Home "ধারাবাহিক গল্প এক ফালি রোদ্দুর এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-১৫

এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-১৫

0
915

#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_১৫_

সকাল থেকেই ইফতি বায়না করছে গাড়ি কিনবে। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তার মুখে এক কথা। খেলনা গাড়ি চাই। শুধু সাধারণ কোনো গাড়ি নয়, বড়সড় একটা গাড়ি, যেটা হাতে নিয়ে সে পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াতে পারবে। প্রথমে সবাই ভেবেছে, কিছুক্ষণ পরই হয়তো ছেলেটা অন্য কোনো বিষয়ে মন দেবে। কিন্তু দিন যতো গড়িয়েছে, তার বায়না ততো বেড়েছে।

অবশেষে ছেলের আবদারের কাছে হার মেনে ফারহান সিদ্ধান্ত নেয় তাকে নিয়ে শপিং সেন্টারে যাবে। ইফতির আনন্দ তখন দেখার মতো। ছোট্ট মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলো উত্তেজনায়। সে যেন আগেই কল্পনা করে ফেলেছে তার নতুন খেলনা কেমন হবে। দুপুরের পরে তারা শহরের বড় একটি শপিং সেন্টারে পৌঁছায়। জায়গাটা মানুষের ভিড়ে সরগরম। চারপাশে আলো, রঙ আর শব্দের এক ব্যস্ত জগৎ। খেলনার বিশাল শোরুমে ঢুকতেই ইফতি যেন নিজের স্বপ্নের রাজ্যে প্রবেশ করলো। সারি সারি সাজানো খেলনার দিকে তাকিয়ে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠে। ফারহান তখন পুরো মনোযোগ ছেলের দিকে দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোন গাড়িটা ভালো হবে, কোনটা ছেলেটার পছন্দ হবে, কোনটার মান ভালো, সবকিছু খুঁটিয়ে দেখছে সে। ইফতিও একটার পর একটা খেলনা হাতে তুলে দেখছে।

প্রভা কিছুক্ষণ তাদের সঙ্গে ভেতরে ছিলো। কিন্তু, খেলনার দোকানের ভিড় আর কোলাহল তার ভালো লাগছে না। তাই বাইরে বেরিয়ে এলো। শপিং সেন্টারের বাইরে এসে একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো সে। চারপাশে অসংখ্য মানুষ। কেউ কেনাকাটার জন্য ভেতরে যাচ্ছে, কেউ বাইরে আসছে, কেউ পরিবারের সঙ্গে ঘুরছে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে। প্রভা অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাতে লাগে। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে থেমে যায় একটু দূরে। পরের মুহূর্তেই পুরো শরীর যেন ঝাঁকি খেয়ে উঠে। একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। স্থির। নিঃশব্দ। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রাজ!

প্রভার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সময় যেন থেমে যায়। এই মানুষটাকে শেষ দেখেছিলো অনেকদিন আগে। তারপর জীবন কতোদূর এগিয়ে গেছে। কতোকিছু বদলে গেছে। তবু এক মুহূর্তে মনে হলো অতীত যেন হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রাজও তাকিয়ে আছে। চোখ সরাচ্ছে না।অনেকদিন পর সে প্রভাকে দেখছে। গত কয়েকটা সপ্তাহ তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর মধ্যে কেটেছে। নিজের ভুল, নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের কর্মফল, সবকিছুর ভার যেন একসঙ্গে এসে চাপ ফেলেছে তার উপর। অনন্যার বিশ্বাসঘাতকতার পর পৃথিবীটাকে নতুন করে চিনতে শুরু করেছে সে। যে সম্পর্ককে সত্যি ভেবেছিলো, সেটাই ছিল মিথ্যে। আর যাকে অবহেলা করেছিলো, সেই মানুষটার মূল্য আজ বুঝতে পারছে।সেই উপলব্ধিই তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছে। কয়েকদিন সে প্রায় ঘরবন্দি ছিলো। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলো। নিজের ঘরের দেয়ালের ভেতর বসে শুধু অতীতের হিসাব কষেছে। আর সেই অতীতের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়েই ছিল প্রভা। অবশেষে, একসময় বুকের ভেতরের আকুলতা আর দমিয়ে রাখতে পারেনি সে। একবার দেখতে চেয়েছে। দূর থেকে হলেও। শুধু এক নজর। সেই ইচ্ছাই আজ তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। তার চোখের সামনে প্রভা আছে। কিন্তু, আগের মতো আর তার নয়। অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। আজ শুধু বুঝতে পারছে, কিছু মানুষকে হারানোর পরই তাদের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায়। আর সেই উপলব্ধির চেয়ে ভারী শাস্তি পৃথিবীতে খুব কমই আছে।

কিন্তু, এখন প্রভাকে সামনে দেখে রাজের মনে হচ্ছে, প্রস্তুত ছিলো না সে। একদমই না। মেয়েটার মধ্যে আগের সেই শান্ত সৌন্দর্য এখনও আছে। বরং, সময় তার শ্যামবর্নকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। মুখের ভেতর এক ধরনের প্রশান্তি এসেছে। চোখে আর আগের সেই বিষণ্নতা নেই। একসময় যে চোখগুলো নীরবে কষ্ট সহ্য করতো, আজ সেখানে স্থিরতা আছে।সন্তুষ্টি আছে। জীবনকে নতুন করে পাওয়ার আলো আছে। রাজের বুকের ভেতর তীব্র একটা ব্যথা অনুভূত হয়। কারণ সে বুঝতে পারছে, এই আলোটা তার দেওয়া নয়। এই শান্তিটুকুও তার দেওয়া নয়। যে মেয়েটাকে একসময় সে ভেঙে দিয়েছিলো, আজ সেই মেয়েটাকে অন্য কেউ যত্ন করে গড়ে তুলেছে।

প্রভা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভেতরেও অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছে। রাজকে দেখে পুরোনো কোনো ভালোবাসা ফিরে আসেনি। কোনো আকাঙ্ক্ষাও জাগেনি। তবে, অতীতের অসংখ্য স্মৃতি একসঙ্গে মনে পড়ে গেছে। কতোটা পথ পেরিয়ে এসেছে সে। কতোটা কষ্টের ভেতর দিয়ে। আর আজ সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। একসময় এই মানুষটার সামান্য অবহেলাও তার চোখে পানি এনে দিতো। আজ সেই মানুষটা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ তার ভেতর কোনো ঝড় উঠছে না। শুধু এক ধরনের দূরত্ব অনুভব করছে সে। জীবনের এক বন্ধ হয়ে যাওয়া অধ্যায়ের মতো। দুজন মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো। মাঝখানে দূরত্ব খুব বেশি না। তাও মনে হচ্ছে, তাদের মাঝখানে কয়েকটা জীবনের সমান পথ জমে আছে।

রাজ ধীর পায়ে এগিয়ে এলো প্রভার দিকে। দুজনের মাঝখানে খুব বেশি দূরত্ব না, তবু সেই কয়েক কদম পথ পাড়ি দিতে তার যেন অনেকটা সময় লেগে গেলো। প্রভার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলো সে। তারপর কষ্ট করে ঠোঁট নেড়ে বললো,
” কেমন আছো?”

প্রশ্নটা শুনেই প্রভার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠে। পুরোনো অনেক স্মৃতি একসঙ্গে ভিড় করলো মনে। একসময় এই কণ্ঠস্বর শোনার জন্য কতোটা অপেক্ষা করতো সে। অথচ আজ সেই কণ্ঠস্বর তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করলো প্রভা। নিজেকে শক্ত করে।তারপর শান্ত গলায় বলে,
” ভালো আছি। খুব ভালো আছি, স্বামী সন্তান নিয়ে।”

স্বামী শব্দটা শুনেই রাজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। চোখ দুটো অনিচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বাস্তবতা সে জানতো। তাও, প্রভার মুখে এই পরিচয় শুনে কষ্টটা নতুন করে অনুভব করলো। প্রভা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
” আপনার ব্যাপারে সবটা শুনলাম। আফসোস আর মায়া, দুইটাই হচ্ছে আপনার জন্য।”

রাজ তিক্ত হেসে বললো,
” পিঞ্চ করছো?”

” না! সত্যিটাই বলছি।”

কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে রাজ আবার বলে,
” আপনি করে কেন বলছো?”

” কারণ, আপনি এখন আমার কাছে একজন পরপুরুষ।”

শব্দগুলো যেন ধারালো অস্ত্রের মতো এসে আঘাত করে রাজের বুকে। পরপুরুষ? গলা শুকিয়ে এলো তার। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা কি সত্যিই সেই প্রভা? এতোটা শক্ত কবে হয়ে গেলো সে? নিজেকে সামলে নিয়ে রাজ বললো,
” কিন্তু, তোমার সন্তানের পিতা আমি।”

প্রভার ঠোঁটে এক চিলতে তিক্ত হাসি ফুটে উঠে।
” কে বলেছে?”

” রক্তকে অস্বীকার করতে চাচ্ছো?”

” না, মোটেও না। আপনি যে রক্তের কথা বলছেন, এমন রক্ত তো হাজার পুরুষ পতিতালয়ে ফেলে আসে। তাই বলে কি তারা পিতার পরিচয় পায়?”

রাজ নিঃশব্দ হয়ে যায়। প্রভা থামে না,
” আপনি জানেন, আপনার সন্তান কালো নাকি ফর্সা? জানেন, ওর চোখ কার মতো? ওর হাসিটা কেমন? ও কাঁদলে কীভাবে শান্ত হয়? ও কী খেতে পছন্দ করে? কীসে ভয় পায়?”

প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে রাজের মাথা আরও নিচু হয়ে আসতে লাগে। প্রভা গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
” কিছুই জানেন না। তাই না? তাহলে কেমন পিতা আপনি?”

মুহূর্তেই চারপাশের সমস্ত শব্দ যেন হারিয়ে যায়। রাজ অনুভব করে, তার হাত পা কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বুকের ভেতর জমে থাকা অপরাধবোধটা আরও ভারী হয়ে উঠেছে। কারণ, প্রভার প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর তার কাছে নেই। একটাও নেই। প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর ধীর, স্থির কণ্ঠে বললো,
” পিতা মানে কী বুঝেন আপনি?”

রাজ মাথা তুলে তাকায়। চোখ দুটো ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। প্রভা তিক্ত হেসে বললো,
” পিতার উদাহরণ দেখতে চান? তাহলে আমার স্বামী ফারহানকে দেখুন। যে মানুষটা আমাকে বিয়ে করেছে আপনার জন্ম দেওয়া সন্তানকে আগলে রাখার জন্য। যে মানুষটা নিজের রক্তের সন্তান না হয়েও আমার সন্তানের প্রতিটা আবদার পূরণ করে। বাবা কাকে বলে জানেন? ফারহান জানে।”

রাজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। প্রভা বলতে থাকে,
” বাসর রাতে মানুষ সাধারণত স্ত্রীর মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা শুনতে চায়। কিন্তু, ফারহান চেয়েছিলো আমার ছেলের মুখে বাবা ডাক শুনতে। আর যখন ইফতি তাকে বাবা বলে ডেকেছিলো, তখন আমি নিজের চোখে দেখেছি তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে। মানুষ বাসর রাতে নিজের স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে ঘুমানোর স্বপ্ন দেখে। অথচ ফারহান বাসর রাতে আপনার আর আমার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়েছে। মানুষ বাসর রাতে স্ত্রীকে চুমু দিতে চায়। কিন্তু ফারহান সেদিন আমার ছেলেকে অজস্র চুমু খেয়েছে। যেন বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া কোনো ধন ফিরে পেয়েছে। আর আপনি আজ এসে বাবা হওয়ার কথা বলছেন?”

রাজের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। বুকের ভেতর একটা চাপা যন্ত্রণা জমে উঠছে। যেন কেউ ধীরে ধীরে তার অস্তিত্বটাকে চূর্ণ করে দিচ্ছে। প্রভা আবার বললো,
” আপনি কি ভুলে গেছেন? একদিন আপনিই আমাকে বলেছিলেন এই সন্তানকে নষ্ট করে ফেলতে। এবোরশন করিয়ে ফেলতে। ভুলে গেছেন?”

রাজ চোখ নামিয়ে ফেলে। সে ভুলে যায়নি। একটা শব্দও ভুলে যায়নি। বরং, সেই কথাগুলোই আজকাল রাতের পর রাত তাকে ঘুমাতে দেয় না। প্রভা কষ্টমাখা হাসি হাসে।
” কিন্তু, আমি ভুলিনি। একটা মুহূর্তের জন্যও ভুলিনি।আমার সন্তান যখন আমার গর্ভে ছিলো, তখন ফারহান পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। আমার পাশে না, আমার সন্তানের পাশে। আর আপনি? একটা বার খোঁজ নিয়েছিলেন? একটা বার জানতে চেয়েছিলেন সন্তানটা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে? আজ যখন নিজের পাপের ফল ভোগ করছেন, তখন হঠাৎ সন্তানের কথা মনে পড়ে গেছে? কতোটা স্বার্থপর হলে একজন মানুষ এমন হতে পারে?”

চারপাশের ভিড়ের শব্দ যেন রাজের কানে পৌঁছাচ্ছে না। তার ভেতরে শুধু প্রভার কথাগুলোই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। প্রভা ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
” জানেন, ফারহান আমাকে কী বলেছে? ফারহান বলেছে, সে আর কোনো সন্তান নেবে না। কারণ সে ভয় পায়। হ্যাঁ। ভয়। যদি কোনোদিন নিজের রক্তের সন্তান পৃথিবীতে আসে, তাহলে হয়তো অজান্তেই ইফতির প্রতি অবহেলা করে ফেলবে। হয়তো নিজের সন্তানের প্রতি একটু বেশি দুর্বল হয়ে যাবে। সেই ভয়েই সে আর সন্তান চায় না। বুঝেন এই অনুভূতিগুলো? বুঝেন এই ত্যাগ? বুঝেন বাবা হওয়া কাকে বলে?”

রাজ আর তাকিয়ে থাকতে পারে না। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেললো সে। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটা বাক্য তার সমস্ত অহংকার, সমস্ত অস্তিত্বকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো। তারপর প্রভা শান্ত গলায় বললো,
” সন্তানকে দেখার ইচ্ছে হয়েছে আপনার। কেন হয়েছে জানি না। হয়তো অনুশোচনা থেকে। হয়তো একাকীত্ব থেকে। হয়তো অন্য কোনো কারণে। আমি আপনাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। একটু পর আমার সন্তান আর তার বাবা শপিংমল থেকে বের হবে। দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখে যাবেন। কিন্তু খবরদার, আমার সন্তানের সামনে যাবেন না। সে যেন আপনার এই মুখ না দেখে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। দূরে থাকবেন আমাদের থেকে। কারণ, আপনি আমাদের দুজনের কাছেই বিষাক্ত একজন মানুষ।”

কথাগুলো বলে প্রভা এক মুহূর্তও আর দাঁড়ায় না।
ঘুরে শপিং সেন্টারের সামনে পার্ক করা গাড়ির দিকে চলে গেলো। রাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মনে হচ্ছে, শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে।বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে আসছে। কয়েক মুহূর্ত পরে সে ধীরে ধীরে একপাশে সরে গেলো। একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু, পারে না। চোখের কোণ ভিজে উঠলো অজান্তেই।আজ প্রথমবার সে বুঝতে পারলো, কোনো মানুষকে হারানোর কষ্টের চেয়েও ভয়ংকর হলো, সেই মানুষটার সুখের কারণ অন্য কাউকে হতে দেখা। আর সেই মুহূর্তে ফারহানের কাছে নিজের পরাজয়টা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠলো তার কাছে। সে দূরে দাঁড়িয়ে রইলো। অপেক্ষা করতে লাগলো। একবার, শুধু একবার নিজের সন্তানের মুখ দেখার জন্য।

কিছুক্ষণ পর শপিং মল থেকে বেরিয়ে এলো ফারহান আর ইফতি। ফারহানের এক হাতে শপিং ব্যাগ, আর কোলে বসে আছে ইফতি। খেলনা গাড়ি কেনার আনন্দে ছোট্ট ছেলেটা উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে। আধো আধো ভাষায় একনাগাড়ে কীসব বলে চলেছে সে। কিন্তু, তাতে ফারহানের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। বরং প্রতিটা কথারই উত্তর দিয়ে যাচ্ছে সে।
” বাবা! আমাল গালিটা বাসায় গিয়ে দৌলাবে?”

” আচ্ছা, দৌড়াবে।”

” অনেক জোলে?”

” অনেক জোরেই দৌড়াবে।”

” মাম্মাম বয় পাবে।”

” তোমার মাম্মাম তো সাহসী। ভয় পাবে কেন?”

ইফতি খিলখিল করে হেসে ওঠে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজ নিঃশব্দে সবকিছু দেখছে। তার দৃষ্টি আটকে আছে শুধু ছোট্ট ছেলেটার ওপর। এটাই তার সন্তান।তার রক্ত। তার অস্তিত্বের একটা অংশ। তবুও কতোটা অপরিচিত। ফারহানের গায়ের রং আর তার নিজের গায়ের রং প্রায় একই রকম। দুজনেই ধবধবে ফর্সা। ইফতিও হয়েছে ঠিক সেই রকম। তাই ফারহানের কোলে বসে থাকতে দেখে যে কেউ বলবে, ছেলেটা ফারহানেরই সন্তান। রাজ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ফুলোফুলো গাল, গোলগাল হাত পা, হাসলে চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে। ছোট্ট মুখটা নড়ছে অবিরাম। কীসব গল্প করে চলেছে। রাজের মনে হলো, গড়নটা কি তার মতো হয়েছে? চোখ দুটো? হাসিটা?কিংবা চিবুকের রেখাটা? কোনো উত্তর সে জানে না।জানার অধিকারও হারিয়ে ফেলেছে বহু আগেই। তবুও চোখ সরাতে পারছে না। এতো সুন্দর হয়েছে তার সন্তান। এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নেয়। সুখ, কষ্ট, অনুশোচনা আর অপূর্ণতার মিশ্রণে তৈরি এক অসহনীয় অনুভূতি।

গাড়ির কাছে পৌঁছে ফারহান প্রথমেই কিছু একটা খেয়াল করে। প্রভা গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত।ফারহান ভ্রু কুঁচকে ফেলে। সে দ্রুত শপিং ব্যাগগুলো গাড়ির ব্যাকসিটে রেখে দিলো। তারপর ইফতিকে সামলে নিয়ে প্রভার সামনে এসে দাঁড়ায়। উদ্বিগ্ন গলায় বললো,
” কোনো সমস্যা হয়েছে?”

প্রভা এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললো,
” না তো। কেন?”

ফারহান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো।মেয়েটাকে সে ভালোই চিনে। প্রভা যখন কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করে, তখন তার চোখের ভেতর একটা অস্থিরতা ফুটে ওঠে। আজও সেই অস্থিরতা আছে।তবে, সে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। শুধু মৃদু হেসে বললো,
” কেনাকাটা শেষ। এবার চলি?”

প্রভা মাথা নাড়ে। কিন্তু, ফারহান হঠাৎ যেন কিছু মনে করে বললো,
” না! সরাসরি বাসায় যাবো না।”

” কেন?”

” আমার বাবাটাকে নিয়ে একটু পার্কে যাবো।”

প্রভা বিস্মিত হয়ে তাকায়।
” এখন?”

ফারহান ইফতির নাকে আলতো টোকা দিয়ে বললো,
” হ্যাঁ। অবশ্যই! কারণ আমার বাচ্চাটা যেতে চেয়েছে।”

প্রভা এবার ছেলের দিকে তাকালো। ছোট্ট ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে সে মায়ের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি সে জানিয়েছে।প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
” সব সময় বায়না থাকে তাই না?”

ইফতি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলো,
” বাবা বুলেচে, আমি কুতায় যেতি চাই, আমি বুলেচি আমি পালকে যেতি চাই। আমাল কুনো দুষ নাই।”

তার নিষ্পাপ যুক্তি শুনে প্রভার হাসি পেয়ে গেলেও মুখ গম্ভীর রাখলো।
” হুম! তোমার তো কখনোই কোনো দোষ থাকে না। সব সময় শুধু বাবা, কাকাই এদের দোষ হয়ে যায়।”

ইফতি সঙ্গে সঙ্গে গাল দুটো আরও ফুলিয়ে ফারহানের দিকে তাকায়। তারপর নালিশের সুরে বলে,
” মাম্মাম বুকা দিচ্চে।”

ফারহান হেসে ফেলে। সে ছেলেটাকে একটু কাছে টেনে নিয়ে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কী যেন বললো। কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। পরের মুহূর্তেই সে খিলখিল করে হেসে উঠলো। তার সেই প্রাণখোলা হাসিতে আশপাশের পরিবেশটাও যেন হালকা হয়ে যায়। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজ তাদের কথোপকথন শুনতে পাচ্ছে না। এতোটা দূর থেকে শব্দ তার কানে পৌঁছানোর কথাও নয়। কিন্তু ইফতির হাসিটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ছোট্ট ছেলেটার হাসিতে কী অদ্ভুত প্রাণ আছে। তার বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠে। কারণ, আজ সেই হাসির কারণ অন্য একজন পুরুষ। যে মানুষটাকে তার সন্তান বাবা বলে জানে। যার কোলেই সে নিশ্চিন্তে মাথা রাখে। যার হাত ধরেই পৃথিবীটাকে চিনতে শিখছে। আর রাজ? সে শুধু দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অপরিচিত মানুষ। একজন দর্শক। যার সঙ্গে এই শিশুটার রক্তের সম্পর্ক আছে, অথচ জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই।

ফারহান গাড়ির দরজা খুলে ইফতিকে নিয়ে ভেতরে উঠে বসে। তারপর নিজের কোলে বসিয়ে ছেলেটার সঙ্গে আবার কী যেন বলতে লাগে ইফতিও আধো আধো ভাষায় উৎসাহ নিয়ে জবাব দিতে লাগে। প্রভা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ চলে যায় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজের দিকে। লোকটা এখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। স্থির। নিঃশব্দ। তাদেরই দেখছে। এক মুহূর্তের জন্য প্রভার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জাগে। তবে সেটা মায়া নয়, ভালোবাসাও নয়। শুধু অতীতের একটা অধ্যায়ের প্রতি শেষবারের মতো তাকিয়ে থাকার অনুভূতি।পরের মুহূর্তেই সে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আর কোনোদিনের মতোই। চিরতরে।

গাড়িতে উঠে বসতেই ফারহান আলতো করে ইফতিকে প্রভার কোলের ওপর বসিয়ে দেয়। তারপর খুব যত্ন করে তাদের দুজনের সিটবেল্ট বেঁধে দিলো। সবকিছু ঠিক আছে কিনা আরেকবার দেখে নিয়ে নিজের সিটবেল্ট লাগিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দিতে বললো,
” তো বাবাজান, এবার পার্কে যাওয়া হবে?”

ইফতি আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো।
” হব্বে!”

ফারহান হেসে মাথা নাড়ে। গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলো। ব্যস্ত রাস্তার ভিড়ের মধ্যে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা মিশে যেতে লাগে। দূরে দাঁড়িয়ে রাজ তাকিয়ে রইলো। যতোক্ষণ দেখা যায়। যতোক্ষণ গাড়িটার শেষ অংশটুকুও চোখের আড়াল না হয়। অবশেষে সাদা গাড়িটা মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যায়।রাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। চারপাশে মানুষের ভিড়, গাড়ির শব্দ, ব্যস্ত শহরের কোলাহল, সবকিছুই যেন তার থেকে বহু দূরের কোনো জগতের অংশ। ধীরে ধীরে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকায় সে। বিকেলের আলোয় আকাশটা ঝলমল করছে।সূর্যের শেষ সোনালি রঙ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। অদ্ভুত সুন্দর একটা বিকেল। অথচ, সেই সৌন্দর্যের ভেতর তার নিজের জন্য কোনো জায়গা নেই।

রাজ ধীরে ধীরে একটা ঢোক গিলে নেয়। তারপর গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুকের ভেতর থেকে। কিছু সম্পর্ক মানুষ নিজ হাতে ভেঙে ফেলে। তারপর সারাজীবন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, সেই ভাঙা সম্পর্কের ধ্বংসস্তূপের ওপর অন্য কেউ কতো সুন্দর করে নতুন একটা জীবন গড়ে তোলে। আর তখন আর কিছু করার থাকে না। শুধু দূর থেকে দেখার অধিকারটুকু ছাড়া। চোখ নামিয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যায় রাজ। দরজা খুলে ভেতরে বসে। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে একবার চোখ বন্ধ করে। তারপর নীরবে গাড়িটা চালু করে রাস্তায় নামিয়ে দেয়। ব্যস্ত শহরের অসংখ্য গাড়ির ভিড়ে সেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

সেই দিনের পর কেটে গেছে দশটি দীর্ঘ দিন। এই দশটা দিন রাজের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনেনি। সময় এগিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরের পৃথিবীটা যেন একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে, এক অন্ধকারে আটকে থাকা এক নিষ্প্রাণ জীবন। সে এখনও ঘরবন্দী। দরজা জানালার বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু শব্দ আর ছায়ার মতো।

মারফুয়া বেগম যখনই রুমে আসে, রাজ ভেঙে পড়ে। এক শিশুতোষ অসহায়তায় সে মায়ের কোলে মাথা রেখে কাঁদে হাউমাউ করে, কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়া। মারফুয়া বেগম চুপচাপ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তাঁর বুকেও পাথরের মতো ভার জমে থাকে, কিন্তু কিছুই করার থাকে না। সন্তানের এমন ভেঙে যাওয়া কোনো মায়ের পক্ষেই সহ্য করা সহজ নয়। তিনি নীরবে কাঁদেন, চোখের পানি মুছতেও ভুলে যান।

রাতটা নীরব, ভারী আর অস্বস্তিকর। ঘরের ভেতর শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ। সেই শব্দও যেন রাজের বুকের ভেতরের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিছানায় শুয়ে আছে সে। ঘুম নেই, শান্তিও নেই। শরীরটা ক্লান্ত, কিন্তু মনটা যেন হাজার দিক থেকে টেনে ধরছে কেউ। অবশেষে সে উঠে বসে। ঘরের আলো মৃদু। চারপাশ নিঃস্তব্ধ। উঠে বসতেই তার চোখ যায় দেয়ালের বড় আয়নার দিকে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব। কিন্তু সেই মানুষটা কি সত্যিই সে?না। আয়নায় থাকা মানুষটা যেন তাকে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে, অথচ তার চোখে তাচ্ছিল্য। ঠোঁটে হালকা হাসি, বিদ্রূপের। রাজ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। তার গলা শুকিয়ে আসে। সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
” হাসছো কেন তুমি?”

আয়নার ভেতরের মানুষটা যেন একটু মাথা কাত করে তাকায়। একটু থেমে উত্তর দেয়, ঠান্ডা গলায়,
” তোমার এই করুণ দশা দেখে।”

রাজের বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে। সে আবার বলে,
” আমি, আমি কেন এমন হয়ে গেছি?”

প্রতিবিম্ব হাসে। এবার হাসিটা আরও তীক্ষ্ণ, আরও ভয়ংকর।
” কারণ তুমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছো।”

রাজ দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে। তার কণ্ঠ ভেঙে যায়,
” না! আমি হারিয়ে যাইনি। আমি মুক্তি চাই। আমি মুক্তি চাই। আমাকে মুক্তির পথ বলো, আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”

” মুক্তি তো তোমার হাতের কাছেই।”

রাজ মাথা তোলে।
” আমার হাতে? কিভাবে?”

আয়নার সেই তাচ্ছিল্য হাসিটা এবার আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। প্রতিবিম্বটি বলে ওঠে,
” সিলিংয়ের দিকে তাকাও।”

রাজ তাকায়। কিছু সময় তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়। আয়না থাকা প্রতিবিম্ব বলে,
” স্টোর রুমে অনেক মোটা মোটা আর শক্ত দড়ি পেয়ে যাবে। তারপর আর নিশ্চয় তোমাকে বলে দিতে হবে না।”

” এতেই মুক্তি পেয়ে যাবো আমি?”

” একদম মুক্তি পেয়ে যাবে। বিশ্বার করো, শান্তি পাবে। এইটা হলো শান্তি আর মুক্তি পাওয়ার সব থেকে ভালো মাধ্যম। একদম আরাম পাবে তুমি। এইসব অশান্তি দমবন্ধ অনুভুতি সব কিছু থেকে মুক্তি পাওয়ার মেডিসিন ঐটা।”

” সত্যি বলছো?”

” একদম সত্যি বলছি।”

রাজ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে, এক অটল দৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে। কাচের ভেতর যে অস্বাভাবিক প্রতিবিম্বটি প্রথমে কেঁপে কেঁপে উঠছে, তা ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু, রাজের চোখে সে পরিবর্তনের কোনো ছায়া নেই। তার মন সেখানে নেই, আয়নার গায়ে নেই, ঘরের দেয়ালে নেই, কোথাও নেই। তার দৃষ্টি যেন শূন্যতার গভীরে আটকে গেছে, এক অদৃশ্য ভারে স্থির হয়ে আছে। চোখ দুটো খোলা, তবু ভেতরে কোনো দেখা নেই, শুধু নিঃশেষ নীরবতা, যা ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ফেলছে।

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹