#এক_বরষায়[৩]
জেরিন আক্তার নিপা
জেসমিন স্কুলের উদ্দেশ্যে ব্যাগ কাঁধে গেট দিয়ে বেরুতে বেরুতে পেছন ফিরে ডেকে বলল,
‘আপু গেট লাগিয়ে দে। আমি যাচ্ছি।’
বলেই আগাতে লাগল সে। পা ব্যথার অজুহাতে দুই দিন স্কুল কামাই করেছে। পড়াশোনা তার একদম ভালো লাগে না। কেন যে লেখাপড়া করতে হয়! এই লেখাপড়া নামক শব্দটা দুনিয়া থেকে উঠে গেলে জীবনটা আরও সুন্দর হতো। পঞ্চাশ ষাট বছর যত বছরই বাঁচত সুখে শান্তিতে কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু এখন? ক্লাস টেস্ট দাও। প্রথম সেমিস্টার, দ্বিতীয় সেমিস্টার এরকম করে চার পাঁচটা সেমিস্টার দাও। তারপর আবার ফাইনালের টেনশন করো। এক জীবনে এত টেনশন নেওয়া যায়! কবে জানি তার ছোট্ট মাথা পরীক্ষায় চিন্তা করে করে ফেটে যায়। যে পড়াশোনা আবিষ্কার করেছিল তাহলে পেলে মজা বুঝাতো। পড়াশোনা আবিষ্কার করেছিস ভালো কথা। সাথে এমন কোন ঔষধ বড়ি আবিষ্কার করতে পারলি না যা খেলে কঠিন কঠিন বিষয় গুলো খুব সহজেই মাথায় ঢুকবে। বা এমন কোন উপায় কেন বের করলি না, যাতে সারা বছর না পড়েও পরীক্ষায় পাস করা যাবে।
‘এই জেসমিন। জেসু শোন।’
নিজের ভাবনায় মগ্ন হয়ে হাঁটতে হাঁটতে নয়ন ভাইকে না দেখেই চলে আসছিল। পেছন থেকে নয়ন ভাইয়ের ডাক শুনে দাঁড়াতে হলো। নয়ন দৌড়ে এসে ওর সামনে দাঁড়াল। জেসমিন মুখ কালো করে বলল,
‘কী বলবে বলো।’
‘খবর কী তোর? দেখা পাওয়া যায় না তোর। দুই দিন কই ডুব দিয়েছিলি শুনি?’
ডান পা-টা বাড়িয়ে দিয়ে জেসমিন বলল,
‘দেখো, পা ভেঙে রোগী হয়ে বসেছিলাম। তুমি যে একটু আমার খোঁজ খবর নিবে, ফলফুল নিয়ে বাড়িতে দেখতে যাবে সেটা তো করো না। খালি নিজের কাজের সময় জেসু লক্ষী সোনা চাঁদের কণা।’
‘আহা পা ভাঙলি কীভাবে?’
‘উস্টা খেয়ে নখ উলটে ফেলেছি। কত রক্ত পড়েছে। আমার শরীরের অর্ধেক রক্ত বেরিয়ে গেছে মনে হয়।’
‘আহারে! তুই টেনশন করিস না। বাজারের সব ফল আজকের পর থেকে তোর জন্য ফ্রি। এক মাস জম্পেশ খাওয়া দিয়ে আবার রক্ত বানিয়ে ফেলবি। এখন বল আমার কাজ কতদূর এগোলো।’
‘কীভাবে এগোবে বলো তো?’
‘কেন কী হয়েছে? ‘
‘তোমার মা সারাদিন পাড়া ঘুরে যেই হাড়ে আমার বাপ আর বোনের বদনাম কয়ে বেড়ায়! এতে এই জনমে তোমার স্বপ্ন সত্যি হবে না।’
নয়নের মুখটা অমাবস্যার নিকষ কালো রাতের মতো হয়ে গেল। ধারা এত ভালো মেয়ে মা যে তবুও কেন ওকে পছন্দ করে না! ধারার নামই শুনতে পারে না।
জেসমিন আড়চোখে নয়ন ভাইয়ের চুপসে যাওয়া মুখটা দেখে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল,
‘তোমার মা’র ভয়ে আপুর কানে আমি তোমার কথা তুলতেই পারি না। আপু নিজের নামে সব অপবাদ সহ্য করে নিলেও বাবার নামে কেউ খারাপ কথা বললে ওটা সহ্য করতে পারে না।’
‘কিন্তু আমার মা তো তোর বাবার নামে অপবাদ দিচ্ছে না। তোর বাবা তো সত্যিই মদ…
জেসমিন চোখ পাকিয়ে তাকালে নয়ন মুহূর্তে কথা ঘুরিয়ে নিল। এই মেয়েকে রাগিয়ে দেওয়া যাবে না। একে রাগালে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। তাই যেভাবেই হোক একে হাতে রাখতে হবে।
‘মদ খাওয়া খারাপ কিছু না। মদ খাওয়া ভালো। সবাই যদি মদ খাওয়া ছেড়ে দেয় তাহলে মদ কোম্পানির মালিকের বউ বাচ্চা না খেয়ে মরবে। আর যারা মদ খায় তাদের মন পরিষ্কার থাকে৷ মদ খেয়ে মনের সব কথা বলে দেয়। মনের মধ্যে কোন জটিলতা থাকে না।’
‘তোমার মাকেও তাহলে মদ খাওয়ানো দরকার। মনের ভেতর থেকে সব কুটিলতা বদগিরি ছুটে যাবে।’
‘তোর বোন কি আজ ভার্সিটিতে যাবে না?’
‘যাবে। একটু পরেই বেরুবে।’
‘আচ্ছা আমি তাহলে তোকে রিকশা ডেকে দেই।’
‘দাও।’
নয়ন রিকশার খুঁজে রাস্তায় দেখছে। একটা রিকশাও নেই আজকে। একটু পরে ধারা বেরুবে। হেঁটে যাবে নাকি মেয়েটা! জেসমিন নয়ন ভাইকে দেখল। নয়ন ভাইয়ের জন্য মায়া হয় ওর। বেচারা চারটা বছর ধরে গাধার মতো আপুর পেছনে পড়ে আছে। আপু ওকে পাত্তাই দিচ্ছে না। আপু যে কেন নয়ন ভাইকে পছন্দ করে না এটা তার বুঝে আসে না। নয়ন ভাইকে অপছন্দ করার মতো কারণও সে খুঁজে পায় না।
‘নয়ন ভাই, তুমি পড়াশোনা কেন ছাড়লে বলো তো।’
‘হঠাৎ এই প্রশ্ন!’
‘কলেজ পাস করে আর পড়লে না কেন? আপু পড়ে ভার্সিটিতে ও তার থেকে কম পড়ালেখা জানা ছেলেকে কেন পছন্দ করবে?’
‘তোর বোনের বেশি পড়ালেখা জানা ছেলে পছন্দ নাকি? ও বলেছে তোকে?’
‘বলেনি। তবে আমি জানি। আর বাবাও আপুকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে রাজি হবে না। আপুর জন্য যে কয়টা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে সব কয়টা ছেলেই অনার্স মাস্টার্স পাস। কেউ কেউ তো আবার বড় বড় পদে চাকরি করে।’
‘তোর আপুর বিয়ের কথা ভাবা হচ্ছে?’
‘না। বাবা এখনও কিছু বলেনি। তবে পাড়ার কয়টা কাকী ইতোমধ্যে তাদের ভাতিজা ভাগিনার জন্য প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছে।’
‘কোন কোন কাকী আমাকে চিনিয়ে দিস তো।’
জেসমিন ভ্রু নাচিয়ে সকৌতুকে জিজ্ঞেস করল,
‘চিনিয়ে দিলে কী করবে তুমি?’
‘শুধু বলে দেব ভাই ভাতিজা যেই আসুক। আমাদের পাড়ায় নিজের পায়ে হেঁটে ঢুকবে। কিন্তু বেরুবে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে।’
নয়ন ভাইয়ের কথা শুনে জেসমিন খিলখিল করে হাসতে লাগলো। নয়ন উদাস মুখে দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে। হাসতে হাসতেই জেসমিন বলল,
‘ধরো আপুরই যদি তোমাকে পছন্দ না হয়। আপু যদি বলে আপনাকে আমার পছন্দ না। তাহলে তুমি কি করবে?’
একটা খালি রিকশা আসছে। নয়ন জেসমিনের কথায় উত্তর না দিয়ে হাত উঁচিয়ে রিকশা ডাকল। জেসমিনকে তুলে দিয়ে রিকশাওয়ালাকে বলল,
‘স্কুলের সামনে নামাই দিয়েন মামা। সাবধানে নিয়া যাইয়েন।’
রিকশা ছেড়ে দিয়েছে। জেসমিন মুখ বাড়িয়ে পেছন দিকে ফিরে বলল,
‘আমাদের বাড়িতে ভাড়াটে আসবে নয়ন ভাই। একটা ছেলে ভাড়াটে।’
ভাড়াটে আসবে? একটা ছেলে! নয়নের মনটা তিক্ত হয়ে গেল। আজকে তার সাথে শুধু খারাপ ঘটনাই ঘটে যাচ্ছে। সকাল থেকে ভালো কিছুই ঘটেনি। এই পর্যন্ত কয়টা খারাপ খবর শুনেছে ও।
খারাপ সংবাদ নাম্বার এক, ধারার বিয়ের সম্বন্ধ আসছে। এটার কিছু করে নেবে সে। কোন কাকীরা ধারার বিয়ের পেছনে পড়েছে এটা জেনে একটু টাইট দিলেই। এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
খারাপ সংবাদ নাম্বার দুই, ধারার বেশি পড়াশোনা জানা ছেলে পছন্দ। তার কাছে ইন্টারমেডিয়েটের ডিগ্রি আছে। কিন্তু এতে হবে না। অনার্স বা মাস্টার্স এর ডিগ্রি লাগবে। এসব ডিগ্রি কিনতে পাওয়া যাবে না। পড়ে অর্জন করতে হবে। কিন্তু তার আর এখন পড়াশোনা মাথায় ঢুকবে না।
খারাপ সংবাদ নাম্বার তিন, ধারাদের বাড়িতে ছেলে ভাড়াটিয়া আসবে। সেই ছেলের বয়স কত হবে কে জানে। ছেলেটার যদি দুই বোনের থেকে ধারাকে পছন্দ হয়ে যায়। ধারাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়, তাহলে ওই ছেলের হাতপা ভেঙে ফেলবে সে।
চতুর্থ নাম্বার, এটা কোন খারাপ সংবাদ না। কিন্তু মা’কে থামাতে হবে। নইলে তার ধারাকেকে বিয়ে করার স্বপ্ন এই জীবনে কেন অরেক জীবনেও পূরণ হবে না।
*****
দাদী এবার অনেকদিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিল। দাদী ছাড়া এই দুনিয়ায় তাদের আর কে আছে? বাবা সারাদিন বাইরে থাকে। রাতে কখন বাড়ি ফিরে সেটারও ঠিক ঠিকানা নেই। দাদী না থাকলে তাদের দুই বোনকে কে আগলে রাখত। ধারা তবুও বড় ছিল। নিজের কাজ যেমনই হোক করতে পারত। কিন্তু জেসমিনকে খাওয়ানো, গোসল করানো থেকে সবই তো দাদী করেছে।
জেসমিন যখনই দাদীর কাছে যায় কিছুক্ষণ বসে থাকার পর হু হু করে কেঁদে ফেলে। দাদী যদি বলে, আমার কিছু হবে না। এত তাড়াতাড়ি আমি মরব না। ধারার বিয়ে দেব। তোর বিয়ে দেব। তোদের জামাই না দেখে মরব নাকি!’ দাদীর এই কথায় জেসমিন দাদীকে জড়িয়ে ধরে কান্নার বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। ধারা চাইলেও দাদীকে জড়িয়ে ধরে জেসমিনের মতো কাঁদতে পারে না।
***
এই যাত্রায় দাদী সুস্থ হয়ে উঠল। জেসমিনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলো। ধারা এটাই ভাবে দাদী মারা গেলে জেসমিনটা কীভাবে থাকবে? দাদাজান মারা যাবার পর ধারার কতটা কষ্ট হয়েছিল তা শুধু সে-ই জানে। কাউকে বলতে পারেনি। দাদাজানের ঘরের দিকে দেখলেই কান্না পেত। কত রাত বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছে। সময়ের সাথে সাথে সব কষ্টের তীব্রতাই কমে যায়। যেমন এখন আর দাদাজানের ঘরের দিকে চোখ গেলে কান্না পায় না। জীবনের নামই মানিয়ে নেওয়া। সয়ে যাওয়া। জীবন এভাবেই চলে আসছে।
ভাড়াটে আসবে বলেছিল সেই কবে। কই বাবার ভাড়াটে? কবে আসবে? নাকি আসবে না।
‘এই আপু, বাবার ভাড়াটে কবে আসবে কিছু জানিস?’
ধারা তেরছা চোখে ওর দিকে তাকালে নড়েচড়ে বসল জেসমিন। বোকা হেসে বলল,
‘আমি তো এমনি জানতে চাচ্ছিলাম। কৌতূহল থেকে আরকি। এছাড়া এসব জেনে আমার কী দরকার বল।’
‘তোর কান্ডকারখানা আমরা সহ্য করে নিলেও বাইরের মানুষের সামনে এসব করিস না। বাবার কানে নালিশ গেলে তোর অবস্থা কী হবে জানিসই তো।’
‘হুম। জানি জানি। কবে আসবে?’
‘বছরের শুরু থেকে।’
‘জানুয়ারি মাসে? তাহলে তো আর বেশি দেরি নেই। এই মাস শেষ হতে আর কয়টা দিন।’
‘তোমার পরীক্ষার কতদিন বাকি আছে এটা মনে আছে তো?’
‘এক মাস।’
‘সেই অনুযায়ীই পড়াশোনা কোরো। ফেল করলে বাবা তোমার ঠ্যাঙ ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবে।’
‘পড়া পড়া পড়া। পড়া ছাড়া তোর মুখে কোন কথা নাই। অসহ্য। পড়তে পড়তেই একদিন মরব। তখন বোন খুঁজবি।’
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে মুখ ভেংচি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল জেসমিন। পড়াশোনা তার জীবনে সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন তো পথেঘাটেও যে-ই দেখে জিজ্ঞেস করে,
‘পরীক্ষার কয়দিন আছে? প্রস্তুতি কেমন? পাস করবি তো?’
কী এক জ্বালা। জীবন অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে এরা পাড়া-মহল্লার কুটনী মহিলা গুলো মিলে।
চলবে🌸