#আসমানী_পালক
|শেষ পর্ব|
এরপর পুনরায় বিদীর্ণ সম্পর্কে বিয়োগের মরশুম এসে গেল। বহুদিন আমাদের দেখা হলো না, কথা হলো না। বিলিয়ে দিতে চাওয়া আত্মসম্মানকে সামলে নিয়ে আমিও যেমন ভুল পথ থেকে ফেরার চেষ্টা করলাম তেমনই ওপাশের মানুষটাও আমাকে সরিয়ে নিজের মতো হারিয়ে গেল। এরপর গল্পের মোড় ভিন্ন দিকে ঘুরতে পারত, যা মোহ কিংবা প্রেম চিরতরে মিলিয়ে যেতে পারত আমার জীবন থেকে। কিন্তু কে জানে কেন! মায়াজালের জাদুকর অপু নামক লুপ থেকে ত্রয়ীর ধ্বংসকে আর বিচ্ছিন্নই করা গেল না।
দিন,কাল-মাস গড়িয়ে সময় বছরের দূরত্ব ছুঁয়ে ফেলল। গর্ব করার মতো ভালো একটা রেজাল্ট নিয়ে অনার্স শেষ করলাম আমি। মাস্টার্স বাইরে করার অনেক ইচ্ছে থাকলেও আব্বার বারণে সে ইচ্ছেটা অপূর্ণ রয়ে গেল। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে নিতে ওখানেই মাস্টার্সের ক্লাস করছিলাম টুকটাক। সারাদিন রাত ব্যস্ত রাখতাম নিজেকে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে রাখতাম; পরাজিত প্রেমিকার ব্যথা-বিদীর্ণ এবং ভারী লজ্জার গল্পগুলোকে আড়ালের বৃথা চেষ্টা। কতটা পারতাম জানা নেই, তবে নিজের সাথে লড়াই চলছিল পুরোদমে। এমনই এক দুর্বোধ্য সময়ে আমার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে হৃদ আঙিনায় নিজের শক্তপোক্ত স্থান তৈরি করতে অপুর আগমন ঘটল পুনরায়। একদিন অসময়ে যে স্থানে যেভাবে আমায় প্রত্যাখ্যান করে চলে গিয়েছিল, ঠিক সে স্থানেই তেমনই এলেবেলেভাবে বিয়ের প্রস্তাব রাখল অপু। আমার সম্পূর্ণ সত্তা তো উন্মুখই ছিল তার একটা ডাকের জন্য, তাই এত অসম্মান-অপমান কিছুই আটকাতে পারল না আমাকে তার ডাকে সাঁড়া দিতে। পরিবার, সমাজ কেউ সোজা চোখে দেখল না আমার এই সিদ্ধান্ত। মেনেও নিলো না একবাক্যে। মানবেই বা কেন! জেনে-বুঝে একটা খারাপ ছেলের সাথে বিয়ে, সংসার কেইবা মেনে নিতে পারে। পারিবারিক অবস্থান যেমন আমাদের অসম তেমনই যোগ্যতার বিচারও আমাদের ক্ষেত্রে অসম। তবু দু’টি মন কখন কীভাবে কোন জাদুবলে জুড়ে যায়, কে ব্যাখ্যা দিতে পারে!
এতসব অনুভূতির খেলা তো অনেকটাই অন্যকারুর বোঝার বাইরে৷ তাই লাজলজ্জা ভুলে মুঠোফোনে কাঁপা কাঁপা স্বরে বিয়ের খবর জানানোমাত্র আব্বার কড়া শব্দে ত্যাজ্য হলাম রাতারাতি। আমার আব্বার জিদ ভয়ানক, তাঁর মতের বিরুদ্ধে এক কদম হাঁটলে শাস্তি অবধারিত। সেখানে আমি তো একা একা বিয়েই করে ফেলেছিলাম! লোকসমক্ষে জ্যান্ত জ্বালায়নি এও তো ভাগ্য।
তবে আমার ত্যাজ্য হওয়ার সংবাদটা অপুকে অনেকটা বিচলিত করল। শুনে একরাশ অপরাধবোধ এবং অসীম রাগ নিয়ে আমার বাহু চেপে ধরে বলল,
— বুঝতে পারছিস তাহলে অভিশপ্ত মানুষটাকে ভালোবাসার শাস্তি! এই শাস্তি তোকে মৃত্যু অবধি পেতে হবে ত্রয়ী মনে রাখিস।
ভেবেছিলাম অন্যকেউ মেনে না নিলেও অপুর আব্বা নির্দ্বিধায় স্বীকৃতি দেবেন আমাদের সম্পর্ককে। জটিল পরিস্থিতিগুলোকে স্বেচ্ছায় সামলে দেয়ার মানুষ পাচ্ছেন এও কম কিসে। তবে আমার ভাবনায় খানিক ভুল ছিল। স্বীকৃতি তিনি দিলেন ঠিক, তবে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে ছেলের বউ দেখে সহসা জ্বলে ওঠা ওনার চোখের দ্যুতি কোন দ্বিধায় নিভে গিয়ে পরক্ষনেই আক্ষেপের সুর হয়ে ঝরে পড়ল,
— শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের শত্রু হলে মা! স্বেচ্ছায় এভাবে আগুনে ঝাঁপ দিলে। এরপর তোমার মরণ কে আটকায়।
আমি সলজ্জ মাথা নুয়ে লুকিয়ে পড়লাম অপুর পেছনে। সত্যিই আমার মরণ কে আটকায়। নিজেই কি এ মরণ আটকানোর চেষ্টা করিনি! পারিনি তো, একফোঁটা পারিনি আটকাতে নিজেকে। তাই বাধ্য হয়ে…
____________
প্রেমহীন সম্পর্ক সোনামুখি সুঁইয়ের মতো। বুকের গহীনের নরম মাংসপিণ্ডে বিঁধে অবিরাম যন্ত্রণা দেয়, রক্ত ঝরায়। খোলা চোখে কেউ বুঝতে পারে না। শুরু থেকে আমিও নিভৃতে এমন আঘাত বয়ে বেড়াচ্ছিলাম খুশিমনে। বয়ে বেড়াতে হতো আমায়। দুয়ো রানির মতো আরেকজন ভাঙাচোরা মানুষকে আগলে নেয়ার পর এমনই তো পরিণতি হওয়ার কথা ছিল তাই না?
আমি ভীষণ ভালোবাসার কাঙাল। প্রিয় মানুষের হৃদয় জুড়ে শুধুই আমার বিচরণ থাকবে এই চাহিদাটুকু ছাড়া অপুর কাছে আর কিচ্ছু চাইনি। কেন যে এতটুকুই ওর কাছে দুর্বোধ্য মনে হতো! সাঁড়াই দিত না।
কখনো মুখ ফুটে বলা হয়নি ঘুম ঘোরে ও যখন আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে এলেবেলে কথার ভেতর অস্ফুটে মিরার নাম করত। বলত
“মিরারে আমার তুই ছাড়া কেউ নাই”
ঠিক সেই মুহুর্তে আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করতো তুই আজও তবে মিরাকে ভুলতে পারিসনি? এতকিছুর পরেও। ভুলতেই যদি না পারবি তাহলে আমাকে কাছে ডেকেছিলি কেন? চোখ খোল অপু, জবাব দে। চেয়ে দেখ মিরা নই, আমি ত্রয়ী। তোর স্ত্রী। তোর হৃদয় রাজ্যে একমাত্র আমার বিচরণ হওয়ার কথা। সত্যটা মেনে নিতে শেখ অপু। একবার চোখ খুলে দেখ তোর ত্রয়ী তোকে কতখানি ভালোবাসে।”
ঘুম ভাঙলে অপু কি বুঝতে পারত আমার ব্যথা! কে জানে। হয়তো চেষ্টাও করত ভালোবাসার, পারত না। নাকি পেরেছিল ভালোবাসতে। শোনা হলো কই। আমাদের বিয়ের পর পরই ওকে জেলে যেতে হলো। আইনের অনিয়ম, লিমিটেশন সব ওর বেলাতেই ফুরিয়ে গেল। ঠিকমতো সংসার করতে পারলাম আমরা ছাড়া ছাড়াভাবে মাস ছয়েক ও যখন জামিনে ছাড়া পেত তখন করে। এরপর, এরপর একদিন বড্ড আয়োজন করে অপুর বিচারকার্য শুরু হলো। ভাগ্যিস প্রতিজ্ঞায় আটকেছিল ও আমায়, নইলে কেসের নামে মিথ্যাচার কোর্ট রুমে সইতাম কি করে! একেকদিন কোর্ট থেকে ফেরার পর বাবা-র মলিন মুখ আমায় অনুভব করাতো, এই ভাল। অন্ধের মতো শুধু শুনেই নিশ্চুপ থাকছি, তাই ভাল।
যাকগে দুঃখ গাঁথা রোজনামচায় অনেক টানা হলো। এবার তবে ইতির পালা। ছোট করে লিখলে অপ্রেমের শুরুটা যেমন সুখকর হয়নি তেমন ইতিও সুখকর হলো না। স্বল্প দিনের মিলন মেলায় বিদায়ের ঘন্টা খুব দ্রুতই বেজে গেল অপুর জন্য। অপজিশনের প্রোটকল অনেক স্ট্রং হওয়ায় শেষ রক্ষা আর হলো না। আইনের চোখে চিরকালের তরে দোষী তকমা পেয়ে গেল।
অপরদিকে মানুষটার অলক্ষ্যে তাঁর একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছিলাম আমি নিজের ভেতর। খুব করে তাকে সংবাদটা জানাতে চাইলেও আব্বার বারণে জানাতে পারছিলাম না। বুকও পাথর বেঁধে নিয়েছিল যেন। এত এত অশুচির ভেতর এক টুকরো পবিত্রতা যকের ধনের মতো আগলে নিতে শিখিয়েছিল সৃষ্টিকর্তা আমায় দু’হাতে। হয়তো অশুচির কিছু অংশও তার ওপর আসতে দেবে না বলেই আব্বা বারণ করেছিলেন অপুকে জানাতে। তাঁর ধারণা ছিল একদিন সমস্ত মিথ্যে মামলাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রশস্ত হাসির সাথে বেরিয়ে আসবে ছেলে, তখুনি জানানো হবে তাকে সৌভাগ্যের সংবাদ। তবে যেই সৌভাগ্য সৃষ্টিকর্তা তার অদৃষ্টে পরিপূর্ণভাবে লিখবেন না বলে ভেবেই রেখেছেন, তাকে আমরা মানুষরা জোরজারি করে পরিবর্তন করব কি করে! পরিকল্পনা অনেক সাজালেও পরিশেষে খুশির সংবাদটা শুনতে হলো অপুকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দোরগোড়ায়, রিক্ত চোখে। শুনল ওর শেষ ট্রায়ালে যেদিন বাবু পেটে গিয়েছিলাম আমি আদালতে; স্বামীর বিচার দেখতে।
আমাদের দেশে বিনাবিচারে সাজা খুব সাধারণ বিষয়। সেখানে তো আমার পাগল স্বামী শতভাগ দোষী না হয়েও দোষ স্বীকার করেছিল নির্দ্বিধায়। আব্বার কাছে শুনেছিলাম সবগুলি ট্রায়ালে ওর নির্লিপ্ততার গল্প।
কিন্তু শেষদিন আমি যাওয়ার পর, আমাকে দেখার পর সকলে সাক্ষী হলো ভিন্ন চিত্রের। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েই হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল ও। কাপড়ের আড়ালে ঢাকতে চাওয়া পেটটার দিকে নজর পড়তেই রক্তশূন্য হয়ে গেল ওর মুখ। নিশ্চয়ই তখন উপলব্ধি করেছিল কতটা অন্যায় সে করে ফেলেছে আমাদের সাথে, নিজের সাথে। কিন্তু দেরি যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছিল। জীবনের শেষ সীমান্ত পৌঁছে যাওয়ার পর ফিরে আসার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ওর জন্য। অগত্যা দুর্ভাগ্যকে শেষ বারের মতো বরণ করতে হলো। বিপুল অর্থদণ্ডের পাশাপাশি যাবজ্জীবনের সাজাপ্রাপ্ত হলো আমার অপু।
আজও মনে আছে বিচার শেষে ওকে যখন পুনরায় জেলে নিয়ে যাওয়া হবে, সেই মুহুর্তে সমস্ত বাঁধাকে অতিক্রম করে ছুটে এসে আমার হাত চেপে ধরেছিল। অপর হাতে আমার পেট ছুঁয়ে অধীর হয়ে জানতে চাইছিল,
” আমারে বলস নাই ক্যান? ও আমার তাই না ত্রয়ী? ও আমার”
আমি ঈষৎ মাথা ঝাঁকাতেই পরক্ষণে মানুষটার সরু সরু চোখের কার্নিশ ছাপিয়ে নোনাপানির ঢল নেমেছিল। হাঁটু মুড়ে বসে ও সকলের সামনে জড়িয়ে ধরেছিল আমার কোমর। সময় নিয়ে পেটে কান পেতে বসেছিল কতক্ষণ, ফিসফিসিয়ে কিসব বলল। কতক্ষণ ঠোঁট চেপে ধরে রইল। আর যাওয়ার বেলা করতলে মুখ নিয়ে কোমল স্বরে বলল,
“ওরে মানুষের মতো মানুষ করিস ত্রয়ী৷ আমার কথা জানাস না। বলিস ওর বাবা মরে গেছে। ওর মারে একসময় বহু কষ্ট দিয়েছিল, নিষ্ঠুরের মতো ব্যবহার করছিল তাই বিনিময়ে মৃত্যুর শাস্তি উপহারস্বরূপ পেয়েছে। ও যেন আমার শিক্ষা না নেয়। আ..আচ্ছা সব শোনার পর ও আমারে অনেক ঘৃণা করবে তাই না ত্রয়ী?
— উঁহু। তুই এমন একটা মানুষ তোকে কখনো ঘৃণা করাই যায় না অপু। আর আমিও আমাদের সন্তানকে ঘৃণার ভাষা শেখাব না। ও শিখবে শুধুই ভালোবাসা, অনিঃশেষ ভালোবাসার শব্দ।
— তোকে আমি তোর প্রাপ্য ভালোবাসা দিতে পারলাম না বউ। ক্ষমা করিস আমাকে। তবে মনে রাখিস আমাদের বাবুর মধ্যে, তোর ভালোবাসার মধ্যে তোর অপু আজীবন বেঁচে থাকবে। ভালোবাসি আমার আসমানী পালক, বড্ড ভালোবাসি। একটাই অনুরোধ কখনো আসিস না আমার সামনে, উজ্জ্বল জীবনে এই আঁধারকে মনে রাখিস না।
শেষবার আমার কপালে উষ্ণ স্পর্শ এঁকে চলে গেল অপু।
আমার বলতে ইচ্ছে করল, শেষবার যে জড়িয়ে ধরা বাকি অপু। আরেকবার তোর হাত ধরে মসৃণ একটা পথ চলা বাকি। সবাইকে সবটা দিয়ে আমার হিসেবের খাতা শূন্য করে কেন চলে যাচ্ছিস? তুই জানিস না সকল আঁধারের সমাপ্তি লেখা থাকে এক আলোকবিন্দুতে। অপেক্ষা কেন করলি না? কেন আলোকে অগ্রাহ্য করে চির আঁধারে নিলীন হওয়াটাই বেছে নিলি!
বলা হলো না। প্রতিবারের মতো চারিদিক পরিপূর্ণ করে ত্রয়ীর ঝুলি শূন্যতা বেছে নিলো।
আর আমার আঁধারপ্রিয়? অপরাধবোধে ধুঁকে ধুঁকে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিলো ক’দিন বাদেই। নতুন করে তাকে হারিয়ে আমি আর শোক করলাম না। শোকে শোকে ভরা জীবনে নতুন ব্যথা যে ব্যথা মনে হয় না।
এরপর দিন-মাস বছর করে জীবনের রিক্ত বসন্তগুলো কেটে যেতে লাগল। প্রতিজ্ঞাকে বেদবাক্য করে প্রিয় স্মৃতিচিহ্নটাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গড়ে তুললাম। অপুর মায়ের দেখা অপূর্ণ স্বপ্ন, আমার অপুর সমস্ত স্বপ্ন পরিশেষে পূরণ হলো আমাদের ছেলে অভির হাত ধরে। বিদীর্ণ সম্পর্কের বড্ড আকাঙ্ক্ষিত বন্ধন দৃঢ়তায় অঙ্কিত রইল নশ্বর পৃথিবীর বুকে।
আর অপুর আসমানী পালক? সে বরাবরের মতো নিজের শেষ প্রহর পর্যন্ত প্রিয়তমকে কামনা করে নিঃশেষ হয়ে গেল। কে জানে তাদের অদৃষ্টের কি লিখন! পৃথিবীর বুকের অপূর্ণতাগুলোকে সৃষ্টিকর্তা পরপারে পূর্ণ করবেন কি না এ একমাত্র তাঁরই পত্রে লিখিত রইল। যা জানার দুঃসাহস কারোর নেই;কক্ষনও নেই।
~সমাপ্ত~
মিথির গপ্পোসপ্পো