#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_২১
বাইরে তখন প্রকৃতির রুদ্ররূপ। পৌষের আচমকা কালবৈশাখীর মতো মুষলধারে বৃষ্টি এসে আছড়ে পড়ছে বড় ঘরের টিনের চালে। বৃষ্টির একটানা শব্দের সাথে আশ্বিনের শোঁ শোঁ বাতাসের মাতম মিলে যেন এক বিষাদময় সুরের সৃষ্টি করেছে।
ঘরের মেঝেই আছড়ে পড়া হারিকেনের ঘোলাটে আলোয় দাঁড়িয়ে ছিল মরিয়ম আর সুরাইয়া। দুই নারীর নীরব দৃষ্টিবিনিময়ের মাঝেই যেন এক অদৃশ্য লড়াই চলছিল। মরিয়মের বুকটা রাফির সুরক্ষা ভাবনায় দ্রুত ওঠানামা করলেও তার চোখের তারায় ফুটছিল অগাধ দৃঢ়তা।
সুরাইয়ার হাতের দুধের বাটিটা সামান্য কেঁপে উঠে কাঠবোর্ডের ওপর ঠক করে শব্দ করল।
“ভাবিজান,,,,” সুরাইয়া আঁচল দিয়ে হাত দুটো মুছতে মুছতে এক পা এগিয়ে এল, “তুমি আমারে খারাপ ভাবতেছো? ভাববা না-ই বা কেন! যেই ঘরে একদিন শিউলি বিষ ছড়াইছে, সেই ঘরে আমার মতো পর হওয়া বোনরে তো অমঙ্গলই মনে হবে। কিন্তু বিশ্বাস করো, রফিক ভাই আমারে যতখানি শয়তান ভাবুক না কেন, আমি আমার কোল-আঁধার করা ভাইপোটার কোনো ক্ষতি চাই না।”
মরিয়ম কোনো কথা বলল না। সে শুধু নিষ্পলক চোখে সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। শাড়ির আঁচলের ভেতর লুকানো সেই চিঠিটা তখন তার ত্বকে বিষাক্ত কাটার মতো বিঁধছিল।
সুরাইয়া আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে ধীরপায়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। কাঠের দরজার কপাটটা বাতাসের ঝাপটায় খানিকটা কেঁপে উঠে থমকে রইল।
সুরাইয়া চম্পট দিতেই মরিয়ম তড়িঘড়ি করে ঘরের কাঠের খিলটা কষে আটকে দিল। তার হৃদপিণ্ড যেন পাঁজরের হাড় চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
খাটে শুয়ে থাকা কচি শিশু রাফি তখন পরম শান্তিতে নিদ্রামগ্ন। মরিয়ম নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে ঘরের উত্তরের কোণে রাখা সেই মাটির সিন্দুকটার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল।
সিন্দুকটি শতাব্দীপ্রাচীন। রফিক শেখের দাদার আমল থেকে এই শেখ বাড়ির অমূল্য আমানত বয়ে নিয়ে চলেছে এই মেঝের সিন্দুক। লালচে মাটির ওপর পিতলের ভারী পাত মারা। মরিয়ম হাত বাড়িয়ে সিন্দুকটির পেছনে অন্ধকার কোণটায় স্পর্শ করল। ধুলো আর মাকড়সার জালে ঘেরা স্যাঁতসেঁতে এক জায়গা। চিঠিতে বলা হয়েছিল এই সিন্দুকের পেছনেই নাকি লুকানো আছে এক ছোট বাক্স, যার ভেতর লেখা রয়েছে এই শেখ বাড়ির রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের আসল রূপকথার সত্য!
মরিয়মের আঙুল স্পর্শ করল ঠাণ্ডা, ধাতব একটা খাঁজ। সত্যি! সিন্দুকের কাঠের কাঠামোর পেছনে মাটির খাঁজে নিখুঁতভাবে বসানো রয়েছে একখানা ছোট লোহার ডিব্বা!
মরিয়মের নিঃশ্বাস থমকে গেল। সত্যানুসন্ধানের এক অদম্য কৌতূহল ও আতঙ্কের মিশ্রণে তার হাত দুটি কাঁপতে লাগল। সে অতি সাবধানে ডিব্বাটি টেনে বের করে আনল। ডিব্বাটির ওপর কোনো তালা নেই, কেবল একখানা প্রাচীন ধাঁচের পিতলের আংটা দিয়ে আটকানো।
আংটাটা সরাতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল দুটো পুরানো জং-ধরা চাবি আর একখানা কালচে হয়ে যাওয়া সুতির টুকরো কাগজ।
মরিয়ম প্রদীপের আলোর একদম কাছে নিয়ে কাগজটি মেলল! উর্দুমিশ্রিত বাংলায় হাতে লেখা অস্পষ্ট কয়েকটি লাইন ফুটে উঠল
“শেখ বাড়ির উঠোনে যে বীজ পোঁতা হয়েছে, তার ফসল পীরপুরের মানুষকে রক্ত দিয়ে মেটাতে হবে। চার বছর আগের সেই অমাবস্যার রাতে মধুমতীর ঘাটে যে জীবন বলি দেওয়া হয়েছিল, তার খতিয়ান লুকানো আছে রফিকের মাটির সিন্দুকের দ্বিতীয় খোপে। সুরাইয়া অপরাধী নয়, সে কেবল সেই বলির শোধ নিতে এসেছে,,,,”
কাগজটি পড়া শেষ হতেই মরিয়মের চোখের সামনে এক ঘোর অন্ধকার নেমে এল!
‘সুরাইয়া কেবল সেই বলির শোধ নিতে এসেছে?’ তবে কি চার বছর আগে এই শেখ বাড়িতে এমন কোনো নির্মম ঘটনা ঘটেছিল, যার সুতো রফিক শেখ নিজের হাতে কেটে দিয়েছিলেন? রফিক কি সততার চাদরে ঢেকে রাখা এক অন্য মানুষ? না না! মরিয়মের মন চিৎকার করে বলে উঠল যে পুরুষ নিজের স্ত্রীর প্রতি এত দরদী, যে পুরুষ অন্যায় দেখে গর্জে ওঠে, সে কীভাবে কোনো খারাপ ঘটনার সাথে যুক্ত হতে পারে?
ঠিক তখনই বাইরে ভিটের ওপর ভারী পায়ের শব্দ আর শোঁ শোঁ আওয়াজে দরজায় ধাক্কা পড়ল।
“মরিয়ম! দরজা খোলো বউ!”
রফিক শেখের গম্ভীর, কড়া কণ্ঠস্বর চিরে ভেতরে প্রবেশ করল।
মরিয়মের হাত বুক থেকে কেঁপে উঠল। সে এক মুহূর্তে কাগজ আর ডিব্বাটি সিন্দুকের পেছনে যথাস্থানে রেখে শাড়ির আঁচল সোজা করল। ধীরপায়ে গিয়ে দরজার কাঠের খিলটি খুলে দিল।
রফিক শেখ ঘরের ভেতরে পা রাখল। ওর মাথার সুতির গামছাটা ভিজিয়ে একাকার, গা বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে। তবে আজ ওর চোখের দৃষ্টিতে পরম এক ক্লান্তি আর গভীর দুশ্চিন্তার ছায়া।
“বাইরে বৃষ্টি আরও বাড়ছে মরিয়ম,” রফিক গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল। “পুলিশ সদরের নদীঘাট ঘেরাও করেছে। গ্রামের মানুষকে সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে। তুমি আর রাফি একটু সাবধানে থেকো।”
মরিয়ম রফিকের ভেজা চেহারার দিকে তাকাল। যে মানুষটিকে দেখে সবসময় তার মনে এক পরম আশ্রয়ের অনুভূতি জাগত, আজ এই চিঠি আর পুরনো ডিব্বার রহস্য জানার পর ওকে কেমন যেন এক অচেনা পুরুষ বলে মনে হচ্ছে।
“রফিক,,,,” মরিয়মের স্বর কেঁপে উঠল।
রফিক ওর গামছাটি ঝুলিয়ে রেখে মরিয়মের দিকে ফিরল, “কিছু বলবে বউ?”
মরিয়ম সরাসরি রফিকের চোখে চোখ রাখল, “চার বছর আগের অমাবস্যার রাতে মধুমতীর ঘাটে কী হয়েছিল রফিক?”
কথাটা শোনামাত্রই রফিকের পুরো শরীর যেন এক মুহূর্তে জমে পাথর হয়ে গেল! ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কপালে ভেসে উঠল রক্তবর্ণ রগ। হাতের লাঠিটা ওর মুঠোর ভেতর মড়মড় করে উঠল।
ঘরের ভেতরে এক পিনপতন নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। বাইরের ঝুমঝুম বৃষ্টির আওয়াজ যেন এক বিভীষিকাময় রূপ ধারণ করল।
রফিক ধীরপায়ে মরিয়মের একদম কাছে এগিয়ে এল। ওর চোখ দুটি কাঁপছিল এক অচেনা যন্ত্রণায় আর ক্রোধে।
“তুমি এই কথা কোথায় শুনলে মরিয়ম?” রফিকের স্বর ছিল সাপের ফুসফাসের মতো অতি নিচু ও বরফশীতল।
“আমি কোথায় শুনেছি তা বড় কথা নয় রফিক,” মরিয়মের চোখ বেয়ে একবিন্দু পানি গড়িয়ে পড়ল, “বড় কথা হলো যেই বাড়িতে আমি আমার সন্তানকে নিয়ে বাঁচতে চাই, সেই বাড়ির মাটি রক্তে ভিজে আছে কি না তা আমার জানা দরকার! সুরাইয়া আপা কিসের শোধ নিতে এসেছে? আর সেই অঙ্গ পাচারকারী পিশাচদের সাথে আমাদের বাড়ির কী সম্পর্ক?”
রফিক শেখ এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ওর চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল। মনে হলো, ওর ভেতরের সেই লুকিয়ে রাখা অসীম যন্ত্রণা আর গোপন সত্য আজ বাঁধ ভাঙতে চাইছে।
তিনি ধীরপায়ে গিয়ে খাটের পাশে বসল। ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট রাফির মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলতে লাগল
“মরিয়ম,,, চার বছর আগের সেই রাতে আমি এক ভুল করেছিলাম। সুরাইয়া যাকে বিয়ে করেছিল, সেই লোকটা কেবল কোনো সাধারণ অপরাধী ছিল না। সে ছিল পীরপুরের তৎকালীন এক নামজাদা পরিবারের সন্তান, যে আড়ালে এই অঙ্গ পাচারকারী চক্র পরিচালনা করত। সুরাইয়া যখন ওর প্রেমে অন্ধ হয়ে গৃহত্যাগ করতে চাইল, তখন আমি ওকে আটকানোর জন্য মধুমতীর ঘাটে গিয়েছিলাম,,,,”
রফিক শেখের গলা কান্নায় বুজে এল, ওর চোখ থেকে একবিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ওর হাতের ওপর।
“সেদিন নদীঘাটে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে,,,, সেই লোকটির হাত থেকে এক মারাত্মক তথ্য বেরিয়ে আসে। সে কেবল সুরাইয়াকে ব্যবহার করছিল আমাদের এই শেখ বাড়ির ভিটে আর আমার সুনামকে কাজে লাগিয়ে গ্রাম থেকে সহজে মানুষ গুম করার জন্য! সুরাইয়া সে ভালোবাসে, কিন্তু আসলে সে ছিল কেবল ওই শয়তানের হাতের পুতুল! আমি যখন ওকে সত্যিটা বোঝাতে ব্যর্থ হলাম,,, তখন সেই লোকটা আমার দিকে রিভলবার তাক করেছিল, মরিয়ম!”
মরিয়ম ওর বুকের ওপর হাত চেপে ধরল।
“নিজেকে বাঁচাইতে আর আমার বোনরে ওই শয়তানের হাত থেকে টেনে আনতে গিয়ে,,,,” রফিকের স্বর কাঁপতে লাগল, “আমার আর কিছু করার ছিল না।সবাই ভেবেছিল সে মরে গেছে,,, সুরাইয়াও ভেবেছিল আমি ওর স্বামীকে খু*ন করেছি! সেইদিন থেকে সুরাইয়ার মনে শেখ বাড়ির প্রতি আর আমার প্রতি চরম বিষ জন্ম নেয়। সে প্রতিজ্ঞা করে ফিরে আসার,,,”
রফিক থামল। মরিয়ম ওর দিকে নিষ্পলক চেয়ে রইল।
“কিন্তু রফিক,,,,” মরিয়ম নিচু গলায় বলল, “লোকটা যদি সেদিন ম*রেই গিয়ে থাকে, তবে আজ গ্রামে এই অঙ্গ পাচারের মাস্টারমাইন্ড কে? আর সুরাইয়া আপা কার হয়ে কাজ করছে?”
রফিক শেখ মুখ তুলে তাকাল। ওর চোখের মণি দুটোতে ফুটে উঠল এক পরম বিভীষিকা!
“সেই লোকটা ম*রেনি মরিয়ম!” রফিকের বরফশীতল স্বর ঘরের প্রতিটা কোণে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল। “সে নদীর স্রোতে ভেসে গিয়ে রক্ষা পেয়েছিল। আর আজ চার বছর পর, সে আরও বড় ভয়ংকর রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে! সে এখন আর বাইরে থেকে আক্রমণ করছে না,,,, সে সুরাইয়াকে ব্যবহার করে আমাদের ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে!”
ঠিক সেই মুহূর্তে বড় ঘরের বাইরের বারান্দায় এক বিকট চিৎকার আর কাঁচ ভাঙার শব্দ পাওয়া গেল!
“ওরে আমার রফিক রে! ওরে জাহিদ! বাঁচা রে!”
শাশুড়ি রাবেয়া বেগমের এই আর্তচিৎকারে রফিক আর মরিয়ম দুজনেই এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল!
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টির মাঝে শেখ বাড়ির উঠোন ঘিরে ফেলেছে একদল সশস্ত্র, কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা মানুষ! আর তাদের একদম সামনে, হারিকেনের লাল আভায় দাঁড়িয়ে আছে সুরাইয়া! ওর হাতে জ্বলজ্বল করছে একখানা ধারালো রামদা, আর উনার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশালাকৃতির লোক, যার মুখের অর্ধেকটা আগুনে ঝলসানো ও বীভৎস!
মাস্টারমাইন্ড অবশেষে ছদ্মবেশ খুলে নিজের রূপ ধরে শেখ বাড়ির ভিটেয় পা দিয়েছে!
চলবে,,,,

