#এল এ ডেইস
পর্ব ৩৬
লেখনী মাহীরা ফারহীন
উইকেন্ড ডেতে প্রতিটা দর্শনীয় স্থানেই পা ফেলা যায় না এমন অবস্থা নতুন কিছু নয়। আজও তেমনই এক অবস্থা। ক্যালিফোর্নিয়া সর্বদাই বড় বড় থিম পার্কের জন্যে বিশ্ববিখ্যাত। পরিষ্কার প্রগাঢ় নীল আকাশ। নীল আকাশের ক্যানভাসে সাদা সাদা রেখা। ফুরফুরে বাতাস বইছে। মাত্র রায়েদ ও মাহীন হাঁটতে হাঁটতে ডিজনিল্যান্ডের সামনে পৌছালো। এটা ক্যালিফোর্নিয়ার ‘এনাহেইম’ শহর। স্যান্টা মনিকা থেকে মেট্রোতে চল্লিশ মিনিট লেগেছে এখানে এসে পৌঁছতে। টিকেট কেটে ওরা দুজন গেটের দিকে এগিয়ে গেল। মিষ্টি উষ্ণ রোদে মেখে আছে চারিদিক। বিকেল পাঁচটা বাজে সবে। ডিজনিল্যান্ডের গেট একটি বড় প্রাসাদের মতো। এই প্রাসাদের তলদেশ হতেই ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। মানুষের ভিড় স্রোতের মতো ভেতরে প্রবেশ করছে। রায়েদ ও মাহীন ভেতরে প্রবেশ করল। সম্পূর্ণ জায়গাটিতে মার্বেল পাথরের মেঝে। ঠিক ডিজনি মুভি গুলোর ঘরবাড়ি মতো করে সারি সারি ঘরবাড়ি বানিয়ে একটি ছোটখাটো টাউন তৈরি করা হয়েছে। এদিক ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা উজ্জ্বল সবুজ পাতায় ছাওয়া গাছগুলোর পাতাকে ছেঁটে চতুর্ভুজ আকৃতির করা হয়েছে। মাহীন উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,’আহ মনে হচ্ছে কোনো ডিজনি মুভির শহরে চলে এসেছি।’
রায়েদ বলল,’হুম আমি শেষ যখন এসেছিলাম তখনকার থেকে অনেক কিছুই পাল্টে ফেলা হয়েছে। যদিও প্রাসাদের মতো গেটটা একই রয়েছে।’
ওরা ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাচ্ছে। মাহীন বলল,’প্রিন্সেস মুলানের সেটটা যেখানে ওখানে গিয়ে আমরা ছবি তুলবো। এই জায়গা খুব সুন্দর।’
রায়েদ বলল,’ওইটা তো বোধ-হয় আশেপাশেই কোথাও রয়েছে।’
কিছুক্ষণ পরপরই এদিক ওদিক থেকে বিভিন্ন ডিজনি চরিত্র যেমন, মিকিমাউস, ওলাফ, জুটোপিয়ার ফক্সের পোশাক পরা মানুষদের দেখা যাচ্ছে। তাড়া সাধারণত ছোট বাচ্চাদের আদর করছে এবং তাদের সাথে খেলছে। কোথাও কোথাও কোনো না কোনো মুভির মিউজিক বাজচ্ছে মৃদু স্বরে। মাহীন কোলাহলের মাঝে কান পেতে শোনার চেষ্টা করে বলল, ‘এটা ‘আপের’ মিউজিক না?’
রায়েদ বলল,’হ্যা। ওইটাই তো মনে হচ্ছে।’
মাহীন সামনে ইশারা করে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
‘দেখো আপের বেলুন বাড়িটা!’
রায়েদ সামনের দিকে তাকাল। একটা বারো তেরো ফুট উঁচু নানা রঙের রঙিন বাড়ি। তারপর ছাদের চিমনি মুখ থেকে প্রায় শতশত রঙিন বেলুন উড়ছে। দূর থেকে দেখলেও এই নানা রঙের বেলুনের সমাহারটা চোখে লাগার মতো। রায়েদ বলল,’এবং দেখো বাড়ির দরজার সামনে বারান্দায় রাসেলও রয়েছে।’
মাহীন হেসে বলল,’হ্যা। কি কিউট বাচ্চাটা।’
ওরা সামনে এগিয়ে গেল। রায়েদ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
‘আচ্ছা তুমি তিনদিন আগে আমাদের বাসায় এসেছিলা। তাই না?’
মাহীন ইতস্তত করে বলল, ‘হ্যা গিয়েছিলাম তো।’
রায়েদ বলল,’হুম জানালা দিয়ে দেখলাম তুমি, রাবিত এবং দাদি বসে খুব জরুরি কিছু আলোচনা করছিলা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে তুমি আমার সাথে না দেখা করেই চলে গেলা।’
মাহীন জ্বিব কামড়াল। তারপর কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে অবশেষে বলল,’হ্যা গিয়েছিলাম মিসেস মাদির সঙ্গে কথা বলতে। পরে রাবিতও আমাদের জয়েন করেছিল।’
রায়েদ বলল,’তো সেদিন তুমি দাদির সাথে যেই কথা বলতে যাচ্ছিলে সেটা তোমার বাকিই ছিলো?’
মাহীন সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল। রায়েদ চোখ সরু করে ওর দিকে চাইল। বলল,’উমহু তুমি আসলে কী করছো বলোতো? অন্য কোনো কারণে তুমি ওখানে গিয়েছিলা। যেটা তুমি আমাকে বলছো না।’
মাহীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘অন্য আর কী কারণ থাকতে পারে।’
রায়েদ সামনের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলল, ‘হ্যা এর আগে যতবার এভাবে বলেছো যে, তুমি কিছুই করছো না। ততবারই দেখা গিয়েছে তুমি আসলে কিছু একটা তো ঘটনা ঘটাচ্ছ।’
মাহীন অবশেষে বলল,’আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোমার বাসায় অন্য কারণেই গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমার সাথে দেখা করিনি কারণ আমি তখন তোমাকে ব্যাপারটা জানাতে চাইনি।’
রায়েদ সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল। বলল, ‘তাহলে এখন বলো।’
মাহীন ইতস্তত করে বলল,’এখনো বলতে পারবো না। দেখো তুমি আমাকে দুই মাস সময় দাও। তারপর আমি তোমাকে শান্তিতে সব বলবো। তখন জানলে তোমার যেমনটা লাগবে এখন জানলে আর ওমন লাগবে না।’
রায়েদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বলল,’দুইমাস! মনে হচ্ছে অনেক বড় কিছু করছো। আল্লাহই জানে কী করছ।’
মাহীন কিছুই বললো না। দেখা গেল ওদের থেকে কিছুটা দূরেই ‘মুলান’ মুভির সেটটা শুরু হয়েছে। মাহীন প্রসন্ন কন্ঠে বলল, ‘দেখো আমরা মুলানের কিংডোমে পৌঁছে গিয়েছি।’
বলে আগে আগে এগিয়ে চললো। এই জায়গাটার পরিবেশটাই অন্য রকম। ঘরবাড়িগুলো মাটির। কিছু কিছু ঘরের ওপর খড়ের ছাদ। মাঝে লম্বা লম্বা ঝুলন্ত পাতাওয়ালা গাছে ঘেরা বড় একটা ঐতিহাসিক চাইনিজ বাড়ি। ঠিক প্রাচীণ চাইনিজ বাড়িগুলো যেমন হতো সেরকম। এর পাশের সবুজ পানির একটা কৃত্রিম পুকুরও রয়েছে। রায়েদ বলল,’তো এখানেই ছবি তুলবা তুমি?’
মাহীন নিজের সেলফোনটা হাতে নিয়ে বলল,
‘হ্যা।’ তারপর একজন মধ্য বয়সি মহিলাকে দেখে বলল,’এক্সকিউজ মি।’
মহিলা থেমে দাঁড়ালেন তার সাথে আরেকজন ফর্সা লোকও থেমে দাঁড়াল। মাহীন বলল, ‘আপনি কী আমাদের কিছু ছবি তুলে দিতে পারবেন?’
মহিলা আন্তরিকতার সঙ্গে বলল, ‘অবশ্যই।’ বলে মাহীনের হাত থেকে মোবাইলটা নিল। মাহীন ও রায়েদ পাশাপাশিই সেই সবুজ পানির কৃত্রিম পুকুরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মহিলা একটা ছবি তুলে বললেন,
‘আরেহ তোমরা এত দূরে দূরে কেন? একসাথে লেগে দাঁড়াও।’
ওরা আসলেই পাশাপাশিই দাঁড়িয়ে ছিল তবুও কয়েক ইঞ্চির দূরত্বে। এবার ওরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াল। মহিলা ছবি তুলছেন। ওনার সাথে থাকা লোকটা বলল,
‘হেই তোমরা কী ধরনের কাপল? সিরিয়াসলি তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে দুজন অপরিচিত মানুষ প্রয়োজনে ছবি তুলতে হচ্ছে বলে তুলছে।’
মাহীন কিছুটা বিচলিত হলো। রায়েদ এক মুহূর্ত দ্বিধা করে ওর ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। মাহীন ওর বাহু জড়িয়ে ধরে হাসি মুখে দাঁড়াল। এবার মহিলা আরো কয়েকটা ছবি তুলে মোবাইলটা ফেরত দিতে দিতে বললেন,’ইট ওয়াজ এ লিট!’
রায়েদ ধন্যবাদ জানালা। ওনারা চলে গেলেন। মাহীন ও রায়েদও আবার হাঁটতে শুরু করল। মাহীন ভুলেই গিয়েছে যে ও রায়েদের বাহু জড়িয়ে ধরে আছে। রায়েদ খেয়াল করল বিষয়টা কিন্তু কিছুই বললো না। ওদের সামনে দিয়ে মিকিমাউসের স্ক্রুজ ম্যাকডাকের পোশাক পরা কেউ যাচ্ছে। রায়েদ বলল,’মাহীন দেখো স্ক্রুজ ম্যাকডাক। একে ছোট বেলায় আমি এত ভয় পেতাম যে এখানে এলেই শুধু আতঙ্কে থাকতাম কখন না সামনে এসে পরে।’
মাহীন হেসে বলল,’তাই? লিটল মার্মেইডে যে একটা ডাইনি ওয়ালা অক্টোপাস ছিলো ওকে আমার খুব ভয় লাগলো।’
‘ওকে অনেকেই ভয় পেত।’ বলল রায়েদ।
এবার ওরা ‘কারস’ মুভির সেটের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। এখানে কারস মুভির বিভিন্ন গাড়িতে করে সকলে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। জায়গাটাকে গাড়ি ঠিক করার দোকানের মতো সাজানো হয়েছে।
সামনে হাওয়াই মিঠাই তৈরি হচ্ছে।মাহীন হাঁটতে হাঁটতে বলল,
‘চলো না আমরা হাওয়াই মিঠাই নেই।’
রায়েদ সেদিকে তাকিয়ে বলল,’হ্যা চলো।’ ওরা এগিয়ে গেল সেখানে। স্নো হোয়াইটের মতো পশাক পরা একজন কিশোরী হাওয়াই মিঠাই তৈরি করছে। এখানে ছেলে মেয়েদের বেশ ভির রয়েছে। ওরা দুজন একটাই হাওয়াই মিঠাই কিনল। রায়েদ সেটা ধরে রেখেছে। মাহীন বলল,’হাওয়াই মিঠাই দেখে অকুয়ামারিন এর কথা মনে পরল। দেখেছ ওটা?’
রায়েদ বলল,’হ্যা দেখেছি। অকুয়ামারিনের কটন ক্যান্ডি খাওয়ার দৃশ্যর কথা মনে পরেছে?’
মাহীন মুখে হাওয়াই মিঠাই দিয়ে সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল। রায়েদ বলল,’ওটা বেশ ক্রিন্জি না?’
মাহীন হালকা হেসে বলল,’তা বটে। তবুও ওটা আমার অতি পছন্দের মুভি। ওটা দেখার পর ফ্লোরিডা কী ভালোটাই না লেগেছিল।’ শেষ কথাটা আফসোসের সঙ্গে বলল।
রায়েদ হেসে বলল,’তারপর তুমি জানতে পেরছ যে ওটা অস্ট্রেলিয়ায় শুট করা হয়েছিল?’
মাহীন সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল। রায়েদ বলল,’আগে অনেক মুভি দেখা হতো। এখন কদাচিৎ দেখা হয়।’
মাহীন জিজ্ঞেস করল,’হলে গিয়ে দেখো?’
রায়েদ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘শেষ গিয়েছিলাম বোধহয় গত বছর ডিসেম্বরে।’
মাহীন হতাশ কন্ঠে বলল, ‘আমি কখনো হলে গিয়ে মুভি দেখিনি।’
রায়েদ অবাক হয়ে বলল,’সিরিয়াসলি? মানে তুমি কখনো মাছ ধরতে দেখোনি কাউকে। এবং মুভি হলে গিয়ে মুভিও দেখোনি?’
মাহীন নিরাশ কন্ঠে বলল, ‘আরো অনেক কিছুই সকলে সাধারণ ভাবেই করে থাকে যেটা আমি কখনো করিনি।’
রায়েদ বলল,’ওয়েল এখানে ভালো ভালো হলের অভাব নেই। কখনো গিয়ে দেখিও।’
মাহীন বলল, ‘অবশ্যই। কেমন হয় যদি আমরা মুভি দেখতে যাই?’
রায়েদ ওর দিকে ভ্রু উঁচু করে তাকাল। মুচকি হেসে বলল,’অসাধারণ হয়।’ তারপর একটু থেমে আবার বলল,’তোমার অসম্পূর্ণ ইচ্ছাগুলো বোধহয় আমাকে নিয়েই পূরণ করবা।’
মাহীন ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি বজিয়ে রেখে বলল,’সম্ভবত।’
ওরা হেঁটে চলেছে একটি ব্রিজের ওপর দিয়ে। ছোট কাঠের ব্রিজ। তার নিচে কৃত্রিম সবুজ পানির পুকুর। তার ওপাশে স্নো হোয়াইটের সেই বাড়ি এবং তার সামনে অনেকগুলো ছোট ছোট বামন দাঁড়িয়ে আছে।
মাহীন বলছে,’আমার মনে হচ্ছে ক্যালিতে আসার পর তোমার সাথেই সবচাইতে বেশি ঘুরতে যাওয়া হয়েছে আমার।’
রায়েদ মুচকি হেসে বলল,’ওহ কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে মাত্র কয়েকবারই একসাথে সময় কেটেছে আমাদের।’
মাহীন বলল,’হুম তা ঠিক তবে খেয়াল করে দেখ সেই কয়েকবারই কিন্তু অন্যদের তুলনায় বেশি।’
তখন প্রায় ছয়টা বিশ বাজে সূর্য অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই সময় সূর্য যেই সোনালি রোদ বিকিরণ করছে তার আলোয় চারিদিকের সবকিছুকেই সোনালি লাগছে। নীল আকাশে ছন্নছাড়া তুলোর মতো ছোট ছোট মেঘ। সরাসরি অস্তগামী সূর্যের আলো গায়ে পরলে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। মনটাও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে। রায়েদ বলল,’হিয়ার উই গো এগেইন!’
মাহীন বলল,’ঠিক আবার আমরা এবং সূর্যাস্ত মুখোমুখি।’
রায়েদ বলল,’এটা আমাদের তৃতীয় বার একসাথে সূর্যাস্ত দেখা।’
ওরা ডিজনিল্যান্ডের মাঝে থাকা ছোট লেকটার সামনে দাঁড়িয়ে। লেকের ওপারে বড় ফেরিস হুইল এবং রোলারকোস্টার টা দেখা যায়। মাহীন হঠাৎ উত্তেজিত কন্ঠে বলল,’রায়েদ! ফেরিস হুইল!’
রায়েদ অবাক হয়ে বলল,’তুমি ফেরিস হুইলে উঠবা?’
মাহীন উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, ‘হ্যা। চলো ফেরিস হুইল থেকে সূর্যাস্ত দেখি।’
রায়েদ বলল,’তাহলে তাড়াতাড়ি চলো। ওটা এবার চালু হয়ে সূর্য ডোবার পর নিচে নামবে।’
ওরা দ্রুত গতিতে হাঁটতে লাগল। গোলাকার ছোট লেকটা পার করে ফেরিস হুইলের সামনে এসে দাঁড়াল। ওটাকে এখন বিশাল চাকার মতো দানব বলে মনে হচ্ছে। ফেরিস হুইলের কেন্দ্রতে মিকিমাউসের একটা মুখের একটা মূর্তি। ওরা টিকেট কাটলো পাশের কাউন্টার থেকে। তারপর হুইলের একটা বুথে উঠে বসল। রায়েদ জিজ্ঞেস করল,’তোমার ভয় লাগে না তো?’
মাহীন হেসে বলল,’ভয় লাগবে কেনো? আমার তো ছোট বেলা থেকেই ফেরিস হুইল এবং রোলারকোস্টার দুটোই পছন্দ।’
রায়েদ বলল,’এখন বলো আবার রোলারকোস্টার এ উঠবা। আমার কিন্তু মাথা ঘোরে।’
মাহীন বলল,’ঠিক আছে ঠিক আছে। চিন্তা করো না। আমরা রোলারকোস্টার এ উঠবো না।’
তখনই একটা জোরে যান্ত্রিক শব্দ হলো। এবং ফেরিস হুইলটা চলতে শুরু করল। ওদের বুথের বাম দিক দিয়েই পরিষ্কার ভাবে দেখা যাচ্ছে এনাহেইম শহরের ঘরবাড়ি এবং আকাশ গিয়ে দিগন্তে মিশেছে। আকাশের বুক থেকে লাল টকটকে সূর্যটা যেন ধিরে ধিরে শহরের মধ্যেই পিছলে পরে যাচ্ছে। আকাশের বর্নিল পটভূমিতে সোনালি রোদে মাখা মেঘগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। মাহীন মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ রায়েদের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। দেখলো রায়েদ ওর দিকেই আবিষ্টমনে তাকিয়ে আছে। মাহীন বলল,’এর আগেও বলেছি না আমি সূর্যাস্ত, সূর্যোদয় থেকে বেশি সুন্দর নই। আমার দিকে তাকিয়ে না থেকে ওদিকে দেখো।’ রায়েদ মাহীনের হাত দুটো ধরল। আমুদে গলায় বলল, ‘ওহ তাই? তোমাকে কে বলেছে তুমি সূর্যাস্ত থেকে কম সুন্দর।’
মাহীন লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। সূর্যের সোনালি আলো সরাসরি ওদের ওপর পরেছে। মাহীনের গালে হালকা লালাভা ফুটে উঠলো। ফেরিস হুইলটা ঘুরছে। ধীরে ধীরে বুথটা উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। মাহীন বলল,’আমি আগে থেকেই জানতাম আমাকে খুন করার একটা মতলব তোমার ছিলো। এখন দেখছি সেটা ইমোশনালি খুন।’
রায়েদ হাসল এবং বাইরে ডুবন্ত সূর্যের দিকে দৃষ্টি ফেরাল।কিছুক্ষণ পর সূর্য সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেল। তবে কিছুক্ষণ পূর্বে যেখানে অবস্থান করছিল সেখানটায় লাল আবির ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। লাল আকাশের বুকে সোনালী আঁচড়। মাহীন প্রসন্ন কন্ঠে বলল,
‘তিনবার সূর্যাস্ত দেখা এবং একবার সূর্যোদয় দেখা হলো।’
রায়েদ আমুদে বলল,’সিমস লাইক তোমাকে নিয়ে এখন আবার সূর্যোদয় আবার দেখা লাগবে।’
মাহীন মুচকি হেসে বলল,’সূর্যোদয়টাও প্রতিদিনই হয়। দুঃখের বিষয় হলো সেটা ধরতে হলে কিছু কাঠখড় পোড়াতে হয়।’
রায়েদ বলল,’তা বৈকি।’ তারপর হঠাৎ মাহীনের দিকে চেয়ে থেকে ভাবনায় ডুবে গেল, কিছু কিছু মানুষ এমনই যাদের পারসনালিটিটাই অন্য রকম। তারা একবার কিছু বলে দিলে মনে হশ সেটা যতই অসম্ভব হোক না কেন সে ঠিকই উতরে যাবে। মাহীনও ঠিক সেরকম। ওর সাথে থাকলে মন হয় সবই সম্ভব। ও ঠিক জাদুর মতো কাজ করে। ওর অওরাটাই ম্যাজিকাল। যখন থেকে ওর সাথে দেখা হয়েছে তখন থেকেই মনে হয়েছিল ও যেভাবেই হোক আমার জীবনের রঙই পাল্টে দেবে। আমার বেরঙ জীবনের কতশত রঙের সমাহর ঘটিয়ে দিলো। আসলেই ওকে এখন আর সন্দেহ করার সাহস হয় না। ও যাই করছে ভেবে চিন্তেই করে। শুধু যে ওর দ্বারাই সব সম্ভব তাই নয়। এখন তো আমারও মনে হতে শুরু ওর জাদুর প্রভাবে ওকে ভালোবেসে ফেলাটাও আমার জন্য অসম্ভব নয়।’
সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার পর ওরা ডিজনিল্যান্ডে আর থাকলো না। এখান থেকেই কাছাকাছি কোনো রেস্টুরেন্ট থেকে ডিনার করেই তারপর ট্রেন ধরবে ঠিক করল ওরা। ডিজনিল্যান্ডের আশেপাশের এলাকা অতি জাঁকজমকপূর্ণ। চারিদিকে যতই এগিয়ে যায় রাস্তার দুপাশে থাকা গাছগুলো মরিচ বাতিতে জর্জরিত। ওরা ওখানেই একটা টার্কিশ রেস্টুরেন্টে ঢুকল। মূলত মাহীনের ইচ্ছায়। কাঁচের দেয়ালের পাশেই একটা টেবিলে বসেছে ওরা। কাঁচের দেয়াল ভেদ করে ওদের পাশ দিয়েই ফুটপাথ ধরে মানুষজন এগিয়ে যাচ্ছে। ফুটপাথের পাশের গাছগুলোর মরিচ বাতিগুলো ঝলমল করছে। রেস্টুরেন্টটাও বেশ জমজমাট। মাহীন প্রফুল্ল কন্ঠে বলছে,
‘তো এবার তুমি আমাকে টার্কিশ খাবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবা।’
রায়েদ মুচকি হেসে বললো,
‘ওয়েল ঠিক আছে। মেনুতে দেখা যাক এখানে কী কী আছে।’ বলেই ও মেনুটা হাতে তুলে নিল।
মাহীনও টেবিলে রাখা আরেকটা মেনু হাতে নিয়ে দেখতে লাগল। তারপর মেনুটা মুখের সামনে ধরে রেখেই বলল,’ইসকেন্দার কেবাব কেমন?’
রায়েদ বলল,’উম মজা তো।’
‘তাহলে এটা নিব।’
রায়েদ বলল, ‘ইনেগোল কোফতে?’
এক মুহূর্তের জন্য মেনুটা মুখের সামনে থেকে সরিয়ে বলল,’কোফতা আমার ভয়াবহ পছন্দ! যেমনই হোক আমি নিব।’
রায়েদ মুচকি হাসল। এবার মাহীন জিজ্ঞেস করল,
‘আচ্ছা তোমার কী পছন্দ?’
রায়েদ একটু ভেবে বলল,’মান্তি।’
‘এটা খেতে কেমন?’
‘এটা একধরনের ডাম্পলিং। বিফ দিয়ে তৈরি করা হয় তবে একটু ক্রিমি ক্রিমি হয়।’
মাহীন বলল,’এটাও অর্ডার দাও।’
রায়েদ সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল।
মাহীন আবার বলল,’এবং মেনেমেনটাও অর্ডার দিবো।’
রায়েদ বলল,’এতগুলো খাবার তুমি আদৌ শেষ করতে পারবা তো?’
মাহীন বলল,’তুমিও তো আছো সাথে।’
রায়েদ হালকা হেসে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ওরা এরপর খাবার অর্ডার দিল। এবার মাহীন জিজ্ঞেস করল,’আচ্ছা তুমি কখনো তুরস্ক গিয়েছো?’
রায়েদ বলল,’নাহ। আমরা টার্কিশ ঠিকই। টার্কিশ বলতেও পারি ঠিকই। কিন্তু সেই দেশের সিটিজেন না।’
মাহীন সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল। তারপর বলল,
‘আচ্ছা আমাকে কিছু ইউনিক টার্কিশ ফ্রেজ শিখাও।’
রায়েদ হাসল। বলল,’তুমি আমার কাছ থেকে টার্কিশ শিখবা?’
মাথা জোড়ে জোড়ে ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
‘না এখন না। আমি বলছি শুধু কয়েকটা ফ্রেজ শিখাও।’
রায়েদ কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর হাসি মুখে বলল,
‘বলো ‘গুলে গুলে গ্যদিন।’
মাহীন ততক্ষণাৎ বলল,’গুলে গুলে গ্যদিন!’
রায়েদ বলল,’চমৎকার! এটার ঠিক মানে হলো যে ‘আগামীকালও আরেকটা নতুন দিন। মানে নতুন আশা। এমন মোটিভেশনাল ক্ষেত্রেই এটা ব্যবহার করা হয়।’
মাহীন উৎফুল্ল কন্ঠে বলল,’আরেকটা শেখাও!’
রায়েদ এবার কিছুক্ষণ ভাবার পর ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ণ ফিচেল হাসি টেনে বলল,’সেনি সেভিওরুম।’
মাহীন চোখ সরু করে তাকাল। বলল,’সেনি সেভিওরুম?’
রায়েদ বলল,’হ্যা এটার মানে গেট ওয়েল সুন।’
মাহীন ভাবালু কন্ঠে বলল,’এটা বেশ শোনা শোনা একটা বাক্য।’
রায়েদ প্রশ্ন করল,’কোথায় শুনেছ?’
মাহীন হেসে বলল,’টার্কিশ ড্রামাতে।’
রায়েদ ভ্রু উঁচু করে বলল,’ওরে বাবা! তুমি টার্কিশ ড্রামা দেখ?’
‘আগে দেখা হত। এখন অনেকদিন যাবত দেখিনি। তাই টার্কিশ ভাষা শুনেই বুঝতে পারি এটা কোন ভাষা। এবং হালকা পাতলা কয়েকটা শব্দ এবং বাক্যও জানি।’
রায়েদ বলল,’তো সেনি সেভিওরুম শেখা হয়ে গিয়েছে?’
মাহীন বলল,’এটা তো অনেকবার শুনেছি। কিন্তু এটার মানে কী এমনই ছিলো?’ প্রশ্নটা যেন ও নিজেকে করল।
রায়েদ বলল,’ওহ তোমার সন্দেহ আছে?’
‘না না আমি তাই বলিনি।’
রায়েদ নিজের মোবাইলটা ক্ষণিকের জন্য বের করল। হয়তোবা সময় দেখল বা অন্য কিছু। তারপর সামনে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল,’হ্যা তো যেটা বলছিলাম। তাহলে দশবার সেনি সেভিওরুম বলো।’
মাহীন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, ‘দশবার?’
‘হ্যা।’
‘কিন্তু কেন?’
‘ওফ তুমি অনেক প্রশ্ন করো। এটা আমার প্রিয় একটা ফ্রেজ। তাই দশবার বললে তোমার মনে থাকবে।’
মাহীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা শুরু করল,’ঠিক আছে।’ তারপর এক মুহূর্ত থেমে বলতে শুরু করল,
‘সেনি সেভিওরুম,
সেনি সেভিওরুম,
সেনি সেভিওরুম,
সেনি সেভিওরুম,
সেনি সেভিওরুম,
সেনি সেভিওরুম,
সেনি সেভিওরুম,
সেনি সেভিওরুম,
সেনি সেভিওরুম,
সেনি সেভিওরুম।’ বলে মাহীন আবার এক লম্বা নিঃশ্বাস বুক ভরে নিল। রায়েদ হাসল। বলল, ‘অন ফ্লিক!’
মাহীন হালকা হাসল। এরপরই ওদের খাবারগুলো দিয়ে যাওয়া হলো। ওরা তৃপ্তি করেই খাওয়া দাওয়া শেষ করল। সন্ধ্যা বাড়ছে। আর কাল বিলম্ব না করে ওরা দুজনে সাড়ে পৌঁনে আটটার দিকে ট্রেন ধরল।
.
.
.
.
(অতিরিক্ত অংশ)
মাহীন নিজের বিছানায় আরামসে শুয়ে রয়েছে। বেশ ক্লান্ত লাগছে। যদিও এনাহেইম পাশের এলাকার মতোই তবুও সেটা আরেকটা শহর। বাড়ি থেকে এতদূর শুধু আরেকজন মানুষের সাথে এর আগে যায়নি কখনো।মাহীনের হঠাৎ মনে পরলো সেই দুটো টার্কিশ বাক্যের কথা। সেগুলো এখনো অব্দি গুগল ট্রান্সলেট করা হয়নি। মাথায় এই ভাবনার আগমন ঘটতেই বিছানায় পরে থাকা মোবাইলটা হাতে নিল। তারপর প্রথম বাক্যটা ‘গুলে গুলে গ্যডিন’ ট্রান্সলেট করল। সেটা রায়েদ যা বলেছিল তাই মানে। এবার ‘সেনি সেভিওরুম’ ট্রান্সলেশন করল। এটার মানে দেখেই মাহীনের চোখ কপালে উঠল। আপনাআপনি মুখ দিয়ে উচ্চস্বরে বেরিয়ে আসল,’আই লাভ ইউ! এটার মানে আই লাভ ইউ! ও আমাকে দিয়ে দশ দশ বার আই লাভ ইউ বলিয়েছে। ওফ ওফ! কিন্তু রিয়েলি এটা কী সত্যি? ও আসলেই আমাকে পছন্দ করে তাহলে? কারণ শুধু আমাকে দিয়ে নয় বরং নিজেও বলেছে সেনি সেভিওরুম!
চলবে ইনশাআল্লাহ।
#এল_এ_ডেইস
পর্ব ৩৭
লেখনী মাহীরা ফারহীন
মাত্র প্রচন্ড শব্দে ঘন্টা বাজতেই সকল ক্লাসে হইচই পরে গেল। শিক্ষকরা সকলেই একে একে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাদের পরপরই শিক্ষার্থীরাও স্রোতের মতো বেরিয়ে আসছে। ছুটির ঘন্টা পরেছে। মাহীন নিজের ক্লাস থেকে বেরিয়ে র্যবিটকে খুঁজছিল। র্যবিটের ক্লাসের আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পাশের করিডর দিয়ে ধীরে সুস্থে হেঁটে আসতে দেখা গেল তাকে। গুনগুন করে আবার গানও করছে,
‘উড়ি উড়ি যায়, উড়ি উড়ি যায়।
উড়তি পাতাং দ্যাখো উড়ি উড়ি যায়।’
মাহীন অবাক হয়ে বলল, এ্যই তুমি কী গান গাইছ?’
রাবিত থেমে গিয়েছে। বলল, ‘তুমি চিনবা না। একটা হিন্দি গান।’
‘আমি চিনবো না মানে? তুমি হিন্দি পারো?’
‘হ্যা। আমার মা উর্দু পারে জানো তো। আর সিরিয়াসলি আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম এটা দেখে যে এই হিন্দি আর উর্দু একেবারেই সেম।’
মাহীন হেসে বলল, ‘হেল! তুমি আমাকে আগে বলবা তো। জানো না যে আমিও হিন্দি পারি!’
রাবিত উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, ‘ওহ ওয়াও। দেন তুমি এই গানটা শুনছো আগে?’
‘অফ কর্স!’
মাহীন বলল, আচ্ছা এখন এটা বলো আন্টির কী অবস্থা চলছে?’
র্যবিটকে হতাশ দেখা গেল। শুকনো কন্ঠে বলল,
‘গতকালও মাকে নিয়ে পার্কে গিয়েছিলাম। সেলিও এসেছিলেন।’
মাহীন আগ্রহী কন্ঠে বলল, ‘তো সব কেমন গেল?’
রাবিত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বলল,’ওখানে তো সব ঠিকই গিয়েছে। এখন আমি আপ্রাণ চেষ্টায় আছি ওনাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর জন্যে রাজি করাতে।’
লিম সামনের চত্ত্বর থেকে চিৎকার দিয়ে বলল,
‘মাহীন আজ বিকেল চারটায় কিন্তু!’
মাহীন ও রাবিত দুইজনই সেদিকে দৃষ্টি ফেরাল। ওরা খোলা করিডর ধরে হাঁটছে। সামনে চত্ত্বরে কড়া রোদ পরেছে। মাহীন মাথা হেলিয়ে সায় জানাতেই লিম জু দ্রুত গতিতে গেটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আবার উষ্ঠা খেয়ে পরল। মাহীন ভ্রু কুঁচকে তাকাল সেদিকে। সবসময়ের মতোই মিনি স্কার্ট পরে আছে। নির্ঘাত হাঁটুটা ছিলে গিয়েছে। রাবিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘অনেক দিন পর আবার এক্সিডেন্ট করল।’
‘কীভাবে যে চলা ফেরা করে আল্লাহই জানে।’ তারপর থেমে আবার বলল,’তো, মিসেস মাদিহ ওনাকে একবারও কিছু বলেছেন?’
‘এখনো সেভাবে কিছু বলেননি। তবে তিনিও ভাবছেন সেভাবে মাকে বুঝিয়ে বলবেন।’
মাহীন সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল। তারপর বলল,
‘উনি রাজি হলে আমাকে জানিও।’
‘অবশ্যই।’
ওরা হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। এবার মাহীন বলল,’এই আজকের বিকেলে নাকি তোমার ডেট আছে?’
রাবিত ইতস্তত হাসল। বলল,’হ্যা আছে তো। কিন্তু আমি তো তোমাকে বলেছিলাম সাহায্য করতে। এখন দেখছি ব্যাপারটা সাইলোহ, জেনেট আর লিম সামলাচ্ছে?’
মাহীন টিটকারির সুরে বলল,’আমি এমনিই মিসেস রহমানকে কিভাবে সুস্থ করে তোলা যায় সেই চিন্তায় বাঁচি না আবার তোমার ডেট ফিক্স করা। তাও তো শোকর করো তোমার জন্য একটা রফাদফা করেছি।’
রাবিত হঠাৎ বলল,’আচ্ছা শোনো এই ব্যাপারে ভাইকে কিছু বলো না।’
‘তোমার ডেটের ব্যাপারে?’
‘উম হ্যা।’
মাহীন ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
‘কিন্তু কেন? ও জানলে কী হবে?’
রাবিত ইতস্তত করে বলল,
‘কি আর হবে প্রথমে আমাকে দুটো থাপ্পড় দিবে। তারপর ঝাড়ি দিবে দশ মিনিট। এরপর লেকচার দিবে পঁচিশ মিনিট।’
তারপর একটু থেমে বলল,’ইভেন আমাকে সাহায্য করার জন্য তোমার ওপরও রেগে যেতে পারে।’
মাহীন হেসে উঠল। বলল,’আমি তো তোমাকে সাহায্য করিইনি! তোমাকে সাহায্য ওরা করছে আমি নাহ। আমি এগুলো কিছুই জানি না। ইভেন ভুলেও গিয়েছি তুমি আমাকে এমন কিছু বলেছো।’ বলেই ঝড়ের বেগে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। রাবিত হা করে দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, ‘দেখো তো কিভাবে পাল্টি খেলো। ভাই যেমন বালদিজও পেয়েছি তেমন।’ ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
.
.
.
.
মিউ!’ বলে উঠল টঙ্কস। মাহীন টঙ্কসের মখমলের মতো নরম গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,’তোর আবার মিকিমাউসের সঙ্গে শত্রুতা কবে থেকে?’
‘মিউ’ লেজ নেড়ে আবার বলল টঙ্কস।’
মাহীন বলল,’ওহ হ্যা আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম মিকিমাউস আসলে ইঁদুর।’
মাহীন টঙ্কসকে নিয়ে নিজের বিছানার ওপর বসে আছে। এবং বোর হচ্ছে। খোলা জানালা দিয়ে শুধু ঝলমলে রোদই আসছে। কিন্তু এক বিন্দু বাতাস হচ্ছে না বাইরে। হঠাৎ টিং করে নোটিফিকেশনের শব্দ হলো। মাহীন ততক্ষণাৎ চার্জার থেকে ফোনটা খুলে নিল। দেখল রাবিত টেক্সট করেছে,’গেস ওয়াট? বুম! মা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে রাজি হয়েছে!’
মাহীন ম্যাসেজটা দেখা মাত্র লাফ দিয়ে উঠল। টঙ্কস ওর কোল থেকে পরে গেল এবং ভয়ে পেয়ে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে গেল। মাহীন প্রায় লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামল। ওর সারা মুখে উচ্ছ্বসিত হাসি ছড়িয়ে পরেছে। ধুপধাপ পদক্ষেপ ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। এবং সোজা গিয়ে মা-বাবার বেডরুমের দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজাটা খোলাই ছিল। মিসেস নাসরিন বিছানায় বসে কাপড় গোছাচ্ছেন। মাহীন ভেতরে প্রবেশ করে বিছানায় ধপ করে বসল। মিসেস নাসরিনের কামরা সবসময় পরিপাটি করে গোছানো থাকে। বিছানারও বেড শীট টান টান করে গুছানো ছিল। মাহীন ঝড়ের মতো অবতরণ করতে কিছুটা ঘেঁটে গেল। মিসেস নাসরিন বললেন, ‘হঠাৎ করে তুই তিড়িংতিড়িং করছিস কেন? কী হয়েছে?’
মাহীন প্রফুল্লচিত্তে বলল,’মা! জানো কী হয়েছে!’
মিসেস নাসরিন ভাবলেশহীন মুখে জিজ্ঞেস করলেন,
‘না জানি না। কি হয়েছে?’
মাহীন এখনো একই স্বরে বলল,’রায়ে…আই মিন ওইযে তোমাকে যেই ফ্রেন্ডের মায়ের মানসিক সমস্যা আছে বলেছিলাম না?’
‘হ্যা তো?’
‘আমি ওই ফ্রেন্ডকে মিসেস বিঙ্গের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিয়েছি। এবং ওই ফ্রেন্ডটা জানাল ওর মা অফিশিয়ালি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে রাজি হয়েছেন!’
মিসেস নাসরিন এবার আনন্দিত কন্ঠে বললেন,
‘আলহামদুলিল্লাহ। এখন সেলি কী বলেছে?’
মাহীন বলল,’এখন পর্যন্ত সেলির সঙ্গে ওনার পার্কে দুইবার অনেক কাঠখড় পুরিয়ে দেখা করানো হয়েছে। সেলি বলেছেন যে, ওনার পুরোপুরি ঠিক হতে হলে নিয়মিত কাউন্সিলিং করতে হবে এবং কিছু ঔষধ দিতে হবে। যেটা তাকে অফিসিয়ালি দেখালেই দিতে পারবেন। এবং এখানে মিসেস র..মানে আমার ফ্রেন্ডের মায়ের ঠিক হতে দুই তিন মাস এট লিস্ট লাগবে।’
মিসেস নাসরিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,’যাক ভালোই হয়েছে।’ একটু বিরতি দিলেন। কিছু একটা ভাবলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন,’আচ্ছা এটা বললে সমস্যা কী সেটা তোর কোন ফ্রেন্ড?’
মাহীন বিভ্রান্ত হলো। মায়ের প্রশ্নসূচক দৃষ্টি থেকে চোখ সরিয়ে নিল। তারপর শান্ত কন্ঠে বলল,’কারণ আমিই প্রথম বাইরের মানুষ যাকে ও নিজে থেকে এই কথাগুলো বলেছে। তাছাড়া আমি জানি না তুমি কী মনে করবা এটা কে জানলে।’
মিসেস নাসরিন লম্বা এক শ্বাস ফেললেন। মাহীনের দিকে ভালো ভাবে ঘুরে বসলেন। বললেন,’কী এমন আর ভাবতে পারি? তোর ফ্রেন্ড তো কোথাও কোনো অপরাধ করেনি যে আমাকে ওর ব্যাপারে জানানো যাবে না।’
মাহীন পানসে কন্ঠে বলল, ‘না আমি সেটা বলিনি। বলছি যে ওর তো এটা ভালো লাগবে না যদি তুমি জানো এই ব্যাপারে।’
মিসেস নাসরিন বললেন, ‘ওকে তুই না বললে ও জানবে কিভাবে আমি জানি। আর এমনিতেও তোর কোন ফ্রেন্ডকেই বা আমার ভালো লাগে।’
মাহীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,’হ্যা সেটাই তো। যেই একটা মাত্র ফ্রেন্ডকে তোমার পছন্দ সেই ফ্রেন্ডই এটা।’
মিসেস নাসরিন ভ্রু দয় প্রসারিত করে বললেন,
‘তুই কার কথা বলছিস? তোর কোন ফ্রেন্ড কে আমার পছন্দ?’ বলে নিজেই ভাবতে ভাবতে বললেন,’রায়েদ!’
মাহীন সায় জানিয়ে মাথা নাড়ল। মিসেস নাসরিনের মুখে বিস্ময় ছড়িয়ে গেল। এতটাই বিস্মিত হলেন তিনি যে কিছুক্ষণ পর্যন্ত তার চোয়াল ঝুলে রইল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,’রায়েদ এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে চার বছর কাটিয়েছে! কী আশ্চর্য।’ এখন তার মুখে বিস্ময়ের বদলে ক্লেশ ফুটে উঠল। তার চোখে কী অদ্ভুত বেদনার ছোঁয়া। মাহীন অবাক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে চেয়ে রইল। মিসেস নাসরিন বললেন,
‘এটা বলতেই হবে যে অন্তত তুই প্রথম বার একটা ঠিক কাজই করেছিস এবার। ভাগ্যিস ওর তোর সাথে দেখা হয়েছিল। ইশ আবার আমাদের বাসায় আসলে ভালো ভাবে আপ্যায়ন করব।’
মাহীন ভাবল, আমি প্রথম বার একটা ঠিক কাজ করেছি? বাহ তাও ভালো আমার কোনো একটা কাজকে তো মায়ের ঠিক মনে হয়েছে।’
মিসেস কী যেন ভাবছেন। তাকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছে। আর কিছু বলতে পারেন হয়তো সেই অপেক্ষায় রইল মাহীন।কিছুক্ষণ বাদে মিসেস নাসরিন অবশেষে ভাবনার সমাপ্তি ঘটিয়ে বললেন, ‘শোন এরপরের বার রায়েদের সাথে দেখা হলে ওকে আমাদের বাসায় দাওয়াত দিবি।’
মাহীন ইতস্তত হাসল। এটাই শোনা বাকি ছিল। হয়তোবা ও আশাই করেছিল এমন কিছু একটা শুনবে বিধায় খুব একটা অবাক হলো না। মিসেস নাসরিন বলে গেলেন,’এবং ওর ছোট ভাইকেও দাওয়াত দিবি।’ বলে এক মুহূর্ত থামলেন তারপর আবার বললেন,
‘আচ্ছা এটাতো ষোলো তারিখ। তুই ওকে তেইশ তারিখ দাওয়াত দে। শুক্রবার দুপুরে। জুম্মার পর।’
মাহীন এক লম্বা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হালকা হাসল।
.
.
.
.
টিং টিং শব্দে কলিং বেল বেজে উঠল। মাহীন নিজেই শব্দটায় চমকে উঠল। শব্দটা একটু বেশিই তীক্ষ্ণ ছিলো। আরেকবার বাজানোর প্রয়োজন হলো না এর পূর্বেই দরজা খুলে ছিলো। যেন দরজার ওপারেই কেউ অপেক্ষা করেই দাঁড়িয়ে ছিলো। দরজা খুলেছে লিম জু। হাসি মুখে সরে দাঁড়িয়ে বলল,’ওহ অবশেষে তুমি এসেছো।’
মাহীন ভেতরে প্রবেশ করতে করতে প্রসন্ন কন্ঠে বলল,
‘আসতাম না কেন।’
বলে ভালো ভাবে এদিকওদিক চোখ ঘোরাল। প্রথমেই লিভিং রুম। কামরার মাঝে ফ্যাকাসে সবুজ রঙের সোফা সেট। অদ্ভুত প্রাচীণ ধরনের জিনিসপত্রে ঠাসা একটি সো-কেস। আরেকটি সরু বুক কেস রয়েছে। এবং ছোট একটি কর্ণার টেবিলের ওপর একটি বনসাই রাখা। তা আসল কিনা বোঝা গেল না। কাঠের বাড়ি। তবে মেঝেটা সম্পূর্ণ মোলায়েম ধূসর কার্পেটে মোড়া। দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া সিঁড়ি উঠে গেছে দুই তলায়। লিম সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে মাহীনকেও ইশারা করল। মাহীন ও পেছন পেছন উঠে গেল। ওপরে উঠেই বামে এক সরু করিডরের শেষ প্রান্তে একটি মাত্র দরজা। সরু করিডরেও ভেন্টিলেটরের মোত ছোট একটি জানালা দিয়ে সোনালি রোদ চুইয়ে পরছে। কাঠের মেঝে রোদ পরে ঝিলিক দিয়ে উঠছে। করিডরের শেষ মাথায় থাকা দরজাটি ভেজানো রয়েছে। ভেতর থেকে কথা বলার শব্দ ভেসে আসছে। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল জেনেট ও ক্যারোট বিছানায় বসে আছে। সাইলোহ ড্রেসিং টেবিলের চেয়ারে বসে রয়েছে। কামরাটা যথেষ্ট এলোমেলো। মাহীনের মনে হলো ওর নিজের কামরাও বোধহয় এর থেকে বেশি গোছানো হবে। কামরার মাঝে বিছানা, বামে কাবার্ড ও ডানে কাঁচের থাই গ্লাসের স্লাইডিং ডোর দেওয়া বেলকোনি।
মিষ্টি ঝলমলে রোদ এসে গড়াগড়ি খাচ্ছে বারান্দায়। সেই আলো সারা কামরায় এক অদ্ভুত সোনালি আলো বিকিরণ করছে। জেনেট বলল,
‘আহ অবশেষে আমরা সকলে একত্রে হতে পেরেছি। পিকনিকের পর থেকে তো স্কুল ছাড়া একসাথে হওয়া দুষ্কর হয়ে পরেছিল।’
মাহীন বিছানায় ক্যারোলের পাশে বসল। লিম ড্রেসিং টেবিলের পাশে রাখা টুলটায় বসল। লিম বলল,
‘তা ঠিক। সামনেই মিডটার্ম পরীক্ষা। সকলেই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত।’
‘কার এই পরীক্ষার আগে আগে আমার সাথে ডেটে যাওয়া শখ উঠেছে?’ বিষন্ন শোনাল ক্যারোলের কণ্ঠ।
সাইলোহ আমুদে গলায় বলল,’আহা একটা সিম্পল ডেটই তো। তোমাকে তো কেউ বলেনি যে এক ডেটে গেলেই তুমি সেই মানুষের গার্লফ্রেন্ড হয়ে যাবা।’
জেনেট বলল,’লাইক সিরিয়াসলি তুমি কখনো এর আগে ডেটে যাওনি?’
ক্যারোট ড্যাব ড্যাব করে তাকাল একে একে সকলের দিকে। তারপর নির্বিকার চিত্তে বলল,’নাহ!’
সাইলোহ ও জেনেট দুজনেই অবাক হলো। লিম বলল,
‘এত অবাক হচ্ছো কেন? আমিও তো কখনো যাইনি।’
মাহীন বলল,’এবং আমিও!’
সাইলোহ বলল,’তুমি না সেদিনই গেলা?’
‘কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল মাহীন।
জেনেট বলল,’ডেটে।’
মাহীন বুঝতে না পেরে দ্বিধান্বিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘কোন ডেটে? আমি ডেটে গেলাম আর আমি নিজেই জানি না দেখছি।’
ক্যারোট চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ওমা সেকি! ওই যে তুমি ডিজনিল্যান্ডে গেলা ডেটে।’
মাহীন বিচলিত হলো। পানসে কন্ঠে বলল,
‘হ্যা ঠিক আছে। তোমার যদি মনে হয় আমি ডেটে গিয়েছিলাম তাহলে ডেটে গিয়েছিলাম। ওহ হ্যা এবং রায়েদ আমাকে প্রপোজও করসে। শান্তি?’ শেষের কথাটা নাটকীয়ভাবে বলল। যদি তা এক অর্থে সত্যি। জেনেট লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,’এই মেয়ে কখনো মানবে না।’
লিম তাড়া দিয়ে বলল,
‘আচ্ছা যাই হোক। এখন ক্যারোটের তৈরিও তো হতে হবে। সময় তো চলে যাচ্ছে।’
জেনেট লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল,’এই ক্যারোট অনেক দোনোমনা করেছো। এখন ওঠো তো তৈরি হয়ে নাও।’ ক্যারোল মুখ ফুলিয়ে উঠে গেল। মাহীন বারান্দায় এসে পরা সোনালি রোদের দিকে তাকাল। বারান্দার সামনেই এক পাইন গাছ। মাহীন আনমনে তাকিয়ে রইল। ভাবতে লাগল, একটা কথা তো আগে মাথায় আসেনি। ক্যারোট তো অন্য ধর্মের মেয়ে। আর রাবিত মুসলিম। ওদের কোনো প্রকার সম্পর্কই ঠিক নয়। রাবিতের কথায় তখনই রাজি হয়ে যাওয়া উচিৎ হয়নি। ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখা উচিৎ ছিল। এখন তো এটা ঠিক হচ্ছে না। এই জন্যেই কী রাবিত রায়েদকে বলতে মানা করেছিল? যাই হোক আমি আর এসবের মাঝে নেই। সবকিছুতেই সাহায্য করতে যাওয়া উচিৎ নয়।’
ইনশাআল্লাহ চলবে।