#খাঁচায়_বন্দি_নীলকন্ঠী
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৩
ছাদ থেকে প্রায় একপ্রকার দৌড়ে নিচে নেমে এল মেহরীন। তার বুকের ভেতরটা তখনো কামারের দোকানের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আরিশের সেই কথাগুলো, ‘নীলকণ্ঠী পাখি’, ‘ভেতরের নীল বিষ’ যেন তীরের ফলার মতো তার মনের দেওয়ালে বিঁধে আছে। কিন্তু সেই ভাবনায় ডুব দেওয়ার মতো অবকাশ পুরান ঢাকার এই জমিনদার ভিলায় মেহরীনের নেই। সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই সামনে এসে দাঁড়ালেন শাশুড়ি দিলরুবা বেগম। ওনার পরনে দামী সুতি শাড়ি, হাতে পানের বাটা। মেহরীনের হাতের আধ-শুকনো কাপড়ের দলাটার দিকে তাকিয়ে ওনার চোখ দুটো সরু হয়ে গেল।
“কী গো মেহরীন? ছাদে কি কাপড়ের সাথে নিজেরে মেলা দিছিলা নাকি? একটা কাপড় শুকাতে দিতে এতক্ষণ লাগে? নিচে রান্নাঘরে বাবুর্চি এসে বসে আছে। আজ আকিলের গদির বড় কাস্টমাররা আসবে রাতে খাইতে। আর ওনার কোনো হুঁশই নাই!” দিলরুবা বেগম পানের পিক ফেলে মুখটা বাঁকালেন।
মেহরীন মাথা নিচু করে শান্ত গলায় বলল, “শাড়িগুলো শুকাচ্ছিল না আম্মা, তাই একটু দেরি হলো। আমি এখনই রান্নাঘরে যাচ্ছি।”
“শুকাইত না মানে? কার্তিক মাসের কড়া রোদ উঠছে আকাশে। আসলে নবাবের বেটির তো কোনো দায়-দায়িত্ব নাই। একটা পোলাপান নাই যে ওটার পিছে সময় যাইব, ঘরের কাজটুকুই যা করার। তাও যদি এত আলসেমি করো, তবে কেমনে কী?”
দিলরুবা বেগমের এই চেনা খোঁচাটা মেহরীনের কলিজায় গিয়ে লাগল। একসময় এই ‘পোলাপান নাই’ শোনার পর মেহরীন বাথরুমে ঢুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদত। কিন্তু এখন আর তার কান্না আসে না, আসে এক ধরণের তীব্র বিষাদ। সে জানে, এই বাড়িতে তার অবস্থান কেবল একজন দামী দাসীর মতো, যার কাজ হলো নিখুঁতভাবে সংসার চালানো আর মেহমানদারী করা। মেহরীন কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
সারাটা দুপুর আর বিকেল মেহরীনের কাটল মসলার ঝাঁঝ, তেলের ছ্যাঁকছ্যাকানি আর বাবুর্চির তদারকি করতে করতে। পোলাওয়ের চাল মাপা, খাসির মাংসের রেজালা পরীক্ষা করা, বোরহানি ঠিকঠাক হলো কি না দেখা… সব সে করল একটা পুতুলের মতো। তার হাত সচল, কিন্তু মনটা পড়ে ছিল অন্য কোথাও।
সন্ধ্যায় মেহমানরা এল। ড্রয়িংরুমে তখন হাসির রোল উঠেছে। আকিল সাহেব তার বন্ধুদের সামনে ব্যবসার দাপট দেখাচ্ছেন। মেহরীন যখন ভারী কাঁচের ট্রের ওপর দামী পোর্সেলিনের বাটিতে খাবার সাজিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকল, আকিল সাহেব একবারের জন্যও মেহরীনের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকালেন না।
একজন ব্যবসায়ী বন্ধু মেহরীনের রান্নার প্রশংসা করে বললেন, “ভাবীর হাতের রান্নার জবাব নাই আকিল ভাই! খাঁটি পুরান ঢাকার স্বাদ।”
আকিল সাহেব বুক ফুলিয়ে হেসে উঠলেন, “আরে ভাই, টাকার গরম থাকলে সব হয়। ওরে চকবাজারের সবচেয়ে দামী বাসমতি চাল আর খাঁটি ঘি এনে দিই। দামী জিনিস দিলে রান্না তো ভালো হবেই!”
আকিল সাহেবের এই অহংকারী মন্তব্যে বাকিরা হাসল, কিন্তু মেহরীনের হাতটা ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। সে ট্রের ওপর রাখা বাটিগুলো নামিয়ে রেখে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
রাতে সব গোছগাছ শেষ করে মেহরীন যখন নিজের শোয়ার ঘরে ঢুকল, তখন রাত বারোটা। আকিল ততক্ষণে বিছানায় শুয়ে পড়েছে, তার এক হাতে ফোন। সেখানে কোনো ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখছে সে। মেহরীন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গলার ভারী সাতনরি হারটা আর কানের ঝুমকোগুলো এক এক করে খুলতে লাগল।
আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে মেহরীনের মনে কোনো প্রেমের অনুভূতি জাগল না, কিন্তু তার বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘ, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এক গভীর আফসোস তাকে গ্রাস করতে লাগল। সে মনে মনে ভাবল, “সাতটা বছর… দীর্ঘ সাতটা বছর এই মানুষটার সাথে এক বিছানায় কাটালাম। আমার রান্না ভালো হলে ও দেখে চালের দাম, আমার রূপ ভালো হলে ও দেখে গহনার ওজন। কোনোদিন এই মানুষটা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল না, মেহরীন তুমি কেমন আছ? অথচ আজ দুদিনের এক চেনা মানুষ, যে আমার কেউ না, সে দূর থেকে দেখে আমার মনের ভেতরের বিষটা চিনে ফেলল!”
মেহরীনের চোখে কোনো জল এল না, কিন্তু তার আফসোসটা এক পাথুরে বেদনায় রূপ নিল। সে আলমারি থেকে একটা সাধারণ সুতি শাড়ি বের করে শাড়িটা বদলে নিল। বিছানায় আকিলের পাশে গিয়ে যখন সে শুলো, তখন ওনাদের মাঝখানের দূরত্বটা কেবল কয়েক ইঞ্চির ছিল না, মনে হলো যেন এক জনমের দূরত্ব।
জানালার বাইরে রাতের আকাশে তখনো চাঁদটা একলা জেগে আছে। মেহরীন চোখ বন্ধ করল, আহা জীবন….
–
বিয়েবাড়ির সেই রাতের পর এবং পরের দিন ছাদের ওই টুকটাক কথা সবকিছু মিলিয়ে মেহরীনের মনের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হয়েছিল। সে কোনো প্রেমে পড়েনি, কিন্তু দীর্ঘ সাত বছরের অবহেলিত জীবনে এই প্রথম কোনো পুরুষ তার ভেতরের হাহাকারটা এক পলকে চিনে ফেলেছে, এই সত্যটা সে ভুলতে পারছিল না।
এর পরের দিন থেকে মেহরীন প্রতিদিন দুপুরের কাজ শেষ করে কোনো না কোনো বাহানায় ছাদে যেতে লাগল। কখনো ভেজা কাপড় ছড়ানোর অছিলায়, কখনো বা স্রেফ একটু খোলা বাতাসের খোঁজে। কিন্তু এক অদ্ভুত নিয়তি! পুরো একটা সপ্তাহ কেটে গেল, আরিশকে ওপাশের ছাদে আর একবারের জন্যও দেখা গেল না। তার ঘরের জানলাটা বন্ধ, ছাদের সেই ইজি চেয়ারটা একলা পড়ে থাকে। মেহরীনের মনের ভেতর এক ধরণের মৃদু আফসোস আর একাকীত্ব তৈরি হলো। সে আরিশের জন্য ব্যাকুল হচ্ছে না, কিন্তু তার মনে হতে লাগল এই নরক গুলজারের মতো সংসারে অন্তত একটা মানুষ তো ছিল, যার কথাগুলো শুনলে মনে হতো এই পাথুরে বুকেও একটু প্রাণ আছে। সেই মানুষটাও হুট করে কোথায় হারিয়ে গেল!
ওদিকে ‘জমিনদার ভিলা’র ভেতরের পরিবেশ প্রতিদিন আরও বেশি বিষাক্ত। আকিলের মেজাজ চব্বিশ ঘণ্টা খিটখিটে থাকে। পান থেকে চুন খসলেই সে মেহরীনের ওপর চিৎকার করে ওঠে। গত রাতেই যেমন, আকিল কাজ থেকে ফিরে টেবিলের ওপর ফাইলের স্তূপ আছাড় দিয়ে মারল। মেহরীন চায়ের কাপ দিতেই সে ছুড়ে ফেলে দিল। “কী ছাইপাঁশ বানিয়েছ এটা? মুখে দেওয়া যায় না! ঘরে বসে বসে চর্বি বাড়াচ্ছ, আর কাজের কাজ কিচ্ছু পারো না। অলক্ষ্মী একটা!” চড়া চায়ের কাপটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল, গরম চা মেহরীনের পায়ে ছিটকে পড়ল। মেহরীন একটা শব্দও করল না, শুধু মুখ বুজে ভাঙা কাঁচগুলো কুড়াতে লাগল।
শাশুড়ি দিলরুবা বেগমের অত্যাচারও এর সাথে দ্বিগুণ হয়েছে। ছেলের ব্যবসার ক্ষতি হওয়ায় তিনি সব দোষ মেহরীনের ঘাড়ে চাপিয়েছেন। সকালে তসবি গুনতে গুনতে বললেন, “যে মেয়ের কোনো সন্তান হয় না, তার পা ফেলার ছিরিই আলাদা। অলক্ষ্মী পাড়া দিয়ে আমার সোনার সংসারটা শেষ করল। ঘরে একটা বাতি দেওয়ার মানুষ নাই, আবার ওনার খাওয়া-দাওয়ার দেমাক কত!” এর চেয়েও বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে দেবর রাইয়ান। সে ইদানীং মেহরীনের দিকে কেমন এক লোলুপ, অশুভ দৃষ্টিতে তাকায়। মেহরীন যখন রান্নাঘর থেকে বের হয়, রাইয়ান ইচ্ছা করে করিডোরে এসে দাঁড়ায়। সেদিন মেহরীনের শাড়ির আঁচলটা একটু সরে যেতেই রাইয়ান যেভাবে তার গলার দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে একটা বিকৃত হাসি দিল, তাতে মেহরীনের সমস্ত শরীর ঘেন্নায় রি রি করে উঠেছিল। এই তিনদিকের সাঁড়াশি আক্রমণের মাঝে মেহরীনের মনে হচ্ছিল সে শ্বাস নিতে পারছে না। ঠিক আট দিনের মাথায়, এক তপ্ত দুপুরে মেহরীন যখন ক্লান্ত শরীর আর মন নিয়ে ছাদে গেল, তখন আলিসার ওপর ভর দিয়ে সে আনমনে সামনের ছাদের দিকে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল।
আরিশ দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সাদা সুতি পাঞ্জাবি, চোখে সেই চশমা। সে গিটার বাজাচ্ছিল না, শুধু মেহরীনের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে শান্ত, মায়াবী হাসি ফুটিয়ে তুলল। এক সপ্তাহ পর তাকে দেখে মেহরীনের মনে হলো, মরুভূমির মাঝে কেউ যেন এক ফোঁটা ছায়ার সন্ধান পেল। আরিশ রেলিংয়ের কাছে এগিয়ে এসে খুব মৃদু স্বরে বলল, “অনেকদিন পর আপনাকে ছাদে দেখলাম ভাবী। এক সপ্তাহ খুব ঝড় গেল ওপাশ দিয়ে, তাই না? আপনার চোখ দুটো বড্ড ক্লান্ত লাগছে।”
মেহরীন নিজেকে সামলে নিয়ে খুব ছোট করে বলল, “হুম। আপনি ছিলেন না?”
আরিশ একটু হাসল, “ব্যবসায়িক কাজে ঢাকার বাইরে যেতে হয়েছিল। তবে দূর থেকেও আমি টের পাচ্ছিলাম, আপনার চারপাশের দেয়ালগুলো আপনাকে খুব জোরে চেপে ধরেছে। আপনার এই একাকীত্বটা বড্ড ভারী ভাবী।”
মেহরীন এবারও বেশি কথা বলল না। সে শুধু ‘হু-হা’ করে আরিশের কথার পিঠে মাথা নাড়ল। কিন্তু আরিশের সেই শান্ত গলার স্বর, আর তার কোনো রকম লম্পটতাহীন ভদ্র চাহনি মেহরীনের সাত বছরের জমানো পাথুরে কষ্টটাকে এক পলকে হালকা করে দিল। সেই দিনের পর থেকে ওটা একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেল। রোজ দুপুরে মেহরীন একবার করে ছাদে যায়। ওপাশে আরিশ দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের মাঝে কোনো ভালোবাসার লেনদেন হয় না, কোনো নিষিদ্ধ প্রেমের আলাপ হয় না। আরিশ শুধু খুব মন দিয়ে মেহরীনের দুই-একটা কথা বা তার নীরবতাটুকু শোনে, আর মেহরীনকে বোঝায় যে তারও একটা নিজস্ব মূল্য আছে।
নিচে শাশুড়ির গালি, দেবরের কুৎসিত নজর আর আকিলের পশুর মতো ব্যবহার যখন মেহরীনকে বিষিয়ে তোলে, তখন সে শুধু মনে মনে ভাবে আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা, তারপর দুপুরে ছাদে গিয়ে সে আরিশের সামনে দাঁড়াবে। আরিশ মেহরীনের জন্য কোনো প্রেমিক নয়, সে হয়ে উঠল মেহরীনের আত্মার সেই গভীর ক্ষতগুলো এবং তীব্র একাকীত্ব দূর করার জাদুকরী মাধ্যম।
–
দিন দিন ‘জমিনদার ভিলা’র ভেতরের বাতাস মেহরীনের জন্য বিষাক্ত থেকে বিষাক্ততর হয়ে উঠছিল। আকিলের সব ঝামেলা মেটাতে দেবর রাইয়ানই এখন প্রধান ভরসা। কিছুদিন আগে টাকা চুরি হয়েছিল আকিলের। সেই টাকা উদ্ধারের জন্য রাইয়ান দিন-রাত কোর্ট-কাচারি আর চকবাজারের দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করছে। আর এই সুযোগেই রাইয়ানের দাপট আর সাহস বাড়ির ভেতরে আকাশ ছুঁয়েছে। মেহরীনের ওপর তার সেই লোলুপ আর নোংরা নজরটা এখন আর শুধু চোখের চাতুরিতে সীমাবদ্ধ ছিল না।
সেদিন বিকেলে বাড়িতে শাশুড়ি দিলরুবা বেগম পাশের বাসায় মিলাদ মাহফিলে গিয়েছিলেন। কাসেম আলি গেছে বাজারে। পুরো বিশাল অট্টালিকাটায় মেহরীন তখন সম্পূর্ণ একা। সে যখন দোতলার অন্ধকার করিডোর পেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে রাইয়ান এসে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে তার পথ আগলে দাঁড়াল। মেহরীন চমকে উঠে দুই কদম পিছিয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। সে শক্ত গলায় বলল, “রাইয়ান? এখানে কী চাও? পথ ছাড়ো, আমি ঘরে যাব।”
রাইয়ান তার পথ তো ছাড়লই না, বরং এক কদম এগিয়ে এসে মেহরীনের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। ওনার মুখে বিকৃত, কুৎসিত হাসি। সে মেহরীনের শাড়ির আঁচলের দিকে তাকিয়ে লম্পটের মতো ফিসফিস করে বলল, “আরে ভাবী, এত তাড়াহুড়ো কিসের? আকিল ভাই তো ব্যবসার টাকা পয়সা লইয়া অন্ধ হয়া আছে। ওনার তো আপনার এই রূপ দেখার সময় নাই। তা ঘরের লক্ষ্মী এভাবে একা একা শুকায়া মরবেন, ওটা তো দেবর হিসেবে আমার সহ্য হয় না।” বলতে বলতেই রাইয়ান হুট করে মেহরীনের ফর্সা হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। তার নোংরা আঙুলগুলো মেহরীনের ত্বকে বসে গেল। মেহরীন তীব্র ঘৃণায় আর আতঙ্কে শিউরে উঠল। সে নিজের পুরো শক্তি দিয়ে রাইয়ানের বুকে একটা ধাক্কা মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নিল।
“লজ্জা করে না তোমার? আমি তোমার বড় ভাইয়ের বউ, তোমার মায়ের মতো! আর একটা কদম এগোলে আমি চিল-চিৎকার করে লোক জড়ো করব!” মেহরীনের গলা রাগে আর অপমানে কাঁপছিল। রাইয়ান ধাক্কা খেয়ে একটু পিছিয়ে গেল, কিন্তু তার মুখের সেই জঘন্য হাসিটা গেল না। সে পকেটে হাত দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “চিৎকার করবেন? করেন দেখি কে শোনে! আর মনে রাখবেন ভাবী, এই বাড়িতে আকিল ভাইয়ের পর আমার কথাই শেষ কথা। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আপনার এই রাজকীয় হাল এক মিনিটে রাস্তায় নামায়া দিমু।” রাইয়ান আর কথা না বাড়িয়ে একটা শিস দিতে দিতে নিচে নেমে গেল। মেহরীন নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা লক করে দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। তার পুরো শরীর তখনো ঘেন্নায় রি রি করছে।
রাত বারোটার পর আকিল সাহেব যখন ঘরে ফিরলেন, তখন ওনার মুখ ক্লান্তিতে কালো হয়ে আছে। মেহরীন অনেক কষ্টে নিজের জড়তা ঝেড়ে, বিছানায় বসা আকিলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার গলা জড়িয়ে আসছিল। সে বলল, “আকিল, আমি তোমাকে একটা খুব জরুরি কথা বলতে চাই। রাইয়ান… রাইয়ান আজ বিকেলে আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। ও আমার হাত ধরে টেনেছে, নোংরা কথা বলেছে। ও ভালো মানুষ নয় আকিল, তুমি ওকে বিশ্বাস করো না।”
আকিল তখন ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলাচ্ছিল। তবে মেহরীনের কথা শেষ হওয়া মাত্রই সে ফোনটা বিছানায় আছাড় দিয়ে মারল। তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। সে বিছানা থেকে উঠে মেহরীনের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।
“তুমি কী বললে? আমার ভাইয়ের নামে তুমি এই নোংরা তকমা দিচ্ছো?” আকিলের কণ্ঠস্বরে বাঘের মতো গর্জন।
“আমি সত্যি বলছি আকিল, খোদার কসম ও আজ….”
“থামো! একদম মুখ বন্ধ করো!” আকিল মেহরীনের হাতটা ঝটকানি দিয়ে ধরে চিৎকার করে উঠল, “রাইয়ান আমার ব্যবসার ডান হাত। ও না থাকলে আজ আমার গদি নিলাম হয়ে যেত। ও দিন-রাত এক করে আমার পনেরো লাখ টাকা উদ্ধারের জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছে। আর তুমি? ঘরে বসে বসে দামী অন্ন ধ্বংস করছ, আর আমার ভাইয়ের নামে এসব নোংরা অপবাদ দিচ্ছো? তুমি দুই দিনের মেয়ে হয়ে এই বাড়িতে এসে আমার ভাইয়ের চরিত্র নিয়ে কথা বলো? আসলে তোমার কোনো সন্তান-সন্ততি নেই, মাথায় কোনো চিন্তা নেই, তাই সারাদিন ঘরে বসে বসে এসব কুৎসিত নাটক সাজাও!”
আকিলের এই প্রতিটি শব্দ মেহরীনের বুকে একেকটা ধারালো খঞ্জরের মতো বিঁধতে লাগল। যে স্বামী নিজের স্ত্রীর ইজ্জতের চেয়ে টাকার থলিকে বড় মনে করে, তার সাথে আর কোনো কথা বলা বৃথা। আকিল মেহরীনকে একটা তীব্র ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিল। “আজ থেকে রাইয়ানের নামে একটা কুৎসিত কথা যদি তোমার মুখ থেকে বের হয়, তবে এই ঘর থেকে তোমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব। অকৃতজ্ঞ মেয়েছেলে!”
আকিল পাশ ফিরে শুয়ে লাইটটা বন্ধ করে দিল। অন্ধকার ঘরে মেহরীন বিছানায় শুয়ে রইল নিথর পাথরের মতো। তার চোখের জল বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো নামল। বালিশটা চোখের জলে ভিজে ভারী হয়ে উঠল, কিন্তু তার বুক ফেটে যে কান্না আসছিল, তা সে মুখ চেপে আটকে রাখল। এই অন্ধকার ঘরে, এই বিশাল সমাজে তার আপন বলতে কেউ নেই। সে কতটা একলা, কতটা অসহায়।
–
রাত তখন আনুমানিক দুটো কি আড়াইটা। পুরো ফরাশগঞ্জ শহর ঘুমিয়ে কাদা। ‘জমিনদার ভিলা’র ভেতরে তখন আকিলের ভারী নাসিকাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। মেহরীনের মনে হচ্ছিল এই বন্ধ ঘরের ছাদটা এখনই তার ওপর ভেঙে পড়বে। সে আর সহ্য করতে না পেরে বিছানা থেকে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। একটা কালো সুতি চাদর গায়ে জড়িয়ে সে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে এল। রাতের ছাদটা বড্ড শান্ত, নিঝুম। আকাশে একফালি মেঘলা চাঁদ, যার আলো চুন-সুরকির পুরনো ছাদে এসে পড়েছে। মেহরীন ছাদের আলিসাটার ওপর দুই হাত রেখে আকাশের দিকে তাকাল। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এতক্ষণের চেপে রাখা কান্নাটা এবার হাহাকার হয়ে বুক চিরে বেরিয়ে এল। সে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল, এই জীবনটা রাখার চেয়ে বুড়িগঙ্গার জলে ঝাঁপিয়ে পড়া অনেক ভালো।
“কান্না চেপে রাখলে বুকের ভেতরটা পাথর হয়ে যায় মেহরীন ভাবী। কিন্তু সেই পাথরের ভারে নিজেকে শেষ করে দেওয়াটা কোনো সমাধান নয়।” স্তব্ধ মধ্যরাতে হুট করে ওপাশের ছাদ থেকে এক শান্ত, গম্ভীর আর অত্যন্ত চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মেহরীন চমকে উঠে চোখ মুছে তাকাল। দেখল আরিশ ওপাশের ছাদের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কোনো ঘুম নেই, পরনে একটা সাদা কুর্তা। চশমার আড়ালে তার চোখ দুটো চাঁদের আলোয় চকচক করছে।
মেহরীন এই মাঝরাতে আরিশকে দেখে অপ্রস্তুত হলো না, লোকলজ্জার ভয়ও পেল না। কারণ তার ভেতরের সবটুকু ভয় আজ আকিল আহমেদ নামক মানুষটা শেষ করে দিয়েছে। মেহরীন শুধু ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “আমি আর পারছি না আরিশ… আমি আর নিতে পারছি না।”
আরিশ খুব নরম গলায় বলল, “আমি জানি ভাবী। আজ আপনার বাড়ির ভেতরের সেই চিৎকার আর অশান্তির আওয়াজ আমার এই ছাদ পর্যন্ত আসছিল। কী হয়েছে আমাকে বলুন। নিজেকে একা ভাববেন না।”
আরিশের এই ‘নিজেকে একা ভাববেন না’ কথাটুকু মেহরীনের ভেতরের সাত বছরের জমানো বাঁধটাকে এক পলকে ভেঙে চুরমার করে দিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এই প্রথম সে কোনো পরপুরুষের সামনে নিজের জীবনের সবটুকু নগ্ন সত্য, সবটুকু দুঃখ উজাড় করে বলতে শুরু করল।
সে আরিশকে বলল, কীভাবে বিয়ের পর থেকে সে একটা খাঁচার পাখি হয়ে আছে। কীভাবে তার কোল শূন্য বলে তাকে ‘আঁটকুড়ি’র তকমা সইতে হয়েছে, অথচ আসল সমস্যা যে আকিলের, সেই সত্যটা ওনারা কীভাবে চেপে গেছেন। সে বলল আজ বিকেলে রাইয়ানের সেই নোংরা হাত বাড়ানোর কথা, আর রাতে আকিল তাকে যেভাবে অপবাদ দিয়ে বিছানায় ধাক্কা মেরে ফেলেছে সবকিছু সে একনাগাড়ে বলে গেল। বলতে বলতে মেহরীনের গলা বুজে আসছিল, চোখ দিয়ে অবিরাম জল ঝড়ছিল।
আরিশ পুরোটা সময় গভীর মনোযোগ দিয়ে, অত্যন্ত শান্তভাবে মেহরীনের প্রতিটি কথা শুনল। মেহরীন কথা শেষ করে বলল, “বলুন আরিশ, আমার অপরাধটা কী? আমি কেন এই নরকে প্রতিদিন তিলে তিলে মরছি? আমার কি কোনো অধিকার নেই একটা মানুষের মতো বাঁচার?”
আরিশ চশমাটা একটু ঠিক করে রেলিংয়ের ওপর আরও একটু ঝুঁকে এল। তার গলার স্বর এবার অত্যন্ত দৃঢ় আর যৌক্তিক হয়ে উঠল। সে বলল, “আপনার কোনো অপরাধ নেই মেহরীন ভাবী। অপরাধটা হচ্ছে আপনার এই সহ্য করার ক্ষমতার। আপনি নিজেকে অপরাধী ভাবছেন কারণ সমাজ আপনাকে শিখিয়েছে স্বামী যা-ই করুক, মুখ বুজে সয়ে যাওয়াই নারীর ধর্ম। কিন্তু লজিক কী বলে জানেন?”
আরিশ মেহরীনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, “আকিল সাহেব আপনাকে ভালোবাসেন না, কারণ ওনার কাছে স্ত্রী মানে একটা সম্পত্তির দলিল। আর আপনার দেবর রাইয়ান যা করেছে, ওটা কোনো হুট করে ঘটা ঘটনা নয়। ওটা হলো আপনার এই দীর্ঘদিনের নীরবতার সুযোগ নেওয়া। ও দেখেছে আপনি প্রতিবাদ করেন না, আকিল সাহেব আপনার খোঁজ নেন না, তাই ও সুযোগ নিতে চেয়েছে। আর আকিল সাহেব আজ আপনাকে যে অপমানটা করলেন, ওটা ওনার পুরুষতান্ত্রিক অহংকার। ওনার নিজের যে অক্ষমতা, সেই অপরাধবোধটা উনি আপনার ওপর রাগ ঝেড়ে ঢাকতে চাইছেন।”
আরিশ এক মুহূর্ত থামল, তারপর তার কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত সাহসের আলো ফুটিয়ে বলল, “মেহরীন ভাবী, যে পুরুষ নিজের স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করতে পারে না, যে পরিবার একটা নারীকে প্রতিদিন মানসিক লাঞ্ছনা দেয়, সেই পরিবারকে ‘সংসার’ বলাটা সবচেয়ে বড় ভুল। ওটা একটা কারাগার। আর আপনি কোনো ‘আঁটকুড়ি’ বা ‘অলক্ষ্মী’ নন। আপনি একজন জ্যান্ত, স্বাধীন মানুষ। খোদা আপনাকে এই সুন্দর জীবনটা দিয়েছেন চার দেওয়ালে বন্দি হয়ে প্রতিদিন অপমানের জল গিলে মরার জন্য নয়। নিজের ভেতরের সেই নীলকণ্ঠী পাখিটাকে আর বিষ গিলতে দেবেন না। এবার চোখ মুছুন। অন্যায় সহ্য করাটাও একটা মস্ত বড় অন্যায়। আপনি যদি নিজের জন্য নিজে না দাঁড়ান, এই দুনিয়ার কেউ আপনার জন্য দাঁড়াবে না। নিজের ভেতরের সাহসটাকে জাগিয়ে তুলুন।” আরিশের এই প্রতিটি কথা, এই অকাট্য যুক্তি আর বিশ্লেষণ মেহরীনের মাথার ভেতর নতুন আলো জ্বেলে দিল। এত বছর ধরে সে নিজেকে যে অপরাধী ভাবত, আরিশের লজিক এক পলকে সেই মিথ্যাটাকে ধুয়ে দিল। মেহরীনের বুক চিরে এক অন্যরকম সাহসের হাওয়া বয়ে গেল। সে আরিশের দিকে তাকাল। মেহরীন ধীরপায়ে চোখটা মুছল। তার কান্নার বেগ কমে এল, সেখানে জায়গা করে নিল এক নতুন জেদ। সে আরিশকে নিচু স্বরে বলল, “ধন্যবাদ আরিশ।”
আরিশ মৃদু হাসল, “আমি তো আগেই বলেছি ভাবী, আমি শুধু আপনার স্তব্ধতার ভাষাটা পড়তে পারি। এবার ঘরে যান, শান্তিতে ঘুমান।”
মেহরীন মাথা নাড়াল। সে যখন ছাদ থেকে নিচে নেমে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল, তখন তার পায়ের আওয়াজে আর কোনো জড়তা ছিল না। এখন শান্তি লাগছে। হয়তো শান্তি লাগছে কারন তার একটা কথা বলা, নিজের মনের ভাব বিনিময় করার মানুষেরই অভাব ছিল।
চলবে?

