এক খণ্ড কালো মেঘ পর্ব-১৩+১৪

0
381

#এক_খণ্ড_কালো_মেঘ
#পর্ব_১৩
#নিশাত_জাহান_নিশি

অয়ন্তীর নিঁখোজের খবরটা পেয়ে-ই অনিক তার সমস্ত কাজকর্ম ছেড়ে ঢাকায় ছুটে এসেছে। সেও নিজের মত করে অয়ন্তীকে পাগলের মত খুঁজে বেড়াচ্ছে। আলিজাকে নানানভাবে জেরা করছে। ভার্সিটিতে অয়ন্তীকে কেউ বিরক্ত করত কীনা বা অয়ন্তী কারো সাথে কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল কীনা সব খবরাখবর সে এই মাঝরাতে এসে আলিজার কাছ থেকে নিচ্ছে। ঘুম টুম যেন সব হারাম হয়ে গেছে তার!

আলিজার সাথে কথাবার্তা শেষ করে অনিক যেইনা হম্বিতম্বি হয়ে বাড়ি থেকে বের হতে যাবে ঠিক তক্ষণি কোনোভাবে তার চোখ পড়ল ড্রয়িংরুমের পূর্ব-পার্শ্বে থাকা রাফায়াতের ছোট্টো রুমটির দিকে! খোলা দরোজা। ভেতর থেকে পুরুষালী কণ্ঠের সুমধুর গান ভেসে আসছে! এই মাঝরাতে আবার কে গান গাইছে? কার মনে এত সুখ, এত রঙ? তীব্র কৌতূহল নিয়ে অনিক তার শার্টের কলার ঝেড়ে যেইনা খোলা দরোজা ডিঙিয়ে রুমের ভেতর প্রবেশ করল অমনি সে দেখতে পেল একজন সুঠাম দেহের অধিকারী পুরুষ তার ঠিক উল্টোদিক ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। শূন্য আকাশের দিকে মুখ তার। ড্রিম লাইটের আধো আলোতে তার পেছনের দিকটা অনিক তার আবছা নয়নে দেখতে পারছে। উন্মুক্ত ছেলেটির শরীর। মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে ফরফর করে ইংরেজি গান! যে গানের অর্থ সে সঠিক ধরতে পারছেনা। কণ্ঠটা যদিও তার পূর্ব পরিচিত বলে মনে হচ্ছে তবে ছেলেটি কে? তা সে এখনো অবধি আন্দাজ করতে পারছেনা! কৌতূহল তার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে লাগল। এইদিকে আলিজার বুকের ভেতরে সাইক্লোন বইতে লাগল! শুধু আলিজা-ই নয় বরং তার পরিবারের সবার মনে তীব্র ভয়-ভীতি কাজ করতে লাগল। সবার ভয় রাফায়াতকে নিয়ে। অনিক না আবার কোনোভাবে রাফায়াতকে দেখে ফেলে! অনিক সম্পর্কে তাদের সবার কম-বেশি ধারণা আছে। কতটা মা’স্তা’ন টাইপের এই ছেলে! তার উপর অনিক বর্তমানে চট্টগ্রামে থাকছে। রাফায়াতের বাড়িও চট্টগ্রাম! কোনোভাবে যদি তাদের কানেকশান থেকে থাকে বা দুজন দুজনকে আগে থেকে চিনে থাকে তাহলে তো রাফায়াতের জন্য তা হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে! এই মুহূর্তে তাদের ঠিক কী করণীয় আদোতেই বুঝতে পারছেনা তারা!

কিছু জানার বা দেখার আগ্রহ বেশিক্ষণ ছাপিয়ে রাখতে পারলনা অনিক। পা বাড়িয়ে সে যেইনা ছেলেটির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করল অমনি পেছন থেকে আরিফ এসে অনিকের নাম ধরে ডেকে উঠল! তার উদ্দেশ্য-ই যেন ছিল অনিককে তার লক্ষ্য থেকে আটকে দেওয়া! কার্য উদ্ধার হতেই সে উত্তেজিত গলায় অনিককে ডেকে বলল,

“অনিক ভাই অনিক ভাই। আমরা হয়তো অয়ন্তী ভাবির খোঁজ পেয়ে গেছি!”

মুহূর্তের মধ্যেই অনিক পিছু ঘুরে তাকালো। দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে আরিফের মুখোমুখি দাঁড়ালো। তীব্র অস্থিরতা নিয়ে আরিফকে ঝাঁকিয়ে বলল,,

“কোথায় অয়ন্তী বল?”

“নিচে চলুন। পরে বলছি।”

হুট করেই অনিকের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হলো! ভ্রু যুগল ঈষৎ কুঁচকে সে আরিফের দিকে সন্দেহজনক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। চোয়াল শক্ত করে বলল,,

“তুই তো আমার শত্রু ছিলি তাইনা? হুট করেই আমার সাথে এত ভাব জমাতে এলি কেন হ্যাঁ? কারণ কী?”

থতমত খেয়ে গেল আরিফ! তবুও সন্তপর্ণে পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার শতভাগ চেষ্টা করল। বিচলিত না হয়ে বরং স্পষ্ট গলায় বলল,,

“কী যে বলেন না ভাই? আমাদের মধ্যে যতই শত্রুতা থাকুক না কেন একই এলাকার ভাই ব্রাদার তো আমরা নাকি? এখন যেমন আপনার বিপদে আমি পাশে এসে দাঁড়িয়েছি তদ্রুপ আমার বিপদেও তো আপনি পাশে এসে দাঁড়াবেন তাইনা? আরিফ স্বার্থ ছাড়া কোনো কাজ করেনা ভাই। ভেবে নিন এর পেছনেও আমার স্বার্থ আছে!”

আরিফের মুখের কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো অনিক! বিশ্বাস করবে-ই বা না কেন? আরিফ যেভাবে ভোলাভালা কণ্ঠে হৃদয় নিংড়ানো সমস্ত অনুভূতি মাখিয়ে কথাগুলো বলছিল সেই জায়গায় যেকোনো কেউ এক কথাতেই তার মুখের কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য! আরিফের বাঁ কাঁধে ভরসার হাত রাখল অনিক! আরিফকে নিয়ে বাড়ির সদর দরোজার দিকে অগ্রসর হলো। অমনি মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো আরিফ। ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা আলিজার দিকে বাঁকা চাহনিতে তাকালো। শার্টের কলারটা খানিক উঁচিয়ে বেশ ভাব নিয়ে তার ক্ষমতা দেখালো! স্বস্তির শ্বাস ফেলল আলিজা! বুকে হাত রেখে মাথা নুয়ালো। বিড়বিড় করে বলল,,

“ভাগ্যিস! ঠিক সময়ে আরিফটা এসেছিল!”

বাড়ির প্রত্যেককে এক এক করে যার যার রুমে পাঠিয়ে দিলো আলিজা! ধীর পায়ে হেঁটে সে একাই রাফায়াতের রুমে প্রবেশ করল। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রাফায়াত কেমন যেনো পৈশাচিক হাসি হাসছে। একাধারে সিগারেট টেনে-ই চলছে! উন্মাদ হওয়া গলায় বলছে,,

“তোর খেলা শেষ হয়ে আসছে অনিক! ইউ আর ফিনিশড অনিক! ইউ আর টোটালী ফিনিশড!”

অবাক হলো আলিজা! শুধু অবাক নয় খুব বেশি অবাক হলো। রাফায়াতের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সে। সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,,

“আপনি অনিক ভাইকে চিনেন রাফায়াত ভাই?”

মুহূর্তের মধ্যেই সিগারেটটি হাত থেকে ছুড়ে ফেলল রাফায়াত! ঘটনার আকস্মিকতায় সে প্রসঙ্গ পাল্টে নেওয়ার শতভাগ চেষ্টা করল। আলিজার দিকে তাকিয়ে ঝেড়ে কেশে বলল,,

“এসব নিয়ে পরে কথা হবে আলিজা। নাও আই নিড টু স্লিপ।”

রাফায়াতের কথা মেনে নিলো আলিজা। মাথায় শত শত প্রশ্নের ঝুঁড়ি নিয়ে সে রাফায়াতের রুম পরিত্যাগ করল। আলিজা রুম থেকে বের হতেই রাফায়াত ঠাস করে রুমের দরোজাটি লাগিয়ে দিলো! ভয়ে আঁতকে উঠল আলিজা। বুকে থু থু ছিটিয়ে দৌঁড়ে সে তার রুমের দিকে অগ্রসর হলো। রুমে প্রবেশ করেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ল! অয়ন্তী কোথায় যেতে পারে বা কোথায় থাকতে পারে এই ভেবে তার কষ্টের পরিমাণটা যেন বেগতিক বাড়তে লাগল!

কিয়ৎক্ষণ পর বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়তে-ই রান্নাঘর থেকে চুপিচুপি খাবার নিয়ে রাফায়াত বাড়ি থেকে আবারও বের হয়ে গেল! ভোরের আনাগোনা তখন ধীর গতিতে শুরু হতে লাগল। এখন থেকে রাফায়াতের মোট তিনটি দিকেই ব্যালেন্স রাখতে হবে। প্রথমত, অয়ন্তীর কাছাকাছি থাকা। দ্বিতীয়ত, ঢাকা থেকেও চট্টগ্রামের খবর রাখা। তৃতীয়ত, সময় মতো আলিজাদের বাড়িতেও উপস্থিত থাকা। যেন কেউ কিছু সন্দেহ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা!

,
,

হাঁটুতে মাথা রেখে এখনো পূর্বের ন্যায় কেঁদে চলছে অয়ন্তী! ভয়ে, আতঙ্কে, যথেষ্ট খাবার এবং ঘুমের অভাবে তার দিন-দুনিয়া নিরান্দন ঠেকছে। তার উপর স্যাতঁস্যাতে অন্ধকার রুম। ওয়াশরুমের খুবই বিচ্ছিরি অবস্থা। টয়লেট পেলেও যাওয়ার মত কোনো উপায় নেই! ভাগ্যের এই নির্মম পরিহাসে তার মরি মরি অবস্থা। রাফায়াতের প্রতি তীব্র ক্ষোভ জমাট বাঁধতে লাগল তার মনে। সামনে পেলে এক্ষুণি রাফায়াতকে খাবলে খুবলে খাবে এই দুঃসাধ্য ভাবনা-ই তার মস্তিষ্কে চেপে বসল! অমনি অয়ন্তী খেয়াল করল খাটটা কেমন যেন নড়ছে। এক মুহূর্ত পর পর কেঁপে কেঁপে উঠছে। বুঝতে বেশি বেগ পেতে হলোনা কারো ফোন সাইলেন্ট মোডে বাজছে। তার মানে রাফায়াত কী ভুলে তার ফোনটা এখানে ছেড়ে চলে গেছে? আশার আলো যেন খুঁজে পেল অয়ন্তী! ঝট করে সে হাঁটু থেকে মাথাটা তুলল। হাতড়ে তার পাশ থেকে বাজতে থাকা ফোনটির স্ক্রীনে তাকালো। অশ্রুসিক্ত অসম্ভব ফোলা ফোলা চোখে সে স্ক্রীণে ভাসতে থাকা সেভ করা নাম্বারটি স্পষ্টভাবে দেখতে পারছিল না! চোখে প্রচণ্ড জ্বালা করছিল। চট জলিদ কলটি কেটে সে অনিকের নাম্বারে কল করার মত দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিলো। তবে অতি উত্তেজনায় কলটি কাটতে গিয়ে হঠাৎ রিসিভ হয়ে গেল! অমনি হেঁচকি তুলে কাঁদতে থাকা একটি মেয়ের কণ্ঠস্বর তার কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হলো! ভরাট গলায় নিদারুন কাকুতি মিনতি করে মেয়েটি বলল,,

“আমাকে মাফ করে দাওনা রাফায়াত প্লিজ। আমি যা করেছি ভুল করেছি। চরম ভুল করেছি। তোমার সাথে সম্পর্কে থাকার পরেও আমি অন্য কারো সাথে গভীর সম্পর্কে জড়িয়েছি! বিশ্বাস করো আমি জড়াতে চাইনি তার সাথে। কথায় আছেনা? দুষ্টু লোকের মিষ্টি কথা? আমি তার মিষ্টি কথাতেই জড়িয়ে পড়েছিলাম রাফায়াত। এবারের মত আমাকে ক্ষমা করে দাও প্লিজ। তুমি আমাকে ক্ষমা না করলে কিন্তু আমি সত্যি বলছি সু’ই’সা’ই”ড করব!”

অয়ন্তী তাজ্জব বনে গেল! মুখে হাত দিয়ে সে থম মেরে বসে রইল। মেয়ের কণ্ঠটি তার বড্ড চেনা চেনা লাগছিল। এর আগেও স্বরটি কোথাও শুনেছে এমনটা মনে হচ্ছে। কান থেকে ফোনটি সরিয়ে এনে সে স্ক্রীণের দিকে এবার ভালো করে তাকাতেই আকস্মিকভাবে রুমের দরোজা খুলে রাফায়াতের আগমন ঘটল। সঙ্গে সঙ্গেই হাত থেকে ফোনটি ছিটকে পড়ে গেল অয়ন্তীর! প্রিয়া ঐ প্রান্ত থেকে হরদমে হ্যালো হ্যালো করতে লাগল। কী হয়েছে রাফায়াত? কিছু বলছ না কেন? কেবল এই কথাগুলোই মৃদু আওয়াজে আওড়াতে লাগল। রুমে দ্বিতীয় কারো উপস্থিতি পাওয়া মাত্রই অয়ন্তীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কেমন যেন পালপিটিশান হতে লাগল।

ইতোমধ্যেই হাতে থাকা মাঝারি আকৃতির চার্জ লাইটটি জ্বালিয়ে দিলো রাফায়াত। অমনি সে দেখতে পেল অয়ন্তী ভয়ে থরথর করে কাঁপছে! দেখেই বুঝা যাচ্ছে কিছু একটা অনর্থ করেছে সে! নতুবা আকস্মিক কারো আগমনে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। খাবারের বক্সটি একপাশে রেখে রাফায়াত দৌঁড়ে এলো অয়ন্তীর কাছে। অমনি তার শ্রবণশক্তিতে প্রিয়ার ক্রন্দনরত কণ্ঠস্বরটি ভেসে এলো। পাশে তাকিয়ে দেখল তার ফোনের স্ক্রীণ জ্বলছে! ফোনের ঐ প্রান্ত থেকে প্রিয়া এক নাগাড়ে হ্যালো হ্যালো করছে। দাঁত গিজগিজিয়ে উঠল রাফায়াত। প্রথমে তার ফোনটি হাতে তুলে নিলো। ঝট করে ফোনটি কেটে দিলো সে! তাড়াহুড়ো করে প্যান্টের পকেট থেকে একটি নতুন সিম কার্ড হাতে নিলো। পুরাতন সিমটি খুলে নতুন সিমটি ফোনে ইন করল। পাওয়ার অন করে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। হাতে থাকা পুরোনো সিমটি সে মুহূর্তের মধ্যেই দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে দিলো। মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছেনা তার। হিংস্র বাঘের ন্যায় রাগে গর্জন করে উঠছে। কেমন যেন গোঙিয়ে গোঙিয়ে উঠছে!

রাফায়াতের এহেন মহা প্রলয়ঙ্কর রূপ দেখে ভয়ে আরও সিঁটিয়ে গেল অয়ন্তী। পুনরায় খাটের কার্ণিশের সাথে সে ঘেঁষে বসল। কান্না চেপে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করল। অমনি রাফায়াত তার ফোনটি হাত থেকে খাটের উপর রাখল। রগচটা হয়ে ভীতসন্ত্রস্ত অয়ন্তীর দিকে অনেক খানি এগিয়ে গেল। খাটের মাঝ বরাবর সে এত জোরে এক ঘু’ষি মারল যে খাটটি গটগট করে নিচের দিকে তলিয়ে গেল! মাঝখান থেকে পুরোপুরি ভেঙে গেল খাটটি। এমনিতেই প্রথম থেকে নড়বড়ে ছিল খাটটি। এখন তো আধম”রা হয়ে যা ইচ্ছে তা অবস্থা! খাট ভেঙে নিচে পড়ে যাওয়ার পরেও সেদিকে ঘুনাক্ষরেও ধ্যান নেই রাফায়াতের! আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকা অয়ন্তীর দিকে সে গরম দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। ঝাঁঝালো গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,,

“এই? অনিককে আমার নাম্বার থেকে কল করেছিলে তুমি?”

নির্বিকার অয়ন্তী। মুখ চেপে ধরে শুধু অঝরে কাঁদতে ব্যস্ত। দম যেন বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় হয়েছে তার! অচিরেই এই দমবন্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে চায়। অয়ন্তীর নীরবতা রাফায়াতকে আরও ভীষণভাবে আক্রোশের দিকে ঠেলে দিলো! অয়ন্তীর ডান হাতটি সে শক্তভাবে চেপে ধরতে বাধ্য হলো। গলা উঁচিয়ে বলল,,

“চুপ করে থেকো না অয়ন্তী। যা প্রশ্ন করেছি তার উত্তর দাও।”

“নানানায়ায়ায়া। কককরি নি।”

“মিথ্যে বলছ তুমি হ্যাঁ? মিথ্যে বলছ?”

“সত্যি আমি কল করিনি।”

“যদি কল করেও থাকো। এতে কিন্তু ক্ষতি তোমারই হবে!”

“আমি কল করিনি বললাম তো!”

“পারমিশন ছাড়া কারো ফোনে হাত দিতে নেই জানো না?”

রাফায়াতের কঠিন চোখে বিভীষিকাময় চাহনি অয়ন্তীর! ভেতরের করুণ যন্ত্রণা সে মুখে উচ্চারিত করে বলল,,

“নিজেকে প্রটেক্ট করার জন্যও কি এখন শত্রু পক্ষের থেকে পারমিশন নিতে হবে?”

“তুমি এখন এখানে আছো বলেই বেঁচে আছো, ভালো আছো। অনিকের কাছে থাকলে না? এতক্ষণে তুমি ম’রে যেতে! সুখ সহ্য হচ্ছেনা তাইনা?”

“কীসের সুখ হ্যাঁ? কীসের সুখ? এখানে কী সুখ আছে বলুন? এখানে শুধু ভয় আছে, আতঙ্ক আছে। বেঁচেও ম’রে থাকার মত বিষাক্ত অনুভূতি আছে।”

“একটু সময় দাও সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার পারমিশন ছাড়া অনিকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করবেনা তুমি।”

ইতোমধ্যেই রাফায়াতের নতুন সিম থেকে তার সেল ফোনটি বেজে উঠল। স্ক্রীনের দিকে না তাকিয়ে-ই রাফায়াত তড়িঘড়ি করে ফোনটি কানে তুলল। এই নাম্বারটিতে চঞ্চল এবং আরিফ ছাড়া অন্যকেউ কল করবেনা তা তার আগে থেকেই জানা! অমনি ফোনের ঐ প্রান্ত থেকে বেশ চঞ্চল প্রফুল্ল গলায় বলল,,

“গুড নিউজ আছে বস!’

“কী গুড নিউজ?”

“ইয়াদের জ্ঞান ফিরেছে। তুই এখন নিশ্চিন্তে চট্টগ্রাম ব্যাক করতে পারিস! এলাকা এখন আমাদের।”

#চলবে…?

#এক_খণ্ড_কালো_মেঘ
#পর্ব_১৪
#নিশাত_জাহান_নিশি

“ইয়াদের জ্ঞান ফিরেছে। তুই এখন নিশ্চিন্তে চট্টগ্রাম ব্যাক করতে পারিস! এলাকা এখন আমাদের।”

পৈশাচিক হাসি হেসে উঠল রাফায়াত! খুশিতে যেন মাতোয়ারা সে। আনন্দ কোনোভাবেই ধরছিলনা তার। উৎফুল্লিত মুখখানি দেখে মনে হচ্ছিল যেন এতগুলো দিন ধরে সে ঠিক এই শুভ দিনটির-ই অপেক্ষায় ছিল! না চাইতেও এই শুভ দিনটি তার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালো। খুব সতর্কতার সহিত রাফায়াত অয়ন্তীর পাশ থেকে খানিক দূরে এসে সরে দাঁড়ালো। কারণ, রাফায়াত বুঝতে পারছিল অয়ন্তী কান পেতে তার সমস্ত ফোনালাপ গিলছিল! এই মুহূর্তে অয়ন্তী তার বিষয়ে কিছু জানুক বা জানার আগ্রহ দেখাক তা চাইছেনা রাফায়াত। সঠিক সময়ে অয়ন্তী নিজে-ই রাফায়াতকে নিয়ে ভাববে! রাফায়াতের আসল পরিচয় খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে, তার সমস্ত রহস্য ভেদ করবে এটাই চাইছে রাফায়াত!

হাসি থামালো রাফায়াত৷ মুখশ্রীতে বেশ তৎপর ভাব ফুটিয়ে তুলল। বিড়বিড়িয়ে ফোনের ঐ প্রান্তে থাকা চঞ্চলের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,,

“তার মানে কেইস তুলে নিয়েছে ইয়াদ?”

“হ্যাঁ বস। এখন শুধু তোর সিগনেচারের অপেক্ষা।”

“মানে ঐখানে সব ঠিকঠাক আছে তাইতো?”

“অল পার্ফেক্ট। সকালের মধ্যেই রওনা হয়ে যা।”

“শোন? অয়ন্তীকেও সাথে নিয়ে আসছি আমি! তুই বরং একটা কাজ কর। ইমেডিয়েটলি একটা গেস্ট হাউজের ব্যবস্থা করে রাখ।”

“মানে? কী যা তা বলছিস তুই? খামোখা রিস্ক নিতে যাচ্ছিস কেন রাফায়াত?”

“অয়ন্তী এখানে সেইফ না চঞ্চল। আমি তাকে এভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে স্বার্থপরের মত পালিয়ে যেতে পারিনা। কথা না বাড়িয়ে আমি যা বলছি তুই তাই কর প্লিজ।”

“ভুলে যাসনা রাফায়াত। তুই অয়ন্তীকে ফাঁসাতে গিয়েছিলি। অনিকের থেকে রিভেঞ্জ নিবি বলে। হঠাৎ কী হচ্ছে এসব বল তো? কীভাবে পারলি তুই নিজের উদ্দেশ্য ভুলে যেতে?”

“তুইও হয়তো ভুলে যাচ্ছিস চঞ্চল। একটা সময় আমি অয়ন্তীকে পাগলের মত ভালোবাসতাম!”

“বাসতিস! অতীত। বর্তমানে দাঁড়িয়ে তুই অতীত নিয়ে ভাবছিস রাফায়াত? তাছাড়া তখন কিন্তু তুই নিজে-ই অয়ন্তীকে অনিকের হাতে তুলে দিয়েছিলি!”

“ভুল করেছি আমি! ঐ বা’স্টা’র্ড’টা’কে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলাম আমি। দেখা হলে আমি তোকে সব ডিটেইলসে বলব। এখন প্লিজ ফোনটা রাখ। আর যেভাবেই পারিস একটা গেস্ট হাউজের ব্যবস্থা কর। দুপুরের মধ্যেই আমার চট্টগ্রাম পৌঁছাচ্ছি!”

ধুম করে কলটা কেটে দিলো রাফায়াত। চঞ্চলকে কিছু বলার সময় সুযোগটাও দিলোনা। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে-ই রাফায়াত সামনের-পেছনের চুলগুলো স্মোথলি টেনে ধরল। মুখমণ্ডলে চিন্তিত ভাব প্রগাঢ়ভাবে ফুটিয়ে তুলল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,,

“আই ডোন্ট নো, অয়ন্তীকে নিয়ে ঢাকা থেকে বের হওয়াটা এত সহজ হবে কি-না! এই শহরের পরতে পরতে বিপদ। অনিক না জানি কতটা পাগল হয়ে আছে অয়ন্তীকে খুঁজে বের করতে।”

আরিফ যেহেতু এখন অনিকের সাথে আছে তাই আরিফকে কল করার পরিবর্তে ম্যাসেজ করাটাই ভালো মনে করল রাফায়াত। নাম্বারে ম্যাসেজ করে রাফায়াত সব বৃত্তান্ত খুলে বলল আরিফকে। একটু পরেই যে তারা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হবে এমনকি অনিককে যেভাবে-ই হোক এদিক-ওদিক করে ব্যস্ত রাখার কথাটাও ভেঙে বলে দিলো রাফায়াত। চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে যেন অনিক কোনো ভাবে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সে বিষয়েও বেশ তাগিদ দিলো আরিফকে। অনিককে নিয়ে আরিফ ঢাকার সব তেলিকোণায় ঘুরে বেড়াচ্ছে! পাগলা কুকুরের মত অনিককে হয়রান করছে আরিফ! অনিকও আরিফকে বিশ্বাস করে আরিফের কথা মত-ই চলছে। তার বিরুদ্ধে কোনো রকম প্রশ্ন অবধি তুলছেনা সে। আর ঠিক এই দিকটাই হলো আরিফ এবং রাফায়াতের জন্য প্লাস পয়েন্ট!

ম্যাসেজে আরিফকে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার পর রাফায়াত হুট করে পিছু ঘুরতে-ই তার সামনে রণরঙ্গিনী রূপে দাঁড়িয়ে থাকা অয়ন্তীকে দেখতে পেল! কোঁমড়ে হাত গুজে অয়ন্তী গরম চোখে রাফায়াতের দিকে তাকালো। থতমত খেয়ে গেল রাফায়াত। অয়ন্তীর থেকে হকচকানো দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। ভাবলেশহীন হয়ে ফোনটা ভালোভাবে তার পকেটে গুজল। সন্দিহান হয়ে মনে মনে আওড়ে বলল,,

“যাহ্ বাবা! এই চু’ক’লীটা আবার সব শুনে নিলো না তো? যা খাঁড়া কান ওর!”

অমনি অয়ন্তী চোয়াল উঁচিয়ে রাফায়াতের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে দাঁড়ালো। টগর মগর দৃষ্টিতে কেবল রাফায়াতকে সবদিক থেকে প্রত্যক্ষণ করতে লাগল। অতঃপর দাঁত কিড়মিড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,,

“এই মা’ফি’য়া’র বাচ্চা? কার সাথে কথা বলছিলি তুই হ্যাঁ? আমার সম্পর্কে কী কী বলছিলি বল?”

“এমা! তুমি সত্যিই কিছু শুনো নি?”

“শুনলে আবার তোকে জিজ্ঞেস করতাম না-কি?”

স্বস্তির শ্বাস ফেলল রাফায়াত। হাঁফ ছেড়ে যেন বাঁচল এমন একটা ভাব নিলো। সামনের চুলগুলো পেছনের দিকে টেনে ধরে বলল,,

“ভাগ্যিস তুমি শুনো নি!”

অয়ন্তীকে উপেক্ষা করে রাফায়াত চ্যালচ্যালিয়ে হেঁটে খাবারের বক্সটি হাতে তুলে নিলো। বক্সের মুখটি খুলতেই অয়ন্তী পুনরায় তেড়ে এলো রাফায়াতের দিকে। ঝাঁজালো গলায় বল প্রয়োগ করে পুনরায় শুধালো,,

“এই বল? কার সাথে আমার সম্পর্কে ডিসকাস করছিলি তুই? আমাকে বে”চে দেওয়ার ধা’ন্দা করছিস তাইনা? এজন্যই আমাকে কি’ড’ন্যা’প করেছিস?”

ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে রাফায়াত চোখ ঘুরিয়ে অয়ন্তীর দিকে তাকালো। দাঁতে দাঁত চেপে তটস্থ গলায় বলল,,

“ব্যবহার ঠিক করো অয়ন্তী। তুই তুকারী শব্দটা আমি টলারেট করতে পারিনা।”

“সরি টু সে মিস্টার রাফায়াত। তোর সাথে আমার এরচেয়ে ভালো ব্যবহার আসছেনা! তুই হলি নর্দমার কীট! যার সাথে উগ্র ভাষাতে-ই কথা বলতে হয়!”

মাথায় পুরো দমে রাগ চেপে বসতেই রাফায়াত না চাইতেও অয়ন্তীর চুলের মুঠি চেপে ধরল! তার ভয়ঙ্কর মুখের সামনে অয়ন্তীর ভয়াল মুখখানি টেনে আনল। রাগে রি রি করে বলল,,

“নর্দমার কীট আমি না বুঝেছিস? তোর ঐ অনিক। যাকে তুই অন্ধের মত বিশ্বাস করিস। যাকে ছাড়া তোর একটা মুহূর্তও চলে না! এখন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেয়ে নে। একটু পরেই আমাদের বের হতে হবে। সূর্য ওঠার আগেই। রাস্তাঘাটে যদি কোনো সিনক্রিয়েট করিসনা? তখন কিন্তু এই রাফায়াতের চেয়ে খারাপ কেউ হবেনা! আই হোপ সো এই কয়দিনে আমাকে বেশ ভালো-ই চিনেছিস?”

এমনিতেই ক্ষুধার জ্বালায় মাথা ঘুরছিল অয়ন্তীর। তার উপর অনেকক্ষণ যাবত চুলের মুঠি ধরে রাখার কারণে তার মাথাব্যথা এসে পৌঁছালো চরম পর্যায়ে! অঝরে কান্নার ফলে চোখদুটোও যন্ত্রণায় কেমন যেন ফেটে যাচ্ছিল তার। সব মিলিয়ে ফট করে অয়ন্তীর মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরে এলো। শরীরের সমস্ত শক্তি খুঁইয়ে সে রাফায়াতের বুকে লুটিয়ে পড়ল! যদিও জ্ঞান তার সম্পূর্ণ লোপ পায়নি। তবে মুখে সে কিছু অস্ফুটে বুলি আওড়াতে লাগল। হিতাহিতজ্ঞান ফিরে পেতেই ঘাবেড়ে উঠল রাফায়াত। অয়ন্তীর চুলের মুঠি ছেড়ে সে কান পেতে অয়ন্তীর সেই অস্পষ্ট কথাগুলো শুনতে লাগল। অকপটে চোখ জোড়া বুজে অয়ন্তী ঘোলাটে গলায় বলল,,

“আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে রাফায়াত। প্লিজ কিছু খেতে দিন।”

ক্ষুধার তাড়নায় অয়ন্তীর এহেন করুন আকুতি যেন রাফায়াতের বুকের ভেতরটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছিল! রাগ সংযত করতে না পেরে সে অয়ন্তীর উপর এত বড়ো একটা নিষ্ঠুরতম আচরণ করতে পারবে ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেনি সে। অতিশয় উদ্বিগ্ন হয়ে রাফায়াত অয়ন্তীকে তার বুকের মাঝে চেপে ধরে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল। খুব সতর্কতার সহিত ভাঙা খাটের কার্ণিশে অয়ন্তীকে ঠেস দিয়ে বসালো। বোতল থেকে পানি ঢেলে হাতটা একটুখানি ধুঁয়ে নিলো। খাবারের বক্সটি খুলে কিছু ভাত এবং মুরগি মাংসের আলু, সাথে ঝোলগুলো হালকা করে মেখে নিলো। অয়ন্তীর মুখে লোকমা তুলেই সে আচমকা চোখের জল ছেড়ে দিলো! সেই চোখের জল এসে ভাতের প্লেটে পড়ল! চোখ মেলে তাকানোরও শক্তিটুকু অবশিষ্ট নেই অয়ন্তীর। তাই রাফায়াতের অশ্রুসজল চোখ তার চোখে পড়েনি। রাফায়াতের ভেতরকার যন্ত্রণা তার মনে জায়গা করে নিতে পারেনি। অতিরিক্ত ক্ষুধার থাকার দরুন অয়ন্তী মুখের সামনে খাবার পেয়ে অমৃতের মত খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে লাগল! খাবারের প্রতি অয়ন্তীর এমন পাগলামি দেখে রাফায়াত নিজেকে ধিক্কার জানাতে লাগল! তার বদরাগী এবং উদাসীন স্বভাবের জন্য-ই অয়ন্তীকে এতটা সময় ধরে ক্ষুধামন্দায় ভুগতে হলো!

খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই রাফায়াত কোমল হাতে অয়ন্তীর মুখটা ভালো করে মুছিয়ে দিলো। পেটটা পুরোপুরি ভরে উঠতেই অয়ন্তী পূর্বের ন্যায় তাজা হয়ে উঠল! হাতটা ভালোভাবে পরিষ্কার করে রাফায়াত যেইনা অয়ন্তীর দিকে ঈষৎ ঝুঁকে চিন্তিত গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,,

“এখন কেমন ফিল করছ?”

অমনি অয়ন্তী গর্জে উঠল। সামনে বসে থাকা রাফায়াতকে সে এক ধাক্কায় মেঝেতে কাত করে দিলো! অর্ধভাঙা বিছানা থেকে বিছানার চাঁদর, বালিশ এবং কাঁথা উঠিয়ে সে মেঝেতে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ল! রাফায়াত অবাক হলো। শুধু অবাক নয় ভীষণ অবাক হলো। অবাকের চরম শীর্ষে পৌঁছে সে মেঝে থেকে ওঠে বসল। চোখ বুজে রাখা অয়ন্তীর দিকে বিস্ফোরক গলায় প্রশ্ন ছুড়ে বলল,,

“এই? তুমি কী এখন ঘুমুবে?”

কাঁথাটিকে গাঁয়ে আরও আরামদায়কভাবে পেঁচিয়ে নিলো অয়ন্তী! ঘুম ঘুম গলায় বলল,,

“হ্যাঁ ঘুমুবো। ডিস্টার্ব করবেন না তো। দুপুরের আগে আমাকে একদম ঘুম থেকে জাগাবেন না। দয়া করে খেতে দিয়েছেন, এবার একটু ঘুমুতেও দিন!”

“আরে বলছ কী এসব? আমাদের তো এক্ষুণি রওনা হতে হবে। সকাল হওয়ার আগেই আমাদের ঢাকা ত্যাগ করতে হবে।”

“এত শত বুঝিনা আমি। আপনি কি’ড’ন্যা’পার হয়েছেন বলে-ই যে আমার উপর শুধু জোর খাটাবেন তা কিন্তু নয়! যাকে আপনি কি’ড’ন্যা’প করেছেন তার ও তো কিছু চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে তাইনা? সো এখন আমাকে ডিস্টার্ব না করে একটু ঘুমুতে দিন। বড্ড ঘুম পেয়েছে আমার। এত ধকল সইছেনা আর দেহে।”

অর্নগল কথাগুলো বলেই অয়ন্তী ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল। রাফায়াত হাজার ডেকেও অয়ন্তীকে সেই অলক্ষুণে ঘুম থেকে জাগাতে পারলনা! কপালে হাত দিয়ে রাফায়াত কিছুক্ষণ দাঁতে দাঁত গিজগিজালো। অতঃপর অয়ন্তীর আরামের ঘুম দেখে তার চোখেও কেমন যেন দস্যু ঘুমেরা হানা দিলো। অয়ন্তীর ঘুম জড়ানো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাফায়াত নিজেও অয়ন্তীর পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। সে এক গভীর ঘুম। প্রেয়সীর মুখের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্তে স্বপ্নপুরীতে তলিয়ে যাওয়া শান্তির এক ঘুম!

,
,

রাফায়াতের সেই গভীর তন্দ্রাবিলাসে হানা দিলো ফোনের বাইব্রেশন মুড! ঘুমের মধ্যেই রাফায়াত অনেকক্ষণ যাবত অনুভব করছিল তার প্যান্টের পকেটে বেশ ভয়াবহভাবে-ই সাইক্লোন উঠেছে। তবে নিদ্রা কাটিয়ে তার পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছিলনা সাইক্লোনের কারণ খতিয়ে দেখার। কিয়ৎক্ষণ যাবত সেই সাইক্লোন তুমুল বেগে বয়ে যাওয়ার পরে গিয়ে রাফায়াতের টনক নড়ল। অবিলম্বেই তার ডান হাতটি চলে গেল প্যান্টের পকেটে। ফোনটি পকেট থেকে বের করে সে এক চোখা দৃষ্টিতে স্ক্রীনের দিকে তাকালো। স্পষ্টভাবে কিছু না দেখেই সে ফোনটি রিসিভ করে কানে তুলে নিলো। অমনি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে চঞ্চল বিরক্তি ভরা গলায় বলল,,

“এই ই”ডিয়”ট কোথায় তুই?”

রাফায়াত তখনও ঘুম ঘুম আবেশে বলল,,

“এইতো ঘুমে!”

“ঘুম মানে? তুই বুঝতে পারছিস তো কী বলছিস তুই?’

“কেন? কী বলছি? কী হইছে?”

“দুপুর দুইটায় তোর চট্টগ্রাম থানায় প্রেজেন্ট থাকার কথা ছিল রাফায়াত! এখন অলরেডি দুইটা প্লাস!”

ঘুমের ঘোর এবার বেশ ঝাঁকি দিয়ে-ই ভাঙল রাফায়াতের! চক্ষু জোড়া আচ্ছন্নতা নিয়ে সে তড়িঘড়ি করে শোয়া থেকে ওঠে বসল। পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখল অয়ন্তী তার গাঁয়ের সাথে সম্পূর্ণ চিপকানো। গভীর ঘুমে আবিষ্ট সে। তৎক্ষনাৎ মাথাটা জাঁকালো রাফায়াত। উত্তেজিত গলায় ফোনের ঐ প্রান্তে থাকা চঞ্চলকে বলল,,

“বিকেলের মধ্যেই আমি চট্টগ্রাম পৌঁছাচ্ছি। প্লিজ আর একটু ম্যানেজ কর।”

কলটি কেটেই রাফায়াত ঘুমন্ত অয়ন্তীকে টেনে হেঁছড়ে শোয়া থেকে উঠালো। তার চোখে-মুখে বোতল ভর্তি পানি ঢেলে দিলো! বসা থেকে অয়ন্তী ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে উঠতেই রাফায়াত তার হুডিটা অয়ন্তীর গাঁয়ে পড়িয়ে দিলো! হুডির টুপিটা অয়ন্তীর মাথায় ভালো করে পড়িয়ে সে অয়ন্তীর হাত ধরে জান নিয়ে দৌঁড়ে পালালো রুম থেকে! বেচারি অয়ন্তী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রাফায়াতের সাথে সাথে দৌঁড়াতে লাগল। আপাতত কিছু বলার পর্যায়ে নেই সে! মস্তিষ্ক তার সম্পূর্ণ ফাঁকা৷ ঘুম ফুরানোর আগেই হুট করে ঘুম ভেঙে ওঠার ফল এসব! মেইন রাস্তায় কোনোভাবে ওঠে যেতেই রাফায়াত একটি সি.এন.জি ঠিক করল বাসস্টপ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য। সি.এন.জি তে উঠতেই হকচকিয়ে ওঠা অয়ন্তী অস্থির রাফায়াতের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে বলল,,

“আরে আমরা যাচ্ছিটা কোথায় হ্যাঁ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে বলুন?”

মিরর গ্লাস দিয়ে সি.এন.জি ড্রাইভারটা কেমন যেন সন্দেহজনক দৃষ্টিতে রাফায়াত এবং অয়ন্তীর দিকে তাকালো! সঙ্গে সঙ্গেই রাফায়ত জোরপূর্বক হাসি দিয়ে অয়ন্তীর কানে মুখ ঠেকালো। দাঁত চিবিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,,

“বলেছিলাম না সিনক্রিয়েট না করতে? আই সোয়ার, যদি আশেপাশের মানুষজন খারাপ কিছু আঁচ করতে পারেনা? তবে কিন্তু তোমার পরিবারের ক্ষতি করতে আমার বেশী সময় লাগবেনা!”

#চলবে….?