কারণে অকারণে সে পর্ব-০৩

0
1006

#কারণে_অকারণে_সে
#পর্ব:৩
#লেখক:রিয়ান আহমেদ(ছদ্মনাম)
;
সাভাশ রেস্টুরেন্টে ঢুকে কাউন্টারে গিয়ে নিজের বন্ধুকে বলল,
“দোস্ত তোর হবু ভাবীকে এনেছি স্পেশাল আপ্যায়ন করতে হবে কিন্তু।”
সাভাশের বন্ধু হেসে বলে,
“এডভোকেট সাহেব আপনাকে এবং আমার সম্মানিত ভাবীকে আমার রেস্টুরেন্টে আসার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।এই জারিফ আপনাদের আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখবে না।,,তা ভাবী কই আমার সঙ্গে একটু পরিচয় করা।”
সাভাশ ভীতু চোখে পেছনে আরশির দিকে একবার চেয়ে জারিফের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজকে পারবো নারে।ও ভাবী টাবী শুনলে আমাকে পারলে গুলি করে উড়িয়ে দেবে।তুই অপেক্ষা কর পরে একদিন পরিচয় করাবো।”

“আচ্ছা ঠিকাছে।তোরা গিয়ে বোস আমি আজ আমার স্পেশাল ডিশ তোদের জন্য তৈরি করাবো।”
“ওকে।”

আরশি আর সাভাশ বসে আছে সামনা সামনি একটা টেবিলে।আরশি ব্যাগের থেকে চুইংগাম বের করে মুখে দিতে গেলে সাভাশ বলে উঠে,
“খাবারের আগে এসব খাওয়া ঠিক না আরু।কিছুক্ষণের মাঝেই খাবার চলে আসবে।”

আরশি সাভাশের কথায় কান না দিয়ে চুইংগাম মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে বলে,
“আমি খাবার আগে চুইংগাম খাবো না চুইংগামের ফ্যাক্টরি খাবো সেটা আমার বিষয়।আপনি আমাকে বেশি জ্ঞান দিতে আসবেন না।আর আমাকে আরু ডাকলেন কোন সাহসে।এটা আমার কাছের মানুষদের দেয়া নাম।”

“আমি কি দূরের নাকি?,,দেখো তোমার চুইংগামের না মধুর দরকার বুঝলে।তাহলে হয়তো তোমার মুখ থেকে একটু মিষ্টি কথা বের হবে।”
“আমাকে শিখাতে আসবেন না একদম।আপনি একজন বাজে লোক।আপনি কিভাবে জানলেন আমি আমার ভাইকে ভয় পাই?”
সাভাশ আরাম করে সোফায় হেলান দিয়ে বসে নিজের গালে হাত বুলিয়ে হেসে বলল,
“দেখো এডভোকেট তো এমনি এমনি হয় না মানুষ এর জন্য মানুষ চিনতে হয় বুঝলে।
আমি তোমাকে প্রথমে প্রশ্ন করার পর তুমি উত্তর দিতে দ্বিধাবোধ করছিলে। দেখো তোমার সম্পর্কে এতটুকু আমি খুব ভালো জানি যে তুমি তোমার ভাইকে ভয় পাও।তুমি কেন আমিও পাই তোমার ভাইকে।তারপর যখন তোমার বান্ধবী এসে বিয়ের সাক্ষী হওয়ার কথা বলল তখন আমি আন্দাজে ঢিল মারলাম। আর দেখো এখন তুমি আমার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে এসেছো।”
আরশি নিজের বোকামির জন্য কিছুটা লজ্জিত হলো।আসলেই তো সে যদি তখন সাভাশের মুখের উপর বলতো,”আমার ভাইকে বললে কি হবে?আমাকে আমার ভাইয়ের নামে ভয় দেখাবেন না।” তাহলেই এখন হয়তো তাকে সাভাশের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসে থাকতে হতো না।
আরশি খাবার খাচ্ছিল তখনই তার চোখ যায় সামনের টেবিলে।তীব্র ,নেহা এবং তাদের কিছু বন্ধু সেখানে বসে আড্ডা দিচ্ছে।আরশি আড়াল হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে।নেহা মেয়েটার কথাবার্তা আরশির পছন্দ নয়।কেমন অতিরিক্ত ভালোবাসা দেখিয়ে কথা বলে আবার হঠাৎ করে সবার আড়ালে খোঁচা মেরে এমন কথা বলে ফেলে যে সেই কথা না সহ্য করা যায় আর না হজম করা যায়।খাওয়া দাওয়া কোনোমতে শেষ করে আরশি সাভাশকে ছোট্ট করে একটা ”বাই” দিয়ে সেখান থেকে এক প্রকার পালাতে চাইলো।
কিন্তু নেহা সেটা আর হতে দিল না।সে ঠিক আরশিকে চিনে ফেলল দেখে।আরশি চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেও নেহা ধরে বেঁধে আরশিকে তাদের পাশে বসিয়ে দিল।আরশি নেহার পাশে বসতেই তীব্রর গ্রুপের সবাই ওর সঙ্গে পরিচিত থাকায় কুশল বিনিময় করলো।আরশি হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলে।এর মাঝে তীব্র প্রশ্ন করে বসে,
“আরশি তুই এখানে কি করছিলি?”
তখনই সাভাশ সেখানে এসে হাজির।সে এমনভাবে প্রশ্নের উত্তর দিলো যেন প্রশ্নটা তাকেই করা হয়েছে।সাভাশ বলল,
“রেস্টুরেন্টে মানুষ কি করতে আসে?খাবার খেতেই তো আসে তাই না।আরুও আর দশজনের মতো খাবার খেতে এসেছিল।”
তীব্র ভ্রু যুগল কুঁচকে আরশিকে প্রশ্ন করলো,
“হু ইজ হি?”
“ওনার নাম সাভাশ।”
সাভাশ এবার নিজেই নিজের পরিচয় বলল,
“সাভাশ চৌধুরি।এন্ড আপনি কে মিস্টার?”
“আমি আরশির ভাই সামিউল আহসান তীব্র হই।”
“ওহ।আচ্ছা আমি কি আরশিকে নিয়ে যেতে পারি?আসলে আমাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে তো তাই আমরা একে অপরকে বিয়ের আগে পুরোপুরি আবিষ্কার করতে চাইছি।সো উই নিড সাম প্লেস।”

তীব্র কিছু বলার আগে নেহা বলল,
“শিওর শিওর।আরশি নিজের হবু বরের সাথে যাও।টেক ইওর ওন টাইম।”
আরশি আর কি বলবে চলে গেল সাভাশের সঙ্গে।আরশির নিজের বুকে ব্যথা অনুভব করছে এই ব্যাথার কারণটা বোধহয় তীব্র নামক মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার বেদনা।
;
;
;
আরশি বাসায় এসে জামাকাপড় বদলে ছাদে গিয়েছে প্রায় অনেকক্ষণ।সে ছাদের বাউন্ডারির উপর বসে আছে।তাদের ছাদটা অর্ধেক রেলিং দিয়ে করা আর অর্ধেক বাউন্ডারি।ছাদের আরশির বাবা অনেক ধরনের ফল আর সবিজির গাছে ভরে রেখেছে তাদের নিচের গার্ডেনের মতো। আর অন্য সাইডে আরহাম নিজের কবুতরদের জন্য একটা ঘর বানিয়ে রেখেছে।আরশি মূলত বাগান সাইডেই আছে এখন।
আরশি কিছুটা দূরেই দেখে তীব্রর বারান্দার দরজা খোলা আর তীব্র সেখানে একটা সেন্টু গেঞ্জি আর থ্রি কোয়াটার প্যান্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছে আর নিজের গাছে পানি দিচ্ছে।আরশির মনে মনে ভাবছে,
“তীব্র ভাইকে সেদিন ভালোবাসার কথাটা না বললেই পারতাম।তাহলে প্রতিদিনের মতো আজও ওনাদের বাসায় গিয়ে ওনার গাছে পানি দেওয়ার কাজটা আমিই হয়তো করতাম।তীব্র ভাই আমি আপনাকে যেভাবে মিস করি আপনি কি সেভাবে আমাকে মিস করেন?নাহ্ করেন না।কারণ আমাকে নিয়ে আপনি প্রয়োজন ছাড়া কখনো চিন্তাই করেন না। মিস আবার কেন করবেন?কিন্তু আমি যে আপনাকে নিয়ে বড্ড বেশি চিন্তা করি।”

চারদিকে মাগরিবের আজান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।আরশি মাথায় কাপড় দিয়ে ছাদ থেকে নেমে যায়।মা বাবার ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পায় ওর বাবা বলছে,
“সাভাশের মা চলে এসেছেন।আগামীকাল ওরা আমাদের সঙ্গে পাকা কথা বলতে আসবেন।সব ব্যবস্থা করে রেখো।”

আরশি কথাটা শুনতেই তার মন-মস্তিষ্ক সব জায়গায় আন্দোলন শুরু হয়।তার মস্তিষ্কের নিউরণগুলো লাফাচ্ছে আর বলছে,”সাভাশ!সাভাশ!বিয়ে!বিয়ে!” আরশির নিজেকে পাগল পাগল লাগছে।সে দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে ভেসিনে মাথা দিয়ে মাথায় পানি দেয়।নাহ্ মাথা ঠান্ডা হচ্ছে না।আরশি লম্বা একটা শাওয়ার নেয়।মস্তিষ্কের এই চাপ সে নিতে পারছে না।

আরশি ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুল মুছতে মুছতে মুছতে ভাবে,
“এই সাভাশ নামক আপদটাকে আমি কি করবো।কারণে অকারণে সে আমার জীবনে সমস্যা তৈরি করছে।সাভাশ চৌধুরি তোমাকে আমি বিয়ে কখনোই করবো না।আসলে আমার ভেতরে থাকা জ্বীনটা করবে না।”
কথাগুলো বলেই আরশি একটা শয়তানি হাসি দিয়ে আয়নায় নিজের দিকে তাকালো।
;
;
;
সকালে উঠে মেয়ের রুমে গিয়ে আরশির মা দেখলেন তার মেয়ে ঘরে নেই।এতো সকালে মেয়েটা কোথায় গেল?আয়েশা বেগম কথাগুলো ভাবতে ভাবতে পুরো বাড়িতে মেয়েকে খুঁজলেন।কিন্তু আরশিকে কোথাও পেলেন না।আয়েশা বেগমের এবার কান্না করার মতো অবস্থা। এমন সময় বিউটি খালা দৌড়ে এসে বললেন,
“ভাবী আলশিমণিরে পাইছি।”
“কোথায়?আমার মেয়েটা কোথায়?”
“আরশিমণি বাগানে কদম ফুল গাছের উপরে পা ঝুলাইয়া বইসা আছে।,,ভাবী বিশ্বাস করবেন না এমন ভাবে হাসতাছে যেন জ্বীন বা ভুতে ধরেছে।”

আয়েশা বেগম ধমক দিয়ে বললেন,
“উল্টাপাল্টা কথা কম বলো বিউটি।চলো গিয়ে দেখি কি হয়েছে।”

আয়েশা বেগম গিয়ে দেখলেন ঘটনা আসলে সত্য।তার মেয়ে গাছে পা ঝুলিয়ে বসে বসে বিদঘুটে ভাবে হাসছে।আয়েশা বেগম রাগী গলায় বললেন,
“আরশি গাছ থেকে নেমে আয়।নেমে আয় বলছি।সকালবেলা এখানে ফাজলামি চলছে।”

আরশি মনে মনে বলল,”আম্মাজান এতক্ষণ আগে আসতে।গাছে বসে বসে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।যাইহোক এখন যখন এসেছো তাহলে ড্রামা শুরু হবে।”

আরশি অদ্ভুত ভয়েজে বলতে লাগলো,
“আমি এখান থেকে নামবো না।আমাকে জোর করবি না তোরে।আমাকে বেশি জোর করলে তোদের মেয়ে আরশিকে মেরে দেবো এখান থেকে ফেলে দিয়ে।”
আয়েশা বেগম এবার কেঁদে দিয়ে বিউটি খালাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“ও বিউটি তোমার ভাইজানকে ডাকো আমার মেয়েটাকে জ্বীনে ধরেছে গো।”
বিউটি খালা বললেন,
“ভাবী কাইন্দেন না আল্লাহ্ আল্লাহ্ করেন।”
;
;
;
আরশি রুমে ঘুমিয়ে আছে তাকে ঘরে শুইয়ে দিয়ে রিজা আহসান আর আরহাম চিন্তামগ্ন হয়ে বসে আছে।আয়েশা বেগম নিজের বাবার বাসায় ফোন করে সব বলছেন আর হুজুর পাঠাতে বলছেন।কথা শেষ করে টেলিফোন রাখতেই রিজা আহসান বললেন,
“আয়েশা তুমি কি শুরু করেছো বলো তো আমার মেয়েটা মানসিকভাবে একটু অসুস্থ তাই বলে এখন তাকে তুমি জ্বীনে ধরা মেয়ের ট্যাগ লাগিয়ে দেবে?”
আয়েশা বেগম ধমকে বললেন,
“তুমি চুপ করো।আমি আগেই বলেছিলাম হুজুর দেখাতে কিন্তু তুমি না করেছো।এখন দেখছো তো তোমার মেয়ের কি অবস্থা হয়েছে?এখন আর আমি তোমার কোনো কথা শুনবো না।”

রিজা আহসান বললেন,
“এখন আমি সাভাশের পরিবারকে কি বলবো ওনারা তো আমাদের মেয়েকে দেখতে দুপুরে আসবেন বলেছেন।”
আরহাম বলল,
“যেটা হয়েছে সেটাই বলে দেও।আরু সুস্থ হলে ওনাদের আসতে বলো।”
আয়েশা বেগম বললেন,
“অ্যাহ ওনাদের এই কথা বললে ওনারা আমার মেয়েকে কি না কি ভাববে।এরচেয়ে ভালো ওদের বলে দেও যে আরশির টাইফয়েড জ্বর হয়েছে।”
“মিথ্যা কথা বলবে কেন?”(আরহাম)
“আমি যা বলেছি তাই।”
তখনই তীব্রর পরিবারের সবাই এলো আরশিকে দেখতে মানে আরশির চাচার পরিবার।কারণ ততক্ষণে পুরো মহল্লায় ছড়িয়ে গেছে যে আরশিকে জ্বীনে ধরেছে।

আরহাম চুল কাটার জন্য সেলুনে যেতেই দেখলো দোকানদার ছেলেটা এক কাস্টমারকে বলল,
“ভাই আপনি শুনছেন আরহাম ভাইয়ের বোন আরশিকে জ্বীনে ধরছে?”
“কি বলিস?সত্যি না কি?”
“হ্যা তা নয় তো আর কি বলছি।আমি তো সেদিন ঐ মেয়েকে দেখলাম আকাশে উড়তে।আবার আরেক দিন দেখলাম রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অদৃশ্য হয়ে যেতে।”

এই সবকিছুই লোকটা বানিয়ে বলছে।আসলে মানুষের স্বভাব হচ্ছে তিলকে তাল বানানো।আরশির বানানো মিথ্যা কাহিনীটাকে মানুষ আরো রিয়ালিস্টিক বানানোর জন্য সেটাতে মসলা মাখছে।

আরহাম নিজের বোনের সম্পর্কে এসব কথা শুনে আগুন হয়ে গেল।তার রাগ এমনিতেই বেশি তাই এমন কথা শুনে সে ভয়ানকভাবে ক্ষেপে গেল।আরহামকে দেখতেই ছেলেটা চুপ হয়ে গেল আর কাস্টমার তো আধা শেভ করা অবস্থাতেই ,”আরহাম ভাই মাফ করে দেন।” বলে সেখান থেকে পালালো।আরহাম ছেলেটার দিকে এগুতে এগুতে বলল,
“কি বলছিলি তুই আমার বোন সম্পর্কে?”
ছেলেটা ঢোক গিলে বলল,
“ভাই কিছু না।”
আরহাম ছেলেটার গালে একটা থাপ্পড় দিয়ে কলার ধরে ছুঁড়ে মারলো।ছেলেটা কাঁচ ভেঙ্গে দোকানের বাইরে গিয়ে পড়লো।
#চলবে!