গোধূলি বিকেলে তুমি আমি পর্ব-৪৩+৪৪

0
581

#গোধূলি_বিকেলে_তুমি_আমি❤️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম❤️
— পর্বঃ৪৩
________________

লাঠির খট খট আওয়াজে শরীরটা যেন হাল্কা কেঁপে কেঁপে উঠছে আদ্রিজার। আদ্রিজা বুঝতে পারছে না এত ভয় পাওয়ার কি আছে। তারপরও তাঁর ভয় হচ্ছে। আদ্রিজার অবস্থাটা যেন বুঝলো অভ্র। খানিকটা ঝুঁকে বললো,

‘ এত ভয় পাওয়ার কি আছে ব্ল্যাকবেরি? আমার দাদু কিন্তু যথেষ্ট ভালো। তাই ভয় পেও না আর তাছাড়া আমি তো আছি তোমার সাথে নাকি।’

অাদ্রিজা তাকালো অভ্রের মুখের দিকে। মুগ্ধ হলো সে, ভীষণভাবে মুগ্ধ হলো অভ্রের কথা শুনে। এই অভ্র বরাবরই তাঁকে মুগ্ধ করে মাঝে মাঝে তো মনে হয় আদ্রিজার জন্যই যে অভ্র তার ভালোবাসার মানুষ লাবন্যকে পাচ্ছে না। এটা হয়তো অভ্র ভুলো গেছে। সেই বিয়ের দিন থেকেই দেখছে আদ্রিজা, হয়তো অভ্রের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এতদিনে আদ্রিজার সাথে বাজে ব্যবহার করতো কে জানে নানাভাবে অত্যাচারও করতো কি না। সেই হিসেব করলে অভ্র তো পুরোই উল্টো। সেই শুরু থেকেই নানাভাবে আদ্রিজাকে হেল্প করে অভ্র। এখনও তো করে কাল রাতে শ্রাবণকে দেখার পরও তো করছিল। সাহস দিয়েছিল মনে আর ভাবলো না আদ্রিজা। এই অভ্রকে নিয়ে সে যত ভাববে ততই যেন মুগ্ধতায় আঁটকে পড়বে।’

আদ্রিজার ভাবনার মাঝেই সে বুঝতে পারলো সামনের লাঠির খট খট শব্দ আরো নিকটে আসছে। মানে অভ্রের দাদু তাঁর খুব নিকটেই আসছে। আদ্রিজা মাথা তুলছে না যার দরুন দাদু ঠিক তাঁর কতটা দূরত্বে আছে এটা বুঝচ্ছে না সে। দাদু সামনে এসে শুরুতেই খক শব্দ করে একটু কাশলো তারপর গলাটা ঝেড়ে খানিকটা গম্ভীর কণ্ঠ নিয়ে বললো,

‘ তাহলে তুমিই হলে আদ্রিজা আমার অভ্র দাদুভাইর বউ?’

অভ্র চোখ তুলে তাকালো সামনে। সাদা পাঞ্জাবি, পাজামা পরিধিত হাতে লাঠি নিয়ে মুখে, সাদা চুলে ঠিক দাদু দাদু বলে মনে হচ্ছে না আদ্রিজার। তারপরও বেশি না ভেবে সৌজন্যতার খাতিরে শুরুতেই সালাম দিলো আদ্রিজা। আদ্রিজার কথা শুনে দাদুও সালামের উওর দিয়ে বললো,

‘ ঠিক আছে ঠিক আছে। তা আসতে কোনো অসুবিধা হয় নি তো। আমি কিন্তু খুব গম্ভীর মানুষ তা জানো তো,

উওরে আদ্রিজা কি বলবে বুঝতে পারছে না। খানিকটা ভয়ে আছে সে। আদ্রিজা কিছু বলতে নিবে এরই মাঝে অভ্র বলে উঠল,

‘ তা আমায় কিছু বলবেন না দাদু ভাই?’

অভ্রের কথা শুনে হাল্কা হেঁসে বলে উঠল সামনের ব্যক্তিটি,

‘ হুম বলবো তো অবশ্যই। বিয়ের পর দাদুকে একদমই ভুলে গেছেন আপনি।’

এবার অভ্র স্বাভাবিক হলো গম্ভীর কণ্ঠ নিয়ে বললো,

‘ এসব কি হচ্ছে কানের নিচে দুটো দেওয়া লাগবে নাকি।’

অভ্রের কথা শুনে চোখ বড় বড় তাকালো আদ্রিজা। এটা কিভাবে কথা বলছে অভ্র তাঁর দাদুর সাথে। আদ্রিজার ভাবনার মাঝেই আবারো বলে উঠল অভ্র,

‘ কি হলো কথা বলছিস না কেন এইরকম থার্ড ক্লাস অভিনয় কে শিখিয়েছে তোকে নিশ্চয়ই আরু অথবা তুষার।’

অভ্রের কথায় হকচকিয়ে উঠল হিয়ামিনি যা বাবা ধরে ফেললো অভ্র। সে কতটা নিখুঁতভাবে দাদুর মতো সেজেগুজে এসেছিল সামনে। অথচ অভ্র ভাই ধরে ফেললো এইভাবে। হিয়ামিনি নিজেকে স্বাভাবিক রেখে স্ট্রেট কন্ঠে বললো,

‘ তুমি তো ভাড়ি খারাপ হয়েছো অভ্র দাদুর সাথে কেউ এইভাবে কথা বলে ছিঃ,

এবার অভ্র এগিয়ে আসলো হিয়ামিনির দিকে। বললো,

‘ দাঁড়া তোকে দাদু হওয়া বার করছি।’

বলেই তেড়ে যেতে লাগলো অভ্র হিয়ামিনির দিকে। হুট করেই অভ্রের এমন কান্ডে ঘাবড়ে গেল হিয়ামিনি তক্ষৎনাত দৌড়ে গিয়ে চাঁচি ওরোফে অভ্রের মায়ের পিছনে লুকিয়ে গিয়ে বললো,

‘ চাঁচিমা বাঁচাও তোমার ছেলে নইলে মেরেই দিলো আমায়।’

‘ তোকে তো মারতেই হবে এই রকম থার্ড ক্লাস একটিং করতে কে বলেছে তোকে?’

উওরে হিয়ামিনি বলে উঠল,

‘ বিশ্বাস করো ভাইয়া এইসব আমি করতে চাই নি সব তুষার ভাইর প্ল্যান।’

সঙ্গে সঙ্গে তুষার বলে উঠল,

‘ যাহ বাবা আমি কি করলাম বিশ্বাস করো অভ্র ভাই আমি কিছু করি নি। আমি তো এসব ব্যপারে কিছু জানতামই না।’

এবার অভ্র হিয়ামিনিকে রেখে তেড়ে গেল তুষারের দিকে। বললো,

‘ তুই কিছু জানতিসই না ইডিয়েট।’

‘ সত্যি বলছি ভাই আমি কিছু করি নি।’

বলেই দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল তুষার। আর তুষারের কান্ডে অভ্র আর কিছু বলতে পারলো না। এদের কান্ডে হেঁসে দিলো সবাই। হিয়ামিনিও হেঁসে দিল ফিক করে। যা দেখে অভ্র বলে উঠল,

‘ তুই হাসছিস কেন?’

অভ্রের কথা শুনে তুষারের মতো হিয়ামিনিও দৌড়ে যেতে লাগলো। অভ্র ধরতে নিলো তাঁকে সাথে সাথে মাথার নকল সাদা চুল খুলে হাতে চলে এলো অভ্রের। সঙ্গে সঙ্গে সবাই হেঁসে দিল উচ্চস্বরে। আরুও ছিল এদের দলে, তাই আগেই ভেগেছে সে।’

এদিকে আদ্রিজাও মুখ চেপে হাসছে। তাঁর মানে ওই মেয়েটা দাদু সেজে এসেছিল তাদের সামনে।

‘ তাই তো বলি, ওনাকে ঠিক দাদু দাদু লাগছিল না কেন?’

এরই মাঝে সেখানে উপস্থিত হলো অভ্রের দাদা দাদি। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল দুজনেই। অভ্রকে দেখেই খুশি হয়ে বললেন ওঁরা,

‘ অভ্র কেমন আছো দাদুভাই?’

অভ্র তাকালো তার দাদুর দিকে। তারপর মুচকি হেঁসে বললো,

‘ জ্বী ভালো দাদু তুমি?’

উওরে দাদুও মুচকি হেঁসে বললো,

‘ হুম ভালো।’

এরই মাঝে অভ্রের মা আদ্রিজার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে এসে দাঁড় করালো অভ্রের দাদা দাদির সামনে। তারপর বললেন,

‘ বাবা মা আপনাদের নাতবউ, আদ্রিজা।’

প্রতি উওরে অভ্রের দাদি এগিয়ে এসে অাদ্রিজার থুতনি ধরে মাথাটা উঁচু করে বললো,

‘ মাশাল্লাহ। অভ্র দাদুভাইর বউ তো ভাড়ি মিষ্টি দেখতে।’

আদ্রিজা কিছু বললো না লজ্জা লাগছে তাঁর। আদ্রিজা বেশি না ভেবে দাদা দাদিকে সালাম দিলো। ওনারাও খুশি মনে সালামের উওর দিলো। যতই হোক আর বিয়েটা যেভাবেই হোক আদ্রিজাকে তাদের ভাড়ি পছন্দ হয়েছে।’

____

বিকেলে ৫ঃ০০টার কাছাকাছি। ওয়াশরুমের দরজা সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাকছে অভ্র আদ্রিজাকে। আদ্রিজা তখন বিছানার উপরই বসা ছিল। কতক্ষণ আগেই তাদেরকে এই রুমটায় থাকার ব্যবস্থা করে দিলো শাশুড়ি মা।
আদ্রিজা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

‘ কি হয়েছে?’

উওরে অভ্র, গায়ে ব্ল্যাক টিশার্ট আর সাদা ট্রাউজার পড়ে ভেজালো শরীর, ভেজালো চুল নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে বললো,

‘ একটা টাওয়াল খুঁজে আনতে পারো আমারটা মাথা মুছতে গিয়ে বালতির ভিতর পড়ে গেছে।’

অভ্রের কথা শুনে খানিকটা ভরাট গলায় বললো আদ্রিজা,

‘ আমি টাওয়াল পাবো কই? দাঁড়ান আমি আরুকে ডাকছি,

বলেই রুম থেকে বের হতে নিলো আদ্রিজা। পরক্ষণেই তাঁর মনে পড়লো আরু তো তুষার ভাইয়ার সাথে সামনের দোকানে গেছে কিছু একটা আনতে। মাও নেই হিয়ামিনিকে নিয়ে পাশের বাড়ি গেছে। আর বাকি যারা আছে তাদের ডেকে কি বলবে আদ্রিজা। আদ্রিজা কিছু একটা ভাবলো, যাদের চিনে না তাদের কাউকে ডাকতেও কেমন যেন সংকোচ ফিল হচ্ছে তাঁর, কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে বিষয়টা। আদ্রিজা তাঁর শাড়ির আঁচলটা খেয়াল করলো তাঁকেও গোসল করতে হবে সেই হিসেব করলে এই শাড়ির আঁচল দিয়ে অভ্রের গা মুছে দিলে খুব একটা সমস্যা হবে কি? কিন্তু অভ্রকে কি করে বলবে সে। আদ্রিজা এগিয়ে গেল অভ্রের দিকে তারপর বললো,

‘ বাড়িতে তো আরু, মা কেউ নেই অন্য কাউকে ডাকতেও কেমন লাগছে? টাওয়াল ছাড়া আপনার গা মুছে দিলে ক্ষতি হবে কি?’

অভ্র অবাক হলো আদ্রিজার কথা শুনে। টাওয়াল ছাড়া মুছবে মানে। অভ্র আদ্রিজার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ টাওয়াল ছাড়া মুছবে মানে?’

আদ্রিজা ধাপধুপ পা ফেলে এগিয়ে আসলো অভ্রের দিকে তারপর বললো,

‘ আমার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছবেন অভ্র। আমিও তো এখন সাওয়ার নিতে যাবো তাই ভিজে গেলে প্রবলেম নেই।’

অাদ্রিজার কথা শুনে অভ্র বেশ অবাক হয়ে বললো,

‘ কি?’

‘ এত কি কি কইরেন না তো এভাবে ভেজালো অবস্থায় থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে আপনার। আপনি চুপ করে বসুন আমি আপনার মাথা মুছে দিচ্ছি।’

বলেই নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে অভ্রের মাথা মুছে দিতে লাগলো আদ্রিজা। আকস্মিক আদ্রিজার এমন কান্ডে চোখ মুখ কুঁচকে এলো অভ্রের। সাথে চরম অবাকও হলো সে। তবে কিছু বলতে পারলো না। নিমিষেই নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললো সে।’

অন্যদিকে আদ্রিজা,

অভ্রের মাথা, মাথায় থাকা চুল, মুখ আর গলার অংশটাকে ভালো মতো মুছে দিতে লাগলো। এতে অভ্রের খানিকটা কাছাকাছিও চলে এসেছে সে।
অভ্রের মাঝে খানিকটা ভালো লাগা কাজ করছে, সাথে কেমন একটা ফিল করে, অভ্র চোখ খুলে তাকালো আদ্রিজার দিকে, কেমন যেন আদ্রিজা মাঝে মায়ানামক কিছু একটা ফিল করছে সে। অগোছালো চুল, মুখে মেকাপ বিহীন, চোখের কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক বিহীন যেন অন্যরকম লাগছে আদ্রিজাকে। অভ্র তাঁর ধ্যান ভরা চেহারা নিয়েই আনমনে মুখ ফসকে বলে ফেললো,

‘ এই যে তুমি আমার এতটা কাছাকাছি চলে এসেছো এখন আমি যদি হুট করে ভুল কিছু করে ফেলি তুমি কি রাগ করবে ব্ল্যাকবেরি?’

লাস্টের ‘ব্ল্যাকবেরি’ শব্দ যেন শুনলো আদ্রিজা। অভ্রের থেকে খানিকটা দূরে সরে এসে বললো সে,

‘ কিছু কি বললেন আপনি?’

হকচকিয়ে উঠল অভ্র। এইমাত্র কি বলবো কথাটা ভাবতেই নিজের উপর নিজেই অবাক হলো খুব। কি বললো সে। অভ্রের ভাবনার মাঝে আবারও বলে উঠল আদ্রিজা,

‘ কি হলো কিছু বলছেন না যে? কিছু কি বললেন এইমাত্র?’

উওরে খানিকটা আমতাআমতা করে বললো অভ্র,

‘ না কিছু না। তুমি এখানে বসো আমি তোমার জন্য টাওয়াল নিয়ে আসছি। গোসল করতে যাবে তো।’

বলেই একপ্রকার হতভম্ব হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল অভ্র। আর আদ্রিজা জাস্ট হা হয়ে তাকিয়ে রইলো অভ্রের যাওয়ার পানে। সে বুঝলো না হুট করে হলো কি অভ্রের। সে কি ভুল কিছু করে ফেললো নাকি। অদ্ভুত তো!’

ভাবলো আদ্রিজা।’

___

রুম থেকে বেরিয়ে জোরে নিশ্বাস ছাড়লো অভ্র। কিছুক্ষন আগে কি বলে ফেলেছিল ভাবতেই কেমন যেন লাগছে এখন। ছিঃ আদ্রিজা যদি তাঁর কথাটা শুনে ফেলতো তাহলো কি ভাবতো তাঁকে। ভাবলেই এখন অভ্রের গিল্টি ফিল হচ্ছে। কিন্তু অভ্রের হয়েছিলটা কি? আদ্রিজা খুব কাছে চলে আসায় কেমন নেশা নেশা লাগছিল নিজেকে কেমন যেন একটা ঘোরে আঁটকে পড়েছিল অভ্র। ভিতর থেকে কেমন একটা ফিলিংস আসছিল তাঁর।’

‘ তবে কি নিজ অজান্তেই আদ্রিজার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে অভ্র?’

#চলবে….

#গোধূলি_বিকেলে_তুমি_আমি❤️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম❤️
— পর্বঃ৪৪
________________

টাওয়াল হাতে ওয়াশরুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে অভ্র। কি করবে না করবে ঠিক মাথায় আসছে না তাঁর। কি যে হয়েছে তাঁর কে জানে? হঠাৎই ডাকলো সে আদ্রিজাকে। বললো,

‘ ব্ল্যাকবেরি শুনছো তোমার জন্য দাদির কাছ থেকে টাওয়াল নিয়ে এসেছি?’

আদ্রিজা শুনলো অভ্রের কথা মাত্রই ওয়াশরুমে ঢুকেছিল সে। তক্ষৎনাত ওয়াশরুমের দরজা খুলে দাঁত মাঝতে মাঝতে বললো সে,

‘ জ্বী বলুন,

প্রতি উওরে আদ্রিজার দিকে তাকিয়ে বললো অভ্র,

‘ না মানে তোমার টাওয়াল।’

আদ্রিজা শুনলো অভ্রের কথা মুখের ফ্যানা ওয়াশরুমের বেসিনের ভিতর ফেলে বললো,

‘ ওহ দিন ধন্যবাদ।’

বলেই আদ্রিজা হাত পেতে নিলো টাওয়ালটা। অভ্রও দিলো। টাওয়াল পেতেই আদ্রিজা ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে পুনরায় ঢুকে পড়লো আবার। আদ্রিজা দরজা আটকাতেই অভ্র গিয়ে বসে পড়লো বিছানায়। কেমন যেন লাগছে নিজেকে। হয়েছে টা কি তাঁর?’ নিজেকে কেমন যেন কন্ট্রোল করতে পারছে না সে। এমন কেন লাগছে তাঁর অদ্ভুত তো!’

____

রাত_৮ঃ০০টা,,

সোফায় গোল হয়ে বসে আছে আরু,হিয়ামিনি, তুষার, অভ্র সহ ওদের আরো দুজন কাজিন। আর আদ্রিজা ছিল রান্নাঘরে অভ্রের মায়ের হাতে হাতে কিছু করে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। আদ্রিজা অভ্রের মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে বললো,

‘ আমি কিছু করে দেই মা?’

প্রতি উওরে অভ্রের মা বললো,

‘ কি করবি তুই কিছু করা লাগবে না তুই গিয়ে আরুদের সাথে গল্প কর। আমরা এখানে অনেকজন আছি সমস্যা নেই।’

‘ কিন্তু মা,

‘ আবার কথা এতটুকু একটা মেয়ে এখন কিছু করা লাগবে না যা তুই?’

এবার অভ্রের মেজো চাঁচিও বললো,

‘ ঠিকই তো তুমি আরুদের সাথে গল্প করো আদ্রিজা আমরা এখানে আছি তো।’

‘ কিন্তু চাঁচিমা তোমরা কাজ করবে আমি ওখানে বসে থাকবো যতই হোক আমি তো এ বাড়ির বউ। একদমই কিছু না করলে চলে বলো।”

আদ্রিজার এবারের কথা শুনে অভ্রের ছোট চাঁচিও। বললো,

‘ বউ বলে কি সবসময় কাজ করতে হবে নাকি,

‘ তাই তো যা এখান থেকে,

এই বলে একপ্রকার জোরজবরদস্তি করে রান্নাঘর থেকে বের করে দিলো অভ্রের মা আদ্রিজাকে। আর আদ্রিজাও শেষমেশ কোনো উপায় না পেয়ে চলে গেল আরু ওদের কাছে। গিয়ে বসলো আরুর পাশ দিয়ে। এরই মাঝে তুষার বলে উঠল,

‘ তোরা জানিস আমাদের এই বাড়ির রেখে পাশের বাড়ির এক ভৌতিক কাহিনি?’

তুষারের কথা আদ্রিজা আরুসহ সবাই তাকালো তুষারের দিকে। আদ্রিজাই বলে উঠল আগে,

‘ কি হয়েছিল ভাইয়া পাশের বাড়িতে?’

আদ্রিজার কথা শুনে তুষার আদ্রিজার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ সে এক পুরোই ভৌতিক কাহিনি আদ্রিজা, আজ থেকে ঠিক ২০ বছর আগের ঘটনা।’

তুষারের কথা শুনে সবাই বেশ অবাক হয়ে বললো,

‘ ২০ বছর আগের ঘটনা।’

উওরে তুষারও বললো,

‘ তাহলে বলছি কি?’

তুষারের কথা শুনে অভ্র এবার চোখ তুলে তাকালো তুষারের দিকে। গম্ভীর কণ্ঠ নিয়ে বললো,

‘ রাতের বেলা হচ্ছেটা কি তুষার?’

সঙ্গে সঙ্গে তুষার তেড়ে উঠে বললো,

‘ কি হচ্ছে কিছুই না তোর কি কিছু শোনার আগেই ভয় হচ্ছে নাকি।’

‘ আমি একবারও বলি নি আমার ভয় লাগছে কারন তোর ওই বিশ বছর আগের কাহিনি তেমন আহামরি কোনো কাহিনি ছিল না।’

‘ তাহলে কথার মাঝখানে কথা বলছিস কেন? চুপচাপ শুনতে পাচ্ছিস না আমার কথা।’

তুষারের কথা শুনে অভ্র কিছু বলতে যাবে এরই মাঝে আদ্রিজা বলে উঠল,

‘ আপনি এমন করছেন কেন নিশ্চয়ই কোনো ইন্টারেস্টিং কাহিনি ঘটেছিল ২০ বছর আগে।’

আদ্রিজার কথা শুনে অভ্র কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। যার জন্য তুষারকে চুপ থাকতে বললো সেই তাঁকে কথা শোনাচ্ছে। ঠিক আছে তুমি তাইলে শোনো তুষারের ভৌতিক কাহিনি তারপর যদি রাতে আমাকে ঘুমাতে না দেও তবে দেখো কি করি তোমায়?’ –কথাগুলো মনে মনে বলে ওখান থেকে উঠে গেল অভ্র। কারন তুষারের ওই ফালতু বকবকানি শোনার ওপর তাঁর বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই।’

অভ্র যেতেই সবাই খিলখিল করে হেঁসে দিলো। কারন তারা বুঝেছে অভ্র হয়তো ভয় পেয়েছে। হঠাৎই হিয়ামিনি বলে উঠল,

‘ অভ্র ভাই নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছে।’

প্রতি উওরে তুষার বললো,

‘ না ভয় পায় নি এ কাহিনি ও জানে।’

‘ ওহ, এবার তবে আমাদেরও সেই কাহিনিটা বলো।’

‘ হুম বলছি শোন, সে ছিল বিশাল এক আলিশান বাড়ি আমাদের বাড়িটার থেকেও বড় ছিল সেই বাড়িটা। কিন্তু বাড়ি বড় থাকলে কি হবে সেই বাড়িতে শুধু একটি মেয়ে ঝনঝন শব্দ করে পায়ে নুপুর বেঁধে হাঁটতো সারাবেলা।’

তুষারের কথার মাঝেই আরুর বলে উঠল,

‘ ওত বড় বাড়িতে একা একটা মেয়ে থাকতো ভয় লাগতো না।’

প্রতি উওরে তুষা চেঁচিয়ে বলে উঠল,

‘ ভয় লাগতো না আবার ভীষণ ভয় লাগতো, ভয়ে কাঁপা কাঁপা অবস্থা তাঁর।’

সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল সবাই, ঘাবড়ে গিয়েছিল কিনা। সবার রিয়েকশন দেখে বললো তুষার,

‘ ঠিক তোদের মতোই এইভাবে ভয় পেত মেয়েটা। একদিন যেন কি হলো মেয়েটাকে কারা যেন মেরে ওই বাড়িতেই রেখে গিয়েছিল। এরপর থেকে ওই বাড়িতে আর কেউ যায় না। এখনও তো ওই বাড়িটার ঝুনঝুনাঝুন শব্দ আসে মাঝে মাঝে। গভীর রাতে কেউ সজাগ থাকলে শুনতে পায় সেই শব্দ।’

তুষারের কথা শুনে ভ্রু-কুচকে বললো আরু,

‘ তুমি সত্যি বলছো ভাইয়া,

সঙ্গে সঙ্গে আরুর দিকে তেড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বললো তুষার,

‘ তাহলে কি আমি মিথ্যে বলছি,

আরুর কেঁপে উঠলো ভয়ে। আরুর পাশাপাশি হিয়ামিনি আর আদ্রিজাও কেঁপে উঠলো পুরো। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বুঝলো আদ্রিজা। অভ্র কেন তখন তুষারকে এসব বলতে বারন করেছিল। এরই মাঝে তুষারের বাবা বলে উঠল,

‘ শুধু শুধু মেয়েগুলোকে ভয় দেখাচ্ছিস কেন তুষার?’

সঙ্গে সঙ্গে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল আরু আর হিয়ামিনি তাঁর মানে তুষার ভাই এতক্ষণ সব মিথ্যে কথা বলেছিল। হিয়ামিনি তুষারের বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ চাচ্চু তাঁর মানে তুষার ভাইয়া এতক্ষণ সব মিথ্যে বলেছিল।’

‘ পুরোটা মিথ্যে এমনটা নয়, একটা মেয়ে থাকতো ওই বাড়িতে এটা ঠিক, মারা গিয়েছিল এটাও সত্য তবে এখনও সেই শব্দ পাওয়া যায় এটা মিথ্যে। আর ওগুলো সব অনেক পুরোনো ঘটনা। তাই ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই শব্দ ফব্দ কিছু আসে না এখন আর।’

বাবার কথা শুনে এবার তুষারও বেশ কনফিডেন্স নিয়ে বললো,

‘ কি শুনেছিস? আমি মিথ্যা বলি না ইউ নো।’

এরই মাঝে হিয়ামিনি তুষারের কানের সামনে একটা বাচ্চাদের ঝুনঝুনিয়ে বাজিয়ে, খানিকটা ফিস ফিস কন্ঠ নিয়ে বললো,

‘ এই রকম শব্দ আসতো ভাইয়া।’

সঙ্গে সঙ্গে তুষার ঘাবড়ে গিয়ে ছিটকে গেল দু’কদম। হুমড়ি খেয়ে পড়লো সে সোফার ওপর। তুষারের কান্ডে হেঁসে দিলো সবাই আর হিয়ামিনি তো হাসতে হাসতে বলে উঠল,

‘ আইছে আমাগো ভৌতিক কাহিনি শোনানোর আদুভাই। নিজেই ভয়ে উল্টে যায় আবার আমগো ভয় দেহায়।’

হিয়ামিনির কথা শুনে তুষার হিয়ামিনির দিকে তেড়ে যেতে যেতে বললো,

‘ বান্দর মাইয়া এত সুন্দর গল্প শুনালাম আর তুই কিনা আমায় ভয় দেখাস দাঁড়া আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন?’

‘ হুম আহো আহো আমিও দেহি তোমার কত দম অভ্র ভাইয়া জানি কি একটা বলেছিল আমায় হা থার্ডক্লাস অভিনয় আমিও তোমায় বলছি তোমার ওই থার্ডক্লাস গল্প তোমার কাছেই রাখো হুহ,

‘ হ এখন তো কবিই কতক্ষণ আগেও তো শোনার জন্য একদম ব্যাকুল হয়ে গেছিলি।’

‘ ব্যাকুল না ছাই তুমি আর তোমার থার্ডক্লাস গল্প দুটোই ফালতু।’

‘ তুই আমায় ফালতু বললি দাঁড়া বদমাশ মাইয়া,

বলেই তেড়ে গেল তুষার হিয়ামিনিকে মারতে আর তুষারের কান্ডে হিয়ামিনিও ঘাবড়ে গিয়ে দিল দৌড়। অতঃপর শুরু হলো তুষার আর হিয়ামিনির ছোটাছুটি। সবাই ওদের কান্ডে হাসছে। শুধু হাসছে না আদ্রিজা। তুষারের কথা শুনে মুখের হাসি গায়েব আদ্রিজার। এই মুহূর্তে তাঁর মাথায় একটা কথাই ঘুরছে শুধু,

‘ আজ রাতে কেমনে ঘুমামু আমি?’

____

নিজের রুমে জানালার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে অভ্র। মোবাইল না থাকায় বর্তমানে বড্ড বেমানান লাগছে নিজেকে। ভুল হয়ে গেছে শপিং করার পর একটা ফোন আর সিমও কিনে নিতো সে তাহলে খুব ভালো হতো। কামছে কম এখন মোবাইল টিপেও নিজের সময় কাটানো যেত তাঁর। নানা কিছু ভেবে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো অভ্র। নিচে যাওয়ার পরিকল্পনা করলো আবার, এরই মাঝে তাঁর সামনে আদ্রিজাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিকটা চমকে উঠলো অভ্র। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বললো সে,

‘ ব্ল্যাকবেরি তুমি এখানে?’

প্রতি উওরে মিন মিন কন্ঠ নিয়ে বললো আদ্রিজা,

‘ তুষার ভাইয়া যা বললো তা কি সব সত্যি?’

খানিকটা ভড়কে গেল অভ্র। বললো,

‘ কোন সত্যির কথা বলছো তুমি?’

‘ ওই যে ২০ বছর আগে কোন মেয়ে একা একটা বাড়িতে থাকতো,

আদ্রিজার এবারের কথা শুনে বুঝলো অভ্র। আদ্রিজা ঘাবড়ে গেছে সাথে আদ্রিজার চোখ মুখের অবস্থা দেখেও বুঝলো অভ্র ভয়ে মাখা অবস্থা আদ্রিজার। ঠিক এই কারনেই অভ্র তখন তুষারকে ওসব বলতে বারন করেছিল। অভ্রের ভাবনার মাঝেই আবারও বলে উঠল আদ্রিজা,

‘ কি হলো আপনি কোনো কথা বলছেন না কেন? তুষার ভাইয়ার বাবাও তো বললো এসব নাকি সত্যি।’

প্রতি উওরে অভ্রও বলে উঠল,

‘ পুরোটা মিথ্যে ছিল এমনটা নয় তবে এখন আর কিছু নেই, তাই টেনশন নিও না।’

প্রতি উওরে কাঁদো কাঁদো ফেস নিয়ে বললো আদ্রিজা,

‘ আমরা বাড়ি কবে যাবো অভ্র? চলুন আমি আপনি এক্ষুনি চলে যাই। আমাদের বাড়িই ঠিক আছে, এমন গ্রামীন পরিবেশ একদম ভালো নয়। চলুন না ফিরে যাই?’

অভ্র গম্ভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো আদ্রিজার মুখের দিকে। ‘ আজ রাতেও যে এই মেয়ে তাঁকে ঘুমাতে দিবে না এটা হারে হারে টের পাচ্ছে অভ্র?’

জোর গলায় বলতে ইচ্ছে হচ্ছে অভ্রের,

‘ এখন ভয় পাচ্ছো কেন? তখন যখন বারন করতে গেলাম তখন তো সাহস দেখাচ্ছিলি এখন সাহস গেল কই? মিস ভিতু কাঠবিড়ালি থুক্কু মিসেস কাঠবিড়ালি।

কিন্তু আফসোস অভ্র পারলো না কথাগুলো বলতে না। তাই বেশ গম্ভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো সে আদ্রিজার মুখের দিকে। আদ্রিজাকে ঠিক এই মুহূর্তে কি করা উচিত সেটাই ভাবছে অভ্র।’

#চলবে…