#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_৩
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
আজ বহুক্ষণ ধরে ডায়েরির সাদা পাতার দিকে তাকিয়ে আছি। কলমটা আঙুলের ফাঁকে স্থির, অথচ শব্দগুলো যেন বুকের ভেতর থেকে বেরোতে চাইছে না। কিছু কিছু সত্য এতটাই নির্মম হয় যে, সেগুলো লিখতে গেলেও হৃদয়ের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তবুও লিখছি। হয়তো এই পাতাগুলোই একমাত্র সাক্ষী, যাদের সামনে আমাকে হাসিমুখে অভিনয় করতে হয় না।
আমি বুঝে গেছি, আমায় উনি ভালোবাসেন না। ভালোবাসবেন না। ভালোবাসার অভিনয় করা যায়, দায়িত্ব পালন করা যায়, কর্তব্যের প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা যায়; কিন্তু হৃদয়ের গভীরে অন্য কারও জন্য জমে থাকা অনুভূতি কোনোদিন অভিনয় করে বদলে ফেলা যায় না। আমি যতই তাঁর পাশে দাঁড়াই না কেন, যতই তাঁর জীবনের অংশ হতে চাই, আমি কখনোই সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারব না, যে জায়গাটা বহু আগেই অন্য একজনের নামে লিখে রাখা হয়েছে। উনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন, সেটা জানার পর আমার সমগ্র দুনিয়া যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। আমার বেলায় এমন হয় কেন?
আমি শুধু তাঁর বর্তমান। আর তাঁর হৃদয় এখনো অতীতের কাছেই বন্দি। অনেক দিন নিজেকে বুঝিয়েছি, সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। অথচ কিছুই ঠিক হওয়ার নয়। উনি আমায় সেই চোখে দেখেন না। আমি ওনার নিকট নিছকই একটি বোঝা মাত্র, যা তিনি মুখে নিয়েছেন, কিন্তু গলাধঃকরণ করতে পারছেন না। আর না পারছেন ফেলে দিতে। সেদিন খুব কেঁদেছি। হয়তো কেউ জানে না সেই আত্মার কান্না। কেউ দেখেনি, আমায় কীভাবে ভেঙেছে সবকিছু। উনি আমার কাছ থেকে সত্য লুকাননি। আমায় ওনার বন্ধু হওয়ায় সবটা বলেছেন। তাই চাইলেও মুখ ফুটে ওনার কাছে ভালোবাসা চাওয়ার মতো দুঃসাহস করিনি।
কীভাবে করব? যেখানে ওনার হৃদয়ে অন্য কারও বসবাস! আমরা স্ত্রীসমাজ হয়তো কোনোদিনও এই সত্য মেনে নিতে পারি না। তবুও আমি আমার অনুভূতিকে গলাধঃকরণ করেছি। তবুও কি অনুভূতিকে আটকানো যায়? উনি আমার পবিত্র অনুভূতি, যাঁকে আমি হালালভাবে গ্রহণ করেছি। আমার প্রথম ভালো লাগা, ভালোবাসা ওনাকে ঘিরেই। অথচ ওনার কোথাও আমি নেই! নিজের ওপর ধিক্কার জানাচ্ছি। আমার বোঝা উচিত ছিল, “আমি যাই ছুঁয়ে দিই, তাই-ই দুঃখ হয়ে ফিরে আসে।” তবুও মানবমন বলে কথা। মনের ওপর কারও দখলদারি চলে না। সে নিজের মর্জির মালিক। তাই নিজেকে ওনাকে ভালোবাসা থেকে আটকাতে পারছি না। মানুষটা আমায় ভালো না বাসলেও আমায় অসম্মান করে না। আমার প্রয়োজন মেটায়, কিন্তু আমি চাই না এমন সম্মান। চাই একটু ভালোবাসা। কিন্তু আমার ভাগ্যে এত সুখ কই?
“আমার বেলায় সবার ভালোবাসা কেন ফুরিয়ে যায়, আল্লাহ? আমি এতোটাই অযোগ্য, যে কারও ভালোবাসায় আমার স্থান হয় না! উনিও আমায় ভালোবাসেন না। আমায় কেউ কোনোদিন ভালোবাসেনি! কেউ না!”
আজও মনে আছে সেই রাতটা। সেদিন প্রথমবার আমাদের মধ্যকার দূরত্বটুকু ভেঙে গিয়েছিল। সমাজের দৃষ্টিতে হয়তো সেটা স্বাভাবিক এক দাম্পত্যের সূচনা। কিন্তু আমার কাছে সেই রাত ছিল ভালোবাসা আর শূন্যতার পার্থক্য বুঝে ওঠার প্রথম অধ্যায়। মানুষ বলে,
“প্রিয় মানুষের স্পর্শে হৃদয় কেঁপে ওঠে।”
কিন্তু আমি সেদিন অনুভব করেছিলাম সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু। উনি যখন আমার হাতটা ধরেছিলেন, আমি সেই স্পর্শে নিজের জন্য কোনো আহ্বান খুঁজে পাইনি। মনে হয়েছিল, তাঁর আঙুলগুলো যেন আমাকে নয়, আমার ভেতর দিয়ে অন্য কাউকে ছুঁতে চাইছে। উনি খুব কাছে ছিলেন, তবু সেই নৈকট্যের মাঝেও আমি অসীম দূরত্ব অনুভব করেছি। চোখ বন্ধ করেছিলাম আমি। ভেবেছিলাম, হয়তো ভালোবাসা অনুভব করতে পারব। কিন্তু না। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, আমি যেন কারও স্মৃতির ছায়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছি।
আমি ছিলাম উপস্থিত, অথচ তাঁর অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অন্য এক মুখ, অন্য এক নাম, অন্য এক অসমাপ্ত গল্প। সেদিন আবারও উপলব্ধি করলাম, স্পর্শ সবসময় ভালোবাসার ভাষা নয়। কখনো কখনো স্পর্শও ভীষণ নিঃসঙ্গ হয়। ভীষণ নির্দয় হয়। আমরা নারীসমাজ ভালোবাসার স্পর্শ চিনি। সেখানে মমতা থাকে, আশ্বাস থাকে, নিজের মানুষ হয়ে ওঠার নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু সেই রাতে তাঁর স্পর্শে আমি নিজের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি। শুধু অনুভব করেছি, আমি যেন কারও হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির বিকল্প মাত্র। সেদিন আমার চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল। সেই হৃদয়বিদারক অশ্রু কেউ দেখেনি, উনিও না! কারণ মানুষের চোখ তখনই কারও অশ্রু দেখতে পায়, যখন সেই মানুষটাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসা হয়।
আজও আমি তাঁর স্ত্রী। তাঁর বাড়ির একজন মানুষ। তাঁর জীবনের একটি পরিচয়। কিন্তু তাঁর হৃদয়ের মানুষ? না, সেই পরিচয়টা কোনোদিন আমার হবে না। হয়তো উনি দায়িত্ববোধ থেকে আমার খোঁজ নেবেন, অসুস্থ হলে ওষুধ এগিয়ে দেবেন, প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু ভালোবাসবেন? সেই প্রশ্নের উত্তর আমি বহু আগেই জেনে গেছি।
“সবচেয়ে গভীর কষ্ট বোধহয় সেই মানুষটাকে ভালোবেসে ফেলা, যার হৃদয়ে তোমার জন্য একটুকুও জায়গা নেই।”
তবুও আশা হারাইনি, যদি আমায় সময়ের সঙ্গে একটু ভালোবাসে। আমি এই ‘যদি’ আশায় বসে আছি। হলেও সত্যি হতে পারে।
আয়াশ আর পড়তে পারল না। বুকের অভ্যন্তরে যেন আকস্মিক এক অদৃশ্য ভূকম্পনের উৎপত্তি ঘটছে। শ্বাসনালিতে জমাট বেঁধেছে অস্বস্তির অদেখা পিণ্ড। শব্দগুলো আর কালি নয়; প্রতিটি অক্ষর যেন রক্তমাংসের অস্ত্র হয়ে বক্ষপিঞ্জরের অভ্যন্তর চিরে এগিয়ে চলেছে।
ধপ্।
ডায়েরিটি অনিচ্ছাকৃতভাবে তার কোল থেকে মেঝেতে পড়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত স্থির বসে থাকল আয়াশ। দৃষ্টি শূন্য, অথচ মস্তিষ্কের অন্তর্লোকে চলতে থাকে অগণিত প্রশ্নের উন্মত্ত সমাবেশ। এ কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? সে তো কখনো ইনায়াকে ভালোবাসেনি। না, ভালোবাসার মতো কোনো অনুভূতির অস্তিত্ব ছিল না তার অন্তরে। ছিল কেবল দায়িত্ব। এক অনাথ, আশ্রয়হীন মেয়েটির নিরাপত্তার দায়িত্ব। এতটুকুই। এর বাইরে কোনো ব্যাখ্যা সে কোনোদিন নিজেকে দেয়নি। তাহলে আজ এই অস্থিরতা? এই বুকের ভেতর শ্বাসরুদ্ধকর চাপ? এইসব কি শুধুই তিন বছর একই ছাদের নিচে থাকার কারণ? কেন বারবার মনে হচ্ছে, ইনায়া এই মুহূর্তে কোথাও একা বসে আছে? কারও দরজায় আশ্রয় চাওয়ার মতোও তো কেউ নেই তার। পৃথিবীতে নিজের বলতে একটি মানুষও নেই। অজান্তেই আয়াশের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। খেয়েছে তো? মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়েনি তো? কোথাও কোনো বিপদে? চিন্তার স্রোতটি হঠাৎ করেই থেমে যায়। নিজের কপালে বিরক্তিভরে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে ওঠে সে,
“কেন ভাবছি আমি এসব? ইনায়া বুঝদার মেয়ে! নিজের যত্ন নেবে।”
হয়তো নিজেকে এতটুকু দিয়ে সান্ত্বনা দিল। সে উঠে দাঁড়ায়। দীর্ঘ পদক্ষেপে জানালার কাছে গিয়ে থামে। বাইরের আকাশটিও আজ অদ্ভুত কৃষ্ণবর্ণ। চাঁদ নেই আকাশে, যেন প্রকৃতিও কোনো অনামা বিষাদের ভারে নুয়ে পড়েছে।
কাঁচের ওপর করতল রেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল আয়াশ। মস্তিষ্ক নিরন্তর যুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে।
‘এটা ভালোবাসা নয়।’
‘শুধু দায়িত্ববোধ।’
‘সে আশ্রয়হীন। তাই চিন্তা হচ্ছে।’
কিন্তু অন্তর বড় নির্মম। প্রতিটি যুক্তিকে একে একে ভস্মীভূত করে দিয়ে সে কেবল একটি প্রশ্নই ফিরিয়ে দিল,
“তাহলে সে চলে যাওয়ার আগে কখনো এমন শূন্যতা অনুভব করোনি কেন?”
আয়াশ নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে নিল। স্মৃতিরা একে একে ফিরে আসছে। চুপচাপ রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। অকারণেই মৃদু হেসে চা বাড়িয়ে দেওয়া। নিজের কষ্ট গোপন রেখে অন্যের আরাম নিশ্চিত করার নির্বোধ প্রচেষ্টা। কখনো কোনো অভিযোগ করেনি। কখনো কিছু দাবি করেনি। অথচ বিদায়টুকুও জানিয়ে যায়নি। আয়াশ চোখ খুলে ফেলে। বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। অনুভূতিটিকে নাম দিতে পারছে না সে। স্বীকারও করতে পারছে না। ভালোবাসা? না, দায়িত্ব? সম্ভবত। নাকি এর মধ্যবর্তী এমন কোনো দুর্বোধ্য অনুভব, যার অভিধান আজও রচিত হয়নি? উত্তর তার জানা নেই। শুধু এটাই জানে, ডায়েরিটা আবার পড়ার সাহস তার আর অবশিষ্ট নেই। কারণ সে আশঙ্কা করছে, শেষ পৃষ্ঠায় হয়তো ইনায়ার লেখা থাকবে না, বরং নিজের অস্বীকৃত অনুভূতিরই চূড়ান্ত রায় পড়ে ফেলবে সে।
—
প্রভাতের সূর্যালোক এখনও সম্পূর্ণরূপে পৃথিবীর বুকে অবতীর্ণ হয়নি। আকাশের পূর্বদিগন্তে কেবলমাত্র অরুণাভ এক রেখা ধীরে ধীরে আঁচড় কেটে চলেছে রাত্রির কৃষ্ণবর্ণ আবরণে। অথচ আয়াশের রাত্রি এখনও সমাপ্ত হয়নি। চোখদুটি রক্তাভ। নিদ্রাহীনতার গাঢ় ছাপ স্পষ্ট তার অবসন্ন মুখাবয়বে। সমগ্র রজনী জুড়ে এক মুহূর্তের জন্যও নয়নযুগল একত্রিত হয়নি। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে স্থাণুর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে সে। সামনের সেন্টার টেবিলের উপর নিঃসঙ্গভাবে পড়ে আছে ডায়েরিটি। আজ আর সময় নষ্ট করার অবকাশ নেই। ইনায়াকে খুঁজতে বেরোতেই হবে।
কিন্তু, যদি এই ডায়েরির পৃষ্ঠায় এমন কোনো সূত্র লুকিয়ে থাকে, যা তাকে ইনায়ার নিকট পৌঁছে দিতে পারে?
দ্বিধাগ্রস্ত পদক্ষেপে এগিয়ে আসে আয়াশ। বুকের ভেতর অদৃশ্য কোনো আশঙ্কা ধুকধুকিয়ে ওঠে। করতল অস্বাভাবিক শীতল। তবুও সমস্ত মানসিক প্রতিরোধ ভেঙে ডায়েরিটা আবারও খুলে বসে। প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তি পড়তেই বুকের ভেতর পুনরায় সৃষ্টি হয় সেই পরিচিত চাপা ব্যথা।
“আজও তাকে বললাম না। হয়তো কোনোদিন বলাও হবে না।”
আরও একটি পৃষ্ঠা উল্টায় সে।
“তার প্রতিটি উদাসীনতা আমি গ্রহণ করি, কারণ ভালোবাসা কখনো প্রাপ্যের হিসাব রাখে না।”
আয়াশের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। অবচেতনেই দ্রুত আরও কয়েকটি পৃষ্ঠা অতিক্রম করে। হঠাৎ তার দৃষ্টি একটি বাক্যে এসে স্তব্ধ হয়ে যায়।
“আজ ডাক্তার নিশ্চিত করলেন, আমার অন্তরে একটি ক্ষুদ্র প্রাণের স্পন্দন জন্ম নিয়েছে। আমাদের সন্তান!”
সময় থেমে যায়। আক্ষরিক অর্থেই থেমে যায়। আয়াশের গলা কেমন শুকিয়ে কাঠ-কাঠ হয়ে এল। পরবর্তী শব্দগুলো চোখে আটকে গেল।
আমি আমার সন্তানকে চাইনি। কিন্তু কি করে,কি করে জানি ও এসে গেলো। আমার আর আপনার ভালোবাসাহীন এক অস্তিত্ব এসে আমার কোলে জায়গা করে নিলো, আমি ওকে আটকাতে পারলাম না। পারলাম না ওকে আটকাতে! ও আসবে কেনো? ভালোবাসাহীন ওর অস্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। ও কি আমার মতোই ভালোবাসাহীন ভাবে বেড়ে উঠবে? আমি ওকে চাইনি, কিন্তু ও এসেছে৷ এবার কি করে ওকে জবাব দিবো? জবাব দিবো কিভাবে? ওর বাবা যে কোনোদিন আমায় ভালোবেসে কাছে টানেনি। আমায় বলে স্পর্শ করেনি, তাহলে ও কেনো এলো?”
দৃষ্টিপট ঝাপসা হয়ে এলো আয়াশের। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য স্পন্দন বিস্মৃত হয়। আঙুলের ফাঁক গলে ডায়েরিটি প্রায় মেঝেতে পড়ে যেতে উদ্যত হয়, শেষ মুহূর্তে কোনোমতে আঁকড়ে ধরে সে। অসম্ভব! না এটা এটা কী পড়ল সে? তার সন্তান? ঠোঁট নড়লো, অথচ কোনো শব্দ বেরোলো না। মস্তিষ্ক অবিশ্বাসের শেষ সীমায় পৌঁছে প্রতিটি অক্ষরগুলোকে অস্বীকার করতে চাইলো। কিন্তু ডায়েরির কালি মিথ্যা বলে না। আয়াশ অনুভব করলো, তার সমগ্র অস্তিত্ব যেন এক অদৃশ্য বজ্রাঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। সে বাবা হতে চলেছে।
অথচ সে জানেই না!নিজের সন্তানের অস্তিত্ব সম্পর্কে তার প্রথম জ্ঞান লাভ হচ্ছে একটি নিঃসঙ্গ ডায়েরির পাতায়। এর চেয়েও নির্মম পরিহাস কি আদৌ সম্ভব? দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে মাথা এলিয়ে নিলো। অন্তর্লোকে শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ সংঘর্ষ। সে কি ইনায়াকে কখনো ভালোবেসেছে? না। ভালোবাসার স্বীকারোক্তি সে নিজের কাছে কোনোদিন দেয়নি। তবে কেন এই মুহূর্তে বুকের প্রতিটি শিরা এমন নিষ্ঠুর যন্ত্রণায় কাঁপছে? কেন মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত দূরত্ব অতিক্রম করে এখনই ইনায়ার সামনে পৌঁছে দাঁড়াতে হবে? সে কি কেবল সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন?
নাকি,প্রশ্নটি সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই কঠোরভাবে মাথা নাড়লো আয়াশ। না,না এভাবে ভাবা যাবে না।নিজেকে স্থির রাখতে হবে। কিন্তু স্থিরতা আজ তার নাগালের বাইরে।
হঠাৎ করেই মস্তিষ্কে একের পর এক আশঙ্কা ঝড়ের বেগে আছড়ে পড়ছে। ইনায়া কোথায়? সে কি নিরাপদ? তার শরীরের বর্তমান অবস্থায় একা একা কীভাবে চলাফেরা করছে? ঠিকমতো আহার করছে তো? কোনো অসুস্থতা হলে কার কাছে যাবে? হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো একটি মানুষও তো নেই তার। একটি আশ্রয়,একটি নিরাপদ ঠিকানা,একটি আপনজন কিছুই নেই।
মুহূর্তের মধ্যে আয়াশের সমগ্র সত্তা তীব্র অস্থিরতায় আক্রান্ত হলো। সে ঝটকা মেরে ডায়েরিটি বন্ধ করে। আর এক মুহূর্তও বসে থাকার উপায় নেই। দ্রুত নিজের মোবাইলটি হাতে তুলে নেয়। কল লিস্টে থাকা ইনায়ার নম্বরে একের পর এক ডায়াল করে। প্রতিবারই একই নির্মম উত্তর’সুইচড অফ’ অভিশাপের মতো । কোনো বন্ধুও নেই, বন্ধু বলতে সে নিজেই। আর সেই মানুষটার কাছ থেকেই তো ইনায়া দূরে চলে গেছে।আয়াশ দাঁতে দাঁত চেপে গাড়ির চাবিটি তুলে নেয়। আজ পুরো শহর তন্নতন্ন করে খুঁজবে সে। প্রথমে হাসপাতাল। তারপর ইনায়ার আশ্রয়কেন্দ্র। এরপর রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, ভাড়াবাসার এলাকাগুলো একটি জায়গাও বাদ যাবে না।
“ এমনটা না করলেও পারতে! এতোটা নিষ্ঠুর হলে, যে আমাকে এতো বড় কথাটাও জানালেন না।”
বলেই আয়াশ বের হয়ে যায়। আয়াশের বাবা-মা কয়েকদিনের জন্য গ্রামে গেছে। আসবে আরও এক সপ্তাহ পর, তারা ফিরে আসলে সে কি জবাব দিবে? কোনে জবাব নেই তার কাছে। তার মস্তিস্ক কেবল একটিই কথা পুনরাবৃত্তি করে চলছে।
“ওকে খুঁজে বের করো। যত দেরি হবে, ততই হয়তো সবকিছু তোমার নাগালের বাইরে চলে যাবে।”
#চলবে

