এক বরষায় পর্ব-০৭

0
701

#এক_বরষায় [৭]
Jerin Akter Nipa

জেসমিন সর্তক বিড়াল ছানার মতো পা টিপে টিপে আপুর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। এই ঘরটা এখন আপুর না। লোকটা এসেই যে ঘরের ভেতর নতুন বউ সেজে বসেছে আর বেরুবার নাম নিচ্ছে না। ভেবেছিল দুপুরে তো তাদের সাথেই খাবে, তখন দেখে নিবে। কিন্তু আপু আতিফকে দিয়ে দুপুরে উনার ঘরে খাবার পাঠিয়ে দিয়েছে। সকালে উঁকি দিয়েও ঠিকঠাক মতো দেখতে পায়নি। উল্টো মাথায় ব্যথা পেয়েছে। কিন্তু এদিকে লোকটাকে দেখার কৌতূহলে সে না পারছে চুপচাপ বসে থাকতে। না পারছে সরাসরি দেখা করতে যেতে। আপু যদি জানে সে মেহমানের ঘরে গিয়েছিল তাহলে তার খবর আছে। জেসমিন সাবধানে দরজা ধাক্কা দিল। মনে হয় লোকটা ঘুমিয়ে আছে।
মাথা ভেতরে দিয়ে উঁকি দিতেই লোকটাকে নিজের সামনে দাঁড়ানো দেখতে পেল। মুনতাসীর জেসমিনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ওকে দেখল। সে জানালা দিয়ে দেখেছিল কেউ একজন এসেছে। তাকে ডাকছে না শুনে নিজেই দেখতে এসেছিল।

‘ঘটনা কী? কে তুমি?’

জেসমিন সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুনতাসীরের মুখের দিকে তাকিয়ে ও কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘুরে দাঁড়িয়ে এক দৌড় দিল। মুনতাসীর ভেবে পেল না এটা কী হলো। পেছন থেকে ডাকছে ও।

‘এই মেয়ে পালাচ্ছ কেন তুমি? এই শোনো।’

জেসমিন সোজা নিজের ঘরে গিয়ে আটকে রাখা দম নিল। লোকটা যদি আপুর কাছে নালিশ করে দেয় তাহলে আজকেই পৃথিবীতে তার শেষ দিন। বারবার বারণ করে গেছে আপু। মেহমানের সাথে কোন ধরণের অসভ্যতা ফাজলামি করবি না।
****

ধারা যখন গেট দিয়ে প্রবেশ করে তখন মুনতাসীর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। একপলকের জন্য ওদের দু’জনের চোখাচোখি হয়ে গেল। ধারা ঘরে এসে কতক্ষণ থম মেরে বসে রইল। আজকে সে ভালো করে পড়াতেও পারেনি। কোনোরকমে পড়িয়ে ছুটি দিয়ে চলে এসেছে। যাবার সময়ের ওই ঘটনায় মন তিক্ত হয়ে আছে। সে কি কাউকে বলেছে আপনি আমার কথা ভাবুন। আমার কেয়ার করুন। না চাইতেও আমাকে সাহায্য করুন। কারো সাহায্য তার লাগে না। কারো ভালোবাসা চায় না সে। কারো যত্নের প্রয়োজন নেই। ওই বিরক্তিকর নয়ন এই কথা কেন বুঝে না। ওর মনে ধারাকে নিয়ে যা কিছুই আছে তা সম্পূর্ণ একতরফা। ধারা কখনও ওকে নিয়ে কিছু ভাবেনি। আর ভবিষ্যতে ভাববেও না। নয়ন ভাই যদি আর কোনদিনও বাড়াবাড়ি করতে আসে তাহলে বাবাকে জানাতে বাধ্য হবে সে। একটু পরেই মাগরিবের আজান দিয়ে দিল। ধারা নামাজ পড়ে রান্নাঘরে রাতের জন্য রান্না করতে গেল। বাবার উপর রাগ লাগছে তার। কোত্থেকে মেহমান জুটিয়ে বসে আছে। তারা যা খায় সেসব কি মেহমানের পাতে দেওয়া যায়। মেহমান যে এসেছে এই খবরও হয়তো বাবা জানে না। ঘরে বাজার অল্পই আছে। মাসের শেষের দিকে তার হাতেও কোন টাকা নেই।
ধারা রান্না করছে দাদী টুল পেতে ওর পেছনে বসে আছে। পাতিলে খুন্তি নাড়ছে ধারা। চুলোর আঁচ ওর মুখে এসে পড়ছে। ধারা দাদীকে ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকতে তাগাদা দিচ্ছে।

‘ গরমের মাঝে তুমি এখানে শুধু শুধু বসে আছো কেন? ঘরে যাও।’

‘তোর গরম লাগে না? আমি তো দূরে বসে আছি। তুই তো চুলায় ঢুকে যাচ্ছিস।’

‘আমার গরম লাগে না দাদী। তুমি এখান থেকে যাও।’

দাদীর গলা ধরে আসে। ছোট বেলা থেকেই মেয়েটার জীবন সুখের না। ওর মা যখন চলে যায় তখন ধারা সবই বুঝতো। জেসমিন ছোট ছিল। ওর কিছু মনে নেই। কিন্তু ধারার সব মনে আছে। কিন্তু মেয়েটা কোনোদিন মা’র কথা জিজ্ঞেস করেনি। কোনোদিন কাউকে মনের কথা বলেনি। এই ফুলের মতো দুইটা মেয়ে রেখে ওই কলঙ্কিনী চলে যেতে পেরেছে। এজন্য তিনি কোনদিন ক্ষমা করবে না। ওর সন্তানের হায় লাগবে। কোনোদিন ভালো থাকতে পারবে না।

‘এখনও বসে আছো তুমি? তোমরা কেউই কেন আমার কোন কথা শুনতে চাও না বলো তো।’

দাদী ভাবছেন অন্য কথা। ধারার বিয়ের বয়স হয়েছে। কিন্তু ওর মদখোর বাপের মেয়ের বিয়ে নিয়ে কোন চিন্তাই নেই। একদিনও বলেনি ধারার এবার বিয়ে দিতে হবে। তারও বয়স হচ্ছে। ইদানীং শরীর সঙ্গ দিচ্ছে না। মরার আগে ধারাটার একটা গতি করে যেতে পারলে হতো। তিনি মারা গেলে তার ছোট নাতিন কীভাবে বাঁচবে আল্লাহ জানে। তবে ধারা থাকতে কোনোকিছু নিয়েই চিন্তা করতে হবে না তাকে। ধারাকে আল্লাহ এমন এক গুণ দিয়েছে সবকিছু একা হাতে সামলে নিতে পারে মেয়েটা।
*****

জেসমিন আতিফের ঘরের খাটের উপর বসে পা নাচাতে নাচাতে তেঁতুল খাচ্ছে। আতিফ পড়ছে জেসমিন মাঝে মধ্যেই এটা সেটা জিজ্ঞেস করছে। আতিফ বই রেখে বিরক্ত হয়ে জেসমিনের দিকে তাকাল।

‘তোমার সমস্যা কী জেসমিন আপু? আমাকে পড়তে দিচ্ছ না কেন?’

‘এত পড়তে হবে না। পড়ে পড়ে কি বিদ্যাসাগর হবি।’

‘তুমিও তো আমাকে পড়াতে পারো। তা না করে বেকার দিন কাটাচ্ছ।’

‘আমি তো পারিই। কিন্তু পড়াব না।’

‘কেন? পড়াতে না পারলে আমার কাছে লজ্জা পাবে বলে।’

‘দূর। আমর কষ্টে লাগে। আপুর মত ছাত্র পড়ানোর এত ধৈর্য নাই আমার।’

‘আসল কথা তুমি পারোই না।’

‘সব পারি আমি। এসব কি পড়ে এসেছি না! এক বই আমি দুই তিনবার শেষ করেছি।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে। এখন তুমি আমার ঘর থেকে যাও। কাল ক্লাসে পড়া দিতে হবে আমার।’

‘তোর ঘর! শালা আতিইফা, আমাদের বাড়িতে থেকে, আমাদের ঘর থেকেই আমাকে বের করে দিচ্ছিস!’

তখনই ধারা ঘরে ঢুকলো। আপুকে দেখে জেসমিন চুপসে গেল। ভয়ে ভয়ে ধারার দিকে তাকাচ্ছে সে। মেহমান শয়তানটা নিশ্চয় আপুর কাছে বিচার দিয়েছে। ধারা ওড়না দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল,

‘কখন থেকে ডাকছি তোকে। এখানে কী করছিস তুই?’

‘কখন ডাকলে তুমি। আমি তো শুনিনি। এই আতিইফা তুই শুনেছিস?’

‘না আপু আমিও শুনিনি।’

‘বাড়িতে মেহমান আছে। এখন কি আমি তোদের ডাকতে গলায় মাইক লাগাব। অনেক পড়াশোনা হয়েছে। এবার খেতে আয়।’

রাতেও ধারা আতিফকে দিয়ে মেহমানের খাবার ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে। আতিফ মুনতাসীরের খাবার নিয়ে এলে সে বলল,

‘প্রতি বেলা আমার জন্য ঘরে খাবার নিয়ে আসতে হবে না। আমাকে ডেকো, আমি গিয়েই খেতে পারব।’

‘ঠিক আছে।’

‘তোমার নাম কী?’

‘আতিফ।’

‘কোন ক্লাসে পড়ো?’

‘ক্লাস নাইন।’

‘ওহ। তোমার বাবা কি এখনও বাড়ি ফিরেনি?’

মুনতাসীর আতিফকে এই বাড়ির ছেলে ভাবছে। আতিফ ওর ভুল ভাঙিয়ে দিল না। সে বলল,

‘না।’

‘তোমরা কয় ভাইবোন?’

‘তিনজন। সবার বড় ধারা আপু। ধারা আপুকে আপনি চিনেন না?’

মাথা নাড়ল মুনতাসীর। চিনে সে। অনুমান করল যে মেয়েটি গেট খুলে দিয়েছিল সে-ই ধারা। মুনতাসীর বলল,

‘আরেকজন যে আছে, সে?’

‘জেসমিন আপুর কথা বলছেন? জেসমিন আপু ধারাপুর ছোট। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।’

‘ওহ আচ্ছা।’

মুনতাসীর ভাবল, জেসমিন মেয়েটার চরিত্রে এখনও ছেলেমানুষী রয়ে গেছে। সকালে একবার এই ঘরে উঁকি দিয়ে দরজায় বাড়ি খেয়েছে। বিকেলে তার কাছে ধরা পড়ে এমন ভাবে পালালো যেন চুরি করতে এসেছিল এ ঘরে। আর এই ছেলেটাকেও তার ভালো লেগেছে। এবাড়ির সবাই-ই ভালো।
****

প্রতিদিনের মতো নয়ন আজও ধারাদের বাড়ির গেটের দিকে চোখ রেখে বসে আছে। গতকালের ওই ব্যবহারের পর ধারার জায়গায় যদি অন্য কেউ হতো তাহলে ওর ছায়ার দিকেও তাকাতো না নয়ন। কিন্তু এটা ধারা। ধারার জন্য সাত খুন কেন? দশ খুনও মাফ। শুধুমাত্র ধারাই তার সাথে ওরকম ব্যবহার করতে পারে। ভালোবাসে ধারাকে। অধিকার দিয়েছে। নয়ন চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছিল মাত্র ধারাদের গেট দিয়ে অচেনা একটা ছেলেকে বেরুতে দেখে ওর মুখ থেকে চা ছিটে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে সে। কে এই ছেলে? এত সকালে ধারাদের বাড়িতে কেন এসেছিল?
নয়ন তার দুই সাঙ্গকে ডাক দিল,

-রাসেল, পারভেজ। ধারাদের বাড়ি থেকে এটা কে বের হলো রে?’

রাসেল মাথা চুলকাতে চুলকাতে উত্তর দিল,

-জানি না তো ভাই।’

পারভেজ বলল,

-মালডার থেকেই কথা বাইর করমু নাকি ভাই?’

-যা করার ভদ্র ভাবে কর। ছেলেটা ধারাকে দেখতে এলে আজ এর খবর আছে। আর যদি আত্মীয় টাত্মীয় হয় তাহলে আদর আপ্যায়ন করে ছেড়ে দিস।’

-ও-কে ভাই। আপনি টেনশন নিয়েন না।’

মুনতাসীর কলেজে যাচ্ছে। এই কলেজে শিক্ষক হিসেবে জয়েনিং এর আজই তার প্রথম দিন।
হাঁটতে হাঁটতে দুইটা ছেলেকে তার এদিকে এগিয়ে আসতে দেখল সে। ওরা দূর থেকেই ওকে সালাম দিল। মুনতাসীর ঠিক ভেবে পেল না এরা কারা।
সে সালাম নিল। দু’জন থেকে খাটো জন বলল,

-পাড়ায় নতুন মনে হচ্ছে।’

-জি। আপনাদেরকে ঠিক চিনলাম না।’

-চিনার কথাও না। আপনার সাথে আজই আমাদের পরিচয়।’

-হুম।’

-সকাল সকাল কই যাইতেছেন?’

মুনতাসীরের কপাল সামান্য কুঞ্চিত হলো। এদের দু’জনের উদ্দেশ্য তার কাছে ভালো মনে হচ্ছে না।

-তা জেনে আপনাদের কি দরকার?’

-দরকার না! আমাগো ভাবির বাড়ি থেইকা বাইর হইলেন। আপনি ভাবির কী হোন তা জানা তো আমাদেরই দরকার।’

-ভাবি! কে আপনার ভাবি?’

-তা জাইনা তো আপনারও কোন দরকার নাই। সহজ কথায় উত্তর দেন, যেই বাড়ি থেইকা বাইর হইলেন ওদের সাথে আপনার সম্পর্ক কী?’

মুনতাসীর হাত ঘড়ি দেখল। এদের দেখে বোঝাই যাচ্ছে পাড়ার বেকার ছেলে৷ যাদের কোন কাজকর্ম নেই। মানুষকে বিরক্ত করে মজা পায়। সে আর কথা বাড়াতে চাইল না। প্রথম দিনই লেট করতে চায় না সে।

-আত্মীয়।’

আত্মীয় কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে ওদের আচার-আচরণ কথাবার্তার ধরণ পাল্টে গেল। ওদের থেকে বিনয়ী কেউ নেই। বিনয়ে গলে পড়ে বলল,

-আত্মীয়! ওহ, আত্মীয়। আগে বলবেন না। আসেন আসেন। ভাবির আত্মীয় মানে আমাদের আত্মীয়। ভাই সাহেব আপনাকে কিন্তু আমাদের তরফ থেকে এক কাপ চা খেতেই হবে। নাস্তা করেছেন ভাই সাহেব? না করলে কিন্তু আপনাকে আমরা নাস্তা না করিয়ে ছাড়ছি না। দাঁড়িয়ে আছেন কেন ভাই সাহেব? আমাদের একটু আগের ব্যবহারের জন্য হাত জোর করে ক্ষমা চাচ্ছি ভাই সাহেব। আপনি বললে পা ধরেও ক্ষমা চাইব। আমাদের কোন লজ্জা নেই।’

মুনতাসীর পুরোপুরি থতমত খেয়ে গেল। হঠাৎ এই ধাক্কায় ওর এমন দশা হয়েছে মুখ দিয়ে কথা বের করতে পারছে না। গিরগিটি কীভাবে রঙ পাল্টায় এটা দেখেনি সে। কিন্তু এই দুই ছেলের রঙ পাল্টানোর ব্যাপারে গিরগিটিকেও হার মানিয়ে দিবে এটা বাজি ধরে বলতে পারে।

চলবে