একদিন নববর্ষা পর্ব-০৭

0
258

একদিন নববর্ষা – ৭
অদ্রিজা আশয়ারী
__________

বর্ষা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। মাচা থেকে নামতেই দূরত্ব টা কমে এল আমাদের মাঝে। তার হতবিহ্বল ভাব তখনো কাটেনি। হাতের নোট গুলোর দিকে একবার চেয়ে প্রশ্নাতুর চোখে তাকাল আমার দিকে, ভ্রুতে গাঢ় কুঞ্চন এঁকে।
–” এগুলা কি? কেন দিসেন আমারে?”

বর্ষার একটা হাত তখনো আমার হাতে। আমি সেই হাতটা টেনে অধৈর্য হয়ে বললাম,
–” বর্ষা, আমাকে কথা দাও। আমি চলে যাওয়ার পর তুমি এক বারের জন্যও এবাড়িতে পা রাখবে না। এখানে যেই আসুক। তার রান্নার দায়িত্ব তুমি কোনো ভাবেই নিতে পারবে না। আপাতত এগুলো তোমার কাছে রাখো। যেকোনো দরকারে এখান থেকে খরচ করো। আমি খুব শীগ্রই ফিরে আসব। কিছু ব্যাপার সামলানোর জন্য ঢাকায় ফেরা জরুরি হয়ে পড়েছে। ততদিন তোমার এ বাড়িতে পা ফেলা পুরোপুরি নিষে’ধ।”

উত্তরে কিছু বলার বদলে বর্ষা মাথা নুইয়ে ফেললো। আকাশের মন খারাপে জমে থাকা কালো মেঘ দেখলে, বাতাস যেমন অধীর, বিদ্রোহী হয়ে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। বর্ষা মুখে হঠাৎ জমতে শুরু করা কালো মেঘ দেখে আমি তেমনি অধীর হয়ে উঠলাম। মনে হলো বর্ষার মুখে জমে থাকা মেঘ আমার বুকের ভেতর কালো বিষাক্ত ধোঁয়া হয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এর আগে কারো মন খারাপের এতটা পরোয়া আমি কখনো করি নি। অথচ মনে হচ্ছে বর্ষার এই নৈশব্দ মনোভাব যেন আমার ভেতরে কষ্টের বাণ তুলছে একের পর এক। ক্ষণে ক্ষণে জড়িয়ে যাচ্ছি আমি এই বিষাক্ত মায়ায়।
বুঝলাম খুব বাজে ভাবে ফেঁসে গেছি আমি একটি গ্রাম্য মেয়ের প্রেমে।

***

মোংলার জলপথ ছেড়ে আরও খানিক স্থলপথে যাত্রার পর, যশোর টু ঢাকা আকাশপথে যাত্রা শেষে তখন সবে এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়েছি। বা দিকে পার্কিং করে রাখা কফি রঙা হাইস টার দিকে ব্যাগ প্যাক নিয়ে এগিয়ে গেল রশু। ওটা বাড়ি থেকে আমাদের নিতে আরও আধঘন্টা আগে এসে পৌঁছেছে।

যাত্রার পুরো সময়টা বিষন্ন কেটেছে আমার। এই প্রথম একটু ভালো লাগছে। বর্ষাকে ছেড়ে আসার সন্তপ্ত অনুভুতিটা এখন অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। নিজের চিরচেনা শহরে, জনসমুদ্রের মাঝে নিজেকে হারাতে পেরে। সুন্দরবনের অরণ্য জীবনের সেই উদাস, এঁদো-সোঁদা গন্ধযুক্ত বন্য অনুভুতি টা আর পাচ্ছি না। যত এই জনারণ্যে প্রবেশ করছি তত ফিকে হয়ে আসছে অনুভুতি গুলো। শুধু বর্ষা ছাড়া।

গাড়ির পেছনে উঠে বসতেই একরাশ ধুলোর মেঘ মুখে এসে লাগল। তা দেখতে পেয়ে রশু জানালার কাঁচ বন্ধ করে দিল। বিরক্তি এসে গেল আমার।
–” কাঁচ নামিয়েই রাখ। বাতাস আসুক। সাথে শহুরে গন্ধ আর ধূলোর শুষ্ক ঘ্রাণও আসুক।”
আমার কথা শুনে রশু হেসে ফেলল।
–“ধূলোরও আবার ঘ্রাণ হয় নবুদা? আপনি পারেন বটে! ”

–“খবরের কাগজ রাখবেন সাব?”
জানালায় বাড়ানো ছোট মুখটার দিকে আমি আর রশু একযোগে তাকালাম। ধূলোময়লা মাখানো, হলদে গেঞ্জি পড়া ছেলেটার হাতে ডজনখানেক পত্রিকা তখনো অবশিষ্ট। ছেলেটার বয়স বোধহয় বর্ষনের মতোই। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামতে চলেছে। এই পত্রিকা গুলোর মেয়াদ প্রায় ফুরিয়ে গেছে। আর কেউ কিনবে না পত্রিকা। অবুঝ ছেলেটা সেটা বুঝতে পারছে না। ওয়ালেটে বের করে, হাতে যা উঠে এলো ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে বললাম,
–“একটা পত্রিকা দাও।”
ছেলেটা কিছু বুঝতে না পেরে দায়সারা ভাবে বলল
–” একটার দাম তো মাত্র দশ টাকা সাব!”
খেয়াল করলাম ওর কপালের ওপর থাকা ঘন কালো চুল বেয়ে টপাটপ ঘাম নেমে আসছে। গরমের তীব্রতায় অতিষ্ঠ দুটি চোখ। ঠোঁটদয় রুক্ষ।
–“রেখে দাও।”

–“তাইলে আপনে সবগুলা কাগজই নেন।” বলে সে জানলা দিয়ে বাড়িয়ে ধরল পত্রিকা নামক সেই মূল্যহীন কাগজ গুলোকে। আমি তার হাত থেকে ওগুলো নিয়ে পাশে রাখলাম৷
ছেলেটা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। এই ভর সন্ধ্যেতেও যে কেউ তার পত্রিকাগুলো কিনে নেবে, এত ভালো মূল্যে, সে ভাবতেই পারেনি!

ছেলেটা আর দাঁড়াল না। টাকাটা নিয়ে চোখ দিয়ে হেসে, আমাকে একটা অদৃশ্য ধন্যবাদ উপহার দিয়ে মুহুর্তে গায়েব হয়ে গেল। আমি ওপর থেকে একটা পত্রিকা নিয়ে সামনে মেলে ধরলাম। রশু সারহীন কণ্ঠে বলল,
–” এতো পত্রিকা কিনেছেন। বসে থেকে জ্যাম দেখে কি করব! দিন আমিও একটা পড়ি।”

ড্রাইভার সবে ভেতরের বাতি গুলো জ্বেলেছে। পত্রিকা আমার সবসময় শেষ পাতা থেকে পড়তেই ভালো লাগে। রশুকে একটা দিয়ে এবার নিজেও পত্রিকা মেললাম। শেষ পাতাটা মেলে ওপরে নজর বুলিয়ে নিচের হেডিংয়ে চোখ পড়তেই আমার সমস্ত শরীর থেমে গেল। পত্রিকা সহ হাতটা কেঁপে উঠল একবার ।
সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা “জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক নাব্য ইমতিহানের গোপন প্রেমের খবর ফাঁস!”

নিচে বিস্তারিত –
বর্তমান কালের অন্যতম জনপ্রিয় তরুণ কথাসাহিত্যিক নাব্য ইমতিহান। লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, প্রেমের উপন্যাস। তার লেখনীতে কাব্যিক ভাব আর হেয়ালিই মুখ্য। এমনকি বন্ধু ও আত্মীয় মহলের মতে তিনি নিজেও মানুষ হিসেবে ভীষণ হেয়ালি ও বেপরোয়া স্বভাবের। অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রয়েছে তার রয়েছে মিলিয়ন ফলোয়ার। সাহিত্যের পাশাপাশি নারী ভক্ত কূল এই তরুণ লেখকের হেয়ালিকেও ভালোবাসেন সমানভাবে। নাব্যের ব্যাক্তিগত জীবন নিয়েও তারা চড়ম আগ্রহী। সাফল্যের শির্ষে পৌঁছেও কেন তিনি এখনো বিয়ে করছেন না সেই প্রশ্ন উঠে এসেছে বারবার। এবার পাওয়া গেল উত্তর। জানা গেছে দীর্ঘদিন ধরেই প্রেম করছেন নাব্য। সেই প্রেমও হেয়ালিতে ভরপুর। গ্রামের অতি সাধারণ এক কিশোরীর সঙ্গে প্রেমে জড়িয়েছেন তিনি। নির্জনে সাহিত্যসাধনার উদ্দেশ্যে সুন্দরবনের কোনো এক গ্রামে গিয়ে সেই মেয়েটির সাথে তার পরিচয় ঘটে।

শেষ কিছুদিন ধরে মিডিয়া, সাহিত্য কোথাও কোন পদচারণা নেই নাব্যের। শোনা যায় এখন তিনি সেখানেই আছেন। একসাথে থাকতে শুরু করেছেন তারা। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবেন শীগ্রই। কিছুদিন পর পর নাব্যের হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার ব্যাপার টার একটা যোগসুত্র খুঁজে পেয়েছেন অনেকেই এই প্রেমের সাথে।

_______________

–“রশু!” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
রশু পত্রিকা থেকে মুখ সরিয়ে দায়সারা ভাবে আমার দিকে ফিরল। ফিরেই অবাক হয়ে বলল,
–” আরে! কি হয়েছে নবুদা?”
আমি থমথমে স্বরে বললাম,
–“শেষ পৃষ্ঠার হেডিং দেখো।”
রশু দ্রুত পত্রিকা উল্টিয়ে দেখল। লেখাটা পড়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকাল আমার দিকে। আমার ভেতরে তখন একশো বিদ্যুতের ক্রুদ্ধ গর্জন। চোখে ঝিকিমিকি তারা। আমি দ্রুত ড্রাইভার সাহেদের দিকে তাকালাম। ও তো শহরেই ছিল। এসেছেও বাড়ি থেকেই। সে কি কিছুই শোনে নি!
সাহেদ যতটা সম্ভব মাথা নিচু করে গাড়ি চালাচ্ছে। অপরাধবোধে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে তার মুখ। যেন ব্যাপার টা সেই ঘটিয়েছে। গাড়িতে বসে থাকা তিনজন এখন পর্যন্ত কেউ কারো সাথে এ বিষয়ে একটা কথা না বললেও আমরা জানি তিনজনের মাথায় একই ব্যাপার ঘুরছে।
রশু অধৈর্য গলায় সাহেদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
–” সাহেদ, বাড়িতে সবাই কি জেনে গেছে ব্যাপার টা?”
সাহেদ মিনমিনে স্বরে উত্তর দিল
–” জি।”
–“চাচী আম্মা কি বলছেন সব শুনে?” রশু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল সাহেদ কে।
সাহেদ থেমে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,” খালাম্মা সকাল থেকে খাওয়া – দাওয়া বন্ধ করে বসে আছেন। প্রেসারের বড়ি গুলাও খাননাই। প্রেসার বেড়ে বিচ্ছিরি অবস্থা। বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। ”
রশু এবার ভয়ানক ভাবে চেঁচিয়ে উঠলো।
–” তুমি এতক্ষণ কিছু জানাওনি কেন আমাদের? হ্যাঁ? এতকিছু ঘটে গেছে আর আমরা এখনো কিছুই জানি না! ইডিয়ট। ”

বা হাতে মাথায় এলোমেলো আঙুল চালাতে চালাতে আমি পকেট থেকে বন্ধ ফোনটা বের করলাম। রশুকেও দেখলাম পকেট থেকে ফোন বের করল। ফোন চালু করে ডাটা অন করতেই হুড়মুড় করে আসতে থাকা অসংখ্য মেসেজ, নোটিফিকেশনের জোয়ারে ফোন হ্যাং হওয়ার যোগাড়। তারপর প্রথম যেই কলটা এল সেটা নিতিনের। নিতিন ইমরোজ। আমার একমাত্র ছোট বোন। বয়স চৌদ্দ। আমার সাথে তার বয়সের ফারাক টাও চৌদ্দ বছরের।

কল পিক করে কানে রাখতেই একশো সাইকেলের হর্ণ একসাথে বাজতে শুরু করল যেন। নিতিন তার রিনরিনে স্বরে একনিশ্বাসে বলতে শুরু করল নানান এলোমেলো কথা। প্রশ্নের পর প্রশ্নের বান ছুড়তে লাগল আমার দিকে।

শেষ প্রশ্নটা ছুড়ল,
-“দাভাই, তোমরা কি সত্যিই একসঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলে?”

নিজের ছোট বোনের মুখে এই প্রশ্ন শুনে প্রথম যে ভাবনাটা আমার মাথায় এল তা হল, যে এই গুজ*ব রটিয়েছে ওকে খুঁজে বের করে জ্যা*ন্ত পু*তে ফেলা।

আমি শুধু নিশ্বাস ফেলে বললাম,” ফোন রাখ। আমি আসছি। ”

গেটের পাশে, উচু প্রাচীলে বড় বড় সাদা অক্ষরে “রাবেয়া মঞ্জিল” লেখাটা দেখেই আমার হৃদ স্পন্দন বেড়ে গেল কয়েক গুন। কিভাবে আম্মার মুখোমুখি হব শুধু সেটাই ভাবছিলাম এতক্ষণ। নামটা দেখে দাদির কথা মনে পড়ল। আমার প্রাচীন মনা দাদি তার নাতির নামে পেপারে লেখা কু-কীর্তির কথা গুলো কিভাবে হজম করেছেন কে জানে।

গাড়ি থেকে নামতে নামতে ভেবে রাখলাম বসার ঘর খালি পেলে সোজা নিজের রুমে ঢুকে যাব। কিন্তু বাড়িতে এক পা রাখতে না রাখতেই নিতিন এসে হাজির। দু’হাতে দুটো ফোন নিয়ে সে দৌড়ে এল আমার কাছে। কম্পিত স্বরে বলল,
-“দাভাই, তুমি এসব কি করেছ?
আম্মার প্রেসার বেড়ে গেছে। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না। দাদি সারাদিন জায়নামাযে বসে কেঁদেছে। কাল বাবা সিলেট গেছে। কাজে আটকে আছে। এসব কিছু শুনেও ফিরতে পারছে না। চাচী, ফুফু, মামা, নানুভাই… সবাই ফোন করছে। বলছে,
নাব্য আমাদের বংশের মান কেড়েছে। বিয়ের আগেই একটা ফকিরনি মেয়ের সাথে….. ” নিতিন এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।
নিতিনের অবস্থা টা বুঝতে পারলাম। বাবা মায়ের শেষ বয়সের সন্তান সে। বড় আদরের, আহ্লাদি মেয়ে । বাবা, আমি কেউ এখানে নেই, মা অসুস্থ, দাদি ভেঙে পরেছে। বেচারি একা একা সামলাচ্ছে সব দিক। তার ওপর আত্মীয় দের ফোন। আমি এগিয়ে নিতিনের মাথায় হাত রাখলাম। সে তার শত চিন্তা জর্জরিত ক্লান্ত মাথাটা আমার বুকে হেলিয়ে দিল। ওর মাথাটা বুকে চেপে একটা চুমু খেয়ে বললাম।
-” কিচ্ছু হয়নি আমার ছোট্ট পাখি। ভাইয়া এসে গেছে। এইবার সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।”

নিতিন নাক টেনে বলল,
–“আচ্ছা আগে আম্মার কাছে চল।”

এতক্ষণে আমার আর বুঝতে বাকি নেই কে হঠাৎ আমাকে সকলের চোখে কালার করার জন্য খবরটা ছড়িয়েছে। রাহিল সোবহান।

একটা দীর্ঘ শ্বাস গোপন করে আম্মার ঘরের দিকে এগোলাম। দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই আম্মা আমাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন। রাগের আতিশয্যে বিছানা থেকে বালিশ তুলে আমার দিকে ছুড়ে মেরে বললেন,
–” নবু, তুই কি করেছিস? পত্রিকায় যা বেরিয়েছে ওসব কি সত্যি কথা? তুই কি সত্যিই সুন্দরবনে গিয়ে একটা জংলী মেয়ের সাথে রাত কাটাচ্ছিস? তুই নাকি ওকে বিয়েও…. ”
বাকি কথা শেষ করবার আগেই আমি বালিশ তুলে নিয়ে ভয়ে ভয়ে আম্মার পাশে গিয়ে বসলাম। আলতো করে আম্মার মাথায় হাত রেখে শান্ত করবার জন্য বললাম,
–” আম্মা…. আমার আম্মা। তুমি শান্ত হও। কিচ্ছু হয়নি। ওসব গুজব। মিথ্যে কথা।”

আম্মা বাচ্চা মেয়ের মতো চোখের পানি মুছে বললেন,
–“সত্যি?”
দূর্বল স্বরে প্রতুত্তর করলাম।
–” সত্যি। শুধু একটা ব্যাপার ছাড়া।”
–” কি?”
মনে প্রবল সাহস সঞ্চয় করে বললাম।
–“মেয়েটিকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি। ”
আম্মা ঝটকা মেরে আমার হাতটা সরিয়ে দিলেন।
চলবে…..