এক বরষায় পর্ব-০৮

0
675

#এক_বরষায় [৮]
জেরিন আক্তার নিপা

ধারা তাড়াহুড়ো করে গেট দিয়ে বেরুতে গিয়ে কীভাবে যেন জুতা ছিড়ে গেল। বিরক্তিতে মনটা তিক্ত হয়ে গেল। যেদিন বাড়ি থেকে বের হতে দেরি হবে সেদিনই পৃথিবীর সব অঘটন ঘটবে তার সাথে। এখনই জুতা ছিড়তে হলো? ঘরে নতুন জুতাও নেই মনে হয়। তার সব জিনিসই এক জোড়া করে। প্রয়োজনের বেশি সে রাখে না। এক জোড়া জুতা যতদিন না ছিঁড়বে ততদিন নতুন জোড়া কিনবে না। এটাও ভালো বাড়ি থাকতেই ছিঁড়েছে। রাস্তায় গিয়ে ছিঁড়লে আবার এতটা পথ ফেরত আসতে হতো। আর ভার্সিটিতে ছিঁড়লে তো কথাই ছিল না। ভারী অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়তে হতো। ধারা আবার ঘরে ফিরে এলো। ভাগ্য ভালো জেসমিনের বাড়তি এক জোড়া জুতা আছে। কোনরকমে ওটাই পায়ে গলিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। জেসমিনের পা তার পায়ের থেকে একটু বড়। ছোট হলে পরা যেত না।
আজও নয়ন ভাই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ধারা দেখেও দেখল না। তার তাড়া আছে।

-ধারা! এই ধারা!’
আগে তো নয়ন ভাই কোনোদিন পথেঘাটে তার নাম ধরে ডাকতো না। এখন ডাকাডাকিও শুরু করে দিয়েছে!

-একটু দাঁড়াও ধারা। তোমার সাথে কথা আছে।’
ধারা দাঁড়াল না। ভালো ঝামেলায় পড়ে গেল। কাল এত কঠিন কথা শোনার পরেও এই লোকের লজ্জা হয়নি। নয়ন দৌড়ে এসে ধারা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

-আপনার সমস্যা কী? রাস্তাঘাটে ডাকাডাকি করছেন কেন?’
-আপা তোমাকে আজ একবার আমাদের বাড়িতে যেতে বলেছে। এই কথা বলার জন্যই ডেকেছি।’
-বলা শেষ। এখন যান। দয়া করে আমার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলবেন না।
-________________
মুনতাসীর ফেরার সময়ও ছেলে দুটোকে দোকানে বসে থাকতে দেখল। ওকে আবার ফিরে আসতে দেখে পারভেজ রাসেল এগিয়ে এলো। লম্বা করে সালাম দিয়ে বলল,

-ভাই সাহেব, আপনি দেখি আবার ফিরে আসছেন!’
মুনতাসীর মনে মনে ভাবল, এদের নিয়ে তো ভালো যন্ত্রণায় পড়ল৷ কারা এরা? তাকে নিয়ে এত মাথা ব্যথা কেন?

-আপনি তো সকালে চইলা গেছিলেন।’
মুনতাসীর উল্টো প্রশ্ন করল,

-কোথায় গেছিলাম আমি?’
-সেটা আমরা কীভাবে জানব কন তো ভাই সাহেব। দরকারি কিছু ভুল কইরা রাইখা গেছিলেন? এখন নিতে আসছেন।’
-আচ্ছা আমাকে নিয়ে আপনাদের এত চিন্তা কেন ওটাই তো বুঝতে পারছি না আমি। আমি কিছু ফেলে রেখে যাইনি। আর সকালে কলেজে গিয়েছিলাম। আমি আপনাদের এলাকার কলেজের নতুন শিক্ষক।’
কথাটা শুনে পারভেজ ও রাসেলের চোয়াল ঝুলে গেল। বিস্ময়ে লোকটাকে দেখছে ওরা। এই লোক কলেজে মাস্টারি করতে আসছে? একজন শিক্ষকের সাথে ওরা এতক্ষণ ওভাবে কথা বলছিল। পারভেজ রাসেলের কানে কানে বলল,

-শিক্ষক মানুষ। বুঝে শুনে কথা কওয়া লাগব। আমরা তো টেনও পাস করি নাই।’
-মাস্টার সাহেব, আপনি কি আমাদের ভাবিদের বাড়িতেই থাকেন?’
-কে আপনার ভাবি?’
ওরা জবাব দেওয়ার আগে দূর থেকে আতিফ ডাকল।

-মুনতাসীর ভাই!’
মুনতাসীর ছেলে দু’টোকে দাঁড় করিয়ে হাঁটতে লাগল। আতিফকে জিজ্ঞেস করতে হবে এরা কারা।
আতিফের কাছে এসে সে ছেলে দু’জনকে দেখিয়ে বলল,

-ওরা কারা চেনো?’
-আমাদের এলাকারই। কাজকর্ম নেই সারাদিন এই দোকানের সামনে বসে থাকে।’
-বুঝলাম। কিন্তু ওদের ভাবিটা কে? কাকে ভাবি ডাকে?’
আতিফ হেসে ফেলল। ওরা দু’জন বাড়ির দিকে হাঁটছে। আতিফ বলল,

-ধারা আপুকে।’
মুনতাসীরের কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ল।

-এই এলাকারই একটা ছেলে, নয়ন ভাই। ও ধারা আপুকে পছন্দ করে। চার বছর ধরে লাইন দিচ্ছে বেচারা। কিন্তু ধারা আপু? সে নয়ন ভাইকে পাত্তাই দেয় না। ওরা নয়ন ভাইয়ের সাঙ্গপাঙ্গ। ওদের দিনের শুরু হয় এখান থেকে আবার শেষও হয় এখানেই। ধরে নিতে পারেন এরা ধারা আপুর বিনা বেতনের বডিগার্ড। আপনি নতুন এলেন তো ভেবেছে হয়তো ধারা আপুকে দেখতে এসেছেন। যারাই ধারা আপুর বিয়ের জন্য আসে এরা সবাইকে ভাগিয়ে দেয়। নয়ন ভাই থাকতে কারো সাহস নেই এই পাড়ায় ঢুকে ধারা আপুকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে।’
কথাগুলো বলতে বলতে আতিফ হাসছে। মুনতাসীর এবার বুঝল আসল ঘটনা। বাড়ি ঢুকেই ধারার সামনে পড়ল ওরা। ধারা মনে হয় কোথাও যাচ্ছিল। ওদের দেখে আবার ঘরে চলে গেল।
___________

জেসমিন নয়নদের বাড়ির উঠানে পা রাখতে না রাখতেই নয়ন ওকে প্রশ্নের জালে ঘেরে ধরল।

-ওই তোদের বাড়িতে যে একটা মেহমান এসেছে এটা তো আমাকে বললি না। কবে এসেছে ওই মালটা? বাড়ি কই? কোন উদেশ্যে এসেছে?’
জেসমিন চোখ ছোট করে ফেলল৷ নয়ন ভাই পারলে তার ঘাড় মটকে দিবে।

-আরে বাবা থামো তো। আমাকে দম নেওয়ার সময় দাও। সব বলব। বলার জন্যই তো এসেছি।’
-তুই কিন্তু আমার সাথে এই কাজটা মোটেও ঠিক করলি না। আমি তোকে কত বিশ্বাস করতাম।’
-তোমার বিশ্বাস কি ভেঙেছি আমি? আমি এখনও তোমার দলেই আছি। ভবিষ্যতে থাকব কি-না তা তোমার উপর নির্ভর করে।’
-তুই যে পল্টিবাজ রে জেসু!’
-উফ! এখন কি আমার কথা শুনবে তুমি? নাকি আমি চলে যাব।’
-বল শুনি।’
-ওটা বাবার মেহমান। বাবার নাকি কেমন বন্ধুর ছেলে। আমরা তো উনাকে চিনিও না। আমি শুধু দু’বার উনাকে লুকিয়ে দেখেছি। উনার নামটাও জানি না বিশ্বাস করো।’
নয়ন মুখ বাঁকিয়ে মাছি তাড়াবার মতো হাত নেড়ে বলল,

-হয়েছে। তোর থেকে বেশি ইনফরমেশন আমার কাছেই আছে। ওই ব্যাটার নাম মুনতাসীর। আমাদের কলেজে চাকরি নিয়েছে।’
জেসমিন অবিশ্বাস্য গলায় চেঁচিয়ে উঠল,

-কি! সত্যি বলছ তুমি? কোন কলেজে?’
-আমাদের এলাকায় কয়টা কলেজ আছে?’
-কিন্তু এসব কথা তুমি কীভাবে জানলে?’
-জানি। আমি তোর মতো ঘাস খাই না।’
এই খবরটা আপুকে দেওয়ার জন্য জেসমিন আর দেরি করল না। এক দৌড়ে সোজা বাড়ি চলে এসেছে। গেটে পা রেখেই আপুকে ডাকতে লাগল। দৌড়ে আসায় হাঁপাচ্ছে সে। ধারা জেসমিনের গলা শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। এই মেয়েটার আবার কী হয়েছে? এভাবে ডাকছে কেন?

-কী হয়েছে তোর? আজ আবার কোন অঘটন ঘটালি?’
-কোন অঘটন ঘটাইনি। তোমাকে একটা কথা বলার আছে।’
বাইরে ওদের গলা শুনে মুনতাসীরও বেরিয়ে এসেছিল। ভেবেছিল কী না কী হয়েছে। কিন্তু এখন বুঝতে পারল, তেমন গুরুতর কোন ব্যাপার ঘটেনি।
জেসমিন মুনতাসীরকে দেখে গলা খাদে নামিয়ে আপুকে বলছে,

-আপু জানো, বাবার ওই মেহমানটা আমাদের কলেজের শিক্ষক হয়ে এসেছে। আমি তো আপু এই কলেজেই ভর্তি হবো। অন্য কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। ইশ আমার যে কী খুশি লাগছে। উনি কি এখন থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকবে আপু?’
ধারা ঠাস করে বোনের গালে চড় বসিয়ে দিল। শব্দটা জোরে হলেও ব্যথা লাগেনি তেমন। কিন্তু আপু তাকে মেরেছে এটা ভেবেই জেসমিনের কান্না পাচ্ছে। গালে হাত দিয়ে ছলছল চোখে বোনকে দেখছে। ধারা রাগান্বিত গলায় বলল,

-আর কখনও এসব ফালতু কথা বলার জন্য আমাকে এভাবে ডাকবি না। আমি তোর মতো সবসময় মজা করার মুডে থাকি না। আমার চিন্তা হয় তোর, বাবার বুঝি কিছু হয়ে গেল। কোনোদিনও তো ভাবিস না তোদের হারানো ভয়ে রোজ কয়বার বুক কাঁপে আমার।’
-****

রাতে মুনতাসীর ওদের সাথে খেতে এসেছে। আজ টেবিলে ধারার বাবাও আছেন। সবাই খেতে বসেছে। ধারা পরে দাদীর সাথে খাবে। জেসমিন খেতে খেতে কয়েকবার চুরি করে মুনতাসীরকে দেখে নিল। এই লোক তো হেব্বি সুন্দর! টিচার হলেও তেমন টিচার টিচার কোন ভাব নেই। আপুটা তো টিচার না হয়ে ভাব নিয়ে থাকে এক্ষুনি কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলবে। মুনতাসীরকে দেখে শরিফুল ইসলাম ওর বাবা মা’র কথা, বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলেন।

-বাবা ভালোই আছে। আর মা দুই বছর আগে মারা গেছেন।’
ওর এই কথাটা শুনে সবার মুখে শোকের ছায়া পড়ল। ধারাও আড়চোখে একবার ওকে দেখল।
পরিস্থিতি সহজ করতে বাবা বললেন,

-তোমার তো একটা ভাই ছিল না?’
-হ্যাঁ। ও এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিবে।’
-ভালো, ভালো।’ তিনি আর কথা খুঁজে পাচ্ছেন না। অনেক বছর হয়েছে সবাইকে ছেড়ে আসার। জেসমিন হুট করে জিজ্ঞেস করে বসল,
-বাবা আমরা তো শুরু থেকেই এখানে আছি, না? তাহলে তোমার এতদূরে বন্ধু হলো কীভাবে? না মানে, উনারা এত দূরে থাকেন কেন?’
জেসমিন তখন ছোট ছিল। বয়স আনুমানিক পাঁচের বেশি হবে না। ওই বয়সের কোন কথাই তার মনে নেই। জেসমিন হয়তো এটাও জানে না তার মা বেঁচে আছে। ছোট বেলায় ওদের রেখে তারই চাচার সাথে পালিয়ে গেছে। সে এটাই জানে তার মা মারা গেছে।
মেয়ের এই প্রশ্নের তিনি উত্তর দিতে পারছেন না। কী উত্তর দিবে? বলবে তো মা পালিয়ে যাওয়ার পর ওখানকার মানুষ আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে দিচ্ছিল। তাই আমরা ঘরবাড়ি বেচে এখানে চলে এসেছি? জেসমিন এখনও উত্তরের জন্য আগ্রহ নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। ধারা ওর মাথায় হালকা থাপ্পড় দিয়ে বলল,

-চুপচাপ খা তো। খাবার সময় এত কথা বলতে হয় না।’
জেসমিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বোনকে দেখল। তার কি কোন ইজ্জত নেই? এভাবে সবার সামনে মারবে! এখনও কি সে ছোট বসে আছে? বড় হয়েছে তো। শরিফুল ইসলাম মুনতাসীরের সাথে টুকটাক কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। একেবারে চুপ করে থাকলেও পরিবেশ গুমট বেঁধে যায়। কথায় কথায় মুনতাসীর বাড়ি খোঁজার কথাটাও তুললো।

-কলেজের পাশে হলেই ভালো হয়। পাঁচ দশ মিনিটের পথ এমন। একজনের সাথে কথা হয়েছে। বলেছে যত দ্রুত সম্ভব খুঁজে দিবে।’
জেসমিন ফট করে বলে ফেলল,

-বাড়ি খোঁজার দরকার কি? আমাদের বাড়িতে থাকতে কি আপনার ভালো লাগছে না?’
মুনতাসীর ওর দিকে তাকিয়ে হাসল। কিছু বলল না। ধারার ইচ্ছে করছে এই মেয়ের গালে আরেকটা চড় বসিয়ে দেয়। উনার আসা নিয়ে তো তারই সবচেয়ে বেশি আপত্তি ছিল। বোনের ঘরের জন্য রীতিমতো আন্দোলনে নেমেছিল। এখন বলছে, আমাদের বাড়িতে থাকতে আপনার ভালো লাগছে না!

-আপনি যদি বাড়ি খুঁজে না পান, তাহলে আমাকে বলবেন। আমি ব্যবস্থা করে দেব। নয়ন ভাইকে বললেই হবে।’
ধারা টেবিলের নিচ দিয়ে জেসমিনের পায়ে পাড়া দিয়ে ধরল। নিঃশব্দে শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,

-তোর ঠোঁট সেলাই করে দেব আমি।’

চলবে