#এক_বরষায়
জেরিন আক্তার নিপা
৬
মুনতাসীর আবার গেটে ধাক্কা দিতে যাচ্ছিল। তার আগেই গেট খুলে গেল। একটা মেয়ে গেট খুলেছে। মাথার উপর এক হাতে চাদর ধরা। বৃষ্টিতে ঘর থেকে গেট পর্যন্ত আসতেই অনেকটা ভিজে গেছে। চোখের পাতায় বৃষ্টিকণা লেগে আছে। ছোট্ট ছোট্ট বৃষ্টি কণা গুলোকে একেকটা মুক্তোর দানা মনে হচ্ছে। মাথার চুল থেকে কপাল বেয়ে মুখে পানি পড়ছে। ভেজা মুখে কয়েকটা চুল লেপ্টে আছে। মুনতাসীর নিজেও কাক ভেজা হয়ে আছে। এখনও দাঁড়িয়ে থেকে ভিজছে। সেদিকে খেয়াল নেই ওর। কয়েক মুহূর্তের জন্য সামনে দাঁড়ানো মেয়েটাকেই দেখতে লাগল।
ধারা ভিজে যাচ্ছে। লোকটা কে? গেটের সামনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বাড়িতেই এসেছে নাকি? লোকটাকে ওর দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ধারার বিরক্তির সীমা রইল না। সে আবার জিজ্ঞেস করল,
‘কে আপনি? কাকে চান?’
মেয়েটির কথায় মুনতাসীরের ধ্যান ভাঙল। নিজের এমন কাজে লজ্জা পেল। হাতে ধরা সুটকেসের দিকে দেখল। পানি ঢুকে কাপড়চোপড় ভিজে গেছে হয়তো। হঠাৎ মনে পড়ল তার। এই রে, কাপড়চোপড়ের সাথে তার গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও আছে। ওগুলো ভিজে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
মুনতাসীর বলল,
‘এটা কি শফিকুল ইসলামের বাড়ি?’
ধারা হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে জানালো,
‘হ্যাঁ। উনি আমার বাবা।’
‘আমি মুনতাসীর আহমেদ। উনি কি বাড়ি আছেন?’
ধারা ভাবল এটাই বাবার সেই মেহমান না তো! কিন্তু ইনি যে আজ আসবেন তা তো বাবা তাকে বলেনি। হুট করে লোকটা চলে এলো। তার ঘর থেকে দরকারি জিনিস গুলোও তো এখনও দাদীর ঘরে নেওয়া হয়নি। এখন ইনাকে কোথায় তুলবে সে? লোকটার কি আক্কেল জ্ঞান নেই? এই ভরা বৃষ্টিতে আসা কি খুবই দরকার ছিল! ধারা দেখল লোকটা ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে। সে আর কিছু ভাবল না। উনাকে ভেতরে আসতে বলল।
‘আসুন। আপনার আসার কথা বাবা আগেই জানিয়ে রেখেছিল।’
ধারা একটু সরে দাঁড়িয়ে মুনতাসীরকে গেট দিয়ে ঢোকার সুযোগ করে দিল। গেট লাগিয়ে দিয়ে সে মাথার উপর ধরা চাদর ওড়নার মতো গায়ে পেঁচিয়ে নিল। এই চাদরের ছাউনিতে কোন লাভ হয়নি। পুরোপুরি ভিজেই গেছে সে। ধারা লোকটাকে তার ঘর দেখিয়ে বলল,
‘ওই ঘরে আপনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
বলে দাদীর ঘরের দিকে এগোলো সে। বারান্দায় টানানো দড়িতে ভেজা চাদর মেলে দিয়ে ঘরে চলে গেল। তার ভিজে কাপড় থেকে ঘরে পানি পড়ছে। তা দেখে দাদী আর্তনাদ করে বলে উঠলেন,
‘কী করতাছোস ছেড়ি! কী করতাছোস তুই! ঘর তো ভাসাইয়া ফেলতাছোস।’
‘কিছু করার নেই দাদী। আমার ঘরে এখন বাবার মেহমান খুটি গেড়েছে। শুকনো কাপড় আনতে যেতে পারব না।’
‘ভিজা কাপড়ে থাকবি নাকি তুই! নিউমোনিয়া হইব তো।’
‘তোমার ছোট নানিতের কাপড় পরব। তাছাড়া তো আর কিছু করার নেই।’
‘ওর কাপড়ে হাত দিলে জেসু বাড়ি আইসা লঙ্কাকাণ্ড বাঁধাইব।’
***
মুনতাসীর ঘরে এসে সবার আগে সুটকেস খুলে একসেট শুকনো কাপড় বের করে ভেজা কাপড় ছেড়ে নিল। তারপর ভেতরের কাগজপত্র দেখতে লাগল। না তেমন ভিজেনি। ফাইলের ভেতর ছিল বলে এ যাত্রায় রক্ষা পেল। তবে জামাকাপড় কিছুটা ভিজেছে। মুনতাসীর এবার ঘরটা দেখতে লাগল। ঘরের আসবাবপত্র, ব্যবহার্য জিনিসপত্র দেখে বোঝা যাচ্ছে এটা কোন মেয়ের ঘর। আলনায় মেয়েমানুষের কাপড়। টেবিলে বইপত্র গুছানো। মুনতাসীর ভাবল, এটা কি ওই মেয়ের ঘর যে একটু আগে তাকে এঘরে দিয়ে গেছে! যদি তা-ই হয় তাহলে তার এই বাড়িতে বেশি দিন থাকা ঠিক হবে না। খুব শীঘ্রই কলেজের আশেপাশে কোন বাড়ি খুঁজে বের করতে হবে। শরিফুল কাকার বাড়িতে সে উঠতো না। যদি না বাবা জোড়াজুড়ি করত। ওই জায়গায় নতুন গিয়ে কোথায় ঘর খুঁজবি তুই? যদি ঘর না পাস তখন কোথায় থাকবি? শরিফুল আমার বাল্যকালের বন্ধু। কয়টা দিন ওর বাড়িতে থাক। পরে ঘর পেলে চলে যাবি। ও কিছু মনে করবে না।
মুনতাসীর জানালা খুলে দিতে চাইলে সাথে সাথে এক ঝাপটা বাতাস বৃষ্টির ছাঁট নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। এখনও প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। দূরের জিনিস দেখা যাচ্ছে না। শীতকালের কুয়াশার মতন সবকিছু সাদা চাদরে ঢেকে আছে।
‘এই বৃষ্টি কখন থামবে কে জানে!’
*****
বৃষ্টি থামার পর জেসমিন বাড়ি ফিরেছে। ধারা তখন রান্নাঘরে দুপুরের রান্না করছে। ধৈর্যহারা মেয়েটা গেট ধাক্কাতেই আছে। একটু যে অপেক্ষা করবে তা হবে না। ধারা মাছের তরকারিরতে ঝোল দিয়ে গেট খুলতে গেল। জেসমিন বোনকে তার কাপড়ে দেখে এক চিৎকার দিয়ে উঠল।
‘এ কী! হায় হায় তুই আমার কাপড় পরে আছিস কেন?’
ধারা তড়িঘড়ি করে জেসমিনের মুখ চেপে ধরল। চাপা গলায় ধমক দিয়ে বলল,
‘আস্তে কথা বল। বাবার মেহমান এসেছে। এখন কোন নাটক করিস না। তোর এই কাপড় পরার বদলে আমি তোকে আমার নতুন চুড়িদার জোড়া দিয়ে দেব।’
কথা ক’টা বলে ধারা বোনের মুখ ছাড়ল। জেসমিন চোখে সন্দেহ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
‘সত্যিই দিবি তো?’
‘হ্যাঁ দেব।’
‘মেহমান কখন এসেছে?’
‘অনেকক্ষণ।’
‘ছেলে না মেয়ে?’
‘ছেলে।’
‘বড় ছেলে? নাকি আতইফার মতো কচি খুকু।’
‘তোর ফালতু প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।’
ধারা রান্নাঘরের দিকে যেতে লাগল। জেসমিনের মনে কৌতূহল বুদবুদ করে ফুটছে। সে পা টিপে টিপে আপুর ঘরের দিক এগোলো। দরজার সামনে এসে ভেতরে মাথা বাড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। আর তখনই লোকটাও তাকে দেখে ফেলল। চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়লে যেমন হয়। জেসমিন হুড়মুড়িয়ে পালানোর সময় দরজার সাথে মাথায় বাড়ি খেল।
মুনতাসীর এক পলকের জন্য মেয়েটাকে দেখেছে। ওকে দেখে মেয়েটার ওভাবে পালিয়ে যাওয়ার কারণ বুঝতে পারল না। এই বাড়িতে কি শুধু মেয়েরাই আছে। কোন ছেলে নেই? আসার পর থেকে তো কোন ছেলেকে দেখতে পেল না।
‘এতগুলো মেয়ের মধ্যে এখানে আমি কীভাবে থাকব। যেভাবেই হোক কাল পরশুর মধ্যে বাড়ি পেতে হবে।’
****
ধারা তিনটা টিউশনি পড়ায়। একটা সকালে পড়িয়ে ভার্সিটি যায়। আর দু’টো বিকেলে। দুপুরের পরপরই বৃষ্টি থেমেছে। তাই আজ পড়াতে না যাবার কোন কারণ নেই। কয়েক বছর ধরেই সে নিজের খরচ নিজে চালায়। বাবা হাত খরচ দিতে চাইলেও নেয় না ধারা। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের অনেক শখই অপূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রে ধারার তেমন কোন শখই নেই। শখ, ইচ্ছে, আহ্লাদ এগুলো তো জেসমিনের জিনিস। মেয়েটা বুঝতেই চায় না কিছু। একটা কিছু মনে হলেই হয়। তার লাগবে মানে লাগবেই। সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই। বৃষ্টির পর আকাশে একফালি রোদের দেখা মিলেছে। মেঘেদের দল সূর্যকে আড়াল করে সেই রোদও চলে যাচ্ছে। আজ আকাশে মেঘ রোদের লুকোচুরি খেলা চলছে। ধারা বের হবার আগে ছাতা নিয়ে বেরিয়েছে। বলা যায় না হুট করে কখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। ধারা গেট পেরিয়ে রাস্তায় উঠেছে। আতিফ পেছনে দৌড়ে আসতে আসতে ডাকল ওকে।
‘ধারা আপু দাঁড়াও।’
দাঁড়ালো ধারা। আতিফ ওর কাছে এলে জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি কোথায় যাও এখন?’
‘কোথাও যাব না। তোমাকে এগিয়ে দিতে এলাম। চলো।’
ছেলেটার পাগলামি দেখে ধারা হাসলো। ভালোই লাগে তার। নিজের একটা ভাই থাকলেও হয়তো তাকে এভাবে আগলে রাখার চেষ্টা করত।
নয়ন জানে ধারা এই সময় পড়াতে যায়। বৃষ্টির কারণেই হয়তো দোকানী আজ দোকান খুলেনি। সে বন্ধ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে ধারাকে আতিফের সাথে আসতে দেখল নয়ন। আতিফ নয়ন ভাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আজ সাহস করে জিজ্ঞেস করেই ফেলল।
‘ধারা আপু, একটা কথা জিজ্ঞেস করলে তুমি রাগ করবে।’
‘রাগ করার মতো হলে অবশ্যই করব।’
‘তাহলে থাক।’
ধারা হেসে ফেলে বলল,
‘কী কথা?’
আতিফ বলবে কিনা ভাবল। তারপর বলেই ফেলল,
‘নয়ন ভাই তোমাকে পছন্দ করে তাই না?’
‘কেউ যদি আমাকে পছন্দ করে এতে কি আমার কিছু করার আছে?’
‘আমি সেটা বলিনি। তুমিও কি নয়ন ভাইকে পছন্দ করো ধারা আপু?’
‘পছন্দ জিনিসটা কি আমি ঠিক বুঝি না। তাই বলতে পারছি না।’
‘এই যে নয়ন ভাই সকাল বিকেল তোমাকে দেখার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে থাকে এটা কি তোমার ভালো লাগে। যদি লাগে তবে এটাই পছন্দ। আমি যেটুকু বুঝি আরকি।’
‘এই বয়সেই অনেক কিছু বুঝে ফেলেছ দেখছি।’
‘তুমি বলো না। তোমার ভালো লাগে?’
‘না আতিফ। একটা মানুষ কতটা বেকার হলে দিনের অর্ধেকটা সময় দোকানে বসে আড্ডা দিয়ে কাটাতে পারে! বেকার মানুষ আমার একদম পছন্দ না।’
নয়ন লক্ষ করল ধারা ভুলেও একবারও তার দিকে তাকায়নি। মেয়েটার মন এত শক্ত কেন? মন নাকি পাথর। চারটা বছরেও এতটুকু গলাতে পারল না। ভালোবাসা দিয়ে নাকি পাথরে ফুল ফুটানো যায়। সে তো এই মেয়ের মনেই ফুল ফোটাতে পারছে না। তাহলে কি এর মন পাথরের থেকেও কঠিন জিনিস।
ধারা নয়নকে পার করে হেঁটে চলে যাচ্ছিল। নয়ন এইবারও ধারার সাথে কথা বলল না। আতিফকে ডেকে বলল,
‘ছোট ভাই, তোমার আপুকে দাঁড়াতে বলো। আমি রিকশা ডেকে দিচ্ছি।’
কথাটা ধারাও শুনেছে। নয়ন ওকে সরাসরি না বললেও কথাটা বলেছে তো ওকে শুনিয়েই। ধারা শক্ত গলায় বলল,
‘আমার রিকশা লাগবে না আতিফ। রোজ পায়ে হেঁটে যাই, আজও যেতে পারব।’
‘বৃষ্টি হয়েছে। আজ রাস্তায় পানি জমেছে।’
‘বৃষ্টি নতুন কিছু না। হেঁটে যেতে পারব আমি।’
‘আতিফ ওকে দাঁড়াতে বলো। ওইতো একটা রিকশা আসছে।’
ধারা এই পর্যায়ে গলার স্বর শান্ত রাখতে পারল না। কিছুটা ঝাঁঝালো গলায় সে বলল,
‘বলেছি তো হেঁটে যেতে পারব। তারপরও জোড়াজুড়ি কেন?’
নয়ন এবার আতিফকে মাধ্যম বানিয়ে কথা বলল না। সরাসরি ধারাকেই বলল,
‘এত জেদ ভালো না ধারা। আমি তোমার খারাপ চাই না নিশ্চয়।’
ধারাও এই প্রথম বার নয়ন ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বলল,
‘আমিও এটাই বলি। এত বাড়াবাড়ি ভালো না নয়ন ভাই। আপনাকে আমার ভালো চাইতে হবে না।’
এত বছর পর ধারা যাও মুখ খুলেছে প্রথম কয়েকটা শব্দ দিয়েই তার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। এ যেন কথার ছুরি বুকে চালিয়েছে। ধারাকে সে যতটা ভেবেছিল ধারা তার থেকেও বেশি পাষাণ। মেয়েটা জানে তার প্রতি কতটা দুর্বল সে। জেনেই কি এমন করে?
ধারা চলে গেলে আতিফ নয়ন ভাইয়ের মুখের দিকে দেখল। কান্না করলে মানুষকে যেমন দেখায় ঠিক তেমন। ধারা আপু একটু বেশিই কঠিন হয়ে গেছে। আহা নয়ন ভাই বেচারা। ভালোবাসলে মানুষকে এত কষ্ট পেতে হয়! কে জানতো।
চলবে_