#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_০৭
আজ ভার্সিটিতে যায়নি আলো। যায়নি বললে ভুল হবে, সে যেতে পারেনি। শরীরের ব্যথা, পায়ের ব্যথা নিয়ে সারাটাদিন বিছানায় শুয়ে-বসে কাটিয়েছে। দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে পড়ে যাওয়া তো আর মুখের কথা না। নাজুক শরীরে ভালো মতোই ব্যথা পেয়েছে। ফোনে নিজের পরিবারের সাথে কথা বলে নিয়েছে। তবে তাদের কিছু জানায়নি এই দূর্ঘটনার ব্যাপারে। শুধু শুধু চিন্তা দিয়ে কী লাভ? যা হবার তা হয়ে গেছে। দাদাজান ও শেফালি চাচি একটু পরপরই এসে দেখা করে যাচ্ছে। তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি-না বা কোনোকিছুর প্রয়োজন কি-না সবকিছুতে খেয়াল রাখছে। সোবহান খান দুপুর বেলা খাবার নিয়ে এসে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে মেয়েটাকে। নাতবউ হবার আগে মেয়েটা তার নাতনির জায়গা দখল করে নেয়। তাই তো এত ভালোবাসেন এবং কাঠখড় পুড়িয়ে নাতির বউ করে সারাজীবনের জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। এতকিছুর পরও তাহমিনা খান অসুস্থ মেয়েটার কাছে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি, আর না নিয়েছে কোনো খোঁজখবর! কারণ তিনি ভীষণ রেগে আছেন আলোর ওপর। মেয়েটার কতবড় সাহস! তার ভাগ্নিকে চড় মা’রে। ওই মেয়েটার জন্যই তো অত রাতে জ্যোতিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে৷ তিনি এত সহজে ভুলে যাবেন কীভাবে হুহ্? মনে মনে সমস্ত রাগ-ক্ষোভ আপাতত পুষে রেখেছেন। সময় মতো সবকিছুর হিসেব নিবেন।
তখন সময়টা সন্ধ্যা বেলা। আলো রুমে বিছানার মাঝে উবুড় হয়ে শুয়ে আছে৷ পাশের টি-টেবিলের ওপর রাখা গরম তেলের ছোট্ট বাটি। বিকেল থেকে পিঠ টনটন করে ব্যথা করছে। তাই সে শেফালি চাচির থেকে পিঠে তেল মালিশ করে নিবে। মানুষটা তেল রেখে বাহিরে গেছে তো গেছেই, আসার কোনো নামগন্ধ নেই। ওইদিকে তেলটাও ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আলো বিরক্তিকর মুখে বালিশে মুখ গুঁজে রইল। তখন পদাঘাতের মৃদু শব্দ পেয়ে বলল,
-“উমমম….চাচি! এতক্ষণ কোথায় ছিলেন বলুন তো? তাড়াতাড়ি পিঠে তেল মালিশ করে দিন। ব্যথায় মনে হচ্ছে পিঠ খুলে রেখে দিই। ওই শাঁকচুন্নির কতবড় সাহস, আলো রহমানকে ফেলে দেয়! এখানে এসে যদি ওই মেয়েটাকে হাতের কাছে পেতাম, তাহলে ওরে ছাঁদ থেকে টুপ করে ফেলে দিতাম। তাহলে হিসাব বরাবর হত। বাট আফসোস! আমার প্রতিশোধ নেওয়া হলো না। স্যারের কপালে ওই শাঁকচুন্নি জুটলেই বেশ ভালো হত। উনি আমার মতো ভালো মেয়েকে ডিজার্ভ করে না। একটা জলজ্যান্ত শাঁকচুন্নির পাল্লায় পড়লে উনার ইগো-টিগো বেরিয়ে যেত। তখন বুঝত বউ পালা কত কষ্টের হুহ্!”
আলো নিজ মনে বকবক করে থামলো। কিন্তু প্রতিত্তোরে কিছুই শুনতে পেল না। তাই সে পুনরায় বলল,
-“চাচি আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? জলদি মালিশ করে দিন। নয়তো তেল ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
বলতে বলতে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায় এবং মূহুর্তেই শান্ত চোখজোড়া বড়বড় হয়ে গেল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে আধার স্যার দাঁড়িয়ে থেকে হাতঘড়ি, টাই খুলছে। আলো চট করে নজর সরিয়ে নিলো। এই খচ্চর ব্যাটা আবার কখন এল? তারমানে এতক্ষণ যাকে শেফালি চাচি ভেবে কথাগুলো বলছিল, সেটা এই লোকটা! ধুর, ধুর! সে সবসময় ভুল জায়গায় সত্য কথাগুলো বলে দেয়।
আধার শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে স্বাভাবিক গলায় বলল, -“আমার ওয়াইফ হওয়ার যোগত্যা তুমিও রাখো না!”
-“আপনিও আমার হাসব্যান্ড হওয়ার যোগ্য না।”
-“তাহলে আমার সাথে রয়েছো কেন?”
-“আপনি কেন আমার সাথে আছেন?”
-“বাধ্য হয়ে।”
-“আমিও!”
মেয়েটার ত্যাড়ামি দেখে চোখমুখ কুঁচকে ফেললো আধার। কিছু না বলে বড় বড় পায়ে ওয়াশরুমের ভেতর চলে গেল। এই বাঁচাল মেয়েটার সাথে কথা বলা মানে, হাতিকে পোশাক পরানোর ব্যাপার-টা একই!
-“এ্যাই মেয়ে? উঠছো কেন?”
আধার শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসে দেখে আলো বিছানায় থেকে নামার চেষ্টা করছে। কিন্তু পা নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। এটার জন্য নিজের ক্ষত পা-কেই বকাবকি করছে মেয়েটা। তখন সে বিরক্তিকর কণ্ঠে উপরোক্ত বাক্যটি বলে।
-“শেফালি চাচিকে ডাকতে।”
আধার বিনিময়ে কিছু না বলে হাতে থাকা তোয়ালে সোফার ওপর রেখে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। রান্নাঘরে এসে দেখে শেফালি চাচি একগুচ্ছ ছোট মাছ কাটাকাটি করতে ব্যস্ত। মাছগুলো তার দাদাজানের ও ছোটমার ভীষণ প্রিয়। তবে সে এইগুলোর ধারেকাছেও নেই। এতগুলো মাছ কাটতে দেখে আধারের বোঝা হয়ে গেল, এত তাড়াতাড়ি মাছ কাটা শেষ হবে না। তাই সে পুনরায় রুমে গিয়ে আলোর উদ্দেশ্যে বলল,
-“চাচি মাছ কাটতে ব্যস্ত!”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বলল, -“তাহলে আপনি আমার পিঠে তেল মালিশ করে দিন।”
-“হোয়াটটটটট!”
মেয়েটার কথা শুনে আধার আশ্চর্য হয়ে গেল। আলো বিরক্তিতে বলল, -“এতে ষাঁড়ের মতো চেঁচানোর কী হলো আজিব। আজকে আমার এই অবস্থার জন্য শুধুমাত্র আপনি দায়ী। আপনার কারণেই ওই পাঁজি মেয়েটা আমাকে হার্ট করেছে। এখন আমার সেবাযত্ন করতে না পারলে আমাকে বাপের বাড়িতে দিয়ে আসুন। তবুও এইভাবে ব্যথা সহ্য করে পড়ে থাকতে পারব না। আমিও মানুষ, আপনার মতো কোনো এলিয়েন নই!”
আধার ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবলো। ইচ্ছে তো করছে এই মেয়েটাকে তার বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু বিষয়টা খুবই বাজে দেখাবে! তারওপর দাদাজান তো আছেই। উনি যদি একবার জানতে পারে, তাহলে তার কান ঝালাপালা করে দিবে। আর সে মোটেও অশান্তি চায় না। কিন্তু এখন অশান্তি নামক বড় কারণটাই ঘাড়ে এসে জুটেছে। যাকে সে চাইলেও সরাতে পারছে না। তার এলোমেলো জীবনটা আরো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আধার ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, -“ওকে ফাইন!”
স্যারের কথা শুনে আলো ভরকে গেল। এখন সত্যি সত্যিই তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে নাকি? সে তো ভাব নেওয়ার জন্য বলেছিল। এই অবস্থায় বাড়িতে গেলে ব্যাপারটা মোটেও ভালো দেখাবে না। তাই সে কিছু বলতে যাবে তখনই খেয়াল করল আধার স্যার তেলের বাটি-টা নিয়ে তার পাশে বসেছে। এটা দেখে আড়ালে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে উবুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।
এইদিকে আধার থমথমে মুখে মেয়েটার পিঠ থেকে টি-শার্ট উপরে তুলে দেয়। সে জীবনেও এই মেয়েটার মতো নির্লজ্জ আর দুটো মেয়ে দেখেনি! আধার একপলক সাদা ধবধবে মসৃণ উন্মুক্ত পিঠের দিকে তাকিয়ে নজর সরিয়ে নিলো। তারপর কিছু একটা ভেবে উঠে গিয়ে আলমারি খুলে দুটো গ্লাভস বের করে হাতে পড়ে নিলো। এই মেয়েটা বেহায়া হলেও তো আর সে নয়!
কিছুসময় পর নিজের পিঠের মাঝে দুটো হাতের স্পর্শ পেয়ে আলো মাথা তুলে ঘাড় ঘুরিয়ে স্যারের হাতের দিকে তাকায়।কালো গ্লাভস পড়তে দেখে আলো বেকুব বনে গেল। তার শরীর কি নোংরা? যে স্পর্শ করতে গ্লাভস পড়তে হচ্ছে? আলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বালিশে মুখ ডুবিয়ে দিল। তার কেন জানি মালিশটা নিতে ভালো লাগছে।
অন্যদিকে, আধার ঠোঁট কামড়ে আলতো হাতে মেয়েটার পিঠে ও বাঁকানো কোমরে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। তবে তার চোখজোড়া বন্ধ! তবুও সে মেয়েটাকে অনুভব করতে পারছে। হঠাৎই মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। আধার মনে মনে শয়তানি হেঁসে হাতের শক্তি দিগুণ করতেই আলো হকচকিয়ে উঠলো!
-“আয়ায়া….স্যার লাগছে তো! আপনাকে মালিশ করতে বলেছি, পিঠের হাড্ডি ভাঙ্গতে নয়য়য়য়।”
আধার ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তবে আর কিছু করল না৷ ওইদিকে আলো দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বিরবির করে বলল, -“একদিন আমারো সুযোগ আসবে স্যার! তখন আপনাকে যদি নাকানিচুবানি না খাওয়াতে পেরেছি, তাহলে আমিও আলো নই।”
———————————–
এক সপ্তাহ পর ভার্সিটিতে এসেছে আলো। সামনে আবার প্রথম ইনকোর্স পরীক্ষা রয়েছে। এ্যাসাইমেন্ট, প্রেজেন্টেশন কমপ্লিট করতে করতে তার জীবনটা শেষ। তারওপর যদি থাকে স্বামীনামক হিটলার স্যার, তাহলে তো রিল্যাক্স হয়ে থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আলো ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে অর্ধেক খেল। প্রথম ক্লাস শেষ হয়ে গেছে, এখন ফিজিক্স ক্লাস হবে, তাই সবাই বসে থেকে অপেক্ষা করছে স্যারের জন্য।
বেশি পানি খাওয়ার ফলে ওয়াশরুম পেল। আলো বান্ধবীদের বলে পানির বোতলসহ বাহিরে যেতে লাগল। ফেরার সময় নাহয় বোতল ভরতি করে নিয়ে আসবে। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় ফোনটা বেজে উঠলো। আলো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখে ছায়া কল দিয়েছে। সে কলটা রিসিভ করে কানে গুঁজে বোনের সাথে কথা বলতে লাগল। কথা বলার একফাঁকে বাম হাতটা রেলিংয়ে ওপর রেখে ভুলবশত কাত করে। ফলস্বরূপ বোতলের অর্ধেক পানি নিচে পড়ে যায়।
আলো হেঁসে হেঁসে কথা বলতে বলতে বোতলে চুমুক দিল। কিন্তু একি? পানি কোথায়? সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখে বোতল একদম ফাঁকা। চট করে রেলিংয়ের নিচের সিঁড়িতে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে যায়। সাথে মুখও অটোমেটিক হা হয়ে গেল। আধার স্যার ভেজা মাথা, চেহারা নিয়ে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। আলো নিচে নামার আর সাহস পেল না। সে ভয়ে উল্টো ঘুরে এক ছুটে ওখান থেকে পালিয়ে গেল। সব আকাম-কুকাম এই লোকটার সাথেই কেন হতে হয়?
-“কিরে এমন করে হাঁপাচ্ছিস কেন? কোনো সমস্যা?”
তামান্নার কথা শুনে আলো জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বিরবির করে বলল, -“আমার দ্বারা কখনো ভালো কাজ হয় না। সবসময় ভুল জায়গায় উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে থাকি।”
ফারাহ্ কপাল কুঁচকে জানতে চাইল, -“আবার কি করেছিস?”
-“আমি কিছু করিনি। যা করেছে এই শয়তান বোতলটা।”
বলেই আলো জানালা দিয়ে ছুঁড়ে মা’রলো বোতলটি। সঙ্গে সঙ্গে নিচ থেকে একটা ছেলের চিৎকার, চেঁচামেচির শব্দ ভেসে এল। আলোসহ বাকীরা সবাই থতমত খেয়ে যায়। শালুক তড়িঘড়ি করে জানালার কাছে গিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখে একজন সিনিয়র ভাই আলোর বোতল হাতে নিয়ে অন্য হাতে নিজের কপাল চেপে ধরে আছে। শালুক ভয়ার্ত কণ্ঠে বিরবির করে বলে উঠলো,
-“আলো তুই আজ শেষ!”
ক্লাসরুমের লাস্ট বেঞ্চে ঘাপটি মে’রে বসে আছে আলো। ভয়ে রীতিমতো হাতপা জমে যাচ্ছে। সে আজ ভুলবশত যার কপাল ফা’টিয়েছে সেই ছেলেটা এক নাম্বারের শয়তান। বড়লোক বাপের বিগড়ে যাওয়া ছেলে। মেয়েদের সম্মান দেওয়া তো দূরে থাক, সুযোগ পেলে অসভ্যতামিও করতে ছাড়ে না। ভার্সিটির অনেক মেয়েই ভয় পায় ওই ছেলেটাকে।এমনিতেই ওই ছেলেটার সাথে তার সম্পর্ক ভালো না! ভার্সিটির প্রথম দিনেই বড়সড় একটা ঝামেলা করেছিল সে। রাগে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে সবার সামনে থাপ্পড় মে’রেছিল ওই ছেলেটাকে। কারণ ওই ছেলেটা নিজের দলবল নিয়ে র্যাগিং করার নামে তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। তারপর থেকেই ওই ছেলেটার দুচোখের বিষ সে। সুযোগ পেলেই তাদের সাথে লাগার চেষ্টা করে। আর আজ সে অজান্তেই ছেলেটাকে সুযোগ করে দিল ঝামেলা করার জন্য। সবচেয়ে বেশি এখন নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। তখন কেন যে বোতলটা ছুঁড়তে গিয়েছিল….
-“আমরা কী ভেতরে আসতে পারি স্যার?”
আধার ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে লেকচার দিচ্ছিল আর টুকটাক প্রশ্ন করছিল সবাইকে। তখন দরজা থেকে ভেসে আসা বাক্যটি শুনে চশমা ঠিক করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। চার-পাঁচজন সিনিয়র ছেলেপুলে দাঁড়িয়ে আছে। সে সবাইকে চেনে। তাই গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“ক্লাস চলাকালীন নো ডিস্টার্ব! পরে এসো।”
সুজন পুনরায় বলল, -“আপনার স্টুডেন্টের মধ্যে একজনের এই পানির পট ভুলবশত নিচে পড়ে গিয়েছিল। তাই দিতে এসেছি।”
আধার কপাল কুঁচকে বোতলটার দিকে তাকায়। বেগুনি রঙা বোতলটার গায়ে পান্ডার স্টিকার দেখে একটুও চিনতে অসুবিধা হলো না, এটার আসল মালিক কে! সে ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকায়। আলো নিজেকে আড়াল করে রেখেছে বান্ধবীর পিছনে। কারণ সে কোনোরকম ঝামেলা চায় না। আধার নজর সরিয়ে সুজনের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। ছেলেটার কপালে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগানো রয়েছে। সে ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভেবে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
-“এই বোতলটা কি তোমাদের মধ্যে কারোর?”
সঙ্গে সঙ্গে সবাই না বলে। আধার সুজনের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, -“তোমার কোথাও একটা ভুল হয়েছে। এটা এখানকার কারোর নয়! হতে পারে অন্য ডিপার্টমেন্টের কারোর। এটা আপাতত আমার কাছে থাক, আমি খোঁজ নিয়ে আসল মালিকের কাছে পৌঁছে দিবো৷ তোমরা এখন আসতে পারো!”
কথাগুলো বলে আধার এগিয়ে এসে সুজনের হাত থেকে বোতলটা নিয়ে নিলো। ছেলেগুলো কিছু বলতে চেয়েও স্যারের গম্ভীর চেহারা দেখে বলতে পারল না। কারণ তারা কমবেশি সবাই জানে এই লোকটা কেমন! তাই কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চলে গেল। এই বিষয়টা না-হয় পরে দেখা যাবে। তাদেরকে যেতে দেখে আলোর বন্ধুমহলের সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। ফারাহ্ ফিসফিসিয়ে বলল,
-“স্যারের জন্য বেঁচে গেলি!”
আলো মুখ গোমড়া করে মনে মনে বিরবির করল,
-“ওই লোকটার জন্যই এমনটা হয়েছে!”
ক্লাস শেষে আধার বেরিয়ে গেল। নিজের অফিস-রুমে ঢোকার সময় ডাস্টবিনে বোতলটা ছুঁড়ে ফেলতেও ভুললো না!
ভার্সিটি শেষে বাড়িতে এসে গোসল নিয়ে খাওয়াদাওয়া করে, দাদাজানের সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলে ভাতঘুম দিয়েছে আলো। ঘুম ভাঙলো সন্ধ্যার দিকে। আড়মোড়া ভেঙে হামি তুলে উঠে বসে বাম পাশে তাকাতেই দেখতে পেল—আধার স্যার সোফায় বসে থেকে ল্যাপটপে কাজ করছে। পরণে টি-শার্ট ও ট্রাউজার, ঘন বড় বড় চুলগুলো ভেজা, চোখে রিডিং গ্লাস, চিকন রক্তিম নিচের ঠোঁট কামড়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে স্ক্রিনে! শ্যাম বর্ণের সুন্দর মুখশ্রীর দিকে না চাইতেও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মেয়েটা। আজকাল ঘুম থেকে উঠার পরপরই এই মানুষটার মুখখানা দর্শন হয়। মাঝেমধ্যে তো সকাল সকাল আপত্তিকর পরিস্থিতিতেও পড়ে যায়। এইতো আজ সকালের ঘটনা! ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর নিজেকে আবিষ্কার করে মানুষটার নগ্ন বুকের মাঝে। লোকটা তখন গভীর ঘুমে মগ্ন ছিল, অথচ তার ঘুম মূহুর্তেই উড়ে যায়। সে লজ্জায় লাল, নীল, সবুজ হয়ে চট করে সরে আসে৷ মানুষটা তো আর এমনি এমনি বলে না, তার ঘুমানোর কোনো ছিঁড়ি নেই।
আলো এসব ভেবে আনমনে হাসলো। সে সজ্ঞানে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখলেও ঘুমের ঘোরে মানুষটার কাছে চলে যায়। এতে তারই বা দোষ কোথায়? ওইদিকে সোফায় শুয়েও শান্তি নেই। ধপ, ধপ করে উল্টে পড়ে যায়। তাই তো একপ্রকার বাধ্য হয়েই বিছানাতে থাকে। এতে ঘুমটাও ভালো হয়! আর এই বিছানাটা একটু বেশিই নরম। তাই সে সবকিছু জেনেশুনেও মটকা মে’রে পড়ে থাকে। কারণ দিনশেষে নিজের সুখ, শান্তিই আগে!
আলো এসব ভাবতে ভাবতে অন্যমনষ্ক হয়ে বিছানা থেকে নামতে যাবে, তখনই প্লাজুর সাথে পা আঁটকে ধপাস করে কম্ফোর্টারসহ পড়ে গেল নিচে।
-“শালার সব অঘটন আজ আমার সাথেই হ!”
আধার একপলক তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিয়েছে। আলো বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে বিরবির করে কম্ফোর্টার সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। খোলা চুলগুলো হাত খোপা করে ওয়াশরুমের দিকে যেতেই পিছন থেকে শুনতে পেল, ভারী পুরুষালী কণ্ঠে বলা কিছু বাক্য—
-“নিজের হাত-পা কন্ট্রোল করতে শিখুন মিস. কালো! সবাই আধার খান নয় যে আপনাকে ছেড়ে দিবে।”
#চলবে
#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_০৮
আজ রাতের সব রান্না আলো নিজ থেকে রেঁধেছে। এতদিন সে আজাইরা শুয়ে-বসে থেকে ফোনে রান্নার ভিডিও দেখে শিখেছে। যেন তাকে পরবর্তীতে রান্না-বান্না নিয়ে কেউ-ই কিছু বলতে না পারে৷ সবচেয়ে বড় কথা, এটা তার বাপের বাড়ি না! শশুর বাড়ি। একটু অসুবিধা হলেও সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে সবকিছুতে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। হাজার হোক, সে খান বাড়ির বড় বউ! বিয়েটা স্বাভাবিক না হলেও এসব অস্বীকার করতে পারবে না। যেখানে দুটো পরিবারের সম্মান জড়িয়ে আছে। আর মেয়েদের বিয়ে তো একবারই হয়! সেও না-হয় এই অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের মাঝে থাকার চেষ্টা করবে। কারণ চাইলেও তো আর এখন সে কিছুই করতে পারবে না।
রান্না করার সময় আলো কতবার ছ্যাকা খেয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। প্রথম প্রথম, তাই এমনটা হয়েছে। তবে আজ সে শরীরের কষ্টের চেয়েও বেশি খুশি। তার এই আনন্দকে দিগুণ করতে দাদাজান তাকে একটি ডাইরি দিয়েছিল। পুরো ডাইরির পাতা ভর্তি ছিল রান্নার রেসিপি দিয়ে। মেয়েটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এটা কার ডাইরি! তখন জানতে পারে এটার মালিক তার-ই আসল শাশুড়ী মা। উনি রান্না করতে খুব ভালোবাসতেন। সঙ্গে সকল রেসিপিগুলো লিখে রাখতেন। বিয়েতে সে শাশুড়ী মায়ের অনেক গহনাই পেয়েছিল। তাহমিনা খানও দিয়েছিলেন কিছু গহনা! তার আবার এই সোনাদানা খুব একটা পছন্দ না। তাই তো এই সামান্য ডাইরিটা পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল। শাশুড়ী মা আজ যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে সে সোজা গিয়ে হাতে চুমু খেত, এত চমৎকার একটি রেসিপি বুক তৈরি করার জন্য। কিন্তু আফসোস! সেটা চাইলেও করতে পারবে না।
ঘড়ির কাঁটায় রাত এগারোটা ছুঁইছুঁই। নিত্যদিনের ডিনার দশটার মধ্যে শেষ হলেও আজ কিছুটা দেরি হয়ে যায়। এর পিছনে অবশ্য আলোই রয়েছে। মেয়েটা সবকিছু আস্তে-ধীরে করেছে। কারণ তাড়াহুড়ো করা শয়তানের কাজ। যেখানে সে প্রথম এত আইটেম বানিয়েছে সেখানে রান্না খারাপ হোক, সেটা মোটেও চায় না। নয়তো দেখা যাবে এটা নিয়েও কিছু না কিছু কটুকথা শুনে বসে আছে। আলো এতদিনে বুঝে গেছে তার দ্বিতীয় শাশুড়ী মা মোটেও পছন্দ করে না তাকে। এতে তার খারাপ লাগেনি, সব মানুষের পছন্দ তো আর এক নয়! যেখানে তার স্বামীই তাকে পছন্দ করে না, সেখানে শাশুড়ী মায়ের থেকেও কিছু আশা করা যায় না। সেও ওই লোকটাকে পছন্দ করে না। নিজের পরিবার ও দাদাজানের কথা ভেবে একপ্রকার বাধ্য হয়েই থাকছে। তবে ওই মানুষটা যদি তাকে মেনে নিতে চায়, তাহলে সে ভেবে দেখবে।
-“কি গো নাতবউ? তোমার রান্নাবান্না হইলো? নাকি পেটে গামছা বেঁধে আজ রাতটা কাটিয়ে দিতে হবে?”
আলো ডাইনিংয়ে খাবার সাজিয়ে রাখছিল আর আকাশপাতাল ভাবছিল। তখন সোবহান খান এগিয়ে এসে কথাগুলো বলে। আলো একগাল হেঁসে বলল,
-“এইতো দাদাজান সব কমপ্লিট। তুমি খেতে এসো!”
সোবহান খান মুচকি হেঁসে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন, -“যাও, তোমার বরকে ডেকে নিয়ে আসো।”
আলো মাথা নাড়িয়ে আগে তাহমিনা খানের রুমে গেল। দরজায় হালকা টোকা দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“মা, খেতে আসুন!”
অপরপ্রান্ত থেকে কোনো সাড়াশব্দ ভেসে এল না। আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে রিনরিনিয়ে বলল,
-“আজ আমার প্রথম রান্না ছিল মা। তাই একটু দেরি হয়ে গিয়েছে। আপনি প্লিজ রাগ করবেন না। পরেরবার থেকে সময়ের খেয়াল রাখব।”
এবারেও হতাশ হলো আলো। কিছুসময় দাঁড়িয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চলে গেল। রুমে এসে দেখল—আধার স্যার বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে থেকে বই পড়ছে। সে এগিয়ে এসে বলল,
-“খাবার খেতে আসুন!”
আধার বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে সামনে তাকায়। মেয়েটার ফর্সা চেহারা লাল টমেটো হয়ে আছে, মাথায় ওড়না দেওয়া থাকলেও বোঝা যাচ্ছে ঘেমে গিয়েছে। আধার নজর সরিয়ে একবার দেয়াল ঘড়ি দেখে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“চার ঘন্টা ধরে রান্না করছিলে, তা একমাসের মনে? নাকি একবছরের জন্য?”
-“এক মাসও না, এক বছরও না! দশ বছরের মনে রান্না করেছি। খেতে ইচ্ছে হলে আসুন, নয়তো বসে থেকে বই খান।”
-“খাবার আদৌ মুখে তোলা যাবে তো?”
-“মুখে তুলতে না পারলে নাকে তুইলেন।”
একথা বলে আলো ওয়াশরুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে রুমে আধার স্যার নেই। আলো তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে সোফার ওপর রেখে মাথায় ওড়না জড়িয়ে চলে গেল বাহিরে।
ডাইনিংয়ে সোবহান খান, তাহমিনা খান ও আধার খান বসেছে। আলো নিজ হাতে খুশিমনে খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে। তাকে শেফালি চাচিও সাহায্য করছে।
-“তুমিও বসো নাতবউ।”
দাদাজানের কথা শুনে আলো ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি পরে চাচির সাথে খেয়ে নিবো দাদাজান।”
সোবহান খান আর কিছু বললেন না। ওইদিকে আধার থমথমে মুখে বসে আছে। কারণ এখানে বেশিরভাগ খাবারই তার পছন্দের! যেখানে ছোট মা-ই তার পছন্দের, অপছন্দের ব্যাপারে জানে না, সেখানে এই মেয়েটা কীভাবে জানলো? তাহলে কি দাদাজান বলেছে? উমম….হতে পারে।
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইলিশের লেজ ভর্তা, মাথা দিয়ে কচু শাঁক ও ঢেঁড়স ভাজি প্লেটে তুলে নিয়ে গরম ভাতে মেখে এক লোকমা মুখে নিতেই থমকে গেল। অবিশ্বাস চোখে আলোর দিকে তাকায়। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল,
-“তুমি এইগুলো রান্না কোথায় থেকে শিখেছো?”
আলো থমথমে মুখে বলল, -“দাদাজান একটা রেসিপি বুক দিয়েছিল। ওটা দেখেই রান্না করেছি। তাই তো দেরি হয়েছে।”
আধার চট করে দাদাজানের দিকে তাকায়। নাতির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখেও না দেখার ভান করে মনোযোগ সহকারে খেতে খেতে স্বাভাবিক গলায় বললেন,
-“আমার মুখ না দেখে চুপচাপ খাবার খাও। মেয়েটা অনেক কষ্টে রেঁধেছে। আশা করছি সম্পূর্ণ খাবার শেষ করবে।”
তারপর আলোর রান্নার অনেক প্রশংসা করলেন। বিশেষ করে হাঁসের কষা মাংসের! মেয়েটা খুশিতে গদগদ হয়ে আরো মাংস তুলে দিল দাদাজানের পাতে! আধার কিছু না বলে খেতে শুরু করে।
-“মা আরেকটু রুই মাছ দেই?”
আলো খেয়াল করেছে তার শাশুড়ী মা রুই মাছের কালিয়াটা দিয়েই খাচ্ছে। হয়তো মজা হয়েছে। তাই সে জিজ্ঞেস করে। তাহমিনা খান ধীর কণ্ঠে বললেন,
-“না থাক!”
আলো মুখ কালো করে প্লেটের দিকে তাকায়। মাছ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তাই সে সহসাই দুটো মাছের বড় পিস তুলে দিল শাশুড়ীর পাতে। এতে তাহমিনা খান মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। আলো বিনিময়ে হাসার চেষ্টা করল। তাহমিনা খান কিছু বললেন না। কারণ তার কাছে রান্নাটা খুবই ভালো লেগেছে। তিনি তো ভাবতেই পারেন নি, মেয়েটার রান্নার হাত এতটা মারাত্মক হবে। কিছু কিছু আইটেমের ক্ষেত্রে নুন-ঝাল একটু বেশি হলেও খেতে মন্দ নয়! বরং খাবারের স্বাদটাই একদম আলাদা! আলো আড়চোখে স্বামীর দিকে তাকায়। লোকটার প্লেটের ভাত প্রায় শেষের পথে! তাই সে আবারো এক বুক সাহস নিয়ে দম আঁটকে ভাতের পাত্র এগিয়ে নিয়ে গেল। তারপর প্লেট ভরে ভাত বেড়ে দিল।
আধার ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। আলো শুকনো ঢোক গিলে সরে গেল। মনে মনে ভাবছে, এই বুঝি তার উপর ধমকে উঠবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মানুষটা কিছু না বলে চুপচাপ খেতে থাকল। এটা দেখে আলো ঠোঁট কামড়ে হেঁসে তরকারি তুলে দিল। মানুষটা তার রান্না করা সব তরকারি দিয়েই খাচ্ছে। বিশেষ করে ভর্তার আইটেমগুলো!
খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই একটু রেস্ট করে নিজ নিজ রুমে চলে গেল। সোবহান খান যাওয়ার আগে নাতবউয়ের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলে যায়—
-“নিজের মা’কে হারানোর পর আজ প্রথম আমার নাতিটা তৃপ্তি সহকারে খাবার খাইছে।”
🌸
❝Betahasha dil ne tujhko hi chaaha hai
Har dua mein maine tujhko hi maanga hai
Tera jaana jaise koi baddua…
Door jaoge jo tum, mar jayenge hum
Sanam teri kasam o… Sanam teri kasam o…
Sanam teri kasam!❞
দুবাইয়ের সেই বিশাল স্টেডিয়ামে তখন পিনপতন নীরবতা। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিও যেন হার মেনেছে নিস্তব্ধতার কাছে। পুরো স্টেডিয়াম অন্ধকার, শুধু মাঝখানের মঞ্চে কৃত্রিম ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে নীল রঙের একটি তীব্র স্পটলাইট নিবদ্ধ হয়ে আছে এক যুবকের ওপর। যুবকটির বুকের সাথে লেপ্টে আছে তার অতি পরিচিত, সিগনেচার গিটারটি। পরণে কালো লেদার জ্যাকেট, কপালের ওপর অবাধ্যের মতো পড়ে থাকা এলোমেলো দীর্ঘ চুলগুলো তাকে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ রূপ দিয়েছে। তার ডান হাতের আঙুলে ঝিলিক দিচ্ছে রুপালি আংটি, আর কব্জিতে বিশেষ ব্রেসলেট—যা ভক্তদের কাছে তার পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুবকটি চোখ বুজে আছে। চারপাশের হাজারো চিৎকার তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। গিটারে তারে আঙুল ছোঁয়াতেই সুরের এক সম্মোহনী ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল পুরো গ্যালারি জুড়ে। দেশি-বিদেশি অসংখ্য তরুণ-তরুণী মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে সেই বিমোহিত গায়কের দিকে। তার কণ্ঠের জাদুতে তখন মরুর বুকে যেন নীল জোছনা নামছে।
কনসার্ট শেষ হতেই সমস্ত নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল গগনবিদারী চিৎকারে। যুবকটি যখন মঞ্চ থেকে ধীরপায়ে নেমে আসছিল, শত শত ভক্ত বডিগার্ডদের কড়া বেষ্টনী ভেদ করে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল প্রিয় তারকার ওপর। কেউ একটা ছবি, কেউ বা এক পলক ছোঁয়া বা একটু অটোগ্রাফের জন্য রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু যুবকটির দৃষ্টি স্থির ও ভাবলেশহীন। সেই বিশাল উন্মাদনা আর ভিড় এড়িয়ে সে দ্রুতপায়ে গিয়ে উঠে পড়ল তার কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়িটিতে। বাইরে তখনো তার নাম ধরে শত শত মানুষের হাহাকার শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কাঁচের ওপারে সে সম্পূর্ণ একা। এক জনপ্রিয় তারকার এই বিষণ্ণ একাকীত্বই যেন তাকে সাধারণের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে সবার কাছে….
এতক্ষণ ছায়া নিজ ফোনে কনসার্টটা খুব মনোযোগ সহকারে দেখছিল। ভিডিও শেষ হতেই সে ফোনটা বুকে চেপে ধরে চোখ বুজে নিলো। শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিরবির করে বলল,
-“আপনার দেখা কবে পাবো গায়ক সাহেব? এই র’ক্ত-মাংসের আপনি’টাকে একটিবারের জন্য সচক্ষে দেখার বড়ই ইচ্ছে আজ মনে জেঁকে বসেছে। দোহাই আপনার, এবার জলদি দেশে ফিরে আসুন! নয়তো আপনাকে দেখার এই অপূর্ণ স্বাদ হয়তো এ জন্মে আর মিটবে না। আমার এই অবুঝ হৃদয়টা যে আপনার কণ্ঠ আর উপস্থিতির জন্য বড্ড ব্যাকুল হয়ে আছে…..বড্ড!”
———————————-
রাত বাজে আড়াইটা! এই সময়টাতে সবাই গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকলেও আজ আধারের চোখে একটুও ঘুম নেই। অজানা ব্যথায় বুকের ভেতরটা ছটফট করছে। আজ নিজের মা’কে ভীষণ মনে পড়ছে তার। ছোট বেলা কতোই না সুখের, আনন্দের ছিল। তারপর….তারপর এক ঝড়োহওয়ায় সব শেষ! অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে মা’কে হারানোর পর তার জীবন থেকেও সুখ নামক বস্তুটা গায়েব হয়ে যায়। সে যাকেই মন থেকে ভালোবেসেছে এবং আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছে, ওপরওয়ালা তাদেরই কেঁড়ে নিয়েছে। তাই তো আজকাল আর কাউকেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে না, সয়ং নিজেকেও না!
আধারের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে চোখের ওপর থেকে ডান হাত সরিয়ে নিজের বুকের দিকে তাকায়। মেয়েটা ইঁদুরের বাচ্চার মতো গুটিশুটি মে’রে শুয়ে আছে। খোলা কালো চুলগুলো তার সর্বাঙ্গ জুড়ে লেপ্টে রয়েছে। সে কতবার যে মেয়েটাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তবুও ওই ঘুরেফিরে তার বুকের মাঝেই আসবে। একসময় বাধ্য হয়েই
হাল ছেড়ে দেয়। আধার অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে, মেয়েটা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকাকালীন একটু পরপর ঘাড়, গলা চুলকাচ্ছে। এতে দুই ভ্রুয়ের মাঝে চারটে ভাজ পড়ল আধারের। কৌতূহলী হয়ে একহাতে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে নিয়ে একপাশে রাখল। একরাশ অস্বস্তি নিয়েই মেয়েটার কাঁধ থেকে সামান্য টি-শার্টের গলা সরিয়ে নেয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো। পুরো ফর্সা কাঁধ লালচে হয়ে র্যাশে ভরে গিয়েছে। আধার চট করে উঠে বিছানায় শুয়ে দিল আলোকে। চুলগুলো সরিয়ে গলার দিকে তাকিয়ে দেখে, সেখানেও লাল হয়ে র্যাশে ভরে আছে। কোমল দু’হাতেও গুরিগুরি র্যাশ বের হয়েছে। অথচ মেয়েটা কী নিশ্চিতেই না ঘুমাচ্ছে!
আধার বুঝতে পারল, কোনো কারণে সম্ভবত মেয়েটার এলার্জি জেগেছে। তাই সে কয়েকবার ডেকে উঠলো। কিন্তু আলোর ঘুম ভাঙার কোনো নামগন্ধ নেই। আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে পর মূহুর্তে ঘুমন্ত মেয়েটার নাক, মুখ চেপে ধরে নিঃশ্বাস নেওয়াটা বন্ধ করে দিল। কয়েক মিনিটের পরই আলো ফট করে চোখ মেলে তাকায়। মেয়েটার বুক অস্বাভাবিক ভাবে উঠানামা করছে।
আলোকে জাগতে দেখে হাত সরিয়ে নিলো আধার। মেয়েটা চোখদুটো বড়বড় করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে অবিশ্বাস সুরে বলল,
-“আ-আপনি, আপনি আ-আমাকে ম-মে’রে ফেলার প্ল্যান করেছেন স্যার?”
আধার বিছানায় থেকে নেমে গায়ে টিশার্ট জড়িয়ে বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল, -“মা’রার হলে প্রথম রাতেই মা’রতাম।”
আলো উঠে বসে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, -“তাহলে মাঝরাতে এমন করে নাকমুখ চেপে ধরার মানেটা কী? আমি যদি দম আঁটকে ম’রে যেতাম, তাহলে কী হত হুম?”
-“কী হত? কিছুই না। বরংচ আমার ঘাড় থেকে একটা পাগল নেমে যেত!”
আলোর রক্তিম চোখদুটো ছলছল করে উঠলো। অভিমানী সুরে বলল, -“হ্যাঁ ঠিকই তো! আমি কে হই আপনার যে আমার জন্য কষ্ট পাবেন? আমি ম’রলেও কী আর বাঁচলেও কী! আপনার কখনোই যায় আসবে না। উল্টো পৃথিবীর সবচেয়ে খুশি ব্যক্তি আপনিই হবেন। দিনশেষে আলো নামক গলার কাটা-টা অন্তত নেমে যাবে!”
আধার ওয়ারড্রবের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে এইড বক্সে এলার্জির ঔষধ খুঁজতেছিল। সেসময় মেয়েটার কথাগুলো শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এক জোড়া অশ্রুসিক্ত নয়নের দিকে। আলো নাক টেনে বিছানায় থেকে নেমে একটা বালিশ বগলদাবা করে রুমের দরজা খোলার চেষ্টা করতেই আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,
-“কোথায় যাচ্ছো?”
-“থাকব না আপনার ঘরে। নয়তো দেখা যাবে আপনি আবারো আমার ঘুমের সুযোগ নিয়েছেন।”
-“আমার জানামতে, এখন পর্যন্ত তোমার কোনোরকম সুযোগ নেইনি। যদি নিতাম—তাহলে নিজ পায়ে অক্ষত শরীরে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারতে না!”
আলোর ভ্রু কুঁচকে গেল। পিছনে ফিরে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“একদম মিথ্যে বলবেন না। আপনি আমার ঘুমের সুযোগ আলবাত নিয়েছেন। নাহলে কী তখন ওমন করে নাকমুখ চেপে ধরতেন? আপনি তো আমাকে একদম জানে মে’রে ফেলতে চেয়েছেন। ভাগ্যিস তখন ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, নয়তো এতক্ষণে আমি আকাশের চাঁদের আলো হয়ে যেতাম। আপনার নামে মামলা দিবো আমি। কতবড় সাহস, একটা জলজ্যান্ত ঘুমন্ত মেয়েকে মে’রে ফেলার চেষ্টা করেন।”
আধারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রাগে ঘাড়ের শিরা ফুটে ওঠে। সে খপ করে আলোর বাম হাতের বাহু চেপে ধরলো এবং টেনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিয়ে যায়। বড় আয়নার দিকে ইশারা করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“আয়নায় একবার নিজেকে দেখো। তারপর নাহয় আমাকে দোষ দিও!”
আলো কপাল কুঁচকে আয়নার দিকে তাকাতেই চোখ দুটো কপালে উঠে গেল। সে ফ্যালফ্যাল চোখে নিজের দিকে তাকিয়ে রয়! গলায়, হাতের উন্মুক্ত বাহুগুলোতে র্যাশে ভরে গেছে। চোখদুটোও ভীষণ লাল হয়ে আছে। চেহারা হালকা ফোলা-ফোলা! সে এতক্ষণ রাগের মাথায় অনুভব-ই করেনি, তার শরীর বাজেভাবে চুলকাচ্ছে। আলো তড়িঘড়ি করে গলা চুলকাতে শুরু করল। আধার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টি-টেবিলের ওপর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে এসে আলোর সামনে খোলা ঔষধ বাড়িয়ে ধরে বলল,
-“খেয়ে নাও!”
আলো কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল,
-“ক-কিসের ঔষধ?”
আধারের মেজাজ বিগড়ে গেল। এমনিতেই মেয়েটা দুই লাইন বেশি বুঝে উল্টাপাল্টা বকে যাচ্ছে। তাই সে রাগে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
-“এটা বার্থ কন্ট্রোল পিল! একটু আগে না বললে আমি তোমার ঘুমের সুযোগ নিয়েছি? তাহলে তো এখন এটা খেতে হবে। নয়তো দেখা যাবে প্রেগন্যান্ট হওয়ার অপরাধেও আমার নামে মামলা ঠুকে দিলে।”
স্যারের এহেন কথা শুনে আলো পুরাই বাকরূদ্ধ হয়ে গেল। পর মূহুর্তে নাকমুখ কুঁচকে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“আপনার মাইন্ড তো আমার মুখের থেকেও মাশাআল্লাহ স্যার!”
#চলবে

