#চন্দ্রপুকুর
||১৯তম পর্ব||
– ঈপ্সিতা শিকদার
অতীত,
“দিলরুবা, ঐ পুকুরঘাটের সিঁড়িপথ আর তার আশপাশ বহু দিন ধরে এমন কাদামাটিতে ভরপুর, তাই না?”
“হ্যাঁ, বেগম। আসার পর হতেই তো এমন দেখছি। কিন্তু হঠাৎ এ বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন ক্যানো?”
যামিনী সেদিক থেকে নজর সরিয়ে গাঢ় দৃষ্টিতে দিলরুবার পানে তাকায়। তার ঠোঁটে চাপা হাসি।
“আমি এই কাদামাটিতে পিছলে পড়ে আহত হবো। বৈদ্য আসবে আমায় দেখতে।”
“আস্তাগফিরুল্লাহ্ বেগম চন্দ্রমল্লিকা! এসব কী বলছেন আপনি! এমন বিপদে পড়ুক আপনার শত্রু, আপনি না।”
“আরে না আমাকেই পড়তে হবে।”
“মানে?”
কিশোরী মুচকি হেসে দিলরুবাকে নিচু কণ্ঠে প্রকাশ করে পরিকল্পনা। দিলরুবা চোখজোড়া যেন কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসবে।
“এতো বড়ো ঝুঁকি নিবেন বেগম? যদি গুরুতর ক্ষতি হয়ে যায় তাহলে কী হবে? প্রয়োজন নেই বেগম এমন জীবন বাজী রাখার।”
“আমার গোটা জীবনই একেকটা বাজী, প্রতিটি সিদ্ধান্তই ঝুঁকিপূর্ণ। এই যে বিবাহ হয়েছে আমার ও বাবু মশাইয়ের, তাও পরিণাম না বুঝে, বাজীর মতোই। আমার আর ভয় নেই কোনো। তুমি যা বলেছি তা করো।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাথা ঝাঁকায় যুবতী, খাঁস বাঁদী হয়েছে বলে কথা।
যামিনী পরিকল্পনা মোতাবেক হাত-পা ধোয়ার ভঙ্গিমায় পুকুরের দিকে এগিয়ে যায়। দেরি না করেই পিচ্ছিল পথে উবু হয়ে পড়ে সে। তেমন আঘাত না পেলেও অসাড় হয়ে পড়ে থাকে।
দিলরুবা আদেশ মোতাবেক চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে শুরু করে দাসী ও খাদিমদের। তার আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে আসে সকলে। দ্রুতো যামিনীকে উঠিয়ে ঘরে নিয়ে যায়।
“এ কী বেগম তো উঠতে পারছেন না! এখন কী হবে? মোর্শেদা খাতুন, আপনি যেয়ে বৈদ্যকে নিয়ে আসুন, জমিদার বাবুকে খবর দিন। আমার বেগম!”
আকস্মিক ঘটনায় স্তম্ভিত মোর্শেদা খাতুনও দিলরুবার তাগিদে জ্ঞানশূন্য হয়ে তার কথা মোতাবেক কর্ম করে। কিশোরী অশ্রু ঝরানো নয়নযুগল চকচক করে উঠে। দাসীরা ভেজা বস্ত্রের দ্বারা মুছে দেয় দেহে লাগা কাদা।
একটু বাদে বৈদ্য প্রবেশ করেন। উদ্বিগ্ন ও উত্তেজিত ভাবে প্রবেশ করে মেহমাদ শাহও।
“কী হয়েছে? কীভাবে পড়লে তুমি চন্দ্রমল্লিকা?”
যামিনী কিছু না বলেই মুখে আঁচল চেপে ফোঁপাচ্ছে। যুবক দিলরুবার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।
“এখানে তো জেনানা স্নানাগার নেই। তাই পুকুরে যাচ্ছিলেন বেগম হাত-পা ধুতে। হুট করেই পিচ্ছিল পথে পড়ে গেলেন, কারণ সকাল হতেই দুর্বল বোধ হচ্ছিলো তার খানাপিনায় ব্যাঘাত ঘটায়।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহমাদ শাহ। বৈদ্যের দিকে ইশারা করে কার্য শুরু করার।
“চিন্তার বিষয় নেই। ছোটোখাটো আঘাত লেগেছে, হাতে-পায়ে। আমি ঔষধি পাঠিয়ে দিচ্ছি, খেলে ঠিক হয়ে যাবেন। গোটা একদিন একদম বিশ্রামে থাকত্ব হবে। আর দুর্বলতার জন্য বেশি বেশি খেতে হবে, দুশ্চিন্তা করা যাবে না।”
তিনি চলে যান। বেড়িয়ে যায় সকল দাসীও। যামিনী জড়িয়ে ধরে তার বাবু মশাইকে।
“কোথায় ছিলেন আপনি? আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম জানেন? এখানে একদণ্ড শান্তি পাচ্ছি না আমি বাবু মশাই। ভালো লাগছে না আমার। আমার হৃদয় ডুবে যাচ্ছে অতল আঁধারে। দুশ্চিন্তা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে আমায়।”
যামিনীর কথায় যুবকের মাঝে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। বিনাশব্দে তার মাথায় কয়েকদফা হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে যায়।
এক মুহূর্তের জন্য রমণীর মনে হয়েছিল তার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই দিলরুবা প্রফুল্ল হৃদয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে জানায়,
“বেগম, আপনার ভুল মার্জনা করেছেন জমিদার বাবু। আমরা এখনই অন্দরমহলে ফিরবো।”
স্বস্তির শ্বাস ফেলে যামিনী। এতোক্ষণে যেন উত্তপ্ত হৃদয় শীতলতা ফিরে পেলো।
কয়েক ঘণ্টা পূর্বের ঘটনা ভাবতে ভাবতেই মিটমিট হাসছে কিশোরী। তার খুব করে ইচ্ছে হচ্ছে তার বাবু মশাইয়ের কক্ষে যেয়ে তার বক্ষে মিশে নিদ্রায় ডুবে যেতে। তবে যাওয়া সম্ভব নয়, অসুস্থতার অভিনয় হতে যে পর্দা সরে যাবে।
___
শুক্রবার সকাল। বিরিয়ানি, গোশতো ভুনা, কোর্মা, কাবাব সহ নানা পদের খাবারের ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে গোটা নবাববাড়ি। যোহরের সালাত সেড়ে যামিনী রন্ধনশালার দিকে যায়।
তার উদ্দেশ্য আজ নিজ হাতে রান্না করবে সে বাবু মশাইয়ের উদ্দেশ্যে। তার হাতের হাসের গোশতো ভুনা ও চিংড়ি মাছের দোপিয়াজা গ্রামে সবার প্রিয় ছিল।
তাকে দেখেই প্রধান পাচক ও অন্যান্য রাঁধুনিরা হাতের কাজ ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ঝুঁকে সালাম জানায় তাকে।
প্রধান পাচক জিজ্ঞেস করে,
“আসসালামু আলাইকুম বেগম চন্দ্রমল্লিকা। কিছু প্রয়োজন হলে দাসীকে দিয়ে খবর পাঠাতেন। আপনার আসলেন ক্যানো?”
“না, না, আমার কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। বরং আমি কাজ করতে এসেছি। আমি আমার নিজ হস্তে বাবু মশাই মানে জমিদার নবাব মেহমাদ শাহের ও সকলের উদ্দেশ্যে দুটো পদ রান্না করতে চাই।”
“ভুল-ত্রুটি মার্জনা করবেন, বেগম। কিন্তু আমরা থাকতে আপনি ক্যানো…? আপনি বরং আমাদের বলুন কী রান্না করতে হবে, আমরা করে দিচ্ছি।”
“একদম না, আমি নিজ হাতে করবো। আর তোমরা আমাকে সহয়তা করবে। এটা বেগম চন্দ্রমল্লিকার আদেশ।”
কেউ আর বলার কিছু পায় না। কিশোরী নিজ হস্তে হৃদয়ের সকল ভালোবাসা নিংড়ে রান্না শেষ করে। বড়ো চুলোর তাপে ঘেমে-নেয়ে অস্থির সে।
প্রধান পাচক সুদীর্ঘ এক শ্বাস গ্রহণ করে। তার জিহ্বা লালায় ডুবে যায়।
“ঘ্রাণটা তো মনোরম বেগম! এখনই খেয়ে ফেলতে হৃদয় টানছে।”
“ধন্যবাদ, তোমরাও তো পাবে। তবে ভোজনশালায় সবাই এসে পড়েছে? তাহলে খাবার নিয়ে যাওয়া যাক।”
“যথা আজ্ঞা বেগম। সবাই এসে পড়েছে।”
ভোজনশালায় সকলে উপস্থিত, মেহমাদ শাহও। তার আঁখি দুটো কাতর হয়ে খুঁজছে পরিচিত মুখশ্রী, তবে তার আসার নাম নেই। অবশেষে যামিনীকে দেখতে পায় সে।
শাহাজাদি নূর বাহার মুখ বাঁকায় তাকে দেখে। মৃদু আঘাত করার উদ্দেশ্যেই শুধায়,
“এতো দেরি করে আসলে যে বেগম চন্দ্রমল্লিকা? নীতি ভুলে গিয়েছো না কি? যোহরের সালাতের পরপরই তো সকলকে উপস্থিত থাকতে হয় অন্দরমহলে।”
“দুঃখিত শাহাজাদি। আমি আসলে সালাত সমাপ্ত করে সকলের জন্য রান্না করতে গিয়েছিলাম। আপনাদের জন্য বিশেষ করে বাবু মশাইয়ের জন্য নিজ হাতে হাঁসের গোশতো ভুনা ও চিংড়ি মাছের দোপিয়াজা করেছি। আমি যতোদূর জানি, বিবাহের পর নববধূকে কিছু তৈরি করে আহার করানো লাগে শ্বশুরবাড়িকে, তারা খাবার পছন্দ হলে উপহার দেয়। এটাই তো নিয়ম।”
“খাওয়ার যোগ্য হয়েছে তো? আমি ওসব অখাদ্য মুখে তুলবো না।” রাশভারী কণ্ঠ বেগম নূর বাহারের।
“একবার খেয়ে তো দেখেন আম্মিজান।”
বলতে বলতেই এক চামচ তাঁর থালায় দিল যামিনী। এক এক করে দাদীজান, মেহনূর, মোর্শেদা খাতুন ও মেহমাদের থালে খাবার তুলে দিল সে। নিজেও খেতে বসলো।
ভয়ে ভয়ে একগ্রাস মুখে তুলেই বিচার-বিশ্লেষণ করে বিড়বিড়ালো,
“খারাপ হয়নি।”
সকলের দিকে চোখ বুলালো সে। সবাই একবার আহার করেই কেমন নিষ্পলক তাকিয়ে আছে।
মেহমাদ শাহই প্রথমে মুখে খুলে।
“অমায়িক হয়েছে খেতে! এমন হাসের গোশতো আর চিংড়ি মাছ আমি কখনোই খাইনি। তাই না দাদীজান?”
“হুম, ভালো হয়েছে।”
তাঁর কণ্ঠে তেমন আগ্রহ নেই।
মেহমাদ শাহ বলে উঠে,
“তোমাকে তো উপহার দেওয়ার কথা। বলো, কী উপহার চাই তোমার এই অসাধারণ স্বাদযুক্ত খাদ্য আহার করানোর বিনিময়ে?”
কিশোরী মুচকি হেসে বিনা দ্বিধায় উত্তর,
“আমি চাইবো ঠিকই, আপনি দিতে পারবেন কি না তা-ই কথা। বাবু মশাই আমাদের বিবাহের পর কতদিন পেড়িয়ে গিয়েছে। অথচ, আমাদের বিবাহের উদ্দেশ্যে কোনো অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করা হয়নি। আমি চাই সামনের রবিবার তা হোক, শেরপুর বাসী এবং নবাববাড়ির সকলে উপভোগ করুক আমাদের বিবাহের আনন্দ।”
মেহমাদ শাহ চাপা হাসে তার চন্দ্রমল্লিকার কথা শুনে। এক পলক বেগম লুৎফুন্নেসার দিকে দৃষ্টিপাত করে, তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
“অবশ্যই, আমি জমিদার নবাব মেহমাদ শাহ। আমি সবই করতে পারি। অবশ্যই তোমার চাওয়া পূরণ হবে। আম্মাজান, গোটা প্রাসাদ ও প্রাসাদের বাহিরে গ্রামবাসীদের মাঝে আমার বিবাহ উৎসবের সংবাদ প্রচার করুন।”
“ঠিক আছে, আমার শাহ। তুমি যা বলো তা-ই হবে।”
যামিনী তৃপ্তির হাসি দিয়ে খেতে শুরু করে। চিঠিতে থাকা বুদ্ধি তো বাস্তবায়ন করেছে সে, তবে পরিণামটাও চিঠি মোতাবেক হলেই হলো। অপরদিকে কয়েকজনের গলা দিয়ে এত মজাদার খাদ্যও যেন নামতে চাচ্ছে না।
___
যামিনীর বেশ হৃদস্পন্দন যেন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আর এক মুহূর্ত মেহমাদ শাহকে না দেখলে মারা যাবে সে। এতোটাই আকুলতা আজ ভর করেছে প্রিয়তমকে দেখার।
দেরি না করে দিলরুবা ও দাসীদের সহায়তায় নিজেকে সাজিয়ে নেয়। মেহমাদ শাহের উপহার করা সুদূর ফরাস থেকে আনা তীব্র ঘ্রাণজ সুগন্ধিটিও লাগিয়ে নিয়েছে।
আজ একাকিই বেগুনি রাজকীয় ওড়নাটি গায়ে জড়িয়ে মেহমাদ শাহের কামরার দিকে অগ্রসর হয়। পথিমধ্যে যুবককে কক্ষ ত্যাগ করে অন্যদিকে যেতে দেখতে পায়।
কিশোরী ডাক দিতে যেয়েও থেমে যায়। দ্রুতো হাঁটতে শুরু করে বটে, তাকে বাধাদান করতে।
তবে তা তো পারে না। বরং, মেহমাদ শাহের পিছন পিছন অজান্তেই অন্দরমহল হতে বেড়িয়ে প্রাসাদের অন্য অংশে প্রবেশ করে। দূর হতে দেখতে পায় মেহমাদ শাহ বহু প্রহরী ও কালো পোশাকধারী দেহরক্ষীদের দ্বারা আবৃত দ্বার খুলে গহীনে প্রবেশ করে।
যামিনী এগিয়ে যায় সেদিকে। দ্বারের কিছুটা কাছাকাছি যেতেই বাধা প্রদান করে প্রহরীরা।
“এমন ভুলের অর্থ কী? তুমি জানো আমি কে? বেগম চন্দ্রমল্লিকা আমি, জমিদার মেহমাদ শাহের স্ত্রী।”
“দুঃখিত বেগম। ভুল-ত্রুটি মার্জনা করবেন। তবে এই দ্বার নবাব ব্যতীত সকলের জন্য বন্ধ।”
“আমাকে নিষেধ করলে তুমি? আমাকে?”
“চন্দ্রমল্লিকা! তুমি! তুমি এখানে কী করছো?”
পরিচিত কণ্ঠ শ্রবণগত হতেই কণ্ঠের উৎসের দিকে তাকায় যামিনী। সাদা উত্তরীয়ে আবৃত একজন নারী, শুধুমাত্র চোখজোড়া দৃশ্যমান। তবুও কিশোরী চিনতে ভুল করো না মোর্শেদা খাতুনকে।
“আসসালামু আলাইকুম, আম্মাজান। আমি তো বাবু মশাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলাম। কিন্তু প্রবেশই করতে পারছি না।”
“তাই বলে অন্দরমহলের বাহিরে চলে আসবে? জানো কেউ জানতে পারলে কী পরিমাণ ঝড় যাবে তোমার উপর দিয়ে? চলো, এখন আমার সঙ্গে।”
মোর্শেদা খাতুনের কথায় বোকা বনে যায় যামিনী। দ্রুতো আশেপাশে খেয়াল করে। বোধ হয়, এটা তার সুপরিচিত অন্দরমহল নয়।
“দুঃখিত” উচ্চারণ করে মোর্শেদা খাতুনের দিকে এগিয়ে যায় সে। তিনিও কিশোরীকে মৃদু বকার ছলে অন্দরমহলের দিকে এগিয়ে যায়।
হুট করেই রমণী জিজ্ঞেস করে,
“তবে আম্মাজান ঐটা কীসের দ্বার? সেখানে এতো সুরক্ষা ব্যবস্থাই বা ক্যানো? আর সকলের বন্ধই বা কেন?”
স্থির হয়ে গেলেন মোর্শেদা খাতুন। ভয়ার্ত দেখালো তাঁকে।
“নবাববাড়ির কিছু কিছু রহস্য চাপা ও দ্বার বন্ধই থাকে সদা, থাকবেও। তাদের দিকে হাত বাড়ানো তো দূরে থাক, তাদের কথা উল্লেখ করাও বর্জনীয়।”
নৈশব্দে দ্রুতো হাঁটতে শুরু করেন তিনি। যামিনীকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা হয়তো। তবে কিশোরী অনুধাবন করতে পারলো না এর কারণ।
চলবে…
#চন্দ্রপুকুর
||২০তম পর্ব||
– ঈপ্সিতা শিকদার
রংধনু উঠেছে আকাশে। বিরাট আয়োজন তাদের বিবাহের। বাগানের মাঝ বরাবর চলছে সঙ্গীত, নৃত্য প্রদর্শন ও আনন্দ উদযাপন ভোর হতেই।
হলদে শাড়ি পরিধানে যামিনীর। সবাই হলুদ ছোঁয়াবে তাকে, দোয়া করবে তার উদ্দেশ্যে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেগম নূর বাহার এবং শাহাজাদি মেহনূরও উপস্থিত হয়।
যামিনী তাদের দেখেই আসন ত্যাগ করে এগিয়ে যায়। নত দৃষ্টিতে চাপা হাসির সহিত বলে,
“আসসালামু আলাইকুম আম্মিজান ও দাদীজান। আমি প্রচুর আনন্দিত আপনারা এসেছেন বলে। আপনাদের চরণ ফেলে আমার বিবাহের আনন্দকে আরও চারগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমাকে দোয়া করুন সুখী দাম্পত্যজীবন কাটাতে পারি যেন। বাবু মশাইকে যেন সুখী করতে পারি।”
বেগম লুৎফুন্নেসার মুখশ্রীতে চাপা হাসি।
“আমিন। আল্লাহ তোমাদের খুব দ্রুতো সন্তানের পিতা-মাতা করুক।”
তাঁর ইশারা পেয়ে আসন গ্রহণ করে কিশোরী। বেগম লুৎফুন্নেসা ও তারপর বেগম নূর বাহার হলুদ ছুঁয়িয়ে দিলে। একে সকলে হলুদ ছুঁয়িয়ে প্রাণ ভরে দোয়া করে তাকে।
সবাই যে যার মতো নৃত্য করছে, অংশগ্রহণ করছে অনুষ্ঠানে। দিলরুবা সহ অন্যান্য দাসীদের জোরাজুরিতে যামিনীও নৃত্য করে তাদের সাথে। উৎসবে নতুন এক সুর আসে যেন।
মেহমাদ শাহ প্রাসাদের সম্মুখের ভাগে হলুদ উৎসব সমাপ্ত করে নিজের কক্ষে ফিরেছে। তার দেহ হলুদে ভর্তি এখনও। অবচেতন হৃদয়েই করে যেন জানালার বাহিরে উঁকি দেয় সে।
তার মস্তিষ্ক অসার হয়ে পড়ে প্রিয় রমণীর লাস্যময়ী রূপ দেখে। আজকের জন্য অন্দরমহলে প্রহরী সহ সকল পুরুষের প্রবেশ নিষেধ, অন্দরমহলে প্রবেশের সকল দ্বারে পাহারারত সকল প্রহরী ও দেহরক্ষী। যামিনী তাই আজ পোশাকের খেয়াল আর রাখছে না।
ভেজা এলো কেশ, মুখমণ্ডলে জৌলুস আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের, অর্ধভেজা মিহি বস্ত্রের উত্তরীয় আরও কামনীয় করে তুলেছে তার চন্দ্রমল্লিকাকে। যুবক যেন ভালোবাসা, কামনা, প্রেমের জোয়ারে ডুবে যাচ্ছে।
অধরোষ্ঠ কামড়ে হেসে সে বিড়বিড়ায়,
“মাত্র কয়েকদিন তুমি আমার নিকটে আসোনি। অথচ, আমার হৃদয়ে কতো দিন ধরর শূন্যতা তোমার মুখ থেকে প্রেমময় বাণী, প্রেম নিবেদন না শ্রবণ করতে পারার। রাত্রির নিদ্রা আড়াল হয়েছে আমার চক্ষু হতে, যখন থেকে তুমি আড়াল হয়েছো আমার বক্ষ। আজ তোমায় আপন করে নিব, মিশে যাবো তোমাতে পুনরায় চন্দ্রমল্লিকা। আমার প্রিয় বাচ্চা হরিণী! ভালো…”
নিজেই হেসে ফেলে যুবক। হুট করে নিজেকে তার মহাবিদ্যালয়ে (কলেজ) অধ্যায়নরত কোনো কিশোর মনে হলো যেন। যে প্রতি মুহূর্ত পরাজিত হয় নিজের অনুভূতির নিকটই।
___
যামিনীকে তৈরি হয়েছে রুবি পাথরের ন্যায় অপরূপ লাল রঙের সোনালী সুতো ও দামী পাথরে সাজানো পোশাক। বিশাল লাল হিজাব ও নিকাবে ঢেকে যায় মুখশ্রী। গায়ে জড়ানো হয় বেগুনি রাজকীয় ওড়নাটি। দু’হাতে পরানো হয় রতনচূড় ও বালা।
তাকে মোর্শেদা খাতুনের দ্বারা নিয়ে যাওয়া হয় মূল মহলের বৈঠক ঘরে। যামিনীর চরণ বৈঠক ঘরের দ্বারে পড়তেই দাঁড়িয়ে যায় উপস্থিত সকলে, দৃষ্টি নত। নিকাবের আড়াল হতে অবাক হয়ে দেখে রমণী। ঐ যে নিজ গ্রামের ভট্টাচার্য বাবু, হাসান চাচা সহ পাশের গ্রামের ধনী ব্যক্তি ঠাকুর বাবু। কোনো দিন হাসি মুখে দুটো কথা যারা বলেনি, তুচ্ছজ্ঞান করেছে সদা, তারাই আজ তার সম্মুখে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে। অন্যরকম এক আনন্দ ও তৃপ্তি পায় সে। ইচ্ছে হয় তার মামা ও মামীর একবার দর্শন পেতে এই মুহূর্তে। দেখে জ্বলুক না তাঁরা, ক্ষতি কী?
নিজের হৃদয়েই অবাঞ্ছিত ভাবনাগুলো জলাঞ্জলি দিয়ে আশেপাশে তাকায়। পুরুষই উপস্থিত সবাই। বেগম লুৎফুন্নেসা, বেগম নূর বাহার ও শাহাজাদি মেহমূর পর্দার আড়ালে।
কিশোরী মোর্শেদা খাতুনের ইশারায় এগিয়ে যায় তার প্রিয়তমের সিংহাসনের দিকে। মেহমাদ শাহ উঠে এগিয়ে যেয়ে হাত এগিয়ে দেয়। যামিনী তার দিকে তাকিয়ে নিকাবের আড়ালে হেসে হাত ধরে তার সাথে সিংহাসনে বসে।
মেহমাদ শাহের অধর হতে আজ হাসি যেন হারাচ্ছেই না। অত্যন্ত প্রফুল্ল দেখাচ্ছে তাকে।
সে ঘোষণা করে সকলের সম্মুখে,
“আমি জমিদার নবাব আলিউল শাহের একমাত্র পুত্র জমিদার নবাব মেহমাদ শাহ আজ ঘোষণা করছি আমার স্ত্রী এবং এই শেরপুরের বেগম হলো চন্দ্রমল্লিকা। আমাকে যতোটা সম্মান করেছেন সকলেই, ততোটাই ভালোবাসা ও স্নেহ পাবে বেগম চন্দ্রমল্লিকা, এটা আমাদের নিকট কাম্য। আমাদের সংসার যাতে স্থায়ী হয় এবং সুখ ও আনন্দে কাটে এর জন্য সকলকে প্রার্থনা করার অনুরোধ।”
সকল একই সুরে “আমিন” উচ্চারণ করে।
অতঃপর বেগম লুৎফুন্নেসা পর্দা হতে বাহিরে আসেন। তাঁর ইশারায় মোর্শেদা খাতুন একটি প্রাচীন সিন্দুক নিয়ে আসেন।
দাদীজান তা খুলে বহু মূল্যবান রুবি পাথর, হিরা ও পান্নায় সজ্জিত মুকুট। নিজ হাতে যামিনীকে পরিয়ে দেন তিনি।
“আমাদের মহৎ বংশ ও তার মান রক্ষার রক্ষার এবং তাকে বিস্তার দায়িত্ব তোমার মাথায় তুলে দিচ্ছি। আশা করি কখনও তোমায় আমার সম্মুখে লজ্জিত মুখ নিয়ে দাঁড়াতে হবে না।”
মোর্শেদা খাতুনও কানে কানে কিছু একটা ফিসফিস করে বলেন।
“আমিন দাদীজান। আমি এখানে উপস্থিত সকলকে সাক্ষী রেখে শপথ গ্রহণ করছি সবার প্রথমে আমার নিকট গুরুত্ব পাবে এই বংশ। এর মান, মর্যাদা রক্ষার্থে ও বিস্তার করতে আমি সকল কিছু করতে প্রস্তুত থাকবো সদা। নিজের শ্রম, প্রাণ সবকিছু দিয়ে হলেও রক্ষা করবো। আল্লাহ আমায় আমার শপথ পালনের তৌফিক দান করুক। আমিন।”
যামিনীর শপথ গ্রহণের পর শুরু হয় উৎসব। কালোজাম সহ বিভিন্ন পদেত মিষ্টি, দই, শরবত, কী নেই এই উৎসবে! গাইছে বেশ ক’জন পুরুষ, বাজানো হচ্ছে দফ, খঞ্জনী।
কিশোরী ও তার বাবু মশাই উভয়ের নয়নযুগলেই উল্লাস উপচে পড়ছে। তবে তাদের এক হতে দর্শন করে হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। অথচ, পরে থাকতে হচ্ছে প্রফুল্লতার মুখোশ।
___
যামিনীকে বসিয়ে রাখা হয়েছে মেহমাদ শাহের শয্যায়। প্রথমবার বিবাহের সময় তার সজ্জায় তেমন কিছুই ছিলও না। আজও তেমনই, তবে মহা মূল্যবান মুকুটটি তার মাথাতেই এঁটে আছে। একটু বাদেই দরজা খুলে প্রবেশ করেন মোর্শেদা খাতুন। পিছন পিছন দিলরুবা এবং শাহাজাদি মেহনূরও আসে।
মোর্শেদা খাতুন তাকে দাঁড়াতে ইশারা করে। হিজাব ও নিকাব খুলে নাকে নোলক, দু’কানে কানবালা, গলায় কণ্ঠহার ও সাত নোলি হার, দু’হাতে রতনচূড় ও বালার সাথে শোভা পায় দু’মুঠো সরু স্বর্ণের চুড়ি। মাথায় তাজের শোভা বাড়ায় সিঁথিপাটি।
“নিজেকে দেখে নেও চন্দ্রমল্লিকা আয়নাতে। কোনো ঘাটতি বোধ হচ্ছে কি না।”
কিশোরী দর্পণের সম্মুখে দাঁড়ায়। অবাক নয়নে তাকিয়েই থাকে। নিজেকে কোনো শিল্পীর হাতে তৈরি পৌরাণিক রাণীর মূর্তি লাগছে তার নিকট। গহনাগাঁটি দর্শন করেই সে বুঝতে পারছে, এ অলংকার নবাব বংশের বংশপরম্পরায় পাওয়া পৌরাণিক অলংকার।
“খুব সুন্দর লাগছে আম্মাজান। কী অপরূপ ভাবে সাজিয়েছেন আমার ন্যায় কৃষ্ণকলিকে।”
“ধন্যবাদ, চন্দ্রমল্লিকা। শাহাজাদি মেহনূর আপনি ঐ আঙটির বাক্সটি দিন বেগমকে। আমার শাহের আসার সময় হলো। চন্দ্রমল্লিকা এই আঙটি তুমি শাহের অনামিকা আঙুলে পরিয়ে দিবে। বংশের নিয়ম বংশের কুমারী কন্যার আঙটিটি বাসরঘরে নববধূকে দেয়, নববধূ সেটা এই আনন্দের রাত্রিতে ভালোবেসে নিজের স্বামীকে পরায়।”
“আরে মোর্শেদা খাতুন, এতো তাড়া কীসের? আসুক না আমাদের শাহ, ক্ষতি কী? আমরা বসি, একটু গল্প-গুজব করি।”
“যথা আজ্ঞা শাহাজাদি। আমি চললাম, ওদিকে দেখতে হবে।”
বিদায় নেন তিনি।
যামিনী নিজেকে আয়নায় দেখছে বারবার। শাহাজাদির দিকে তার ধ্যান নেই।
“তোমাকে চন্দ্রমল্লিকা নামটি শাহের দেওয়া, তাই না? শাহ খুব সুন্দর সুন্দর নাম দেয় ভালোবাসে। আনন্দের বিষয় শুধু আমরাই এই সৌভাগ্যের অধিকারী। আমাকেও তো দিয়েছেন নাম ভালোবেসে চন্দ্রপ্রভা তোমার পূর্বে। শাহের প্রিয় ফুলের নাম।”
রমণীর আনন্দ ঘুচে যায়। মলিন হয় মুখশ্রী। হৃদয় বিষিয়ে যায়। চোখে চোখ রাখে অপ্রিয় নারীটির। শাহাজাদি মেহনূর বাঁকা হাসি দিয়ে বেড়িয়ে যায়। সে তার উদ্দেশ্যে সফল।
মেহমাদ শাহ প্রবেশ করে কক্ষে। যামিনী থেকে অশ্রুতে টইটম্বুর নয়নযুগল নিয়ে দর্পনের সম্মুখে নির্জীব হয়ে দাঁড়িয়ে।
যুবক সেদিকে খেয়াল না করেই বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নেয় তার প্রেয়সীকে। ঘাড়ে মুখ গুঁজে সুদীর্ঘ চুম্বন করে।
“আমি আমার বাচ্চা হরিণীটার জন্য কতোটা তড়পাচ্ছিলাম চন্দ্রমল্লিকা তা ভাষায় প্রকাশ করার মতোন না। আমাকে এই কোন নেশায় আসক্ত করলে তুমি মেয়ে? একটা মুহূর্ত তুমি হীনা থাকলে তা বিভীষিকাময় হয়ে উঠে।”
যামিনীর ক্রোধ, অভিমান ও বেদনা সম্পূর্ণ রূপে ভাটা পড়ে যায় প্রিয়তমের প্রেমময় আত্মসমর্পণে। যতোই থাকুক জটিল পরিস্থিতি ও পরিবেশের মাঝে, সে তো কিশোরীই। কিশোরচিত্তই তার সকল কিশোরীর ন্যায়, যারা অনুভূতিতে বাঁচে, অনুভবে জোয়ারে ভাসে।
মেহমাদের দিকে ঘুরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে। মেহমাদ শাহের পরনের উত্তরীয়ের বোতাম আঙুলে খুঁটতে খুঁটতে শুধায়,
“কখনও ছেড়ে যাওয়া তো দূরে থাক অন্য কারো নামও মুখে আনবেন না দয়া করে বাবু মশাই। আমার শ্বাস চললেও আমি সেই মুহূর্তে মৃত হয়ে যাব, আমার রুহু মুক্তি চাইতে ছটফট করবে এই দেহ হতে।”
জমিদারের অধরজোড়া কৃষ্ণাভ ললাটে ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দেয়। আরও নিবিড়ভাবে নিজের মাঝে লুকিয়ে নেয় তাকে। যেন পৃথিবী হতে নিজের হৃদয়ের মাঝে বদ্ধ করে নিলেই শান্তি।
“কখনো না, চন্দ্রমল্লিকা। কখনো না। আমি যদি যোদ্ধা হই, তুমি আমার অস্ত্র ও শক্তি। আমি আশাহত এক ভবঘুরে যুবক, তুমি আমার আশার আলো চন্দ্রমল্লিকা। তোমার মাঝে বেঁচে থাকায় ভালো থাকার স্বাদ পাই। তুমি হীনা বিষাক্ত আমার জন্য এই প্রাসাদ, এই ক্ষমতা, প্রাচুর্য, সম্পদ সকল কিছু। ভালোবাসি আমার বাচ্চা বাঘিনী, গভীর ভাবে তোমার প্রতি আসক্ত আমি।”
দু’জন গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বেশ কয়েকমুহূর্ত একে অপরের দিকে। আর একটা শব্দও উচ্চারণ না করে মেহমাদ শাহ যামিনীকে কোলে তুলে অগ্রসর হয় ফুলে সজ্জিত শয্যার দিকে। সম্মুখে আরেকটি সুখময় রাত্রি অপেক্ষারত তাদের উদ্দেশ্যে। তবে আগামী দিনটা যদি বিভীষিকাময় হয়?
___
বেগম নূর বাহারের কক্ষে বসে আছে শাহাজাদি মেহনূর। আল্লাহ দু’জন মনুষ্যের জীবনে আনন্দ দান করেছেন, তা-ই যেন চোখের বালি এই দুই নারীর।
“আমার আর সহ্য হচ্ছে না মেহনূর এই মেয়েকে! কিন্তু কিছুই তো করার নেই। আজ তো বেগমের মর্যাদাও পেয়ে গেল। আর কী করার আছে?”
“আমার কাছে একটা পরিকল্পনা আছে, মামীজান। বাস্তবায়ন করা যাবে যদি আপনি অনুমতি দেন তাহলেই।”
বেগম নূর বাহার প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। যুবতী মৃদু হেসে খুলে বলে তার পরিকল্পনা। এবার দু’জনের মুখেই শোভা পায় কুটিল হাসি।
মেহনূর আপন মনেই বিড়বিড়ায়,
“যতো আনন্দ করার এই চার দিন করে নেও চন্দ্রমল্লিকা। আর চারদিন পর হতেই তোমার আঁধার রাত্রির সূচনা হবে। ঢাল হিসেবে আমার শাহকেও পাবে না, সে তো থাকবেই না শেরপুরে।”
চলবে…
#চন্দ্রপুকুর
||২১তম পর্ব||
– ঈপ্সিতা শিকদার
“চন্দ্র শাহের বিয়ে ভাঙা ঢোল দিয়ে! চন্দ্র শাহের বিয়ে ভাঙা ঢোল দিয়ে!”
যামিনী কাঁচা ঘুমের ঘোরে এমন অস্পষ্ট কথা শুনে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে। পুনরায় একই বাক্য শুনতেই হতভম্ব হয়ে উঠে বসে। কক্ষের আশেপাশে তাকায়, কোথাও কেউ নেই। অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাবে খেয়াল করে শব্দের উৎস বারান্দায় অবস্থিত।
ভীতিগ্রস্ত হয়। নয়নযুগল স্থির মেহমাদ শাহের নিদ্রারত মুখশ্রীর দিকে। দ্রুতো কম্পিত কণ্ঠে ডাকতে শুরু করে তাকে।
“বাবু মশাই! বাবু মশাই! তাড়াতাড়ি উঠেন না। কে যেন আমাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। উঠেন না!”
তন্দ্রাচ্ছন্ন যুবক উঠে বসে। কয়েক মুহূর্ত যায় যামিনীর কথা অনুধাবনে। হো হো করে হেসে উঠে সে।
রমণী বিস্মিত, দুঃখিত, রাগান্বিত। এতো বিশাল এক দুঃসংবাদ ও সতর্কবাণী জানালো আর মানুষটা কি না উপহাস করছো। হাসি থামিয়ে সবচেয়ে অমানানসই কাজটি সম্পন্ন করলো মেহমাদ।
“আমার অবুধ হরিণী” উচ্চারণ করেই কাছে টেনে নিল যুবক। দানবীয় এক চুম্বন করলো নরম অধরজোড়ায়।
ছাড়া পেতেই যামিনী রাগ মিশ্রিত চাহনি নিক্ষেপ করলো যুবকের দিকে। সে হেসে উড়িয়ে দিয়ে নিজে শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে প্রেয়সীকেও দাঁড় করালো।
কপট গাম্ভীর্যপূর্ণ ভঙ্গিমা তার এবার।
“খুব ভয়ানক বিষয় এ তো! শত্রুরা আমাদের মহলে তবে আক্রমণ করেছে। এবার কী হবে চন্দ্রমল্লিকা? আমরা সবাই মারা যাবে? তবে যা-ই হোক মোকাবেলা তো করতেই হবে এ শত্রুর।”
যামিনী কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তার শীর্ণ হস্ত খানা আঁকড়ে ধরে বিবস্ত্র অবস্থাতেই বারান্দার দিকে অগ্রসর হয় সে। দ্বারে পৌঁছাতেই যামিনী ভয়ে চোখ-মুখ খিঁচে মাথা নত করে রেখে। নির্ঘাত এখন রক্তপাত হবে।
“আরে তাকাও তো বাচ্চা বাঘিনী। দেখো তোমার শত্রুকে।”
রমণীর ভয়ার্ত মুখশ্রী চিবুক ধরে ধীরে ধীরে উপরে উঠায় তার বাবু মশাই। চোখ তুলে সামনে তাকাতেই। অধরজোড়ার মাঝে বড়ো একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়।
আপন মনে বিড়বিড়ায়,
“টিয়া পাখি!”
“হ্যাঁ গো জমিদারনি। এই টিয়া পাখিই তোমার গোপণ শত্রু, যে তোমার তন্দ্রা ব্যাঘাত ঘটিয়ে ছিল।”
“চন্দ্রপুকুরে যাব চন্দ্র শাহের বিয়ে খাব! চন্দ্রপুকুরে যাব চন্দ্র শাহের বিয়ে খাব!”
টিয়া পাখির কণ্ঠ শুনে হতবাক নবাবের বেগম। অবিকল মানব কণ্ঠ।
“এটা কার? কোথা থেকে এলো এখানে? আগে তো দেখিনি। কী সুন্দর দেখতে! কী সুন্দর কথা বলে!”
মেহমাদ শাহ মৃদু হাসে। এগিয়ে যায় সোনালী খাঁচা বন্দী পক্ষীর দিকে।
“এটা তোমার আমার চন্দ্রমল্লিকা। উপহার স্বরূপ। শহর থেকে আনা চন্দনা টিয়া। নাম চাঁদনি। তোমাকে দেওয়া হতো আগেই কিন্তু সুশিক্ষা দানে দেরি হলো। যাকগে উপহার কেমন লাগলো আমার আঁধার রাত্রির রাজকন্যা?”
“অনেক ভালো। এমন যা হৃদয়কে শীতল করে। সবচেয়ে ভালো বিষয় কী জানেন? তার কণ্ঠ অনেকটাই আপনার মতোন। যখন আপনি জমিদারির কাজে দূরে যাবেন, পৃথক হবেন আমার বক্ষ হতে, তখন তার সাথে কথা বলে হৃদয়ের যন্ত্রণা লাঘব করবো। আমার খুব যন্ত্রণা হয়, বারবার মন চায় আপনার সাথে কথা বলতে।”
“বাহ্! বাহ্! এ তো দেখা যাচ্ছে আমি নিজ হাতে নিজ চরণে কুড়াল মারলাম। নিজের সতীন কি না নিজেই আনলাম?”
বুকে অতি ধীরে আঘাত করলো যামিনী। অভিমানের সুরে নাক টেনে জিজ্ঞেস করলো,
“যাহ্! আপনার সব ঠাট্টা! আমাকে কি আপনার মনে পড়ে না?”
“মনে পড়ে, তবে তোমার ন্যায় না। আমি তো তোমায় রোজ দেখি।”
অনেকটা ঘোরের মাঝেই উত্তর দিল মেহমাদ শাহ।নিজের কথায় নিজেই যেন ঘাবড়ে গেল।
“মানে?”
“মানে স্বপনে দেখি তোমায় প্রিয়। এখন আবার আমি আবেগ দেখাই না কিন্তু আজ দেখিয়েছি বলে ঠাট্টা কোরো না আমায় নিয়ে।”
“কখনোই না।”
আরও শক্তভাবে লেপ্টে রইলো যামিনী তার প্রিয়তমের দেহে। দূর থেকে কেউ একজন দেখে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আড়ালে চলে গেল।
___
যামিনীর মন আজ বেশ সতেজ। আঙিনায় নিজের পোষা পক্ষী চাঁদনির সাথে প্রাতরাশ সাড়ার ইচ্ছে তার। তাই দাসীদের আদেশ করেছে শীতলপাটি বিছিয়ে তার বসার ব্যবস্থা করতে।
তৈরি হয়ে আঙিনায় আসতেই অবাক সে। তার বিনা শব্দ ব্যয়েই দাসীরা নিজ উদ্যোগে শরবত, কাবাব ও তালের পিঠার ব্যবস্থা করেছে মনোরঞ্জনের জন্য।
“বাহ্! বেশ মনোরম ব্যবস্থা তো আমার বসার জন্য।”
“ধন্যবাদ, বেগম। আপনার সন্তুষ্টি পেলেই আমি ধন্য।”
“দিলরুবা। আমার থলিটা দাও।”
দিলরুবা সায় জানিয়ে ছোট্ট কাপড়ের থলিটা এগিয়ে দেয়। যামিনী তা থেকে বেশ কিছু অর্থ উপহার দেয় তার জন্য বসার ব্যবস্থা করা দাসীদের।
“ধন্যবাদ, বেগম। ধন্যবাদ। সত্যি আপনি অনেক দয়াময়ী। আল্লাহ আপনাকে সুখী করুক। খুব দ্রুতো শাহাজাদি-শাহাজাদার মাতা করুক।”
“আমিন। এই অর্থ নিজেদের মধ্যে বিলিয়ে নেও। আমি বেগম চন্দ্রমল্লিকা কাউকে শূন্য হস্তে ফিরাই না, হোক সে আমার শত্রু বা শুভাকাঙ্ক্ষী।”
রমণী দিলরুবার সাথে বসে পড়ে আহার করার উদ্দেশ্যে। সুখময় এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।
আনমনেই ভাবে,
– চিঠিদাতা সত্যই বলেছিল। তার জন্য বড্ড বেশি লাভজনক হয়েছে এই বিবাহ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা। বেগম তো সে পূর্বেই হয়েছিল তবে গতকাল হতে পেয়েছে বেগমের যথার্থ মর্যাদা।
“চন্দ্র-শাহ! চন্দ্র-শাহ! ভালোবাসা! ভালোবাসা!”
চাঁদনির মানবীয় কণ্ঠ প্রেমাবেশ ও লজ্জায় চোখ নত করে হাসে যামিনী। আশেপাশের দাসীরা মিটিমিটি হাসছে ও কানাঘুষা করছে।
“দিলরুবা, বাবু মশাই মানে তোমার জমিদার বাবু দিয়েছে আমাকে এই পক্ষী উপহার স্বরূপ। কী আদুরে না দেখতে!”
অপ্রিয় নারীটিকে আসতে দেখতে পেয়ে ইচ্ছাকৃত ভাবেই জানানোর ভঙ্গিমায় কথাটি বলে উঠে। সাথে সাথেই দাসীরা নিজেদের মাঝেই কলরব পড়ে যায় তাদের জমিদার ও জমিদারনির মধ্যকার ভালোবাসার প্রসংশা নিয়ে।
শাহাজাদি মেহনূর বাগানের বৈদ্যশালার উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই এ রূপ দৃশ্য দেখে তার শুভ্র গায়ে যেন অম্লরসের ছিঁটে পড়ে।
ধমক দিয়ে উঠে সে,
“এখানে কী হচ্ছে? এতো কলরব ক্যানো? কাজ নেই তোমাদের? যাও, কাজে যাও।”
“শাহাজাদি, আপনি মেহমান। মেহমানদারী উপভোগ করুন। অন্দরমহলের কোথায় কাজ হচ্ছে বা কারা কাজ করছে না সেটার চাপ আপনার মাথায় নিয়ে ঘুরতে হবে না। দাদীজান আছেন, আম্মিজান আছেন, আমি আছি, এই অন্দরমহলের বেগম। আপনি এসবে মাথা ঘামাবেন না।”
যামিনীর শীতল কণ্ঠের শব্দের আঘাতে রাগে ফোঁসফোঁস করে উঠে যুবতী। অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বড় বড় পা ফেলে স্থান ত্যাগ করে।
বিড়বিড়ায়,
“সুখের দিন কাটিয়ে দাও আর কয়েকদিন। অন্ধকার তোমার আঁধারিয়া দেহের নিকট ধেয়ে আসছে।”
তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে রমণী আহার করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দাসীরা তার সুনামে পঞ্চমুখ।
“আমাদের একা ছেড়ে দাও, মেয়েরা। অনেক গল্প-গুজব হয়েছে, এখন কাজে হাত লাগাও।”
সকলে নত হয়ে যামিনীকে বিদায় জানিয়ে চলে যায়। দিলরুবা হেসে বলে,
“বেগম, আপনি তো আজ চমৎকার জবাব দিয়েছে শাহাজাদি মেহনূরকে! ঠিকই আছে, এমনই হওয়া।উচিত ঐ দুষ্টু নারীর সাথে।”
“হু, সবাই তার যোগ্য জবাব পাবে। বুঝবে আমি বেগম নবাবের, বেগম চন্দ্রমল্লিকা।”
“তবে বেগম একটা কথা কিন্তু থেকেই যায়। যে মানুষটা আপনাকে এই তথ্য ও বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করছে তার উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা কী ভেবেছেন?”
“হুম, ভেবেছি। তবে উত্তর পাইনি। তাই এই বৃথা ভাবনায় জলাঞ্জলি দিয়েছি। তাছাড়া তার উপদেশে আমার লাভ বৈকী ক্ষতি তো হচ্ছে না।”
“কিন্তু বেগম… ”
বাধা প্রদান করে যামিনী। বিরক্তির সুরে শুধায়,
“আহা! এখন খাওয়ায় মন দাও দিলরুবা। আমার অনেক ক্ষিধে পেয়েছে। কী মজাদার হয়েছে আজ কাবাব!
মিইয়ে যায় খাঁস বাঁদী। নামিয়ে ফেলে দৃষ্টি মেঝেতে।
“যথা আজ্ঞা, বেগম চন্দ্রমল্লিকা।”
___
মেহমাদ শাহের ব্যবসায়িক সফরে শেরপুরের বাহিরে যেতে হবে আজ। তার তন্দ্রাচ্ছন্ন মুখ খানা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যামিনী। আলতো হাতে স্পর্শ করছে তার মুখশ্রী।
ভাবছে, এই মানুষটি কি তার হওয়ার ছিল? নিজের যোগ্যতার চেয়ে বেশিই আল্লাহ তাকে দিয়ে দেয়নি? কোথায় এতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেহমাদ শাহ, যে কি না পাড়াগাঁয়েও সকলের স্বপ্নের পুরুষ সে কি না তার মতো পোড়াকপালির স্ত্রী! ভাবতেই বক্ষ খানা কেমন যেন ভার লাগে, অধরজোড়া তিরতির কম্পিত হয়।
ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তবে আবেগ অনেক ক্ষেত্রেই নয়৷ যামিনী তো কৈশোর কাটাচ্ছে, তার আবেগে ভাসাই স্বাভাবিক। শক্ত করে ঝাপটে ধরে প্রিয়তমে নিজের সবটুকু আবেগ ঢেলে দেয় তার অধরে।
মানুষটির ঘোর ভাঙে তন্দ্রার, তার ঘোর ভাঙে প্রেমের। লজ্জায় সিক্ত তখন রমণী, দ্রুততার সহিত সরে যেতে চায় শয্যা থেকে। তার শীর্ণ দেহ খানা ততক্ষণে বন্দী হয়েছে কঠোর দেহের বন্ধনে।
“প্রেম সব নিদ্রায় ডুবলেই পায়। একটু জাগ্রতচিত্তেও ভালোবাসার রঙ লাগাও, চলেই তো যাব। যদি ফিরে না আস…”
অধরে তর্জনী রাখে যামিনী। বাধাপ্রাপ্ত হয়ে থেমে যায় মেহমাদ শাহের বচন। প্রিয়তমার ভয়ার্ত নয়ন দুটোতে যেন ডুবেই যাচ্ছে যুবক।
“আস্তাগফিরুল্লাহ, বাবু মশাই। এমন অলক্ষণে কথা বলবেন না তো। আপনার কিছু হলে আমি যে সর্বস্বান্ত নয়, নিঃস্ব হয়ে যাব। আপনি একটি বিশালাকার বৃক্ষের ন্যায়, আমি হলাম কি না সেই লতা যে আপনাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচি। আপনি নেই, তো আমি নেই।”
মেহমাদ শাহ কিছু বলে না। তার মুখমণ্ডলে শুধু চওড়া হাসির কলরব।
“ভোর হয়েছে আমার তৈরি হতে হবে। চলো, এবার উঠা যাক।”
“তা তো যাবেনই। আপনার শুধু এই চন্দ্রমল্লিকার হতে পৃথক হওয়ার বাহানা চাই।”
এলোকেশ হাত খোপা করতে করতে উঠে দাঁড়ায় সে। গায়ে তার এলোমেলো শাড়ি। কোনোরকম গুছিয়ে নেয় সে। একবার অমুধাবনও করে না কারো ঘোরলাগা দৃষ্টি তার প্রতিটি কোষে কোষে আবদ্ধ।
“এভাবে কী দেখছেন? আপনি উঠুন৷ আমি আপনার স্নানের ব্যবস্থা করে আছি।”
যামিনী চলে যায়৷ মেহমাদ শাহ যাওয়ার পানে তাকিয়ে আনমনেই আওড়াই,
“ভালোবাসা, ভালোবাসা, অন্যরকম এক নেশা। পোড়ায়, জ্বালায় তবুও রাখি অনুরাগে তাকেই।”
“পুড়তে ভালোবাসেন বলেই তো পোড়েন। তবে দোষটা কেন শুধু আমার ললাটেই দেবেন?”
যুবক তড়িৎগতিতে চোখ তুলে দেখে। তার বাচ্চা বাঘিনী দেওয়ালের সাথে পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। তার দৃষ্টি ফেলতেই সে নিজ কাজে চলে যায়।
মেহমাদ শাহ তৈরি হচ্ছে যামিনী দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। ভেজা পোশাক তার গায়ে এঁটে আছে। মানুষটা যাবে মনে পড়তেই এক দণ্ড তার হতে দৃষ্টি সরাতে হৃদয় মানছে না।
মাথার চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে নজর যায় যুবকের প্রেয়সীর দিকে। ভ্রু কুঁচকায় সে।
“তুমি এভাবে কী করছো, চন্দ্রমল্লিকা? যাও, পোশাক বদলে নেও।”
“আপনার যেতেই হবে?” বাচ্চাদের ন্যায় সরল অভিমান প্রকাশ যামিনীর।
মায়া বোধহয় মেহমাদ শাহের। এগিয়ে এসে তার বাচ্চা হরিণীর ছোট্ট মুখ খানা দু’হাতের মাঝে নেয়। আদুরে ভঙ্গি তার।
“আমার বাচ্চা বাঘিনী, মায়াবী হরিণী, রূপকথার রাজকন্যা এভাবে মলিন করে রেখো না মুখ খানা। তোমার হাসি মাখা মুখ খানার কথা ভেবেই তো হৃদয় শীতল করি। এভাবে মলিন মুখে বিদায় দিলে তো হৃদয় পোড়নের যন্ত্রণায় শেষ হয়ে যাব আমি। হেসে দাও এবার।”
অশ্রুসিক্ত চোখেই হাসে যামিনী। দু’জন জড়িয়ে ধরে একে অপরকে। দুজনেরই হৃদয়ের কামনা সময়টা যেন থমকে যায়। তবে সময় তো প্রবাহমান, কারো জন্য থামার তার সময় কোথায়?
একটু বাদেই সকলকে বিদায় জানিয়ে বের হয় মেহমাদ শাহ। যামিনী তার কক্ষে বিষণ্ণ মনে বসে। আজও তার সঙ্গী হয়েছে দিলরুবা ও মোর্শেদা খাতুন।
“চিন্তা করবে না চন্দ্রমল্লিকা। আমার শাহ খুব দ্রুতই সুস্থ ভাবে চলে আসবে এই শেরপুরে।”
“আমিন আম্মাজান। আল্লাহ আপনার পুত্রকে সুস্থ রাখুক, দ্রুত ফিরুক।”
“সুম্মা আমিন। আমার শাহ কিন্তু তোমায় বেশ ভালোবাসে। তাকে রেখো অনুরাগে। আমার পুত্রের মনটা অনেক ভালো। এই আমাকেই দেখো। এই আমার ন্যায় সামান্য সন্তানহারা নারীকে সে তার মায়ের সম্মান দেয়। ছেলেটা তোমার জন্য পুরো পরিবারের সাথে সংগ্রাম করেছে, নিজের জমিদারি ও সিংহাসন হাতছাড়া হতে পারে জেনেও একবিন্দু দ্বিধা করেনি তোমার সঙ্গ দিতে। অনেক কথা বলে ফেললাম, এখন যাই।”
চোখের জল শুভ্র হিজাবে মুছে কক্ষ ত্যাগ করে। যামিনী বিড়বিড়ায়,
“এতো ভালোবাসা আমার ঝুলিতে ছিল বলেই কি এতোটা কষ্ট পেতে হয়েছে আমার জন্মলগ্ন হতে? তবে এই সুখটা স্থায়ী করে আল্লাহ। দূরে রেখো আমায় বিপদ হতে।”
___
বেগম নূর বাহার ও শাহাজাদি মেহনূর আগামীকালের জন্য পরিকল্পনা করতে ব্যস্ত। তাদের মুখশ্রীতে বাঁকা হাসি।
আলোচনা শেষে বেগম নূর বাহার বলে উঠে,
“তোমার তেজ সব চুরমার হবে আঁধারিয়া! আর কাল ভোর থেকে তার শুরুয়াত। তবে আমার চাঁদের টুকরো, নানীজান যদি কিছু জানতে পারেন…?”
“মামিজান, আপনি সে চিন্তা করবেন না। আমরা তো ঐ কন্যাকে এক আঘাতে হত্যা করবো না। ধীরে ধীরে একটু একটু করে অদৃশ্য বিষ মিশাবো তার অন্তরে, হৃদয়ে। তার হৃদয় অন্ধকারে ছেয়ে যাবে, সে নিজেই মরে যাবে ধরা-ছোঁয়া ছাড়া।”
#চন্দ্রপুকুর
চলবে…