Home "ধারাবাহিক গল্প অবাঞ্চিতা অবাঞ্চিতা পর্ব-৩৩+৩৪

অবাঞ্চিতা পর্ব-৩৩+৩৪

0
244

৩৩.
রাতের নিস্তব্ধতা চারপাশে তখন জেঁকে বসেছে। রাহাতের সামনে কলি বসে আছে। পরনে শুধুমাত্র বড় গলার ব্লাউজ আর পেটিকোট। রাহাতের অবশ্য সেদিকে কোনো আগ্রহ নেই। তার দৃষ্টি মেঝেতে।

কলি অনেকক্ষণ ধরে রাহাতকে পর্যবেক্ষণ করল। রাহাতের বয়স কম। শরীরে ভরা যৌবন। এরপরেও কলির লাস্যময়ী চাহনি, দেহের উত্তাপ এত কাছে বসেও কিভাবে এড়িয়ে চলছে সে?
বোধগম্য হচ্ছে না কলির।

রাহাতের স্থানে অন্য কেউ হলে এতক্ষণে হয়ত কলির প্রতিটি অঙ্গে নিজের মুখ ডুবিয়ে দিত। তীব্র ঘন নিঃশ্বাস ধাক্কা খেত ঘরের প্রতিটি দেয়ালে।

কলি তার জীবনে কত রকমের পুরুষ দেখেছে। কিন্তু রাহাত তাদের মত নয় কেন? যেন সে একদম ভিন্ন প্রজাতির। তার এই ভিন্নতায় কলিও কেমন যেন লজ্জা পেয়ে গেল। কলির মনে হচ্ছিল এই পবিত্র লোকটার সামনে অর্ধনগ্ন অবস্থায় থাকলে তার পাপ হবে৷

ভাঙ্গা আলমারি থেকে একটা সুতির শাড়ি বের করে যত্নের সহিত গায়ে জড়িয়ে নিল সে।

এরপর রাহাতের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

– স্যার, আপনে কিছু খাবেন? এই গরীবখানায় অবশ্য চা বিস্কুট ছাড়া আপনারে কিছু সাধতেও পারুম না।

রাহাত দৃষ্টি মেঝেতে স্থির রেখেই মৃদু হাসল।
বলল,
– ধন্যবাদ, কলি। আমি এখন কিছু খাব না। আর একটা কথা, আমাকে স্যার বইল না। কেউ শুনে ফেললে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। বুঝলা?

– জ্বি, স্যার।
কথাটা বলা মাত্র কলি জিভে কামড় দিল।

রাহাত চোখ পাকিয়ে তাকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সমাপ্তি ঘটল সামান্য উচ্চ হাসিতে।

– আমাকে ছাড়া খুব হাসাহাসি হচ্ছে, দেখি!

পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে রাহাত মুখ তুলে চাইল। পরমুহূর্তেই সারথি প্রবেশ করল ঘরে। পরনে কালো বোরকা। রাহাতের চোখেমুখে দৃশ্যমান হল উচ্ছ্বাস। সে শুধালো,

– এই বোরকা কই থেকে ম্যানেজ করলি তুই?

– এক বান্ধবীর থেকে ধার নিয়েছি, দাদা।

– তোর বান্ধবী জানে তো, তুই ধার নেওয়া জিনিস ফেরত দিস না?

সারথি মুখ ভেংচি কেটে বলল,

– দেশের জন্য আমার বান্ধবীরা ওদের জীবনও উৎসর্গ করতে পারে। আর এটা তো পরিধানের বস্তু।

সারথি রাহাতের পাশে বসতে বসতে একফাঁকে কলির দিকে তাকাল। হাসিমুখে বলল,

– তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন, বোন? বসো।

কলি খানিকটা ইতস্তত করে বলল,

– আপনাদের পাশে বসুম?

সারথি বিস্মিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,

– কেন আমরা কি বাঘ-সিংহ নাকি? তোমায় খেয়ে ফেলব?

কলির চোখ ভিজে উঠল। বলল,

– আমার মত বাজাইরা মাইয়া আপনাগো মত সম্মানিত মানুষের পাশে বসলে জাত থাকব?

সারথি কলির হাত টেনে নিজের পাশে এনে বসালো। রাহাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

– এই মেয়েটা না থাকলে, এত জলদি কোনো তথ্যই সংগ্রহ করতে পারতাম না। নারী পাচারের খবর শুনে যখন তেঘরিয়াতে আসি খোঁজ নিতে তখন কলিই আমাকে সব খোলসা করে বলেছে। প্রথমবার এই বস্তিতে কলির হেফাজতেই মেয়েগুলোকে রেখেছিল।

রাহাত প্রথমবারের মত কলির দিকে ভালোভাবে তাকাল। গালে হাসি ঝুলিয়ে বলল,

– তোমার কোনো ধারণা নেই কলি, তুমি আমাদের কত বড় সাহায্য করছ। তুমি কোনো সাধারণ মেয়ে নয়। তুমি একজন যোদ্ধা।

– যোদ্ধা?
কলি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রাহাতের দিকে।

– হ্যাঁ। যোদ্ধা। যারা দেশের স্বার্থে কাজ করে, দেশকে নতুন করে গড়তে নিজের জীবন নিয়ে ঝুঁকির সম্মুখে ঝাঁপিয়ে পাড়ে, তারাই যোদ্ধা।

কলি চুপ করে রইল। আজীবন মানুষের সংসার ভাঙ্গার জন্য নীরবে নিজেকে ঘেন্না করে গেছে সে। চারুলতার মত নিষ্পাপ একজন মেয়ের বাসর রাতও সে ভস্ম করেছে।
সে ধ্বংস ছাড়া কখনো গড়তে জানবে এ তো অলীক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়!

কলির চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। সারথি কলির বাহু নিজের নিকটে নিয়ে শুধাল,

– কাঁদছ কেন পাগলি মেয়ে?

– আমি অনেক খারাপ কাম করছি জীবনে, আফা। কখনো কোনো ভালো কামে অংশ নিতে পারুম ভাবি নাই। আমি আইজকা অনেক খুশি।

রাহাত করুনার চোখে তাকাল কলির দিকে। মেয়েটার মন খারাপ তার সহ্য হল না। গম্ভীর পরিবেশে পরিবর্তন আনতে রাহাত বলল,

– কলি, এখন মনে হয় একটু চা খাওয়া প্রয়োজন। আমার আর সারথির জন্য দু কাপ চা নিয়ে আসতে পারবে?

কলি সাথে সাথে চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। বলল,

– এক্ষুনি দিতাছি।

কলি সময় নষ্ট করল না। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ঘরের দেয়ালে হারিকেন ঝুলছে। দূর থেকে ক্ষনে ক্ষনে ভেসে আসছে ক্ষীণ আরামদায়ক চিৎকার। রাত যত গভীর হয়, পতি/তালয় ঠিক তত জেগে উঠে। জমজমাট হয়ে উঠে দেহ ব্যবসা।

রাহাত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এলোমেলো ভাবে পায়চারি করতে লাগল ঘরময়। সারথির কপালে মৃদু ভাঁজ পড়ল। সে জানে রাহাত যখন কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করে তখন এলোমেলো ভাবে হাঁটতে থাকে।

– কি হয়েছে, দাদা? সব ঠিক আছে তো?

রাহাত থমকে দাঁড়াল। মাথা নেড়ে বলল,

– কিচ্ছু ঠিক নেই সারথি। জায়গাটায় আমাকে চোখ বেধে নিয়ে গিয়েছে। ফিরেছেও চোখ বাধা অবস্থায়। প্রজেক্টের একচুয়াল লোকেশনটা কোথায় আমি জানি না।

সারথি আঁতকে উঠল। বলল,

– কি বলছিস, দাদা? তোকে সন্দেহ করছে নাকি?

– সন্দেহ করছে এমনটা নয়। কিন্তু ওই বেটা তালুকদার, জাউরা শালা। বলে নাকি ওর বিশ্বাস অর্জন করতে হলে ওর মত হারামি হইতে হবে। ভাবা যায়?

সারথি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,

– বিশাল বড় সমস্যা হয়ে গেল।

– তা তো বটেই। যদিও কিছু তথ্য আমি তোকে দিতে পারব।

– যেমন?

– তালুকদার বাড়ি থেকে ওই স্থানের দূরত্ব এপ্রোক্সিমেটলি চল্লিশ মিনিট হবে। আর আমার যতদূর মনে হচ্ছে তেঘরিয়ার সীমান্তবর্তী কোনো এলাকাতে ওদের রাখা হয়েছে। তোর খোঁজ নিতে হবে। এই সমস্ত অপরাধমূলক কাজ সচরাচর পরিত্যক্ত কোনো স্থানেই সংগঠিত হয়।

সারথি সব কিছু বুঝে ফেলেছে এমনভাবে মাথা ঝাঁকাল। রাহাত হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলল,

– একবার শুধু লোকেশনটা খুঁজে পাই। তালুকদারের ওইটা আমি ছিঁড়ে ফেলব।

সারথি ফিঁক করে হেসে ফেলল।

– শুধু তালুকদার কেন? ওর বড় ছেলের দিকেও তোর নজর দেওয়া উচিত, দাদা।

– বড় ছেলের এমনেই দুই বউ নিয়ে আধ পাগল অবস্থায় আছে। ওকে আলাদাভাবে কিছু করার প্রয়োজন নেই।

সারথি ভ্রুঁ কুঁচকে শুধালো,

– দুই বউ মানে?

– এ আরেক কিচ্ছা কাহিনী। তুর্জয়ের প্রথম বউ নাকি হুট করে ফিরে আসছে!

– এটা কিভাবে সম্ভব? ওর প্রথম বউকে তো তুর্জয় আর তালুকদার মিলে মে/রে ফেলেছিল। পুরো গ্রামবাসী জানে।

– না, আপা। পুরা গ্রামবাসী মিথ্যা জানে। এইডা সত্য ঘটনা না।

হাতে দুটো চায়ের কাপ নিয়ে কলি ঘরে ফিরে এলো। মুচকি হেসে বলল,

– নাহিদা আপারে মারে নাই।

রাহাত বিস্মিত সুরে জিজ্ঞাসা করল,
– তুমি কিভাবে জানলে?

– আলী মাঝির কাছে শুনছি। নাহিদা আপারে সে তালুকদারের নির্দেশে দূরের অন্য এক গ্রামে রাইখা আসছিল। এরপরেই চারুলতার সাথে বড় পোলার আবার বিয়া দেয়। আমি তালুকদার মশাই রেও দেখছি আলী মাঝির নৌকায় চইড়া ওই গ্রামের দিকে যাইতে। ক্যারা জানে পোলার বউয়ের সাথেও ওই জানোয়ারের বাচ্ছা বা/সর করছিল কিনা! দুনিয়ার সব মেয়েরেই তো সে বউ মানে।

সারথি জিভে কামড় দিয়ে বলল,
– ছিঃ ছিঃ কি বলছ এসব কলি? তাই বলে নিজের ছেলের বউয়ের সাথে?

– আফা, হের কাছে মাইয়ারা মানুষ না। রাতের খেলনা। খেলবার পারলেই হইল। গ্রামের কত বিধবা, অনাথ বাচ্চাগুলার সাথে আকাম করছে হিসাব নাই।

কলি চায়ের কাপ এগিয়ে দিল রাহাতের দিকে। রাহাত কাপে চুমুক দিয়ে বলল,

– আই সি! তাহলে আবার নাহিদারে ফেরত নিয়া আসার কারন?

কলি গানের পেছনে গুঁজে রাখা সস্তা বিড়ি বের করে ধরালো। এরপর খানিকটা লজ্জামিশ্রিত গলায় বলল,

– বেয়াদবি নিবেন না স্যার। বিড়ি না খাইলে আমার মাথা ধরে। খারাপ নেশা। আপনাগো একটা দিমু?

রাহাত মাথা ঝাঁকাল।
– না। তুমি নাহিদার ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বল তো!

– নাহিদা আপায় যখন পোয়াতি, তখন প্রতি রাতে তুর্জয় তালুকদার আমার কাছে আসত শরীরের ক্ষুধা মেটাইতে। চারুলতার লগে বিয়ার পর পরও কয়েকদিন আসছে। কিন্তু…

‘কিন্তু কি কলি?’ – আগ্রহভরে জানতে চাইল সারথি।

– তার মত দেহ/লোভী মানুষ আচমকা আসা বন্ধ কইরা দিল। একদিন শুধু আসছিল মাইয়াগুলারে নিয়া কথা কইতে। আমারে ছুঁইয়াও দেহে নাই। মনে হইল বউরে ভালোবাইসা ফেলছে।

রাহাত কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল৷ মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো,

– এরকম মেয়েকে কেউ ভালো না বেসে থাকতে পারে নাকি?

সারথি আর কলি মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিল। এরপর একযোগে রাহাতের দিকে তাকাল। সারথি মৃদু গলায় ডাকল,

– দাদা?

রাহাত চমকে উঠল। ঘটনা খানিকটা আঁচ করতে পেরে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,

– মেয়েটা কি সাহসী না? এরকম সাহসী মেয়েরা নরপিশাচদেরও একদম সোজা করে ফেলতে জানে। গতকাল মাঝরাতে আমার গলায় ছুঁড়ি ধরেছে জানিস? আমি তালুকদারের লোক কিনা, কেন গ্রামে এসেছি জানতে চেয়েছে। ওই জাউরার লোক হলে বোধহয় মেরেই ফেলত।

সারথি আরোও অবাক হল।
– বলিস কি? তুই তোর আসল পরিচয় দিয়েছিস?

– না। তবে এটুকু বলেছি আমি তালুকদারের লোক নই। আমি চাইছি ওকেও আমাদের মিশনে সামিল করতে।

– এখনি কিছু বলিস না, দাদা। প্রয়োজন হলে দেখা যাবে।

– আমিও সেটাই ভেবে রেখেছি।

সারথি এবার এক গাল হেসে বলল,

– মেয়েটার সাহস আছে বল? অচেনা একজনের গলায় ছুঁড়ি ধরেছে।

রাহাত বেশ জোরেসোরে শ্বাস ছাড়ল। বলল,

– তা আর বলতে! হাঁফ ছেড়ে বেচেছি গতকাল। আরেকটু হলেই কল্লা যেত।

– তুই যে এতক্ষণ এখানে আছিস। বাড়িতে কি বলে এসেছিস? সন্দেহ করবে না?

– কি আর বলব। নারী দেহের টানে ছুটছি।

– তা বুড়ো তোর কথা বিশ্বাস করল?

– বলেছি টুনটুনিতে জং ধরেছে। পরিচর্যা প্রয়োজন। তাই ওতো মাথা ঘামায় নি। আজ দুপুরে ও বাড়িতে আবার সুনামগঞ্জের পার্টি এসেছিল। ওদের কাছে অলরেডি খবর গিয়েছে ইনভেস্টিগেশনের। তা নিয়েই জাউরা মশাই বেশ বিচলিত।

সারথি মাথা চুলকে বলল,

– সবই ঠিক আছে, কিন্তু টুনটুনি পরিচর্যার বিষয়টা বুঝলাম না।

রাহাত হালকা কেশে বলল,
– ওটা আমার আর জাউরা মশাইয়ের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা। তোর না জানলেও চলবে। তুই বাচ্চা মানুষ।

এসব কথোপকথনের কোনোটাই কলির বোধগম্য হল না। তাই মুখে ভ্যাবাচেকা মার্কা হাসি ঝুলিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সে।

*********

‘খবরদার! আমারে স্পর্শ করবি না। আমি তোরে তালাক দিমু।’

তুর্জয়ের মুখে এমন কথা শুনে আঁতকে উঠল নাহিদা। শরীরের কাপড় আলগা করে মাত্রই তুর্জয়ের গায়ে সোহাগের চিত্র আঁকতে চাইছিল সে। কিন্তু একটি মাত্র কথায় অনাগত সুখের মুহুর্তে যেন ধূসর ছাই জমল। সে বিস্মিত স্বরে শুধালো,

– তালাক দিবেন?

– হুঁ।
তুর্জয়ের কণ্ঠস্বর হিমশীতল।

নাহিদা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। উপরন্তু, তুর্জয়ের কণ্ঠস্বরের শীতলতা তাকে যেন হিমায়িত করল।

– কি কইতাছেন এসব?

– যা বলতেছি সত্যি বলতেছি। আমি অনেক চিন্তা কইরা দেখলাম। আমি কি চাই!

– কি চান?
ভীতগ্রস্ত নাহিদা জানতে চাইল।

– আমি আমার ‘বাইলা মাছ’ রে চাই।
তুর্জয়ের গলার স্বর এবারো স্বাভাবিক শোনালো।

নাহিদা আরোও অবাক হল। চোখজোড়া বড় বড় করে জানতে চাইল,

– বাইলা মাছ কে?

– আমার চারুলতা।

নাহিদা আকুতি মিনতি করতে লাগল।

– ওর প্রতি আপনার শুধু মোহ। আপনি ওর লগে একান্ত সময় কাটাইতে চাইলে কন আমারে। আমি বাধা দিমু না। কিন্তু আমারে তালাক দিবেন, এসব কইয়েন না।

– মোহ তোর প্রতি ছিল। তোর শরীরের প্রতি ছিল। চারুলতারে আমি সব ভাবে নিজের কইরা চাই। ওর মন, দেহ সব আমার চাই। তার জন্য যদি তোরে তালাক দেওয়া লাগে, আমি তাও দিমু।

তুর্জয় উঠে দাঁড়াল। নাহিদা স্ত্রীর অধিকার নিয়ে জোর খাটাতে চাইল। তাতে বিশেষ কোনো লাভ হল না। তুর্জয় নিজেকে নাহিদার বাহু থেকে ছাড়িয়ে নিল। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

চারুলতা তখন অতিথি ঘরের দরজায় মাথা ঠেকিয়ে নিস্তব্ধ রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করছিল। লক্ষাধিক তারকারাজির মাঝে চাঁদ যেমন একাকিত্বে ভোগে, তার ভোগান্তিও অনুরূপ। হেমন্তের বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো উড়ছিল তার।
মনে পড়ছিল তার বাবাকে। মাকে। সোনলতাকে!
সহসা তার চোখ পড়ল মূল বাড়ির বারান্দায়।

একজন সুঠাম দেহের পুরুষ লুঙ্গি উচিয়ে এদিকটায় আসছে। চাঁদের ক্ষীণ আলো পড়েছে তার মুখে। তুর্জয় তালুকদার!
এত রাতে প্রথম স্ত্রীকে ফেলে এদিকে কেন আসছে?

চারুলতা সময় নষ্ট করল না। ঘরে ঢুকে দরজা ভিড়িয়ে দিল। তুর্জয়ের ছলনায় সে আর পড়বে না।

তুর্জয়ও নাছোড়বান্দা। সে অতিথিঘরের দরজার সামনে এসে দরজায় টোকা দিল বেশ কয়েকবার। কোনো সাড়া নেই। অথচ মাত্রই সে চারুলতাকে দেখেছে বারান্দায় বসে থাকতে। তার আগমনে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে সে। তুর্জয় মৃদু স্বরে ডাকল চারুলতাকে।
– চারু?

প্রত্যুত্তরে চারুলতা উপহার দিল নীরবতা। সে মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইল। তুর্জয় পুনরায় বলল,

– চারু, দরজাটা খোল। বিশ্বাস কর আমি তোরে স্পর্শ অব্দি করুম না। আমারে শুধু তোর চেহারাটা দেখার সুযোগ কইরা দে। আমি সারা রাত তোর চেহারা দেইখা কাটায়া দিতে পারুম।

চারুলতা এবারো কোনো উত্তর দিল না। নিজের অভ্যন্তরীণ অনুভূতিকে সে পরোয়া করে না। তার বয়স পঞ্চাদশ না পেরোলেও, বাস্তবতা এবং অভিজ্ঞতা মিলে মনের বয়স ঢের বাড়িয়ে দিয়েছে।

অতি আবেগে, যত্নের সহিত যে ভালোবাসা সে স্বামীর জন্য বুনেছিল – তার সূতো ছিঁড়ে গেছে৷
অনুভূতি গুলো মুক্ত ঘুড়ির মত উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে। চারুলতা আর সে অনুভূতির নাটাই ধরতে চায় না। তার জীবনে অনাগত সন্তান ছাড়া আর কাউকে সে ঠাঁই দিবে না। তার জীবনের গল্পে মূল চরিত্র সে নিজে। নিজ সংসার থেকে বিতাড়িত এক অবাঞ্ছিতা।

চারুলতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বালিশে মুখ লুকালো। নিজের অশ্রুসিক্ত চোখ সে নিজেকেও আর দেখাতে চায় না।

তুর্জয় চারুলতার ঘরের বাইরে বসে পড়ল। সে আজ এ ঘরের বাহিরেই থাকবে। অন্য কোথাও যাবে না। পাপের উত্তাল সমুদ্রে গা ভাসিয়ে চলা তুর্জয়ের কাছে এটুকু প্রায়শ্চিত্ত আজ নগন্য বলে মনে হচ্ছে না। এই যে চারুলতার এত কাছে থেকেও সে ধরা ছোঁয়ার বাহিরে – এতে তার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। এ কয়দিন তার জন্য না জানি মেয়েটা কত আহাজারি জমিয়ে রেখেছিল ওই নিষ্পাপ মনে।

কালেভদ্রে তুর্জয়ের চোখে জল জমেছে। তাও সে জল চোখের পাতা অতিক্রম করে নি৷ আজ সেই নথি ভঙ্গ হল তার। অশ্রুধারা ভিজিয়ে দিল তার অযত্নে বেড়ে ওঠা উষ্কখুষ্ক দাঁড়িগুলো। ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠল বুক। অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

– পেটের ক্ষুধা আমি সহ্য করতে পারি। কিন্তু তোরে দেখার ক্ষুধা আর এক মুহুর্তও সহ্য হইতাছে না রে, চারু!

তুর্জয় একইভাবে বসে রইল। রাতের আঁধার ছাপিয়ে আজ ভোর হতে দেখবে সে। মেপে নিবে অপেক্ষার প্রহর কতটা বেদনার হয়!

উপন্যাসঃ #অবাঞ্ছিতা
লেখিকা, #আতিয়া_আদিবা

৩৪.
চারুলতার সারারাত একফোটা ঘুম হল না। পাওয়া না পাওয়ার হিসেব মেলাতে মেলাতে এক বিনিদ্র রজনী কেটে গেল। কারো দৃষ্টিগোচর হল না তার চোখের জল। কেউ বুঝল না মনের ভেতর কতখানি ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছে সে।
বার কয়েক মনে হয়েছে বাহিরে উঁকিঝুঁকি মারবে। মানুষটা কি এখনো একইভাবে বসে আছে ঘরের বাহিরে?

পরক্ষণেই রাগে, ক্রোধে মনের ইচ্ছাকে জীবন্ত কবর দিয়েছে সে। আর কত সহ্য করা যায়? আর কত সুযোগ দেওয়া যায়? এবার যদি সে সুযোগ দেয় তবে কি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না?
নিজের আবেগের সাথে সারা রাত লড়াই করে গিয়েছে চারুলতা। তবুও মাথা নত করে নি।
অবাঞ্ছিতারা বোধহয় একসময় শিরদাঁড়া উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে শিখে যায়।

তুর্জয় এখনো বাড়ির বাহিরে একইভাবে বসে আছে। অংশুমালীর উদয় এখনো ঘটে নি। চারিদিকে সবে মাত্র নতুন ভোরের আগমনী বার্তা।
ঝিরিঝিরি বাতাস। তিরতির করে নড়ছে গাছের রঙিন পাতাগুলো। এখন পাতা ঝরার দিন। শুকনো, মৃত পাতাগুলোও বাতাসের খস খস করে উড়ে বেড়াচ্ছে। পাখিরাও জেগে উঠেছে।

তুর্জয় ভালো করেই জানে ঠিক কোনসময় চারুলতার ঘুম ভাঙ্গে। কম দিন তো এলোমেলো শাড়ির আঁচল নিয়ে তার লোমশ বুকের গহীন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় নি। পিটপিট করে চেয়ে থেকেছে ক্ষণকাল। তুর্জয়ের নড়াচড়া বন্ধ হলে চুপটি করে চুমু এঁকেছে ঠিক বুকের মধ্যিখানে। যেন এই জায়গার একমাত্র মালিক চারুলতা। অথচ কত নারী স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় তুর্জয়ের এই ঘর্মাক্ত বুকের ঘ্রাণ নিয়েছে। কত নারীকে জোরপূর্বক বুকে জড়িয়ে রেখেছে সে নিজেও।

অতীতের অনুতাপকেও ছাড়িয়ে গেছে তুর্জয়ের বর্তমান অনুশোচনা। চারুলতাকে দেওয়া কথাগুলোর চেয়ে কি নাহিদার আবেদনময়ী চেহারার ভার ঢের ছিল? কিভাবে আসক্ত হল সে?

নাহিদা তো চারুলতার মত তাকে একরাশ অনুভূতি নিয়ে জড়িয়ে ধরতে জানে না! শুধুমাত্র নিজের বলে অধিকার খাটিয়ে চুমু আঁকতে জানে না। তার মাঝে একফোটা বিবেকের বীজ বুনতে পারে নি সে। কিন্তু চারুলতা?

পঞ্চাদশী কণ্যার রূপের ছটায় গোটা তালুকদার বাড়ির অন্ধকার ঘুঁচলেও, লাস্যময় দেহ নেই। তবুও তুর্জয় তার অভ্যাস ভুলে অতি সাধারণ, ঘর্মাক্ত দেহের প্রতি বিমোহিত হল।

আজ তুর্জয় দারুণ বুঝতে পারছে, সে শরীরে আসক্ত হয় নি। আসক্ত হয়েছে ‘চারুলতা’ এর অস্তিত্বে। তার প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসে। প্রতিটি ঘামের বিন্দুতে। প্রতিটি লোমকূপের গহীনে। চারুলতার সুরভিতরঙ্গে।

প্রতিদিনকার মত সূর্যের রশ্মি মর্তে পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহুর্তে চারুলতা অতিথিঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চোখে চোখ পড়ল তার তুর্জয়ের সাথে। কলিজাটা ধক করে উঠল তার। সারা রাত না ঘুমিয়ে এখানে বসে ছিল উনি?

চারুলতা বুকের তোলপাড় বাহিরে আসতে দিল না। স্বাভাবিকভাবে চুল খোপা করল। এরপর কলপাড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।

তুর্জয় মৃদু স্বরে ডাকল,

– কথা বলবি না আমার সাথে চারু? আমার ওপর তোর এত রাগ?

চারুলতা চোখমুখ শক্ত করে ফেলল। মুখের কুলুপ অক্ষত রাখল। ক্ষণিককালের জন্য থমকে দাঁড়ালেও, পুনরায় তার পা-জোড়া গতি ফিরে পেল।

তুর্জয়ও উঠে দাঁড়াল। অনুসরণ করতে লাগল চারুলতাকে। সহসা, দ্বিতীয় অতিথিঘরের দরজা খুলে গেল। হাই তুলতে তুলতে রাহাত বেড়িয়ে এলো। এখনো দুচোখে ঘুম আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। সে চারুলতাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– কাকপক্ষী জাগার আগে উঠে গেছেন দেখছি।

চারুলতা মৃদু হাসল। সন্তপর্ণে গায়ের আচল আরোও টিপটপ ভাবে জড়িয়ে নিলো বাহুর চারিপাশে। এরপর পুনরায় এগিয়ে যেতে লাগল।

– মাথাটা খুব ধরেছে। এক কাপ আদা চা পাওয়া যাবে?

রাহাত মাথা চুলকে শুধালো। চারুলতা ঘাড় কাঁত করে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল। তুর্জয় এতক্ষণ আড়ালে ছিল। মাত্র ঘটে যাওয়া বিষয়টি তার ভালো লাগল না। সে এগিয়ে এসে রাহাতের সামনে দাঁড়াল। বাজখাঁই গলায় বলল,

– কাকপক্ষী জাগার আগেই চা ঠুসতে মন চাইছে আপনার?

রাহাত কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তবে তুর্জয়কে সেটা বুঝতে দিল না। সে হাসি হাসি মুখ করে বলল,

– আরে বদ্দা! আপনি দেখি এখনো একই স্থানেই আছেন। তা বড় ভাবি আপনাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল নাকি ছোট ভাবির ঘরে ঠাঁই জুটে নি?

রাহাতের মুখে এহেন কথা শুনে তুর্জয় রাগে ফোঁস করে উঠল। বলল,

– ওই মিয়া সকাল সকাল ফাইজলামি করেন নাকি?

– এ বদ্দা.. না না না! এসব আমি করি না। সাদা মনে প্রশ্ন জাগল তাই জিজ্ঞাসা করলাম। ভুল হলে মাফ করবেন।

রাহাত জিভে কামড় দিয়ে বলল।

‘সাদা মন?’ তুর্জয় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

– সারা রাইত বস্তিতে কাটাইয়া মনের সাফাই গাইতাছেন?

চারুলতার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে আঁড়চোখে তাকাল রাহাতের দিকে।

রাহাত কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই পুনরায় তুর্জয় গালে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে শুধালো,

– তা কেমন লাগল বস্তির রাণীদের স্বাদ? মন ভরছে তো?

এবার রাহাতও চারুলতার দিকে তাকাল। মেয়েটার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি এখনো তার পানে স্থির। অবিশ্বাসেরা খেলা করছে সেথায়।

রাহাত চারুলতার দৃষ্টি উপেক্ষা করে উত্তর দিল,

– মনটা ভরে গেছে, বদ্দা। অতুলনীয় স্বাদ। আগে জানলে প্রথম দিনই ওই বস্তিতে হানা দিতাম।

তুর্জয় হাসল। এবার চারুলতার উদ্দেশ্যে বলল,

– মেহমানরে যেহেতু চা দিতাছস, আমারেও দিস।

একথা বলে তুর্জয় মূল বাড়ির বারান্দার দিকে অগ্রসর হতে লাগল৷ তার গালে ঝুলে আছে বিস্তৃত হাসি। চারুলতার সংস্পর্শে সে কোনো পুরুষকে আসতে দিবে না।
রাহাতের সাথে তুর্জয়ের পরিচয় হয়েছে গতকাল দুপুরে। সুনামগঞ্জের নেতাবৃন্দ যখন এসেছিল তখন। কথাবার্তা বলে সুবিধার বলে মনে হয় নি। অবশ্য সুবিধার লোকজন এই কাজের যোগ্য নয়।

চারুলতার চোখের কোণে রাহাতের জন্য ঘৃণা জমল। সে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল। জোরে হাঁটা শুরু করল। মনে মনে ভাবতে লাগল, রাহাতকে তার মেরে ফেলা উচিত ছিল।

হাতমুখ ধুয়ে রান্নাঘরে গেল চারুলতা। প্রথমে আদা চা বানিয়ে এরপর দুধ চায়ের সরঞ্জাম একত্র করে চুলায় বসিয়ে রাহাতের ঘরে গেল সে।

রাহাত তখনও ভাবছে, কিভাবে চারুলতার তীক্ষ্ণ চোখ মোকাবেলা করবে সে। মেয়েটার মনে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে অবজ্ঞা জন্মেছে। আর তুর্জয়ের মনে জন্মেছে সন্দেহ। একজন পুরুষ অন্য পুরুষের অভ্যন্তরীণ অনুভূতি আঁচ করতে পারে।
গতকাল যখন চারুলতা দুপুরে খাবার পরিবেশন করছিল, বেশ কয়েকবার চোখাচোখি হয়েছে তার সাথে। বিষয়টি হয়ত তুর্জয়ের দৃষ্টি এড়ায় নি। সন্দেহ নির্দিধায় জেঁকে বসেছে তার মাঝে।

চারুলতার আগমনী বার্তা রাহাতের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিল। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে। চারুলতা তার দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

– এক মুহুর্তের জন্য মনে হইছিল, আপনি বোধহয় সত্যিই তালুকদারের লোক না। আমারে মিথ্যা ক্যান বললেন? শুধুমাত্র বাঁচার জন্য?

রাহাত চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল,

– আমি আপনাকে যা বলেছি সত্যি বলেছি।

– তাইলে বস্তিতে আপনে কার কাছে গেছিলেন?

– যার কাছে গিয়েছিলাম তাকে আপনি চিনেন।

চারুলতা কম্পিত গলায় শুধালো,

– কার কাছে?

রাহাত কিছু বলল না। চুক চুক করে চা খেতে লাগল।

– শরীর পাইলে আপনিও নিজেরে ঠিক রাখতে পারেন না তাই না?

রাহাত এবারোও প্রশ্নের উত্তর দিল না।

জিদে, রাগে চারুলতার চোখে জল জমল। সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,

– আপনার লগে এই বাড়ির কারো অমিল নাই। আপনিও আমারে ধোঁকা দিছেন।

চারুলতা একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাহাত ভারাক্রান্ত মনে ওর চলে যাওয়া দেখল। সন্তপর্ণে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল,

– চারুলতা, তোমায় কিভাবে বোঝাই? ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়েও যে দায়িত্বের ভারটা বিশাল বড়! তুমি ভুল বুঝলেও, সেই ভুল ভাঙ্গানোর কাজটা আমার অনিচ্ছায় ছুঁড়ে ফেলে দিতে হচ্ছে। মানুষ বলে অপেক্ষার ফল নাকি মিষ্টি হয়। আমি না হয় সেই ফলের আশায় অগুনিত রাত পোহাবো!

এরপর চারুলতা তুর্জয়ের ঘরে চা দিয়ে রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ক্ষণিককাল বাদে অন্যান্য দিনের মতই মাজেদা এলো, জোহরা এলো। রান্নার আয়োজন করতে লাগল তারা।

নাহিদা সারারাত ভরে শুধুমাত্র এই সময়টুকুর প্রতীক্ষায় মগ্ন ছিল। কখন তালুকদার মশাই এর ঘর ফাঁকা হবে। মাজেদা ঘর থেকে বেরিয়েছে দেখা মাত্রই সে সুযোগ লুফে নিল।

তালুকদার মশাই আরেকটু বেলা পেরোলে উঠেন। তবে আজ ব্যতিক্রম ঘটেছে। কারণ, বৈদ্য আসার কথা। শরীরের ভাবসাব তিনি ঠাহর করতে পারছেন না। বৈদ্যের কথানুযায়ী তালুকদার একের পর এক কুমারী মেয়েদের শিকা/র করছেন। তার মন্দ লাগছে ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু পুরোপুরি আরোগ্যের গন্তব্যে পৌঁছাতে আর কতদিন বাকি তাও তো জানা প্রয়োজন নাকি?

বিছানায় আয়েশ করে আধশোয়া অবস্থায় ছিলেন তালুকদার। এমন সময় ঘরে নাহিদা প্রবেশ করল।

তালুকদারের কপালে ভাঁজ পড়ল। এত সকালে নাহিদা কেন তার ঘরে আসবে?

নাহিদা ঘরে ঢুকে সোজা তালুকদারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চেহারায় অস্থিতিশীলতা। গাঢ় দুশ্চিন্তার ছাপ চোখের নিচে।

– আব্বা?

– হুঁ?

অক্ষিজোড়া বুজে সাড়া দিল তালুকদার।

– আমার সর্বনাশ হইয়া গেছে।

তালুকদারের ভ্রুঁ আরোও সংকুচিত হয়ে এলো।

– কেন? কি হইল আবার?

– আপনার পোলা আমারে তালাক দিবার চায়, আব্বা।

তালুকদার চোখ মেলল। নাহিদার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল।

– আপনার পোলা ছোট বউরে নিয়া সংসার করবার চায়। আমারে তালাক দিবার চায়। আব্বা, কিছু একটা করেন।

তালুকদার পুনরায় চোখ বুজল। স্বাভাবিক গলায় বলল,

– এমনেই বলছে। ঠিক হইয়া যাবে। চিন্তা করবার মত কিছু হয় নাই।

নাহিদা ভারী গলায় বলল,

– আব্বা, আপনে বুঝতাছেন না। সে সারা রাইত চারুলতার ঘরের বাহিরে বইসা ছিল। একটু আগে নিজের ঘরে আসছে।

– কি বললা?

এবার তালুকদারের গলায় খানিকটা উদ্বেগ ধরা পড়ল।

– হ। সে আমারে তালাক দিয়া চারুলতার সাথে সংসার করতে চায়। আপনে আমার সংসারটা বাঁচান আব্বা।

তালুকদার ক্ষণিককাল চুপ করে রইলেন। জানালার ভারী পর্দা ঠেলে সকালের নরম সূর্যের আলো তেমন একটা প্রবেশ করতে পারছে না। তবুও সে উঁকিঝুঁকি মেরে বাইরে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করলেন। উঠোনে লোক জমতে শুরু করেছে। গতকাল বহু মানুষ মূল ফটক থেকেই ফিরে গেছে। তারাও আজ সকাল সকাল আঙিনায় এসে অপেক্ষা করছে।

তালুকদার হাই তুললেন। স্বাভাবিক গলায় বললেন,

– ঘরে যাও, নাহিদা।

নাহিদা এক চুলও নড়ল না। কঠিন গলায় বলল,

– আপনে যদি এর একটা বিহিত না করেন, তাইলে আপনার বড় পোলারে আমি বইলা দিমু কিসের বিনিময়ে আমারে এখনো বাঁচাইয়া রাখছেন আপনে।

তালুকদার হিংস্র চোখে নাহিদার দিকে তাকালেন। থমথমে গলায় বললেন,

– তোমার অনেক সাহস হইয়া গেছে তাই না?

– আমি খুব কাছের থিকা মরণ দেখছি, আব্বা। আমার মনে আর ভয় ডর নাই। নিজের সম্মান আপনের কাছে বলি দিয়া জীবন ভিক্ষা নিছিলাম। শুধুমাত্র জান বাঁচানো ফরয বইলা। ভুল করছি আমি। গ্রামের লোকজনের কাছে নিজেরে মহান দাবী করার জন্য আপনে চারুলতার মত এক রত্তি মাইয়ারে এ বাড়ির বউ কইরা আনছেন। পোলা হাত ছাড়া হইয়া যাইতাছিল দেইখা আবার আমারে ফিরাইয়া আনলেন! এখন চারুলতা পোয়াতি বইলা আপনে চুপ কইরা আছেন। আপনার এসব চাল আমি বুঝি, আব্বা।

তালুকদার মশাই মৃদু হাসলেন।

– মুখে দেখি অনেক বুলি ফুটতেছে তোমার আজকাল!

নাহিদা কঠোর স্বরে বলল,

– আপনার পোলা যদি আমারে তালাক দেয়, আপনার কুকীর্তি আমি গোটা গ্রামবাসীগো জানাইয়া দিমু। এই বইলা রাখলাম।

তালুকদার মশাই একদমই বিচলিত হলেন না। বরং গালে একই হাসি ঝুলিয়ে রেখে উত্তর দিলেন,

– কার সামনে দাঁড়াইয়া আছো তুমি ভুইলা গেছ?

– ভুলি নাই, আব্বা। সব মনে আছে আমার।

– ঠিকাছে, তুমি এখন যাও।

নাহিদা চোখমুখ শক্ত করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তালুকদার মশাই বেশ আয়েশ করে চুরুট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ভাবতে লাগলেন তার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত। মাথায় এক বিদঘুটে বুদ্ধি খেলে গেল তার। বয়স হয়েছে বলে তার জাত তো আর পাল্টায় নি! মন থেকে এখনো সে হারা/মি-ই রয়ে গেছে।

প্রতিদিনকার মত জোহরা তালুকদার মশাই এর ঘরে নাস্তা দিতে ঢুকল। স্বভাবমতন গায়ে ঢলে পরে নাস্তা পরিবেশন করতে লাগল। আহ্লাদী গলায় বলল,

– ও চাচাজান! ডিম আইজকা দুইটা দিছি। আপনার শরীর কেমন দুর্বল হইয়া গেছে। এখন থিকা দুইটা কইরা ডিম খাবেন। শরীরে যুতের হব।

তালুকদার মশাই চুরুটে টান দিয়ে জানতে চাইলেন,

– ফাহিম ঘুম থিকা উঠছে?

– না তো, চাচাজান।

– ওরে ডাকো। ঘুম থিকা তুলো। ওর সাথে আমার জরুরি কথা আছে।

জোহরার চোখজোড়া চকচক করে উঠল। সে সবসময় চেয়েছিল ফাহিম যেন তালুকদারের বিশ্বস্ত এবং একনিষ্ঠ শিষ্য হতে পারে। নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করতে এতদিন কত কাঠখড় পুড়ালো সে! যদিও ফাহিমকে নিয়েই এতদিন তালুকদার মশাই সব সামলিয়েছেন। তবুও আজকে তার বাচনভঙ্গি অন্যরকম। আজ তালুকদারের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ বহন করছে ফাহিমের প্রতি তার আস্থা এবং ভরসা।

জোহরা ঠিক এরকমটাই চেয়েছিল।

– এক্ষুনি যাইতেছি।

একথা বলে জোহরা ছুটল নিজের ঘরে।

ফাহিম তখনও নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। জোহরা এই ঘুমন্ত মানুষটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হুলস্থুল বাজিয়ে দিল গোটা ঘরে।

– আর কত ঘুমাবা। এহন উঠো। চাচাজান ডাকে।

ফাহিম ঘুম জড়ানো চোখ আলগোছে মেলল। কিছুটা বিরক্ত হয়ে শুধাল,

– কি হইছে?

– চাচাজান তোমারে ডাকছে। এহনি যাইতে কইছে। উঠো।

– আরেকটু পর যাই।

জোহরা সাপের মত ফোঁস করে উঠল। ফাহিমের পাশে বসে কর্কশ গলায় বলল,

– আরে বলদ মর্দা কইতাছি উঠ! চাচাজান নিজ থেকে এত সকালে ডাকছে এর মানে বুঝতাছো?

ফাহিম মাথা ঝাঁকাল,

– না। এর মানে কি?

– এর মানে হইল সে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাম তোমারে দিয়া করাবো। তুমি অবশেষে তার বিশ্বাস অর্জন করতে পারছ।

‘ও’ ফাহিম সব বুঝে ফেলেছে এমনভাবে মাথা নাড়ল।

– কিন্তু জোহরা, আমি তো ঘুমে তাকাইতে পারতেছি না। ব্রেইনও ঘুমাইতেছে। শরীরও ঘুমাইতেছে।

জোহরা তাচ্ছিল্যভরে চোখ ফিরিয়ে নিল। বলল,

– তোর শরীর সবসময়ই ঘুমায়।

ফাহিম বুঝল স্ত্রী কোনদিকে ইংগিত করে কথা বলেছে। নিজের সম্মান রক্ষার্থে সে চুপ হয়ে গেল। তালুকদারের ঘরে যাওয়ার জন্য তৈরি হল।

ফাহিম ঘরে প্রবেশ করা মাত্র তালুকদার তাকে বসতে বলল। নাস্তার শেষ লোকমা তৃপ্তিভরে মুখে পুরে বলল,

– সুনামগঞ্জ সদরে আমার অনেকগুলো জায়গা কেনা আছে। তার মধ্যে একটা সাত কাঠার জমি, ভাবতেছি তোর নামে লেইখা দিব।

তালুকদার মশাইয়ের কথা শুনে ফাহিমের চোয়াল ঝুলে পড়ল। ঘুম আচমকা উধাও হয়ে গেল। চোখও কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না ফাহিমের।

– আমার নামে জমি লেইখা দিবেন!

– কেন তুই আমার ভাইয়ের পোলা না? আমার জায়গা জমিতে কি তোগো হক নাই? এত সুন্দর একটা বউ ঘরে আনছস। ওর ভবিষ্যত নিয়া ভাবা লাগব না? সামনে পরিবার আরোও বড় হবে। জায়গা-জমি লাগে।

ফাহিম খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,

– চাচাজান, আপনে সত্যিই মহান।

তালুকদার মশাই হেসে বললেন,

– তা তো বটেই। তবে আমি কিন্তু তোরে জমিটা উপহার দিতেছি নিজের ছেলে হিসেবে। তোরও আমারে বাপ মনে কইরা সব সময়, সকল কাজে পাশে থাকতে হব। সাহায্য করতে হব।

ফাহিম সাথে সাথে উত্তর দিল,

– একশবার! এটা আবার বলা লাগে নাকি, চাচা? আপনার যখন যা লাগব, যখন যা করতে হব, শুধু আদেশ দিবেন। আমি সব সামলাইয়া নিমু।

তালুকদার মশাই মুখে বিশ্রি হাসি ঝুলিয়ে রেখে বললেন,

– তুই সামলাইতে পারবি তা আমি জানি। হাজার হইলেও আমার রক্ত তোর শরীরে। ঠিকাছে, এখন তুই যা। জমির কাগজ পত্র তৈরি কইরা তোরে দিয়া দিব খুব শীঘ্রই।

ফাহিম ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাল। ঘর থেকে বের হবার আগে সে বার কয়েক তালুকদার মশাইয়ের পা ছুঁয়ে সালাম করে নিল।

****************

চারুলতা রান্নার আয়োজন সামলে, দুপুরের খাবার পর্ব মিটিয়ে তখন সবেমাত্র গোসলের পর্ব চুকিয়েছে। তালুকদার বাড়ির পেছনের আঙিনায় নিজের ভেজা কাপড়গুলো যত্নের সহিত নেড়ে দিচ্ছিল সে। ঠিক তখনই তুর্জয়ের সাথে ফের দেখা হল তার। সকালে ভীষণ তাড়াহুড়ো করে চা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে চারুলতা। এবারোও ব্যতিক্রম হল না। কাপড়গুলো চটজলদি মেলতে শুরু করল সে। এই স্থান দ্রুততার সাথে ত্যাগ করা শ্রেয়।

তুর্জয় আজ বহুদিন পর বাইরে যাবে। কতদিন ফারুক, ওসমানের সাথে দেখা হয় না। বাড়িতেও ওদের তেমন যাতায়াত নেই। আজ ওদের নিয়ে একটু কাচা বাজারের দিকে যাবে সে। চা বিড়ি খাবে। এছাড়া যাদের জন্য তুর্জয়ের এতগুলো দিন হাসপাতালে কাটল, তাদের খোঁজ খবর নেওয়াও বাকি। একটু এ গ্রামে তুলে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে। খাতির যত্ন করতে হবে। যেটুকু র/ক্ত তার গা থেকে ঝরেছে, তার তিনগুণ র/ক্ত ঝরাতে হবে। তুর্জয়ের গায়ে আঘাত করে কবে কে পার পেয়েছে?

প্রতিটি পদক্ষেপে পূর্বের সেই খানদানি ভাব বহাল রেখেই অগ্রসর হচ্ছিল তুর্জয়৷ চারুলতার চোখে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়াল সে।

ভেজা চুলের পানিতে চারুলতার পিঠ এবং কোমড়ের অবস্থা জুবুথুবু। শরীরের প্রতিটি লোমকূপ যেন সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে।
দৃশ্যটি দেখামাত্র তুর্জয়ের মেজাজ গেল বিগড়ে।

সে বিদ্যুতের বেগে চারুলতার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটা পালানোর সুযোগ খুঁজেতে গিয়েও ব্যর্থ হল।

তুর্জয় চোখমুখ শক্ত করে কঠিন গলায় বলল,

– গোসল করে চুল মুছা লাগে জানস না?

চারুলতা তুর্জয়ের কথার আগামাথা ঠাহর করতে পারল না। ফলস্বরূপ বিস্মিত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল ওর মুখ পানে।

– কথা বলস না ক্যান? চুল যে মুছস নাই, পানিতে পুরা শরীর ভিজা গেছে। সেদিকে খবর আছে?

চারুলতা তুর্জয়ের এরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণ এবার বুঝতে পারল। কিন্তু সে প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। চুপ করে রইল।

আচমকা তুর্জয় নিজের পরিধানের এক রঙা গেঞ্জি খুলে ফেলল। তা দিয়ে যত্ন সহকারে চারুলতার চুল মুছিয়ে দিতে লাগল। এ কাজে সে পটু নয়, বেজায় অদক্ষ। কখনো কারোও জন্য তার মাঝে দায়িত্ববোধ জন্মায় নি। কাজেই, এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপ গ্রহণ করাও হয় নি। তুর্জয়ের ব্যক্তিত্বের সাথে এসব বড় বেমানান।

তবে, মানুষ তার ভালোবাসার জন্য নিজের সহজাত ব্যক্তিত্ব ভুলে কখনো কখনো ভিন্নতার আশ্রয় নেয়।
শুধুমাত্র ভালোবাসার মানুষটির জন্য। তাকে ভালো রাখার জন্য।

চারুলতার চুল তুর্জয় ভালোমতো মুছে দিতে পারল না বটে, তবে চেষ্টায় কমতি রাখল না। চারুলতাও তাকে বাধা দিল না। কিন্তু তার মনের কঠোরতা কমেছে, ব্যাপারটা তাও নয়। তাদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের সমীকরণ এখন বেশ জটিল।

তুর্জয় কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,

– যা ঘরে যা।

চারুলতা চুপচাপ কয়েক পা এগোতেই পুনরায় তুর্জয় তাকে দাঁড় করালো। বলল,

– এরপর থিকা চুল ভালোমত মুইছা নিবি। চুলের পানি যেন পিঠ আর কোমড়ে না পড়ে। আমারে তোর সহ্য না হইলেও, এইটা ভুইলা যাইস না আমি তোর স্বামী। তোর দিকে কেউ তাকাইলে চোখ উপরায়ে ফেলুম আমি।

চারুলতা তাচ্ছিল্যভরে হাসল শুধু। কিন্তু এবারোও কোনো উত্তর নেই। যেন সে কঠিন মৌনব্রত পালন করছে।

চারুলতা ফিরে যেতেই তুর্জয় সেই ভেজা গেঞ্জিটা পরে নিল। অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে তার মাঝে এখন। গেঞ্জিটা যেন সহসাই চারুময় হয়ে গেল। কি সুন্দর স্নিগ্ধ গন্ধ বেরুচ্ছে!

উপন্যাসঃ #অবাঞ্ছিতা
লেখিকাঃ #আতিয়া_আদিবা