কি আশায় বাঁধি খেলাঘর পর্ব-০১

0
1230

#কি_আশায়_বাঁধি_খেলাঘর (০১)
জাহান আরা

“আম্মা যে রাতে আব্বা কে কুপিয়ে হত্যা করে,নিজেও আত্মহত্যা করলেন,সে রাতে ছিলো প্রচন্ড বৃষ্টি। সেই ঝুম বৃষ্টির রাতেই আম্মা আব্বাকে আমি শেষবারের মতো দেখেছিলাম জীবিত।
আমার যা একটু তন্দ্রামতো লেগে আসছিলো তাও উদাও হয়ে গিয়েছিলো বজ্রপাতের শব্দে। বিছানায় আমার ছোট শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছিলো ভয়ে।

আম্মা প্রতি রাতে আমার সাথে ঘুমাতো,অথচ সে রাতেই আম্মা আমাকে একা ঘুমাতে দিলেন।আম্মাকে ছাড়া আমি ঘুমাতে পারতাম না,আম্মার গায়ের গন্ধ না পেলে আমার চোখে ঘুম আসতোই না কিছুতে।
রাতে ভয়ে আম্মাকে ডাকার জন্য উঠে যাই।আম্মার রুমের দরজা খোলা কি-না দেখার জন্য হালকা ধাক্কা দিতেই দরজা কিছুটা খুলে গেলো। আমি আড়াল থেকে দেখলাম আম্মা আব্বাকে ছুরি দিয়ে কোপাচ্ছেন।
ভয়ে,আতঙ্কে আমি জমে পাথর হয়ে গেলাম।রক্তে সব ভেসে যাচ্ছিলো।আম্মার পুরো শরীর রক্তে জবজবে হয়ে আছে।আব্বাকে দেখতে পেলাম নিথর হয়ে শুয়ে আছেন।দুচোখ খোলা আব্বার।আব্বার নীল দুই চোখে রাজ্যের বিস্ময়!
যেনো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন আম্মার দিকে।আব্বা হয়তো কখনো ভাবেন নি আম্মা এভাবে তাকে খুন করবে তাই এই বিস্ময় ছিলো। আব্বার হাত পা বাঁধা ছিলো।মুখ ও বেঁধে রেখেছিলো আম্মা।
আব্বা একটু চিৎকার ও করতে পারেন নাই মনে হয় মরে যাওয়ার সময়।

আমি কোনো শব্দ না করে নিজের রুমে ছুটে এলাম এক দৌড়ে। বুকের ভিতর হাতুড়ি পেটা করছিলো।আমার ইচ্ছে করছিলো চিৎকার করে কাঁদতে কিন্তু কাঁদতে পারি নি।

চাদর গায়ে দিয়ে আমি অনবরত কাঁপছিলাম বিছানায় শুয়ে,কিছুক্ষণ পর আম্মা আমার রুমে এলেন।
আমাকে আদুরে গলায় ডাকলেন, “চন্দ্র,আমার চাঁদের আলো মা,এদিকে তাকা।”

আমি কোনোমতে চাদর সরিয়ে তাকালাম আম্মার দিকে।মনে হয় আম্মা এই প্রথম আমাকে ডাকছেন নরম স্বরে।আম্মা আমার বিছানার পাশে বসলেন,হাত বাড়িয়ে আমাকে কোলে টেনে নিলেন।
আমার কাঁপুনি বন্ধ হলো না।আম্মার গায়ের এলাচের ঘ্রাণের সাথে আমার নাকে রক্তের একটা ঝাঁঝালো গন্ধ এলো।
আব্বার শরীরের রক্ত!
সেই থেকে রক্ত আমার সহ্য হয় না।

আম্মা আমার কপালে চুমু খেলেন,জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদলেন।তারপর বললেন,”আজ থেকে আর কোনো ভয় নেই মা।আমি খুন করে ফেলেছি তোর বাবাকে।তোর উকিল আংকেলের কাছে এই বাড়ির দলিল,তোর বাবার আমার ব্যাংকের সব কাগজপত্র আছে।আরো অনেক কিছু আছে যা তুই এখন বুঝবি না।যেদিন তোর আঠারোতম জন্মদিন পালন করবি সেদিন সব হাতে পাবি।আম্মাকে তুই ক্ষমা করে দিস।ওখানে আম্মার একটা ডায়েরি ও আছে,সেটা পড়লে তুই সব কিছু জানতে পারবি।আর সব জানে তোর ছোট খালামনি।
কাল সকালে তোর খালামনি আসলে ওর সাথে চলে যাবি ওর বাসায়।
এখন আয় আম্মাকে একটা চুমু দে।”

আম্মার কথা অনেক কিছুই আমি বুঝলাম না।তবে চুমু দিতে ও এগিয়ে গেলাম না আম্মাকে।
কেনো চুমু দিবো আমি?
উনি আব্বাকে মেরে ফেলেছেন কেনো?

আম্মা আমাকে চুপ থাকতে দেখে হাসলেন।তারপর বললো,”যাই মা।একদিন বুঝবি সব কিছু।আর একটা কথা বলি,কখনো পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করবি না।এরা গিরগিটি,ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়।কোনো পুরুষকে কাছে ঘেঁষতে দিবি না,কিছুতেই না,কিছুতেই না।সকালে পুলিশ এলে সব বলবি যা যা দেখেছিস তুই।
আফসোস একটাই রইলো তোর কেউ থাকবে না আর এই দুনিয়ায় আপন বলে।সারা পৃথিবীতে এতো মানুষ থাকতেও আমার চন্দ্র মানুষ হবে একা,মা বাবা ছাড়া।আমার মেয়েটা বাবা মা কারো আদর পেলো না। ”

আম্মা আমাকে রেখে চলে গেলেন আবার নিজের রুমে,তারপর রুমের দরজা বন্ধ করে দিলেন।আমি কাঁপতে লাগলাম চাদর গায়ে দিয়ে।

আব্বার খুব একটা আদর আমি পাই নি।
আব্বা কখনো আমার সাথে কথা ও বলেন নি।কেনো জানি না আব্বা আমাকে পছন্দ করতেন না।
আম্মাও করতেন না আমাকে পছন্দ।আমি যেনো ওনাদের দুজনের চক্ষুশূল ছিলাম।
আমি খুব চাইতাম একটু বাবা মায়ের আদর পেতে।অথচ কিছুতেই তাদের কাছে ঘেঁষতে পারতাম না।

আম্মা আমার পাশে থাকলেই আমি এলাচের একটা মিষ্টি সুগন্ধ পেতাম।
আমার সবসময় ইচ্ছে করতো আম্মার গায়ের এই ঘ্রাণ নিতে কিন্তু সবসময় পারতাম না।আম্মার মেজাজ সবসময়ই তিরিক্ষি হয়ে থাকতো।
কিসের জন্য আম্মা এতো রেগে থাকতেন আমি জানতাম না,বুঝতাম ও না তখন।৮ বছর বয়সী আমার এতোকিছু বুঝার ও ক্ষমতা ছিলো না।
আমি শুধু জানতাম রাত হলে আম্মা আমার পাশে এসে শুবেন,তারপর আমি ঘুমিয়েছি নিশ্চিত হলে আমাকে বুকের ভিতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরবেন।অথচ জেগে থাকলে আম্মা আমাকে ছুঁতেন না মোটেও।
আমিও তাই ঘুমের ভান করে থাকতাম।আম্মার আদর এটুকুই পেতাম আমি।
আর আব্বার একটুও পেতাম না।আব্বা মাঝেমাঝে দূর থেকে আমার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতেন।আব্বার চোখের মনি নীল রঙের ছিলো,সেসময় তার নীল চোখে গভীর ভালোবাসা ফুটে উঠতো।আমি ও নির্বাক তাকিয়ে থাকতাম আব্বার চোখের দিকে কিন্তু আম্মা দেখতে পেলেই ছোঁ মেরে সরিয়ে দিতেন আমাকে আব্বার সামনে থেকে। আব্বা যতোক্ষণ বাসায় থাকতেন আম্মা আমাকে চোখে চোখে রাখতেন আব্বা বের হলেই আম্মা আর আমার খোঁজ নিতেন না।

সকাল হতেই ছোট খালামনি এলেন আমাদের বাসায়,এসে দেখলেন আমি বিছানায় অজ্ঞান হয়ে আছি।আম্মার রুমের দরজা বন্ধ। খালামনি পানির ঝাপটা দিতেই আমার জ্ঞান ফেরে।আমি খালামনিকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে রইলাম।কেনো জানি কান্না পাচ্ছিলো না আমার। আমার জামায় ও রক্ত লেগেছিলো আম্মার শরীর থেকে।
খালামনি সব শুনে পুলিশে খবর দিলেন।

পুলিশ এলো ২০ মিনিটের মাথায়। আম্মার রুমের দরজা ভাঙা হলো।দরজার নিচ দিয়ে রক্তের স্রোত বেরিয়ে এসেছিলো।
আম্মার ঝুলন্ত দেহ দেখা গেলো সবার আগে।ফ্যানের সাথে ফাঁস লাগিয়ে আম্মা ঝুলে ছিলেন,বিছানায় আব্বা।আমার পুরো শরীর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।

আমার আম্মা,আমার আব্বা!

পুলিশ আংকেল আমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন,আম্মা আমাকে বলেছিলেন সব সত্যি বলতে। আমিও সব সত্যি কথা বলে দিয়েছিলাম।

পুলিশ আংকেল খালামনিকে আলাদা ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন।আমি আমার রুমে বসে আনমনা হলাম এই ভেবে,আম্মার গায়ের ঘ্রাণ আমি কোথায় পাবো?
আমি কিভাবে ঘুমাবো রাতে এখন থেকে?
রাতে আমাকে কে জড়িয়ে ধরবে?
এলাচের মিষ্টি ঘ্রাণ আমি কার গায়ে পাবো আর?

এতো কিছু হয়ে যাওয়ার পর তখনও আমি কাঁদি নি।কিন্তু যখন আম্মাকে আর আব্বাকে পাশাপাশি শোয়ানো হলো তখনই কেঁদে উঠেছি আমি।আমার জন্মের পর সেই প্রথম আর শেষ বার তাদের একসাথে দেখেছি।সারাজীবনের জন্য আমি দুজনকে নয়ন ভরে দেখে নিয়েছিলাম।কেমন শান্ত দুজন,চুপচাপ হয়ে শুয়ে ছিলো।
কে বলবে এরা দু’জন একে অপরের ছায়া ও মাড়াত না?

আমি সেদিন প্রথম বারের মতো খেয়াল করলাম আমি দেখতে পুরোপুরি আব্বার মতো হয়েছি।
আব্বার চোখের মতো আমার নীল চোখ।সব ভুলে আমি আব্বার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।এই দুই চোখ আর কখনো আমার দিকে তাকাবে না এক রাশ ভালোবাসা নিয়ে!
কে একজন আব্বার দুচোখ বন্ধ করে দিলো।

এরপর আমি বড় হতে লাগলাম ছোট খালামনির কাছে।আমার জন্মের পর থেকে নানাবাড়ির কাউকে দেখি নি কখনো ছোট খালামনিকে ছাড়া,আম্মাকে কখনো জিজ্ঞেস করে ও জানতে পারি নি।আম্মা জবাব দেন নি,অথবা থাপ্পড় দিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিয়েছেন।কিন্তু আম্মার মৃত্যুর পর নানা,নানি,মামা,খালা সবাইকে দেখলাম।নানি আর ছোট খালামনি ছাড়া বাকি সবাই কেমন কঠোর মুখ করে আমার দিকে তাকাতো,আমার সাথে কথা বলতো।
আমার ভীষণ ভয় করতো ওনাদের দেখলে।ওনারা সবাই যেনো আমার আম্মার প্রতিচ্ছবি। ঠিক আমার আম্মার মতো রেগে থাকতেন যেনো সবসময় আমার সাথে।

শেষ পর্যন্ত খালামনি ও আমাকে রাখলেন না সাথে।আমি ১২ বছর বয়সী হতেই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন হোস্টেলে।তারপর থেকে আজও আমি হোস্টেলেই আছি।”

কথা শেষ করে চন্দ্র এক বোতল পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিলো।তারপর উঠে গিয়ে একটা জানালা খুলে দিলো।মাঘ মাসের শীতেও যেনো চন্দ্রর কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
প্রভা কেঁপে উঠলো শীতে।দৌড়ে গিয়ে জানালা বন্ধ করে দিয়ে বললো,”পাগল হয়ে গেলি না-কি!
কি ঠান্ডা দেখছিস না?
জানালা খুলছিস কেনো?”

চন্দ্র কথা বললো না।দেয়ালঘড়ি ঢংঢং করে জানান দিলো রাত ২টা বেজে গেছে।

চন্দ্র বিছানায় শুয়ে কম্বল মুড়ি দিলো,প্রভাও শুয়ে পড়লো নিজ বিছানায়।সকালে আবার উঠতে হবে।

চলবে।