অবান্তর চিরকুট পর্ব-০৯

0
607

#অবান্তর_চিরকুট (পর্ব-9)

♡আরশিয়া জান্নাত

“আপনি কি ফ্রি আছেন? দেখা করতে পারবেন?”

মনখারাপ করে পার্কের বেঞ্চিতে বসে ছিল রাফসান। তখনই সিতারার মেসেজটা এলো। টেক্সটের দিকে তাকিয়ে কোনো রেসপন্স করলোনা। আজ কারো সঙ্গেই কথা বলার মুড নেই তার। সে আজ একাই ঘুরে বেড়াবে।

–আচ্ছা রাফসান আমি যখন তোমার সাথে ঝগড়া করি কিংবা মেজাজ গরম করে কিছু বলি তুমি বাইরে চলে যাও কেন?
–আমি চাইনা সেসব শুনে প্রভাবিত হতে। দুজন একসঙ্গে রেগে গেলে সম্পর্কে খারাপ প্রভাব পড়বে। আর সত্যি বলতে আমি রাগ সহ্য করতে পারিনা। চেঁচামেচি শুনলে আমার সাফোকেশন হয়,,,
— আগে বলো নি কেন এটা? আমি তো রেগে গেলে অনেক চিল্লাই। তোমার অনেক কষ্ট হয় তাই না? স্যরি সোনা আর কখনো চিল্লাবো না।
— আরেহ স্যরি বলার কিছু নেই। সবার রাগ তো একরকম না।
–তোমার রাগ হয় না? এই পর্যন্ত তো একবারো রাগ করোনি।
–কে বলেছে হয়না, হয়তো।
–কি বলো!! দেখলাম না তো? বেশি রাগ হলে কি করো?
–বেশি করে মরিচ খাই। ঝাল খেয়ে রাগ কমাই।
–ওহ আল্লাহ কি সাংঘাতিক। তাহলে তো অনেক রাগ করেছ এই অবধি। আমি আরো ভাবতাম তুমি ঝাল পছন্দ করো!!!
— হাহাহা। বাদ দাও এসব
— না না বাদ দিবোনা। তুমি সত্যিই খুব অদ্ভুত!
–তাই?
–নয়তো কি! তবে জানো আমি খুব লাকি তোমার মতো বর পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।
–ব্যাপার কি বাটারিং করা হচ্ছে?
–তোমার উপর মুগ্ধ হয়েছি। তাই কেমন প্রেম প্রেম জাগছে।
–আমার তো রোজ প্রেম প্রেম জাগে।
–ঢং না করে ঘুমাও। সকালে না অফিস আছে?
— আমি কি কিছু চেয়েছি নাকি। এই তুমি কি অন্য কোনো কিছু ভাবছো? এইসব চলে মনে না??

সাফা থতমত খেয়ে বললো, না না আমি কি ভাববো।
রাফসান হেসে তাঁকে বুকে জড়িয়ে বললো, ভালোবাসি বৌ টা।

“কেন সাফা কেন? আমার ভালোবাসা ফেলে চলে গেলে। তোমার কি একবারও আমার কথা মনে পড়েনা? আমি কেন তোমায় ভুলতে পারছিনা? আচ্ছা সোহেল কি তোমায় আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসে?”
আনমনেই চোখের কোণে জল ভরে এলো। চোখের পানি বিসর্জন দিতেও তার ভয় হয় যদি এসব অভিশাপ হয়ে যায়! সে তো সাফার খারাপ চায়না। সাফা সুখী হোক সেটাই চায়। মুখে সব বললেও মনে মনে ঠিকই এই ভেবে কষ্ট পায় সাফা তাকে ছাড়া সুখেই আছে। এখানে আত্মগ্লানীটা কিভাবে দূর করবে সে??
_________

সারাটাদিন খুব বিরক্তিকর কেটেছে সিতারার। একে একে সব ফ্রেন্ডরা ফোন করে বলছে, কিরে তোর প্রজেজিব বফ দেখি নতুন বৌ নিয়ে হানিমুনে গেছে। তোকে ডাম্প করলো শেষ পর্যন্ত! আগেই বলেছিলাম এমন ছেলের প্রতি ডেডিকেটেড হয়েও লাভ নাই। এখন দেখ কত রোমান্টিক ক্যাপশন দিয়ে ফটো আপ দিচ্ছে,,,,
সিতারা তাঁর ভাইয়ের একাউন্টে গিয়ে তাহজীবের আপলোড করা ছবিগুলি দেখলো। তাকে দেখে মনেই হচ্ছেনা আনহ্যাপি! ক্যাপশন তো একেকটা ভালোবাসার বন্যা বইয়ে দেওয়া। সিতারা খুব মন দিয়ে দেখলো কাপল ফটো দেখতে তাঁর ভালোই লাগে, তারচেয়ে বেশি ভালোলাগছে ছদ্মবেশী লোকটার দুইদিক সামলানোর ক্ষমতা দেখে।

“আপু তুই আবার তাহজীব ভাইয়ার টাইমলাইন ঘাটছিস?”

(সিতারার ভাই জাহিদ খানিকটা রেগে বললো)

“না এমনি দেখছিলাম দার্জিলিং কেমন,,”

(অপ্রস্তুত গলায় বললো সিতারা)

“আপু যা বলতে পারিস না তা বলতে আসিস কেন? আমরা সবাই ভালো করেই জানি তুই তাহজীব ভাইকে কতটা ভালোবাসতি। সে যে তোর কাঁটা গায়ে নুন ছিটাতে তোর পছন্দের জায়গায় হানিমুনে গেছে তাও অজানা না। এই নিষ্ঠুর লোকটা আমার দুলাভাই হয়নাই আমি অনেক খুশি হয়েছি। তোর উচিত আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা”

“তুই তো তাহজীব ভাই বলতে পাগল ছিলি। আর এখন এই কথা বলছিস?”

“ঘোড়ার ডিম ছিলাম। বোনের উড বি ভেবে মাথায় তুলে রাখতাম, সে এটাকে কি ভাবতৌ কে জানে। তবে মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে ভুল করেনাই। ডোমিনেটিং স্বভাবের ন্যারো মাইন্ডের লোক। এর চিন্তাভাবনা এতো লো কি বলবো”

“এখন এসব বলছিস আমার সঙ্গে বিয়ে হয়নি বলে? বোনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিস?”

“তোরে সান্ত্বনা দিতে আমার বয়েই গেছে। তুই তো তাহজীব বলতে অজ্ঞান। চোখে কালোপট্টি বেঁধে বসেছিলি। এসব বললেও পাত্তা দিতি কখনো? উল্টো আমায় বকতি। আল্লাহ যে কি বাঁচান বাঁচিয়েছে তোকে একদিন ঠিক টের পাবি।”

“বেশি পাকনা সাজিস না। নে ধর তোর ফোন”

“বাব্বাহ এখনো জ্বলে? ভালো মেয়েরা এসব ফালতু ছেলেদের ভালোবাসে বলে আজ আমার মতো ছেলেরা সিঙ্গেল।”

“ফাজিল দাঁড়া তুই”

জাহিদ ফোন নিয়ে দৌড়ে পালালো। সিতারাও তাঁর পিছু ছুটছে। সোফিয়া ছেলেমেয়ের খুনসুটি দেখে প্রশান্তমনেই বললেন, যাক মেয়েটা আগের মতো স্বাভাবিক হচ্ছে।


রাফসানের কোনো রিপ্লাই না দেখে সিতারার খুব গিল্টি ফিল হচ্ছে। সে সবসময় আগ বাড়িয়ে যায় না জানি কেমন মেয়ে ভাবছে। মুখে যাই বলুক ভেতরে ভেতরে ঠিকই খারাপ ভাবছে। কিন্তু এখন যে তাঁকে খুব প্রয়োজন। কি যে করবে সে বুঝে আসছেনা।

পাঁচদিন ধরে রাফসান অফিস যাচ্ছেনা।শরীর মন কোনোটাই ভালো নেই তাঁর। সারাদিন ঘুমিয়ে পার করে আর রাতে ছন্নছাড়ার মতো ঘুরে বেড়ায়। মন খারাপের রেশ কাটানোর কোনো উপায় জানা নেই তাঁর। কি করবে কিছুই জানেনা, শুধু জানে তাঁর এই জীবনটা বয়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা কি এমন হতো ওদের একটা বাচ্চা থাকলে? সেই সন্তানের মুখে চেয়ে আরামসে জীবন কাটিয়ে দিতো। সাফা নিশ্চয়ই সন্তানের কাস্টডি নিতে চাইতো না? নাকি চাইতো! সন্তানের মায়ায় বাঁধা পড়েও কি থেকে যেত না?
প্রথম মিসক্যারেজ এর পর কত রাত সে কেঁদেছিল সেই আবেগপ্রবণ মেয়েটা কি পারতো সন্তানকে মা-হারা করে চলে যেতে?
কতবার কেঁদে বলেছে আমার একটা বাচ্চা চাই। তুমি এখুনি আমায় বাচ্চা দাও। অথচ তখন ওর হেলদের কন্ডিশন খুবই খারাপ ছিল। রাফসান কত কষ্টে সামলিয়েছে সেই আহত পাখিটাকে।
তারপর যখন সব ঠিকঠাক হলো সাফা বললো সে জব করবে। সারাদিন বাসায় থেকে তাঁর কষ্ট বাড়ছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি কল সেন্টারে জব। এভাবেই কাটছিল দিন। সেকেন্ড টাইম কনসিভ করার চেষ্টায় বারবার ব্যর্থ হয়ে রাফসান নিজেই ডক্টর দেখিয়েছে শুরুতে। তবুও সাফার দিকে আঙুল তোলেনি।
সাফাকে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা বলতেই কেমন চেঁচিয়ে বলেছিল, বাচ্চা না হওয়া মানেই মেয়ের দোষ এটাই ভাবো তোমরা? তোমারো তো দোষ হতে পারে। তুমি ডাক্তার দেখাও গিয়ে আমি যাবোনা।
রাফসান ঠান্ডা গলায় বললো, সাফা আমি বলছিনা তোমার দোষ। আল্লাহ না দিলে বান্দা কিছু করতে পারেনা। আমি ডাক্তার দেখাতে বলছি কারণ প্রথমবারের জন্য কোনো জটিলতা তৈরি হয়েছে কিনা,,,,,

“এটার মানে কি রাফসান? আমি যা ভাবছি তা নয়? ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বললেই তো কথা বদলে যাবেনা।তুমি এটাই মিন করেছ এখানে আমার দোষ,,,”
তারপর সে রেগে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে লাগলো। রাফসান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে গেল। দরজার বাইরে অবধি শোনা গেল সাফা চিৎকার করে বলছে, কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাচ্ছ কেন। ফেস করার সাহস নেই?

আসলেই তো নেই, তবুও তো সব ফেস করতে হলো। এই কঠিন সত্যিটা তো এড়ানো গেল না।

ফোনে রিং হচ্ছে সেদিকে খবর নেই তার। বেশ কয়েকবার রিং বাজার পর বিরক্তচোখে ফোনে তাকালো। না চাইতেও ফোন রিসিভ করলো,

“হ্যাঁ বলুন মিস সিতারা”

“কি হইছে আপনার? কোনো খোঁজখবর নাই? কতগুলি মেসেজ দিলাম কল করলাম। রেসপন্স ই করছেন না!”

“আপনি আমার আত্মীয় নাকি বন্ধু? আপনাকে রেসপন্স দেওয়ার দায়বদ্ধতা আছে? আমার ইচ্ছে হয়নি তাই ব্যাক করিনি এখানে কৈফিয়ত চাওয়ার কি আছে?”

“আপনি এতো রেগে কথা বলছেন কেন? আপনার কি মন খারাপ? দেখুন আমি তো কৈফিয়ত চাইছিনা, টেনশন হচ্ছিল তাই জিজ্ঞাসা করলাম।এমন তো করেন নি আগে,,”

“চিনেন কয়দিন হয়? কি করে জানবেন এমন করি নাকি করিনা??”

সিতারা হেসে বললো, আসলেই তো! কথার লজিক আছে। আচ্ছা আপনি কোন সাবজেক্টে পড়েছেন বলুন তো?

রাফসান চুপ করে রইলো,

“শুনুন আপনি যেখানেই আছেন এড্রেস দিন তো। চটজলদি প্লিজ”

“মানে কি এসবের? আমি কেন বলবো আমি কোথায়?”

“এতো না পেঁচিয়ে বলুন তো। নাহয় এখুনি হাতিরঝিল আসুন আধঘণ্টার মধ্যে।”

“আপনি অধিকার খাটাচ্ছেন কিভাবে?”

“মেয়েরা স্বভাবতই অধিকার খাটায়। সম্পর্কের ধরাবাঁধার তোয়াক্কা না করেই। এখন যা বলছি করুন। আমি এখানে একা বসে আছি , জানেন তো এখন মেয়েরা কত আনসেইফ। দায়িত্ব বলেও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি?”

রাফসান বোকার মতো হা করে রইলো। কি বলে এই মেয়ে। সে একা থাকুক বা দোকা এখানে ওর সেইফটির দায়িত্ব তার কিভাবে? স্ট্রেইঞ্জ!

চলবে,,,,