এক বরষায় পর্ব-০৫

0
682

#এক_বরষায়
জেরিন আক্তার নিপা


একদিন বাবা ধারাকে ঘরে ডাকলেন। কী যেন বলবেন বলে। বাবা এভাবে কখনও তার সাথে আলাদা করে কথা বলে না। বাবার সাথে তার যেন কেমন একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। এটা কখন তৈরি হয়েছে বাবা সে কেউই হয়তো বুঝতে পারেনি।
ধারা ঘরে এসে দেখল বাবা খাটে বসে আছে। বিদুৎ নেই। মাথার উপরের ফ্যান থেমে আছে। বাবা ঘেমে একাকার। গ্রীষ্মের শেষের দিকে। তবে এখনও একদিনও বৃষ্টি হয়নি। প্রচন্ড গরম যাচ্ছে। ধারা হাতপাখা দিয়ে বাবাকে বাতাস করতে করতে বলল,

‘ কিছু বলবে বাবা?’

‘হু।’ হু বলে বাবা অনেকক্ষণ আর কিছুই বলল না। ধারাও অপেক্ষা করে থাকল।

‘ধারা মা।’ বাবা ধারাকে শেষ কবে এভাবে মা ডেকেছিল? মনে পড়ছে না তার। তাই আজ একটু অবাকই হলো ধারা। বাবা বলে যাচ্ছে।

‘আমার একজন আত্মীয় আমাদের বাড়িতে কয়টা দিনের জন্য থাকতে আসবে। যতদিন কোন বাড়ি ভাড়া না পেয়ে যায় আরকি। ও আমার একটা কাছের বন্ধুর ছেলে। অনেকদিন পর ওর বাবার সাথে দেখা হলে আমাকে বললে আমি না করতে পারলাম না। কিন্তু আমাদের বাড়িতে তো আর খালি কোন ঘর নেই।’

ধারা বুঝতে পেরেও কিছু বলল না। বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুই হবে হয়তো। নইলে বাবা কোনমতেই রাজি হতো না। বাবা ইতস্তত করছে। কথাটা মেয়েকে কীভাবে বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না।

‘তুমি যদি মা কয়টা দিনের জন্য তোমার দাদীর সাথে থাকতে। তাহলে ও তোমার ঘরে থাকতে পারতো। নিজের ঘর ছাড়তে তোমার যদি সমস্যা হয় তাহলে দরকার নেই। আমি না করে দিব।’

‘আমার কোন সমস্যা নেই বাবা। তোমার যাকে খুশি আমার ঘরটা দিতে পারো। কয়টা দিনেরই তো ব্যাপার। আমি দাদীর সাথে থাকতে পারব।’
****

জেসমিনের পরীক্ষা শেষ। এখন তার জীবনে সুখ আর সুখ। রেজাল্ট না আসার আগ পর্যন্ত কেউ আর তাকে পড়ার কথা বলতে পারবে না। সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। এই আজকে কোন বান্ধবীর বাড়ি চলে যাচ্ছে। কাল রোজী আপার সাথে বের হচ্ছে। আতিফের সাথেও আগের থেকে কিছুটা বনিবনা হয়েছে ওর। কারণ আতিফ ওর সব কথা শুনে। আতিফকে দেখে মনে হবে না ও তাদের ভাড়াটে। হঠাৎ বাইরের কেউ এলে এটাই ভাববে আতিফ এই বাড়িরই ছেলে। ছেলেটা অল্প দিনে এতটা আপন হয়ে গেছে।

‘ওই আতিইপ্পা, তোরে যে তেঁতুল আনতে বলেছিলাম এনেছিস?’

‘তুমি টাকা দিয়েছে!’

‘এহ রে, কী কিপ্টারে তুই! তোর মনটা এত ছোট? আমার বাপের বাজারের টাকা থেকেই কয়েক টাকা মেরে দিতি।’

‘ওসব মারামারির কাজে আমি নাই।’

‘তোরে পাইল্যা কোন লাভই হইব না রে। পর কোনোদিন আপন হয় না।’

ধারাকে অন্যমনস্ক হয়ে এদিকে আসতে দেখে ওরা দু’জন মিছেমিছি ঝগড়া বন্ধ করে দিল।
আতিফ প্রথম কয়েকদিনেই বুঝে ফেলেছিল নয়ন ভাই ধারা আপুকে পছন্দ করে। সে এই বাড়িতে আসার পরের দিন যখন বাইরে যাচ্ছিল, কোত্থেকে দুইটা ছেলে এসে তার পথ আটকে দাঁড়াল। কেমন চোখে তাকে দেখে মুখ বাঁকিয়ে বলল,

‘এটা তো কচি ছেলে। এরে নিয়া কোন চিন্তা নাই।’

‘ভাই শুধু শুধু টেনশন করছিল।’

এদের কথা কিছুই বুঝতে পারেনি সে। তারপর নয়ন ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো। নয়ন ভাই এদের মতো কথা বলে না। বেশ সুন্দর করে শুদ্ধ করে কথা বলে। ওকে পাশে বসিয়ে ওর কাঁধে হাত রেখে বলেছিল,

‘ছোট ভাইয়ের নাম কী?’

‘আতিফ।’

‘কোন ক্লাসে পড়ো?’

‘ক্লাস নাইন।’

নয়ন ভাই এরকম আরও অনেক প্রশ্ন করার পর তাকে ছেড়েছিল। আসার সময় বলে দিয়েছে,

‘ধারা, জেসমিন ওরা তোমার বড় বোন। ছোট ভাই হিসেবে তোমার দায়িত্ব বেড়ে গেল। বোনদের খেয়াল রেখো।’

বাড়ি ফিরে ধারা আপুকে জিজ্ঞেস করেছিল সে।

‘ধারা আপু, দোকানে যে কয়েকটা ছেলে বসে থাকে ওরা কে গো?’

‘ওরা তোমাকে কিছু বলেছে?’

‘না। কিন্তু প্রতিদিনই বসে থাকে দেখি তো তাই..

‘ওরা ভালো ছেলে না। ওদের সাথে মিশবে না তুমি।’
****

আতিফ ভাবল নয়ন ভাইকে নিয়ে কি কিছু হয়েছে? নইলে ধারা আপুকে কখনও মন খারাপ করতে দেখেনি সে। ধারা আপু জেসমিন আপুর মত এত বেশি হাসে না। কিন্তু ওকে বদমেজাজি রাগীও বলা যায় না।
জেসমিন, আতিফ ধারার মুখ থেকে সব কথা শুনলো। জেসমিন বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বলতে লাগল,

‘প্রথমে ভাড়াটে। এবার মেহমান! বাবা আমাদের বাড়িটাকে কী পেয়েছে? এখানে কি অতিথিশালা খুলে বসে আছে যে, একজন একজন করে আসবে আর আমরা মেহমান সেবা করে সোওয়াব কামাই করব। বাবার যখন এতই দরদ তাহলে বাড়িটাকে লিখে দিলেই পারে। আমরা নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। বাবা মেহমান এনে বাড়ি ভরুক। আজব কাণ্ডকারখানা। না, আমি আর এই বাড়িতে থাকতে পারব না। এক আপু ওয়ালাকে নিয়েই আর পারা যাচ্ছে না। তার উপর আবার নতুন আপদ আসছে।’

জেসমিন মেহমান আসার কথাটা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে। বাড়িতে একটা ঘর অদরকারী পড়ে ছিল ওটাকে নাহয় ভাড়া দিয়েছে। এতে কয়টা টাকা আসছে। কিন্তু বাবা তো এবার মাতলামির সব সীমা পার করে দিয়েছে। আপুকে নিজের ঘর ছাড়তে বলছে!

‘এক ঘরে আমরা তিনজন থাকব কীভাবে? আমার আর দাদীরই তো ওই বিছানায় জায়গা হয় না। তোকে কোথায় রাখব? মাটিতে শুবি তুই?’

ধারা জেসমিনের চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে বলল,

‘চেঁচাস না তো তুই। আমি মাটিতেই থাকতে পারব।’

‘বাড়িতে ঘর রেখে মাটিতে কেন থাকবি তুই? নিজের ঘর অচেনা একটা মানুষকে দিয়ে সে নাকি মাটিতে শুবে! আহা দরদ! মাদার তেরেসা এসেছে।’

‘তুই চিৎকার করা বন্ধ কর তো। বাবার কানে গেলে কষ্ট পাবে।’

‘পাক। নিজের মেয়ের থেকে বাইরের মানুষ বেশি হলে কষ্ট পাওয়াই উচিত। দাদী তুমি কেন বাবাকে কিছু বলো না। দাদাজান না থাকলেও তুমি তো বেঁচে আছো। আর এটা বাবার বাড়ি না। দাদাজান এই বাড়ি বানিয়েছেন। বাবা চাইলেই যা খুশি তা-ই করতে পারে না। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে তোকে।’

‘তুই-ই কর। আমি গেলাম। গলা না যেন ভাঙা ঢোল। যতই আস্তে কথা বলতে বলি তার গলা চড়ে যায়।’

‘ভালার জামানা নাই। আমি কি আমার জন্য গলা চড়াচ্ছি! তোর হক আদায়ের জন্যই লড়ে যাচ্ছি। এখানে তুই-ই আমার পাশে থাকছিস না। এইজন্যই লোকের ভালো করতে নেই।’

আতিফ কিছু বলতে নিলে তার আগেই জেসমিন বলে চলল,

‘ওইযে তোর চামচাও প্রতিবাদ করছে।’

ধারা চোখ রাঙিয়ে জেসমিনকে ধমক দিল।

‘এসব কেমন কথা? দিনদিন অসভ্য হচ্ছিল।’

জেসমিনের কোন কথাতেই আতিফ কিছু মনে করে বলে মনে হয় না। সে ওর সব কথা হেসে উড়িয়ে দেয়। এবারও তাই করল।

‘তুমি কিন্তু ভীষণ ঝগড়া করতে পারো জেসমিন আপু। রাস্তা থেকে তোমার গলা শোনা যায়। তোমার গলা শুনে লোকে এটা দেখার জন্য দৌড়ে আসবে। দিনেদুপুরে এ বাড়িতে ডাকাত পড়ল কিনা।’

‘এই আপুর চামচা, বেশি কথা বলবি না। তোর আপুর সমস্যার সমাধান করতেই আমাকে চেঁচাতে হচ্ছে।’

আতিফ একনজর ধারাকে দেখে নিয়ে প্রশ্ন করল,

‘আপুর সমস্যা হতে যাবে কেন?’

‘তুই কি গাধা! আমাদের বাড়িতে আর কয়টা ঘর আছে? একটা তো তুই দখল করে পড়ে আছিস। এখন মেহমান এলে তোর আপুই ঘর ছাড়া হবে। সমস্যা কি তাহলে পাড়ার লোকের হবে? পারলে নিজের ঘর দিয়ে আপুর সত্যিকারের ভাই হওয়ার প্রমাণ দে।’

‘ঠিক আছে। এটা তো কোন সমস্যাই না। আপুকে ঘর ছাড়তে হবে কেন? আমার এতবড় ঘরে আমি তো একাই থাকি। ওই মেহমান আমার সাথে থাকলেই হয়।’

ধারা বলল,

‘এটা হয় না। বাবার খুব কাছের কেউ। তাছাড়া মেহমানকে কি আর অন্য কারো সাথে রুম শেয়ার করতে বলা যায়। কয়টা দিনেরই তো ব্যাপার। তারপর চলে যাবে। তখন আমি আবার আমার ঘরে ফিরে যাব।’

জেসমিন আপুর ভালো মানুষিতে বিরক্ত হয়ে বলল,

‘তোর যা ইচ্ছা কর। আমার কী? আমি তো তোকে আমার ঘরে জায়গা দিব না। আমার ঘরে কোন উটকো ঝামেলা এলাউ করব না আমি, বলে রাখলাম।’
****

বাবার মেহমান তো এলো। সাথে বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নিয়ে এলো। বর্ষাকাল এসে পড়েছে। আকাশে মেঘ করেছে কিন্তু একদিনও বৃষ্টি হয়নি। আজ সকাল থেকেই মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। হালকা পাতলা কোন বৃষ্টি না। কাক ভেজা ঝুম বৃষ্টি। সকাল থেকে এতক্ষণ জেসমিন বাড়িতেই বসে কাটিয়েছে। কিন্তু তার নাকি বাড়িতে বসে থেকে দম বন্ধ হয়ে আসছে। তাই ছাতা নিয়ে রোজী আপাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। আতিফ এক ছাতা নিয়ে স্কুলে গেছে। এই বৃষ্টিতে সে আর আজ ভার্সিটি যাওয়ার সাহস করেনি। পথে পানি জমে গেছে। ধারা বারান্দায় টুলে বসে বৃষ্টি দেখছে। তার আর কিছু করার নেই।

মুনতাসীর অনেকটা সময় ধরে গেট ধাক্কিয়ে যাচ্ছে। ভেতর থেকে কেউ গেট খুলে দিচ্ছে না। ঠিকানা তো এটাই দিয়েছিল। বাড়ি চিনতে ভুল হয়নি। সে যখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছে আকাশ তখন ফকফকা ছিল। মেঘের কোন আনাগোনা নেই। কিন্তু গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে আর থামার নাম নিচ্ছে না৷ তার সাথে ছাতাও নেই। প্রায় ঘন্টা দুইয়ের মতো অপেক্ষা করে বাধ্য হয়ে বেচারাকে ভিজেই আসতে হয়েছে। ঠিকানায় লেখা বাড়ি খুঁজে পেতেও তেমন অসুবিধা হয়নি। কিন্তু এরা কেউ গেট খুলছে না কেন? বৃষ্টির শব্দ কী তার গলা ভেতর পর্যন্ত পৌছোচ্ছে না! হাতে সুটকেস নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আর কতক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজতে হবে? ঠান্ডা লেগে গেলে উপায় নেই। তার জ্বর সহজে সারে না।

‘বাড়িতে কেউ আছেন? শুনছেন।’

গেটে কি কেউ ডাকছে? কারো গলা শোনা যাচ্ছে মনে হয়। ধারা ভালো করে শোনার চেষ্টা করল। বৃষ্টির শব্দে স্পষ্ট করে কিছুই শুনতে পেল না। উঁকি দিয়ে গেটে দেখার চেষ্টা করল। গেটের নিচ দিয়ে কারো পা দেখা যাচ্ছে।

‘এই সময় কে এসেছে?’

যে-ই আসুক বৃষ্টিতে ভিজতে হচ্ছে মানুষটাকে। ধারা ভাবল আতিফ স্কুল থেকে ফিরে এসেছে নাকি? ঘরে বাড়তি আর ছাতা নেই। কীভাবে গিয়ে গেট খুলবে সে? গেট খুলতে গেলে তাকেও ভিজতে হবে। ধারা একটা চাদর মাথার উপর দিয়ে ছাউনির মতো ধরল। উঠানে পানি জমেছে। ছপছপ শব্দে জায়গাটুকু পেরিয়ে গেট খুলে সামনে যে মানুষটাকে দেখল তাকে চিনতে পারল না সে। আগে কখনও দেখেছে বলেও মনে হলো না। কপালে ভাঁজ নিয়ে ধারা জিজ্ঞেস করল,

‘আপনি কে?’

চলবে_