#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_অন্তিম_পর্ব_
আনন্দে আনন্দে পুরো বাড়ি ভরে উঠেছে। আজ যেন এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি কোণ, প্রতিটি মানুষ একসঙ্গে উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। সকাল থেকে বাড়িজুড়ে ব্যস্ততা চলছে। আজ পুন্য আরিজ ইফতির জন্মদিন। দেখতে দেখতে তিনটি বছর পূর্ণ করে ফেলেছে ছোট্ট ছেলেটা।
জীবনের প্রথম দুইটি জন্মদিন খুব সাধারণভাবে পালন করেছিল প্রভা। তখন তাদের জীবন ছিল ভিন্ন রকম। সীমিত পরিসরে, খুব কাছের কিছু মানুষকে নিয়ে কেক কাটা আর ছোট্ট আয়োজনের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতো জন্মদিন। কিন্তু, এবার সবকিছু আলাদা। এবার ইফতি শুধু প্রভার সন্তান নয়, এই বাড়ির সবার আদরের সন্তান। বিশেষ করে ফারহানের। অনেকদিন আগেই ফারহান ঘোষণা করে দিয়েছে, তার ছেলের তৃতীয় জন্মদিন কোনোভাবেই ছোট করে পালন করা হবে না। এমনভাবে উদযাপন করা হবে, যেন এই দিনটা বহুদিন মনে থাকে সবার। সেই সিদ্ধান্তের ফলই আজ চারদিকে চোখে পড়ছে।
পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে ফুল, রঙিন বেলুন আর ঝালর দিয়ে। প্রবেশপথ থেকে শুরু করে বারান্দা, ছাদ, ড্রইংরুম, সবখানেই উৎসবের ছোঁয়া। বাড়ির সামনের লনে ছোট ছোট আলোকসজ্জা লাগানো হয়েছে। সন্ধ্যা নামলে যেগুলো জ্বলে উঠবে রঙিন আলোর মেলায়। বাড়ির সামনের বিশাল খোলা জায়গাটাও সাজানো হয়েছে অতিথিদের জন্য।সেখানে বড় বড় প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে। সারি সারি চেয়ার আর টেবিল রাখা হয়েছে। আর বাড়ির পেছন দিকপ বড় খোলা জায়গায় চলছে রান্নার বিশাল আয়োজন। সকাল থেকেই বাবুর্চিদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। বিশাল ডেকচিতে রান্না হচ্ছে নানা ধরনের মুখরোচক খাবার। বাতাসে মসলার গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সেই আয়োজন তদারকি করতে গিয়ে ফারহান আর ফাহিমের যেন দম ফেলার সময় নেই। একবার রান্নার জায়গায় যাচ্ছে, আবার অতিথিদের বসার ব্যবস্থা দেখছে। কখনো কেটারিংয়ের লোকজনকে নির্দেশ দিচ্ছে, কখনো সাউন্ড সিস্টেম পরীক্ষা করছে। দুজনের মুখেই ক্লান্তি আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি আছে আনন্দ। বিশেষ করে ফারহানের। আজকের দিনটার জন্য সে যেন বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছিলো। তার পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির জন্মদিন আজ। আর সেই মানুষটি হলো ছোট্ট ইফতি।
ফারিহা পারভিনও সকাল থেকেই ব্যস্ত। আত্মীয় স্বজনদের অভ্যর্থনা জানানো, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, বসার ব্যবস্থা দেখা সবকিছু সামলাতে হচ্ছে তাকে। তবুও তার মুখে বিরক্তির কোনো ছাপ নেই। বরং, বহুদিন পর এতো মানুষের উপস্থিতিতে তার ভেতরেও যেন নতুন প্রাণ ফিরে এসেছে। একদিকে আত্মীয়দের সঙ্গে গল্প করছেন, অন্যদিকে মাঝেমধ্যে নাতির খোঁজ নিচ্ছেন। আজকের দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তো সেই ছোট্ট ছেলেটাই।
ফারিনও কম ব্যস্ত নয়। নিজের শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসেছে, পাশাপাশি অন্যান্য আত্মীয়স্বজনও। সবাই যেন স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে, কারো কোনো অসুবিধা না হয়, সেই বিষয়গুলো সে খেয়াল রাখছে। এক ঘর থেকে আরেক ঘর, একদল মানুষের কাছ থেকে আরেকদল মানুষের কাছে ছুটে বেড়াচ্ছে সে। সারা বাড়িজুড়ে বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপ লেগেই আছে। কেউ বেলুন নিয়ে খেলছে, কেউ লুকোচুরি খেলছে, কেউ আবার কেক কখন কাটা হবে সেই অপেক্ষায় বারবার বড়দের বিরক্ত করছে। তাদের চিৎকার, হাসি আর কোলাহলে পুরো পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
কিন্তু, এতো কোলাহল আর আনন্দের মাঝেও বাড়ির একটি ঘরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। সেই ঘরের মাঝখানে বিছানার ওপর বসে আছে ছোট্ট ইফতি। আজকের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ সেই, অথচ এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব আনন্দ উৎসব থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে ছেলেটা। এতো মানুষ, এতো শব্দ, এতো অচেনা মুখ দেখে সে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। সকাল থেকে রুমের বাইরে যেতেই চাইছে না। কেউ কাছে এলে মুখ গোমড়া করে ফেলছে, আর একটু পরপরই কান্না জুড়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আঁকড়ে ধরে আছে প্রভাকে। এই মুহূর্তেও সে প্রভার বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে। ছোট্ট দুই হাত দিয়ে মায়ের জামা শক্ত করে চেপে ধরেছে, যেন ছেড়ে দিলেই কেউ তাকে নিয়ে যাবে।
প্রভা ধৈর্য নিয়ে ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, কখনো কপালে চুমু খাচ্ছে। তাও ইফতির ভেতরের অস্বস্তি যেন কিছুতেই কাটছে না। প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ছেলেটাকে দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক করতে হবে। না হলে বিকেলের অনুষ্ঠানে বড় সমস্যা হয়ে যাবে। এতো মানুষের সামনে যদি সে কান্নাকাটি শুরু করে, তাহলে পুরো আয়োজনটাই এলোমেলো হয়ে যাবে। বিশেষ করে ফারহান কতোটা শখ করে সবকিছু করছে, সেটা প্রভা খুব ভালো করেই জানে। এই অনুষ্ঠান নিয়ে গত এক মাস ধরে মানুষটা যেন অন্য এক জগতে বাস করছে। প্রভা চাইছিল না কোনোভাবেই সেই আনন্দে ছায়া পড়ুক।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে ফারহান। মুখে হালকা ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখেমুখে এখনো উত্তেজনা স্পষ্ট। মনে হচ্ছে, সকাল থেকে এক মুহূর্তও বসার সুযোগ পায়নি। রুমে ঢুকেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল মা ছেলের ওপর। ইফতি তখনো প্রভার বুকে মুখ গুঁজে বসে আছে। ফারহান ভ্রু কুঁচকে কাছে এগিয়ে এলো।
” এখনো স্বাভাবিক হয়নি?”
প্রভা অসহায়ের মতো মাথা নেড়ে বললো,
” না!”
ফারহান কয়েক সেকেন্ড ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বিছানার কাছে এসে বসে পড়ে। মুখে হাসি এনে কোমল স্বরে ডাকে,
” ইফতি! মাই পাপা!”
শব্দটা কানে যেতেই ইফতি ধীরে ধীরে মুখ তুলে। বড় বড় চোখে কয়েক মুহূর্ত বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো।ফারহান আস্তে করে বলে,
” আমার বাবাটার কী হয়েছে?”
কিন্তু পরের মুহূর্তেই ইফতির ঠোঁট ফুলে উঠে। সে আবার প্রভার বুকে মুখ গুঁজে দেয়। প্রভা হতভম্ব হয়ে ছেলের দিকে তাকায়। তারপর অসহায় চোখে ফারহানের দিকে তাকিয়ে রইলো। ফারহানও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর প্রভার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বলে, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। যেন সে জানে, তার ছেলে বেশিক্ষণ এমন করে থাকতে পারবে না। ফারহান মুচকি হেসে আরও একটু কাছে সরে এলো। আজকের জন্মদিনের নায়ক যতোই অস্বাভাবিক থাকুক, তাকে স্বাভাবিক করার দায়িত্বটা যে শেষ পর্যন্ত বাবাকেই নিতে হবে। ফারহান আলতো করে হাত বাড়িয়ে বললো,
” ইফতি! পাপা! আসেন তো আমার কাছে।”
প্রভা কিছু বলার আগেই ফারহান ছেলেকে আস্তে করে নিজের কোলে টেনে নেয়। ইফতি কোনো আপত্তি করে না। শুধু গুটিসুটি মেরে বাবার বুকে হেলান দিয়ে বসে রইলো। ছোট্ট দুই হাত দিয়ে ফারহানের শার্ট আঁকড়ে ধরে আছে। ফারহান ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলে ওঠে,
” আপনি এমন করছেন, পাপা? আপনি জানেন, বাইরে কতো বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে? আপনার কতো বন্ধুরা এসেছে।”
ইফতি ঠোঁট উল্টে বাবার দিকে তাকায়। তার মুখভর্তি গম্ভীর ভাব।
” নিচে অনেক মানুছ।”
ফারহান হাসলো।
” সবাই তো আপনার সাথে কেক কাটতে এসেছে।”
ইফতি কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করে,
” কেনু?”
” আজ আপনার বার্থডে না? আজ আমার এই ছোট্ট সোনা পাপা পৃথিবীতে এসেছিলো। আমাদের জীবনের সব থেকে আনন্দের দিন আজ।”
ইফতি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলো। তারপর কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
” আমি কুতায় চিলাম?”
প্রশ্নটা শুনে ফারহান একবার প্রভার দিকে তাকায়। প্রভাও মুচকি হেসে তাদের কথোপকথন দেখছে। ফারহান ছেলের নাকটা আলতো করে চেপে ধরে বললো,
” আপনি আপনার মাম্মামের পেটে ছিলেন।”
কথাটা শুনে ইফতির চোখ দুটো বিস্ময়ে গোল হয়ে গেলো। সে মুখ হাঁ করে কয়েক সেকেন্ড বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর অবিশ্বাসভরা কণ্ঠে বলে ওঠে,
” তালপল কি আমি পেটু পেটে বেলিয়ে এসেচি?”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তারপরই ফারহান হো হো করে হেসে উঠে। এমনভাবে হাসতে লাগল যে চোখের কোণ পর্যন্ত ভিজে উঠে। প্রভাও আর নিজেকে সামলাতে পারে না। ফিক করে হেসে ফেলে। কিন্তু, তাদের হাসি দেখে ইফতির মোটেও ভালো লাগলো না। সে ভ্রু কুঁচকে দুজনের দিকে তাকায়। যেন বুঝতেই পারছে না, এমন মজার কী বলেছে সে। মুহূর্তেই তার গাল দুটো ফুলে উঠলো অভিমানে। তারপর কোনো কথা না বলে বাবার বুকে মুখ গুঁজে দেয়। ফারহানের হাসি ধীরে ধীরে থেমে এলো। সে ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললো,
” আরে আরে, আমার পাপা রাগ করেছে নাকি?”
ইফতি কোনো উত্তর দেয় না। বরং আরও শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। সেই দৃশ্য দেখে প্রভার বুকটা ভালো লাগায় ভরে উঠে। কয়েক মাস আগেও এমন একটা মুহূর্ত কল্পনা করার সাহস তার ছিলো না। অথচ আজ তার ছেলে অভিমান করলে বাবার বুকেই মুখ লুকায়, আর বাবা সেই অভিমান ভাঙানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিছু কিছু সুখ হয়তো ঠিক এমনই, নিঃশব্দে এসে মানুষের জীবনটা পূর্ণ করে দেয়।
ফারহান আলতো করে ইফতির মাথাটা নিজের বুক থেকে সরিয়ে মুখ দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু, ছোট্ট ছেলেটা অভিমানের দুর্গ গড়ে বসেছে। আরও শক্ত করে বাবার শার্ট আঁকড়ে ধরে মুখ গুঁজে রইলো।ফারহান মৃদু হেসে আবার বললো,
” পাপা! আমার দিকে একটু তাকান তো।”
কোনো সাড়া নেই। ফারহান বলে,
” আচ্ছা, সরি! আমি আর একটুও হাসবো না।”
তবুও ইফতির ভেতরের বরফ গললো না। সে একইভাবে মুখ লুকিয়ে বসে রইলো। প্রভা পাশ থেকে দৃশ্যটা দেখে মুচকি হাসলো। ছেলেটার জেদ দিন দিন কেমন বেড়ে যাচ্ছে। এই জেদ নিয়ে মাঝে মাঝে সে বকাঝকা করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত আর পারে না। কারণ, বাড়ির বাকি মানুষগুলো তাকে বিন্দুমাত্র সুযোগ দেয় না। বিশেষ করে ফারহান, ফাহিম আর ফারিহা পারভিন। ইফতি সামান্য মুখ ভার করলেই তিনজন যেন তাকে খুশি করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। ফলে ছোট্ট ছেলেটা বুঝে গেছে, একটু অভিমান করলেই সবাই তার মন ভাঙাতে ব্যস্ত হয়ে যাবে।ফারহানও হাল ছাড়ার মানুষ নয়। সে ধৈর্য ধরে ছেলের পিঠে হাত বুলাতে লাগে।
” আমার পাপা কি সত্যিই রাগ করেছে?”
ইফতি এবারও কিছু বললো না। ফারহান বলতে থাকে,
” তাহলে আজকে কি আমরা কেক কাটবো না? বেলুনগুলোও দেখবো না?”
ইফতি একই ভঙ্গিতে আছে। ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করে।
” আচ্ছা, তাহলে আমি একাই নিচে চলে যাচ্ছি। আমার পাপা থাকুক এখানে।”
কথাটা বলেই সে একটু নড়েচড়ে বসতেই ইফতি তড়াক করে মাথা তুলে তাকায়। চোখেমুখে স্পষ্ট অস্থিরতা। ফারহানের মুখে সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী হাসি ফুটে উঠলো।
” ওহ! তাহলে আমার পাপা এখনো আমাকে ছাড়তে রাজি না?”
ইফতির মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। সে ছোট্ট করে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। ফারহান সুযোগ বুঝে তার গালে একটা চুমু খেয়ে দেয়।
” এই তো আমার ভালো পাপা!”
অনেক আদর, বোঝানো আর গল্পের পর অবশেষে ইফতির অভিমান পুরোপুরি ভাঙে। কিছুক্ষণ পর তাকে কোলে নিয়েই ফারহান রুম থেকে বেরিয়ে এলো। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই চারপাশের কোলাহল আবার কানে ভেসে এলো। আত্মীয়স্বজন, বাচ্চাদের চিৎকার, হাসাহাসি, সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন উৎসবের এক আলাদা জগতে পরিণত হয়েছে। ফারহান ইফতিকে নিয়ে ড্রইং প্লেসের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই কোথা থেকে ঝড়ের বেগে এসে হাজির হলো ফাহিম। কেউ কিছু বোঝার আগেই সে ছো মেরে ফারহানের কোল থেকে ইফতিকে নিজের কোলে তুলে নিল।
” এই যে আমার বাবাটা!”
হঠাৎ এই কাণ্ডে ইফতি এক মুহূর্তের জন্য অবাক হলেও পরক্ষণেই খিলখিল করে হেসে উঠলো। তার সেই হাসির শব্দ শুনে আশেপাশের কয়েকজনও মুচকি হেসে ফেলে। ইফতি দুই হাত দিয়ে ফাহিমের গলা জড়িয়ে ধরে বললো,
” কাকাই! টুমি বাবাল কাচের তেকে আমাকে নিয়ে এসেচো?”
” হ্যাঁরে বাপ। একদম উদ্ধার করে আনছি।”
” বাবা আমায় আটকে লেকেচিলো?”
” অনেকক্ষণ ধরে।”
” ইশ!”
ফাহিম নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায়।
” ভাগ্য ভালো, আমি ঠিক সময়ে গিয়ে পৌঁছেছি।”
ইফতি আবারও হেসে উঠলো। আর কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে ফারহান হতাশ চোখে পুরো দৃশ্যটা দেখলো।এতোক্ষণ ধরে যে মানুষটা ছেলের অভিমান ভাঙাতে প্রাণপণ চেষ্টা করলো, সেই ছেলে এখন মুহূর্তের মধ্যেই কাকার কোলে গিয়ে হাসিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ফারহান অসহায়ের মতো মাথা ঝাঁকায়।
” বাহ! খুব ভালো।”
কিন্তু তার কথায় কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কাকা ভাইপো তখন নিজেদের জগতেই ব্যস্ত। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে ফারহান রান্নার আয়োজনের দিকে এগিয়ে যায়। কেটারিংয়ের লোকজনকে আরও কিছু নির্দেশ দিতে হবে। অতিথির সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। আর এদিকে ফাহিম ইফতিকে কোলে নিয়েই একদল মানুষের কাছ থেকে আরেকদল মানুষের কাছে ঘুরতে লাগে। কখনো কারও সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, কখনো বেলুন দেখাচ্ছে, কখনো আবার নতুন খেলনা এনে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে ইফতির ভেতরের অস্বস্তিটাও কমতে শুরু করে। কিছুক্ষণ আগেও যে ছেলেটা মায়ের বুক আঁকড়ে ধরে রুম থেকে বের হতে চাইছিলো না, সে এখন সবার সঙ্গে মিশে হাসছে, কথা বলছে। তাকে দেখে প্রভার বুকটা স্বস্তিতে ভরে উঠলো। আজকের দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা যেন অবশেষে হয়ে গেছে, জন্মদিনের ছোট্ট নায়ক আবার নিজের মতো করে হাসতে শুরু করেছে।
…
সন্ধ্যা নেমেছে বেশ আগেই। আকাশের গাঢ় নীল অন্ধকারকে হার মানিয়ে পুরো বাড়ি ঝলমল করে জ্বলে উঠেছে রঙিন আলোয়। বাড়ির চারপাশে টাঙানো টুরি বাল্বগুলো একের পর এক জ্বলে উঠছে, যেন অসংখ্য জোনাকি একসঙ্গে ডানা মেলেছে।বেলুনগুলোর ভেতরেও ছোট ছোট আলো বসানো হয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে, রঙিন আলোর গোলকগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাড়ির সামনের লনে অতিথিদের ভিড় আরও বেড়েছে। শিশুদের হাসি, বড়দের গল্প, মাইক্রোফোনে ভেসে আসা হালকা সুর, সব মিলিয়ে চারপাশে উৎসবের আবহ।
আজকের ছোট্ট নায়কও এখন বেশ স্বাভাবিক। সারাদিন যে ছেলেটা মায়ের বুক আঁকড়ে ধরে কান্না করছিল, সেই ইফতি এখন এক দল বাচ্চার সঙ্গে বেলুন নিয়ে খেলায় ব্যস্ত। মাঝে মাঝেই ছুটে এসে কাউকে না কাউকে নিজের নতুন পোশাক দেখাচ্ছে, আবার দৌড়ে চলে যাচ্ছে। প্রভা দূর থেকে ছেলেকে দেখে মৃদু হাসে। তার বুকের ভেতর এক ধরনের শান্তি কাজ করছে। বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে আজকের এই মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছে সে। চারপাশে এতো মানুষ, এতো ভালোবাসা, এতো আপনজন, সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছে। আর মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই কেক কাটা হবে। ঠিক তখনই হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। মারফুয়া বেগম! এই সময়ে তিনি কেন ফোন করেছেন? কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থেকে প্রভা কলটা রিসিভ করলো। আশেপাশের কোলাহল থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে ড্রইংরুমের এক কোণের নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়ায় সে। কিন্তু, ফোন কানে নিতেই তার শরীর কেঁপে উঠলো। ওপাশ থেকে ভেসে আসছে অসহায়, হৃদয়বিদারক কান্নার শব্দ।
প্রভার ভ্রু কুঁচকে যায়। পর ভাঙা ভাঙা গলায় মারফুয়া বেগম বললেন,
” প্রভা! প্রভা! আমার তো সব শেষ হয়ে গেলো, মা!”
প্রভার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।
” কি হয়েছে?”
ওপাশ থেকে আবার কান্না। তারপর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত হলো কয়েকটা শব্দ,
” রাজ, রাজ আ’ত্মহ’ত্যা করেছে।”
মুহূর্তের মধ্যে সময় যেন থমকে যায়। প্রভার হাত অবচেতনেই শক্ত হয়ে এলো। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেলো তার। চারপাশের শব্দগুলো যেন এক নিমিষে দূরে সরে যেতে লাগে। মানুষের হাসি, বাচ্চাদের চিৎকার, মাইক্রোফোনের সুর, সবকিছু কেমন অস্পষ্ট হয়ে গেলো। ওপাশে মারফুয়া বেগম তখনও কাঁদছেন।
” ও আর পারলো না, মা! ও পালিয়ে গেলো। আমার ছেলেটা আর নেই। তোমার সন্তানের বাবা আর নেই। ইফতির বাবা আর নেই।”
প্রভা কিছু বললো না। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো।মারফুয়া বেগমের আহাজারি চলতেই থাকে।স্বাভাবিক। একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর ঘটনা আর কী হতে পারে? রাজের হাজার অন্যায় ছিলো। হাজার ভুল ছিলো। নিজের জীবন সে নিজেই ধ্বং’স করেছে। কিন্তু, একজন মায়ের কাছে সন্তান তো সন্তানই। সন্তান যতোই ভুল করুক, মা কি কখনো তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন? মারফুয়া বেগমও পারেননি। সব জানার পরও পারেননি। প্রভা একটা ঢোক গিললো।
প্রভার দৃষ্টি গিয়ে থামে কেকের ওপাশে। সেখানে ফারহানের কোলে বসে আছে ইফতি। পাশে দাঁড়িয়ে ফাহিমও তাদের সঙ্গে মেতে আছে খুনসুটিতে। তিনজনকে দেখে মনে হচ্ছে যেন তারা নিজেদের আলাদা এক জগতে বাস করছে, যেখানে দুঃখ কিংবা অন্ধকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। সামনের টেবিলে রাখা বিশাল ডার্ক চকলেট কেকটি রঙিন আলোয় আরও আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। ক্রিমের ওপর নিখুঁত অক্ষরে লেখা,
HAPPY BIRTHDAY EFTY
ইফতির মাথায় ছোট্ট একটি জন্মদিনের টুপি।আজকের পোশাকটাও ফারহান নিজে পছন্দ করে কিনেছিল। সেই পোশাকে ছেলেটাকে যেন আরও বেশি প্রাণবন্ত লাগছে। মুখভর্তি হাসি নিয়ে সে কখনো ফারহানের গলায় ঝুলে পড়ছে, কখনো ফাহিমের দিকে হাত বাড়িয়ে কিছু দেখানোর চেষ্টা করছে। তার খিলখিল হাসির শব্দ আশপাশের কোলাহলকেও ছাপিয়ে বারবার প্রভার কানে এসে পৌঁছাচ্ছে। ছেলেটা জানেই না, এই পৃথিবীতে তার জন্মদাতা পিতা আর নেই। সবকিছু থেকে চিরদিনের জন্য মুক্তি নিয়ে চলে গেছে। সন্তানের মুখোমুখি হওয়ার আগেই পালিয়ে গেছে সে। জীবনের কাছে, দায়িত্বের কাছে, নিজের অপরাধবোধের কাছেও হয়তো। মারফুয়া বেগমের কান্নাভেজা কণ্ঠ এখনো কানে বাজছে প্রভার। সেই অসহায় আহাজারির মাঝেই সে নিঃশব্দে কল কেটে দিয়েছে।
নিজের ভেতরটাকে বোঝার চেষ্টা করলো প্রভা। এই মুহূর্তে কি তার কষ্ট পাওয়া উচিত? একসময় যে মানুষটাকে ভালোবেসেছিল, যার সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বছর কাটিয়েছে, তার মৃত্যুর খবর শুনে কি মানুষের বুক ভেঙে যাওয়ার কথা নয়? কিন্তু, আশ্চর্যজনক ভাবে সে কোনো তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছে না। চোখে জল আসছে না। বুক ফেটে কান্নাও পাচ্ছে না। তাহলে কি রাজের প্রতি তার সমস্ত অনুভূতি সত্যিই একদিন নিঃশেষ হয়ে গেছে? নাকি এতোগুলো বছর ধরে জমে থাকা ক্ষত, অপমান আর বিশ্বাসঘাতকতা তার অনুভূতিগুলোকে ধীরে ধীরে পাথরে পরিণত করে দিয়েছে? উত্তর খুঁজে পেলো না প্রভা। তবে শেষবার দেখা হওয়ার দিনের কথা তার মনে পড়ে যায়। সেদিন রাজকে সত্যিই খুব বিধ্বস্ত লাগছিলো। চোখেমুখে ছিলো ক্লান্তি, একরাশ পরাজয় আর ভেতর থেকে ভেঙে পড়া একজন মানুষের ছাপ। সেই দৃশ্যটা মুহূর্তের জন্য আবার ভেসে উঠলো তার চোখের সামনে।
অবচেতনেই প্রভার আবার দৃষ্টি ফিরে ইফতির দিকে।ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। আজ তার ছেলের জন্মদিন। আজই তার ছেলের পিতার মৃ’ত্যুদিন।একদিকে জন্মের উৎসব, অন্যদিকে মৃ’ত্যুর বিদায়। আর মাত্র কিছুক্ষণ পর ইফতি হাসিমুখে জন্মদিনের কেক কাটবে। চারপাশে করতালি পড়বে, সবাই তাকে ঘিরে আনন্দে মেতে উঠবে। ঠিক সেই সময় হয়তো অন্য কোথাও রাজের নিথর দেহকে শেষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত করা হবে। হয়তো তাকে দাফনের আয়োজন চলছে। হয়তো একজন মা বুক চাপড়ে কাঁদছেন তার সন্তানের জন্য। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য, অথচ অদৃশ্য এক সুতোয় বাঁধা। কিন্তু, এই মুহূর্তে সেই সত্যটা কেউ জানে না। না এই উৎসবে মেতে থাকা মানুষগুলো, না ফারহান। এমনকি ছোট্ট ইফতিও না। সে শুধু হাসছে। নিষ্পাপ, নির্মল আর অজানা এক আনন্দে হাসছে। আর দূর থেকে দাঁড়িয়ে প্রভা অনুভব করে, জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্যগুলো বোধহয় ঠিক এভাবেই পাশাপাশি হেঁটে চলে। এক হাতে জন্মের আলো, অন্য হাতে মৃ’ত্যুর অন্ধকার নিয়ে।
” প্রভা! আসো, কেক কাটা হবে তো।”
ফারহানের কণ্ঠস্বর কানে আসতেই যেন ধ্যান ভাঙে প্রভার। এতোক্ষণ সে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলো। চারপাশের রঙিন আলো, মানুষের কোলাহল, শিশুদের হাসি, সবকিছু থেকেও যেন অনেক দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো। মুখ তুলে তাকায় সে।
সামনের দিকে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান। কোলে ইফতি। দুজনের মুখেই উৎসবের উচ্ছ্বাস। তাদের ঘিরে জড়ো হয়ে আছে আত্মীয়স্বজন, অতিথিরা। সবাই অপেক্ষা করছে জন্মদিনের কেক কাটার মুহূর্তটির জন্য। প্রভা কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নিজেকে সামলে নেয়। স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
” আসছি।”
কথাটা বলে ধীরে ধীরে হাতের ফোনটার দিকে তাকায় প্রভা। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলো প্রভা। তারপর কোনো দ্বিধা না করে সাইডের পাওয়ার বাটন চেপে ধরে। ফোনটা শাট ডাউন করে দেয়। কালো স্ক্রিনে নিজের অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখতে পায় সে।মুহূর্তের জন্য চোখ দুটো বন্ধ করলো। কয়েকটি গভীর নিঃশ্বাস নেয়। চোখ খুলে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সে। প্রভাকে কাছে আসতে দেখেই ইফতি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো। দুই হাত নেড়ে বললো,
” মাম্মাম! আমাল বার্তডে। কেক কাটা হবে একন।”
তার মুখভর্তি উচ্ছ্বাস দেখে প্রভার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠে। তবুও সে হাসে। তারপর এগিয়ে গিয়ে ছেলের ফুলোফুলো গালে আলতো করে একটা চুমু খায়।
” হ্যাঁ, বাবা। কেক কাটা হবে।”
ইফতি খুশিতে খিলখিল করে হেসে উঠে। কিছুক্ষণ পর সবাই কেকের টেবিলের চারপাশে জড়ো হলো। রঙিন আলোয় ঝলমল করছে বিশাল ডার্ক চকলেট কেকটা। মোমবাতির আলো ছোট্ট ছোট্ট শিখা হয়ে জ্বলছে তার ওপর। সবাই একসঙ্গে গেয়ে উঠলো,
” হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!”
চারপাশে করতালি আর হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়লো। ফারহান এক হাতে ইফতিকে ধরে রাখলো, অন্য হাতে ছুরিটা ধরিয়ে দিল। প্রভাও পাশে এসে দাঁড়ালো।তিনজনের হাত একসঙ্গে ছুরির ওপর স্থির হলো।তারপর ধীরে ধীরে কেক কাটা হলো। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে হাততালির ঝড় বয়ে যায়। ইফতি কিছু না বুঝেই সবাইকে অনুসরণ করে নিজেও তালি দিতে শুরু করে। তার ছোট্ট দুই হাতের এলোমেলো তালি দেখে চারপাশে আবার হাসির রোল উঠলো। ফারহান হেসে ছেলের কপালে একটা চুমু খেয়ে কেকের ছোট্ট একটা টুকরো তুলে নেয়। তারপর অত্যন্ত যত্ন করে ইফতির মুখের সামনে ধরলো।
” এই যে, আমার জন্মদিনের বাবার জন্য।”
ইফতি আনন্দে মুখ হা করে কেকটা খেয়ে ফেলে।মুহূর্তেই তার চোখ দুটো চকচক করে উঠে।
” ইয়াম্মি!”
চারপাশে আবারও হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই পুরো দৃশ্যটা নিঃশব্দে দেখছে প্রভা। খুব মনোযোগ দিয়ে। খুব গভীরভাবে। আজ এক অদ্ভুত দিন। একদিকে জন্মের উৎসব। অন্যদিকে মৃ’ত্যুর সমাপ্তি। আজই কোথাও একজন মানুষ শেষবারের মতো পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছে। আর ঠিক সেই দিনেই তার সন্তান জীবন উদযাপন করছে। প্রভার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে উঠে। তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো ফারহানের ওপর। মানুষটা ধৈর্য নিয়ে ইফতির মুখ মুছে দিচ্ছে। আবার কেক খাওয়াচ্ছে। ছেলের হাসিতে হাসছে, তার আনন্দে আনন্দিত হচ্ছে। যেন পৃথিবীর সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে সে।
প্রভার চোখ ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। ভাগ্য কখনো কখনো মানুষের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নেয়।আবার কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে ফিরিয়েও দেয়। আজ জন্ম দেওয়া পিতার মৃত্যুর দিনে, যোগ্য পিতার হাতেই জন্মদিনের কেক খাচ্ছে ইফতি। আর সেই দৃশ্যের চেয়ে সুন্দর সত্য হয়তো এই মুহূর্তে আর কিছুই নয়।
…
রাত প্রায় ১০টা!!
রহমান ভিলা, প্রভাবশালী এক পরিবারের অভিজাত বাসভবন। কিন্তু এখন পুরো বাড়িটা যেন শোকে জমাট বেঁধে আছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই পুলিশের আনাগোনা এখনো অব্যাহত। রাজের মৃ’তদেহ পো’স্টম’র্টাম শেষে দাফন করা হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। তবুও যেন কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না, বাড়ির ছেলে আর কোনোদিন এই বাড়ির দরজা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে না। যেই ঘরে তার উপস্থিতি ছিল, সেই ঘরগুলো আজ হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে গেছে।
মারফুয়া বেগম সেই শূন্যতাটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন। ছেলের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর থেকেই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে একজন নার্সকে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরাও নিয়মিত তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। তবুও, একজন মায়ের বুকের ভেতরের ক্ষত সারিয়ে তোলার মতো ওষুধ পৃথিবীতে নেই। রনক রহমানের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। জীবনের বহু ঝড় মোকাবিলা করা মানুষটাও আজ ভেঙে পড়েছেন। ছেলের এমন পরিণতি তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। অতিরিক্ত মানসিক চাপে তার রক্তচাপ হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছিল। যদিও চিকিৎসার পর এখন কিছুটা স্থিতিশীল, তবুও তার চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে আছে এক সন্তান হারা বাপের বেদনা।
বাড়ির ভেতরে বাইরে পুলিশ সদস্যরা ছড়িয়ে আছে। নিয়মমাফিক তদন্ত চলছে। মৃ’ত্যুর কারণ, ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একদল কনস্টেবল রাজের ব্যক্তিগত কক্ষ তল্লাশি করতে ব্যস্ত। ঘরটা অদ্ভুতভাবে পরিপাটি। যেন এর বাসিন্দা বের হওয়ার আগে সবকিছু গুছিয়ে রেখে গেছে। বিছানা, আলমারি, বুকশেলফ, সবকিছুতেই এক ধরনের শৃঙ্খলার ছাপ। অথচ, সেই শৃঙ্খলার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা, যা শেষ পর্যন্ত একজন মানুষকে নিজের জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে।
তদন্তকারী অফিসার ধীর পায়ে পুরো ঘরটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার অভিজ্ঞ চোখ কোনো কিছুই এড়িয়ে যেতে চাইছে না। একসময় তার দৃষ্টি গিয়ে থামে বেডসাইড টেবিলের ওপর। সেখানে একটি বই রাখা। বইটির নিচ থেকে সাদা কাগজের একটি কোণা সামান্য বেরিয়ে ছিল। প্রথম দেখায় বিষয়টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও অফিসারের অভ্যাস তাকে থামতে দেয় না। তিনি এগিয়ে গেলেন। আস্তে করে বইটি সরাতেই নিচে চাপা পড়ে থাকা ভাঁজ করা কাগজটি বেরিয়ে এলো। কয়েক সেকেন্ড কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি সেটি হাতে তুলে নিলেন।তারপর খুললেন। কাগজের ভেতরে ছোট ছোট, গুটি গুটি অক্ষরে মাত্র দুটি লাইন লেখা,
< আমার মৃ'ত্যুর জন্য দায়ী আমি নিজেই। ইতি, পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা ও ব্যর্থ সৈনিক!! >
…………..🌹সমাপ্ত🌹……………

