#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_০৯
কয়েকদিন পরের কথা—
আজ শুক্রবার হওয়ায় সকলে বাড়িতেই রয়েছে। আলো খুব ভোরে উঠে নামাজ আদায় করে রুম থেকে বেরিয়েছে। তারপর সবার জন্য চা থেকে শুরু করে সকালে নাস্তাটাও বানিয়ে নেয়। মাঝেমধ্যে হালকা পাতলা ছ্যাকাও খায়। তবে সে পাত্তা দেয় না। আজকাল রান্না করতে ভালোই লাগে। যখন দেখে সবাই তৃপ্তি সহকারে তার হাতের রান্নাগুলো খাচ্ছে, তখন মনে হয় সব কষ্ট সার্থক হয়েছে।
আলো গুনগুন করতে করতে শাশুড়ী মা ও দাদাজানকে চা, বিস্কুট দিয়ে এসে এক কাপ চা নিয়ে দোতলায় উঠে গেল। উদ্দেশ্য স্যার নামক স্বামীকে চা দেওয়ার। আগেরবার এই চা দেওয়ার অভিজ্ঞতা মোটেও ভালো ছিল না। আর আজ সে কোনোরকম অঘটন ঘটাতে চাচ্ছে না। তাই খুব সাবধানে ও সর্তকতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওই যে কথায় আছে না? যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। ঠিক তেমনই তার সাথেও কিছু একটা ঘটল।
-“ইউউউ ষ্টুপিড!!”
স্যারের বাজখাঁই গলার ধমকে কেঁপে উঠলো আলো। একই সঙ্গে পেট জ্বলায় চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। সে হাজারবার যদি চায়, কোনো আকাম-কুকাম করবে না। কিন্তু বাজে পরিস্থিতি তার পিছু ছাড়ে না। সে বুঝি এসব অঘটন ঘটানোর জনই পয়দা হয়েছে। এই তো দিব্যি চা নিয়ে আসতেছিল। রুমের দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতে না রাখতেই একখানা শক্তপোক্ত পুরুষালী বুকের সাথে ধাক্কা খেল। ফলস্বরূপ হাতে থাকা চায়ের কাপ-টাও উল্টে পড়ে যায়। তবে এবার সেটা স্যারের গায়ে নয়, বরং তার-ই পেটের ওপর পড়েছে।
-“এ্যাই? তুমি কি চোখে কম দেখো? নাকি ব্রেনের সাথে চোখদুটোও গিলে খেয়ে নিয়েছো হুহ্?”
আলো প্রতিত্তোরে কিছু না বলে মাথা নিচু করে নিল। আধার দাঁতে দাঁত পিষে রাগ কন্ট্রোল করে মেয়েটার হাতের বাহু চেপে ধরে হনহনিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। আলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে ঝর্ণার নিচে দাঁড় করিয়ে পানি ছেড়ে দিল। এতে মেয়েটা আহাম্মক হয়ে যায়। সাত সকালে এমন ঠান্ডা পানিতে ভিজে হকচকিয়ে উঠে সরে আসতে চাইল। কিন্তু আধার বামহাতে তার কপাল চেপে ধরে আবারো পানির নিচে দাঁড় করিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“একদম নড়াচড়া করবে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।”
আলো আশ্চর্য না হয়ে পারল না। এইভাবে সক্কাল সক্কাল তাকে জোরজবরদস্তি করিয়ে গোসল করানোর মানেটা কী? এইদিকে ঠান্ডায় তার শরীর জমে যাওয়ার উপক্রম।
-“উমম…স্যার! শ-শীত করছে তো। ছাড়ুন, ছাড়ুন আমায়।”
আধার কিছুটা সময় নিয়ে নব বন্ধ করে দিল। তারপর বেরিয়ে যেতে যেতে বলে উঠলো,
-“নেক্টস টাইম যেন আমার জন্য চা নিয়ে আসতে না দেখি। নয়তো গরম চায়ের ড্রামে তোমাকে চুবানি দিবো। মাইন্ড ইট মিস. কালো!”
আলোর চোয়াল ঝুলে পড়ল। সে ভালো কিছু করতে চাইলেও উল্টোটা হয়। তার পুরো জীবনটাই লস প্রজেক্ট। আলো রাগে, দুঃখে পরণের ভেজা পোশাক টেনেটুনে খুলে তোয়ালে জড়িয়ে নিল। তারপর দরজা সামান্য খুলে মাথা বের করে উঁকি দিল। ওই তো বজ্জাত ব্যাটা দাঁড়িয়ে থেকে ফোনে কথা বলছে।
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে স্যারের অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য খুকখুক করে কাশি দিল। আধার ঘাড় ঘুরিয়ে বিরক্তিতে বলল, -“কী চাই?”
-“জামাই!”
-“হোয়াট??”
-“ইয়ে না মানে….জামা! জামা।”
আধার ফোনে কথা বলতে বলতেই আলমারি খুলে আলোর পোশাক বের করল। তখনই অসাবধানতার জন্য কাপড়ের ভাজ থেকে কিছু একটা নিচে পড়ে গেল। আধার ভেবেছে রুমাল পড়েছে। তাই সে না দেখে ঝুঁকে বস্তুটা হাতে তুলে নিল। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোখদুটো রসগোল্লার মতো হয়ে যায়। ওইদিকে এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখা মাত্রই আলো চট করে মাথা ভিতরে ঢুকিয়ে নেওয়ার সময় ধরাম করে বারি খেল দরজার সাথে। তবুও মেয়েটা লজ্জায় সব ব্যথা ভুলে ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। ইশশ্! কী লজ্জার ব্যাপার। মানুষটার হাতে কি-না শেষমেশ তার অন্তর্বাস…
প্রায় অনেকক্ষণ যাবত ওয়াশরুমের ভেতর ঘামটি মে’রে আছে আলো। এপর্যায়ে এসে আস্তে করে দরজা খুলে মাথা বের করে উঁকি দেয়। আশেপাশে কোথাও স্যারকে না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে চটপট বেরিয়ে এল। বিছানার ওপর রাখা পোশাকগুলো নিয়ে জলদি ছুটল ওয়াশরুমে।
দুপুর হতে চলেছে। আধার বাহির থেকে ফিরে গোসল করে একটা সাদা পাঞ্জাবি পরেছে জুম্মার নামাজের জন্য। প্রতি সপ্তাহে দুই দাদা-নাতি সেম পাঞ্জাবি পরে মসজিদে যায়। আজও সেটার ব্যর্তিক্রম হলো না। পাঞ্জাবির দু’হাতা বাহুতে গুটিয়ে রাখতে রাখতে সিঁড়ি বেয়ে নামছে আধার। ভেজা চুলগুলো সুন্দর করে সেট করে রাখা। রক্তিম নিচের ঠোঁট কামড়ে, ভ্রু কুঁচকে নিজের কাজ করতে ব্যস্ত। অন্যদিকে, কেউ একজন যে তার দিকে অপলক নয়নে চেয়ে আছে সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।
-“এ্যাই মেয়ে? এটা কি করছো তুমি? সব পানি তো নিচে পড়ে যাচ্ছে। তোমার ধ্যান কোথাই??”
তাহমিনা খান চিল্লিয়ে উঠলেন। এতে ভরকে গেল আলো। চটজলদি নজর সামনে থেকে সরিয়ে এনে নিজের হাতের দিকে তাকায়। সে তো ডাইনিংয়ে এসে পানি খাওয়ার জন্য গ্লাসে পানি ঢালছিল। কিন্তু জগের পানি গ্লাসে পড়ার বদলে টেবিলে ও ফ্লোরে পড়েছে। আলো দাঁত দিয়ে জিহ্বা কেটে দ্রুত জগ নামিয়ে আমতাআমতা করে বলল,
-“আসলে মা খেয়াল করিনি। আমি খুবই দুঃখিত। এখনই জায়গাটা পরিষ্কার করে দিচ্ছি!”
একথা বলে আলো তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে ছুটতে চাইলে খেয়াল করল, শেফালি চাচি কাপড় ও ওয়াইপার নিয়ে এসে জায়গাটা পরিষ্কার করে দিচ্ছে। এটা দেখে আলো মনে মনে হাসলো। এই মানুষটা তাকে সবসময় সাহায্য করে এসেছে এবং করছেও। সে সত্যিই এই মানুষটার প্রতি মন থেকে কৃতজ্ঞ, তাকে ভালোবাসা ও আগলে রাখার জন্য!
-“তা আজকাল আমার নাতবউয়ের মনটা কোথায় থাকছে হুম? নিশ্চয়ই বরের কাছে?”
দাদাজানের কথা শুনে আলো আড়চোখে দূরে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“তুমি ভুল ভাবছো দাদাজান। তোমার বেরসিক নাতির কাছে আমার মনটা রাখতে বয়েই গেছে। উনার কাছে পারলে আমি আমার মাথার একটা চুলও রাখব না। নয়তো দেখা যাবে, তোমার অতি ভদ্র নাতি চুলগুলোও পু’ড়িয়ে ফেলেছে!”
সোবহান খান শব্দ করে হেঁসে উঠলেন। আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলল, -“তোমার হাসা শেষ হলে এখন যাওয়া যাক দাদাজান।”
সোবহান খান মাথা নাড়িয়ে বলল, -“হুম…চলো!”
অতঃপর দুই দাদা-নাতি বেরিয়ে গেল। বাড়ির পাশে মসজিদ হওয়ায় গাড়ি নিয়ে যেতে হয় না। গল্প করতে করতে হেঁটেই চলে যাওয়া যায়। সোবহান খান হাঁটার সময় কিছু একটা অনুভব করে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। তিনি ঠিকই ধরেছিলেন! আলো গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে।
-“আজও কিন্তু জিলাপি নিয়ে এসো দাদাজান।”
আলো কাছে এসে ফিসফিসিয়ে কথাটি বলে। সেটা শুনে সোবহান খান কিছু একটা ভেবে বললেন,
-“আমার তো বয়স হচ্ছে৷ এই বয়সে জিলাপি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে পা জোড়া টনটন করে। তুমি বরং আজ তোমার স্বামীকে বলো। দেখো কি বলে!”
আলো ঠোঁট উল্টালো। তবুও সাহস করে এগিয়ে গেল মানুষটার দিকে।
-“স্যার?”
আলোর ডাকে পাশে ফিরে তাকায় আধার। বলল,
-“কী চাই?”
-“জিলাপি।”
-“মানেহ?”
-“মানে আসার সময় মসজিদ থেকে জিলাপি নিয়ে আসবেন আমার জন্য।”
মেয়েটার এহেন কথা শুনে আধার নাকমুখ কুঁচকে বলল,
-“হোয়াট ননসেন্স! আমি কি-না এখন তোমার জন্য মসজিদে লাইন ধরে জিলাপি নিয়ে আসব? সিরিয়াসলি? এটা তুমি ভাবলে কীভাবে?”
-“এমন ভাব করছেন যেন আমি আপনাকে জিলাপির বদলে জুতা চুরি করে নিয়ে আসতে বলেছি।”
-“জুতা কেন? আমি একটা পিঁপড়েও আনব না।”
বলেই আধার সেখান থেকে চলে গেল। আলো অসহায় চোখে দাদাজানের দিকে তাকায়। সোবহান খান এগিয়ে এসে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন,
-“মন খারাপ করো না। আমার বিশ্বাস, ও তোমার জন্য জিলাপি নিয়ে আসবে।”
-“আর যদি না নিয়ে আসে তাহলে?”
-“তাহলে আমি আনব।”
আলো মুচকি হেঁসে বলল, -“তোমাকে কষ্ট করতে হবে না দাদাজান। আমি খাব না! নিজের বাড়িতে যখন যাব, তখন বাবা, চাচা, ভাইয়াকে বললেই অনেকগুলো নিয়ে আসবে। আচ্ছা তুমি এখন যাও! উনি তো রাগ করে তোমাকে রেখেই চলে গেলেন। পাষাণ লোক একটা!”
————————————–
আলো দুপুরের নামাজ পড়ে টেবিলে বসেছে বইখাতা নিয়ে। চারদিন পর ইনকোর্স পরীক্ষা। কম নাম্বার পেলে আবার ওই লোকটা উঠতে বসতে খোটা দিবে। তাই সে আপাতত পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করছে। পড়ার একফাঁকে খেয়াল করল—তার সামনে পাঁচটা ঠোঙা রাখা হয়েছে। মেয়েটা চোখ বড়বড় করে মাথা তুলে স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। অবিশ্বাস্য সুরে আওরাল,
-“আ-আপনি! আপনি আমার জন্য জিলাপি নিয়ে এসেছেন? তাও এতগুলো?”
আধার কিছু না বলে সরে গেল। পরণের পাঞ্জাবির বোতাম খোলার সময় শুনতে পেল,
-“মসজিদের নাম করে আবার কোনো দোকান থেকে কিনে নিয়ে আসেননি তো?”
এবারেও নিরুত্তোর আধার। সে মূলত নিজের ওপর ভীষণ বিরক্ত। একটা মেয়ের জন্য কি-না আজ আধার খান জিলাপি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল? এটা ভাবতেও অবাক লাগছে তার। কখনো যেটা ছোট বোনের জন্য করেনি, আজ সেটা এই দু’দিনের আসা একটা বাঁচাল মেয়েটার জন্য করেছে। আশ্চর্য!
-“উমম…মজা! আচ্ছা স্যার? আপনাকে এতগুলো জিলাপি কেন দিল?”
আলো কাগজের ঠোঙার ভেতর থেকে ছোট ছোট জিলাপি বের করে, খেতে খেতে জানতে চাইল। আধার পাঞ্জাবি খুলে টিশার্ট ও ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলে উঠলো,
-“আমার সাঙ্গপাঙ্গরা যখন জানতে পারল, আমাদের বাড়িতে নতুন একটা পেটুক ইঁদুর এসেছে। তাই ওদের ভাগেরটাও দিয়ে দিছে!”
-“প্রতি সপ্তাহে এমন করে জিলাপি পেলে ওই ইঁদুরটা মাইন্ড করত না।”
আলোর কথা শুনে আধারের পা জোড়া শ্লথ হয়ে গেল। সে চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। হঠাৎ স্যারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি খেয়াল করে আলো হাসার চেষ্টা করল,
-“হেহেহে মজা করলাম!”
বিকেলের দিকে তাহমিনা খান জানতে পারেন উনার বাবার শরীরটা খারাপ। ইমার্জেন্সিতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খবরটা পেয়ে তাহমিনা খান কোনোমতে ছেলে, শশুরের সাথে ছুটে গিয়েছেন। সোবহান খান সঙ্গে করে আলোকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েটা যেতে রাজি হলো না। কারণ সে খেয়াল করেছিল, তাহমিনা খান চান না তাদের সাথে আলো যাক উনার বাপের বাড়িতে। তাই আলোও নিজের শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে যায় না। শুধু শুধু ঝামেলা বাড়িয়ে কী লাভ? তারচেয়ে বরং সে এখানেই ভালো আছে।
সন্ধ্যা থেকেই নীল আকাশটা আজ মেঘালয়ে ঢাকা। হয়তো বৃষ্টি আসবে। তাই রাতের খাবার হিসেবে খিচুড়ি রান্না করে নিয়েছে আলো। শেফালি চাচি নয়টার দিকে চলে গিয়েছে। মানুষটা এখানে সারাদিন থাকলেও রাতের বেলা নিজ পরিবারের কাছে ফিরে যায়, আবার সকাল সকাল চলে আসে। আলো দাদাজানের থেকে খবর নিয়েছে অসুস্থ মানুষটা এখন কেমন আছে৷ তেমন বড় ধরনের কিছু না, জাস্ট প্রেসার বেড়ে গিয়েছিল। আপাতত উনাকে বাড়িতে নেওয়া হয়েছে এবং সুস্থও আছে। সবটা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেদের খেয়াল রাখতে বলে ফোন রেখে দেয়।
তখন বাজে রাত বারোটা। পুরো নিস্তব্ধ বাড়িতে একা আছে আলো। বাহিরে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভিডিও কলে ছোট বোনের সাথে কথা বলার সময় ছায়া আবদার করে বসল, তার নাচ দেখার। কারণ তারা একসাথে থাকাকালীন প্রায়শই বৃষ্টিতে নৃত্য করেছে। তাদের ফোনের গ্যালারি ভর্তি নাচের ভিডিও দিয়ে। একপর্যায়ে এসে আলো রাজি হয়ে যায়। তারও বহুদিন বৃষ্টিবিলাস করা হয়নি। তারওপর আজ বাড়িটাও একদম ফাঁকা! এই সুযোগে নিজেকে একটু আনন্দ দেওয়ায় যায়। আবার কবে না, কবে বৃষ্টি হবে কে জানে!
আলো ছোট বোনের দেওয়া সুতির, পাতলা আকাশি রঙা শাড়িটা জলদি পড়ে নিলো। তারপর চুলগুলো খোলা অবস্থায় রেখে চোখে গাঢ় করে কাজল, দু’হাতে কাঁচের চুড়ি, কানে দুল পড়ে—হাতে ফোন নিয়ে দৌড়ে ছাঁদে উঠে যায়।
বৃষ্টিতে ভিডিও, ছবি তোলার জন্য ওয়াটারপ্রুফ ফোন নিয়েছিল। ছায়ারটাও ওয়াটারপ্রুফ! তাই আজও কোনো অসুবিধা হলো না বৃষ্টিতে নাচের ভিডিও করার জন্য। আলো দোনলায় ক্যামেরা চালু করে ফোন সেট করে রাখল। সে অলরেডি ভিজে জবজবে হয়ে গেছে।
আলো কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজে নিল। আকাশ চিঁড়ে ঝুম বর্ষণের আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে তার দু’হাতের চুড়ি ও নুপুরের রিনঝিন শব্দ যোগ হলো। একই সাথে সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেদ করে খালি গলায় গুনগুন করে উঠলো,
❝রিমঝিমের ধারাতে চায় মন হারাতে,
রিমঝিমের ধারাতে চায় মন হারাতে—
এই ভালোবাসাতে আমাকে ভাসাতে।
এল মেঘ যে এল ঘিরে,
বৃষ্টি সুরে সুরে সোনায় রাগিণী।
মনে স্বপ্ন এলোমেলো,
এই কি শুরু হলো প্রেমের কাহিনী….(২)❞
গানের সাথে তাল মিলিয়ে চমৎকার ভাবে নাচছে আলো। তার মিষ্টি সুরে আজ প্রকৃতিও সামিল হয়েছে। বৃষ্টির সচ্ছ বিন্দু, বিন্দু জলকণাগুলো তার সর্বাঙ্গ ছুয়ে দিচ্ছে। সে বৃষ্টিবিলাসে এতটাই মগ্ন হয়েছে যে, খেয়ালই করেনি দরজার কাছে কেউ একজন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
~আগে কত বৃষ্টি যে দেখেছি শ্রাবণে,
জাগেনি তো এত আশা, ভালোবাসা এ মনে….।~
আলো দু’হাত মেলে চোখ বুজে মাথা আকাশের দিকে করে ঘুরতে লাগল। অন্যদিকে, আধার এখনো অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে। সে তো একটু আগেই ফিরেছে। তাহমিনা খান এত রাতে তাকে আসতে না দিতে চাইলেও সে চলে এসেছে। কারণ ঐ বাড়িতে তার মনটা কখনোই টিকতে চায় না। শুধুমাত্র আজ দাদাজানের জন্য গিয়েছিল। তারমধ্যে আবহাওয়াটাও খারাপ, আর মেয়েটাও এখানে একা রয়েছে। ভুলবশত যদি কিছু সমস্যার মধ্যে পড়ে তখন কি হবে? যেখানে ওই মেয়েটা মানেই আস্ত একটা মসিবতের গোডাউন! সবসময় কিছু না কিছু অঘটন না ঘটালে পেটের ভাত হজম হয় না। তাই তো একপ্রকার ওই ঝামেলার বস্তার
জন্যই ছুটে এসেছে। হাজার হোক, সে তার বাবাকে কথা দিয়েছে একটু হলেও খেয়াল রাখার চেষ্টা করবে মেয়েটার।
ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে বাড়িতে ঢুকে সোজা দোতলায় উঠে যায় আধার। ভেবেছিল মেয়েটা একা একা ভয় পেয়ে গুটিশুটি মে’রে এক কোণে পড়ে রয়েছে নয়তো ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু রুমে এসে আলোকে দেখতে না পেয়ে কপাল কুঁচকে যায়। বেলকনি, ওয়াশরুম, নিচতলায় ও উপরতলায় খুঁজেও যখন মেয়েটির দেখা পেল না, তখন না চাইতেও বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। কারণ এত রাতে এই মেয়েটা হুট করে গায়েব হয়ে যাবে কোথায়? কোনো বিপদ হয়নি তো আবার!
আধার চিন্তিত হয়ে ঠিক করল, শশুর মশাইকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করবে—ওখানে আলো গিয়েছে কি-না। নেটওয়ার্কের সমস্যা হওয়ার জন্য কল লাগছে না। আধার অধৈর্য্যের মতো পায়চারি করতে করতে হঠাৎই কিছু একটা মনে হতেই সে বড় বড় পা ফেলে ছাঁদের দিকে এগিয়ে গেল।
উদ্দেশ্য ছিল, ছাঁদে এসে যদি মেয়েটাকে না পায় তাহলে সে নিজেই খুঁজতে বের হবে। তারপর কানের নিচে কয়েকটা লাগিয়ে মেয়েটার বাঁদরামি সোজা করে দিবে। কিন্তু এখানে এসে যে এমন কিছু দেখবে সেটা কল্পনারও বাইরে ছিল।
বৃষ্টিতে ভেজা এক নৃত্য প্রদর্শনকারী রমণীকে দেখা মাত্রই হাত থেকে ফোনটা বেখেয়ালে লুটিয়ে পড়ে শক্ত মেঝেতে। এমন অপ্রত্যাশিত দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে, এক মূহুর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে যায় আধার খান…..
#চলবে
#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_১০
আধারের বেহায়া নজর গিয়ে আটকায় রমণীর ভেজা সাদা কোমরের দিকে। শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে মেদহীন পেটের কিছু অংশ। বৃষ্টির পানি মেয়েটার সর্বাঙ্গে ছুয়ে দিচ্ছে, সাথে ভেজা নারীদেহের সৌন্দর্যও কয়েকগুণ ফুটে উঠেছে। বেসামাল প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে গানের ছন্দে নৃত্য করা রমণীকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে আধার খান। নাচের তালে করা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গীমার নিখুঁত কারুকাজ গেঁথে গিয়েছে ওই বিস্ময়কর চাহনিতে! যেখান থেকে চাইলেও অবাধ্য নজর সরিয়ে নিতে পারছে না। বরংচ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
-“স….স্যার আপনি!”
নাচের একপর্যায়ে এসে আলো হঠাৎই থেমে যায়। কারণ তার ভেজা আঁখি জোড়া অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে নিবদ্ধ হয়! এতেই মেয়েটা ভুত দেখার মতো চমকে ওঠে।
-“ইয়েস আই অ্যাম!”
ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দেয় আধার। আলো কোমর থেকে গুঁজে রাখা আঁচল খুলে ঠিকঠাক হয়ে এগিয়ে এসে জানতে চাইল,
-“কখন এলেন? আজ তো আপনার ওখানে থাকার কথা ছিল! তাহলে?”
-“তোমাকে কৈফিয়ত দিতে আমি বাধ্য নই!”
আলো ভ্রু কুঁচকে তাকায়। আধার একটু সময় নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“রাত-বিরেতে এমন পেত্নীর মতো নাচছিলে কেন? এটা কোনো ঝোপঝাড় নয়! এতই যখন নাচার শখ, তাহলে বাঁশবাগানে গিয়ে নৃত্য করো। তখন পেলেও পেতে পারো নিজের মতো কিছু সাঙ্গপাঙ্গ!”
আলো দু’হাত কোমরে রেখে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“এ্যাই! আমাকে দেখে আপনার পেত্নী মনে হয়?”
-“পেত্নী না হলেও শাঁকচুন্নি মনে হয়।”
-“আমি শাঁকচুন্নি হলে এতদিনে আপনার ঘাড় মটকিয়ে কালা ভুনা করে খেতাম।”
-“রাক্ষসীরা খাই খাই ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। উমমম….আকাম-কুকাম করতেও বেশ পারদর্শিতা!”
রাগে আলোর শরীর জ্বলে উঠলো। তার রাগান্বিত লালচে চেহারা দেখে আনমনে হাসলো আধার। পরক্ষণে নিচ থেকে ফোন তুলে চলে যেতে যেতে বলে উঠলো,
-“ভেজা শরীরে একদম রুমে আসবেন না মিস. কালো!”
আলো একহাতে নিজের কপাল চেপে ধরল। এই লোকটার সমস্যা কী? একেই তো তার সুন্দর নামটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। তারওপর তুমি থেকে আবার হুটহাট আপনিতে চলে যায়। এই লোকটা ভবিষ্যতে গিরগিটিকেও হার মানাবে ড্যাম শিওর!
দোলনা থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে শাড়ির কুঁচি ধরে ছুটে যায় আলো। অনেকটাই রাত হয়ে এসেছে। এখনো যদি এই অবস্থায় থাকে, তাহলে সকালে নির্ঘাত জ্বর আসবে। তাই সে স্যারের নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে জলদি রুমের ভেতর ঢুকে গেল।
-“আমার কথা না শোনার কারণ?”
আধার ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে একটা একটা করে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে গম্ভীর মুখে জানতে চাইল। আলো বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
-“কেন শুনব আপনার কথা হুহ্? ভুলে যাবেন না, এটা শুধু আপনার একার রুম নয়। আমারো রুম!”
-“বুঝলাম! এখন চেঞ্জ করে এসে ফ্লোর পরিষ্কার করো।”
-“কেন?”
-“অযথা শুকনো কার্পেট, ফ্লোর ভিজিয়ে দিলে। এইজন্যই তখন রুমে আসতে বারণ করেছিলাম!”
আলোর চোয়াল ঝুলে পড়ল। ফ্লোর ভিজে যাওয়ার ভয়ে কি-না সে সারারাত এইভাবে থাকত? এই লোকটার বুকের ভেতর আদৌ হৃদয় আছে তো? নাকি সেটাও নেই। আসলেই মানুষটার মধ্যে একটুও মায়াদয়া নেই। যদি থাকত, তাহলে এমন কথা বলার আগে দু’বার ভেবে নিত। আলো ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের পোশাক নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমের ভেতর চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে এসে ফ্লোর মুছে দিল। আধারও ফ্রেশ হয়ে আসে।
-“ডিনার করেছেন?”
আলো দাঁড়িয়ে থেকে ভেজা চুলগুলো টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল। আধার একপলক তাকিয়ে ছোট্ট করে বলল, -“উঁহু!”
-“ডাইনিংয়ে আসুন! আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি।”
-“খিদে নেই।”
আলো বাক্যটা শুনেও না শোনার ভান করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর খাবারের প্লেট নিয়ে ভেতরে এল। আধার সোফায় বসে থেকে ল্যাপটপে একটা ইমেইল চেক করছিল। তখন আলো সামনে থাকা কাঁচের টি-টেবিলের ওপর প্লেট রেখে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“কাজ শেষ হলে খেয়ে নিবেন। নয়তো খাবার নষ্ট হবে!”
-“বললাম তো খিদে নেই। তবুও আমার কথা শুনো না কেন?”
-“কারণ আমি আপনার সব কথা শুনতে বাধ্য নই।”
একথা বলে আলো চুপচাপ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। আধার কিছুক্ষণ থম মে’রে বসে থেকে নিজের কাজে মন দিল। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। খাবারের সুঘ্রাণ এসে বারবার নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আধার একপর্যায়ে হাল ছেড়ে দিয়ে কোল থেকে ল্যাপটপ সরিয়ে পাশে রাখল। উঠে গিয়ে ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে পানির গ্লাস নিয়ে বসে পড়ল। উপর থেকে প্লেট সরাতেই দেখতে পেল—ধোঁয়া ওঠা গরম ভুনাখিচুড়ির সাথে বেগুন ভাজা, শুটকি ভর্তা, মুরগীর কষা মাংস ও দুটো ইলিশ মাছ ভাজা!
-“তুমি খেয়েছো?”
আধার স্যারের কথা শুনে আলো কম্ফোর্টারের ভেতর থেকে মাথা বের করে বলল, -“না খেলে কি খাইয়ে দিবেন?”
আধার কপাল কুঁচকে তাকায়। আলো ফিক করে হেঁসে দিয়ে বলল, -“মজা করছি। আমি আপনার আগেই খেয়ে নিয়েছি। এখন আপনি খেয়ে আমাকে উদ্ধার করুন!”
আধার আর কিছু না বলে চুপচাপ খেতে শুরু করল। আলো মুচকি হেঁসে জানতে চাইল, -“মজা হয়েছে?”
আধার খেতে খেতে ছোট্ট করে জবাব দিল, -“হুম।”
আলো আবারো হাসলো। তবে কিছু না বলে চোখদুটো বন্ধ করে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল!
খুব ভোরবেলায় ফোনের ককর্শ আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল আধারের। চরম বিরক্তিতে বালিশের মাঝ থেকে মুখ তুলে আশেপাশে তাকায়! আলো তার পিঠের ওপর দুই ঠ্যাং তুলে রেখে উল্টো দিক হয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এতে একটুও অবাক হয় না আধার। কারণ এখন সে এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
আধার ঘুমু ঘুমু চোখে বালিশের নিচ থেকে বেজে চলা ফোনটা বের করল। সে ভেবেছিল নিজের ফোন, কিন্তু এখন দেখছে এটা আলোর ফোন। আধার ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। একটি নাম্বার ভেসে উঠেছে, কিন্তু সেভ করা নেই। আধার কল রিসিভ না করে রেখে দিল। তার আবার অন্যের ফোন ধরার কোনো অভ্যেস নেই। কিন্তু বারবার কল আসাতে বিরক্তও বটে। ওইদিকে আলোও একটু নড়েচড়ে উঠে ঘুমিয়ে গেল। তার অর্ধেক শরীরই বিছানার বাহিরে ঝুলছে৷ আধার তপ্ত শ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে টেনে নিয়ে এসে ঠিক করে শুয়ে দিল। এই মেয়েটা আবার পুরো বিছানাতে ঘূর্ণিপাকের মতো ঘুরে বেড়ায়। মুখের সাথে হাত-পাও একদম লাগামছাড়া। তার এসব ভাবনার মাঝে আবারো ফোনটা বেজে উঠলো। আধার ভাবল—হয়তো জরুরী ফোনকল। নাহলে কি এই অসময়ে এতবার কেউ কল দেয়? তাই সে সহসাই কলটা রিসিভ করে কানে ধরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই শুনতে পেল, এক পুরুষালী কণ্ঠস্বরে বলা কিছু অপ্রত্যাশিত বাক্য—
-“হাই সুইটহার্ট৷ কেমন আছো? নিশ্চয়ই খুব ভালো আছো? নাহলে কি আমাকে এত সহজে ভুলে যেতে? উমমম…তুমি নতুন কাউকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেলেও কিন্তু আমি আজও তোমায় ভুলতে পারিনি। বিশেষ করে আমাদের একসঙ্গে কাটানো প্রতিটা মূহুর্তগুলো তোমাকে ভুলতে দেয় না। তাই তো আজ আবারো তোমাকে ডিস্টার্ব করলাম। তুমি কিছু মনে করো না ওকে! আমি শুধু তোমার ওই মিষ্টি কণ্ঠস্বরটা একটু হলেও শুনতে চাই। আর এর জন্য আমি বেহায়া, নির্লজ্জ সবকিছু হতে রাজি। এই? তুমি চুপ করে আছো কেন? কথা বলো রিক্তা!”
এক মূহুর্তের জন্য আধার স্তব্ধ হয়ে যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে অবিশ্বাস চোখে ঘুমন্ত মেয়েটার মাসুম চেহারার দিকে তাকায়। ওইদিকে ফোনের ওইপাশে থাকা ছেলেটা কি বলছে না বলছে সেদিকে তার কোনো হুঁশ-জ্ঞান নেই। তার মাথায় শুধু এখন একটা কথায় ঘুরপাক খাচ্ছে—মেয়েটার এক্স বয়ফ্রেন্ড রয়েছে!
———————————–
ভোরের দিকে আলোর ঘুম ভাঙে। প্রতিদিন এই সময়টাতে উঠে অভ্যেস হয়ে গেছে। সে আড়মোড়া ভেঙে হামি তুলে উঠে বসে পাশে তাকায়। আজ আধার স্যারকে নিজের পাশে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে না পেয়ে আলোর মন কিছুটা আপসেট হলো। খোলা চুলগুলো হাত খোপা করে ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে। দশমিনিট পর চেঞ্জ করে এসে চার রাকাত নামাজ আদায় করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সাত সকালে কলিং বেলের শব্দ পেয়ে আলোর কপাল কুঁচকে গেল। ভাবল—হয়তো শেফালি চাচি এসেছেন। কারণ উনি এখনো আসেন নি! তাই জলদি ভেজা হাত ওড়নায় মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে দরজা খুলে দিল এবং ভরকে গেল। কারণ একজন ডেলিভারি বয় একটি বিশাল ফুলের বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাবে তখনই ছেলেটা নিজেই মুখ খুললো!
-“আলো রহমান রিক্তার নামে এই পার্সেলটি এসেছে। আপনি যদি কাইন্ডলি উনাকে একটু ডেকে দিতেন!”
আলোর কপাল কুঁচকে গেল। তার নামে পার্সেল এসেছে মানে? সে তো কিছু অর্ডার করেনি। তাহলে? নিজের মনের ভেতর চলা প্রশ্নগুলোকে দমন করতে না পেরে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি-ই আলো রহমান রিক্তা। কিন্তু আমি তো এই বুকেটা অর্ডার করিনি।”
-“আপনার কোনো একজন শুভাকাঙ্ক্ষী সারপ্রাইজ গিফট দিয়েছে ম্যাম!”
আলো ঠোঁট কামড়ে ভাবতে লাগল তার আবার শুভাকাঙ্ক্ষী কে? বাবার বাড়িতে থাকলে সে পাক্কা জানতে পারত এটা তার বন্ধুমহলের কারোর কাজ। কারণ তারা মাঝেমধ্যেই হুটহাট কিছু না কিছু সারপ্রাইজ দিত। কিন্তু এখন তো সেটাও সম্ভব নয়! তার শশুর বাড়ির ঠিকানা এখনো বন্ধুমহলের কেউ-ই জানে না। তাহলে এই গিফটা কে পাঠাতে পারে? আলো ভালো করে ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে পর মূহুর্তে মুচকি হাসলো। তার প্রিয় ফুল হচ্ছে দোলনচাঁপা! আর এইগুলোই আজ এসেছে। এটা নিশ্চয়ই তার পাগল বোনটার কাজ হবে। মেয়েটা কলেজ থেকে ফেরার পথে দোলনচাঁপা ফুল দেখলেই তার জন্য একটা হলেও নিয়ে আসবে। এমনটা ছোট বেলা থেকেই করে ছায়া! এখন হয়তো তারা দু’বোনে একে অপরের থেকে দূরে আসে, তবে তাদের ভালোবাসা আজও আগের মতোই রয়ে গেছে।
আলো আর কিছু না বলে হাসিমুখে ফুলের বুকেটা নিয়ে নিলো। সকাল সকাল সারপ্রাইজ গিফট ওরফে প্রিয় ফুল পেয়ে মূহুর্তেই মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল। গতকাল রাতে মেয়েটার কথা রাখার জন্য হয়তো আজ এইগুলো পাঠিয়েছে বড় আপুকে খুশি করার জন্য। ডেলিভারি ম্যান চলে যেতেই আলো বুকেটা দু’হাতে ধরে রুমে নিয়ে গেল।
❝নতুন দিনের নতুন সকালের অনেক শুভেচ্ছা আমার ময়না পাখি। আশা করছি আজকের এই দিনটা আমার কাছে যতটা খুশির, ঠিক তারচেয়ে বেশী তোমার কাছেও। আফটার অল আজকের এই তারিখেই আমরা একে অপরের ভালোবাসায় আঁটকে ছিলাম। তুমি নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি? আমি জানি, তুমি আজও আমাকে ততটাই মিস করো যতটা আগে করতে। কিন্তু তুমি এখন পরিস্থিতির স্বীকার! যাইহোক, হ্যাপি টু ইয়ার লাভ অ্যানিভার্সারি জান। তোমার এই দিনটা সুখের হোক। আই হোপ, আমার তরফ থেকে পাঠানো ছোট্ট গিফটা তোমার খুব পছন্দ হয়েছে!❞
রঙিন কাগজের মাঝে লেখা ছোট্ট চিরকুটটা পড়ে আধারের দুই ভ্রুয়ের মাঝে চারটে ভাজ পড়ল। সে তো গিয়েছিল দাদাজানকে নিয়ে আসতে। তাহমিনা খান আরো কিছুদিন থাকবেন উনার বাপের বাড়িতে। আধার যখন ফিরে এল, তখন দরজার চৌকাঠের কাছে পড়ে থাকা লাল পেপার দেখে থেমে যায়। কৌতূহল বশত ওটা হাতে তুলে নিয়ে ভাজ খুলে একবার নজর বুলিয়ে নেয়। তখনই উপরোক্ত বাক্যগুলো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
-“কিসের কাগজ এইডা দাদুভাই?”
সোবহান খানের কথা শুনে আধার চিরকুটটা প্যান্টের পকেটে রেখে শান্ত গলায় বলল, -“তেমন কিছু না দাদাজান। তুমি এসো!”
সোবহান খান তেমন মাথা না ঘামিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। আধার আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা দোতলায় উঠে গেল। রুমে ঢুকতেই তার পা জোড়া শ্লথ হয়ে যায়।
আলো সোফায় বসে থেকে চোখ বুজে কোলে রাখা দোলনচাঁপার সুবাস নিচ্ছে প্রাণ ভরে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখাও উঁকি দিচ্ছে। মেয়েটা কিছুক্ষণ ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ নিয়ে আলতো করে চোখ মেলে তাকায়। মুচকি হেঁসে নরম হাতে ফুলগুলো ছুঁয়ে দিল। একটা ফুল নিজের কানের পাশেও গুঁজে রেখেছে। আলো একসময় খেয়াল করল আধার স্যার এসেছে। তাই সে উঠে কাছে গিয়ে দু’হাতে ফুলগুলো সামনে মেলিয়ে ধরে জানতে চাইল,
-“ফুলগুলো সুন্দর না স্যার?”
আধার ছোট্ট করে জবাব দিল, -“হু!”
আলো একগাল হেঁসে বলল, -“উমম…দেখতে হবে না কে পাঠিয়েছে।”
-“কে পাঠিয়েছে?”
-“স্পেশাল কেউ। বলব না আপনাকে।”
আলো মুখ ভেংচি কেটে সামনে থেকে সরে গেল। টি-টেবিলের ওপর ফুলদানিতে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। আধার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চুপচাপ আলমারি খুলে নিজের পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। আলো ফুরফুরে মনে চটজলদি সকালের নাস্তা তৈরি করে নিলো। ততক্ষণে শেফালি চাচিও চলে এসেছেন।
-“দাদুভাই? হঠাৎ করে না খেয়ে কোথায় যাচ্ছো? এসো আগে নাস্তা করে নাও।”
আধার স্যুটবুট পড়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তখন ডাইনিং টেবিল থেকে সোবহান খান নাতির উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে। আধার পিছনে ফিরে শান্ত গলায় বলল,
-“বাড়ির খাবার খেতে খেতে বোর হয়ে গেছি দাদাজান। এখব আর ইচ্ছে করে না খেতে। আমি বরং বাহিরে খেয়ে নিবো, তুমি চিন্তা করো না। এখন আসছি!”
নাতির কথা শুনে সোবহান খান থমথমে মুখে নাতবউয়ের দিকে তাকায়। মেয়েটা কেমন করে ফ্যালফ্যাল চোখে মানুষটার গম্ভীর মুখের দিকে চেয়ে আছে। হয়তো একটু আগের বলা অপ্রত্যাশিত বাক্যগুলো বোঝার চেষ্টা করছে।
————————————-
আজ পুরো দিনটা অদ্ভুত কাটলো আলোর কাছে। তবে সে অত পাত্তা দিল না। মাঝরাতে হঠাৎ পেটের ব্যথায় ঘুম ভেঙে গেল মেয়েটার। চোখমুখ কুঁচকে পেট খামচে ধরে উঠে বসল। তার পাশেই আধার স্যার উদোম পিঠে উবুড় হয়ে বালিশের মাঝে মুখ গুঁজে পুরুষালী ভঙ্গিতে ঘুমাচ্ছে। আলো ঘুমু ঘুমু চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওয়াশরুমে চলে গেল। একটু পর বেরিয়ে এসে আলমারি খুলে কিছু একটা খুঁজতে লাগল। কিন্তু পেল না তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা। আলো চিন্তিত হয়ে নিজের কপাল চেপে ধরল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে—আড়াইটা বাজে। এখন সে কি করবে? এইদিকে পেটের ব্যথাটা ক্রমশই বেড়ে চলেছে।
আলো ভাবল স্যারকে ডেকে তার সমস্যার কথা বলবে। কিন্তু পরক্ষণে আবার সিদ্ধান্তটা চেঞ্জ করে নিল। মানুষটাকে বলে কি হবে? এত রাতে কি সামান্য তার জন্য ফার্মেসীতে যাবে? উঁহু, মোটেও না। উল্টো দেখা যাবে এটা নিয়েও তাকে কথা শুনিয়ে দিয়েছে। তাই সে মুখে কুলুপ এঁটে থাকল। সময়ের সাথে সাথে আলোর অবস্থা খারাপ হয়। সে এই অসহনীয় পেটের ব্যথা একটুও সহ্য করতে পারে না। ফলস্বরূপ একহাতে পেট ও অন্য হাতে মুখ চেপে ধরে ওয়াশরুমের দরজার সামনেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। এবং নীরবে কেঁদে দিল।
ঘুমের ঘোরে মেয়েলি কণ্ঠে মৃদুস্বরে গোঙানির আওয়াজ পাওয়া মাত্রই চোখের ঘুম ছুটে গেল আধারের। সে তড়াক করে মাথা তুলে বামপাশে তাকায়৷ ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে অদূরে বসে থাকা মেয়েটি কাঁদছে। আধার কপাল কুঁচকে উঠে গেল।
-“কাঁদছো কেন?”
স্যারের কণ্ঠস্বর শুনে আলো মাথা তুলে উপরে তাকায়। আধার দু’হাত বুকে ভাজ করে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আলো কান্না থামিয়ে নাক টেনে বলল,
-“প-পেট খুব ব্যথা করছে।”
আধার ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, -“কেন?”
আলো মাথা নিচু করে নিল। আধার তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করে নেয়। তারপর কিছু একটা ভেবে তপ্ত শ্বাস ফেলে ধীর কণ্ঠে বলল, -“কী লাগবে বলো।”
-“প….প্যাড অর পেইন কিলার।”
আধার আর দাঁড়ায় না। বিছানা থেকে টিশার্ট নিয়ে সোজা রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মনে মনে খুব করে চাইল এত রাতে যেন একটা হলেও ফার্মেসীর দোকান খোলা থাকে।
বেশ কিছুক্ষণ পর আধার ফিরে এল। আলোর সামনে জিনিসপত্র রেখে বলল, -“নাও।”
আলো সামনে তাকাতেই আহাম্মক বনে গেল। এই বেকুব লোকটা পুরো দোকানের প্যাড তুলে এনেছে। সে হা করে স্যারের দিকে তাকায়। মেয়েটাকে এইভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আধার চোখমুখ কুঁচকে বিরক্তিতে বলল, -“হোয়াট?”
-“এইগুলো কয়বছরের জন্য নিয়ে এসেছেন? আর আমি এতগুলো কি করব?”
-“আই ডোন্ট নো!”
বলেই আধার বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আলো কিছুক্ষণ থম মে’রে বসে থেকে ওয়াশরুমে চলে যায়।
-“এত রাতে স্যুপ কোথায় পেলেন স্যার?”
আলো ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে থেকে ব্যথা হজম করছিল। তখন খেয়াল করে আধার স্যার একটা ট্রে নিয়ে প্রবেশ করছে। পাশে থাকা টি-টেবিলের ওপর ট্রে রাখতেই দেখতে পেল, ধোঁয়া ওঠা গরম গরম চিকেন স্যুপ ও হট ব্যাগ। এটা দেখে বেশ অবাক হয়ে উপরোক্ত বাক্যটি জিজ্ঞেস করে। আধার সামনে বসতে বসতে জবাব দিল,
-“তোমার এক্স বয়ফ্রেন্ডের রেস্টুরেন্ট থেকে নিয়ে এসেছি।”
আলো সরু চোখে তাকায়। মনে মনে বিরবির করে বলল,
-“এক্স কেন? একটা যদি বয়ফ্রেন্ডের “ব” থাকত, তাহলে আপনার দেমাগ সহ্য না করে কবেই পালিয়ে যেতাম। বাট আফসোস! এই আমিটার কপালে আপনার মতো খট্টাশ, বদমাইশকেই জুটতে হলো। এখন না পারছি গিলতে আর না পারছি উগলে ফেলতে! পুরো জীবনটাই আমার লস্ট প্রজেক্ট।”
-“হা করো।”
স্যারের কথা শুনে আলো ড্যাবড্যাব করে চায়। মানুষটা তার
তলপেটে হট ব্যাগ রেখে মুখের সামনে চামুচে করে স্যুপ ধরে আছে।
-“ঔষধ খেতে যত লেট করবে, তত কষ্ট পাবে মিস. কালো।”
আলোর একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে খুব ইচ্ছে করল—”আমার কষ্টে আপনার কী স্যার? আমি কে হই?”
তবে জিজ্ঞেস করতে পারল না। কারণ সেই অধিকার যে তার নেই। আলো কথা না বাড়িয়ে দু’হাতে হট ব্যাগ পেটে চেপে ধরে ভদ্র মেয়ের মতো স্বামীর হাতে স্যুপ খেয়ে নিল। পুরোটা শেষ করে একগাল হেঁসে বলল,
-“আপনার হাতের রান্না মাশাআল্লাহ স্যার।”
আধার কিছু না বলে মেয়েটাকে পেইন কিলার খাইয়ে দিল। তারপর সবকিছু গুছিয়ে রেখে রুমের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। অন্যদিকে বেচারি একা একা হাসফাস করতে লাগল। কারণ তার কিছুই ভালো লাগছে না। সবকিছু অসহ্য লাগছে। এই সময় নিজের বাড়িতে থাকলে সে এতক্ষণে মায়ের নয়তো বাবার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাত। কিন্তু এখন সেটাও পারবে না। আলো কিছুক্ষণ ছটফটিয়ে স্যারের দিকে আড়চোখে তাকায়। লোকটা কী আরামে ঘুমাচ্ছে। অথচ সে ব্যথায় ম’রছে। হঠাৎই আলোর মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সে মনে মনে হেঁসে চোখ বুজে কিছু সময় ঘুমিয়ে থাকার ভান করল। তারপর পাশে উল্টে গিয়ে সোজা স্যারের বুকে মাথা রেখে মটকা মে’রে পড়ে রইল।
ধীরে ধীরে অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরেও স্যারের কোনো রিয়াকশন না পেয়ে আলো শব্দ করে শ্বাস ছাড়ল। যাক বাবা, লোকটা ঘুমিয়ে গেছে। নাহলে তাকে দূরে ঠেলে দিত। আলো আনমনে হেঁসে স্যারের লোমহীন বুকের মাঝে একটু নাক ঘষাঘষি করল। এই মানুষটার শরীরের ঘ্রাণ মারাত্মক! সবসময় তাকে আকৃষ্ট করে এবং চুম্বকের মতো কাছে টানে। তাই তো ঘুমের ঘোরেও এই পঁচা বরটার সাথে লেপ্টে থাকে। এতে তার একটুও অস্বস্তি হয় না বরং ভালোই লাগে। যেগুলো জেগে থাকা অবস্থায় করতে পারে না, সেগুলো তার ঘুম করে দেয় হা হা হা।
আলো আজ একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠলো। শরীর ভালো না থাকায় ভার্সিটিতে যাবে না ঠিক করল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বেলকনির দিকে পা বাড়ায়। আধার স্যার ভার্সিটির জন্য তৈরি হয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে কারোর সাথে ফোনে কথা বলছে। সে মূলত রাতের জন্য ধন্যবাদ দিতে চায়। মানুষটা তার জন্য এতকিছু করল! অথচ সে বিনিময়ে কিছুই বলেনি। উনার তো এই ছোট্ট ধন্যবাদ-টা প্রাপ্য।
-“যতদ্রুত সম্ভব আপনি ডিভোর্স পেপার রেডি করুন। আমি এদিকের ব্যাপারটা ম্যানেজ করে নিবো।”
আধারের বলা বাক্যগুলো আলোর কর্ণধারে পৌঁছাতেই মস্তিষ্ক হঠাৎই থেমে গেল। সে অবিশ্বাস চোখে স্যারের পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল। তারমানে মানুষটা তাকে ডিভোর্স দিতে চায়? কিন্তু কেন?
প্রশ্নটা নিজেকে জিজ্ঞেস করতেই থমকে গেল আলো৷ সে তো এটার উত্তর জানে! এই মানুষটা তাকে পছন্দ করে না, আর না ভালোবাসে। বিয়েও করতে চায়নি। তাহলে কেন এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংসারের মাঝে থাকতে চাইবে? সেও তো ওই লোকটাকে একটুও পছন্দ করে না৷ প্রথম প্রথম ভেবেছিল ডিভোর্স দিবে নয়তো পালিয়ে যাবে৷ কিন্তু পরিবারের কথা ভেবে এমন করার দুঃসাহস হয়নি। তারপর….তারপর সে তো সবকিছুতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংসারকে এক মূহুর্তের জন্য নিজের সংসার ভেবে বউয়ের দ্বায়িত্ব পালন করে এসেছে। অথচ বোকা মেয়ে! সে যেগুলোকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে সেগুলো তো কোনো কালেই তার ছিল না। একদিন না একদিন এমনটা হওয়ারই কথা ছিল। তবুও তার স্যারের মুখে ডিভোর্সের কথা শুনে এত খারাপ লাগছে কেন? তার তো খুশি হওয়ার কথা ছিল! অথচ অজানা ব্যথায় বুকটা পুড়ছে তার।
আলো তাচ্ছিল্য হেঁসে ওখান থেকে সরে গেল। আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো,
-“অবশেষে আমাদের বিনি সুতার সংসারটা এখানেই সমাপ্ত হলো! বেস্ট অফ লাক স্যার। আপনার আগামী দিনগুলো খুব সুন্দর হোক এবং আলোয় ভরে উঠুক। আর আমি-নামক এই অন্ধকারের কালো ছায়া চিরতরে মুছে যাক আপনার জীবনের পাতা থেকে!”
#চলবে

