটিতে আরো একবার রিং শোনার ব্যর্থ চেষ্টা চালালো মুনমুন। বরাবরের মতোই শুনতে পেলো, “আপনার কাঙ্ক্ষিত নম্বরটিতে এই মুহুর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না…” আর সহ্য করতে না পেরে ফোনটা ছুঁড়ে মারলো সে। মানুষটার শুধু ছোট্টো একটা ম্যাসেজ এসেছিলো, “বিয়েটা করে নাও।” ব্যস! তারপর থেকে ফোন বন্ধ। এতো এতো চেষ্টা করেও কোনো যোগাযোগ করতে পারলো না মুনমুন। তার মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। সে মাথা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ে। বিছানার ওপর আবার চোখ পড়তেই ছুটে এসে সব কিছু টেনে এনে ছুঁড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। হাঁটুতে মুখ গুজে বুকফাটা আর্তনাদ করে কেঁদে ওঠে। এভাবে সে সবকিছু হারিয়ে ফেলতে পারেনা। কিছুতেই না…..

—-

কলিং বেলের আওয়াজ শুনে রূপসী এসে দরজা খুলে দেখে সাদমান হোসেন দাঁড়িয়ে। রূপসী অবাক হলেও ভদ্রতার হাসি দিয়ে ভিতরে আসতে বলে। তবে সাদমান ভিতরে যায় না। সে রূপসীকে বলে,

–ম্যাম, ইফাদ স্যার আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছেন?

রূপসী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

–নিয়ে যেতে বলেছেন মানে? কোথায়? আর কেন?

–তা তো উনি বলেননি। শুধু বলেছেন ইট’স ভেরি আর্জেন্ট। প্লিজ আসুন ম্যাম।

–ওকে আপনি গাড়িতে ওয়েট করুন আমি আসছি।

পড়ন্ত বিকেলে দখিনা বাতাসে মনজুড়ানো এক পরিবেশ। ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে দীঘির টলমল করা নীল জলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা মানুষটির উদাসীনতা ঠিকই টের পাওয়া যায়। প্রায় আধাঘন্টা ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোনো বাক্য বিনিময় তো দূর একটা শব্দ ও উচ্চারিত হয়নি। রূপসী বুঝে উঠতে পারছে না তার ম্যাজিস্ট্রেট স্যারের হঠাৎ কি হলো? আর অপেক্ষা করা সম্ভব হলো না রূপসীর। সে আমতাআমতা করে বলে উঠে,

–কি হয়েছে? কোনো সমস্যা? এতো জরুরি তলব।

রূপসীর প্রশ্ন শুনে ইফাদ ফিরে তাকায়। ইফাদের শান্ত চাহনি রূপসীর ভিতরটা চিঁড়ে নিয়ে গেলো যেন। সে ঢোক গিলে ভীত কন্ঠে আবার প্রশ্ন করে,

–কোনো সমস্যা হয়েছে কি?

ইফাদ তখনও শান্ত ভঙ্গিতে শীতল দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে রূপসীর দিকে। সেকেন্ড কয়েক পর আচমকা ইফাদ রূপসীকে জড়িয়ে ধরে। শক্ত করে। যেন বেঁধে নিবে সে তার বাচ্চা বউকে নিজের বুকের ভেতর। কেউ যেন ছিনিয়ে নিতে না পারে। কেউ যেন আলাদা করতে না পারে তার কাছ থেকে তার ভালো থাকার মেডিসিনকে। ইফাদের আচরণের কোনোকিছুই বোধগম্য হয় না রূপসীর। সে শুধু আলতো করে ইফাদের পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। শান্তনা দেওয়ার ভঙ্গিতে। ইফাদের বুক ভেঙে কান্না আসতে চায়। তবে কোথাও একটা বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে ভিতরেই আঁটকে থাকে। বেরিয়ে আসতে পারে না আর। রূপসীকে ছেড়ে দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে ইফাদ বলে,

–আজ সন্ধ্যায় মুনমুনের সাথে আমার বিয়ে।

রূপসীর মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে। থমকে যায় সে। সদ্য সাজানো নতুন নতুন রঙিন স্বপ্ন গুলোর ওপর যেন কেউ বুলডোজার চালিয়ে দিয়ে গেলো। তার ম্যাজিস্ট্রেট স্যার তাকে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর, বিষাক্ত এক বাক্য শোনালো। এ কি সত্যিই তার ম্যাজিস্ট্রেট স্যার? অনবরত চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াতে থাকে। রূপসী তা মুছে নিয়ে এদিক ওদিক এলোমেলো দৃষ্টি মেলে তাকায়। ছটফট করতে থাকে সে। খুব করে চাচ্ছে তার ম্যাজিস্ট্রেট স্যার যেন এখনি তাকে বলে উঠে, “ধুর পাগলী! মজা করছিলাম।” কিন্তু না! এমন কিছুই হলো না। সে ইফাদের দিকে তাকিয়ে দেখে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সে। রূপসী ফুঁপিয়ে উঠে প্রশ্ন করে,

–আপনি কি মজা করছেন?

–যদি সত্যি আমি মজা করতে পারতাম তবে আমার চেয়ে খুশি আর কেউ হতো না।

রূপসী এবার শব্দ করে কেঁদে উঠে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,

–আপনি এটা করতে পারেন না। আপনি আমার সাথে এমনটা করতে পারেন না।

ইফাদের প্রচন্ড অসহায় লাগছে। তবুও নিজেকে শক্ত করে বলে,

–মায়ের মাথায় হাত রেখে করা কসম আমার হাত পা বেঁধে দিয়েছে রূপসী। আমার কিছুই করার নেই। কিচ্ছু করার নেই আমার।

রূপসী নিজেকে আর সামলাতে পারে না। সে ইফাদের বুকে সমানে কিল, ঘুষি মেরে যাচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে,

–না না নাআআআ! আপনি আমার ম্যাজিস্ট্রেট স্যার। শুধুই আমার। আপনি আর কারোর হতে পারেন না কারোর না।

রূপসীর চিৎকার, কান্না ইফাদকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। সে ও এবার বাঁধনহারা জলের স্রোতে ভাসিয়ে দিলো নিজের চক্ষুদ্বয়কে। রূপসীর মাথাটা বুকে চেপে ধরে ধরা গলায় বলে উঠে,

–আই এম সরি, সরি রূপসী, সরি!

—-

সন্ধ্যা নেমে এসেছে চারিদিকে। পাখিরা নিজ নিজ নীড়ে ফিরে যেতে ব্যস্ত। একটুপরেই রাতের আঁধারে ছেয়ে যাবে শহর। সেই সাথে ছেয়ে যাবে হয়তো চার চারটি জীবন, আরো গাঢ় অন্ধকারে।

চলবে……

#অপরিচিত_প্রিয়জন
#পর্ব_২১
#এম_এ_নিশী

খন্দকার বাড়িতে এক প্রকার হট্টগোল লেগে গিয়েছে। বাড়ির মানুষজন সব এদিক সেদিক ছুটোছুটি লাগিয়ে দিয়েছে। খন্দকার ইদরীস আহমেদ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বসে আছেন। তার অ্যাসিস্টেন্ট এসে যেই না বলেছে, “স্যার, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না” ওমনি ইদরীস তার সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে তার শান্ত রূপের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। হাতের কাছে থাকা ফুলদানি ছুঁড়ে ফেলে দেন মেঝেতে। পরক্ষণেই সজোরে লাথি মেরে বসেন তার অ্যাসিস্টেন্টকে। চিৎকার করে বলতে থাকেন,

–খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? যাচ্ছে না মানে কি? তোদের খাইয়ে দাইয়ে পুষছি কি এই কথা শোনার জন্য? এতো কড়া পাহারা থাকা সত্ত্বেও সে পালায় কি করে? হ্যা? পালায় কি করেএএএএএ?

–স..স..স্যার পাহারায় কোনো ত্রুটি ছিলো না তবুও কি..কিভাবে পালিয়ে…

–চুউউউপপ! একদম চুপ! আমি একটা কথাও শুনতে চাই না। আগামী ২ ঘন্টার মধ্যে আমার মেয়ে আমার সামনে থাকা চাই। আর ওই ওয়াহাব হা****কেও যেখান থেকে পারিস তুলে নিয়ে আয়। নাও জাস্ট লিভ। গোওওওওও…

ইদরীসের হুংকার শুনে “ইয়েস, বস!” বলতে বলতে ছুটে বেড়িয়ে যায় অ্যাসিস্টেন্ট। ইদরীস ধপ করে সোফায় বসে পড়ে। ফোঁস ফোঁস করে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, “আমার কষ্ট করে সাজানো পরিকল্পনা এভাবে মাঠে মারা যেতে পারে না। কিছুতেই না।”

—-

হাতে থাকা হ্যান্ডব্যাগটা দিয়ে সমানে এলোপাতাড়ি ভাবে মেরে যাচ্ছে মুনমুন ওয়াহাবকে। মারতে মারতে বলছে,

–মাঝরাস্তায় ছেড়ে যাবি তো এসেছিলি কেন জীবনে? বল? কেন এসেছিলি? আমি সেধে গেছিলাম তোকে প্রপোজ করতে নাকি তুই এসেছিলি? মাসের পর মাস ঘুরেছিস পেছনে। পটানোর জন্য কতো নাটকই না করলি। আর এখন আসল টাইমে ভেগে যাচ্ছিস? আজ তোকে মেরেই ফেলবো।

মুনমুনের আক্রমণে প্রথমে দু হাত দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও মুনমুনের কিড়মিড়িয়ে বলা কথাগুলো শুনে থেমে গেলো ওয়াহাব। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রেয়সীর মুখের দিকে। ঠোঁটে মৃদু হাসি। আচমকা মুনমুনের ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠা দেখে হাসি থেমে গেলো তার। মুনমুনের দু হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে মাথানিচু করে অপরাধী স্বরে বলে উঠে,

–সরি, মুনপাখি। ভুল হয়ে গেছে আমার। এতোটা অসহায় লাগছিলো নিজেকে যে কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমাকে মাফ করে দাও প্লিজ।

ওয়াহাবের কথা শুনে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয় মুনমুন। ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে উঠে,

–একবার বলা যেতো না আমাকে? বলা যেতো না যে বাবা রাজি হলেন না? আমি কি এতোটাই অধম? একটা পথও কি বের করতে পারতাম না?

–আসলে আমার মনে হয়েছিল উনি যখন মানলেন না তুমিও হয়তো আমার মতো নিরুপায় ই..

–আর তাই ভদ্রছেলে সেজে সুন্দর ভাবে বলে দিলে, “বিয়ে করে নাও।” খুব সোজা তাই না? এতোটা সস্তা আমি? বলোওও?

ওয়াহাব হেঁচকা টানে মুনমুনকে বুকে চেপে ধরে বলে,

–ছিহহ! একদম এভাবে বলবে না। তুমি আমার কাছে কতোটা দামী তা তোমার কল্পনারও বাইরে। আমি বললাম তো আমার ভুল হয়ে গেছে সোনা। এই যে তুমি এখন আমার কাছে চলে এসেছো আর তোমাকে হারাতে দেব না। এইভাবে শক্ত করে আগলে রাখব। সত্যি।

মুনমুন বাঁধভাঙা কান্নায় ভেসে যাচ্ছে। ওয়াহাবের বাঁধন থেকে নিজেকে ছোটানোর চেষ্টা চালালেও তার কথাগুলো শুনে কান্নার বেগ বাড়িয়ে দেয়। এবার সে ও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ওয়াহাবকে। বেশ কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে মুনমুন ওয়াহাবকে ছেড়ে দেয়। আশেপাশে তাকিয়ে বলে,

–ট্রেন কখন আসবে?

–একটুপরই এসে পড়বে।

–কিন্তু আমরা যাব কোথায়?

–তা তো জানি না। ইফাদ ভাই বলেছে লাস্ট স্টেশনে আমাদের জন্য লোক দাঁড়িয়ে থাকবে। সে যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই যেতে বলেছে। তবে এ কথাও বলেছে ওখানে পৌঁছে সর্বপ্রথম আমরা যেন বিয়েটা করে ফেলি।

–আজ ইফাদ ভাইয়ার জন্যই তোমার কাছে আসতে পেরেছি। নইলে তুমি তো আমাকে ফেলে পালাচ্ছিলে।

–আর কতোবার মাফ চাইবো বলো।

–হয়েছে থাক আর ঢং করতে হবে না।

রাত গভীর থেকে গভীরতর হতে যাচ্ছে। এমন নিশুতি পরিবেশে ভয় এর বদলে পরম শান্তির আবেশে দাঁড়িয়ে থাকে দুজন। ওয়াহাবের বাহু জড়িয়ে কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়ায় মুনমুন। তার নিঃশ্বাসের শব্দ বলে দিচ্ছে কতোটা স্বস্তির শ্বাস ফেলছে সে।

—-

মুনমুনের পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে রয়েছেন আফিয়া। স্বামীর মাথার কাছে জড়সড় হয়ে বসে আছেন। স্বামী তার এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়। দূর্বলতার কারণে কথা বলতে পারছেন না। আফিয়া জানেন তিনি ছেলের প্রতি বড় অন্যায় করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু কি করবেন? স্বামীর সম্মান ও প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিজের ছেলেকে বলির পাঠা বানাতে হলো তার। গতকাল রাতে যখন ইউনুস বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেন তখনই ইদরীসের আগমণ। শান্ত ভঙ্গিতে ইউনুসের পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

–ভাবি, শুনেছি ভাইজানের ওপর নাকি দূর্নীতির বড়সড় এক অভিযোগ দায়ের হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই অবসর নিবেন। অথচ অবসরের আগেই এতোবড় সম্মানহানি। এটা কি মেনে নেওয়া যায় বলেন?

ইদরীসের কথা শুনে আফিয়া চমকে ওঠে। তার স্বামী তো তাকে এই ব্যাপারে কিছুই জানাননি। তিনি উত্তেজিত কন্ঠে বলেন,

–কি বলছো ভাই তুমি? এসব কখন, কিভাবে হলো? উনি তো আমাকে কিছুই বলেননি।

–আহহা ভাবি বলবে কি করে। ব্যপারটা আমি দমিয়ে রেখেছি। ভাইজান নিজেও এখনো জানেন না। তবে এটা আমি আদৌ দমিয়ে রাখবো নাকি ছেড়ে দিয়ে যা হয় হতে দিবো তা নির্ভর করছে আপনার ওপর।

ইদরীসে কথায় আফিয়া অবাক হয়ে যায়। ইদরীসের ভাব ভঙ্গিমা কিংবা কথাবার্তা কোনোটাই তার কাছে বোধগম্য নয় তাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ইদরীস সেই দৃষ্টি লক্ষ্য করে উঠে দাঁড়ায়। ওয়ারড্রবের ওপর রাখা শোপিস গুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বলেন,

–যেভাবেই হোক ইফাদকে বিয়ের জন্য রাজি করান। মুনমুনের সাথে ওর বিয়েটা যতদ্রুত সম্ভব দিয়ে দিতে চাই।

–আর যদি ইফাদ রাজি না হয়?

মৃদু শব্দে হেসে উঠে ইদরীস জবাব দেন,

–সেটা আপনার দায়িত্ব ভাবি। আপনি নিজের ছেলের জেদকে প্রশ্রয় দিবেন নাকি স্বামীর সম্মান বাঁচাবেন তা সম্পূর্ণ আপনার সিদ্ধান্ত।

আফিয়া বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে ইদরীসের দিকে। তাকে কি ব্ল্যাকমেইল করছে ইদরীস? কিন্তু কেন? আফিয়া বুঝে উঠতে পারে না। ইদরীস এগিয়ে এসে পুনরায় বড়ভাই এর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেন,

–ডাক্তারকে ফোন করেছি। চলে আসবে।

এই বলে বেরিয়ে যান তিনি। আফিয়া তখনো বিস্ময় নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকেন।
রাতের ঘটনা ভাবতে ভাবতে চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে তার। ধীরেসুস্থে তা মুছে নিয়ে স্বামীর মুখের দিকে চাইতেই দরজায় খট করে আওয়াজ হলো। চকিতে ফিরে তাকিয়ে দেখেন ইদরীস এসেছে। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে আসে। ইদরীস বিষন্ন চেহারা নিয়ে ভাবির সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেন,

–মেয়েটা আমার এমন কান্ড করবে ভাবতে পারিনি ভাবি। যার জন্য আমার এতো আয়োজন ছিলো সেই যখন নেই তখন আর এসব আয়োজনের ও কোনো মানে নেই। চিন্তা করবেন না ভাবি ভাইজানের ওপর কেসটা আমি পড়তে দিব না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।

এই বলে আফিয়ার উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলে যান ইদরীস। আফিয়া ভাবতে থাকেন ইদরীস কি সত্যি বলে গেলো নাকি এর পেছনে তার অন্য কোনো চাল রয়েছে? তবে এটা ভেবেই তিনি খুশি হলেন যে ইফাদের ওপর আর কোনো জোর নেই। হুট করে তার ইফাদ-রূপসীর বিয়ের কথাটা মনে পড়ে যায়। চাপের মুখে পড়ে ছেলেকে তার ভালোবাসার মানুষ, তার বিয়ে করা বউ এর কাছ থেকে আলাদা করে দিচ্ছিলেন। কিন্তু এখন যেহেতু সেই চাপ আর নেই তবে বাড়ির বউকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে ঘরে নিয়ে আসা উচিত। যতদ্রুত সম্ভব।

——

–অভিমানী বউ আমার অভিমানে মুখ ফুলিয়ে বসে রয়েছে। কখন থেকে ফোন দিচ্ছি ফোনই তোলে না। অবশেষে ফোন তুললো অথচ কোনো কথাই নেই মুখে। বউটা কি আমার সাথে কথা বলবে না আর?

ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা ইফাদের কথাগুলো চুপচাপ শুনে যাচ্ছে রূপসী। কিন্তু কোনো জবাব দিচ্ছে না। অভিমান হয়েছে তার। বড্ড অভিমান। সে জানে মুনমুনের সাথে ইফাদের বিয়ে হয়নি। মুনমুন পালিয়েছে। কিন্তু তার ধারণা মুনমুন না পালালে ইফাদ মুনমুনকে বিয়ে করে ফেলতো। তাই তো থম মেরে চুপটি করে বসে আছে। কথা বলছে না। অথচ সে জানেই না মুনমুনের পালানোর পুরো পরিকল্পনাটা ইফাদেরই ছিলো। সে ই তো সবটা ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
ইফাদ সুর করে বলে উঠে,

–ছোট্ট বাচ্চা বউ আমার
বড় বড় অভিমান
বলবে না কথা সে
কষ্টে ভরা প্রাণ।
কি গো? এ্যাইইই! কথা বলো না প্লিজ। আর কতো রাগ করে থাকবে?

–ওপাশে নিশ্চুপ।

ইফাদ একটু থেমে আবার বলে উঠে,

–আচ্ছা আমি কি এখন দুহাতে কান ধরে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকবো? তবে কি তোমার রাগ কমবে? কিন্তু একটা সমস্যা। আমার প্যান্ট টা বেশ ঢিলা। বেল্ট পড়িনি। ওভাবে দাঁড়ালে যদি প্যান্ট খুলে যায় আর কেউ এসে দেখে ফেলে তাহলে তো মানইজ্জত ফালুদা হয়ে যাবে গো।

এই পর্যায়ে রূপসী আর রাগ ধরে রাখতে পারে না। ফিক করে হেসে দেয়। রূপসীর হাসির শব্দ শুনে ইফাদের ঠোঁটেও হাসি খেলে যায়। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলে,

–যাক! বউটার মান ভাঙলো তবে। আমি স্বামী হিসেবে সফল, বলো?

রূপসী হাসি থামিয়ে থমথমে ভাব নিয়ে বলে উঠে,

–আমি এখনো খুব রেগে আছি।

ইফাদ ফিসফিস করে জবাব দেয়,

–তবে কি আমি আসবো? রাগ ভাঙাতে?

ইফাদের কথার সুর ও বলার ভঙ্গিমা শুনে রূপসীর বুঝতে অসুবিধা হয়না ইফাদের কথার অর্থটা ঠিক কি ছিলো। রূপসী লজ্জায় লাল হয়ে যায়। ফোনটা কানে চেপে ধরে মাথা নিচু করে নেয়। ফোনের ওপারে বসে রূপসীর লজ্জা টের পেয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকে তার ম্যাজিস্ট্রেট স্যার।

চলবে…..