#এক_বরষায় [৯]
জেরিন আক্তার নিপা
পড়াশোনা নিয়ে জেসমিনের কোন কালেই গরজ ছিল না। তার জীবনের লক্ষ্য কী এটা হয়তো সে নিজেও জানে না। পরীক্ষায় এইম ইন লাইফ প্যারাগ্রাফ এলে ওখানে তো ডাক্তারই দিয়েছে। কিন্তু ও বেচারি পড়াশোনা করছে কমার্স নিয়ে।
রেজাল্ট বের হবার আর বেশি দেরি নেই। কিন্তু এ নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথাই নেই। দিব্যি ঘুরছে ফিরছে খাচ্ছে। তার পাস করাই কি আর ফেলই বা কি? কেউ যদি জিজ্ঞেস করে,
‘কিরে তোর রেজাল্ট কবে দিবে।’
সে দায়সারা উত্তর দিয়ে বলে, “যেদিন দিবে শুনবেই তো।”
“পাস করতে পারবি তো?”
“না করলেও তোমার কি?”
কিন্তু যেদিন থেকে সে শুনেছে মুনতাসীর ওই কলেজের শিক্ষক সেদিন থেকে তার একটাই লক্ষ যেভাবেই হোক তাকে ওই কলেজে ভর্তি হতে হবে। যে মেয়ে একবার নাইনে ফেল করেও হাসি মুখে বাড়ি ফিরেছে। সে এখন রোজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে দোয়া করছে কোনোরকমে যেন এসএসসিটা পাস করে ফেলে। পয়েন্ট সবার থেকে কম আসুক। তবুও পাস করুক। ওর এই পরিবর্তন দেখে দাদী রীতিমতো টাস্কি খেয়ে গেছে।
-কিরে ছেড়ি! আগে তো বকাবকি কইরাও তোরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াইতে পারছি না। হঠাৎ এত আল্লাহ ভক্ত হয়ে গেলি কেমনে? মরণের স্বপ্ন টপ্ন দেখাইছে নাকি?”
-উফ দাদী বিরক্ত করো না তো। আমি তসবি পড়ছি। এত কথা না বলে পারলে তুমিও আমার জন্য দোয়া করো। এইবার যেন পাস করে যাই।’
-বাব্বা! তুই আবার কবে থেইকা পাস ফেল নিয়া চিন্তা করা শুরু করছোস? তোর হইছেটা কী আমারে ক তো নাতি? জ্বীন ভূত আছর করছে? কবিরাজের কাছে নিয়া যামু।’
-দূর! শান্তিতে দোয়াও করতে দিলা না।’
জেসমিন জায়নামাজ থেকে উঠে পড়ল। হাতের তসবীর ছড়া রেখে জায়নামাজ ভাঁজ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আপু ছাত্র পড়াতে গেছে। সে কি একবার আপুর ঘর থেকে উঁকি দিয়ে আসবে?
মুনতাসীর শুয়ে শুয়ে একটা বই পড়ছিল। জেসমিন দরজার সামনে থেকে উঁকি দিচ্ছে এটা দেখেও সে বই থেকে মনোযোগ সরালো না। এত দিনে এটুকু জানা হয়ে গেছে এই মেয়ে পাগল। জেসমিন বিড়বিড় করে বলছে,
-কলেজে সারাদিন পড়িয়ে এসেও শখ মিটে না! এখন বাড়িতে বসেও বই পড়তে হবে।’
মুনতাসীর আরও দু’মিনিট দেখল। তারপর বই রেখে ডাকল,
-জেসমিন! এই মেয়ে একদম পালাবে না। তাহলে কিন্তু তোমার বাবার কাছে বিচার দেব আমি। দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসো। ভেতরে এসো বলছি।’
হায় হায়! এটা কী হয়ে গেল? এভাবে ধরা খেয়ে যাবে ভাবতেই পারেনি। এখন যদি এই লোক বাবার কাছে বিচার দেয়। ভয়ে ভয়ে জেসমিন ভেতর এলো। মুনতাসীর শুয়ো থেকে উঠে বসেছে।
-তুমি আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলে কেন?’
-আমি! কখন? আমি আপনাকে দেখিনি তো।’
-আচ্ছা মানলাম দেখোনি। কিন্তু আমার ঘরে এসে রোজ উঁকিঝুঁকি পারো কেন?’
-কখন? আমি উঁকিঝুঁকি পারি না তো।’
মুনতাসীর ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-তুমি উঁকিঝুঁকি পারো না?’
-আমি আসলে, উঁকিঝুঁকি ঠিক না। আমি তো…
-সেদিন ডাক দিলাম পরে ওভাবে দৌড়ে পালিয়ে গেলে কেন?’
-কবে? আমি পালাইনি তো।’
-ঠিক আছে পালাওনি। কিন্তু তুমি আমাকে দেখেই দৌড়াও কেন? আমাকে তুমি ভয় পাও?’
-আপনাকে না। ভয় তো আমার বোনকে পাই। আপনার ঘরে এসেছি শুনলে লবণ মরিচ লাগিয়ে আমাকে তেলে বাজবে।’
-কেন?’
-আপনি আমাদের মেহমান। আপু ভাবে আপনাকে আমি বিরক্ত করব। তাই না করেছে যেন আপনার ঘরে না আসি।’
মুনতাসীর মৃদু হাসল। জেসমিন এখন অনেকটা আপন মনেই কথা বলছে। মেয়েটার মাঝে কোন জড়তা নেই।
-তোমার আপুর এমন মনে হবার কারণ কি?’
-আপু ভাবে আমার কাজই বেশি কথা বলা। আর উল্টাপাল্টা কাজ করা। ধরুণ আপনার ঘরে এসে, ঘরটা অবশ্য আপুর। আপনার কোন দরকারি জিনিস নষ্ট করে ফেললাম। বা আপনার জিনিসপত্র এলোমেলো করে ফেললাম।’
-তোমার আপু তোমাকে কড়া শাসনে রাখে মনে হচ্ছে।’
-আর বলবেন না! জন্মের পর থেকে আপুর কড়াকড়ি, রাগ, শাসন সহ্য করে আসছি। আমার কোন কাজই ওর পছন্দ হয় না। সব কাজে বাধা দিবেই দিবে।’
-এর পর থেকে তোমার যখন খুশি এই ঘরে আসতে পারো। যা খুশি ধরতে পারো। কোনকিছু নষ্ট করে ফেললে বা ভেঙে ফেললেও আমি রাগ করব না।’
জেসমিন খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠে বলল,
-সত্যি! আপনি অনেক ভালো। জানেন আমি পাস করলে আপনার কলেজেই ভর্তি হবো। তখন তো আপনি আমার স্যার হয়ে যাবেন। কিন্তু এখন আপনাকে কী বলে ডাকব?’
-তোমার যা ডাকতে ভালো লাগবে।’
-আচ্ছা। মুনতাসীর ভাই বলে ডাকব। কলেজে যখন ভর্তি হবো তখন ক্লাসে স্যার ডাকব। বাড়িতে ভাই।’
-ঠিক আছে।’
-আপনি কি আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাবেন? ভাড়া বাড়ি কেন খুঁজতে হবে? এখানেই থাকুন না।’
-তুমিই তো বললে এটা নাকি তোমার আপুর ঘর। উনার ঘরে বেশিদিন থাকলে তোমার আপু আবার আমার উপরও রাগ করতে পারে।
-__________________
রোজী আপা সেই কবেই খবর পাঠিয়েছিল। ধারা এসেছে আজ। আসবে আসবে করেও এতদিন আসা হয়নি। রোজী আপা তাকে দেখেই অভিমান করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। ধারা হাসল। রোজী আপার কাছে গিয়ে বলল,
-কেমন আছো তুমি?’
রোজী আপা কোন উত্তর দিল না। ধারা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার বলল,
-কথা বলবে না নাকি?’
আজ রোজী আপার রাগ এত সহজে ভাঙানো যাবে না। ধারা শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,
-তুমি যখন আমার দিকে ফিরবেই না, কথাও বলবে না তাহলে আমি চলে যাই।’
বলেই ধারা ফিরে হাঁটা ধরল। সে জানে রোজী আপা তাকে থামাবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ।
-তুই মানুষটা বড্ড পাষাণ রে ধারা। তোকে কতগুলো খবর দিয়েছি আমি। আজ তোর আসার সময় হলো?’
-তুমি তো জানো…
-হ্যাঁ হ্যাঁ জানি। জানি বলেই শেষ বারের মতো এবার কথা বলছি। পরের বার থেকে মরে গেলেও কথা বলব না।’
অভিমান মিটে গেলে ওরা অনেক গল্প করল। ধারা বাড়িতে পা দিয়েই দেখে নিয়েছে নয়ন ভাই বা তার মা কেউই বাড়িতে নেই। ভেবেছিল ওদের দু’জনের কেউ একজন চলে আসার আগেই সে চলে যাবে। কিন্তু তা আর হলো না। নয়ন কোত্থেকে যেন বাড়িতে চলে এসেছে। নিজের বাড়িতে ধারাকে দেখে প্রথমে ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি। ভূত দেখার মতো কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধারাকে দেখে ঘরে চলে গেল।
-আমাকে কেন খবর দিয়েছিলে? কোন কাজ ছিল?’
-আরে না, কাজ কিছু না। আমার ভাই আমার জন্য ছেলে দেখছে। সিরিয়াস দেখাদেখি। এবার মনে হয় আমার বিয়েটা হয়েই যাবে। এটাই বলতে ডেকেছিলাম।’
-তুমি বিয়ে করবে?’
-কেন করব না? আমার কি বিয়ের বয়স হয়নি!’
ধারা কিছু বলল না। চুপ করে রইল সে। রোজী আপুর একটা ছেলেকে পছন্দ ছিল। বিয়েও মোটামুটি পাকা ছিল। কিন্তু আফসোস! ওদের ভাগ্যে মিলন ছিল না। ছেলেটা বিয়ের কয়েকদিন আগে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। তারপর থেকে কত বছর চলে গেল। রোজী আপু আর বিয়ের নাম নিল না। এখন হঠাৎ বিয়ের কথা কেন উঠছে?
-আমার ভাইটা তার বোনকে নিয়ে ভাবে। এর অবশ্য অন্যও একটা কারণ আছে। কিন্তু সেই কারণটা আমি বড় করে দেখছি না। ওই মানুষটার মৃত্যুতে সবথেকে বেশি কেঁদেছিল এই পাগলটাই। আমিও ওকে থামাতে পারছিলাম না। সময় কত দ্রুত বয়ে যায় না রে ধারা?’
সত্যিই সময় প্রবহমান। আমাদের জীবনে যা কিছুই ঘটুক না কেন, সময় কোনদিন থামে না। তার জীবনে খুব ছোটবেলায় একটা ঘটনা ঘটে গেল। ধারার তখন মনে হচ্ছিল সে জীবনে একা কীভাবে বড় হবে? কিন্তু সে বড় হয়েছে। সময় তাকে পাকাপোক্ত করে দিয়েছে।
নয়ন ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। আবার কোথাও চলে যাচ্ছে সে। যেতে যেতে ওদের আলোচনা হালকাপাতলা শুনতে পেল। তার বোন বলছে।
-মেয়েদের মন বড্ড নরম হয় রে ধারা। মেয়েরা সহজেই সব মেনে যায়৷ সাথে মানিয়েও নেয়।’
-ভুল বললে আপা। সব মেয়েদের মন নরম হয় না। কিছু কিছু মেয়ের মন পাথরের থেকেও বেশি শক্ত হয়। পাথরকে মানিয়ে ফেলা যায় কিন্তু কিছু মেয়ে মরার আগেও মানবে না বলে পণ করে বসে থাকে।’
-_____________
মুনতাসীর ধারাদের বাড়িতে এসেছে ছয় সাত দিন হয়ে যাবে। সে যে ধারাদের বাড়িতে থাকছে এটা এখন আর পাড়ার কারো অজানা না৷ অনেকেই আড়ালে কানাঘুষা করছে। ধারার বাবাকেও কথা শোনাতে ছাড়ছে না।
-বাপ মাতাল হইলে এমনই হয়। এত্ত বড় জোয়ান দুই মাইয়া ঘরে থাকতেও নাকি বাইরের এক পোলারে বাড়িতে তুলছে।’
-আর কইও না অভাবে মানুষের স্বভাব নষ্ট হয়। ধারার বাপেরও হইছে। নইলে ঘরে বিয়ার উপযুক্ত মাইয়া রাইখা ঘর ভাড়া দেয় কোন আক্কেলে?’
-ওদের আর চিন্তা কী গো বইন? ধারারে তো নয়নই বিয়া করব। ছোটডাও দেখবা বয়স হইতে হইতে একটারে জুটাইয়া ফেলব।’
-থাক মাইনসের কথা বাদ দাও৷ আমগো এত সময় নাই যে মাইনসেরে নিয়া চিন্তা করমু। ওদের যা ইচ্ছা করুক। খালি দেখো জেসমিন কোন কেলেঙ্কারি ঘটায় নাকি। এইডারে নিয়া কোন বিশ্বাস নাই। দেখো না কেমনে উড়াল পারে। ধারা তবুও একটু শান্তশিষ্ট আছে।’
-****
নয়ন দূর থেকে মুনতাসীরকে দেখেছে। মুনতাসীরও নয়নকে চেনে৷ আতিফ দেখিয়ে দিয়েছিল এটাই নয়ন ভাই। কিন্তু ওদের দু’জনের কখনও সামনাসামনি হয়নি। কেউ কারো সাথে কথাও বলেনি। আজ ধারা বাড়ি থেকে বের হবার একটু পরেই মুনতাসীরও কলেজে যাওয়ার জন্য বের হলো। নয়ন ধারাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়েছিল। পেছনে ওই ছেলেটাকে দেখে ওর পা থেমে গেল। ধারা আগেপিছে কোনোদিকে না দেখে মাথা নিচু করে সোজা হাঁটছে। বাবার মেহমানের সামনে নয়ন ভাই নতুন কোন নাটক না করলেই বেঁচে যায় সে। মুনতাসীর রিকশার জন্য দাঁড়াবে নাকি হাঁটা ধরবে বুঝতে পারছে না। পেছন থেকে একটা রিকশা আসছে। মুনতাসীর সামনে ধারাকে দেখল। ধারা কি এতটা পথ হেঁটে হেঁটেই যাবে? তার কলেজ থেকে অনেকটা দূরে ধারার ভার্সিটি। এতটা পথ হাঁটা সম্ভব না। মুনতাসীর ঠিক করল রিকশাটা ধারার জন্য ছেড়ে দিবে সে। তার আগেই নয়ন গলা উঁচিয়ে রিকশা ওয়ালার উদেশ্যে ডেকে উঠল,
-মামা এদিকে আসেন। যাত্রী আছে।’
ধারা কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল। নয়ন পেছন থেকে দৌড়ে এসে বলল,
-রিকশায় উঠো ধারা।’
দাঁত কিড়মিড় করে মনে মনে রাগ চেপে নিল ধারা। পেছনেই লোকটা আসছে। এখন নয়ন ভাইয়ের সাথে তর্ক করলে লোকটা অন্য কিছু ভাবতে পারে। তাই ধারা দেরি না করে রিকশায় উঠে বসলো।
নয়ন রিকশাওয়ালা মামাকে চোখে ইশারা করে ধারার থেকে ভাড়া না নিতে বলল।
-সাবধানে নিয়া যাইয়েন মামা।’
চলবে