#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#অন্তিম_পর্ব
বাইরে তখন আশ্বিনের মুষলধারে বৃষ্টি আর বাতাসের মাতম যেন সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কড়কড় শব্দে বিকট বিজলি চমকে উঠতেই উঠোনের দৃশ্যটা মুহূর্তের জন্য দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
শেখ বাড়ির কাদাপানিতে থইথই উঠোন ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চার-পাঁচজন কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা সশস্ত্র পুরুষ। তাদের হাতে ধানের শীষ কাটার মতো ধারালো রামদা। আর সেই তাণ্ডবের ঠিক কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে সুরাইয়া! সুরাইয়ার পরনের সুতির শাড়ি ভিজে গায়ে লেপ্টে আছে, ওর হাতে একখানা চকচকে রামদা, আর ওর ঠোঁটে ঝুলছে এক বিজয়ের হাসি।
সুরাইয়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির দীর্ঘদেহী শরীর আর মুখের বাম পাশটা আগুনের ঝলসানো ক্ষতে বীভৎস রূপ ধারণ করে আছে। চার বছর আগে মধুমতীর তীব্র স্রোতে তলিয়ে যাওয়া সেই অপরাধী চক্রের সর্দার ‘সোবহান’! ওর কুৎসিত চোখের মনি দুটোতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা প্রতিশোধের আগুন স্পষ্ট জ্বলছিল।
রাবেয়া বেগম উঠোনের এক কোণে কাদায় লুটিয়ে পড়ে আকুল হয়ে কাঁদছিলেন, “ওরে সুরাইয়া! তুই নিজের মায়ের ওপর, নিজের ভাইয়ের ওপর র*ক্ত নিয়ে খেলতে আইলি রে? তুই কিসের কুপুত্রি জন্মাইলি!”
সুরাইয়া এক বিকট ঠাট্টার হাসি হেসে উঠল, “মা! আজ আর মা বলে ঢং করো না! চার বছর আগে যখন তোমার সোনার টুকরো ছেলে রফিক আমার স্বামীকে মাঝনদীতে কুপিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিল, তখন তোমার এই মায়া কই ছিল? আজ আমি আর সোবহান ফিরে এসেছি আমার সেই প্রতিশোধ পূর্ণ করতে! এই শেখ বাড়ির ভিটের মাটি আজ রফিকের রক্তে লাল হবে!”
ঠিক সেই মুহূর্তে বড় ঘরের ভারী কাঠের কপাট এক ঝটকায় খুলে বাইরে এল রফিক শেখ!
ওর পরনে খাদি ফতুয়া, উরুতে কষে বাঁধা ওষধি পাতার রক্তভেজা ব্যান্ডেজ। কিন্তু উনার ডান হাতে শক্ত করে ধরা সেই বাঁশের লাঠি। ওর পেছন পেছন মরিয়মও এসে বারান্দার খুঁটি চেপে দাঁড়াল, মরিয়মের বুকে শক্ত করে জড়ানো তোয়ালেতে মোড়া ছোট্ট সন্তান রাফি।
রফিক শেখের বরফশীতল, হুংকারসম আওয়াজ পুরো শেখ বাড়ির উঠোন কাঁপিয়ে দিল, “সোবহান! চার বছর আগে মধুমতীর স্রোত তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু আজ পীরপুরের মাটি তোকে আর ছাড়বে না!”
সোবহান ওর ঝলসানো মুখের বিকট এক হাসি হেসে এক পা এগিয়ে এল, “রফিক, তোর লাঠির শক্তি আমি চিনি। কিন্তু আজ তুই এক পায়ে লড়ছিস! তোর উরুর র*ক্ত এখনো থামেনি। আর আজ তোকে বাঁচানোর মতো এই গ্রামে কেউ নেই! সুরাইয়া আগেই খবর দিয়ে গ্রামের মাতব্বর আর জোয়ানদের অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছে। আজ তোকে আর তোর এই কচি বাচ্চাকে শেষ করে পীরপুর থেকে চিরতরে তোদের অস্তিত্ব মুছে দেব!”
“আমার বাচ্চার দিকে এক পা এগোলে তোর ছাল গুটিয়ে ফেলব সোবহান!” মরিয়ম বারান্দা থেকে গর্জে উঠল। ওর চোখে আজ কোনো ভীতি নেই, এক সন্তানের সুরক্ষায় বাঘিনীর মতো রূপ ধারণ করেছে বড় বউ!
সোবহান এক ইশারায় ওর লোকগুলোকে এগোতে বলল। দুজন লোক রামদা উঁচিয়ে একযোগে রফিকের দিকে তেড়ে এল!
শুরু হলো এক জীবন-মরণের ভয়ংকর র*ক্তক্ষয়ী লড়াই!
অসুস্থ, র*ক্তাক্ত পা নিয়ে রফিক শেখ লাঠি ঘুরিয়ে বীরত্বে লড়তে লাগল। ওর লাঠির সজোরে আঘাতে প্রথম ডাকাতের রামদা হাত থেকে ছিটকে কাদায় পড়ে গেল। রফিক এক পায়ে ভর দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে লাঠির এক সজোর আছাড়ে দ্বিতীয় ডাকাতকে উঠোনের শক্ত মেঝেই ফেলে দিল!
কিন্তু আঘাতপ্রাপ্ত ডান পা সামলাতে না পেরে রফিক শেখ নিজেই হাঁটু গেড়ে কাদায় পড়ে গেল! ওর উরুর ক্ষত থেকে তাজা র*ক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে কাদাপানিকে লাল করে দিল।
“রফিক!” মরিয়ম ও জাহিদ একযোগে চিৎকার করে উঠল।
জাহিদ ঘরের কোণ থেকে একখানা মোটা মেহগনি কাঠের পিঁড়ি তুলে নিয়ে সোজা সুরাইয়ার দিকে তেড়ে এল, “তোরে আজ আমি নিজেই শেষ করব, তোকে আর বোন বলব না!”
কিন্তু সুরাইয়া চটপটে ভঙ্গিতে সোরে গিয়ে হাতের রামদার উল্টো পিঠ দিয়ে জাহিদের ঘাড়ে সজোরে আঘাত করল! জাহিদ আছাড় খেয়ে রফিকের পাশে কাদায় গিয়ে পড়ল।
সোবহান এই সুযোগে নিজের কোমর থেকে একখানা বিষাক্ত ধারালো ছুরি বের করে হাসিতে রফিকের দিকে এগোতে লাগল, “রফিক শেখ! তোর সততার চ্যাপ্টার আজ এখানেই শেষ! তোর চোখের সামনে আগে তোর এই বউ আর বাচ্চাকে ক-ুপিয়ে নদীতে ভাসাব, তারপর তোকে মার*ব!”
সোবহান যখন ওর ছুরি উঁচিয়ে মরিয়মের দিকে এক পা বাড়াল, ঠিক সেই মুহূর্তে রান্নাঘরের দিক থেকে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল!
হঠাৎ করে অন্ধকারের আড়াল থেকে জাহিদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী শিউলি একখানা জ্বলন্ত খড়গাদার মশাল আর মরিচের গুঁড়ো ভর্তি বাটি নিয়ে চিৎকার করে সোবহানের চোখের ওপর ছুঁড়ে ম-ারল!
“ওরে শয়তানের দল! শেখ বাড়ির ওপর তোর এত বড় নজর!”
“আআআহ্!”
মরিচের গুঁড়ো সরাসরি সোবহানের খোলা চোখে গিয়ে পড়তেই সে যন্ত্রণায় বিকট চিৎকার করে চোখ চেপে ধরল! শিউলির মুখে কোনো ছদ্মবেশ ছিল না, ওর চোখে ছিল নিজের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্তের এক অদ্ভুত উন্মাদনা!
শিউলি চিৎকার করে বলল, “রফিক ভাই! লাঠি তুলুন! আমি শিউলি ভুল করেছিলাম, কিন্তু নিজের ভিটেয় পিশাচদের র*ক্ত বেচতে দেব না!”
পীরপুরের সেই কোণঠাসা মুহূর্তে শিউলির এই আচমকা আক্রমণ সোবহানের দলকে পুরো এলোমেলো করে দিল!
রফিক শেখ নিজের সমস্ত শেষ শক্তি একত্র করে কাদা থেকে উঠে দাঁড়াল। ওর ডান হাতের লাঠিটা বাতাস চিরে সোবহানের ঘাড়ের ওপর সজোরে আছড়ে পড়ল!
“কপ!” শব্দে সোবহানের শরীরটা মাটির সিন্দুকের সামনে কাদাপানিতে লুটিয়ে পড়ল। ওর হাত থেকে বিষাক্ত ছুরিটা ছিটকে গেল।
সুরাইয়া উনার সঙ্গীদের এমন পতন দেখে আতঙ্কে এক পা পিছিয়ে গেল। সে নিজের রামদা ফেলে দিয়ে পেছনের বাঁশঝাড়ের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু মরিয়ম আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে বারান্দায় রাফিকে শাশুড়ি রাবেয়া বেগমের কোলে সঁপে দিয়ে বারান্দার কাঠের ভারী খিলটা তুলে নিয়ে সুরাইয়ার পথ আগলে দাঁড়াল!
“কোথায় পালাচ্ছ সুরাইয়া আপা?” মরিয়মের গলায় বরফশীতল হুংকার। “নিজের র*ক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পিশাচদের ঘরে টেনে এনেছ, তার হিসাব না দিয়ে এই শেখ ভিটে থেকে এক পা-ও নড়তে দেব না!”
মরিয়ম ওর সমস্ত জোর দিয়ে সুরাইয়ার পায়ের ওপর খিল দিয়ে আঘাত করতেই সুরাইয়া উল্টে কাদায় পড়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সাইরেনের বিকট শব্দে পুরো শেখ বাড়ির চারপাশ কেঁপে উঠল!
পীরপুর থানার ওসির নেতৃত্বে প্রকাণ্ড পুলিশ বাহিনী আর সাথে মাতব্বর ইদ্রিস আলী সহ গাঁয়ের শত শত মানুষ মশাল হাতে শেখ বাড়ির উঠোনে এসে হাজির হলো! কাল রাতের সেই ঝোড়ো হাওয়ায় পুলিশ ফাঁড়িতে রফিকের আগে থেকেই পাঠিয়ে রাখা সংকেত অবশেষে কাজ করেছে!
“হাত ওপরে তোলো! কেউ এক পা নড়বে না!” ওসির গর্জন আর পুলিশের রাইফেল উঁচিয়ে ধরার মুখে সোবহান আর সুরাইয়ার পুরো অপরাধী চক্র এক নিমেষে বন্দি হয়ে গেল।
কাদায় লুটিয়ে থাকা সোবহান আর সুরাইয়ার হাতে যখন লোহার হাতকড়া পরা হচ্ছিল, তখন সুরাইয়া এক বিষাক্ত নজরে রফিকের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “রফিক! তুই জিতে গেলি! কিন্তু এই শেখ বাড়ির সম্মান তুই কোনোদিন বাঁচাতে পারবি না!”
রফিক শেখ ওর র*ক্তাক্ত পা নিয়ে ধীরপায়ে সুরাইয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর গলার স্বর ছিল একদম শান্ত, গম্ভীর ও দৃঢ়।
“সুরাইয়া, শেখ বাড়ির সম্মান কোনো মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। আজ আমার বউ মরিয়ম, জাহিদ, এমনকি শিউলি প্রমাণ করে দিয়েছে যে সত্যের জয় সবসময় হয়। তোদের মতো পিশাচদের স্থান এই ভিটেয় নয়, অন্ধকার জেলেই তোদের শেষ ঠিকানা!”
পুলিশ বাহিনী যখন আসামীদের টেনে নিয়ে নদী ঘাটের ট্রলারের দিকে রওনা দিল, তখন ঝুম বৃষ্টিটা ধীরে ধীরে থামতে শুরু করেছে।
ভোরের রক্তিম আলো আশ্বিনের মেঘ চিরে পীরপুর গ্রামের ভিটেয় এসে পড়ল।
রফিক শেখ ধীরপায়ে হেঁটে বড় ঘরের বারান্দায় এল। ওর শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিল।মরিয়ম এগিয়ে এসে রফিকের র*ক্তমাখা পা নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে চেপে ধরল, ওর চোখের কোণ দিয়ে ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু।
রাবেয়া বেগম কোল থেকে ছোট রাফিকে রফিকের হাতে তুলে দিল। রাফি কচি কচি চোখ মেলে ওর বাবার মুখের দিকে তাকাল।
জাহিদ ও শিউলি এক কোণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। রফিক জাহিদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, তারপর শিউলিকে উদ্দেশ্য করে বলল, “শিউলি,,, আজ তুই যদি এগিয়ে না আসতি, তবে হয়তো বড় বিপদ হয়ে যেত। তোদের ভুলগুলোকে আমি আজ এই ভোরের আলোর সাথে ক্ষমা করে দিলাম।”
শিউলি উনার শাড়ির আঁচল চোখে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
মরিয়ম রফিকের পাশে এসে উনার হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
চারপাশের রাতের অন্ধকার শেষের দিকে। সাথে ফুটছে নতুন ভোরে আলো। কিন্তু সূর্যের আলো কি সত্যিই অন্ধকার মিটায়?
“মরিয়ম! বিষয়গুলো গম্ভীর হয়ে গেল। আমাদের দাবার দুই ঘুটিই পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। শিউলিও তো পাল্টি খাচ্ছে?” অন্ধকারে একটা ছায়ার প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে।
মরিয়ম খাটে বসে নিজের ছেলেকে লেখছে। তাকাল না সেই অবয়বে দিকে। ” শিউলি এমনিও কোনো কাজ ঠিক মতো পারে না প্রতিবার ধরা খায়। সবসময় বিবেক জাগে ওর। ওর বিবেকের চক্করে আমরা ফেসে যেতে পারি। ও আমার বাড়ির আসে কাজটা সহজ করল। ওকে আমি মে*রে ফেবল শীগ্রই। আর সুরাইয়া আর সোবহান যদি পুলিশে লাঠির সামনে মুখ খুলে বিপদটা হবে তখন।”
অবয়টা চমকে উঠল। “আসলেই তো তা তো মাথায় আসল না।”
মরিয়ম তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে রাফির দিকে তাকায়। “তোমাদের মাথা আছে যে সেটা কাজ করবে? গরু কারখানা পালি আমি। সব তো আমাকেই ভাবতে হয়।”
সমাপ্তি

