অশান্ত বসন্ত পর্ব-১০+১১+১২

0
443

#অশান্ত বসন্ত।
(দশম পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী
(প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
********************
দিনের পর দিন কেটে যায়,রাতের পর রাত।ক্যালেন্ডার জানান দেয় পাঁচ বছর আট মাস তেইশ দিন অতিক্রান্ত।আজ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ধরে পল্লব ব্যাঙ্গালোরে।নিজেকে আরো অনেক ব্যস্ত করে নিয়েছে সে।

তবু ক্লান্ত শরীরেও ঘুম আসতে চায়না।আসে তন্দ্রা,তন্দ্রা এলেই স্বপ্নরা আসে,স্বপ্ন গুলো ও ভেঙে লক্ষচির হয়।
সেই বৃত্তাকার স্বপ্ন গুলো নেড়েচেড়ে ছানাছানি করে পল্লব।

আসলে সময় সব কিছু বদলে ফেললেও,কিছু কিছু মানুষকে একেবারেই বদলে ফেলতে পারেনা।পল্লবের মনে তাই আজও বহ্নি।

পল্লব ওর দামী মোবাইলটা বের করে ঋতমকে ফোন করে।অফিসের কাজে দু-দিনের জন্য ঋতম ব্যাঙ্গালোরে এসেছে।পল্লবকে বলেছে তিনটের দিকে একটা সময় বের করতে,দেখা করবে।

পল্লব অফিসের কাছের কফি-শপে ফোন করে টেবিল বুক করলো।ঋতমকে লোকেশন সেন্ড করে দিয়ে,মিস্টার পোড়েলকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পরলো।অনেকদিন পর প্রিয় বন্ধুর সাথে দেখা হবে,একটু আগেই বেরিয়ে আসলো।

পল্লব কফি-শপের পাশের মলে ঢুকলো।
সাধারণত মলটা দুপুরের দিকে একটু ফাঁকাই থাকে।কিন্তু আজ ভিড়টা তুলনামূলক ভাবে বেশিই।পল্লব টি-শার্ট এর সেকশনে ঢুকে beige colour এর একটা টি-শার্ট নিলো ঋতমের জন্য।কাউন্টারে টাকা দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে চমকে উঠলো পল্লব।’কাকে দেখছে!এ তো কাঁথির মেয়েটা!’

লাইন ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে ভালো করে খেয়াল করে দেখলো,’একেবারে সেই চোখ,সেই মুখ,সেই গলার আওয়াজ’।

কাউন্টার ফাঁকা হতে এগিয়ে যায় পল্লব। কেনা টি-শার্ট টা এগিয়ে দেয়।
মেয়েটা মোবাইল নাম্বার নিয়ে বিল করে,প্যাকেটের সাথে বিল এগিয়ে দিতেই,পল্লব বলে, ‘কাঁথির থেকে কি?’,মেয়েটা মনে হলো পল্লবকে চিনতে পেরেছে,কেঁপে উঠলো যেন চোখের পাতা।মুখে বললো,’one thousands nine hundred ninety please’।

পল্লব টাকা মিটিয়ে ফিডব্যাক বাটন প্রেস করে বেরিয়ে আসলো।বুঝলো,মেয়েটা কথা বলতে ইন্টারেস্টেড নয়,বা হতে পারে কাজের জায়গা বলে কথা বলতে চায় না।পল্লবের কেমন হতাশ লাগছিলো।মেয়েটা এখনো পল্লবের শ্বাসে প্রশ্বাসে।

কফি-শপে ঢুকতেই ওর বুকিং করা টেবিলে ঋতমকে দেখে হাত নাড়লো।ঋতম ওকে দেখে উঠে এসে জড়িয়ে ধরলো।অজান্তেই পল্লবের চোখ ভিজে আসলো।আজ দুজন প্রিয় মানুষের সাথে দেখা হলো ওর।একজন শার্টের কাউন্টারে আর অন্যজন এখন ওর বুকে।

চেয়ারে বসেই পল্লব বললো,’খিদে পেয়ে গেছে নিশ্চয়ই। আমিও লাঞ্চ করিনি।দাঁড়া আগে অর্ডারটা দিই।কি খাবি বল?চাইনিজ না কন্টিনেন্টাল? ঋতম বললো,’এনিথিং, যেটা তুই প্রেফার করিস’।পল্লব ওয়েটারকে বেল বাজিয়ে ডেকে খাওয়ারের অর্ডার দিয়ে দিলো।

‘তুই এখন দিল্লিতেই আছিস তাই না?’,পল্লবের প্রশ্নে হেসে ঋতম বললো,’প্রিসাইজলি নয়ডাতে।আমার খোঁজ রাখিস তাহলে।সেই যে কলকাতা ছাড়লি তারপর তো পাত্তাই নেই কোনো’,একটু থেমে বললো,’রক্ষিতের সাথে কথায় কথায় জানতে পারলাম তুই এখানে,নাম্বারটাও ওর থেকেই পেলাম’।

‘কোন রক্ষিত বলতো!ও আচ্ছা পরেশ রক্ষিত। হ্যাঁ উনি তো আমাদের কোম্পানি ছেড়ে দিল্লিতে জয়েন করেছেন।লোকটা ভালো কিন্তু অলস প্রকৃতির। কাজের চাইতে কথা বলে বেশি।এখন কি তোদের কোম্পানিতে নাকি?’পল্লবের কথায় ঋতম বলে,’সেসব পরে শুনিস।আগে বল কি খবর তোর?’।

‘কেমন দেখছিস?’,হেসে বলে পল্লব।ঋতম ও হেসে ফেললো কথা বলার ভঙ্গিমাতে।তারপর বলে,’ফেসবুক ডিএক্টিভেট করেছিস,নাম্বারটাও বদলে ফেলেছিস।তুই জানিস পাগলের মতো খুঁজেছি তোকে’।

‘আচ্ছা তোর মনে আছে তোকে একটা মেয়ের কথা বলেছিলাম’,পল্লবের কথা শেষ হতেই ঋতম বলে,’ওই যে কাঁথি না মন্দারমনি কোথায় যেন থাকতো!নাম না জেনেও যাকে ভালোবেসে ফেলেছিলিস!’

পল্লব ম্লান হেসে বলে,’মনে রেখেছিস দেখছি।জানিস আবার গিয়ে মেয়েটির সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম।কিছু না শুনেই বিশ্রী ভাবে রিজেক্ট করে।তারপরেই অফিসের অফারটা নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে আসলাম’।

টি -শার্টটা এগিয়ে দিয়ে বলে,’দ্যাখ তো পছন্দ হয় কিনা?তোর প্রিয় রঙের’,ঋতম বললো,’শালা তুই মার্কেটিং করা শিখে গেছিস?আগে তো একটা সিগারেট কিনতেও আমায় ঠেলতিস’,দারুন দারুন হয়েছে।আমি তো ভাবতেই পারছিনা’।

‘জানিস কাউন্টারে সেই কাঁথির মেয়েটাকে দেখলাম’,পল্লবের কথায় হো হো করে হেসে উঠলো ঋতম।বললো,’বলিস কিরে!শয়নে-স্বপনে-জাগরনে এখনো সেই মেয়েটাই আছে?এখনো সব জায়গায় ওকেই দেখছিস?’

পল্লব গম্ভীর মুখে বললো,’তোর কি মনে হচ্ছে আমি মজা করছি?’,ঋতম সোজা হয়ে বসলো।বললো,’তুই সিরিয়াস?সেই মেয়েটিই?এতো বছর বাদে দেখলি,চিনতে পেরেছিস।মানে কোনো গণ্ডোগোল হয়নি তো?’।

পল্লব বললো,’নারে কোনো গন্ডোগোল নেই।সেই মেয়েটিই।আরে ওই চোখ দুটো যে একেবারেই ভোলবার নয়।ভয়েজটাও সেম।আমি ১০০% শিওর,কাউন্টারের মেয়েটা কাঁথির মেয়েটাই’,ওয়েটার প্লেট গুলো দিয়ে যাওয়ার পর,আরো অনেক গল্প করলো ওরা,কিন্তু তেমন জমলো না।

শেষে ঋতম বললো,’এবার কি করবি ভেবেছিস?’,পল্লব হেসে বললো,’আবারো চেষ্টা, আরে চেষ্টা ছাড়া আর কিইবা করতে পারি বলতো!’।

মল থেকে আজ হোস্টেলে আসতে অনেক সময় লাগলো বহ্নির।পা দুটো যেন চলছেই না।অন্য দিন গুলোতেও ক্লান্ত থাকে বহ্নি।কিন্তু আজকের ক্লান্তিটা শরীরের চাইতে বেশি মনের।
সকালে কলেজ করে সোজা মলে চলে যায়।১২ টা থেকে ৬ টা অবধি ডিউটি,তারপর হোস্টেলে ফিরে ফ্রেস হয়ে পড়তে বসা,আপাতত এটাই বহ্নির ডেইলি রুটিন।

ওর মা, দিদিয়াকে এখনো আনতে পারেনি এখানে।তবে ওর দৃঢ় বিশ্বাস পরীক্ষার পরেই চাকরি পেয়ে যাবে।তবে ব্যাঙ্গালোরে এসে পড়তে পারার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ও মনে মনে প্রফেসর কাকুকে আবারো ধন্যবাদ দিলো।উনি স্কলারশিপের ব্যবস্থা না করে দিলে ওর আর পড়া হোতোনা।

অবশ্য এখানে এসে মলের চাকরিটা ও নিজেই জুটিয়েছে।ডায়রেক্ট গিয়ে কথা বলেছিলো, আর মলের মালিক বাঙালি হওয়াতে ওর কাজ পেতে অসুবিধা হয়নি।লোকটার মন বেশ ভালো। বেশিই টাকা দেয় পড়াশোনা করছে জেনে।

তবে এতো বেশি পরিশ্রমে শরীরটাও বিদ্রোহ করতে চায়,কিন্তু উপায় নেই কোনো।অনেকটা পথ চলা বাকি যে।এরপর চাকরি পেয়ে এখানে থাকার একটা বন্দোবস্ত করে মা দিদিয়াকে নিয়ে আসতে হবে, তারপর দিদিয়ার অপারেশনটাও তো করাতে হবে।কেমন দমবন্ধ লাগে বহ্নির।এতো দায়িত্ব ওর কাঁধে,পারবে তো ঠিকঠাক পালন করতে!

হোস্টেলে এসে ফ্রেস হয়ে পড়তে বসে।কিন্তু অন্যদিনের মতো আজ আর মন বসেনা পড়াতে।বহ্নি বুঝতে পারে ওর কিছু একটা হয়েছে।যদিও সেটা দেখা যাচ্ছেনা,শোনা যাচ্ছেনা,বোঝাও যাচ্ছেনা।কিন্তু ভিতরে একটা তাগিদ,একটা উৎকন্ঠা, একটা তাড়াহুড়ো ভাব।

বহ্নি উঠে ফোনটাকে নিয়ে,’সেই মানুষটা’বলে সেভ করা নাম্বারটা দেখে।ডায়াল করতে চেয়েও করতে পারেনা।কিসের একটা অস্বস্তিবোধ ছেয়ে আছে মনে।
রুমমেট আঁচলের সাথে নিজে নিজেই হাবিজাবি কথা বলতে থাকে।আঁচল বোধহয় নিজেও অবাক হয়ে যায় বহ্নির আচরণে।সাধারণত বহ্নি চুপচাপ থাকে।নিজে থেকে কোনো কথাই বলেনা।আসলে যদি কোনো ভাবে দুপুরের ব্যাপারটা মাথা থেকে বেরিয়ে যায়।

খাওয়াদাওয়া সেরে শুয়ে পরে তাড়াতাড়ি।দেখতে দেখতে পাশের বেডে আঁচল ঘুমিয়ে পরে।কিন্তু বহ্নির ঘুমটা আসছে না।সেই তাড়াহুড়োর ভাবটাও কিছুতেই কাটছে না বহ্নির।যেন কোথাও যেতে হবে এক্ষুনি,কি যেন হয়েছে একটা,একটা তাগিদ আসছে ভিতর থেকে।জরুরি,ভীষণ জরুরি একটা ব্যাপার।

না আর পারলোনা বহ্নি শুয়ে থাকতে।দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিয়ে সোজা ছাদে গিয়ে,’সেই মানুষটা’নাম্বারটায় ডায়াল করলো।অপরপ্রান্তে ‘হেলো’বলার সাথে সাথেই কেটে দিলো ফোনটা।
বেশ খানিকটা সময় পায়চারি করবার পর আবার ডায়াল করলো,অপর প্রান্ত থেকে বলে উঠলো,প্লিজ কাটবেন না ফোনটা।আমার মন বলছে আপনি কাঁথির সেই মেয়েটা,যাকে কাউন্টারে দেখলাম’।

বহ্নি কোনো রকমে বললো,’হুম’।
কেন যে সেবার ছেলেটির কথা না শুনে ভয়ে দৌঁড়েছিলো!আর কেন যে পরের বার ও কথা বলতে চাওয়ায় চড় মারতে গেলো!সেই অপরাধ বোধ আজও ওকে কুড়ে কুড়ে খায়।আর সেই অপরাধবোধ থেকেই নাম্বারটা আজ সেভ করেছিলো কাউন্টার থেকে।ভেবেছিলো,ক্ষমা চাইবে।কিন্তু ক্ষমা চাওয়াটা যে এতো কঠিন হয় সেটাই বোঝেনি।

গলা দিয়ে একটা আওয়াজ বের হচ্ছেনা বহ্নির।পল্লব বললো,’আমার না বলা কথা গুলো বলতে চাই আবারো।কাল কি সময় হবে?আমি সন্ধ্যে ছয়টার পর মলের পাশের কফি-শপটায় ওয়েট করবো,প্লিজ একবার আসুন’,বহ্নি কোনোরকমে, ‘আচ্ছা’বলে ফোন কেটে দিলো।এতো অস্থিরতা আগে কখনো হয়নি বহ্নির,দরদর করে শুধু ঘামছে।

(চলবে)

#অশান্ত বসন্ত
(একাদশ পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী
(প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
***********************
কানাডাতে গিয়ে অর্নব নিজেকে আবার কাজের মধ্যে ডুবিয়ে নিয়েছে।অর্নবের অবসর বিনোদনের বাইরে গিয়ে এখন একটাই কাজ,’নিজের মুখোমুখি হওয়া’ বা ‘নিজেকে মূল্যায়ন’।

আসার আগে অদ্রিজাকে মিউচুয়াল ডিভোর্স দিয়ে কিছুটা হলেও ভারমুক্ত সে।
অর্নবের বিশ্বাস, অদ্রিজাও এটাই চেয়েছিলো।তাই মিউচুয়াল ডিভোর্সের কথাতে এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলো।

সাধারণত কিছু কিছু মানুষের মূল্যায়ন তাঁদের জীবনকালেই সম্পূর্ণ হয়ে যায়।
আবার কিছু মানুষের আসল মূল্যায়ন শুরু হয় মৃত্যুর পর থেকে।

অর্নবের বিশ্বাস তার মৃত্যু কারোর মনেই কোনো হতাশা এনে দেবেনা।কিন্তু সত্যিই কি তাই!
বহ্নিকে যখন যে জানালো,কানাডায় চলে আসবে,তখন করুনা অঝোরে কেঁদে যাচ্ছিলো।

অর্নবের সাহস হয়নি এগিয়ে গিয়ে করুনার চোখের জল মোছাবে,কাছে টেনে নেবে করুনাকে,সব ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে।আসলে কোনো না কোনো ভাবে নিজেকেই সে ক্ষমা করতে পারেনি।

কতো কম সময় দেখা হতো করুনার সাথে।একটা দুটো কথা হতো, সেটাই ছিলো অর্নবের কাছে অনেকখানি পাওয়া। তারপর বিয়ে হলো,শরীরে শরীর মিললো।হৃদয় কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা আর বিশ্বাসের বেষ্টনীতে ঘিরে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় ঘেরা দুটো শরীর-মন ডুবে থাকতো নিজের খেয়ালে।

কিন্তু সময় ধীরে ধীরে দুটো কাছের মানুষের মাঝেও একটা অদৃশ্য পর্দা তুলে দেয়।যে দাম্পত্য দুটো মানুষের স্বপ্ন কে সফল করে তোলে,তাও একদিন ফিকে হয়ে যায়।
দুজনের মাঝে যেটুকু সেতু সেও তার বাচ্চাদের জন্যই টিকে থাকে।

অভ্যস্ত সংসারে দুটো মানুষ যেন দুটো দ্বীপ,মাঝে লবনাক্ত সমুদ্র।একই হাওয়া দুটো দ্বীপে বয়ে চলে,শুধু ঋতু পরিবর্তন হয়না।

সে কারনেই বুঝি বাতাসের প্রবল মাতনে নতুন হাওয়ার অসীম টানে অদ্রিজার কাছে যাওয়া।মেদের মজলিসে আনন্দের চুড়ান্ত সীমায় পৌঁছোনো।

আর এখন সব হারিয়ে ফেলবার পরেও, সময় তাকে মাঝেমাঝেই টেনে নিয়ে যায় গভীর পাকে।তাই সময় স্রোতে এখন শুধুই গড়িয়ে চলা।আর দিন শেষে হোঁচট খাওয়া স্তূপীকৃত কুশীলবে।

এখন এতো ভীড়েও তার একলা বাউল মন।যে মন জীবনের প্রতি নির্লিপ্ত।তবু যদি ফোনে ডাক আসে করুনার!তবু যদি বাবা বলে ডেকে ওঠে তার আদরের ডলি!এই একটা আশাই বাঁচিয়ে রেখেছে তাকে।আজকাল বড়ো মেয়ে শিখার প্রতি ও কেমন টান অনুভব করে।হারিয়ে ফেলবার পরেই বুঝেছে ওরা কতো মূল্যবান ছিলো ওর জীবনে।

মেয়েটা ‘আচ্ছা’ বলে ফোন রেখে দিলো।তারমানে পল্লবের সঙ্গে দেখা করবার ক্ষেত্রে আপত্তি নেই ওর।
মানে সত্যিই আগামীকাল মেয়েটার মুখোমুখি হবে কফিশপে!পল্লবের আনন্দে লাফাতে ইচ্ছে করছে।যদিও আনন্দ পাওয়ার মতো কিছুই হয়নি এখনো।বাকি আছে আরো অনেক পথ চলা।

পল্লবের মনে হয়না আজ রাতে আর ঘুম আসবে।
মেয়েটা ফোন রেখে দেওয়ার পর থেকে মনের ভিতর অসহ্য আবেগের স্পন্দন অনুভব করতে পারছে পল্লব।

যদিও সবকিছুই প্রায় অনিশ্চয়,তবু অসম্ভবও নয়।আসলে দূর থেকে সব সমস্যাই তীব্রতর মনে হয়।কাল্পনিক আতঙ্ক আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।মনের ভিতর তাই সবসময়ই ‘গেল’ ‘গেল’ রব।

সাহসে ভর করে এগিয়ে গেলে হয়তো সব আতঙ্কের অবসান হতে পারে, উৎকন্ঠার কারনটিও প্রশমিত হতে পারে।

ভেবেছিলো আগামীকাল দেখা করে মনের সব কথা গুলো জানাবে।জানাবে যে ওকে এতোদিন দুর থেকে ভালোবেসেই নিজের মনের আকাশকে রাঙিয়ে তুলতো পল্লব।

তবে মনে হচ্ছে এখনো সময় আসেনি কথাটা বলবার। বিশেষ করে যে মেয়েটি ওকে ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো,এমনকি চড় পর্যন্ত মেরেছে,তাকে ভালোবাসি বললে আবারো রিজেক্ট হতে হবে। দেখা করতে যে রাজি হয়েছে আপাতত এটাই অনেক।

না আগে মেয়েটির সাথে মিশতে হবে।সাথে নিজের মনের ভালোবাসার প্রকাশকে সচেতন ভাবে আড়াল রাখতে হবে।

আগে পরিচিতি পর্বটা বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ,মেয়েটির মনে জায়গা করে নিতে হবে।তারপর না হয় বলা যাবে,’ভালোবাসি তোমায়।ভীষণ -ভীষণ ভালোবাসি’,গভীর আবেশে পল্লবের চোখ বুজে আসলো।

এই প্রথম কলেজে যায়নি বহ্নি।আসলে শেষ রাতের দিকে ঘুমটা এমন ভাবে আসলো যে মোবাইলের এলার্মটাও কানে আসেনি।সাড়ে দশটায় ঘুম ভাঙবার পরেও হাই তুলছে বার বার।আঁচল পাশের বেডে নেই।ওকে তো একবার ডাকতে পারতো।যাক গিয়ে মলে তো যেতেই হবে কাজে।এভাবে শুয়ে থাকলে চলবে না।

গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলো বিছানায়।আর মনে পরে গেলো সেই লোকটার সাথে দেখা করতে হবে।কেমন যেন একটা অস্বস্তি ছেয়ে গেলো মনে।ওকে সেই লোকটা কি বলতে চায় এটা ওর কাছে একটা বড়ো প্রশ্ন!বিছানা থেকে নেমে স্নান সেরে আসলো।ভিজে চুলটা আঁচড়ে নিয়ে কফি কালারের কুর্তি আর সাদা লেগিংস্ টা পরে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার দেখলো নিজেকে।তারপর ঝোলা ব্যাগটা নিয়ে বেড়িয়ে পরলো।

পল্লব নিজেকে অনেক কষ্টে শাসন করে রেখেছিলো সাড়ে পাঁচটা অবধি।
কিন্তু আর পারছে না।একটা কি ফোন করবে মেয়েটাকে।কিছু যদি মনে করে!কিন্তু ফোন না করলে তো জানতেও পারবে না মেয়েটা আদৌ আসবে কিনা।ভাবতে ভাবতে ফোনটা করেই ফেললো পল্লব।

(চলবে)

#অশান্ত বসন্ত
(দ্বাদশ পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী
********************
কফি-শপের বাইরে একরাশ উৎকন্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো পল্লব। অবশেষে বহ্নিকে আসতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।

একটু এগিয়ে গিয়ে এক গাল হেসে বললো,’ভেবেছিলাম ভুলে গেছেন।তাই মনে করিয়ে দিতে ফোন করেছিলাম,ফোনটা ধরেননি দেখে ভয় পাচ্ছিলাম আসবেন না ভেবে’।

বহ্নি বললো,’ডিউটি আওয়ার্সে ফোন ধরার পার্মিশন নেই।তাই কেটে দিয়েছিলাম’।

কফি-শপের ভিতরে ঢুকেই পল্লব, ‘প্লিজ আসুন’,বলে একটা খালি টেবিলের দিকে এগিয়ে যায় ।তারপর চেয়ার টেনে আগে বহ্নিকে বসিয়ে, নিজেও উল্টো দিকের চেয়ার টেনে বসে।

এরমধ্যেই কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে পল্লবের ।রুমাল বের করে ঘামটা মুছে নিলো।

তারপর বললো,’আমার মনে হয় পরিচিতি পর্বটা নাম দিয়েই শুরু হওয়া উচিত, আমার নাম পল্লব চ্যাটার্জি, আপনি?’,বহ্নি বলে, ‘আমি বহ্নি চৌধুরী, এবার বলুন তো কি কারনে ডাকলেন?আমার কিন্তু হাতে অনেক সময় নেই’।

পল্লব হেসে বলে,’সরাসরি বিষয়েই যেতে বলছেন।একটু কফি খেলে হতোনা?এখানের চিকেন স্যান্ডউইচটা কিন্তু ব্যাপক’।

বহ্নি বললো,’আমি এক কাপ কফিই নেবো।আর আমার কফির পেমেন্টটা কিন্তু আমিই করবো’।
পল্লব বললো,’ ঠিক আছে দুকাপ কফি নিয়ে আসছি’।

কাউন্টারের দিকে যেতে গিয়ে পল্লব মনে মনে ভাবলো,অফিসে কতো স্বাচ্ছন্দ্যে বড়ো বড়ো মিটিং এটেন্ড করি অথচ ওর সাথে কথা বলতে গিয়ে কালঘাম ছুটে যাচ্ছে,আবার চড় না মারার ইচ্ছে হয় মেয়েটার!
গতকাল রাতে কতো কিছু ভেবে রেখেছিলো,অথচ মেয়েটার সামনে কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে।

দুকাপ কফির কাপ ট্রেতে নিয়ে নিজেদের টেবিলের দিকে এগিয়ে আসলো পল্লব।বহ্নি বললো,’এবার বলুন কি বলতে চেয়েছিলেন কাঁথিতে? আর আজকেও কি বলতে ডাকলেন?’

পল্লব কফির কাপটা বহ্নির দিকে এগিয়ে দিয়ে,নিজের কাপে একটা বড় চুমুক দিয়ে নিলো।

তারপর বললো,’ মন্দারমনি আমার ভীষণ পছন্দের জায়গা।আর ওখানে গেলেই ফেরার পথে কাঁথিতে ফুলমানির বাড়িতে দেখা করে আসি’।
বহ্নি বললো, ‘ফুলমানি মানে বোস কাকিমা?’

পল্লব মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললো,’একবার ফুলমানির দোতলার ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার সময় আপনাকে দেখি।কমলা পাড় সাদা শাড়ি পরে,কাঁধে ব্যাগ নিয়ে,দুবেনী ঝুলিয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছেন’।

বহ্নি বললো, ‘আর আপনার সেটা দেখেই প্রতিদিন পিছু নেওয়ার ইচ্ছে হলো তাইতো?’

পল্লব বহ্নির কথার উওর না দিয়েই বললো,’ঠিক তা নয়,আসলে ভালো লেগে গিয়েছিল আপনাকে, ফিরবার আগের দিন কথা বলতে চেয়েছিলাম,আর তাতেই বিপত্তি’।

বহ্নি বললো,’আপনার ধারণা নেই কি পরিমাণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি’।
পল্লব বললো,’সে তো আপনার প্রানপন ছোটা দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম।কিন্তু বিশ্বাস করুন শুধুমাত্র কথা বলতেই চেয়েছিলাম সেদিন’।

বহ্নি বললো,’বুঝলাম।এবার বলুন পরেরবার কি এমন জরুরি কথা ছিলো,যে আমার সাথেই দেখা করবার জন্য কাঁথি গিয়েছিলেন!”

পল্লব একটু সময় চুপ করে থেকে বললো,’এখানকার চিকেন স্যান্ডউইচটা সত্যিই ব্যাপক বানায়।এতোক্ষণ কাজের জায়গায় ছিলেন,ক্ষিদে পায়নি?’

বহ্নি বিরক্ত মুখে বললো, ‘আপনার ক্ষিদে পেলে অর্ডার দিন না।আমি খাবোনা’।

পল্লব বললো,’আপনি কি রেগেই থাকেন সবসময়?’, বহ্নি এই কথাটার কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলোনা।বললো,’কথা শেষ করুন,আমার তাড়া আছে’।

পল্লব এবার ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খেয়ে নিলো।
মনে মনে কথা হাতড়াচ্ছে,অথচ কোনো কথাই খুঁজে পাচ্ছেনা।
বুঝতে পারছে সত্যি কথাটা বলে দিলে মেয়েটা শুধু যে ওকে অপমান করে দেবে এমনটা নয়,ওর সাথে আর কথাই বাড়াবেনা।

তবু সত্যি কথাই বললো।’বাড়িতে বিয়ের কথা চলছিলো,তাই ভাবছিলাম…’,কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বহ্নি বলে উঠলো,’ বিয়ে! আমার অভিধানে কিন্তু ওই শব্দটা একেবারেই নেই’।

পল্লব অতি কষ্টে ও হেসে ফেলে বললো, ‘সে আমাকে না হয় যোগ্য মনে হয়নি ।কিন্তু শব্দটা অভিধানেই নেই এমন বলবেন না’।

বহ্নি বলে,’যা কথা বলার ছিলো নিশ্চয়ই বলে নিয়েছেন।আর আমার উত্তর টাও আশা করি পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দিতে পেরেছি,তাহলে আমি এবার আসি?’।

ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিলো পল্লব।এইভাবে বলতেও চায়নি কিছু,তবু মেয়েটার জেরার মুখে পরে না বলেও পারলোনা।

অনেক কষ্টে হাসি এনে পল্লব বললো,’ আমরা তো বন্ধু হোতেই পারি তাইনা?’,বহ্নি বললো,’না পারিনা ”।

একটু থেমে বলে,’তাছাড়া আমাকে নিয়ে কি জানেন ,যে বন্ধু হতে এগিয়ে এলেন?’,পল্লব বুঝতে পারছে ওর নিজের মুখটা লাল হয়ে গেছে, নিশ্বাস দ্রুত পরছে।পারলে কেঁদেই ফেলবে এখন ‘।

বহ্নি পল্লবের মুখের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো,এইভাবে বলাটা ওর ঠিক হয়নি।

নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,’দেখুন এখানে আপনি আমায় ডাকলেও আমি আসলে নিজেই এসেছিলাম ক্ষমা চাইতে। রাস্তায় অতো লোকের মাঝে চড় মারাটা আমার অন্যায় ছিলো।আমি সত্যিই লজ্জিত’।

পল্লব বললো,’ইটস ওকে বহ্নি।আপনার অনিচ্ছাসত্ত্বেও দাঁড় করিয়ে কথা বলতে চাওয়াটা ঠিক হয়নি’।

বহ্নি বলে চলে,’আসলে জীবনে কিছু পরিস্থিতি আসে যখন নিজের ব্যবহারের ওপর নিজেরই কন্ট্রোল থাকেনা।সেদিনটা আমার জীবনের তেমনই একটা দিন ছিলো।মাঝখান দিয়ে আপনি চড়টা খেয়ে গেলেন।এনিওয়ে ক্ষমা চাইছি সেই দিনের সেই ব্যবহারের জন্য’।
তারপর নিজের বিলের টাকাটা রেখে ‘আসছি’,বলে বেরিয়ে গেলো।

বহ্নির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে বহ্নির উদ্দেশ্যে বললো,’আমার মন বলছে এতো সহজে তুমি ছেড়ে যেতে পারোনা আমায়।আমি যে তোমায় ছেড়ে আমার ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভাবতেই পারিনা’।

কাল রাতের আর আজ সারাদিনের অস্বস্তিটা এখন আর নেই।অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে বহ্নির।কফি-শপ থেকে বেরিয়ে, কিছুটা রাস্তা হেঁটে খাতার দোকানে আসলো ।দুদিন আগেই খাতা শেষ হয়ে গেছে।
খাতার সাথে দুটো পেন,একটা পেনসিল ও নিয়ে নিলো।

কলেজে প্লেসমেন্ট চলছে এখন।বেশ কয়েকটা জায়গা থেকে ইন্টারভিউ ও নিয়েছে।মনে হচ্ছে হয়ে যেতে পারে চাকরিটা।টাকা মিটিয়ে দোকান থেকে বের হোতেই ফোনটা বেজে উঠলো।

(চলবে)