Home "ধারাবাহিক গল্প খাচায় বন্দি নীলকন্ঠী খাচায় বন্দি নীলকন্ঠী পর্ব-০৫ এবং শেষ পর্ব

খাচায় বন্দি নীলকন্ঠী পর্ব-০৫ এবং শেষ পর্ব

0
309

#খাঁচায়_বন্দি_নীলকন্ঠী
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#অন্তিম_পর্ব

পুরান ঢাকার সকালগুলো ইদানীং মেহরীনের কাছে একেকটা দীর্ঘশ্বাসের মতো আসে। সূত্রাপুরের এই জমিনদার ভিলার দেয়ালগুলো রোজ রাতে ইঞ্চি ইঞ্চি করে চেপে বসে ওনার বুকের ওপর। আকিল আহমেদের ডিভোর্স পেপার রেডি করার সেই হুমকির পর দুটো দিন কেটে গেছে। এই দুটো দিন বাড়িতে কেউ মেহরীনের সাথে একটা কথাও বলেনি। সে যখন খাবার টেবিলে তরকারি নিয়ে যায়, আকিল আর শাশুড়ি এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেন যেন ওনারা কোনো অপয়া, অলক্ষ্মী অস্পৃশ্য কিছু দেখছেন।

আজ নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। সকাল থেকেই আকাশটা কেমন যেন মেঘলা, কুয়াশার একটা পাতলা চাদর বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে উড়ে এসে ফরাশগঞ্জের অলিগলি ভরিয়ে দিয়েছে। মেহরীন দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধোয়া শাড়িগুলো মেলছে। তার হাত দুটো কাঁপছে। গত রাতেও আকিল কাজ থেকে ফিরে টাকার শোকে ঘরে তাণ্ডব চালিয়েছে। মেহরীনকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, “তোর ওই ডাইনী মুখের দিকে তাকাইলেই আমার সব কাজে লোকসান হয়। আর একটা সপ্তাহ, পেপারটা আসলেই তোরে লাথি মেরে এই বাড়ি থেকে বের করব।”

মেহরীন তখন কাঁদেনি। সে শুধু নিজের ঘরের জানলা দিয়ে ওপাশের সেই দোতলা শ্যাওলা পড়া সবুজ রঙের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখানে আরিশের ঘরের জানলাটা বন্ধ। আজ দুদিন ধরে আরিশকে ছাদে দেখা যায়নি। মেহরীনের মনের ভেতর তীব্র ব্যাকুলতা তৈরি হয়েছে। এটা কি কেবলই আশ্রয় পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, নাকি আরিশ নামের সেই শান্ত, প্রগতিশীল যুবকটির প্রতি এক অলিখিত, গভীর মনস্তাত্ত্বিক টান? মেহরীন নিজেই জানে না। কিন্তু সে শুধু বোঝে, নিচে শাশুড়ির গালি আর আকিলের পশুর মতো ব্যবহারের পর ওই ছাদের ওপারে আরিশের একটা মৃদু চাহনিই তার সমস্ত ক্ষত ধুয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। চব্বিশটা ঘণ্টা সে শুধু ছক কাটে কখন দুপুর হবে, কখন সে ছাদে যাবে। একজন বিবাহিত নারী হিসেবে এই টানটা হয়তো পাপ, কিন্তু মেহরীনের মরণাপন্ন আত্মা তখন কোনো পাপ-পুণ্যের হিসাব করার অবস্থায় নেই।

“ ভাবী, একা একা শাড়ির আঁচল নিয়া কী ভাবতাছেন? নিজের রূপের দেমাক এখনো গেল না?” পেছন থেকে রাইয়ানের সেই পরিচিত, নোংরা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মেহরীন চমকে ঘুরে দাঁড়াল। রাইয়ানের পরনে আজ একটা কালো রঙের সিল্কের পাঞ্জাবি, হাতে সেই চামড়ার দামী ব্রিফকেসটা।

মেহরীন নিজের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে শক্ত গলায় বলল, “রাইয়ান, আমার সামনে থেকে যাও। আমি তোমার সাথে কোনো কথা বলতে চাই না।” রাইয়ান এক কদম এগিয়ে এল। ওনার মুখ থেকে উগ্র জর্দার গন্ধ বের হচ্ছিল। সে মেহরীনের একদম কাছাকাছি এসে ফিসফিস করে বলল, “কথা কইবেন না? আর তো মাত্র কয়েকটা দিন ভাবী। বড় ভাই তো পেপার রেডি করতাছে। এই বাড়ি থিকা যখন রাস্তায় নামবেন, তখন কিন্তু এই রাইয়ান ছাড়া আপনারে আশ্রয় দেওয়ার কেউ থাকব না। এখনো সময় আছে, আমার সাথে একটু ভালো ব্যবহার করেন। গদির পনেরো লাখ টাকার হিসাব আমি এমনভাবে মিলায়া দিমু যে বড় ভাই আপনারে পায়ে ধইরা রাখব।”

মেহরীন তীব্র ঘৃণায় আর অপমানে রাইয়ানের মুখে থুতু দিতে চাইল। সে নিজের হাতটা তুলে রাইয়ানকে সরিয়ে দিয়ে বলল, “নিজের নোংরা মুখ বন্ধ করো রাইয়ান। আমি রাস্তায় না খেয়ে মরব, তাও তোমার মতো একটা পশুর ছায়া এদিকের মাটিতে পড়তে দেব না। পথ ছাড়ো!” রাইয়ানের চোখ দুটো এক পলকের জন্য হিংস্র হয়ে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সে এক বিকৃত হাসি দিল। ওনার হাতের ব্রিফকেসটা শক্ত করে ধরে সে বলল, “আচ্ছা ভাবী, আপনার এই দেমাক আমি কেমনে ভাঙি, ওটা আজ রাতেই দেখবেন। এই রাইয়ান কী জিনিস, ওটা বুইঝা ওঠার সময়ও পাইবেন না।” রাইয়ান আর দাঁড়াল না, দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। মেহরীন বারান্দার গ্রিলটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ওনার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় দপ দপ করতে লাগল।

দুপুর দুইটো বাজতেই মেহরীন প্রায় ছটফট করতে করতে ছাদে উঠে এল। আজ তার আর সহ্য হচ্ছিল না। সে আলিসার ওপর দুই হাত রেখে চাতক পাখির মতো ওপাশের ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। খানিক বাদে চিলেকোঠার দরজা খুলে আরিশ বেরিয়ে এল। আজ আরিশের পরনে একটা ধবধবে সাদা রঙের ফতুয়া, চোখে চশমা। মেহরীনকে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিশের মুখে সেই চিরচেনা, শান্ত আর মায়াবী হাসিটা ফুটে উঠল। সে রেলিংয়ের কাছে এগিয়ে এসে খুব নিচু কিন্তু গভীর গলায় বলল, “আজকের কুয়াশাটা বড্ড ভারী মেহরীন ভাবী। কিন্তু আপনার মুখের কুয়াশাটা তার চেয়েও বেশি ঘন লাগছে। নিচে কি আবার কোনো অশান্তি হয়েছে?”

আরিশের এই শান্ত, মায়াবী কণ্ঠটা শোনা মাত্রই মেহরীনের চোখের কোণ দিয়ে দুই ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। সে নিজের কান্নাটা লুকাতে পারল না। সে ফিসফিস করে বলল, “আরিশ, আমি আর পারছি না। রাইয়ান আজ আবার আমাকে হুমকি দিয়েছে। সে বলেছে আজ রাতেই নাকি আমার দেমাক ভেঙে দেবে। আর আকিল… আকিল তো উকিলের সাথে কথা বলছে। আরিশ, ওরা আমাকে এই চুরির অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। এই বিশাল শহরে আমার তো মাথা গোঁজার কোনো জায়গা নেই। আমি কোথায় যাব আরিশ?” আরিশের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে গম্ভীর হয়ে গেল। ওনার চশমার আড়ালের চোখ দুটো কেমন যেন ধারালো দেখাল। সে চশমাটা একটু ঠিক করে অত্যন্ত ধীরস্থির লজিক দিয়ে বলতে শুরু করল, “মেহরীন ভাবী, ভয় পাবেন না। আমি আপনাকে আগেও বলেছি, রাইয়ানের এই অস্থিরতা আর এই হুমকি কিন্তু ওনার নিজের ভেতরের কোনো বড় অপরাধের বহিঃপ্রকাশ। ও যখন দেখছে যে আকিল সাহেব আপনাকে ডিভোর্স দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন, তখন ওনার নিজের কোনো একটা বড় চাল শেষ করার এটাই উপযুক্ত সময়। আজ সাবধানে থাকবেন। রাইয়ান আজ রাতেই কোনো বড় ঘাপলা করতে পারে।”

মেহরীন আরিশের দিকে এক মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। মেহরীন বলল, “আমি ওদের পরোয়া করি না আরিশ। কিন্তু আমার আত্মসম্মান? ওরা যদি আমার গায়ে হাত তোলে?” আরিশ এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। সে ওপাশের ছাদ থেকে মেহরীনের ফর্সা, বিষাদময় মুখের দিকে তাকাল। ওনার গলায় এক অদ্ভুত সাহসের আলো ফুটে উঠল। সে বলল, “যদি ওনারা আপনার গায়ে হাত তোলেন, তবে জানবেন ওটাই ওনারা ওনাদের পতন ডেকে আনছেন। অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহ্য করে দুজনেই সমান অপরাধী ভাবী। আপনি নিজের ভেতরের সেই নীলকণ্ঠী পাখিটার ডানা আর গুটিয়ে রাখবেন না। আজ রাতে যদি কোনো ঝড় আসে, আপনি শক্ত থাকবেন। মনে রাখবেন, এই ছাদটা সবসময় আপনার জন্য খোলা আছে। আমি এখানেই আছি।”

আরিশের এই ‘আমি এখানেই আছি’ কথাটুকু মেহরীনের ক্ষতবিক্ষত কলিজায় এক পরম মলমের মতো কাজ করল। সে কোনো প্রেমের শব্দ শুনতে পায়নি, আরিশ তাকে নিজের করে নেওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবুও সে অলিখিত টান অনুভব করতে লাগল এই পরপুরুষের প্রতি। সে কি জানে না, এই টানের শেষ পরিণতি কতটা করুণ হতে পারে?

রাত তখন আনুমানিক সাড়ে এগারোটা। পুরো জমিনদার ভিলা এক ভয়াবহ চিৎকারে কেঁপে উঠল। মেহরীন নিজের ঘরে বসে একটা সুতি শাড়ি গুছাচ্ছিল, ঠিক তখনই শাশুড়ি দিলরুবা বেগমের চিল-চিৎকার শোনা গেল। “ওরে আমার সব শেষ হয়া গেল রে! ও আকিল, আমারে কে বাঁচাইবা আইসা দেখ রে!” মেহরীন ধড়ফড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এল। সেখানে এসে সে যা দেখল, তাতে ওনার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। শাশুড়ির ঘরের দামী কাঠের আলমারির ড্রয়ারগুলো সব মেঝেতে ভেঙে পড়ে আছে। কাপড়-চোপড় সব তছনছ। দিলরুবা বেগম মেঝেতে বসে বুকে চাপড়ে কাঁদছেন। আকিল সাহেব তখন মাত্রই অফিস থেকে ফিরেছেন, ওনার হাতের ব্রিফকেসটা মেঝেতে পড়ে আছে। ওনার চোখ দুটো রাগে আর অপমানে লাল হয়ে বাঘের মতো জ্বলছে।

“কী হইছে আম্মা? চিৎকার করতাছেন কেন?” আকিল গর্জে উঠলেন।

দিলরুবা বেগম মেহরীনের দিকে নোংরা এক আঙুল তুলে চিৎকার করে উঠলেন, “এই ডাইনী, এই চোর আমার লকারের চাবি চুরি কইরা আমার পনেরো ভরির সোনার সীতাহার আর গদির কালেকশনের পাঁচ লাখ টাকা সরাইয়া ফেলছে রে আকিল! আজ সন্ধ্যায় আমি যখন ওজু করতে বাথরুমে গেছিলাম, এই মেয়ে আমার ঘরে ঢুকছিল। আমি নিজের চোখে দেখছি!” মেহরীন স্তব্ধ হয়ে গেল। ওনার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে চিৎকার করে বলল, “আম্মা! খোদার কসম আমি আপনার ঘরে যাইনি! আমি কিচ্ছু জানি না! আমি কেন চুরি করব?” কিন্তু মেহরীনের কথা শেষ হওয়ার আগেই আকিল পশুর মতো ঝাঁপিয়ে এলো। সে মেহরীনের চুলে মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টেনে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে নিয়ে এলো। তার বিশাল হাতের এক কষে থাপ্পড় পড়ল মেহরীনের গালে। থাপ্পড়ের চোটে মেহরীনের ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল।

“হারামজাদী! চোর মেয়েছেলে!” আকিল দাঁতে দাঁত চেপে মেহরীনের পেটে একটা লাথি মারল। মেহরীন যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে মেঝেতে পড়ে গেল। তার মাথার খোঁপাটা খুলে চুলগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

আকিল মেহরীনের চুলের মুঠি ধরে ওনার মুখটা ওপরে তুলে বলল, “আমার গদির পনেরো লাখ টাকা শেষ হইছে, আর তুই এই সুযোগে আম্মার গহনা আর ঘরের পাঁচ লাখ টাকা চুরি কইরা তোর কোন নাগররে দিতে চাইছস? বল! টাকা আর গহনা কই রাখছস?” মেহরীন যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার ঠোঁটের রক্ত মেঝেতে পড়ছিল। সে রাইয়ানের দিকে তাকানোর জন্য চোখ মেলল, কিন্তু দেখল ড্রয়িংরুমে রাইয়ান নেই।

শাশুড়ি দিলরুবা বেগম মেহরীনের পিঠে ওনার তসবির কাঠের গোছাটা দিয়ে সজোরে আঘাত করতে করতে বললেন, “বল ওরে অলক্ষ্মী, গহনা কই রাখছস? আজ তোরে পুলিশে দিমু। আকিল, তুই রাইয়ানরে ফোন কর। ও উকিল আর পুলিশ লইয়া আসুক।” আকিল পকেট থেকে ফোন বের করে রাইয়ানের নাম্বারে ডায়াল করতে লাগল। একবার, দুবার, তিনবার… কিন্তু ওপাশ থেকে অনবরত ভেসে আসছিল, ‘দয়া করে কিছুক্ষণ পর চেষ্টা করুন’।

আকিল ভ্রু কুঁচকে বললেন, “রাইয়ানের ফোন বন্ধ কেন? ও তো আজ সন্ধ্যায় গদির পেমেন্ট কালেকশন নিয়া বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কাসেম আলী! ও কাসেম আলী! রাইয়ান কই?” পুরনো কাজের লোক কাসেম আলী এক কোণায় ভয়ে কাঁপছিলেন। সে হাত জোড় করে বলল, “ছোট সাহেব তো সন্ধ্যা সাতটার দিকে ওনার সেই বড় চামড়ার বাক্সটা লইয়া গাড়ি দিয়া বাইর হয়া গেছেন। কইলেন চকবাজারের বড় পার্টির সাথে দেখা করতে যাইতাছেন।”

আকিল সাহেবের বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল। সে মেহরীনের চুলের মুঠিটা ছেড়ে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে গদির ম্যানেজারের নাম্বারে ফোন করলেন। ওপাশ থেকে ম্যানেজার যা বলল, তা শুনে আকিল সাহেবের হাতের ফোনটা মার্বেল পাথরের মেঝেতে পড়ে ঝনঝন শব্দে ভেঙে গেল। ম্যানেজার জানিয়েছে রাইয়ান আজ বিকেলেই গদির সমস্ত ক্যাশ বাক্স খালি করে, ব্যাংকের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে আকিলের রিয়েল এস্টেটের পার্টনারশিপের ভুয়া কাগজ দেখিয়ে পুরো বিশ লাখ টাকা তুলে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। আকিল সাহেব এক মুহূর্তে দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লেন। ওনার মুখটা ফ্যাকাশে, জ্যান্ত লাশের মতো হয়ে গেল। সে বিড়বিড় করে বললেন, “রাইয়ান… আমার নিজের ভাই আমারে ফকির কইরা দিয়া পালাইল?”

শাশুড়ি দিলরুবা বেগম ওনার ছেলের এই অবস্থা দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। ঘরের পুরো পরিবেশ এক নিমেষে বদলে গেল। যে চুরির অপবাদ ওনারা মেহরীনের ওপর দিচ্ছিলেন, আসল চোর যে ওনাদের নিজেদের কলিজার টুকরো রাইয়ান এই সত্যটা ওনাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিল। মেহরীন মেঝে থেকে অনেক কষ্টে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণ থেকে তখনো রক্ত ঝরছে, সারা শরীরে চাবুকের মতো দাগ। কিন্তু তার চোখে আজ কোনো জল নেই, সেখানে আছে এক পৈশাচিক শান্ত জেদ। সে আকিল আর শাশুড়ির এই কান্নাকাটির দিকে তাকিয়ে এক ফোঁটা মায়াও অনুভব করল না। সে ধীরপায়ে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেল। সে বুঝতে পারল, এই জমিনদার ভিলার সোনার খাঁচাটা আজ চিরতরে ভেঙে গেছে। সে নিজের চাদরটা গায়ে জড়িয়ে, এই কালরাত্রির অন্ধকারেই শেষবারের মতো সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে পা বাড়াল। সে আরিশের কাছে যাবে। আরিশের সেই শান্ত ছাদটুকুই এখন তার জীবনের শেষ সীমানা।

_

রাত তখন তিনটে। ফরাশগঞ্জের আকাশটা আজ এক গভীর কুহক মেখেছে। কুয়াশা এতটাই ঘন যে সামনের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোটাও ঘোলাটে দেখাচ্ছে। জমিনদার ভিলার লোহার সদর দরজাটা এক ইঞ্চিও শব্দ না করে খুলে মেহরীন বেরিয়ে এল। তার পরনে একটা সাদামাটা কালো সুতি শাড়ি, গায়ে জড়িয়ে রাখা সেই চাদরটা। ঠোঁটের কোণের রক্তটা শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে, সারা শরীরে যন্ত্রণার নীল দাগ। কিন্তু মেহরীনের মনে তখন কোনো শারীরিক ব্যথা নেই। তার মনের ভেতর তখন শুধু একটা নাম ঝংকারের মতো বাজছিল। আর তা হলো আরিশ।

আরিশের বাড়ির সদর দরজার কলিংবেলটা চাপার সময় মেহরীনের হাতটা কাঁপছিল। সে কি ঠিক করছে? এই মাঝরাতে একজন বিবাহিত নারী হয়ে অন্য পুরুষের দুয়ারে দাঁড়ানোটা কি সমাজ মেনে নেবে? মেহরীন তখন তার ভেতরে একটা ‘মিষ্টি পাপ’ অনুভব করলেন। হ্যাঁ, আরিশের প্রতি ওনার এই টানটা হয়তো বৈধ নয়, কিন্তু যে স্বামী তার ইজ্জত আর শরীরকে পশুর মতো ছিঁড়ে খেয়েছে, তার চেয়ে এই পরপুরুষের সাহসের কথাগুলো কাছে অনেক বেশি পবিত্র।

দরজাটা খুলল। মেহরীন ভেবেছিল আরিশকে একা দেখবে। হয়তো আরিশ তাকে দেখে চমকে উঠবে, তারপর তার ক্ষতগুলো দেখে আগের মতো করে সান্ত্বনা দেবে। কিন্তু দরজা খোলার পর যা ঘটল, তার জন্য মেহরীন বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলেন না। দরজাটা খুলল এক যুবতী মেয়ে। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা, বড় বড় মায়াবী চোখ, পরনে একটা সালোয়ার কামিজ। মেয়েটার কপালে বড় একটা লাল টিপ। সে মেহরীনকে দেখে একটু অবাক হয়ে হাসল। “কাকে খুঁজছেন?”

মেহরীন বাক্যহারা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার ভেতরটা যেন হঠাৎ করে কোনো এক গভীর শূন্যতায় তলিয়ে গেল। ঠিক তখনই ভেতর থেকে আরিশের সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। “নীলা, এই মাঝরাতে কে এল?”

আরিশ এগিয়ে এল। পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। মেহরীনকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিশের মুখটা এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। কিন্তু তার চোখে আগের সেই মায়াবী আশ্বাসের চেয়েও সঙ্কোচ ফুটে উঠল।

“মেহরীন ভাবী? আপনি… এই অবস্থায়?” আরিশের গলায় একটা জড়তা।

মেহরীন কোনো কথা বলতে পারল না। সে শুধু দেখল আরিশের পাশে সেই মেয়েটি খুব আপনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আরিশ মেহরীনের দিকে তাকিয়ে বলল, “নীলা, ইনি মেহরীন ভাবী। আমাদের পাশের বাড়ির। ওইযে ফোনে যার কথা সবসময় বলতাম। আর ভাবী… এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। নীলা আমার স্ত্রী। আমরা পাঁচ বছর ধরে সম্পর্কে ছিলাম, দুই দিন হলো ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছি। সব ঘরোয়াভাবে হয়েছে বলে কাউকে জানানো হয়নি। আপনাকে কালকেই জানাতাম। রাতেই তো বাড়ি এসেছি, ক্লান্ত শরীর।”

নীলা খুব মিষ্টি করে হেসে বলল, “আসুন না ভেতরে ভাবী। আপনার মুখে রক্ত কেন? আরিশ, দেখো তো ওনার কী হয়েছে!”

মেহরীনের মনে হলো তার পায়ের তলার মার্বেল পাথরটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। তার বুকের ভেতর যে পাহাড়প্রমাণ কষ্টের নদীটা আরিশের কাছে উজাড় করে দিতে এসেছিল, তা এক মুহূর্তেই বরফ হয়ে গেল। পাঁচ বছরের সম্পর্ক! তার মানে আরিশ যখন রোজ দুপুরে ছাদে দাঁড়িয়ে তাকে সাহসের কথা গুলো বলত, যখন তার বিষটুকু নিজের বুকে টেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিত তখন এই নীলা নামক মেয়েটি আরিশের অস্তিত্ব জুড়ে ছিল। আরিশ কোনোদিন তাকে বলেনি সে ভালোবাসে, কোনোদিন কোনো অধিকারের কথা বলেনি। মেহরীনই নিজের মনের অজান্তে আরিশের প্রতিটি শব্দকে ‘ভালোবাসা’ ভেবে এক পাপে ডুবেছিল।

মেহরীন তার চাদরটা দিয়ে গালের ক্ষতটা ঢাকার চেষ্টা করে একটা শুকনো হাসি দিল।গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছিল না, তাও সে বলল, “না না, আমি… আমি আসলে আরিশকে বলতে এসেছিলাম যে রাইয়ান টাকা নিয়ে পালিয়েছে। আরিশ বলেছিল না রাইয়ান বিপজ্জনক? ওটাই শুধু জানাতে এসেছিলাম। আমি যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

নীলা খুব আন্তরিকভাবে বলল, “সে কী! এই অবস্থায় যাবেন না। একটু চা খেয়ে যান।”

“না, আমার স্বামী অপেক্ষা করছে।” মেহরীন এই চরম মিথ্যেটা বলে হুট করে ঘুরে দাঁড়ালন। তার চোখের জল তখন আর বাঁধ মানছিল না। সে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। আরিশ একবারও পেছন থেকে ডাকল না। ডাকবেই বা কেন? তার তো একটা মানুষ আছেই, অথচ তার সাহস জোগানো কথা গুলোকে ভালোবাসা হিসেবে নেওয়ার শাস্তি খোদা বুঝি এভাবে দিলেন?

সকালে সদরঘাট টার্মিনালে তিল ধারণের জায়গা নেই। কার্তিক শেষের কনকনে কুয়াশা আর বুড়িগঙ্গার উগ্র গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। চারদিকে চিল-চিৎকার, কুলিদের হাকডাক, আর একের পর এক লঞ্চের কর্কশ ভেঁপুর আওয়াজ বাতাসে কাঁপন ধরাচ্ছে। এই তীব্র কোলাহলের মাঝে মেহরীন যখন একটা সাধারণ ডবল ডেকার লঞ্চের কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ছাদে এসে দাঁড়াল, তখন তার চারপাশের পৃথিবীটা আশ্চর্য নীরবতায় ডুবে গেছে।

তার ডান হাতে একটা ছোট, জীর্ণ কাপড়ের ব্যাগ। পরনে সেই চুনট করা নীল সুতি শাড়িটা। যা আরিশের খুব প্রিয় ছিল। আরিশের ছাদ থেকে যখনই সে এই শাড়িটার দিকে তাকাত, তার চোখের চশমাটা আলতো উঁচিয়ে এক চিলতে অদ্ভুত আলো খেলে যেত। আজ সেই আরিশের দেওয়া শেষ আঘাতের পর, কাল পুরোটা রাত মেহরীনের কেটেছে জমিনদার ভিলার ওই অন্ধকার ছাদের সিঁড়িতে বসে। একাকী, নিথর হয়ে। চোখের জলের সাথে রাতের কুয়াশা এক হয়ে তার গাল বেয়ে চাদরে গিয়ে মিশেছে। জীবন নিয়ে মেহরীনের আসলে আর নতুন করে কিছু বলার নেই, কোনো অভিযোগও নেই। না নিজের বাপের বাড়ি থেকে সে কোনোদিন আদর-সুখ পেয়েছিল, না পেয়েছিল এই সাত বছরের চেনা স্বামীর সংসারে।

আজ বড় বেশি মনে পড়ছে পুরনো কথাগুলো। আকিল আহমেদের বয়স ছিল তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। বিয়ের পর যখন সতেরো বছরের মেহরীন পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের রাস্তায় আকিলের হাত ধরে প্রথম হেঁটেছিল, তখন পাড়া-পড়শিরা আড়ালে-আবডালে বলত, “অন্ধকার আকাশ যেন নিজের ঘরে আস্ত একটা চাঁদ আইনা রাখছে!” মানুষের সেই রূপের প্রশংসা, সেই মুগ্ধতা যেদিন আকিল আর আকিলের পরিবার সহজভাবে নিতে পারল না ঠিক সেদিনই মেহরীন প্রথম আন্দাজ করেছিল, এই রূপই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হতে চলেছে। ঈর্ষা আর হীনম্মন্যতার এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছিল তার চারপাশে।
পুরান ঢাকায় বড় ঘরের বউ হয়ে আসার পর নিজের বলতে আর কোনো অস্তিত্ব থাকেনি মেহরীনের। সকাল থেকে মাঝরাত অবধি স্বামীর কোনটা লাগবে, শাশুড়ির তসবির থলেটা কোথায় গেল, সংসারের কোন কোণায় ঝুল জমল এসব দেখতে দেখতেই জীবনের বসন্তগুলো স্রেফ কর্পূরের মতো উড়ে গেল। দিনশেষে ওই এক চিলতে বারান্দার গ্রিল ধরে খোলা আকাশের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তার। স্বামী তাকে পৃথিবীর সব জাগতিক সুখ এনে দিয়েছিল, গয়নাগাটি থেকে শুরু করে দামী পারফিউম সব এনে দিয়েছিল, কেবল ভালোবাসা ছাড়া। এই সাত বছরের সংসার জীবনে এসে মেহরীন একটা সত্য খুব ভালো করে বুঝেছিল। “নারীদের কোনো নিজস্ব চাহিদা থাকতে নেই, কোনো নিজস্ব অসুখ বা ক্লান্তি থাকতে নেই।” সারাদিন অমানুষিক খাটুনির পর ঘরের বউ যদি একটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাফ ছাড়তে যায়, তবে এই সমাজে কথা শুনানোর লোকের কোনো অভাব হয় না। সাতটা বছর মেহরীন কেবল ওই মেঘলা আকাশের দিকে চেয়ে নিজের নিঃসঙ্গতা মেটাত। তারপর, কোনো এক অলৌকিক দুপুরে তার সেই একাকীত্বের আকাশে হুট করেই আরিশের আগমন ঘটেছিল। যেই খাঁচায় বন্দী নীলকণ্ঠী পাখিটা এতদিন খালি দূরের আকাশ দেখত আর ডানা ঝাপটাত, তাকে ডেকে সেই মুক্ত আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখাল ওপাশের ওই চারতলার ছাদের আরিশ। তার গলার স্বর মেহরীনকে বুঝিয়েছিল এই খাঁচা তার আসল ঠিকানা নয়, এই বন্দিত্ব কোনো নিয়তি নয়। অথচ, দিনশেষে সেই জাদুকরী মানুষটাও আজ মেহরীনের হলো না। তার জীবনে অন্য এক নারীর পাঁচ বছরের অধিকার।

মেহরীনের ঠোঁটের কোণে এক ম্লান হাসি ফুটে উঠল। আরিশ তার হলো না, তাতে কী হয়েছে? আরিশের ছায়া তার জীবনে মিশেনি তো কী হয়েছে? আরিশ তাকে যে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই স্বপ্ন তো কেউ তার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। সেই স্বপ্নটাকেই আজ বাড়ি ছাড়ার সময় একমাত্র পুঁজি হিসেবে সাথে করে নিয়ে এসেছে সে। কাল সারারাত ওই অন্ধকার সিঁড়িতে বসে ভেবেছে সে, “যেই সংসারকে নিজের যৌবন, রক্ত আর শ্রম দিয়ে এত কিছু দিল, সেই সংসার তাকে এক মুহূর্তে এক চিলতে চুরির অপবাদ দিয়ে চোর বানিয়ে দিল! তালাকনামা ছুঁড়ে দিয়ে এক লহমায় বুঝিয়ে দিল এই বাড়িতে তার অবস্থান আসলে কোথায়।” এমন পশুর সংসারে বেঁচে থাকা মানে স্বপ্ন দেখাও এক ধরণের পাপ। ওই নোংরা খাঁচায় থেকে নীল আকাশ দেখাও এক মস্ত বড় অপরাধ। তাই খাঁচাটা সে নিজেই ভেঙে এসেছে। অন্য কারো আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য নয়, আরিশের হাত ধরার জন্যও নয় মেহরীন এবার বেরিয়েছে স্রেফ নিজের মতো করে, নিজের জন্য বাঁচবে বলে। এতক্ষণে না জানি সূত্রাপুরের সেই জমিনদার বাড়ির অবস্থা কেমন? মেহরীন যাওয়ার আগে সেই ডিভোর্স পেপারের নিচে সই করে এসেছে। আর তার পাশে টেবিলের ওপর রেখে এসেছে একটা সাদা চিরকুট। তাতে লেখা ছিল,

“সাত বছর ধরে এই সইটার জন্যই তো তোমরা অপেক্ষা করছিলে আকিল। আজ মুক্তি দিলাম। তোমাদেরও, আর নিজেকেও। আকিল, তুমি ভেবেছিলে আমি অলক্ষ্মী। কিন্তু আজ যখন তোমার নিজের ভাইয়ের চক্রান্তে তোমার সব সম্পদ চলে গেল, তখন তুমি আমার মাঝে লক্ষ্মী খুঁজছো। আমি কোনো খাঁচার পাখি হতে আসিনি। আকাশটা আজ আমি নিজের চোখে দেখতে চাই। আমি চলে যাচ্ছি, আমাকে খুঁজো না।”

লঞ্চের চাকা ঘুরতে শুরু করল। এক বিশাল ঝাঁকুনি দিয়ে বুড়িগঙ্গার বুক চিরে লঞ্চটা যখন মাঝনদীতে এসে পৌঁছাল, মেহরীন তখন ছাদের রেলিংয়ে দুই হাত রেখে আকাশের দিকে তাকাল। সামনে অসীম, বিশাল ধূসর আকাশ। শীতের আমেজ মাখা বাতাস এসে তার মুখের ওপর আলগা হয়ে থাকা চুলগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছে। পুরাণের সেই নীলকণ্ঠী পাখি যেমন সমস্ত জগতের বিষ নিজের গলায় গিলে নীল হয়ে যায়, মেহরীনও আজ তার জীবনের সমস্ত অপমান, শ্বশুরবাড়ির লাঞ্ছনা, আর আরিশের দেওয়া সেই প্রত্যাখ্যানের বিষটুকু এক চুমুকে গিলে নিজের ভেতরে নীল হয়ে গেছে। কিন্তু তার চোখে আজ কোনো কান্নার জল নেই, সেখানে জ্বলজ্বল করছে অপার্থিব জ্যোতি। সে আজ মুক্ত! আরিশ তার পাশে নেই, আরিশ কোনোদিন তার দরজায় এসে দাঁড়াবে না এই সত্যটা তার বুকের এক কোণায় গভীর হাহাকার তৈরি করলেও, তার এই মুক্তিকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি। আরিশ তাকে নদীর ওপার পর্যন্ত পৌঁছে দেয়নি ঠিকই, কিন্তু নদী পার হওয়ার সাহসটা তো আরিশই তার রক্তে মিশিয়ে দিয়ে গেছে।

“মুক্ত আকাশের দিকে আপনি দেখি ম্যাডাম খাঁচায় বন্দী নীলকণ্ঠী পাখির মতো তাকিয়ে আছেন।” হঠাৎ খুব কাছ থেকে একটা পুরুষালী কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মেহরীন চমকে পাশে তাকাল। তার পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে এক অপরিচিত যুবক। গায়ে জড়ানো সাধারণ একটা চাদর, আরিশের সেই অতি পরিচিত র সেই ‘নীলকণ্ঠী পাখি’ আর ‘খাঁচার’ তুলনাটা এই সম্পূর্ণ অপরিচিত লোকটার মুখে শুনে মেহরীনের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য ওলটপালট হয়ে গেল। তার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল। মেহরীন লোকটার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এবার এক চিলতে বিষাদময় মুচকি হাসি ফুটে উঠল। লোকটা তার হাসিতে উৎসাহিত হয়ে আবার নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছেন ম্যাডাম? আপনার গন্তব্য কোন দিকে?”

মেহরীন আর কোনো মৌখিক জবাব দিল না। সে লোকটার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার সামনের অসীম আকাশের দিকে চোখ রাখল। তার মনে হলো, আরিশ হয়তো আজ সশরীরে তার পাশে নেই, আরিশ হয়তো তার জীবনের গল্পে একটা অসমাপ্ত অধ্যায় হয়েই রয়ে গেল, কিন্তু আরিশের দেখানো ওই অনন্ত আকাশটাই এখন তার চিরস্থায়ী ঠিকানা।

লঞ্চটা কুয়াশার ঘন চাদর চিরে, জলরাশি দুই ভাগে ভাগ করে সামনের অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল। মেহরীন ডানা মেলা আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ফিসফিসিয়ে বলল, “বিদায় আরিশ। তুমি আমার হবে না, কোনোদিন আমার কপালে তোমার আঙুলের ছোঁয়া পড়বে না জেনেও বলছি আমার এই অনন্ত মুক্তির আকাশে তুমিই আজীবন বাতাসের মতো মিশে থাকবে। প্রতিটা নিঃশ্বাসে তোমাকে অনুভব করব। এই একটিমাত্র পাপ আমি আমার চাদরের ভাঁজে, আমার স্মৃতির মণিকোঠায় সারাজীবন পরম যত্নে আগলে রাখব। মেহরীন লোকটির কথার আর জবাবই দিলো না। কেবল একটা স্নান হাসি দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। একজন বিবাহিত নারী হয়েও আরিশকে ভালোবাসা ছিল তার জন্য পাপ। কেবল পাপ নয়, একটা পবিত্র পাপ। আর এমন পাপ বারবার নয়, একবারই করা যায়। মেহরীন ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল…..
পুরান ঢাকার সেই অন্ধকার খাঁচায় বন্দি থাকা নীলকণ্ঠী পাখিটা আজ সত্যিই শিকল ছিঁড়ে ডানা মেলেছে। আরিশ পাশে নেই তো কী হয়েছে? আকাশটা আজ শুধুই মেহরীনের।

(সমাপ্ত)