#গোধূলি_রাঙা_আলোয়
#পর্ব_৮
রাতুলের সাথে আজ বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াতে যাওয়ার কথা আলোর। মিরপুর এক পর্যন্ত আলোর পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে রাতুলের সাথে যাবে। কিন্তু পথে যোগাযোগ করতে মোবাইল লাগবে। আসা যাওয়া করতে টাকা লাগবে। ফেসবুকে আলোর ছবিগুলো ভাই আশিকের ফোনে তোলা। অল্প টাকার চাইনিজ ফোন হলেও ছবি আসে ভালো। এই ফোনটা পাওয়া গেলে ভালো হতো। ছবি তুলতে পারতো। এতদিন তো রাতুলের সাথে ক্লাসের বাইরে দেখা করেছে। বলেছে সামনে বোর্ডের পরীক্ষা তাই বাসা থেকে ফোন আনতে দেয় না, সময় নষ্ট করবে বলে। ডেটিং ও করেছে আশেপাশে ফাস্টফুডের দোকানে। ইদানীং রাতুল বাইরে ঘুরতে চাওয়ার চাপ দিচ্ছে। ওর সব বন্ধুরা নাকি গার্লফ্রেন্ড নিয়ে রুম ডেট করে। আশুলিয়া, পূর্বাচল কত দূরে দূরে ঘুরতে যায়। আর আলো ওকে এতটুকু বিশ্বাস করে না যে ওর সাথে সামান্য পার্কে যেতে চায় না !
এসব কথায় আলো নরম হয়ে যায়। প্রেম করতে গেলে ডেটিং তো করতেই হবে। আজকের দিনটা তাই ঠিক করেছে ঘোরার জন্য। বাসায় বলেছে বন্ধুরা নিজেরা নিজেদের বিদায় দিবে আজ। তাই হালকা খাওয়া দাওয়া হবে। মায়ের কাছ থেকে অনেক খুঁজে দুইশো টাকা পেয়েছে। কিন্তু এই টাকায় কী হয়! আসা যাওয়াতেই শেষ। আলোর আরও টাকা দরকার!
এমনিতেই জন্মদিনের উপহার যে রাতুলের খুব একটা পছন্দ হয়নি বুঝেছে আলো। যদিও রাতুল কিছু বলেনি। চার হাজার টাকার একহাজার গেলো কেক এ। ঘড়ি কিনলো উনিশশো টাকা দিয়ে। রাতুল একবার বলেছে ও ব্রান্ডের জিনিস ছাড়া পরে না! বাকি দুশো টাকা টুকটাক খরচে লেগেছে। মোমবাতি কিনেছে, রেস্টুরেন্টের একটা কর্ণার সাজানোর জিনিস কিনেছে। রাতুল বন্ধু বান্ধবরা তাদের গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এসেছিল। আলো কাউকে নেয়নি। সে যে ধনী ঘরের মেয়ে না এটা এখনই রাতুলকে বোঝাতে চায় না। তাই বান্ধবীদের সাথে নেয়নি। কেউ যদি বলে দেয়! আলো রাতুলকে আগেই বলেছিলো ও ট্রিট দিবে। এক হাজার টাকার বাজেটও করেছিল। কিন্তু মানুষ হয়ে গেল সাতজন। আর বার্গার, কফির বিল আসলো একুশশো টাকা। আলো এমন ভাব করলো যে ও বাড়তি টাকা পার্সে ঢুকাতে ভুলে গিয়েছে। নিজের এক হাজার টাকা বের করে দিয়েছে, বাকিটা রাতুল দিয়েছে।
এরপর আলো ভেবেছে আবার সুযোগ পেলে কিছু টাকা সরিয়ে রাতুলকে ওর টাকা দিয়ে দিবে। কেননা মনে হচ্ছে রাতুলের ওকে সন্দেহ হয়েছে। ইদানীং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আলোর পারিবারিক অবস্থার কথা জানতে চায়। বাড়ি নিজেদের কিনা! ভাই কী করে! বাবা ছাড়া সংসার কিভাবে চলে! আলো অবশ্য বলেছে বড়ো বোন ডাক্তার, হাসপাতালে চাকরি করে। ভাইয়ের দোকান আছে বসুন্ধরায়, আরেক বোনের বিয়ে হয়েছে, দুলাভাই বড়ো ব্যবসায়ী। রাতুলকে বেশি ভাবার সুযোগ দিতে চায় না আলো। একবার প্রেম জমে গেলে কে এত ভাববে। আর কোন রকমে বিয়ে করতে পারলে কথাই নাই। বিয়ে হয়ে গেলে বাকি সব ম্যানেজ হয়ে যাবে। বোন কী করে, ভাই কী করে তাতে তখন কী আসবে যাবে। আলো তখন রাতুলদের পাঁচ তলা বাড়ির মালকিন হয়ে যাবে। এই ঘুপচি ঘর থেকে তখন মুক্তি!
সমস্যা হলো ডেটিং এ যেতেও পয়সা লাগে। সেদিনের সেই তিন হাজার টাকা চুরি নিয়ে বাসায় কম কান্ড হয়নি। মা আর বোনের কথা বলাবলি বন্ধ। ভাগ্য ভালো আলো বাসায় ছিল না। ওকে কেউ সন্দেহও করেনি। তবে সাবধানে তো থাকতে হবে। আর পাঁচশোটা টাকা যদি ম্যানেজ করতে পারতো আজকের দিন নিশ্চিত হওয়া যেত। আলো পা টিপে টিপে ভাই আশিকের প্যান্টের কাছে যায়। আশিক বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। দশটার আগে উঠবে না। মা গিয়েছে সবজি আর টুকটাক সদাই-পাতি আনতে। বাসায় এখন আলো একা। ভাবে ভাইয়ের প্যান্টের পকেটে কিছু নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। এখন তো ভাইয়াও চাকরি করে। টাকা না পেয়ে খুঁজলে এমন ভাব করবে ও কিছু জানে না।
কপাল ভালো আলোর। মানিব্যাগে ভাঁজ করা দেড় হাজার টাকা পেয়ে যায়। খুচরোগুলো আর নেয় না।পুরোটা নিবে, না শুধু পাঁচশো নিবে ভাবে। কিন্তু মনকে বুঝ দেয়, এই টাকা তো পকেটমার নিতে পারতো, ছিনতাইকারীও নিতে পারতো। ও বোন হিসেবে নিলে সমস্যা কী! বড়ো ভাইয়ের আয়ে ছোটোবোনের সামান্য অধিকার থাকবে না! তাছাড়া ভাইয়া তো ওদের এক হাজার করে দিতেই চেয়েছিল। বাড়ি ভাড়া দিতে না হলে তো এই টাকা ও এমনিই পেত। একদিক থেকে ভাবলে ওটা ওরই টাকা। মূল দোষ তো মায়ের। মা কেন আপার দেওয়া বাড়ি ভাড়ার টাকা নষ্ট করলো!
রাতুলের আলাদা কোন রুম নেই। কামরাঙ্গী চরে এই বাড়িটা ওদের নিজেদের ঠিক। তবে জায়গার পরিমাণ খুব কম। দুই শতক জমিতে তিনতলা বাড়ি। নিচের তলায় দোকান আর গুদামঘর। দোতলায় রাতুলরা থাকে। তিনতলায় দুই ইউনিটের ছোটো দুই বাসা ভাড়া দেওয়া। রাতুলের তিন বোন দুই ভাই। রাতুল সবার ছোট। বড়ো ভাই বিয়ে করেছে কিছুদিন হলো। মেজো ভাই এর বিয়ে হয়নি এখনো। বড়ো দুই ভাই নিচে দোকান করে, গুদামঘর চালায়। রাতুলের বাবা ওয়াশার পিয়ন ছিল। অবসরের পর পাওয়া টাকা, আর জামনো টাকা মিলে জায়গা কিনে এই বাড়ি করেছে। বড়ো বোনের বিয়ে হয়েছে ভালো পরিবারে। অবিবাহিত দুই বোন আছে। একজন ডিগ্রিতে পড়ে, আরেকজন অনার্স শেষ করেছে। বিয়ের জন্য পাত্র দেখা হচ্ছে। রাতুলরা দুই ইউনিটে মিলিয়ে দোতলায় থাকলেও এত মানুষের জায়গা হয় না। এক রুমে বাবা মা থাকেন। আরেক রুমে বড়ো ভাই ভাবি। একরুমে দুই বোন একসাথে থাকে। বসার ঘরে বিছানা পেতে রাতুল আর মেজোভাই এর থাকার ব্যবস্থা। বসার ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দায় বোর্ড বসিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এখানেও একটা রুমের মতো সিঙ্গেল খাট বসানো হয়েছে। মেহমান আসলে রাতুলের জায়গা হয় এখানে। একপাশে ওয়ারড্রব আছে। মেজো ভাই আর রাতুল কাপড়চোপড় রাখে।
বসার ঘরের এক কোণায় স্ট্যান্ড দেওয়া প্লাস্টিকের একটা আয়না ঝোলানো আছে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সেই আয়নার সামনেই রেডি হয় রাতুল। আজ আলোকে নিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াতে যাবে। আলো অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে। নিজেদের ফ্ল্যাটে থাকে। দেখতে অতটা ভালো না হলেও স্মার্ট আছে। পরিবারের সবার অবস্থা ভালো। এমন মেয়ের সাথে প্রেম করা লসের কিছু না। ভাইদের সাথে দোকানে কাজ করতে আগ্রহী নয় রাতুল। অনার্স শেষ প্রায়। বাবা চেষ্টা করছে সরকারি অফিসের কোথাও যদি ঢোকানো যায়। ঘুষের টাকা শ্বশুর পক্ষ থেকে নিবে। মেয়ের খুশির জন্য এতটুকু তো বাবা মা করতেই পারে। রাতুলের সরকারি চাকরি হলে তো তাদেরই লাভ। আলোর অবস্থা শুনে মনে হচ্ছে আট দশ লাখ টাকা দেওয়া ওর পরিবারের জন্য কঠিন কিছু হবে না। যদিও বাবা নেই এটা একটা সমস্যা। আর মেয়ে বেশি ভীতু। সারাদিন পরিবারের ভয়ে অস্থির থাকে। ফোনটাও আনে না সাথে। আরেকটু পটালে কাজ হয়ে যাবে। আর বেশি সমস্যা মনে হলে একবারে বিয়ে করে ফেলবে। কিন্তু নিজের বড়ো ভাইবোনদের বিয়ে হওয়ার আগে ওর বিয়ে করাটা সহজ না। না হলে বিয়ে করে ফেলে রাখলে খারাপ হতো না। তখন আলোকে শ্বশুর বাড়িতে তুলে আনানোর জন্য আলোর পরিবারেরই মাথা খারাপ হয়ে যাবে। সে সময় সুযোগ বুঝে টাকা দাবি করলেই হবে। মানিব্যাগ দেখে রাতুল। পাঁচশো টাকা আছে। ঐ দিন শুধু শুধু এক হাজার টাকা খরচ হলো। আলো টাকা দিতে পারবে না জানলে বন্ধু বান্ধব সাথে নিতো না। একটু খরচ হচ্ছে প্রেম করতে। সমস্যা নাই সামান্য ইনভেস্ট করতেই হয়।
আশিক রেডি হয়ে দোকানের জন্য বের হয়। মাসের সবে মাঝামাঝি অথচ পকেটে আছে আর হাজার দেড়েক টাকা। এই টাকায় মাসের বাকিটুকু হাত খরচ চালাতে হবে। আজ ফোনটাও সাথে নেই। আলো চেয়ে নিলো। বন্ধু বান্ধবের সাথে ছবি তুলবে বললো। নিক, ছোটোবোন। কিছু তো দিতে পারে না। একদিন ফোন চাইলে দেওয়াই যায়। দোকানে ঢোকার আগে এক কাপ চা খেতে গিয়েও খায় না আশিক। থাক অপ্রয়োজনে টাকা নষ্ট করার দরকার নেই। টাকা হাতে থাকুক।
(চলবে)