অশান্ত বসন্ত পর্ব-১৭+১৮+১৯

0
406

#অশান্ত বসন্ত
(সপ্তদশ পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী।
(প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
**********************
পল্লবের মা,বাবা,বোন সকালের ফ্লাইটেই ব্যাঙ্গালোরে এসেছে।একপ্রকার পল্লবকে না জানিয়েই পিউয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন ওনারা।
ডেট ফাইনাল করতেই নাকি ব্যাঙ্গালোরে আসা।তাছাড়া ছেলের আংটি, ব্রেসলেটের মাপ,জুতোর মাপটাও নিয়ে যাবেন সাথে।

পল্লবের মায়ের ছোটোবেলার বান্ধবী অঞ্জনা মাসীর ছেলের সাথেই নাকি পিউয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছে।

পল্লব জিজ্ঞেস করে,’অঞ্জনা মাসি বা ওনার ছেলে আমাদের পিউকে আবার দেখলো কবে?’,’উত্তরে ওর মা জানায়, ‘পিউয়ের ছবি দেখেই পছন্দ করেছে অঞ্জনা।আর এবার তো মুখোমুখি ও দেখাটা হয়ে যাবে।

ছেলেটা এম.টেক ইঞ্জিনিয়ার,দেখতেও সুদর্শন আর কথাবার্তা ও ভদ্রোচিত’।

পল্লব বুঝতে পারেনা এই মুহুর্তে ওর ঠিক কি রিএক্ট করা উচিৎ!একটু চুপ করে থেকে বললো,’ছেলে -মেয়ে দুজন দুজনকে দেখলোনা পর্যন্ত আর তোমরা ডেট ফাইনাল করতে কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোরে চলে এলে,এমনকি আমাকে একবার জানালেনা পর্যন্ত ‘।

পল্লবের মা বলেন,’উফ আসতে কথা বল,তোর বাবা বাথরুম থেকে শুনতে পাবে।কেন তুই তো দেখেছিস ছেলেকে,কথাবার্তা ও বলেছিস,ভালো লাগেনি তোর?’একটু থেমে গিয়ে বললেন,’তোকে তো সেই কারনেই অঞ্জনার ঠিকানা দিয়ে দেখা করে আসতে বলেছিলাম।আর তুই তো ফোনে বললি বেশ ভালো ঘরদোর অঞ্জনা মাসির,আর ওনার ছেলে,মেয়ের ব্যবহারটা ও ভীষণ ভালো’।

পল্লবের মনে পরে যায় মাস কয়েক আগে মায়ের অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে একবার গিয়েছিলো অঞ্জনা মাসীর বাড়িতে।তবে তখন তো আর জানতোনা মায়ের মনে এসব চলছে!হ্যাঁ ওনার দুই ছেলে মেয়েই উচ্চশিক্ষিত।ওদের ব্যবহারটাও অমায়িক, এমনকি বাড়ি ঘর ও খারাপ নয়।কিন্তু তা বলে আজকালকার দিনে এতো তাড়াতাড়ি পিউয়ের কেন বিয়ে দিতে চাইছে মা বাবা সেটাই এখনো ক্লিয়ার হয়নি পল্লবের কাছে।মনটা বিরক্তিতে ভরে যায় সকাল সকাল।

যদি ও আপাতত কথা না বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে বাজারের দিকে ছোটে পল্লব। এক ঘন্টার মধ্যে ওকেও বের হতে হবে ভিক্টোরিয়া হসপিটালের উদ্দেশ্যে। আজই শিখার প্রথম অপারেশনের ডেট পড়েছে।গতকালই বহ্নির সাথে গিয়ে শিখাকে হসপিটালে এডমিট করে দিয়ে এসেছিলো পল্লব ।তারপর প্রায় সারা রাতই বহ্নি আর পল্লব ফোনে ছিলো।বহ্নি খুবই কান্নাকাটি করছিলো।

আসলে ডক্টর এ.কে.গুপ্তা শিখার কেসটা নিতেই চাইছিলেননা।অনেক গুলো টেস্ট, এক্স-রে ইত্যাদি করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে,শিখার অপারেশনটা খুবই রিস্কের।

একটা নয় দুটে অপারেশন করতে হবে মিনিমাম ছয় মাস অন্তর।তারপরেও যে ঠিক হয়ে যাবে তেমন কোনো গ্যারান্টি নেই।হতে পারে অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাবে এমনকি ব্লিডিং বন্ধ না হলে প্রানহানিও ঘটতে পারে।
৫% মাত্র চান্স আছে ভালো হওয়ার। তাও সেটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।বহুদিন স্পিচ থেরাপি নিতে হবে অপারেশন যদি সাকসেসফুল হয় তাও।

বহ্নি কথাগুলো শুনে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলো ডাক্তার বাবুর সামনেই।তারপর বলেছিলো,’আমি যে অনেক আশা নিয়ে এসেছি আপনার কাছে।আমার মায়ের একমাত্র এটাই স্বপ্ন ছিলো যে আমার দিদিয়া সুস্থ,স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে।আপনি তো শুনেছি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন কঠিন কঠিন কেস,আর আপনার অপারেশন সবসময়ই সাজসেসফুল হয়।আর একটা চ্যালেঞ্জ নিননা ডাক্তার বাবু।প্লিজ আমার দিদিয়াকে ভালো করে দিন’।

উনি বেশ কিছুক্ষণ সময় চুপ করে থেকে বলেছিলেন,’ রিস্কটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে’,বহ্নি বলেছিলো,কিসে রিস্ক নেই বলুন তো?রিস্ক না নিলে তো জীবনে পিছিয়ে পরতে হয়।আর দিদিয়া যে জীবন কাটাচ্ছে সেটা কি একটা জীবন বলুন?প্লিজ আপনি অপারেশনের ডেটটা দিন।আমার বিশ্বাস আপনার হাতে আমার দিদিয়ার কিছু খারাপ হতেই পারেনা’।

বহ্নির কথায় আবার চ্যালেঞ্জটা নিয়েই নিলেন ডাক্তার বাবু।তবে বহ্নির অর্থনৈতিক অবস্থা আন্দাজ করে বেসরকারি নার্সিংহোমে নয়,ভিক্টোরিয়া হাসপাতালেই ডেট দিয়েছেন।
আর আজ সেই অপারেশন। বহ্নিকে মনে জোর দিলেও পল্লবের নিজেরই বেশ টেনশন হচ্ছে।অপারেশনটা না করালেই পারতো বহ্নি।সত্যি যদি খারাপ কিছু একটা হয়ে যায় নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে বহ্নি!কথাটা ভেবেই অস্থির লাগছে পল্লবের।

তিন দিনের মতো বাজার করে নিয়ে এসে কিচেনে রেখে দিয়ে,পল্লব ওর মাকে জানায় ওকে এখনই বেরিয়ে যেতে হবে।ওর বন্ধুর দিদির অপারেশন আজ।পল্লবের কথা শেষ না হোতেই পিউ বলে ওঠে,’সেকিরে দাদাভাই আমরা তো সবে এলাম।আর তুই আমাদের ফেলে চলে যাবি?যেতে হলে আমাকেও সাথে নিয়ে যেতে হবে’।

পল্লব হেসে বলে,’পাগল নাকি তুই?হসপিটাল কি শপিং মল নাকি যে ঘুরতে যাবি?’,কিন্তু পিউ নাছোড়বান্দা। যেতে হলে ওকে নিয়েই যেতে হবে,নাহলে যাওয়া কেন্সেল করতে হবে।অগত্যা পল্লব বলে,’পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসতে পারলে তবেই নিয়ে যাবো’।

পিউ কুর্তিটা চেঞ্জ করে,চুলটা আঁচড়ে দুমিনিটের মধ্যে কাছে এসে দাঁড়ায়।পল্লব হেসে ফেলে বোনুর হাত ধরে বলে, ‘চল তাহলে’।

পল্লবের বাবা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে ওদের বেরিয়ে যেতে দেখে সীমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় গেলো ওরা?’,সীমা বললো,চা টা জুড়িয়ে যাচ্ছে, আগে খেয়ে নাওতো’।

গাড়িতে উঠেই পল্লব বলে,’বুঝতে পারছি অনেক কথা আছে আমার সাথে।আমি গাড়িটা স্টার্ট দিচ্ছি,তুই তোর মুখটা স্টার্ট দে’।

দাদাভাইয়ের কথায় কেঁদে ফেলে পিউ।বলে,’বিয়েটা আটকা দাদাভাই।আমি সত্যিই এতো তাড়াতাড়ি এই বিয়ের গ্যাড়া কলে পরতে চাইছিনা।আপাতত কম্পিটিটিভ পড়ে চাকরির পরীক্ষা গুলোতে বসতে চাইছি।চাকরি করা কালীন যদি কাউকে সত্যিই মন চায়,তখনই একমাত্র বিয়েতে বসবো’,।

পল্লব বলে,’একদম সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিস।কিন্তু কথাটা কি বলেছিস বাবাকে?’,পিউ কেঁদে ফেলে আবারো বলে,’আমার কি তোর মতো সাহস আছে নাকি?বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেই ভয় লাগে’।

পল্লব হেসে বলে,’না তাকিয়ে বলবি।জেনে রাখ জীবনটা তোর,তাই সেই জীবনের সিদ্ধান্তটাও কেবল তোরই হওয়া উচিত।দ্যাখ মা বাবার কথা শোনা আমাদের কর্তব্য হলেও তাদের ভূল সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে জীবন কাটানোটা অনুচিত। জীবন একটাই,তাই নিজের ইচ্ছে ডানায় ভর করে বিন্দাস বাঁচা উচিত ‘।

পল্লবের কথায় পিউয়ের মুখের কালো মেঘ কেটে যায়।চোখের জল মুছে বলে,’তুই আমার সঙ্গে আছিস তো?’পল্লব হেসে বলে,ইয়েস মাই সুইট সিস,এবার তো হাসি মুখটা দেখা’,পিউ খিলখিল করে হেসে উঠলো।

পল্লব এবার ফোন করে বহ্নিকে বলে,’শোনো আর পনেরো-কুড়ি মিনিটের মধ্যেই হসপিটাল পৌঁছোচ্ছি,একদম চিন্তা কোরো না।সব ঠিকঠাক মতোই হবে’,পিউ ফিচেল হাসি হেসে বলে,’এটা বন্ধু ছিলো না বান্ধবী ছিলো রে?’

(চলবে)

#অশান্ত বসন্ত।
(অষ্টাদশ পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী।
(প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
*********************
পল্লবকে দেখেই বহ্নি এগিয়ে এসে ওর হাত দুটো ধরে।বহ্নির চোখ দুটো ছলছল করছে।এক রাতেই চেহারা যেন অর্ধেক হয়ে গেছে মেয়েটার।পল্লব বললো,’মনের জোর হারালে চলবে?মনের জোরটাই কিন্তু পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করবার একমাত্র হাতিয়ার’।পল্লবের কথায় একটু যেন ভরসা পায় বহ্নি।নিজেই চোখটা মোছে।পল্লব বলে,’আলাপ করিয়ে দিচ্ছি,ও পিউ, আমার একমাত্র আদরের বোন।আজকেই মা বাবার সাথে ব্যাঙ্গালোরে এসেছে নিজের বিয়ের ডেট ফাইনাল করতে’।

পিউ রেগে গিয়ে বলে,’দাদাভাই ভালো হচ্ছেনা বলে দিচ্ছি।আমি মোটেও বিয়ে করতে চাইছিনা’,তারপর বহ্নিকে ভালো করে দেখে বলে,’আরে দাদাভাই একেই সেই ফুলমানির বাড়িতে দেখেছিলাম না?’,পল্লব মাথা নাড়িয়ে সায় দিতেই পিউ হেসে বলে ওঠে,’এখন আর চড় মারে নাতো তোকে?’,পিউয়ের কথায় লজ্জা পেয়ে যায় বহ্নি,আর পল্লব হেসে ওঠে বোনুর দুষ্টুমিতে।

‘১২০ নম্বর বেডের পেশেন্টের বাড়ির লোক শিগগিরই হলে এসে দেখা করুন’,কথাটা কানে যেতেই কেঁপে উঠলো বহ্নি।পল্লব বহ্নির হাত ধরে হলের দিকে এগোলো।একটি অল্প বয়েসী নার্স এগিয়ে এসে বলে, ‘১২০ নম্বর বেডের পেশেন্ট পার্টি?’,মাথা নাড়িয়ে সায় দিতেই বলেন,পেশেন্ট
ওটির জন্য রেডি করতে দিচ্ছেন না,ভীষণ রকম হাইপার হয়ে যাচ্ছেন।কাইন্ডলি একজন আসুন’।

বহ্নি এগিয়ে যায়।তারপর নার্সের পিছন পিছন গিয়ে লিফটে ওঠে।নার্সটি জিজ্ঞেস করেন,’পেশেন্ট কে হয় আপনার?’,বহ্নি বলে,’আমার দিদিয়া’।
‘উনি কিছুতেই ওটি ড্রেস পরাতে দিচ্ছেন না,এদিকে টাইমে রেডি না করে দিলে স্যার আমাদের ওপরই রাগারাগি করবেন’,নার্সের কথায় বহ্নি বলে,’আসলে দিদিয়া বাইরের জগতে বের হয়না তো, আর হসপিটালের পরিবেশের সাথে তো আরোই অপরিচিত’।

বহ্নি বেডের কাছে যেতেই শিখা আঁকড়ে ধরলো বহ্নিকে।বহ্নিও পরম মমতায় শিখার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো।একটু শান্ত হওয়ার পর বহ্নি নার্সটিকে রেডি করিয়ে দিতে বললো।এবার নার্সটি এগিয়ে এসে শিখার চুল আঁচড়ে দুটো বেনী করে দিয়ে,ওটি ড্রেস পরিয়ে দিলো।বহ্নি হাত ধরে থাকায় শিখা আর কোনো আপত্তি করেনি।নার্সটি বহ্নিকে বললো,’একটু বাদেই ওটি বয়রা এসে স্ট্রেচারে করে এসে পেশেন্ট কে ওটিতে নিয়ে যাবে।কাইন্ডলি ততোক্ষণ আপনি পাশে থাকুন’।

বহ্নি এবার শিখার বেডের পাশের চেয়ারটা টেনে বসে।বহ্নির দুচোখের জল আর বাঁধ মানছেনা।মনে মনে মাকে উদ্দেশ্য করে বলে,’মা মাগো তুমি তোমার শিখার পাশে ঢাল হয়ে থেকো।ওকে যেন কোনো বিপদ ছুঁতে না পারে।পাথরের ভগবান নয়,তুমি বেঁচে থাকতেও আমার কাছে তুমিই আরাধ্যা ছিলে।সব কাজের আগে বরাবর তোমাকে স্মরণ করেছি,এখনো করছি।তুমি দিদিয়াকে সুস্থ করে দাও মা,স্বাভাবিক করে দাও’।

এর মাঝেই নার্সটি এসে বিপি চেক করে যায়।সেলাইন এর চ্যানেল করা হাতটা দেখিয়ে শিখা ইশারায় বহ্নিকে বোঝায় হাতটা ব্যথা।বহ্নি নার্সটিকে কথাটা জানাতে তিনি একটি থম্বোফোব জেলের টিউব এনে হাতে লাগিয়ে দেন।আর বহ্নিকে বলে একটা থম্বোফোব জেলের টিউব এনে জমা দিয়ে যেতে,কারন বেশ কয়েকদিন চ্যানেল করা থাকবে।এর ভিতর দিয়ে ইঞ্জেকশন ও চলবে।বহ্নি মাথা নাড়িয়ে জানায় ও এনে দেবে।

বহ্নি এবার ইশারায় শিখাকে বোঝাবার চেষ্টা করে, অপারেশন এর পর শিখার মুখ থেকে আর লালা পরবে না।শিখা কথাও বলতে পারবে,হাসতে পারবে মন খুলে।শিখা কি বুঝলো কে জানে,কিন্তু ফ্যালফ্যাল অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো বহ্নির দিকে,ওর চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পরতে থাকে।

‘একটু উঠে সাইডে গিয়ে দাঁড়ান,পেশেন্টকে ওটিতে নিয়ে যাবো’,কথাটা কানে যেতেই বহ্নি সরে দাঁড়ায়। দুজন ওটি বয় শিখাকে স্ট্রেচারে তুলে ওটির দিকে নিয়ে যায়।যাওয়ার আগে শিখার হাতে চাপ দিয়ে বহ্নি বোঝাবার চেষ্টা করে যে কোনো ভয় নেই,ও ওর দিদয়ার সাথেই আছে।

ওটি রুম বন্ধ হোতেই কান্নায় ভেঙে পরে বহ্নি।একজন নার্স এসে বলেন,’প্লিজ এখানে একদম কান্নাকাটি নয়,প্রে করুন গডকে,এভরিথিং উইল বি অলরাইট’,বহ্নি চোখ বুজে নিজের মায়ের চেহারা সামনে এনে প্রার্থনা শুরু করে।ততোক্ষনে পল্লব আর পিউ বহ্নির দুপাশে বসে,বহ্নির হাত নিজেদের হাতের মুঠোতে আবদ্ধ রেখে দিয়ে বোঝায়,বহ্নি একা নয়,ওর লড়াইয়ে ওরা ও সামিল।

(চলবে)।।

#অশান্ত বসন্ত।
(ঊনবিংশ পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী
(প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
********************
চা-পর্ব মিটিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে বাজার গোছাতে বসে সীমা।সত্যি পল্লবের মতো করে এতো সুন্দর গুছিয়ে বাজার করতে অসীমও পারেনা।কিসের সাথে কি লাগবে বুঝে শুনে নিয়ে আসে ছেলেটা।

সীমা সবজি কেটে দুটো ওভেনেই রান্না চাপিয়ে দিলো।দু’ঘন্টার মধ্যে ভাত,মুসুরির ডাল,উচ্ছে বেগুন ভাজা,ফুলকফির ডালনা,আলু-বরি-ধনেপাতা আর আদা লঙ্কা বাটা দিয়ে হালকা করে কাতলা মাছের ঝোল নামিয়ে আর একবার গা ধুয়ে আসলো।

সাধারণত জার্নির ধকল সামলে কেউ এতো কিছু বানায়না।কিন্তু যতই পরিশ্রান্ত থাকুক না কেন সীমাকে কয়েক পদ বানাতেই হয়।

অসীমের খাওয়ার বায়নাক্কা সামলাতে আজকাল বেশ হাফিয়ে যায় সীমা, হয়তো বিরক্তিও আসে।আসলে বয়েস তো তারও বাড়ছে।আর বয়েস বাড়ার সাথে সাথেই এসেছে এক পাহাড় ক্লান্তি।

তাছাড়া জীবন-সায়াহ্নে এসে বোধহয় সবাই চাওয়া-পাওয়ার হিসেবটা মিলিয়ে দেখতে বসে।সেক্ষেত্রে সীমার পাওয়ার আঁচলটা শূন্য।অসীম বড্ড আত্মকেন্দ্রিক মানুষ। নিজেরটা ছাড়া আর কারোরটা সেভাবে ভাবে না।সীমার পছন্দ অপছন্দ কোনো কিছুরই বিশেষ মূল্য নেই তার কাছে।

তার ওপর বিয়ের পর থেকেই দেখেছে নাকের ডগায় রাগ থাকে লোকটার।কথায় কথায় মেজাজ।এমনকি আন্ডার গার্মেন্টস না পাওয়া গেলেও সীমার ওপর চোটপাট, যেন সীমা হাতে করে নিয়ে গিয়ে হারিয়ে ফেলে এসেছে।আগে কান্না পেতো সীমার।কতোদিন বাথরুমে গিয়ে সাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে কেঁদেছে। অবশ্য সেসব এখন অতীত।

সীমার শ্বাশুড়ি মা বলতেন,’পুরুষ মানুষের রাগ না থাকলে কি মানায়?তাছাড়া কথায় আছে,সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে’।একবার সীমা বলেছিলো,’এর পরের লাইনটা কি জানেন মা?পরের লাইনটা হলো, ‘যদি গুনবান পতি থাকে তার সনে’।কথাটা যে তার শ্বাশুড়ি মায়ের পছন্দ হয়নি সেটা ওনার মুখ বেঁকিয়ে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া দেখেই বুঝতে পেরেছিলো সীমা।তবে বলতে পেরে একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিলো।

তার এই নির্গুণ পতিটি তো ওনারই অংশ।শুধু ছেলে বলেই যাকে মাথায় তুলে নৃত্য করে গেছেন সারাটা জীবন।ছেলেকে মানুষ করেননি পুরুষ করেছেন! তবে সীমার নিজের অংশের প্রতি আস্থা আছে।পল্লবের মতো কেয়ারিং ছেলে যে কোনো মায়ের গর্ব।মেয়েদের সম্মান দিতে জানে তার ছেলে।

এতোদিন তো এই ছেলে-মেয়ে দুটোর মুখ চেয়েই বেঁচেছিলো সীমা।কখন যে এরা বড়ো হয়ে গেলো বুঝতেই পারেনি।এখন দুজনের জন্য সঠিক জীবন সঙ্গী এনে দিতে পারলেই তিনি দায়িত্ব মুক্ত।

ভীষণ রকম ইচ্ছে এই দায়িত্ব গুলো শেষ হলেই নিজের কথা ভাববে সীমা।কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজেকে নিয়ে হারিয়ে যাবে অনেক দূরে।আর মনে মনে দূর থেকে অসীমকে বলবে,’ দ্যাখ কেমন লাগে’।যদিও কোথায় যাবে সে বিষয়ে এখনো কিছু ভেবে উঠতে পারেনি সীমা।কিন্তু তাও যাওয়াটা তার ফাইনাল।

‘কী ব্যাপার বলোতো সীমা?সেই যে দুই ভাই বোন বের হলো,না একটা ফোন না মেসেজ, ঘড়ি দেখেছো?সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে’,সীমার ভাবনার জাল ছিঁড়ে অসীমের কথাগুলো কানে এলো।উত্তর দিতে ইচ্ছে না করায় অন্যদিকে পাস ফিরে শুলো সীমা।

‘কি গো কথা কানে যাচ্ছেনা?ছেলে মেয়ে দুটো এখনো কেন বাড়ি ঢুকলোনা?পাখিরাও সন্ধ্যে হলে বাসায় ফেরে’,অসীমের কথায় বিরক্ত হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পরে সীমা।তারপর বিরক্তিটা গিলে স্বাভাবিক গলাতেই বলে,’ওরা যে পাখি নয়,ওরা আজকালকার দিনের শিক্ষিত ছেলে মেয়ে সেটাই মনে থাকেনা তোমার।আর ওদের কি দরকারে লাগবে শুনি?পল্লবের বন্ধুর দিদির অপারেশন চলছে,ওরা হসপিটালে,ফিরতে দেরি হবে’।

কথাটা শুনেই তেলে বেগুনে চটে যায় অসীম।’বাড়ির খেয়ে বোনের মোষ তাড়াতে গেছে,সেটাই বলো’,অসীমের কথায় সীমা গলা নামিয়ে কেটে কেটে বলে, ‘বহুদিন থেকে কিন্তু পল্লব নিজের রোজগারেই খায়।খাওয়ার খোটা দিচ্ছো কাকে?বাড়িতে গেলেও সে নিজেই বাজার করে’।

অসীম রেগে গিয়ে বলে,’তাও বাড়ির মালিক আমি।আমার কথাই শেষ কথা।আমায় না জানিয়ে কি করে এমন অবিবেচকের মতো কাজ করার সাহস পায় তোমার ছেলে?দুদিন বাদে যে মেয়েটার বিয়ে হবে তাকেও নিয়ে হসপিটালে গেছে।উচ্ছন্নে যাচ্ছে সব তোমার শিক্ষায়’।

সীমা কথা গুলোর কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলোনা।তবে কেমন একটা অস্বস্তি হতে শুরু করলো মাথার ভিতর,’আচ্ছা অঞ্জনা ওর ছেলেকে মানুষ বানিয়েছে না পুরুষ বানিয়েছে!?’,এই প্রশ্নটা আপাতত ওকে অস্থির করে দিচ্ছে।

অসীমের ননস্টপ ঘ্যানঘ্যান করা কথা গুলোকে উপেক্ষা করে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় সীমা।অঞ্জনাকে মেসেজ করে জানিয়ে দেয় তাদের আসার কথা।অঞ্জনার নেট বন্ধ তাই সিঙ্গেল টিক হয়েই পরে রইলো মেসেজ।

‘চুপচাপ দাঁড়িয়ে না থেকে ফোনতো করতে পারো ছেলেকে’,অসীমের কথায় সীমা জানায়, ‘ছেলের নাম্বার তোমার ফোনেও সেভ আছে।চাইলে নিজে ফোন করে নাও’।

মনে মনে ভাবে একটু ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে তাতেও শান্তি নেই,ঠিক খিটমিট করার জন্য পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।মুখটা বেঁকিয়ে দেয় একটু।

হঠাৎ সীমার মোবাইল বেজে ওঠে।স্ত্রিনে পল্লবের ছবি।হেলো বলতেই পল্লব জানায়,’অপারেশন হয়ে গেছে মা।দেড় ঘন্টা বাদে ডাক্তার বাবু আসবেন রাউন্ড দিতে।উনি পেশেন্ট ভিজিট করার পর জানতে পারবো রাতে থাকতে হবে কিনা!থাকতে বললে পিউকে বাড়িতে দিয়ে যাবো’।সীমা চিন্তিত গলায় বললো,’তোরা খেয়েছিস তো?’,পল্লব বলে, ‘পিউকে পাশের রেস্টুরেন্টে থেকে লাঞ্চ করিয়ে দিয়েছি,বিকেলের টিফিন ও কিনে দিয়েছি’।

সীমা বললো,’তারমানে তোর বন্ধু খাবার খায়নি,সেই কারনে তুই নিজেও অভুক্ত তাইতো?’,পল্লব হেসে বলে,’না বলতে কি করে সব বুঝে যাও বলোতো মা?সত্যি ইউ আর গ্রেট’,সীমা বললো,’এটা কিন্তু ঠিক নয়,হসপিটাল মানেই রোগী আর রোগের বাসস্থান,সেখানে কি না খেয়ে এতো সময় থাকতে হয় নাকি?শিগগিরই কিছু খেয়েনে দুজন’।

পল্লব বললো,’আচ্ছা এবার রাখছি মা,ফোনের চার্জ প্রায় শেষ,সুইচ অফ হয়ে যাবে যে কোনো মুহূর্তে।তুমি আর বাবা চা খেয়ে নিও।আর দেখবে মুড়ি আর চানাচুরের প্যাকেট রাখা আছে রান্নাঘরের ওপরের শেলফে,বাই’।

পল্লবের ফোন এসেছে বুঝতে পেরে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল অসীম।সীমা পিছন ঘুরতেই অসীমের সাথে ঢাক্কা।বিরক্ত হয়ে সীমা বলে,’আর পারিনা ভগবান, এবার আমায় তুলে নাও’।

অসীম বলে,’বিরক্তিটা কার ওপর?ছেলে না আমার?’,সীমা রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলে,’নিজেই বুঝে নাও,আমি বলতে পারবোনা’। ‘তাতো পারবেই না,আমি তো চোখের বালি হয়ে গেছি তোমার’।সম্ভবত আরো কিছু বলছিলো অসীম,কিন্তু রান্নাঘরে যাওয়ার জন্য সেগুলো আর কানে পৌঁছোলো না সীমার।

(চলবে)