অপরিচিত প্রিয়জন পর্ব-২৪ এবং শেষ পর্ব

0
857

#অপরিচিত_প্রিয়জন
#অন্তিম_পর্ব
#এম_এ_নিশী

ইফাদকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই বাড়ির পরিবেশ শোকাবহ হয়ে রয়েছে। চারিদিকে যেন বিষন্নতার ছাপ। আফিয়া এখনও কেঁদে চলেছেন। রূপসী শান্তনা দিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তার নিজের ভেতরটাও যে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। এই সময়টা তার জীবনের সবচেয়ে সুখী সময় হওয়ার কথা ছিলো। অথচ ভাগ্যের কি পরিহাস।

রাত ১ টা বেজে ১৫ মিনিট। আফিয়াকে বেশ জোরজবরদস্তি করে অল্প খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে রূপসী। তার মাথার কাছেই বসে বসে ঝিমোচ্ছিল সে। হঠাৎ ঠুকঠাক আওয়াজ শুনে চমকে উঠে সে। বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে তার অসুস্থ শ্বশুর মশাই রয়েছেন। ইদরীস আর ইমাদ থানায়। এখনো ফেরেনি। মারিয়ারা তাদের বাড়িতে ফিরে গিয়েছে। এ বাড়িতে এখন শুধু সে তার দুই শ্বাশুড়ি, শ্বশুর, দাদী আর তার মা, বোন। সবাই ঘুমোচ্ছে। রূপসী ধীর পায়ে খাট থেকে নেমে এলো। আওয়াজের উৎস খুঁজতে বাইরে বেরিয়ে এলো। অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে এগোচ্ছে সে। আওয়াজটা বাড়ির পেছন দিক থেকে আসছে। রূপসী সেদিকে যেতেই দেখতে পায় পেছনের দরজা খুলে কেও একজন বাড়িতে ঢুকছে। রূপসী ভয়ে চিৎকার করে উঠার আগেই সামনের ব্যক্তিটির নজরে পরে যায় সে। মুখ খোলার আগেই তার মুখ চেপে ধরে পেছনে সরিয়ে দেওয়ালে ঠেসে ধরে তাকে। রূপসী বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে। অন্ধকারে মুখ দেখা না গেলেও মানুষটাকে চিনতে একটুও অসুবিধা হয়না রূপসীর। মানুষটা আর কেউ নয়, রূপসীর ম্যাজিস্ট্রেট স্যার। রূপসীকে শান্ত হতে দেখে ইফাদ মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়। রূপসী চাপাস্বরে বলে,

–আপনি? এখানে? কিভাবে?

–হুশশ! এখানে খুব একটা কথা বলা উচিত হবে না। আমি এসেছি তোমাকে নিয়ে যেতে।

–তো তাই বলে চোরের মতো পেছনের দরজা দিয়ে কেন?

–বুঝতে পারছিলামনা বাড়ির লোকেরা জেগে আছে কিনা। চাইছিলাম না কেউ জানুক ব্যপারটা। এখন চলো আমার সাথে।

–কিন্তু কোথায়?

–গেলেই বুঝতে পারবে।

ইফাদ রূপসীকে নিয়ে বেরিয়ে আসে। গাড়িতে বসেই খুব দ্রুত ছুটতে শুরু করে। কিছু সময় পরই গন্তব্যে চলে আসে। রূপসী খেয়াল করে দেখে ভাঙা একটি বাড়ি। জায়গায় জায়গায় ইট খসে পড়েছে। প্রচুর শ্যাওলা জমে আছে দেওয়ালগুলোতে। চারপাশে গাছগাছালিতে ভরা থাকায় রীতিমতো জঙ্গল মনে হচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে পরিত্যক্ত বাড়ি। খুব একটা কেউ আসে না এখানে। ইফাদ রূপসীকে নামিয়ে তাকে সাবধানে ভেতরে নিয়ে গেলো। ভিতরে ঢুকেই রূপসীর পিলে চমকে উঠলো। তার সামনে পরপর সারি সারি করে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় রয়েছে আজমল, দিদার, তাদের গ্রামের মাতব্বর কুদ্দুস মিঞা আর একজনকে সে ঠিক চিনতে পারছে না। রূপসী ইফাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই ইফাদ আজমলকে দেখিয়ে বলে উঠে,

–এই সেই কালপ্রিট, যে তোমার সরলতা আর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তোমাকে নারীপাচার কারীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল।

রূপসী রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে আজমলের দিকে। সেদিনের কথা মনে পড়ে অশ্রু জমে গেছে চোখের কোণায়। ইফাদ পুনরায় বলে উঠে,

–আর এই সেই শয়তান দিদার যে তোমাকে একলা পেয়ে তোমার সম্মানহানী করতে চেয়েছিলো। আর পাশেই বসে আছেন তার আদর্শ পিতা কুদ্দুস মিঞা যে নারীপাচার কারীদের আরেক গুরু।

রূপসী অবাক হয়ে যায় এ কথা শুনে। তাদের গ্রামের মাতব্বর নারীপাচারের সাথে জড়িত। ইফাদ সর্বশেষ লোকটিকে দেখিয়ে বলে উঠে,

–রূপসী, ভালো করে চিনে রাখো। এই লোকটা হচ্ছে মনছুর আলী। এই পুরো চক্রটার মাথা। একেই সেদিন ধরতে গিয়েও পারিনি। হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে। তবে আজ প্রত্যেকটাকে নাগালে পেয়েছি। খাতিরদারি তো জমিয়ে হবে।

এ পর্যায়ে রূপসী বলে ওঠে,

–কিন্তু আপনি এদেরকে পেলেন কিভাবে? আর এদের ব্যপারে এতোকিছু জানলেনই বা কি করে? আর তাছাড়া আপনার তো থানায় থাকার কথা। আপনাকে ছেড়ে দিলো কীভাবে?

–বলছি। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর ব্যখ্যাসমেত দিচ্ছি।

একটু থেমে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে ইফাদ। অতঃপর বলতে শুরু করে,

–তোমার আমার পেছনে তাড়া করা সেই মুখোশধারী লোকগুলোকে যখন তুমি মেরে আধামরা বানিয়ে ফেলে রেখেছিলে। এরপর আমরা পালিয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় এক দোকানীর কাছ থেকে ফোন নিয়ে ওয়াহিদ দুলাভাইকে ফোন করেছিলাম সেই সাথে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিয়েছিলাম সাদমান সাহেবকে। লোকেশন ট্রেক করে সাদমান সাহেব টিম নিয়ে ওখানে উপস্থিত হয়ে ওদেরকে ধরে ফেলে। কারণ প্রত্যেকে মরার মতো বেহুশ হয়ে পড়ে ছিলো। তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আমি চলে আসি এখানে। ওদেরকে এখানেই রাখা হয়েছিল। এদের মধ্যে আজমলকে দেখেই আমি চিনে ফেলি কারণ তাকে দেখেছিলাম যেদিন গ্রামের লোক আমাদের জোর করে বিয়ে দেয় সেদিন সে কি সুন্দর মিথ্যে বানোয়াট এক তথ্য গ্রামের মানুষদের শুনিয়ে দিয়েছিলো। তারপর থার্ড ডিগ্রি দিতেই ফরফর করে সমস্ত সত্য উগলে দিলো সে।

ইফাদের কথার মাঝখানেই সেখানে উপস্থিত হয় সাদমান সহ বেশ কয়েকজন। আরো একজনকে ধরে এনেছে তারা। চোখ আর হাত বাঁধা অবস্থায়। বন্দি লোকটাকে দেখেই রূপসীর চোখ কপালে উঠে যায়। এ সে কাকে দেখছে? বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে সে ইফাদের দিকে তাকাতেই ইফাদ লোকটিকে ভেতরের ঘরে নিয়ে যেতে ইশারা করে। রূপসী বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠে,

–আপনার চাচা?

ইফাদ রূপসীর কথার জবাব না দিয়ে তার চাচার সামনে এসে চোখের বাঁধন খুলে দেয়। ইফাদকে দেখেই ইদরীস দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠে,

–এ কোন ধরনের বেয়াদবি? আমাকে এভাবে নিয়ে এসেছো কেন?

–আপনার সেবা করতে। যতকিছু আপনি এতদিন আমাদের বিরুদ্ধে করে আসলেন তার বিনিময়ে একটু সেবাযত্ন তো আপনার প্রাপ্যই।

–দেখো ইফাদ তুমি কিন্তু কাজটা ঠিক করছো না। আমি কিন্তু শেষ করে দিবো তোমাদের সবাইকে…

ইদরীসের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই ইফাদ চিৎকার করে বলে উঠে,

–সাদমান সাহেব।

সাদমান ভড়কে গিয়ে তড়িঘড়ি করে জবাব দেয়,

–ইয়েস.. ইয়েস স্যার।

–লোকটার গালে কষে একটা চড় মারুন।

ইফাদের আদেশ পেয়ে সাদমান ইদরীসের গালে কষিয়ে চড় লাগায় পরপর দুটো। ইদরীস হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ইফাদ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। হাত দিয়ে ইশারা করে নিয়ে যেতে বলে। ইদরীসকে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্রমাগত ভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু লাভ নেই। তার হুমকি বাস্তবায়ন আর কখনোই তার পক্ষে সম্ভব না। রূপসীর কাছে এসে এবার তার প্রশ্নের উত্তর দেয় ইফাদ,

–হুম! কি তিতকুটে এক সত্য। তাই না। এসবকিছুর নাটের গুরু আমারই আপনজন। আমার পিতৃতুল্য চাচা।

–কিন্তু উনি কি করেছেন?

–এই নারী পাচারের চক্রটি মূলত উনারই তৈরি। এতোদিন আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ায় কেউ উনার ব্যপারে জানতে পারেনি।

–তবে এখন? আপনি জানলেন কিভাবে?

–থ্যাংকস টু মুনমুন। মাকে ব্ল্যাকমেইল করে মুনমুনের সাথে আমার বিয়ে দেওয়াতে রাজি করানোর সময় আড়াল থেকে সবটা শুনে নেয় মুনমুন। বিষয়টা আমাকে সাথে সাথেই জানিয়েছে সে। এরপরের ঘটে যাওয়া সমস্ত নাটক ঘটতে থাকে আমার প্ল্যান অনুযায়ী। মুনমুনকে ওয়াহাব এর সাথে পালাতে সাহায্য আমিই করেছিলাম। সবকিছু ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। জানতাম চাচা এবার ফুঁসে উঠবেন। উনার টার্গেট কি তা জানা ছিলো না আমার। তাই উনার এই ফুঁসে ওঠাকে কাজে লাগিয়ে বিষয়টা বের করে আনতে চাইছিলাম। হলোও তাই। উনি উনার অ্যাসিস্টেন্টের সাথে সবটা খোলাখুলি আলোচনা করেন। আমাদের পুরো প্রপার্টি উনার নিজের নামে চায়। তাই দাদীকে ভুল ওষুধ দিয়ে অসুস্থ করে দিয়েছিলেন। যাতে ওই অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে সবকিছু নিজের নামে লিখে নিতে পারেন। তবে বড় বাঁধা হতে পারে আমার বাবা আর আমি। তাই বাবাকেও খাবারের সাথে দিনের পর দিন ওষুধ দিয়ে অসুস্থ করে দিয়েছেন। মুনমুনের সাথে বিয়ে দিয়ে আমাকে নিজের আয়ত্তে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা হলো না। তারপর তার পরিকল্পনা হলো আমাকে বাল্যবিবাহের কেসে ফাঁসিয়ে দেওয়া। তবে উনি তখনও অজ্ঞ ছিলেন যে উনার সব পরিকল্পনা আমি জেনে গেছি। কারণ উনার কোটের বোতামে আমি একটা মাইক্রোফোন সহ বেডরুম আর অফিস কেবিন দুই জায়গাতেই গোপন ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছিলাম। তবে উনাকে হাতেনাতে ধরাটাই আমার মূল টার্গেট ছিলো। তাই উনি আমাকে যেভাবে ফাঁসাতে চেয়েছেন আমিও সবটা সেভাবেই সাজিয়েছি। যারা আমাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছিলো তারা সবাই আমার টিমের লোক, আমার হয়েই কাজ করছিলো। আমি জানতাম আমি সরে গেলে চাচা রিল্যাক্স মুডে অনেকটা ওপেনলি নিজের কুকর্মের বাকি ধাপ সম্পন্ন করতে যাবেন। আর হয়েছেও তাই। উনি গিয়েছেন মনছুর আলীর সাথে সাক্ষাৎ এ। আর সেখান থেকেই উনাকে হাতেনাতে ধরা।

–কিন্তু চাচা তো থানায় গিয়েছিলেন আপনাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যপারটা দেখতে।

–ইমাদকে কাজে লাগিয়ে উনি চলে গিয়েছেন নিজের কাজে। আমি নেই। বড় বড় ডিলগুলো আরামসে সারতে পারবেন এই চিন্তাধারা ছিলো তার। কিন্তু শেষ চালটা যে আমিই দিয়ে বাজিমাত করে দিব তা তিনি ঘুনাক্ষরেও টের পাননি।

–এখন এদের সাথে আপনি কি করবেন?

–এই যে এই লোকগুলো, যারা তোমার সাথে কতো অন্যায় করেছে। আমি চাই তুমি আজ এদেরকে ইচ্ছে মতো মারো। শোধটা তুলে নাও।

–কিহহ! আমি?

–হ্যা, তুমি। পারবেনা? ভেবে দেখো, ওরা কতোই না কষ্ট দিয়েছে তোমাকে, তোমার পরিবারকে।

এ কথা শুনে রূপসীর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ইফাদ রূপসীর হাতে একটি লাঠি ধরিয়ে দেয়। রূপসী তা শক্ত মুঠোয় ধরে সামনে এগিয়ে যায়। তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে অতীতের স্মৃতি গুলো। এদের জন্য তাকে কি ভয়াবহ এক পরিস্থিতি পার করতে হয়েছে। তার বাবা, মা, বোন ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছে। গ্রাম থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। রূপসী দুটো বছর বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিলো নিজের পরিবার থেকে। আর তার বাবার সাথে শেষ দেখাটাও হলো না তার। এসব কিছু যখন তার চিন্তার মধ্যে খেলে গেলো, তারপর… ইচ্ছে মতো সবকটাকে পিটিয়ে গেছে। পাগলের মতো। যেন একটাকেও জীবিত ছাড়বে না আজ। অবস্থা বেগতিক দেখে একটা সময় এসে ইফাদ আটকে দেয়। তবে রূপসী ভয়ংকররূপে চলে গিয়েছে। তাকে আটকানো যায় না। রূপসীকে দুহাতে শক্ত করে আগলে নিয়ে তাকে পেছনে টেনে আনে ইফাদ। বহুকষ্টে শান্ত করে। তারপর সাদমানকে এদিকটা দেখতে বলে রূপসীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে।

দীঘির পাড়ে সবুজ ঘাসের ওপর বসে আছে ইফাদ ও রূপসী। আকাশে চাঁদখানা ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভয়ংকর রাগে ফুঁসলে থাকা রূপসী এখন শান্ত, ধীর। ঠিক ওই দীঘির জলের মতো। নীরবতা ভেঙে রূপসীই বলে উঠলো,

–আপনার চাচার সাথে কি করবেন এখন?

–চাচাকে আঘাত করতে পারবো না আমি। তাই রিমান্ডের দায়িত্ব আরেকজনের হাতে দিয়ে এসেছি। এরপর আইন বিচার করে যা শাস্তি দিবে তাই হবে তাদের সাথে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইফাদ আবার বলে,

–এসব অপরাধীদের ধরতে আর শাস্তি দিতে দিতে আমি ক্লান্ত রূপসী। নিজের মানুষ যখন পিঠে ছুরি বসায় তখন তো নিজেকে শক্তিহীন, অসাড় মনে হয়। আমার আর এসব নিয়ে ভাবতে বা কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আমি একটু শান্তি চাই। মানসিক শান্তি।

বলতে বলতে ইফাদ রূপসীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। রূপসী পরম যত্নে আঙুল চালায় ইফাদের ঘন চুলের ভাজে ভাজে। চোখ বুজে নেয় ইফাদ, হয়তো শান্তি খুঁজে পেয়েছে। পরম শান্তি।


সেদিনের পর খন্দকার বাড়ির পরিবেশটা অনেকখানি বদলে গেলেও সময় থেমে থাকেনি। তাই সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে গিয়েছে সকলের জীবন। ইদরীসের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো। তার স্ত্রী সুমাইয়া এতে আঘাত পেলেও অপরাধী অপরাধ করেছে তাই শাস্তি হয়েছে এই শান্তনাতেই নিজেকে সামলেছে।

মুনমুন ওয়াহাব ফিরে এসেছিলো। ওরা ফিরে আসার পর পুনরায় ওদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ইফাদ-রূপসী আর মুনমুন -ওয়াহাব চারজনেরই আবার বিয়ে হয়, পারিবারিক ভাবে।

দেখতে দেখতে কেটে যায় অনেকগুলো দিন, মাস, বছর।

কোনো এক গোধূলি লগ্নে, মৃদুমন্দ ঝিরিঝিরি বাতাসের ঝাপটা ভেদ করে মাটির রাস্তার ধার ধরে হেঁটে চলেছে ইফাদ-রূপসী। ইফাদের বাহু জড়িয়ে ধীরগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে রূপসী, ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটেই রয়েছে সবসময়। মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকিয়ে রূপসীর ভাবভঙ্গিমা বোঝার ব্যর্থ প্রয়াস চালাচ্ছে ইফাদ। একটা সময় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে বলেই ফেলে,

–আর কতো হাঁটবে? এই অবস্থায় এতো হাঁটা উচিত না।

রূপসী সরু চোখে ইফাদের দিকে তাকিয়ে বলে,

–হাঁটবো। অনেক হাঁটবো। বসে থেকে থেকে কতটা নাদুসনুদুস হয়ে গেলাম দেখেছেন?

–আমি তো জানতাম প্রেগন্যান্সির কারণে প্রায় সব মেয়েই এমন নাদুসনুদুস হয়ে যায়। এতে প্রবলেম কি?

ইফাদের কথার তোয়াক্কা না করে রূপসী “হইই!” করতে করতে সামনে এগিয়ে গেলো। ইফাদ চেঁচিয়ে বলে,

–আরে আস্তে, সাবধানে।

তারপর বিরবির করে নিজে নিজেই বলে,

–বাচ্চার মা হতে চললো তবুও ছটফটানি কমলো না।

সামনে উড়ন্ত বাহারি প্রজাপতিদের মেলা লেগেছে যেন। রূপসী সেগুলো ধরার চেষ্টা করতে থাকে। তার উচ্ছ্বাস দেখে মনে হবে যেন কোনো গুপ্ত রত্নের সন্ধান পেয়েছে সে। রূপসীর এমন কর্মকান্ড দেখতে দেখতে গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় ইফাদ। থেকে থেকে রূপসীর লাফিয়ে ওঠা দেখে ইফাদ হেসে দেয়। মনে মনে হিসেব কষতে থাকে।
“সেই প্রথম আহত অবস্থায় আবছা আবছা ভাবে ভেসে ওঠা এক মায়াবী মুখ, যখন স্পষ্ট প্রকট হয় তখন এক চেনা চেনা অনুভূতি। অপরিচিত অবয়বে কোনো পরিচিত কেউ দাঁড়িয়ে ছিলো কি? উত্তরবিহীন প্রশ্ন ছিলো তার। তবে আজ.. উত্তরটা তার জানা। এইযে সেই অপরিচিত মায়াবিনী তার রসকষহীন জীবনে ওই রং বেরং এর প্রজাপতিগুলোর মতোই উড়ে উড়ে এসে রঙিন করে দিলো চারপাশ। জীবনের ছকটাই বদলে দিলো। সেই অপরিচিত আজ তার পরম প্রিয়জন।”

ভাবতে ভাবতে রূপসীর কাছে এসে একটি প্রজাপতি ধরে তার হাতের ওপর বসিয়ে দেয়। রূপসী বাচ্চাদের মতো খুশি প্রকাশ করতে থাকে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতে থাকে প্রজাপতিটিকে। আর ইফাদের মুগ্ধদৃষ্টি তার ফড়ফড়িয়ে উড়ে বেড়া প্রজাপতির দিকে। রূপসীর মুখের ওপর আছড়ে পড়া কিছু অবাধ্য চুল তার কানের পাশে গুজে দিয়ে বিরবির করে বলে উঠে ইফাদ, “তুমি আমার এক অপরিচিত প্রিয়জন!”

~সমাপ্ত ~