ইচ্ছে কথন পর্ব-১০

0
827

#ইচ্ছে_কথন
#writer_falak_moni
#পর্ব_১০

আজ রাতটা লঞ্চে কাটাতে হবে সবাইকে।আকাশ, সাথী, কল্প নাতাশা তরু, প্রিয় সবাই অলরেডি চলে এসেছে। তবে সিধু আর তার গার্ল ফ্রেন্ড এখনো আসেনি। বিকেল ৫টা বাজতে চলল এখনো তাদের কোনো খবর নেই।আর ৩০ মিনিট পর লঞ্চ টার্মিনালের কাছ থেকে ছেড়ে দিবে। প্রিয় পকেট থেকে ফোনটা বের করলো সিধুকে কল করবে বলে। তখনই দেখা গেল সিধু আর তার গার্ল ফ্রেন্ড আসছে। প্রিয় ফোনটা পকেটে আবার রেখে দিল। সিধু সামনে এসে প্রিয়কে জরিয়ে ধরে বলতে লাগলো,

সরি দোস্ত ওর জন্য ওয়েট করতে করতে দেরি হয়ে গেল।

ওকে ঠিক আছে যা। তরু প্রিয়র পেছনে দাড়িয়ে ছিল যেটা প্রিয় দেখেনি। সিধুর সাথে মেয়েটাকে দেখে তো তরুর চোখ কপালে। কারন এটা তরুর বান্ধবী নীলিমা। কিন্তু এখানে কিভাবে। এসব ভেবে তরু প্রিয়র সামনে দাড়িয়ে বলতে লাগলো,

আরে নীলি তুই।এখানে কিভাবে?

প্রিয় মুখটাকে বাঁকা করে বলতে লাগলো,

সিধুর গার্লফ্রেন্ড।

তরুর এবার আরো অভাক হলো।নীলি তলে তলে প্রেম করছে৷ আর সে কি না কিছুই জানেনা। তরু নীলির দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,

কি রে নীলি সত্যিই,

নীলিমা এবার হাসি দিয়ে বলতে লাগলো। বল্লাম না সারপ্রাইজ।

তরুর এবার মনে হলো।সেদিন তো নীলিমা বলেছিলো সারপ্রাইজ এর কথা তাহলে কি এটাই সেই সারপ্রাইজ। তাহলে কি নীলিমা সব জানতো নাকি প্রিয় আর তার ব্যাপারে। কারন তরু নীলিমাকে শুধু এতটুকুই বলেছিলো সে বিবাহিতো আর তার স্বামীর নাম প্রিয় চৌধুরি। কিন্তু এখন তো সব ক্লিয়ার। পাশে দাড়িয়ে থাকা সিধু বলতে লাগলো,

হায় ভাবি কেমন আছেন।

তরু ভালো বলেই নীলিমাকে নিয়ে চলে গেল। প্রিয় তরুর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। কারন এ কয়টা দিন তরু প্রিয়র সাথে কথা বলার কোনো প্রয়োজন মনে করেনি। সব সময় তাকে এড়িয়ে চলতো। যেটা প্রিয়র ভালো লাগতো না। কিছু বলতে গেলেও এড়িয়ে যেত হেন তেন বলে। যেটা দেখলে প্রিয়র পায়ের রক্ত মাথায় অতিক্রম হতো।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতে নিল।নাতাশা আর কল্পের রুম নং ৩৫৪ তরু আর প্রিয় আলাদা রুমের বুকিং এর জন্য বলেছিল।সিধু কল্প আকাশ মিলে তাদের একই রুমে সিফ্ট করেছে। তাই তাদের রুম নং ৩৬৫। ৩৬৬ আর ৩৬৭ দুই রুমে রয়েছে সাথী, লীলিমা এক রুমে আর আকাশ সিধু এক রুমে।

নাতাশা একটা সাদা রঙের জামা পড়ে বসে বসে ফোন টিপছে। কপালে কালো টিপ ঠোঁটে হালকা গোলাপি রঙের লিপস্টিক। তার সামনে বসে আছে কল্প গালে দিয়ে। কল্প বসে বসে চিন্তা করছে এই ছোট বেড দুজন শেয়ার করবে কিভাবে। কোথায় ঘুমাবে সে। নাতাশা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে গলা খাকড়িয়ে বলতে লাগলো,

কল্প তুমি এত ঘুম কাতুরে কেন বলো তো।সারাক্ষণ শুধু ঘুম নিয়ে চিন্তা ভাবনা তোমার মধ্যে। এত ঘুম আসে কই থেকে।

কল্প নাতাশার কথা শুনে একটা হাসি দিল। হাসি দিয়ে বলতে লাগলো,

নাতাশা, আমার আগে ঘুম নিয়ে তেমন চিন্তা ছিল না। যেদিন তোমার সাথে বিয়ে হয় তারপর থেকেই আমার ঘুম নিয়ে যত চিন্তা।

কল্পের কথা শুনে নাতাশা হাসবে নাকি কাদঁবে বুঝতে পারছে না। কল্প আবারো বলতে লাগলো,

ঘুম হলো মানুষের সমস্ত ক্লান্তির নির্যাস। যেখানে থাকেনা কোনো চিন্তা ডিপ্রেশন ডেসপায়ার। তাই শরীরকে ভালো রাখার জন্য হলেও আমাদের ঘুমের দরকার।

কথাগুলো এক নাগারে বলে গেল কল্প। নাতাশা বসে বসে শুনে যাচ্ছিলো।সত্যিই তো লোকটা কত সুন্দর করে সিম্পল ভাবে ঘুমের বর্ণনা দিয়ে দিল।

রাত যত গভীর হচ্ছে তরুর ভেতর ততোই দূরদর্শিতা রণকৌশলী যুদ্ধের মতো ছাতক মারছে।

যেই করেই হোক ওনার সাথে একই রুম শেয়ার করা, ইম্পসিবল। ওনার সাথে রুম শেয়ার করা যাবে না। এর থেকে বিরত থাকতে হবে। কারন আমি ঘুমালে আমার পা থাকে একদিকে মাথা থাকে অন্যদিকে । যদি ভুলবশত ওনার হাতের সাথে আমার হাতটা লেগেও যায় পরে বলবে,

তরু তুই ইচ্ছে করে লাগিয়েছিস। তরু তর এত বড় স্পর্ধা তুই আমাকে টার্চ করেছিস। উহহ,, আরো কত কি। খোদা তুমি আমাকে ধৈর্য্য দাও, জলদি দাও, এখনই দাও কুইক।

কথাগুলো বলেই তরু লঞ্চের ছাদে উঠে গেল। রাত ১১টা বাজে প্রিয় একদিকে চিত হয়ে শুয়ে আছে। কিন্তু তরু রানীর এখনো কোনো আসার কোনো নাম গন্ধও নাই।১১ঃ৩০বাজতে চলল এখনো তরুকে দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটা গেল কোথায় এসব ভেবে প্রিয়, সিধুর রুমের সামনে গেল।দরজা নক করার আগেই দেখতে পেল, সিধু আর নীলিমা একে অপরকে জরিয়ে ধরে আছে। এমন দৃশ্য দেখে প্রিয় তাড়াতাড়ি করে সেখান থেকে চলে গেল।কিছুদূর হাটার পর দেখতে পেল নাতাশা আর কল্প হাসাহাসি করছে। তাদের এমন খুশি দেখে প্রিয়র ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা ফুটে উঠলো।নাতাশার দিকে তাকিয়ে প্রিয় দূর থেকেই বলতে লাগলো,

নাতাশা তরুকে দেখেছো??

কল্প তখন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

লঞ্চের ছাদে যাও পেয়ে যাবা।

প্রিয় আর একমিনিটও দেরি করলো না। সোজা দৌড় দিল লঞ্চের ছাদে।
গন্তব্যে এখন ঠিক কোথায় এসে বেয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝা খুবই মুশকিল। চলন্ত লঞ্চের ছাদে দাড়িয়ে দাড়িয়ে রাত্রি যাপন করা খুবই মন মুগ্ধকর এক প্রবনতা। যেটা কেবল সেই বুঝে যে এমন একটা দৃশ্য প্রতিস্থাপন করেছে। তরু হাত দুটো সামনের দিকে দিয়ে দাড়িয়ে দাড়িয়ে চলন্ত লঞ্চের বাতাসের আনাগোনা উপভোগ করতে লাগলো। লাল রঙের একটা টপস পড়ে আছে তরু গলায় সাদা রঙের একটা ওড়না পেচানো। চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া। চলন্ত লঞ্চের মনোমুগ্ধকর বাতাসের স্রোতে দুপাশের চুল গুলো উরে যাচ্ছে এক হিমেল হাওয়ার আবেশে। তরু তার চুলগুলো সেভাবেই ছেড়ে দিল যেভাবে তারা উরনচন্ডী হতে চায়। পেছনে দাড়িয়ে থাকা প্রিয় এমন দৃশ্য দেখে এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল।তরুর দিকে। এক অন্যরকম স্নিগ্ধ সুষমায় ভরপুর হয়ে আছে গভীর রাতের এই দৃশ্য। যেই দৃশ্যটাকে প্রিয় হেয়ালিভাবে উরিয়ে দিতে চায় না। হয়তো এমন দৃশ্য আর কখনো আসবে না সময়টাও না। এক অজানা অনুভূতির সাথে পরিচিত হতে লাগলো প্রিয়।যেই অনুভূতিটা কেবল সেদিনই প্রথম এসেছিলো। যেদিন তরুর ছবিটা নিজের ফোনে দেখে ছিল।দূর থেকে মেয়েটাকে ছোট বলে মনেই হচ্ছে না। কে বলে মেয়েটা ছোট। প্রিয় না চাইতেও মুখ ফুসকে বলে ফেলল,

কেশবতী।

তরু হঠাৎ প্রিয়র ধ্বনি আওয়াজ পেয়ে পেছনের দিকে তাকালো। তাকিয়ে দেখতে পেল প্রিয় দাড়িয়ে আছে। ব্লাক রঙের জ্যাকেট গায়ে নিচে ব্লু কালার টিশার্ট। চুলগুলো স্পাইক করে একপাশে রাখা। আজকে দাড়িগুলো কেটে একটু ছোট করছে। যার জন্য প্রিয়কে অন্যরকম লাগছে। লোকটা বয়স যে ৩০হয়েছে বুঝাই যাচ্ছে না। যে কেউই দেখে বলবে ২৬বছরের পুরুষ। লোকটা তেমন ফর্সা না হলেও চেহায় এক রকম মায়া আছে। বিশেষ করে চোখের ভেতর। যেই এ চোখে তাকাবে সেই খুন হয়ে যাবে। প্রিয় আস্তে আস্তে এক অজানা ঘোরে এসে তরুর সামনে দাড়ালো।দাড়িয়ে তরুর পাশের উরন্ত চুলগুলোকে এক হাত দিয়ে কানের পাশে গুঁজে দিল। খুবই ইচ্ছা ছিল মেয়েটার এমন এলো কেশী চুলগুলোকে একটিবার ছুঁয়ে দিতে। প্রিয় সেটাই করলো। প্রিয়র এমন স্পর্শ পেয়ে তরু কেপে ওঠলো চোখগুলোকে সাথে সাথেই বন্ধ করে ফেলল এক অজানা ঘোরে। প্রিয় তরুর এমন ফেইস দেখে আরো মায়া জাগতে লাগলো।এ যেন এক কেশবতী রূপেরঘটা মায়াবতী। যার তুলনা নোট বুক করেও পার পাওয়া যাবে না। প্রিয় এক ধ্যান এক মন নিয়ে তাকিয়ে আছে তরুর এমন মায়া ভরা মায়াময়রূপের দিকে। তরু মনের ভেতর উতালপাতাল ঢেউয়ের আগমন হতে লাগলো।এভাবে তাকিয়ে থাকলে যে সে খুন হয়ে যাবে। তাই তরু গলা খাকড়ি দিল।সাথে সাথেই প্রিয় দূরত্ব বজায় রেখে সরে গেল। তরু যেন হাফ ছেড়ে বাচঁলো। প্রিয় এক হাতে মাথার চুলে খামচি দিয়ে তরুর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,

কি রে রুমে যাবি না। এই ঠান্ডায় এভাবে দাড়িয়ে আছিস কেন। জ্বর সর্দি হবে তো।

তরু একটা ম্লানমুখে মৃদু হাসি দিল। তারপর বলল,

আমাকে নিয়ে ভাবো তুমি?

প্রশ্নটা করেই তরু নিচে চলে গেল।প্রিয় সেখানে দাড়িয়েই রইলো। কথাটার মানে কি হতে পারে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না সে। মেয়েটা এমন কেন।

#চলবে