আবার এলো যে সন্ধ্যা পর্ব-০৬

0
323

#আবার এলো যে সন্ধ্যা
পর্ব-৬

মিডটার্ম এক্সাম শেষে প্রায় তিনমাস পরে বাসায় এসেছে শোভা। যদিও আসার ইচ্ছে ছিল না। ভেবেছিল হলে থেকে ফাইনালের কিছু পড়ালেখা এগিয়ে রাখবে। কিন্তু মা কয়েকদিন ধরে ঘ্যানঘ্যান করছিল বাসায় আসার জন্য। বাধ্য হয়ে শোভাকে বাসায় আসতে হলো। বাসায় আসার পর অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো ওর মা বাবা আর ভাই বোনকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে এইবার। ঘরে নতুন পর্দা ঝুলছে। ড্রইং কাম ডাইনিং এ সুন্দর একসেট সোফা দেখা যাচ্ছে। বিছানায় নতুন চাদর। শোভার ভালো লাগছে আবার মন খানিকটা খারাপও লাগছে। ওকে ছাড়া ওর পরিবার তাহলে ভালোই আছে? বুকের কোথাও যেন চিনচিনে ব্যথা বোধ হচ্ছে।

একটা সময় ও ছিল এই পরিবারটার জান। ওকে ঘিরেই সব আনন্দ বেদনা ঘুরপাক খেতো। শোভার মন খারাপ মানে পুরো বাড়ির মন খারাপ। শোভার মন ভালো মানে পুরো বাড়ি আনন্দে ঝলমল করতো। মা বলতো, শোভা পেটে আসার পর থেকে নাকি ওদের জমিতে ধান হতো খুব। চালের আড়তদারিতে বরকত আসলো। ওর ফুফুর অনেকদিন আঁটকে থাকা বিয়েটা হয়ে গেলো। শেখ পরিবারের মান মর্যাদা নাকি বেড়ে গেছিল শোভার আসার পর। বাবা এইজন্য জন্মের পর ওর নাম দিয়েছিলেন শোভা। বাবার চোখের মনি ছিল শোভা। বাবার আদরের মান রেখেছিল শোভা। পড়ালেখায় শুধু পরিবার না স্কুলের গর্ব ছিলো সে। সেই আদরের শোভার ভাগ্য বদলে গেলো এসএসসির পর। যাকে একসময় বাবা চোখে হারাতো সেই মেয়ে হয়ে গেলো বাবার সবচেয়ে অপছন্দের সন্তান। বাসায় ফিরে যে মেয়েকে একনজর না দেখে মুখে ভাত তুলতেন না সেই মেয়ে সামনে এলে বাবার খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। শোভার কান্না পেয়ে গেলো। সবকিছু এতো দ্রুত পাল্টে কিভাবে গেলো? কখনো কি আবার আগের মতো বাবার ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্য হবে শোভার?
“শোভা, কি করছিস?”
শোভা দ্রুত চোখ মোছে-“কিছু না মা। বসেই আছি।”
সাজেদা মেয়ের দিকে এগিয়ে এলেন-“তুই কাঁদছিস? কেন?”
“কাঁদছি না মা। এই চোখে মনেহয় ময়লা পড়েছে।”
সাজেদা মেয়ের পাশে বসে মন খারাপ করেন-“কি হয়েছে সত্যি করে বলবি?”
“কিছু না মা। দেখছি তোমরা বেশ ভালো আছো আমাকে ছাড়া।”
সাজেদা চমকে উঠে হেঁসে দিলো-“পাগল মেয়ে আমার। তোকে ছাড়া পরিপূর্ণ ভালো কি থাকি? তবে হ্যা, তোর বাবার মনমেজাজ ইদানীং বেশ ভালো থাকছে। কেন জানিস? এই শহরে তোর বাবা অবশেষে একজন বন্ধু খুঁজে পেয়েছে। তার বাল্যকালের বন্ধু, গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিল বহু আগে। ক’দিন আগে দেখা হয়েছিল অফিসে। আমাদের বাসায় বেড়াতেও এসেছে উনি। বেশ ভালো মানুষ। বলতে পারিস তার কল্যানে তোর পুরনো বাবাকে কিছুটা হলেও ফেরত পেয়েছি। মানুষটা আবারও হাসছে এটা দেখে ভালো লাগছে।”
এ কথা শুনে শোভার মন ভালো হয়ে গেলো-“সত্যি বাবা আগের মতো হয়ে গেছে?”
“সত্যি রে সত্যি। তুই চাইলে পুরনো দিনের মতো ভালোবাসাও পেতে পারিস বাবার কাছ থেকে।”
শোভা অতি উৎসাহী হয়ে জানতে চাইলো-“কিভাবে?”
“তোর বাবা তোর বিয়ে দিতে চায় শোভা। তোর আঙ্কেল তার ছেলের সাথে তোর বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।”
শোভার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো-“বিয়ে! মা কি বলছো এসব? কেবল ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করবো নিজের পায়ে দাঁড়াব। নিজের একটা পরিচয় হবে। এখন কেন বিয়ে করবো মা?”
সাজেদা গম্ভীর হলেন-“তুই যদি চাস তোর বাবা তোকে আগের মতো ভালোবাসুক তাহলে বিয়ে নিয়ে কোন নেতিবাচক কথা বলিস না শোভা। অনেকদিন পরে তোর বাবাকে এমন আনন্দিত দেখছি তার এই সুখ টুকু কেড়ে নিস না শোভা।”
শোভার মনটা হুহু করে উঠলো। এই মুহূর্তে বিয়ের কোন ভাবনা তার মনে নেই। সে চায় তার নামের সাথে লেগে যাওয়া কালিমা মুছতে৷ বিয়ে করলে কি সে কালিমা মুছবে কখনো?
“মা, আর যা করতে বলো করবো কিন্তু বিয়ে না মা। বিয়ে করে কি হবে? আমি তো পড়ালেখাই শেষ করতে পারবো না। তাহলে এতো কষ্ট করে পড়ালেখা করলাম কেন? ভালো রেজাল্ট করে কি লাভ হলো?”
সাজেদার চেহারা কঠোর হলো-“তুই যা করেছিস তা কি কম হয়েছে শোভা? এক জীবনে আর কতো কাহিনি করবি? বিয়ে করলে পড়ালেখা হবে না কেন? তোর বাবাকে কি এতোটাই উদাসীন মনেহয়? তুই যাতে পড়ালেখা করতে পারিস সে কথা সে বলে নিয়েছে। এখন যেমন পড়ালেখা করছিস তেমনই করবি। এবার বল আর কি লাগবে তোর?”
“মা প্লিজ!”
তখনই যেন ঘরে বজ্রপাত হলো। আজমল শেখ এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের দরজায়-“সাজেদা, তোমার মেয়েকে বল সে যদি তার বাবাকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসে তাহলে যেন বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। আজ তিনটে বছর হয় নিজের বাড়িতে যেতে পারছি না। নিজের পরিবারের মুখোমুখি হতে পারি না। আত্মীয় স্বজনদের কাছে যাওয়া যায় না। এবার অন্তত যেন সে আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকায়। ওর ছোট দুই ভাইবোনের দিকে তাকায়। ওর বিয়ে হলে মানুষ আগের ঘটনা নিয়ে মাথা ঘামাবে না। আমরা আবার বাড়িতে ফিরতে পারবো। মেয়ে হয়ে এই স্বস্তিটুকু তার কাছ থেকে চাইছি। যদি তাতেও ওর সমস্যা থাকে তাহলে যেন আমাকে ভুলে যায়।”
“বাবা! এটা কি বললে তুমি?”
শোভা ঝরঝর করে কাঁদে। আজমল শেখ এতটুকু নরম না হয়ে বললেন-“তুমি বলো, এভাবে আর কতদিন বনবাস যাপন করবো? তুমি না হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যেয়ে বেঁচেছ আমরা কি করবো? এভাবে থাকতে দমবন্ধ হয়ে আসে আমার। তাছাড়া ভালো পাত্র ভালো পরিবার আর পরিচিত মানুষ এরকম সুযোগ কি বারবার আসবে? কে বিয়ে করবে তোমাকে? ভালো পাত্র কি পাবো? কেউ যদি ঘুনাক্ষরেও তোমার অতীতের খবর পাশ তাহলে কি আদৌও ভালো কোন পরিবারে আত্মীয়তা সম্ভব?”
একটু থেমে দম নিলেন আজমল শেখ-“তোমার আরও দু’টো ভাইবোন আছে ওদের কথাও ভালো। এই চাকরি করে সংসার চালাতেও কষ্ট। তোমার চাচা সব দেখাশোনা করে। যা টাকা পাঠায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে যেহেতু আমি সেখানে নেই। তোমাকে বিয়ে দিতে পারলে আমরা নিশ্চিতে ফিরে যেতে পারবো তোমার দাদাবাড়ী। আশাকরি বুঝতে পেরেছ আমাদের পরিস্থিতি।”
“সাজেদা, ওকে বলো আগামীকাল ওরা আসবে। আপাতত আংটি পড়িয়ে যাবে। ওর সেমিস্টার ফাইনাল হলে তুলে নেবে। কোন উল্টো পাল্টা আচরণ যেন না করে।”
আজমল শেখ চলে গেলেন। সাজেদা উঠে দাঁড়ালেন-“আমাদের ভুল বুঝিস না শোভা। আমরা তোর ভালো চাই বলেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাগ করিস না।”
শোভার বুকের উপর ওড়না ভিজে জবজব করছে। নিঃশব্দ কান্নায় বুক ভার হয়ে গেছে। ভেবেছিল মা অন্তত তাকে বুঝবো। সেই ঘটনার পর বাবা দূরে ঠেলে দিলেও মা বুকে আগলে রেখেছিল তাকে।
কিন্তু সেও যখন বাবাকে সাপোর্ট করলো তখন আর বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না শোভা। তবুও কাঁদতে কাঁদতে মায়ের দিকে তাকালো-“আমার নিজেকে প্রমান করার একটা সুযোগ পর্যন্ত দিলে না মা? তোমাদের কাছে এতটাই অপাংতেয় আমি?”
“বিয়ে করে প্রমান কর শোভা। নিজেকে প্রমান করার তোর সামনে এর চাইতে ভালো আর কোন সুযোগ নেই।”

★★★

“রিফাতের কি হয়েছে রে? দেখেছিস কেমন যেন উদাস উদাস চাহুনি দিচ্ছে? ব্যাটা কি প্রেমে ট্রেমে পড়লো নাকি?”
নিয়াজ চিমটি কাটে ফুয়াদের বাহুতে।
“ওকেই জিজ্ঞেস কর না? আসার পর থেকে কেমন একটার পর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে যাচ্ছে।”
ফুয়াদ দূরে দাঁড়িয়ে দেখলো রিফাতকে। নিয়াজও তাকালো-“রিয়্যাক্ট করে যদি। মিনহাজটা আসছে না কেন? ওই ব্যাটা তো মন বিশারদ আবার খবরের ডিব্বা। ও ঠিক বলতে পারবে কি হয়েছে।”
“দাঁড়া ফোন দিচ্ছি মিনহাজকে।”
ফুয়াদ ফোন বের করতেই রিফাত ওদের দিকে তাকালো। ইশারা করে জানতে চাইলো-“তোরা দু’জন ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস? আয় এখানে। সেই কখন থেকে একা বসে বোর হচ্ছি।”
দু’জন একে অপরকে দেখলো। রিফাতের দিকে এগিয়ে গেলো-“তোর কি কিছু হয়েছে? কেমন অন্যরকম লাগছে। সিগারেট খাচ্ছিস, এত সিগারেট তো তুই খাস না।”
রিফাত কাঁধ ঝাঁকালো-“কি হয়েছে জানি না। কিছু ভালো লাগছে না ক’দিন হলো।”
দু’জনেই বেশ অবাক হলো। এরকম হেয়ালি কথা রিফাত বলে না কখনোই।
“ওর প্রেম রোগ হয়েছে। তাই নারে রিফাত?”
মিনহাজ এগিয়ে এলো বন্ধুদের দিকে।
“প্রেম! রিফাত! কার সাথে?”
নিয়াজ বিস্মিত হয়ে তাকায়। মিনহাজ রহস্যময় হাসলো-“আছে একজন। আমি দেখেছিলাম। ওই যে সেদিন জাবিতও দেখলাম। তোরাও দেখেছিস মেয়েটাকে।”
“কোন মেয়েটা বলতো?”
দু’জনেই সমস্বরে জানতে চাইলো। মিনহাজ রিফাতের দিকে চোখ নাচায়-
“কিরে রিফাত বলবো? নাকি তুই বলবি?
রিফাত মিনহাজের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর দৃষ্টিতে ভাবলেশহীন ভাব।

চলবে—
©Farhana_Yesmin