এক বরষায় পর্ব-১০

0
644

#এক_বরষায় [১০]
লেখনীতে_ জেরিন আক্তার নিপা

ধারা সবে গোসল সেরে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভেজা চুল শোকাচ্ছে। আজ শুক্রবার ছুটির দিন। জেসমিন নয়ন ভাইদের বাড়িতে গেছে। আতিফ সকালে মুনতাসীরের সাথে কোথায় যেন বেরিয়েছে। দাদী ঘরেই শুয়ে আছে। সে গেটের দিকে চোখ রেখে গামছা দিয়ে চুল মুছছে। আতিফ বাড়ি ফিরলে ওকে দোকানে পাঠাতে হবে। ছেলেটা কোথায় গেছে এখনও ফিরছে না কেন। দাদী ঘর থেকে ধারাকে আওয়াজ দিচ্ছে। ধারা দাদীকে দেখতে গেল।

-কিছু লাগবে দাদী?’
-না। আমার সামনে একটু বোস তো তুই।’
-আবার বসতে বলছো কেন? কী বলবে?’
ধারার সামান্য কোঁকড়া ভেজা চুল থেকে এখন টুপটাপ করে পানির ফোঁটা পড়ছে। মেয়েটার চুল তার মায়ের মতো হয়েছে। যেমন কোমর সমান লম্বা তেমন কালো কুচকুচে। চোখ মুখ নাক সব যেন মায়ের প্রতিচ্ছবি। দাদী মুগ্ধ নয়নে ধারাকে দেখছে। গোসল করে সতেজ লাগছে মেয়েটাকে। সদ্য ফোটা ফুল যেন একটা।

-কী দেখছো দাদী?’
-তোরে। আমি পাকঘর ছাড়ছি কয়েক বছর হইছে। তোর উপর সব দায়িত্ব দিয়া নিজে আরাম করি। তোরে কাজ করতে দেখলে আমার শান্তি লাগে না রে নাতিন। এইটা কি তোর সংসার সামলানোর বয়স!’
গলায় কৃত্রিম বিরক্তি ফুটিয়ে ধারা বলল,

-আহ দাদী! তোমার এসব কথা আমার ভালো লাগে না। সংসারটা কি অন্য মানুষের? দু’বেলা রান্না করা আর ঘর ঝাড় দেওয়া কি কোন কাজের মধ্যে পড়ে? তুমি শুধু শুধু বাড়িয়ে চারিয়ে বলে এমন প্রমাণ করো যেন আমি সারাদিন কাজ করতে করতে বুড়ী হয়ে যাচ্ছি।’
দাদী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন,

-তোর বিয়া হইয়া গেলে এই সামান্য কাজই কে করব? জেসমিন! ও তো পানিটাও জগ থেকে ঢেলে খায় না।’
-আমি বিয়ে করলে তো।’
-বিয়ে করবি না তুই? এইডা কেমুন কথা! মাইয়া মানুষ বিয়া না কইরা থাকে কি কইরা? তোর বাপ তোর বিয়ার কথা না ভাবলেও আমি ঘটক ধরছি।’
ধারা এবার সত্যি সত্যি বিরক্ত হলো। কপালে ভাঁজ পড়ল তার।

-তুমি আবার ওই মহিলারে উল্টাপাল্টা বিয়ের সম্বন্ধ আনতে বলেছ? সেবার কিন্তু বাবা কিছু বলেনি। এবার চুপ করে থাকবে না।’
-না না। এইবার উটকো ফুটকো ছেলে আনব না। আমার নাতনির বিয়া দিমু। রাজপুত্রের মতো পোলা আনতে কইছি।’
-ওই রাজপুত্রকে তুমিই বিয়ে করে নিও। কেননা এখন আমার বিয়ে করার কোন পরিকল্পনা নেই।’
ধারা দাদীর কাছ থেকে উঠে পড়ল। এই মহিলার মাথায় আবার তার বিয়ের ভূত চেপেছে। দাদী যত যা-ই করুক ধারার এক জায়গায় স্বস্তি আছে নয়ন ভাই তার বিয়ে হতে দিবে না। প্রতিবারই তো ছেলে দেখতে আসবে বলেও বাড়ি পর্যন্ত আসতে পারে না। সবাই জানে নয়ন ভাই-ই পাত্র ভাগিয়ে দেয়।
ধারা বিড়বিড় করে বলল,

-আপনার সব কাজই আমার অপছন্দ। কিন্তু এই কাজটা আপনি ভালোই করেন।’
ধারা দরজার সামনে চলে এসেছিল। দাদী পেছন থেকে বলে উঠল,

-নজরুলের পোলাডা নাকি আমগো বাড়িতে থাকে। ওরে তো আমি একদিনও দেখলাম না।’
ধারা দাদীর দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,

-কার পোাল?’
-আরে তোর বাপের বন্ধু। চিনস না তুই? পোলাডা যে কয়দিন আগে আমগো বাড়িতে আইলো। তোর কি কিছুই মনে নাই?’
-না। কী মনে থাকবে? কার কথা বলছো তুমি?’
-ভুইলা গেছস হয়তো। তখন তো ছোট আছিলি। আমরা আগে ওইখানে থাকতে নজরুলের বাড়ি আমগো বাড়ির কাছেই আছিল। তুই তো সারাদিনই ওই বাড়িতে থাকতি। বড় পোলাডার নাম যেন কী?’
মনে করার অনেক চেষ্টা করেও নামটা মনে করতে পারলেন না তিনি। শেষে নিজের স্মৃতিশক্তির উপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল,

-মরার কিছুই মনে থাকে না। নজরুলের বড় পোলাডার নাম ভুইলা গেছি। ওর মা তোরে কত আদর করতো। তোর মনে নাই ওই পোলা সবসময় তোর লাইগা কিছু না কিছু আমতো।’
ধারার কিছুই মনে নেই। আর মনে করতে চায়ও না সে। অতীতের কোন কথা, কোন স্মৃতি সে মনে করবে না। অতীত অনেক আগেই ভুলে গেছে। শুধু দাদাজানের বলা কথাগুলো কখনও ভুলবে না ধারা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে রাখবে। ওই মহিলা তোমার মা না দিদিভাই। মা কি কোনোদিন সন্তান রাইখা যাইতে পারে? ওই মহিলা তো গেছে। তোমাদের মা মারা গেছে। ওই মহিলা আমাদের কেউ না। ওই মহিলারে তোমরা ঘৃণা করো।

-দাদী ওসব কথা আমার কিছুই মনে নেই। আর আমি কারো কথাই মনে করতে চাইও না। তুমিও আর কোনোদিন আমার সাথে ওসব কথা তুলবে না। আমরা এখন যেমন আছি ভালো আছি।’
ধারা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বারান্দায় বাঁধা দড়িতে ভেজা গামছা শুকোতে মেলে দিল। তখনই আতিফের সাথে মুনতাসীর বাড়িতে এসে উঠেছে। গেটের ভেতর পা রেখেই ধারার দিকে চোখ পড়ল ওর। ধারাও তাদের দেখে তাড়াহুড়ো করে মাথায় ওড়না টেনে দিল। আতিফকে সে যতই ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করুক তবুও কোনোদিন আতিফের সামনে মাথা থেকে ওড়না পড়তে দেয়নি সে। আর মাথায় ওড়না ছাড়া এই লোকের সামনে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। বাবা বাড়িতে তুলেছে তাই বাধ্য হয়ে সামনে যেতে হয়।
ধারা মুনতাসীরের হাতে বাজার ভর্তি ব্যাগ দেখল। ইনি কি বাজার করতে গিয়েছিলেন? কেন? মেহমান মানুষের টাকায় বাজার খাবে কেন ওরা? ধারার কুঁচকে উঠা কপাল দেখে আতিফ আগেই বলে দিল,

-আমি মুনতাসীর ভাইকে না করেছিলাম। সেদিনই আমি বাজার করেছি। আর লাগবে না। তবুও শুনলেন না তিনি। জোর করেই…
আতিফের কথা শেষ হওয়ার আগে ধারা তীক্ষ্ণ ধারাল কন্ঠে বলল,

-তোমাকে আমি একজন উনার সাথে পাঠাইনি আতিফ।’
আতিফ অপরাধীর মতো মুুখ ছোট করে ফেলে বলল,

-সরি ধারাপু। আমি না করেছিলাম।’
আতিফের কোন দোষ না থেকেও ছেলেটা বকা খাচ্ছে দেখে এই প্রথম মুনতাসীর ধারার সাথে সরাসরি কথা বলল,

-ওকে কিছু বলবেন না। ও আমাকে বারণ করেছিল। আমি ভাবলাম বাজারের কাছে যখন এসেছি তখন…
-আপনি আমাদের মেহমান। আপনি কেন বাজার করতে যাবেন।’
-রোজ রোজ তো করি না। আজ নাহয় একদিন…
-একদিনও না। আপনার টাকার আমাদের বাজার খেতে হবে না। দয়া করে আমাদের এতটাও গরীব ভাববেন না। আপনার উদ্দেশ্য না থাকলেও এতে আমাদের অপমান হবে।’
ধারা কোন রাগ মুনতাসীরের উপর দেখাচ্ছে নিজেও বুঝতে পারছে না। এটা ঠিক একটু আগে বলা দাদীর কথা শোনে ধারার রাগ উঠেছিল। কেউ তার সামনে ওই মহিলার কথা তুললেই তার মাথা ঠিক থাকে না।
মুনতাসীর এতক্ষণ শান্ত ভাবে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছিল। এবার সে-ও কঠিন ভাবে জবাব দিতে বাধ্য হলো।

-তাহলে তো আপনাদের বাড়িতে থাকা খাওয়ার জন্য আমারও অপমান বোধ করা উচিত। মেহমান হিসেবে কেউ কারো বাড়িতে এতদিন থাকে না। আমি আছি তার তো অনেক দিন হয়ে গেল। বিনা পয়সায় আপনাদের অন্ন ধ্বংস করছি। আপনাদের একটা ঘর দখল করে থাকছি। এভাবে থাকার কারণে তো আমার লজ্জা পাওয়া উচিত। আপনারা নেহায়েত ভদ্র মানুষ বলে আমাকে সহ্য করছেন। মুখে কিছু বলছেন না হয়তো কিন্তু মনে মনে যে আমার উপর বিরক্ত হচ্ছেন না তা কীভাবে বুঝব।’
ধারার রাগ পড়ে এলো। রাগের মাথায় কি মানুষটাকে একটু বেশি কটু কথা শুনিয়ে দিয়েছে সে? ওভাবে তো সে বলতে চায়নি। উনার এখানে থাকাতে কেউ বিরক্ত হচ্ছে না। জেসমিন, আতিফ ওরা দু’জনই উনাকে ভীষণ পছন্দ করে। বাবাও চায় তার বন্ধুর ছেলে এবাড়িতেই থাকুক। কিন্তু মানুষটা তো ভুল বুঝতে শুরু করেছে। ধারা মুনতাসীররে চোখের দিকে তাকাতে পারল না। সে ক্ষীণ গলায় বলল,

-আমি কথাগুলো ওভাবে বলিনি। আপনাকে ছোট করার বা কষ্ট দেওয়ারও আমার কোন উদ্দেশ্য ছিল না।’
বলেই ধারা বাজারের ব্যাগটা নিয়ে রান্নাঘরের ভেতর চলে গেল। ওদের দু’জনের ঝগড়া লেগে যাওয়া দেখে আতিফ হয়তো কেঁদেই ফেলত। ধারা আপুকে যতটা পছন্দ করে ও, মুনতাসীর ভাইকেও ঠিক ততটাই পছন্দ করে। যেকোনো একজনের পক্ষ নিতে পারত না সে। যাক ভালো হয়েছে ওদের ঝগড়া লাগেনি। কিন্তু মুনতাসীর ভাই কি রেগে গেছে? আতিফ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,

-মুনতাসীর ভাই, আপনি কি রাগ করেছেন? ধারা আপু ওরকমই। কিন্তু ও খারাপ না। আপনি আপুকে ভুল বুঝবেন না। ওর উপর রাগও করবেন না। ধারা আপু ভীষণ ভালো। কিন্তু একটু অন্যরকম। মুখে কঠোর কথা বললেও মনটা ভীষণ কোমল। আপনি তো আপুকে চিনেন না তাই ওকে বুঝতে পারবেন না।’
আতিফকে বোনের হয়ে সাফাই গাইতে দেখে মুনতাসীর হেসে ফেলল৷ ওকে হাসতে দেখে আতিফ স্বস্তির দম নিল। নিজেও একটু হেসে বলল,

-আপনি রাগ করেননি তো?’
-আমি এত সহজে কারো উপর রাগ করি না আতিফ। একটা কথা আছে না, তুমি রেগে গেলে তো হেরে গেলে। আমি রাগ করে সামনের মানুষটাকে জিতিয়ে দিতে চাই না।’
-*****

-তোদের ওই মেহমানটা কেমন লোক রে? মানে তোদের সাথে…
নয়নকে প্রশ্নটাও শেষ করতে দিল না। তার আগেই জেসমিন বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

-নয়ন ভাই, উনি তেমন মানুষ না। আমাদেরকে আপন বোনের মতো না দেখলেও চাচাতো মামাতো বোনের মতো দেখে।’
নয়ন বাঁকা চোখে ওকে দেখল। জেসমিনকে হতাশ দেখাচ্ছে। নয়ন জিজ্ঞেস করল,

-চাচাতো মামাতো কেন? আপন বোন কেন নয়?’
-মানুষটা তোমার মতোই ভালো। তুমিও তো আমাকে আপন বোনের চোখে দেখো না।’
-সেটা না দেখার আমার একটা কারণ আছে। তোকে আমার আপন বোন বানালে তোর বোনকে আপন বউ বানাবো কীভাবে? মাথা টাথা ঠিক আছে তোর? আমার সাথে ওই লোকের তুলনা দিচ্ছিস! ওই ব্যাটা কি ধারারে বিয়ে করবে নাকি?’
জেসমিন বিড়বিড় করে বলল,

-বিয়ে যে তুমিও করতে পারবে এটার তো কোন গ্যারান্টি নাই। আপু তোমাকে বিয়ে করবে? কে জানে! আমার তো মনে হয় না।’
-বিড়বিড় করিস না। যা বলার স্পষ্ট বল। শোন, তোর বাবার মেহমান যেন আমার ধারার দিকে চোখ না দেয়। ভুলেও যদি ওকে আমি ধারার আশেপাশে দেখি তাহলে…
-কী করবে? হাত-পা ভেঙে দিবে? পারবে তুমি? উনিও কিন্তু দেখতে কম গাট্টাগোট্টা না। তুমি যে খুব সহজে উনার সাথে পেরে উঠবে এটা ভেবো না।’
নয়ন জেসমিনের মাথায় চাটি মেরে বলল,

-এই তুই কার দলে? আমার তো মনে হচ্ছে তুই নতুন দলে নাম লিখিয়েছিস। আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলে আমি কিন্তু এই জীবনে তোর বিয়ে হতে দিব না। পাড়ায় ঢোকার আগেই বর পিটিয়ে ভাগিয়ে দেব।”
জেসমিন খিলখিল করে হাসতে লাগল। সে কারো দলেই না। কিন্তু সে দেখায় যে, আমি তো তোমার দলেই। নয়ন ভাইকে তার ভালো লাগে। এখন আবার মুনতাসীর ভাইকেও তার ভালো লাগে। দু’জনের মধ্য থেকে কার প্রতি ভালোলাগা বেশি এটা এখনও ঠিক করতে পারেনি। তবে মুনতাসীর ভাইও যদি আপুকে বিয়ে চায় এটাও খারাপ হবে না। তখন আপুকে নিয়ে নয়ন ভাই আর মুনতাসীর ভাইয়ের মধ্যকার কামড়াকামড়ি দেখা যাবে।

চলবে