Home "ধারাবাহিক গল্প এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব-১১+১২

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব-১১+১২

0
362

#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_১১

আজকাল আলোর সময়টা তেমন ভালো যাচ্ছে না। কিছু না কিছু অঘটন ঘটিয়ে বসে থাকছে। এই তো আজ ভার্সিটি থেকে দুপুরের দিকে বাড়িতে ফেরার পর রাইসকুকারে পানি গরম করতে দিয়েছিল। অথচ মেয়েটা ভুলে বিকেলে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে সে আবার একটা আকাম করে বসে আছে। পুরো রাইসকুকার ফাঁকা! ভাগ্যিস কোনো দূর্ঘটনা ঘটেনি, নয়তো আজ পুরো খান ভিলা আগুনে জ্ব’লত। তাহমিনা খান এখানে থাকলে নিশ্চিত তার চৌদ্দ গুষ্ঠি ধুয়ে দিত।

ভার্সিটি বর্তিত আলো বাড়িতে সবসময় একা মনমরা হয়ে থাকে। খুব বেশি একাকীত্ব অনুভব করলে দাদাজানের কাছে গিয়ে গল্পর আসর খুলে বসে। সে আবার একা থাকতে পারে না। ছোট বেলা থেকে যৌথ পরিবারের মাঝে বড় হওয়া মেয়ে ও। বাড়িতে সারাদিন হইহই করতেই থাকত। তার সঙ্গ দিত ছায়া, মায়া ও রহিত। বাড়ির বড়দের পিছনেও সবসময় লেগে থাকত। সবাইকে ভীষণ জ্বালাত সে। কিন্তু এখানে এসে অজান্তেই খাঁচায় বন্দী হয়ে গেছে। আশেপাশে তাকিয়েও কাউকে খুঁজে পায় না। আগে স্যারের সাথে টুকটাক ঝগড়া করলেও এখন সেটাও করে না। হঠাৎই সবকিছু কেমন জানি পাল্টে গিয়েছে। এই একাকীত্ব তাকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে মা’রছে। সে না পারছে সহ্য করতে আর না পারছে কাউকে কিছু বলতে। কারণ ওই মানুষটার থেকেও দূরত্ব বেড়ে চলেছে। তারা হয়তো একই ছাঁদের নিচে, একই বিছানায় থাকে। কিন্তু তাদের মধ্যে বিশালাকৃতির অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে। যেটা চাইলেও ভাঙা অসম্ভব প্রায়!

আলো শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার এই নতুন জীবনটা একদম ভালো লাগছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। এখানে কেউ-ই তাকে ভালোবাসে না, শুধু মাত্র একজন ছাড়া। যে মানুষটার এক কথায় না জেনেশুনে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। অথচ এখন সেটাই খুব বাজেভাবে গলায় বিঁধে গিয়েছে। সে ছিল আকাশের মুক্ত পাখি, কিন্তু এখন হয়ে গেছে ঘরকুনো পাখি। যেটা তাকে তিলে তিলে ক্ষ’তবিক্ষ’ত করছে। বারবার মনে হচ্ছে—তার জীবনটা এমন না হলেও পারত। আজ বড্ড মনে পড়ছে নিজের হাসিখুশি ছোট্ট পরিবারকে। ইচ্ছে করছে সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে কোথাও একটা পালিয়ে যেতে! তাহলে হয়তো একটু শান্তি পেত।

আলো খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে আবারো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ফোনটা নিয়ে একটা নাম্বারে ডায়াল করল। কিছুক্ষণ পর অপর প্রান্ত থেকে রিসিভ হতেই সে কানে গুঁজে ধীর কণ্ঠে বলে উঠলো,

-“শুনেছিলাম বিয়ের পর মেয়েরা পর হয়ে যায়। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল, আমি কখনো তোমাদের পর হবো না। কিন্তু আফসোস! তোমরাও আমাকে পর করে দিলে বাবা।”

মতিউর রহমান অফিসে ছিলেন। সেসময় ভর সন্ধ্যা বেলা বড় মেয়ের ফোনকল পেয়ে কিছুটা অবাক হোন। কারণ আলো সবসময় রাতে কিংবা সকালেই কল দেয়। তিনি আর সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি করে কল ধরে কিছু বলতে যাবে তখনই মেয়েটার কথা শুনে থমকে যায়। পর মূহুর্তে বললেন,

-“তুমি আমাদের মেয়ে ছিলে, আছো এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তুমি কখনোই পর হবে না আমাদের কাছে।”

আলো কিছু না বলে চুপ করে থাকল। মতিউর রহমান চিন্তিত হয়ে শুধায়,

-“ওখানে কিছু কী হয়েছে সোনা?”

-“কী হবে? কিছুই হয়নি।”

-“তাহলে তুমি হঠাৎ এমন কথা বলছো কেন?”

-“তোমাদের কথা খুব মনে পড়ছিল বাবা। কতদিন হলো তোমাদের দেখি না। তোমরা আমাকে ভুলে গেলেও কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রতিনিয়ত মিস করি। আচ্ছা ভালো থেকো! আর হ্যাঁ, অফিস থেকে সাবধানে বাড়িতে ফিরবে। আমি রাখছি। আসসালামু আলাইকুম।”

বলেই আলো কল কেটে দিল। অন্যদিকে মেয়ের এমন ব্যবহারে বেশ অবাক হলেন মতিউর রহমান!

ডাইনিংয়ে বসে থেকে সোবহান খান ও আধার খান ডিনার করছে। আলো উনাদের খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে। তাকেও খেতে বলা হয়েছিল, কিন্তু সে খায়নি। বলতে গেলে তার খিদে নেই। দরজা থেকে ভেসে আসা কলিংবেলের শব্দ পেয়ে কপাল কুঁচকে গেল সবার। এত রাতে আবার কে এল? আলো তরকারির পাত্র টেবিলের ওপর রেখে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আমি দেখছি।”

একথা বলে সে বড় বড় পা ফেলে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে দরজার কাছে যায়। এবং দরজা খুলতেই অবাক হয়।

-“ব….বাবা তুমি?”

অসময়ে এখানে নিজের বাবাকে দেখে অস্ফুটস্বরে আলো জিজ্ঞেস করে। মতিউর রহমান বিস্ময়ে মেয়ের মলিন চেহারার দিকে তাকিয়ে রয়। তার আগের মেয়ের সাথে এই মেয়েটার চেহারা মেলাতে খুব কষ্ট হলো বটে। আলো আগে থেকে পাঠকাটি হলেও এখন আরো শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে হালকা ডার্কসার্কেলও পড়েছে৷ চেহারা থেকে লাবণ্যতা হারিয়ে গেছে যেন। মতিউর রহমান নিজেকে সামলিয়ে মেয়ের মাথায় হাত রেখে আদুরে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

-“আমাকে দেখে খুশি হওনি মামণি?”

আলো কিছু না বলে দু’হাতে বাবাকে ঝাপটে ধরে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল,

-“তোমাকে পেয়ে তোমার মেয়ে খুউউউব খুশি হয়েছে বাবা।”

মতিউর রহমান হাসলেন। ততক্ষণে ড্রয়িংরুমে সোবহান খান ও আধার চলে এসেছে।

-“বাবাকে কী বাহিরেই রাখবে নাতবউ? ভেতরে নিয়ে এসো।”

দাদাজানের কথা শুনে হুঁশ এল আলোর। সে আড়ালে চোখের পানি মুছে তড়িঘড়ি করে বাবাকে ছেড়ে বলল,

-“এসো বাবা, ভেতরে এসো।”

মতিউর রহমান ভেতরে এলেন। উনার পরণে ফর্মাল ড্রেসআপ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অফিস থেকে সোজা এখানেই এসেছেন। উনার পিছু পিছু ড্রাইভারও ভেতরে প্রবেশ করলেন। লোকটার দু’হাত ভর্তি ফলমূল, মিষ্টি, শুকনো জিনিস ও আরো অনেক কিছু। সেগুলো টি-টেবিলের ওপর রেখে ড্রাইভার চলে গেল বাহিরে। তখন সোবহান খান বললেন,

-“এতকিছু কেন নিয়ে আসতে গেলে?”

-“মেয়ের শশুর বাড়িতে কী কখনো খালি হাতে আসা যায়?”

-“এটা তোমার মেয়ের আরেকটা বাড়ি। সেখানে এত ফর্মালিটি মেইনটেইন করতে হবে না মতিউর। আমরা আমরাই তো।”

বিনিময়ে মতিউর রহমান হাসলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে—আলো হাসফাস করছে কিছু একটা বলার জন্য।

-“আমার কাছে এসো মামণি।”

আলো গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে বাবার পাশে বসল। মতিউর রহমান একহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ধীর কণ্ঠে বললেন, -“কিছু বলবে?”

আলো কপাল চুলকিয়ে বিরবির করে বলল, -“এই সময়ে এখানে কেন বাবা? না মানে সব ঠিক আছে তো?”

-“তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল, তাই এসেছি।”

আলো কিছু না বলে মাথা নাড়াল। মতিউর রহমান আশেপাশে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, -“তোমার শাশুড়ী মা কোথায়?”

-“উনি উনার বাবার বাড়িতে গিয়েছে বাবা।”

শেফালি চাচি চা-নাস্তা নিয়ে এসে সামনে থাকা টি-টেবিলের ওপর রাখল। মতিউর রহমান সোবহান খানের উদ্দেশ্যে বললেন,

-“বড় মেয়েটার বিয়ের তো অনেক দিন হয়ে গেল। আমরা সবাই ওকে খুব মিস করছি। তাই ভাবছিলাম, আজ ওকে আমার সাথে নিয়ে যাব। সামনেই ওর পরীক্ষা! আমাদের ওখানেই না-হয় থেকে পরীক্ষাটা দিক। পরীক্ষা শেষ হলে আবার এখানে ফিরে আসবে। এই কটা দিন ও আমাদের সাথে থাকলে আমরা খুব খুশি হতাম। আপনার কী মতামত?”

সোবহান খান থমথমে মুখে পাশে বসে থাকা নাতির দিকে তাকায়। উনার দৃষ্টি লক্ষ্য করে মতিউর রহমান মেয়ে জামাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,

-“আমার মেয়েকে এখন নিয়ে গেলে কী তোমার কোনো অসুবিধা হবে বাবা?”

আধার স্বাভাবিক গলায় বলল, -“আপনি আপনার মেয়েকে নিয়ে যাবেন, এতে আমার কেন অসুবিধা হবে? তার যতদিন ইচ্ছে ততদিন থাকুক আপনাদের ওখানে। এতে আমার কোনো অসুবিধা নেই আঙ্কেল।”

মতিউর রহমান মনে মনে খুশি হলেন। এইদিকে আধারের মুখে “আঙ্কেল” সম্মোধন শুনে আলোর মনটা বিষাদে ভরে গেল। যেখানে সে এই বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই তাহমিনা খানকে “মা” বলে সম্মোধন করেছিল। সেখানে মানুষটা সবার সামনে কি নির্দ্বিধায় আঙ্কেল বলে ডাকলো তার বাবাকে! আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আজকাল একটু বেশি-বেশিই আশা করে বসে থাকে। যেটা কখনোই পূরণ হবার নয়।

-“তুমি তোমার বাবার সাথে যেতে চাও নাতবউ?”

দাদাজানের কথা শুনে আলো মাথা নাড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, -“হ্যাঁ দাদাজান। আমি বাড়ি যেতে চাই।”

সোবহান খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুচকি হেঁসে বললেন,

-“ঠিক আছে। তবে জলদি ফিরে আসবে কেমন?”

আলো মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। অথচ সে নিজেই জানে না, আদৌ এখানে আর ফিরে আসবে কি-না!

বাবা-মেয়েকে রাতের খাবার খাইয়ে তবেই ছাড়লেন সোবহান খান। আলো রুমে এসে নিজের ল্যাগেজ গুছিয়ে নিল। প্রয়োজনীয় জিনিস, বইপত্র ও হালকা-পাতলা জামাকাপড় নিয়েছে। ল্যাগেজের চেইন লাগানোর সময় বিপত্তি ঘটল। বই তোলার কারণে ফুলেফেঁপে উঠেছে ব্যাগের ভেতরটা। সে চেপেচুপেও চেইন লাগাতে পারছে না। তখন খেয়াল করল তার সামনে থেকে ল্যাগেজ উধাও! আলো চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখে আধার স্যার চেইন লাগিয়ে দিচ্ছে।

আলো কিছু না বলে চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে গেল। একটু পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে তৈরি হয়ে নিল। পিছনে ফিরতেই আধার একটা ক্রেডিট কার্ড সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

-“এটা রাখো।”

-“কেন?”

-“হাতখরচের জন্য।”

আলো তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, -“যেখানে মানুষ হিসেবে আপনাকে পাওয়ার অধিকারটাই আমার নেই, সেখানে আপনার অর্থ বা অন্য কিছু গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না।
ভালো থাকবেন, নিজের ও সবার খেয়াল রাখবেন। আসছি!”

বলেই আলো আর না দাঁড়িয়ে চুপচাপ ল্যাগেজ নিয়ে চলে গেল। আর আধার থমথমে মুখে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল।

-“ঠিকমতো ঔষধ খাবে দাদাজান। আমার জন্য একটুও মন খারাপ করবে না। আর না তো চিন্তা করবে। আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসার চেষ্টা করব। তোমার যদি আমার কথা খুব মনে পড়ে, তাহলে টুপ করে চলে আসবে আমার কাছে। আমি তিনবেলায় তোমাকে ভিডিওকল করব। আর তেলমশলা জাতীয় বেশি খাবার একদম খাবে না। মিষ্টিও কম কম খাবে। শরীর খারাপ করলে কিন্তু আমি আর কথা বলব না তোমার সাথে। আমি চাই আমার দাদাজান সবসময় ফিটফাট থাকুক। নয়তো মেয়েরা পটবে কীভাবে হুহ্?”

আলো বাহিরে এসে দাদাজানের পাশে বসে একনাগাড়ে কথাগুলো বলে। সোবহান খান হেঁসে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

-“ঠিক আছে। সব মানবো। আর তুমিও নিজের খেয়াল রাখবে। কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই জানাবে তোমার দাদাজানকে।”

আলো একগাল হেঁসে দাদাজানকে জড়িয়ে ধরে টুপ করে গালে চুমু খেয়ে বলল, -“লাভ ইউ দাদাজান।”

সোবহান খান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে মেয়েটার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, -“তোমার পথ চেয়ে কিন্তু আমি অধীর আগ্রহে বসে থাকব নাতবউ। আশা করছি আমার এই অপেক্ষার প্রহর তাড়াতাড়ি শেষ হবে। তুমি আমাকে কখনো নিরাশ করবে না কেমন?”

-“ইনশাআল্লাহ দাদাজান। তোমার আলো কখনোই তোমাকে কষ্ট দিবে না!”

সোবহান খান মুচকি হেঁসে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন। আলো হাসিমুখে বিদায় নিয়ে বাবার সাথে চলে গেল। গাড়িতে বসার পর জানালা দিয়ে মাথা বের করে বাড়িটাকে দেখে নিল। ভেবেছিল আধার স্যার তাকে এগিয়ে দিতে আসবে। কিন্তু মানুষটার কোনো অস্তিত্বই দেখতে পেল না। আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ততক্ষণে গাড়িটা নিজ গতিতে চলতে শুরু করে দিয়েছে। তবুও মেয়েটা এখনো চেয়ে আছে, পিছনে ফেলে আসা তার অনাকাঙ্ক্ষিত ছোট্ট সংসারের প্রাণে। যতদূর পর্যন্ত দেখা গেল, ঠিক ততোদূর পর্যন্ত অপলক নয়নে তাকিয়ে ছিল। আজ থেকে মানুষটা নিশ্চয়ই শান্তিতে থাকবে। দিনের বেলাতেও কেউ জ্বালাবে না, আর রাতের বেলাতেও কেউ ঘুমের ঘোরে কাছে গিয়ে বিরক্ত করবে না!

আলো ফিচেল হেঁসে মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে বাবার কাঁধে মাথা রেখে চোখদুটো বুঁজে নিল। খান বাড়ির সামনে থেকে তাদের গাড়িটা অদৃশ্য হলেও দোতলার রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মানবের ছায়া এখনো স্পষ্ট!

—————————————-
বহুদিন পর নিজ বাড়িতে এসে প্রাণভরে শ্বাস টেনে নিল আলো। এখন কিছুটা হলেও মনটা হালকা লাগছে। ছোট বোনের সাথে নিজের রুমে এসে ধপ করে বিছানার ওপর বসল। মায়া ফলের জুস নিয়ে এসেছে। মেয়েটা এবার জেএসসি দিবে। তাদের বাড়ির ছোট সদস্য ও।

-“আপু নাও।”

আলো মুচকি হেঁসে মায়ার হাত থেকে জুসের গ্লাসটা নিল। ছায়া বড় আপুর হাত খেয়াল করে অবাক কণ্ঠে বলল,

-“তোমার হাতে কী হয়েছে আপু?”

আলো জুস খেতে খেতে নিজের হাত দুটো দেখে ধীর কণ্ঠে বলল, -“সংসার করতে গেলে টুকটাক এমন ছ্যাকা খেতে হয়।”

-“দুলাভাই তোমার সাথে এল না কেন আপু?”

-“উনি ব্যস্ত মানুষ। এত সময় আসে নাকি উনার?”

ছায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে আওরায়, -“তুমি অনেক শুকিয়ে গেছো আপু।”

আলো হেঁসে বলল, -“নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগবেই। যাইহোক, অনেক রাত হয়ে এসেছে। তোরা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। আমিও ঘুমাব।”

ছায়া আর মায়া মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। আলো কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে রুমের লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।

আলেয়া রহমান রুমে এসে দেখলেন উনার স্বামী রকিং চেয়ারে বসে থেকে কিছু একটা ভাবছেন। তিনি এগিয়ে এসে জানতে চাইলেন,

-“কী হয়েছে? আপনাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন? সব ঠিক আছে?”

মতিউর রহমান জোরে শ্বাস ফেলে বললেন, -“সবকিছু ঠিক থেকেও যেন কিছু একটা ঠিক নেই।”

-“কোনো সমস্যা হয়েছে?”

-“আমার মেয়েটা ওখানে ভালো নেই আলেয়া। একটুও ভালো নেই।”

স্বামীর মুখে এমন কথা শুনে আলেয়া রহমান চমকে উঠলেন। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, -“এসব কী বলছেন আপনি? মেয়েটা ওখানে ভালো নেই মানে? তাহলে কী আধার এখনো বিয়েটা মেনে নেয়নি?”

-“উঁহু।”

আলেয়া আঁতকে উঠলেন। -“এখন কী হবে?”

মতিউর রহমান চেয়ারে মাথা ঠেকিয়ে দু’চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, -“জানি না। তবে এইটুকু বুঝতে পারছি, মেয়েটার ভালো করতে গিয়ে অজান্তেই মরীচিকার মাঝে ফেলে দিয়েছি। যেখানে থাকাটাও কষ্টকর এবং বের হয়ে আসাটাও আরো বেশি কষ্টকর!”

—————————–
মামার বাড়িতে এসে আজ দিয়ে এক সপ্তাহ হলো। আলো সবকিছু ভুলে নিজের মতো জীবন উপভোগ করছে। সে আবার অহেতুক কিছু নিয়ে নিজেকে কষ্ট দিতে বা চিন্তায়, চিন্তায় ডিপ্রেশনে যেতে মোটেও ইচ্ছুক নয়! তার কাছে সবার আগে নিজেকে খুশি রাখা। কারণ সে নিজেকে প্রচুর ভালোবাসে। কেউ তাকে পছন্দ করে কি-না করে না, এতে একটুও মাথা ব্যথা নেই। তবে মাঝেমধ্যে মনটা বেইমানি করে তার সাথে। যেটা ভীষণ বিরক্তিকর!

আলো নীল সমুদ্রের জলে নগ্ন পায়ে হেঁটে চলেছে৷ তার মামার বাড়ি কক্সবাজারে হওয়ার সুবাদে এখানে এলেই সমুদ্রবিলাস করতে পারে। এর জন্য তার পছন্দের জায়গা হচ্ছে মামার বাড়ি। তাই তারা চার ভাই-বোনে চলে এসেছে ঘুরতে। এ ক’দিনে ওই বাড়ির লোকজনের মধ্যে শুধু দাদাজানের সাথেই কথা হয়েছে। এছাড়া আর কারোর সাথেই কথা হয়নি। আলো একবার ভেবেছিল স্যার নামক স্বামীকে কল দিবে। কিন্তু তার কাছে তো মানুষটার নাম্বারই নেই। সে চাইলে অন্য কারোর থেকে নিতে পারত, কিন্তু নেয়নি। যে মানুষটা তাকে ভুলে গিয়েছে, সেখানে আগ বাড়িয়ে ফোন-আলাপ করা মানায় না। যে যার মতো ভালো থাকুক!

-“এ্যাই আপুউউউ! দাঁড়াও দাঁড়াও।”

পিছন থেকে ছোট বোনের চিল্লানির আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আলো। অদূর থেকে ছায়া আর মায়া দৌড়ে আসছে। সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে এক জায়গায় রহিত ভাইয়া দাঁড়িয়ে থেকে ফোনে কথা বলছে। আর তার পাশে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা আপু।

-“এই অসময়ে পানিতে ভেজার প্ল্যান করেছো নাকি? বাবা আসার সময় পইপই করে নিষেধ করেছে, সমুদ্রের পানিতে বেশি গোসল না করতে। কিন্তু তুমি? তুমি তো পারলে তিন বেলায় পানিতে ভিজো।”

ছায়ার কথা শুনে আলো বলল, -“বেশি পকপক না করে চল, কাঁকড়া খাবো।”

ছায়া আর মায়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। তারা তিনবোন এগিয়ে গেল রহিতদের কাছে। তারপর একটু ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া করে বাড়িতে ফিরে গেল।

-“এই আলো? তোর বরটা কী তোকে একটুও মিস করে না?”

ডিনার শেষে অন্ধকার রুমে বসে থেকে ল্যাপটপে মুভি দেখছিল সবাই মিলে। তখন মেঘলা আলোর উদ্দেশ্যে ফিসফিসিয়ে কথাটি বলে। মামাতো বোনের কথা শুনে আলো আইসক্রিম খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল,

-“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

-“না মানে, এতদিন হয়ে গেল বউ বাইরে আছে। অথচ মানুষটা একবারের জন্যও তোকে কল দিল না। সব ঠিক আছে তো?”

আলোর খাওয়া থেমে গেল। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আসলেই কী সবকিছু ঠিক আছে? উঁহু, নেই তো। কিছুই ঠিক নেই। তার সবটাই এখন এলোমেলোর পথে। আবছা আলোর মাঝে মেয়েটার মলিন চেহারা খেয়াল করে রহিত মেঘলার মাথায় চাটি মে’রে বলল,

-“তোর এই বোঁচা নাকটা সব বিষয়ে না গলালে হয় না?”

মেঘলা মা’র খেয়ে বিরবির করে বলল,

-“আমি আবার কী করলাম?”

-“পরে বুঝাচ্ছি তুই কী করেছিস। এখন মুখ বুঁজে চুপচাপ মুভি দেখ। নয়তো ঘাড় ধরে বের করে দিবো বেয়াদব।”

মেঘলা ছলছল চোখে তার বড় ভাইয়ের দিকে তাকায়। মাহিন ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল, -“জানিস তো ও কেমন! চুপচাপ মুভি দেখ।”

মেঘলা কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্যদিকে ছায়া আর মায়া ঘুমে ঢুলছে। তখন বাজে রাত একটা। মুভি দেখা শেষে যে যার মতো চলে যায়। মায়া মেঘলার রুমে থাকে এবং ছায়া তার আপুর রুমে থাকে।

-“শুনুন?”

রহিত রান্নাঘরে এসেছিল ফ্রিজ থেকে পানির বোতল নিতে। পানি খেতে খেতে পিছনে ফিরতেই দেখতে পায় মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে। পরণে লং টি-শার্ট, প্লাজু ও গলায় ওড়না পেঁচিয়ে রাখা। এবার অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বেবি ফেসের জন্য বয়স বোঝা দায়। হাইট তার ঠিক বুক পর্যন্ত হবে মেবি। রহিত কিছুক্ষণ মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগল। তখন পিছন থেকে মিহি কণ্ঠে ডেকে ওঠে মেঘলা। রহিত থেমে গিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“বল!”

মেঘলা দু’হাত কচলাতে কচলাতে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“না মানে, আসলে….আপনি এই বিয়েতে মন থেকে রাজি হয়েছেন?”

-“আজকাল তুই কিন্তু একটু বেশিই কথা বলছিস।”

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল,

-“দেখুন আমি একটুও চাই না, আপনি শুধুমাত্র আপনার পরিবারের কথা ভেবে আমাকে বিয়ে করুন। আপনি যদি এই বিয়েতে রাজি না থাকেন তাহলে প্লিজ বলে দিন। আমি আর এসব নিতে পারছি না।”

কথাগুলো বলতে বলতে মেঘলার চোখদুটো ভরে উঠলো। এই মানুষটা কেন তার ভালোবাসা বুঝতে পারে না? সে যে এই লোকটাকে প্রচুর ভালোবাসে। তাই তো বেহায়ার মতো বাবার কাছে আবদার করেছিল এই মানুষটাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে। তারপর দুই পরিবার বসে আলাপ-আলোচনা করে তাদের বিয়েটা ঠিক করল। আর তিনমাস পর তাদের বিয়ে। কিন্তু সে চেয়েও খুশি হতে পারছে না এই লোকটার অদ্ভুত বিহেভিয়ারের জন্য। সবসময় তাকে দূর দূর করে! তাই আজ মনে সাহস জুগিয়ে কথা বলতে এসেছে। কারণ সে চায় না, বিয়ের পর কোনোরকম অশান্তি হোক।

রহিত কাউন্টারের ওপর বোতল রেখে পিছনে ফিরে মেঘলার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

-“তোর কেন মনে হচ্ছে, আমি এই বিয়েতে মন থেকে রাজি না?”

-“কারণ আপনি আমাকে মোটেও পছন্দ করেন না। একটু সুযোগ পেলেই বকাবকি করেন নয়তো মা’রেন।”

-“ঠিক আছে। এখন থেকে নাহয় তোকে শুধু আদরই করব। চলবে?”

-“হু!”

অন্যমনষ্ক হয়ে জবাব দিতেই মেঘলার চোখ দুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে তড়াক করে মাথা তুলে উপরে তাকাতেই এক জোড়া শক্ত-পোক্ত হাত এসে তার কোমর এবং ঘাড় চেপে ধরে কাছে টেনে নিল। মেঘলা বিস্ময়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকায় রহিতের ঘোর লাগা চোখের দিকে। সে কিছু বলতে যাবে তখনই তার ঠোঁট জোড়া শক্ত করে আঁকড়ে ধরল রহিত।

মেয়েটা এক মূহুর্তের জন্য থমকে যায়। পরক্ষণে দু’হাতে প্রিয় মানুষটার মাথার পিছনের চুলগুলো খামচে ধরে আবেশে আঁখি জোড়া বুজে নিল। তার চোখের কুর্ণিশ বেয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তবে এটা কষ্টের নয়, বরং সুখের। কারণ সে তার সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেয়ে গেছে আজ!

ফোনের ককর্শ শব্দে আলোর কাঁচা ঘুম ভেঙে যায়। সে সবেমাত্র শুয়েছিল। অথচ ঘুম ধরতে না ধরতেই উবে গেল। আলো একরাশ বিরক্তিতে পাশে থাকা টি-টেবিল হাতড়ে নিজের ফোনটা নিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরে ঘুমু ঘুমু কণ্ঠে বলল,

-“আসসালামু আলাইকুম! কে বলছেন?”

অপর প্রান্ত থেকে কেউ কিছু বলল না। আলো জোরে শ্বাস নিয়ে বলল, -“কথা যখন বলবেনই না, তখন অযথা রাতবিরেতে কল দিয়ে একটা মেয়েকে ডিস্টার্ব করেন কেন?”

এবারেও নিশ্চুপ। আলো কল কেটে দিল। কিন্তু আবারো ফোন এল।

-“হ্যালো? কে বলছেন?

-“………..”

-“শালার ঘরে বেয়াদব শালা, আমার সুন্দর ঘুমটা নষ্ট করে এখন বোবার ভান ধরে থাকা হচ্ছে? তোর কপালে বোবা বউ জুটবে দেখিস।”

বলেই খট করে লাইন কেটে দিল আলো। ফোনটা রেখে চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পর মূহুর্তে আবারো
কল এল। আলো দাঁত কিড়মিড় করে কলটা রিসিভ করে কানে গুঁজে বলল,

-“এই ভাই আপনার সমস্যা কী হুহ্? কিছু বলার থাকলে বলুন, নয়তো আমাকে ঘুমাতে দিন। নাহলে আপনার নামে মামলা ঠুকে দিবো। তখন জেলে বসে থেকে শক্ত রুটি চিবোতে চিবোতে মেয়েদের মাঝরাতে ফোন দিয়ে বিরক্ত কইরেন।”

অপর প্রান্ত থেকে শুধু ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। আলো তপ্ত শ্বাস ছেড়ে কেটে দিল। ফোন সাইলেন্ট করতে যাবে তখনই খেয়াল করল, আবার কল এসেছে অচেনা নাম্বার থেকে। আলো একটু সময় নিয়ে রিসিভ করে কানে গুঁজে চুপ করে থাকল। তারপর বিরবির করে বলল,

-“আই অ্যাম নট সিঙ্গেল। আমার স্বামী, বাচ্চাকাচ্চা সব আছে। সো আমাকে লাইন মে’রে কোনো লাভ নেই। উল্টো আপনারই ক্ষতি হবে। আমার বরটা এক নাম্বারের সাইকো। উনি যদি জানতে পারে আপনার জন্য আমার ঘুম নষ্ট হয়েছে, তাহলে শিওর আপনার ঘুম কেঁড়ে নিবে৷ তাও সারাজীবনের জন্য। তাই বলছি, ভালো হয়ে যান। আবার যদি কল দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে আপনি ছাগলের তিন নাম্বার ব্রেনলেস ছাও!”

#চলবে

#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_১২

-“কাজ কতদূর?”

-“আঙ্কেলের সাথে কথা বলা শেষ। উনি খুব শীঘ্রই ডিভোর্স পেপার নিয়ে আসবেন। জরুরী কাজের জন্য শহরের বাহিরে গিয়েছেন। তাই কিছুটা দেরি হচ্ছে।”

-“আচ্ছা, সমস্যা নেই।”

-“যা করছিস ভেবে করছিস?”

-“হুম। তোর ভাবী চায় না আমার সাথে সংসার করতে। আমি ওকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু ও এক কথাতেই আঁটকে আছে। প্রতিদিন অশান্তি আর ভালো লাগে না। রাতবিরেতে ক্লাবে গিয়ে পার্টি করা থেকে সবকিছু করে। ওকে বহুবার বলেছি ভালো হয়ে যেতে, কিন্তু ও আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম ওকে ডিভোর্সই দিবো। তারপর দেখি ও কী করে বা কার কাছে যায়।”

ইয়াসিনের কথা শুনে আধার কফির মগে চুমুক দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“কিছু কিছু মানুষ বড্ড বেইমান। এরা কখনোই ভালোবাসা ডিজার্ভ করে না।”

ইয়াসিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, -“দিনশেষে আমরা ভুল মানুষকেই ভালোবেসে ফেলি। তারপর পস্তাতে হয়!”

-“এইজন্যই আই হেট লাভ।”

ইয়াসিন কফির মগে ঠোঁট ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল, -“শুনলাম বিয়ে করেছিস?”

-“হু!”

-“সংসার টিকবে?”

-“জানি না!”

-“মেয়ে কেমন? না মানে তোর ভাবীর মতো না তো আবার…!”

-“উঁহু! সে সবার থেকে আলাদা।”

ইয়াসিনের যুক্তিকে নাকচ করে কাঠকাঠ গলায় জবাব দিল আধার। তারা একটা ক্যাফেতে বসে থেকে কফি খাচ্ছে আর কথাবার্তা বলছে। মূলত আজ ইয়াসিন-ই ডেকেছে স্কুল, কলেজ জীবনের বন্ধু আধারকে। ভার্সিটি শেষে সন্ধ্যার দিকে এখানে এসে উপস্থিত হয় আধার। ইয়াসিনের দাম্পত্য জীবনে ঝামেলা চলছে। তাই সে যেটুকু পারছে ওইটুকু সাহায্য করার চেষ্টা করছে। যেখানে তার নিজের সংসারটাই এলোমেলো হয়ে আছে।

-“ভালোবাসাতে বিশ্বাস করিস না, অথচ বিয়ে করে ঠিকই বসে আছিস। এটা কেমন লজিক হুহ্?”

বন্ধুর কথা শুনে ঠোঁট প্রসারিত করে হালকা হাসল আধার। তারপর বলল, -“কী করব বল? দাদাজান জোকের মতো পিছনে লেগে ছিল। শেষমেশ উনার ইচ্ছেটাকেই পূরণ করলাম।”

-“ভালো করেছিস। আর কতদিন একা থাকতিস। জীবনে চলার পথে একটা সঙ্গী থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটা যদি হয় সঠিক মানুষ!”

আধার প্রতিত্তোরে কিছু বলল না। তার চোখের দৃষ্টি তো এখন অন্য এক জায়গায় নিবদ্ধ।

-“আপু এটা না, এটা না! এটা আমি খাবো।”

ছায়া তড়িঘড়ি করে লাস্ট পিস চকলেট ব্রাউনি নিতে যাবে তার আগেই আলো চিলের মতো ছো মে’রে ওটা নিয়ে মুখে পুরে নিল। সঙ্গে সঙ্গে তার গালদুটো ফুলে উঠলো। বড় বোনের কান্ড দেখে মায়া ফিক করে হেঁসে দিল। ছায়া গোমড়া মুখে বলল,

-“এটা তুমি ঠিক করলে না আপু। যাও তোমার সাথে কথা বলব না।”

আলো খেতে খেতে হেঁসে দেয়। তারা কক্সবাজার থেকে তিনদিন আগে ফিরে এসেছে। কারণ আলোর আর দু’দিন পরই পরীক্ষা। আজ রাতে মেঘলা চলে যাবে, তাই রহিত সবাইকে নিয়ে রাতের শহর ঘুরতে বেড়িয়েছিল। পাশের এলাকার এই ক্যাফের কফি ও ডেজার্ট আইটেম বেশ ফেমাস হওয়ায় এখানে আসা হয়েছে। অফিসে কাজের চাপের জন্য মাহিন আসতে পারেনি। তারা দু’জন সমবয়সী-ই!

-“আচ্ছা এখন চলি! অনেক রাত হয়ে এল। আকাশটাও ভালো নেই। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।”

ইয়াসিনের কথা শুনে আধার সামনে থেকে নজর সরিয়ে বাহিরে তাকায়। হালকা বাতাস বইছে! মাঝেমধ্যে আকাশ গর্জেও উঠছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। হঠাৎই আধারের চোখের সামনে সেই দিনের অপ্রত্যাশিত কিছু দৃশ্য ভেসে উঠলো। এমনই একটি বৃষ্টিময় রাতে ছাঁদে গান গাইতে গাইতে নৃত্য করছিল এক স্নিগ্ধ রমণী। যাকে দেখে না চাইতেও সে এক মূহুর্তের জন্য নিজেকে হারিয়েছিল! এবং থেমেছিল অশান্ত হৃদয়…

আধার তপ্ত শ্বাস ফেলে সব চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে এক চুমুকে কফি খেয়ে নিল। তারপর বিল মিটিয়ে ইয়াসিনের সঙ্গে উঠে গেল।

-“আসসালামু আলাইকুম দুলাভাই। আপনি এখানে?”

ছায়া বড় বোনের ওপর রাগ করে বাহিরে চলে এসেছিল। উদ্দেশ্য ছিল রিকশা ধরে চলে যাওয়ার। তখন দুলাভাইয়ের মতো কাউকে দেখতে পায়। তাই সে কৌতূহল হয়ে রাস্তার পাশে এগিয়ে আসে। তারপর উপরোক্ত বাক্যটি বলে।

ইয়াসিন চলে যাওয়ার পর আধার পার্কিং প্লেসের দিকে যাচ্ছিল। তখন পিছন থেকে মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে থেমে যায়। এবং পিছনে ফিরে দেখে তার শালী সাহেবা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আধার সালামের জবাব দিয়ে বলল,

-“কিছু কাজ ছিল। কিন্তু তুমি এখানে?”

-“আপুদের সাথে ঘুরতে এসেছি।”

আধার কপাল স্লাইড করতে করতে আশেপাশে তাকিয়ে বলল, -“আইসক্রিম খাবে?”

আইসক্রিমের কথা শুনে ছায়ার চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো। আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল, -“এসো।”

আলো, মায়া, মেঘলা ও রহিত বাহিরে এসে ছায়াকে খুঁজতে লাগল। ততক্ষণে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। আলো মনে মনে ছোট বোনকে বকাবকি করে নিজের ফোনটা বের করল ব্যাগ থেকে। এই মেয়েটা আবার কোথায় গেল কে জানে! আলো পাশে ফিরতেই দেখতে পায়—ছায়া হাতে করে এক গুচ্ছ চকলেট, চিপস, আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে আসছে। এতকিছু দেখে আলোর কপাল কুঁচকে গেল। সে খ্যাক করে বলল,

-“কার পকেট মে’রেছিস হুহ্? নাকি কোনো দোকান লুট ক…!”

বাকী কথা বলতে পারল না আলো। তার আগেই অতি পরিচিত একখানা সুদর্শন চেহারা দেখতে পেয়ে চমকে উঠলো। ঠিক কতদিন, কত রাত পর এই মানুষটাকে দেখছে? উমম…..১১ দিন, ১১ রাত, ১৫,৮৪০ মিনিট এবং ৯,৫০,৪০০ সেকেন্ড পর মানুষটাকে দেখছে আজ।

-“তুমি আমার খাবার মে’রেছো। তাই আমিও তোমার বরের পকেট মে’রেছি। হিসাব বরাবর আপু!”

ছায়া বোনের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে কথাটি বলে। আলো নিজেকে সামলিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকায়। ছায়া মুখ ভেংচি কেটে সরে গেল। ছোট বোনের স্বামীকে দেখে রহিত এগিয়ে এসে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করল। আধারও ভদ্রতার খাতিরে টুকটাক কথাবার্তা বলল।

মুষলধারে বৃষ্টি পড়তেই মেঘলা হকচকিয়ে উঠে বলল,

-“তাড়াতাড়ি রিকশা ডাকো। নয়তো আজ রাত এখানেই থাকতে হবে।”

রিকশা করে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রহিত আজ গাড়ি নিয়ে আসেনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, না নিয়ে এসেই ভুল করেছে। তার ভাবনার মাঝেই তাদের সামনে এসে একটা কালো রঙের গাড়ি থামে। জানালার কাঁচ নামিয়ে আধার সকলের উদ্দেশ্যে বলল,

-“গাড়িতে উঠে এসো। আমি তোমাদেরকে ড্রপ করে দিচ্ছি।”

ছায়া আর মায়া গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে ঢুকে পড়ল। কারণ তারা এত রাতে ভিজতে চায় না। অলরেডি অর্ধেক ভিজেই গেছে। মেঘলা থমথমে মুখে রহিতের দিকে তাকায়। রহিত কিছু একটা ভেবে ইশারা করে ভেতরে বসতে বলল। মেঘলা চুপচাপ গিয়ে মায়ার পাশে উঠে বসল। এখন বাকী আলো ও রহিত। কিন্তু সিট ফাঁকা মাত্র একটা। তাও আধারের পাশের সিট।

-“তুই গিয়ে বস। আমি রিকশায় করে যাচ্ছি।”

ভাইয়ার কথা শুনে আলো চটপট করে বলে উঠলো, -“তুমি গিয়ে বসো ভাইয়া। আমি রিকশায় করে যাচ্ছি।”

-“মাথা ঠিক আছে তোর? ক’টা বাজে দেখেছিস? এত রাতে কি-না তুই ওই নির্জন পথ দিয়ে একা ফিরবি? সিরিয়াসলি?”

রহিতের ধমকে কেঁপে উঠলো আলো। বিরবির করে বলল,

-“তাহলে তুমি একা ফিরতে চাচ্ছো কেন?”

-“কারণ আমি ছেলে আর তুই মেয়ে।”

-“আমাদের দু’জনের শরীরেই কিন্তু কিডনি, লিভার, হার্ট আছে।”

রহিত দাঁত কিড়মিড় করে তাকায়। আলো গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে রইল। আধার কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মেঘলা কিছু একটা ভেবে রহিতের উদ্দেশ্যে ফট করে বলে উঠলো,

-“আপনি বরং ড্রাইভ করুন। আর আলো দুলাভাইয়ের কোলে বসুক। তাহলেই আর কাউকে রিকশায় করে যেতে হবে না।”

একথা শুনে আলোর চোখদুটো কপালে উঠে গেল। সে কিছু বলতে যাবে তখনই রহিত ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল, -“নাইস আইডিয়া মেঘ।”

তারপর দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

-“নিজের বউকে কোলে নিতে আপনার কোনো অসুবিধা আছে দুলাভাই? আমরা কিন্তু…মাইন্ড করব না প্রমিস!”

আধার ঠোঁট কামড়ে আশেপাশে তাকায়। ধীরে ধীরে আবহাওয়াটা খারাপ হচ্ছে। সে কিছু না বলে ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে পাশের সিটে এসে বসল৷ রহিত মনে মনে হেঁসে ঘুরে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। আধার সিট বেল্ট বেঁধে আলোর ভেজা চেহারার দিকে তাকিয়ে আওরায়,

-“সারারাত কী এখানেই থাকবে? নাকি তোমার জন্য প্লেন বুক করব?”

আলো থম মে’রে দাঁড়িয়ে আছে। সে চাচ্ছে না ওই লোকটার কোলে বসতে। দু’দিন পর তাকে ডিভোর্স দিবে, আর এখন কিনা কোলে উঠতে হবে। এইদিকে আধার গম্ভীর মুখে বসে থাকল। রহিত রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আলোকে ধমক দিতেই মেয়েটা চুপচাপ এগিয়ে এল।

গাড়ির ভেতর উঠে স্যারের কোলে বসতেই নিঃশ্বাস আঁটকে গেল আলোর। কোনোমতে দাঁত খিঁচে চোখমুখ বুঁজে মটকা মে’রে বসে থাকল। লজ্জায় তার বাতাসের সাথে ফুড়ুৎ করে উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে। এমন পরিস্থিতিতে যে পড়তে হবে, সেটা কখনো কল্পনাও করেনি। আধার হাত বাড়িয়ে ডোর লাগিয়ে দিতেই রহিত গাড়ি স্টার্ট দিল। পিছনে বসা ছায়া, মায়া ও মেঘলা মিটমিট করে হাসছে আর ফাসুরফুসুর করে কিছু একটা বলাবলি করছে। তারা আজ আচ্ছা মতো জব্দ করতে পেরেছে ত্যাড়া মেয়েটাকে।

আলোকে লজ্জা পেতে দেখে রহিত ভেতরের বাতি নিভিয়ে বলল, -“নে এখন আর লজ্জা পেতে হবে না।”

আলো নিভে যেতেই মেয়েটার হার্টবিট বেড়ে গেল। সে হাসফাস করতেই কোমরের কাছে শক্তপোক্ত, বলিষ্ঠ হাতের কঠিন ছোঁয়া অনুভব করল। একই সাথে কানের কাছে গরম নিঃশ্বাসের অস্তিত্ব টের পেতেই জমে বরফ হয়ে গেল মেয়েটা। দূরে সরে আসার চেষ্টা করতেই শুনতে পেল হিসহিসিয়ে বলা কিছু বাক্য,

-“চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো বসে থাকো। নয়তো চলন্ত গাড়ি থেকে রাস্তায় ছুঁ’ড়ে মা’রব মিস. কালো!”

————————————–
কথায় আছে বিপদে পড়লে বাঘ ঘাসও খায়। ঠিক তেমনই আজ আলো বিপদে পড়ে পুরো রাস্তা স্যার ওরফে স্বামীর কোলে বসে থেকে এসেছে। তখন রাত বাজে সাড়ে বারোটা।
শহর জুড়ে ঝড়ঝাপটার তান্ডব শুরু হয়েছে। তার মাঝে রহমান বাড়ির সামনে এসে থামে একটি কার! সবার আগে আলো বেরিয়ে এল। তারপর মেঘলা, ছায়া ও মায়া বেরিয়ে আসে। তারা তিনজন ভেতরে চলে যায়। রহিত আবহাওয়া দেখে বলল,

-“আবহাওয়াটা খুব খারাপ দুলাভাই। আপনি বরং আজ রাতটা আমাদের এখানেই থেকে যান।”

আধার সিট বেল্ট খুলতে খুলতে বলল, -“উঁহু, সমস্যা নেই রহিত। আমি যেতে পারব।”

তবুও রহিত অনেকবার বলল থেকে যেতে। কিন্তু আধার এক কথায় অনড় ছিল। তাই হাল ছেড়ে রহিত বিদায় নিয়ে সাবধানে যেতে বলে চলে যায়। আধার ড্রাইভিং সিটে বসে দু’হাতে ভেজা চুলগুলো ঝাড়ল। চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিতে চেয়েও কিছু একটা অনুভব করে দিল না। পাশের জানালার কাঁচ নামাতেই দেখতে পেল—বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা এক অতিব সুন্দরী রমণীকে।

-“কী চাই?”

-“ভেতরে আসুন।”

-“উঁহু যাবো না।”

-“কেন?”

-“কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই আমি।”

আলোর চোয়াল শক্ত হলো। রেগেমেগে তেড়ে এসে খেঁকিয়ে বলল,

-“কী চাচ্ছেন আপনি হ্যাঁ? এত ঝড়ঝাপটার মধ্যে গাড়ি চালিয়ে এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে যেতে? নাকি উপরে যেতে হুহ্?”

-“হাসপাতালে যাই কিংবা আকাশে! এতে আপনার কী সমস্যা??”

আলো দাঁতে দাঁত পিষলো। মানুষটা তো ঠিকই বলেছে। তার কী এতে? সে কেন এত ভাবছে মানুষটাকে নিয়ে? কই তাকে নিয়ে তো মানুষটা কিছু ভাবে না। তাহলে কেন সে বারবার এই মানুষটাকে নিয়ে ভাবে? কেনোওও?

কোনো জবাব পেল না আলো। শুধু জানে এই খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে মানুষটার যাওয়া একদম ঠিক হবে না। তারা যখন ফিরছিল তখনই গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ছিল গাড়ির ছাঁদে! রহিত ভাইয়া অনেক কষ্টে ড্রাইভ করে নিয়ে এসেছে। আর মানুষটা কিনা এর মধ্যেই বাড়িতে ফিরতে চাচ্ছে। এখান থেকে খান বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় তিন-চারটে বেজে যাবে। তারওপর রাস্তা কোনোভাবে ব্লক থাকলেই মাঝপথে আঁটকা পড়বে। অথচ মানুষটা এখনো নিজের ইগোর ড্রাম নিয়ে বসে আছে।

আলো জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল, -“দেখুন আ…!”

-“যা দেখছি এতেই এনাফ! এর বেশি কিছু আর দেখতে চাই না।”

মানুষটার এমন কথা শুনে ও নজর খেয়াল করে আলো ভ্রু কুঁচকে নিজের দিকে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে তো ভুলেই গেছিল আজ সাদা পরেছে৷ বৃষ্টিতে ভেজার ফলে শরীরের বেশির ভাগই ফর্সা ত্বক দৃশ্যমান। মূহুর্তেই লজ্জায় লাল, নীল, হলুদ হয়ে গেল আলো। সে চট করে পিছনে ফিরে ওড়না টেনেটুনে শরীর ভালো করে ঢেকে নিল। মনে মনে অসভ্য লোকটাকে ইচ্ছে মতো বকাবকি করতেও ভুললো না।

-“ভেতরে যাও।”

-“আপনিও আসুন।”

আধার চোখমুখ কুঁচকে ফেললো। এই বাচাল মেয়েটা তার কথা শুনে না কেন?

সে কিছু না বলে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল। সোজা পথ ধরে চলে যাওয়ার সময় সাইট মিনারে নজর আটকালো। আলো বাহিরে এসে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার চলন্ত গাড়িটার দিকেই নিবদ্ধ!

কালো রঙের গাড়িটা চোখের সামনে থেকে আড়াল হতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আলো। একটা রাতের-ই তো ব্যাপার ছিল! থাকলে কী এমন ক্ষতি হত মানুষটার? সে কী খুব বেশি কিছু আবদার করে ফেলেছে? যেটা পূরণ করতে হিমশিম খেত হত?

বিকট শব্দ তুলে বাজ পড়তেই আলোর ভেজা শরীর কেঁপে উঠলো। তড়িঘড়ি করে পিছনে ফিরে সামনে পা বাড়াতেই ধপাস করে পিছলে পড়ল। এতে হতবাক হয়ে যায় মেয়েটা। পর মূহুর্তে চোখমুখ কুঁচকে কোমর চেপে ধরে কাদামাটিকে বকাবকি করল। দু’পায়ের জুতা খুলে হাত নিয়ে আস্তে-ধীরে উঠে দাঁড়ায়। ভাগ্যিস মানুষটা চলে যাওয়ার পরই আছাড় খেয়েছে, নয়তো আজও তার মানসম্মান চলে যেত অসভ্য লোকটার সামনে।

তার ভাবনার মাঝেই হুট করে এক জোড়া তীব্র লাইটের হলদেটে আলো এসে পড়ল তার সর্বাঙ্গ জুড়ে। আলো চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। অপ্রত্যাশিত কিছু দেখেও নড়ল না। বরং বিস্ময়ে চেয়েই রইল।

মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে গাড়িটা ভেতরে চলে যায়। তারপর বেরিয়ে এল স্যুটবুট পরিহিত একজন যুবক। ততক্ষণে আলোও গুটিগুটি পায়ে ভেতরে এসেছে। আধার একপলক মেয়েটাকে দেখে নিয়ে গায়ের কোট খুলে বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

-“আশা করছি আমার কোট নিতে তোমার কোনো অসুবিধা নেই।”

আলো চুপচাপ কোট নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিল। আধার আর কথা না বাড়িয়ে সামনে চলতে থাকল। আলো কিছুক্ষণ থম মে’রে দাঁড়িয়ে থেকে সেও পিছু পিছু ছুটল।

—————————————
অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে মেয়ে জামাইকে এত রাতে দেখে বাড়ির সবাই চমকে ওঠে। পর মূহুর্তে জানতে পারে, রহিতদের ড্রপ করতে এসে ঝড়বৃষ্টির কারণে আটকে পড়েছে। সবাই এতে কিছুই বলে না, বরং নতুন জামাইকে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অতিথি আপ্যায়নের জন্য।

রাতের খাবার খেয়ে একটু হাটাহাটি করে রুমে এল আধার। রুমটা খুব বেশি বড় না। তবে খুব সুন্দর করে পরিপাটি করা এবং সবকিছু গুছিয়ে রাখা। একপাশে বই ভর্তি বুকশেলফ।
আলো ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে শুয়েছে। কারণ তার বেড সিঙ্গেল! আর লম্বা সোফাও নেই ভেতরে। তাই সে নিচেই শুয়েছে। আধার ফ্রেশ হয়ে এসে রুমের লাইট নিভিয়ে ড্রিম লাইট জ্বা’লিয়ে দিল। তারপর বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে থেকে আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকায়।

-“কিছু কথা ছিল।”

আলো চাদরের নিচ থেকে মাথা বের করে সোজা হয়ে বলল, -“জানি কী বলবেন। ডিভোর্সের কথা তাই তো?”

আধারের কপাল কুঁচকে গেল। আলো পুনরায় বলল,

-“চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো। আপনি শুধু কাগজটা পাঠিয়ে দিয়েন।”

-“এখানে ডিভোর্সের কথা কেন উঠছে?”

-“কারণ আপনি চান আমাকে ডিভোর্স দিতে।”

-“শুধু আমি-ই?”

আলো কিছুটা সময় নিয়ে বলল, -“উঁহু, আমিও।”

আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে জানতে চাইল, -“তুমি কী সত্যিই ডিভোর্স চাও?”

আলো কি জবাব দিবে বুঝতে পারল না। কারণ সে এখন চায় না ডিভোর্স হোক তাদের মধ্যে। সে তো ওই ছোট্ট সংসারটা করতে চায়। কিন্তু….কিন্তু এই মানুষটা যে তাকে চায় না। তাহলে সে কীভাবে একা সংসার সামলাবে? যেখানে নেই কোনো ভালোবাসা, বিশ্বাস, ভরসা, সেখানে আদৌ কোনো সংসার টিকে? উঁহু, মোটেও না। আলো জোরে শ্বাস ছেড়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“হ্যাঁ!”

-“ঠিক আছে।”

অতঃপর রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা ছেয়ে গেল। আধার দু-চোখ বুঁজে একসময় সমস্ত নীরবতা ভেঙে শান্ত গলায় জানতে চাইল,

-“ভালোবাসার মানুষ থাকা সত্ত্বেও কেন এই বিয়ে করলে?”

আলোর ভ্রু কুঁচকে গেল। সে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,

-“ভালোবাসার মানুষ যদি থাকত তাহলে আর আপনাকে বিয়ে করতাম না। আর যাইহোক, বেইমান নই আমি। ভালো না বাসলেও ভালোবাসার কদর করতে জানি।”

আধার চট করে চোখ মেলে তাকায়। কৌতূহল কণ্ঠে শুধায়,

-“ওইদিন ফুল কে পাঠিয়েছিল?”

-“কে আবার? আমার বোন ছায়া পাঠিয়েছে। ও জানে তার আপু ঠিক কতটা ফুল পছন্দ করে। আর ও মাঝেমধ্যেই আমাকে সারপ্রাইজ দেয়। শুধু ও না, আমার খচ্চর বন্ধুমহলের সদস্যরাও। তবে তারা এখনো জানে না আপনি আমার স্বামী। নাহলে এতদিনে আপনাদের বাড়িতেও হামলা দিত।”

আধার ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবতে লাগল। পরক্ষণে বলল, -“তারমানে বলতে চাচ্ছো তুমি কখনো প্রেম করোনি, তাই তো?”

আলো চোখ দুটো বুজে ঘুমু ঘুমু কণ্ঠে বিরবির করে বলল,

-“আমি যদি প্রেম করতাম, তাহলে কখনোই ভালোবাসার মানুষ বর্তিত অন্য কাউকে বিয়ে করতাম না। কিন্তু আপনি হঠাৎ করে আমার প্রেমকাহিনী নিয়ে পড়লেন কেন বলুন তো?”

-“উঁহু, কিছু না। ঘুমাও!”

-“আপনি কী প্রেম করে ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা হয়ে আছেন স্যার?”

-“প্রেম কিংবা ভালোবাসা—এসবের কোনোটাতেই বিশ্বাসী নই আমি। এগুলো কেবল ধ্বংস করতেই জানে। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসের নাম হলো এই ‘ভালোবাসা’ নামক অসুখ। যার এক রূপ সুখ হলেও দ্বিতীয় রূপটা চরম অভিশাপ। ​একটা জলজ্যান্ত হাসিখুশি মানুষকে কীভাবে নিমিষেই জীবন্ত লা’শে পরিণত করা যায়, সেটা এই ভালোবাসার আগুনকে না দেখলে জানতামই না! জীবনে আর যাই করো, কখনো কাউকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে যেয়ো না। নয়তো এই প্রেমের দহনে একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে তুমিসহ, তোমার পুরো অস্তিত্ব!”

আলো মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনে প্রতিত্তোরে বলল,

-“ভালোবাসা কোনো অভিশাপ নয় স্যার, বরং খুব সুন্দর। এটা যেমন কাউকে মে’রে ফেলতে পারে, ঠিক তেমনি কাউকে দিতে পারে নতুন জীবন। সবকিছুরই ভালো-মন্দ দুটো দিক থাকে। এক জীবনে যদি সবকিছু পেয়েই যাই, তবে আর কিসের আফসোস থাকবে? ​কিছু মানুষ অতি সুখে নিজের সৃষ্টিকর্তাকেই ভুলে বসে, অথচ বিপদ এলে সর্বপ্রথম তাঁকেই স্মরণ করি আমরা। জীবন মানেই তো সুখ-দুঃখের মিশেল, স্যার। হাজারো সুখের মাঝেও কিছুটা বেদনা থাকা দরকার—যা আমাদের সবসময় না-পাওয়ার আফসোসটা মনে করিয়ে দেবে। ​আই উইশ…আপনার মরুভূমির ন্যায় রুক্ষ জীবনেও কোনো একদিন বৃষ্টির শীতল ধারার মতো প্রশান্তির প্রেম নেমে আসুক। সেদিন আপনি বুঝবেন, আসল ভালোবাসার মানে কী এবং এর স্বাদ কেমন!”

#চলবে