#আঁধারিয়া_অম্বর
#সুরাইয়া_সাত্তার_ঊর্মি
১০।
শ্যামা মনে সাহস নিয়ে দরজা খুলতেই চোখ বড় বড় করে তাকালো….
বাহিরে একটি ছিমছাম গড়নের তামাটে রঙের একটি যুবক দাঁড়িয়ে আছে। ঢুলঢুল করে দুলছে সে বৃষ্টির মাঝে। মদের তীব্র গন্ধ শ্যামার নাকে বাড়ি খাচ্ছে। শ্যামা এই ছেলেটিকে ভালো করেই চিনে, তাদের এলকার কাউন্সিলরের ছেলে। এক নাম্বারে বদমায়েশ ছেলে। এই এলাকার প্রতিটি মেয়েকেই এদের একটু গ্রুপ মিলে বিরক্ত করে বেড়ায়। শ্যামা এদের জন্য পদক্ষেপ নিতে চাইছিলই কি, ওর লাইফে এত এত ঝামেলা হাঝির হয়ে গেছে। শ্যামাকে-ও ছেলেটি বড্ড উত্ত্যক্ত করে। শ্যামার বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে এই বাড়িটির উপরেও তাদের লোভ। নানান ভাবে এ বাড়িটি থেকে বের করার পায়তারা চালিয়ে যাচ্ছে। রাত বিরাতে তাদের বাড়ির ছাদে ঢিল মারা, বাসার সামনে ময়লা আবর্জনার স্তুপ করা, বা কখনো বাড়ি বয়ে আসে সাঙ্গু পাঙ্গুদের নিয়ে হুমকি ধামকি দিয়া করেই চলছে। ম্যামা ছেলেটির আগাগোড়া দেখে ঠোঁট ভাজ করলো,
“শিফন তুমি!”
শিফন শ্যামার লতানো শরীরের বাঁক গুলোতে নজর বুলিয়ে বলে উঠলো,
“আর কত একা থাকবা জান? চলে এসো আমার কাছে, এই বাড়িও তোমার, আমাদের বাড়িও তোমার এবং (বুকের মাঝে হাত দিয়ে) এই বুকটাও তোমার!”
শ্যামার ঘৃণায় গা গুলিয়ে এলো,
“তুমি এখান থেকে যাবে? না, মানুষ জড় করবো?”
শিফন সব দাঁত বের করে বিশ্রি হেসে বলল,
“আমি তো চাই মানুষ ডাকো, সবাই জানুক আমাদের প্রেমের কথা!”
কান গরম হয়ে গেলো এবার শ্যামার। দাঁত দাঁত চেপে বলল,
” এই খান থেকে যা কুত্তার বাচ্চা, নর্দমার কিট, নয় খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু!”
শিফন বেশরমের মতো হাসলো। বলল,
” ঠিক আছে ঠিক আছে, কাউকে কিছুই বলবো না, তার বদলে না হয়, এই বৃষ্টির রাতে তোমার শরীরের উষ্ণতা ভোগ করতে দাও?”
শ্যামা আর সইতে পাড়লো না। দরড়ার কিনারায় থাকা শ্যামার ছোট বেলার খেলার কাঠের ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে বেদম পেটাতে লাগলো । শিফন চেঁচিয়ে উঠলো,
“ওই ছেমরি করছ কি, করছ কি, মাইরা ফেলবি নাকি? আহ্, কার গায়ে হাত তুলতাসোস জানোস তুই? শালি ছাড়!”
বলতে বলতে ব্যাট ধরে ফেলতে চাইলো শিফন। কিন্তু শ্যামার আজ এত বছরের রাগ ঝেড়ে ফেললো মুহূর্তেই। শিফনের দু পায়ের মাঝ বরাবর এক কিক মেরে দিলো। শিফন মদে টাল ছিলো, তার উপর অপ্রত্যাশিত আঘাত পেয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়লো। কাঁদা মাটিতে এক হয়ে যাচ্ছে তার শরীরের কাপড়, ব্যথায় কুকিয়ে যাচ্ছে বার বার। শ্যামা বলল,
“হারামজাদা এর পর এখানে দেখলে গলা কেটে ঝুলিয়ে রাখবো দরজার সামনে। ভাগ”
শিফন উঠে পালাতে পালাতে বলল,
“দেখে নিবো তোকে, এত কিসের দেমাক তোর? সব শেষ করে দিবো।”
শ্যামা বলল,
” আগে ঠিক করে দাঁড়াতো আগে । ”
শিফন এরি মাঝে উধাও হয়ে গেলো। শ্যামা রাগে ফোঁসফোঁস করে তাকিয়ে রইলো অন্ধকার রাস্তার দিকে৷ সব কতটা নিস্তব্ধত। কেউ নেই পথ ঘাটে।
————
“দাদিজান আপনি এত জরুরি তলব কেন করলেন?”
বড্ড অস্থির হয়ে দ্বিতীয় বারের মতো প্রশ্ন করে বসলো ইজহান। আলিয়া আর্ম চেয়ারে বসে আছে। দৃষ্টি তার জানালার বাহিরে। বাহিরের টিম টিম করে জ্বলা লাল-নীল আলো অন্ধকার ঘরটুকু আলোকিত করে দিচ্ছে। আলিয়া সেদিকে তাকিয়ে ছোট একটি শ্বাস ছেড়ে বললেন,
” তুমি কি তোমার মায়ের আত্মচিৎকার ভুলে গেছো?”
ইজহান চ্মকে গেলো। হুট করে শোনা কথাটি তীরে মতো ঢুকলো কানে, অস্থির মুখ খানা কঠিন হয়ে এলো মুহূর্তে। ইজহান বলল,
“আমি তা ভুলিনি, দাদিজান।”
“তাহলে?… তাহলে কেন ছুটে গেলে সেই মেয়েটির পিছনে? যার জন্য…. যার জন্য তোমার বাল্যকালেই মাকে খোয়াতে হয়েছে, হারিয়ে ফেলেছো চিরতরে তার মেয়ের জন্য হঠাৎ তোমার বদলানো রূপটা আমি সইতে পারছি না।”
ইজহানের ভাবমূর্তি পরিবর্তন হয়ে গেলো। গম্ভীর , অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে বাহিরে তাকিয়ে রইলো। কিছুই বলল না। আলিয়া আবার উঁচু গলায় বলল,
“এমনি নয়তো ইজহা্ন? মেয়েটিকে আবার তুমি ভালোবাসতে শুরু করেছো?”
ইজহান তখন চুপ। দৃষ্টি শূন্য। আলিয়া হতাশ হয়ে গেলো। নিজেকে সামলে ইজহানের পাশে বসে, ওর হাতটি ধরে বলল,
“আমি তোমাকে কিছু বলতে চাইছি ইজহান, মনযোগ দিয়ে শোনো, নেক্সট উইক মেহরিন দেশে আসচ্ছে, আমি তোমাদের দুহাত এক করতে চাই!”
ইজহান এবারো চুপ। আলিয়া কি করবে? ভেবে পাচ্ছে না। তার নাতির অভিব্যক্তি বুঝা বড় দায়। তবুও সে আশা করছে, আর যাই হোক তার নাতি তাকে ডিসাপয়েন্টেড করবে না। তবুও তার চান্স ৪০ ভাগ। বাকি ৬০ ভাগ…..। হতাশার শ্বাস ছাড়লেন আলেয়া।
————–
দরজা লাগিয়ে ভিতরের ঘর প্রবেশ করতেই আবারো দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। শ্যামা রাগে দুঃখ এবার দা নিয়ে ছুটে গেলো দরজা খুলতে। বলল,
“আজ তোর শেষ দিন রে….”
বলেই চোখ বুজে দু হাতে দা তুলে কোপ দিতেই নিচ্ছিলো শ্যামা। তখনি কেউ হায় হায় করে উঠলো একটি পরিচিত কন্ঠ। অধিরাজ বলল,
” এই এই, করছো কি? করছো কি? স্যারকে মেরে দিবে নাকি?”
শ্যামা চট করে তাকিয়ে, জ্বিব কাটলো। ছিঃ একটা অবস্থা করে দিলো সে। শ্যামা আড় চোখে দীর্ঘাকায় সুদর্শন পুরুষটিকে দেখে নিলো। তাকিয়ে আছে তার দিকে, বরফ দৃষ্টি মেলে। শ্যামা শুকনো ঢুক গিললো। চাপা হেসে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“আ.. প.. নারা? এখানে?”
অধিরাজ বলল,
“কেন আসতে পারি না বুঝি?”
“না না তা বলিনি, হঠাৎ এত রাতে যে,,”
অধিরাজ কিছু বলতেই নিতে চাইছিল। ইজহান তার গম্ভীর বরফ কন্ঠে বলল,
“তুমি আসতে পারো। ”
অধিরাজ হ্যাঁ বোধক ঘার নাড়িয়ে চলে গেলো। শ্যামা চোখ গোল গোল করে চেয়ে রইলো অধিরাজের যাওয়ার দিকে। ইজহান পকেটে হাত গুঁজে ভাবলেশহীন চোখে চেয়ে আছে শ্যামার দিকে। শ্যামার অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগলো। সে দিক সেদিক তাকাতে লাগলো। আজ সাত দিন পর একে অপরকে দেখছে। ইজহানের এই মুহূর্তে এক ছুটে জরিয়ে ধর বুকের সাথে মেশিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে ইজহানের। কিন্তু পারছে না। একটা অদৃশ্য দেয়াল যেন ইজহানকে আটকিয়ে দিচ্ছে। এই মুহূর্তে তার দাদিজানের কথা গুলো বেমালুম ভুলে গেল ইজহান। তার ঝংকারময় কন্ঠে বলল,
” ভিতরে আসতে বলবে না?”
শ্যামা যেন অন্য জগতে ছিলো। ইজহানের কথায় ভাবনায় ছেঁদ পড়লো, বলল,
“হুমম? ও হ্যাঁ হ্যাঁ আসেন আসেন ভিতরে আসেন।”
ইজহান তার লম্বা লম্বা পা ফেলে এই প্রথমবার শ্যামাদের বাড়িতে প্রবেশ করলো। শ্যামার কাছে মনে হলো, বাড়িটি ইজহানের সাথে যাচ্ছে না। সোনার চামচ মুখে নিয়ে যার জম্ম, বড় বড় হল ঘরে যার চলাফেরা তার অবশ্যই এমন পরিবেশে আর যাই হোক দম ফালতে কষ্ট হবে। শ্যামা কালক্ষণ ব্যয় না করে বলল,
“আব.. মি. ইজহান আপনি এখানে হটাৎ?”
ইজহান জবাব দিলো না। উল্টো জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার রুম কোনটা?”
শ্যামা থতমত খেয়ে গেলো। তার মাথা কাজ করছে না। এই ইজহান তার রুমের কথা জিজ্ঞেস করছে কেন? আচ্ছা? আবার… আবার ওসব করবে না তো?? ভাবতেই ঠোঁট কামড়ালো শ্যামা। ইজহান তখন আবার বলল,
“কি হলো? কোথায় হারিয়ে গেলে?”
শ্যামা আমতা আমতা করে বলল,
“উপরের ডান দিকের টা।”
ইজহান কোনো কথায় বলল না। মাথা নেড়ে সোজা হাটা ধরলো শ্যামার ঘরে, শ্যামা তাজ্জব বনে গেলো। আরে? ছেলেটা চায়ছে টা কি? শ্যামা পিছন পিছন গেলো। ইজহান শ্যামার রুম ঢুকেই এদিক ওদিক তাকালো। ঘরটা মাঝারি সাইজের। যেখানে একটি সিঙ্গেল বিছানা, যার চার পাশে ফেরি লাইট দিয়ে সাজানো। ছোট একটি পড়ার টেবিল। পড়ার টেবিলের উপর একটি ফোটোফ্রেম। ইজহান সেদিকে যেতেই শ্যামার কি ভেবে দৌড়ে সামনে যায়, আর লুকিয়ে ফেলে ছবিটি৷ তা দেখে ইজহান ভ্রু কুঁচকা। তা দেখে শ্যামা হাসার চেষ্টা করে বলে,
“এইটা.. এইটা কিছু না। ”
ইজহান কিছু বলল না। চলে গেলো শঢামার আলমারির দিকে। শ্যামা অবাক হয়ে কিছু বলতে নিবে তার আগেই যা হবার হয়ে গেছে। আলমারি দরজা খুলতেই হুড়হুড় করে সব কাপড় ইজহানের মুখে পড়ে গেছে।
শ্যামা বিড়বিড় করে বলল,
“গেলো, গেলো, মান সম্মান গেলো আমার!”
ইজহান বিস্ময়ে বিমূঢ় । আসলে কাজের জন্য নিজের আলমারি কাপড় গুলো গুছাতে পারে না সে। ভেবেছিলো কাল ছুটির দিন। কাল করবে সব। কিন্তু তার আগেই! শ্যামা ক্যবলাকান্তের মতো হাসলো,
“হে, হে!”
ইজহান শ্যামার এই বেকুব মার্কা হাসি দেখে নিজেও হেসে ফেলতে চাইছে। কিন্তু তার অভিব্যক্তি ঠিক রেখে একটি তয়লা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো,
“খাবার কি আছে?”
শ্যামা বলল,
“খিচুরি করেছিলাম সাথে আমারে আচার। ”
“ওকে ”
বলেই চলে গেলো ওয়াশরুমে। শ্যামা মাথা চুলকিয়ে বুঝার চেষ্টা করতে লাগলো, কি হচ্ছে এসব? তখনি আবার ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেলো। হালকা মুখ বের করে বলল,
“আঙ্কেলের কোনো কাপড় পাওয়া যাবে কি? আমার কাপড় সব ভিজে গেছে।”
শ্যামা রোবটের মতো মাথা নেড়ে বলল,
“এনে দিচ্ছি, এখনু এনে দিচ্ছি।”
বলেই পা বাড়ালো বাবার ঘরে। মাথা তার পুরোই হ্যাং। এসব হচ্ছে টা কি আজ? আচ্ছা শ্যামা স্বপ্ন দেখছে না তো?? নিজেকে নিজেই চিমটি কেটে চিৎকার করে উঠলো। নাহ্ স্বপ্ন না। সব সত্যি। শুকনো ঢুক গিলে বাবার এক সেট রাতে পরার জামা নিয়ে নিজের মনে বকবক করতে করতে রুমে ঢুকতেই এক চিৎকার করলো শ্যামা। শ্যামার চিৎকার ইজহানও চমকে উঠলো। বলল,
“চিৎকার করছো কেন?”
শ্যামা ঘোরে আছে। আজ পর্যন্ত এই ব্যক্তিকে অর্ধনগ্ন ভাবে কখনো দেখেনি সে। বলতে গেলে সে সুযোগ এই লোকটি তাকে দেয় নি। আর আজ? লোমহীন উদম চওড়া বুক দেখে শ্যামার কি যেন হয়ে গেলো। এতটা.. এতটা সুন্দর কেন এই পুরুষ। একটু কম হলে হতো নাকি? শ্যামাকে এভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইজহান নিজেই এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলো৷ শ্যামা তা দেখে পিছাতে লাগলো। ইজহান আগায়, শ্যামা পিছায়, এভাবে করতে করতে একে বারে লেগে যায় দেয়ালের সাথে শ্যামা। ইজহান তখন এক হাত উঠিয়ে শ্যামার দিক বাড়াতেই ঘাবড়ে গেলো সে। মনে পড়লো আবার,
” এই এই লোকটা কি সত্যি এবার ওই সব করবে?”
চোখ মুখ কুচকে বন্ধ করে ফেলো শ্যামা। ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। ঠিক তখনি হাত থেকে কাপড় গুলো নিয়ে নিলো ইজহান। কিন্তু সরে দাঁড়ালো না দূরে। উল্টো এক পলক তাকিয়ে থাকলো শ্যামার ভয়ার্ত মুখটির দিকে। শ্যামা যখন বুঝলো ইজহান কাপড় নিয়েছে তার হাত থেকে। তখনি নিজেকে নিজে হাজার টা গালি দিতে শুরু করলো। ছিঃ কি ভাবছে সে আবোল তাবোল। শ্যামা চোখ খুললো। ইজহান তখন মিটিমিটি হাসছে। শ্যামা ভেবাচেকা খেয়ে বলল,
“হাসছেন যে?”
ঠোঁটে দুষ্ট হাসি রেখে চকিতে বলল ইজহান,
“আমি ওসব করবো না এখন!”
শ্যামার কান গরম হয়ে গেলো, গাল দুটি টমেটোর মতো হয়ে গেলো। লজ্জায় তাকাতে না পেরে বলল,
“খাবার রেডি করছি নিচে আসুন!”
বলেই ছুটে পালালো শ্যামা। ইজহান শ্যামার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। শ্যামার বাবার কাপড় পরে নিচে যাবে তার আগেই তার ফোন টুং টাং করে বেজে উঠলো। এই ওসময় কে ফোন করলো? ভেবেই ভ্রু কুচকে ফেললো ইজহান। তারপরেও ফোনটি হাতে না তুলে নিচে চলে গেলো। সে মুলত এসেছে এখানে তার জম্মদিনের শেষ সময়টুকু শ্যামার সাথে কাঁটাতে। একটিবার শ্যামার মুখ থেকে ” হেপি বার্ড ডে” শুন্তে। আচ্ছা শ্যামাকি তাকে উইশ করবে? করলে হয়তো এতক্ষণে করে ফেলতো নাকি? তবুও আশায় বাঁধে বাসা। সেটা ভেবেই নামতে লাগলো নিচে। আর তখনি….
চলবে,