#চন্দ্রপ্রভা_রজনী
#পর্বঃ২৯
লিখাঃসামিয়া খান
“এ দুনিয়ায় সবথেকে কঠিন কাজ হচ্ছে নিজেকে হত্যা।অন্যকে হত্যার থেকে নিজেকে হত্যার মধ্যে হাজারগুণ সাহসের প্রয়োজন হয়।একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখা যায় মানুষ সামান্য আলপিন তার শরীরে প্রবেশ করতে কাঁপা-কাঁপি শুরু করে দেয় অথচ ঠিক সেই মানুষ নিজের হাতে ধারালো বস্তু চালাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনা।”
“তাহলে যারা আত্নহনন করে তাদের তুমি সঠিক বলছো সুবাহ আপু?”
“না মোটেও তারা সঠিক নয়।শুধু তাদের পরিস্থিতি বিবৃতি করলাম দিহা।যে কতোটা বাধ্য হলে তারা নিজেকে হত্যার পথ বেঁছে নেয়”
একটা অতি নরম তুলতুলে হাতের বন্ধনে থেকে কথাগুলো বলে চলেছে সুবাহ।গোলাপি শুভ্র হাত।ছোট ছোট হাতে নেড়ে মায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করছে নিজের দিকে।এবং তা সফল হয়ে একটা বিজয়ীর হাসি হেসে দিলো ছোট্ট হাতের অধিকারী।
“ওর নাম কি রাখবে সুবাহ আপু?”
“ওর বাবার ইচ্ছে ওর নাম মেহেরিমা রাখা।”
“কেন?”
কাঠখোট্টা হয়ে সুবাহ জবাব দিল,
“জানিনা।”
“তোমাদের নামের সাথে মিলিয়ে রাখা উচিত ছিল।”
“দিহা একটা কথার সত্যিকারের জবাব দিবি?”
“বলো আপু।”
“মায়া ভাবীর সাথে আরিয়ানের কি আগে থেকে কিছু ছিল?”
সুবাহার করা প্রশ্নে একটুও চমকালো না দিহা।কারণ সে আগে থেকে জানতো এরকম একটা অবস্থার সস্মুখীন কখনো না কখনো তার হতে হবে।শান্ত,ধীর,স্থির গলায় জবাব দিলো,
“অতীত শব্দটা অনেক কঠিন একটা শব্দ।এর ভর সকলে বহন করতে থাকে আজীবন।কিন্তু তা শক্ত বাঁধনে বেঁধে একটা আবরণে ঢেকে।কখনো কখনো মানুষের জন্য মঙ্গল ওই আবরণটাকে না ভাঙা।এতে মানুষের উপকার হয়।”
“হেয়ালি করতে হবেনা দিহা।আমি যা বুঝার বুঝে গিয়েছি।”
“দুইজনেই অনেক এগিয়ে গিয়েছে আপু।”
কথাটার জবাব দিলনা সুবাহ।আজ বিয়ের দেড় বছর পর আরিয়ানের করা সমস্ত ব্যবহারের কারণ বুঝতে সক্ষম হলো সুবাহ।মাত্র বিশদিন আগে সুবাহার মেয়ে মেহেরিমা এই পৃথিবীর আলো দেখেছে।আরিয়ান সর্বোচ্চ ভালোবাসে মেহেরিমাকে।এজন্য সুবাহ বিষয়টা ঘাটবেনা।কখনো কখনো কম্প্রোমাইজ জীবনের জন্য করতে হয়।আজ যদি সুবাহ মেহেরিমার জন্য কম্প্রোমাইজ না করে তাহলে অবশ্যই তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তা ক্ষতিকর।
,
,
,
মায়া ও দিহানের ছেলে আবরিশামের বয়স একমাস।পুরোদস্তুর বাবার মতো দেখতে হয়েছে।সেই দিহানের নাক,সেই দিহানের চোখ, হাত, মুখের আদল সব।ওয়াফা তো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে মনে হয়।সারাদিন মায়ার ছেলে আবরিশামকে নিজের কোলে রাখে।মায়ার পরিবার,দিহানের পরিবার,আরিয়ানের পরিবার সকলে মিলে মায়ার নানুর বাড়ী এসেছে।এখানে দুই নবজাতকের আকীকার অনুষ্ঠান হবে।
“কেমন আছেন ম্যাডাম?”
হাসিমুখে পিছন ফিরে তাঁকিয়ে মূহুর্তে হাসিটা মিলিয়ে গেল ওয়াফার মুখ থেকে।আবরিশামকে কোলে তুলে নিয়ে ওই জায়গা ত্যাগ করবে ওয়াফা তখন স্বাধীন ওকে থামিয়ে দেয়।
“রাগ করে রয়েছেন ওয়াফা ম্যাডাম?”
“ছাড়েন বাবুকে খাওয়াবো।ওর ক্ষুধা লাগছে।”
“ইশ!এমনভাব করেন যেন বাচ্চাটা আপনার।”
“আমার না হলেও আমার বোনের তো।”
ওয়াফার আবার চলে যেতে নিলে স্বাধীন আটকিয়ে দিল।
“ওয়াফা!আমি প্রায় নয়মাস পর রিহ্যাব থেকে আসলাম।ভালোভাবে কথা বলবে না?”
“রিহ্যাব কেন?”
“পুরোদমে ড্রাগ এডিক্টেড ছিলাম।এজন্য।”
“কেন?ছ্যাঁকা খেয়েছিলেন?”
“কিছুটা ওরকম।”
“তাহলে আমি আপনাকে আবার ছ্যাঁকা দিলাম।”
“এক মিনিট।আমরা প্রেম করলাম কখন?”
“স্বপ্নে।”
কথাটা বলে ভেঙচি কেঁটে আবরিশামকে কোলে নিয়ে স্থান ত্যাগ করলো ওয়াফা।তার যাওয়ার দিকে তাঁকিয়ে হালকা হেসে দিল স্বাধীন।এক নতুন অনুভূতির সৃষ্টি হতে চলেছে।
,
,
,
জিকজ্যাকের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মায়া।আরামে ঘুম চলে আসছে বিড়ালটার।জিকজ্যাকের জন্য একটা মেয়ে বিড়াল এনেছে দিহান।তাকে ভালোবাসা তো দূর দুদিনে আরো বেশী মেরেছে জিকজ্যাক।বেচারি ভয়ে জিকজ্যাকের আশেপাশেও আসেনা।ঘারে গরম নিশ্বাসের অনুভূতি লাগায় চকিত হয়ে গেল মায়া।এ স্পর্শ চিনে মায়া।
“ক্ষুদা লাগছে আবরিশামের আম্মু।খাবো।”
“আপনি না কেবল খেলেন?”
“এটা মিনি ক্ষুদা।”
“এতো খেলে মোটা গাম্বুস হয়ে যাবেন নায়কসাহেব।”
“এতে তো ভালোই হবে।বাবু হওয়াতে তুমিও একটু মোটা হয়েছো আমিও একটু মোটা হবো।তখন দুজনে মিলে হয়ে যাবো মোটামুটি।”
“দিহান!”
দরজায় টোকা লাগায় আর কিছু বলতে পারলো না মায়া।আরিয়ান দাড়িয়ে আছে দরজায়।
“ভেতরে আসো আরিয়ান।কোন কাজ ছিল?”
“জ্বী দিহান ভাইয়া।নিজের জিনিস নিতে এসেছি এবং আপনার জিনিস ফেরত দিতে এসেছি।”
“সেটা কি?”
“তার আগে আপনি একটা ভিডিও দেখুন।”
ফোনে স্ক্রিনে একটা ভিডিও ওপেন হলো যেখানে একটা বন্ধ ক্লাসরুমে মুখোমুখি স্বাধীন আর সুবাহ বসে আছে।স্বাধীনের হাতে হকিস্টিক।
“এটা তো মিনিস্টারের ছেলে স্বাধীন রাইট?”
“ইয়েস।আগে দেখেন মজার একটা ঘটনা ঘটবে।”
ভিডিওতে এক পর্যায়ে সুবাহ বলে,
“হুম।আমার বাচ্চার বাবা স্বাধীন।আরিয়ান নয়।”
কথাটা শুনে মায়া দিহান কোন রিয়াকশন দিলো না।কারণ এর পূর্বের সকল কথা তারা শুনেছে।বিরক্তি নিয়ে দিহান বলল,
“এতে কি প্রমাণ হয় আরিয়ান?”
“প্রমাণ হয় যে সুবাহার বাচ্চার বাবা স্বাধীন।আমি নই।”
“গাঞ্জা খেয়েছো নাকী আরিয়ান?”
“কই না তো।”
“তাহলে এমন কথা বলছো কেন?ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায় সুবাহ ওটা কথার কথা বলেছে।”
“আমি জানি।কিন্তু তা তো আর বাহিরের মানুষ জানেনা?একথা গুলো এখন ভাইরাল হবে।সাথে সুবাহ আর স্বাধীনের কিছু অন্তরঙ্গ ছবি।উহু!আসল না।ওটা এডিট।কিন্তু বাঙালি তো আর এডিট বিবেচনা করবেনা।”
“আরিয়ান!তোকে আমি কিছু বলিনা তাই যা মনে হয় তাই করতে পারবিনা তুই।”
“দিহান আস্তে কথা বলেন। বাহিরে মানুষ।”
“মায়া দেখেছো কি বলছে ও?কীভাবে নিজের নবজাতক মেয়ের গায়ে জারজের সিলমোহর লাগাতে চায়?”
“আমি ওতো কিছু জানিনা দিহান ভাই।আপনি চাইলে বিষয়টা আটকাতে পারেন।শুধু মায়া আর আবরিশামকে আমাকে দিয়ে দিবেন।এবং সুবাহ আর মেহেরিমাকে নিয়ে চলে যাবেন।এবং তা কালকের মধ্যে।তা নয় এগুলো ভাইরাল হতে সময় লাগবেনা।আর আমি যা বলি তাই করি।”
এ সময় মায়া মুখ খুললো,
“আরিয়ান!আপনি যা চাচ্ছেন তা কি আদৌ কখনো সম্ভব?আমি কখনো আপনার কাছে যাবো না।”
“না আসলে তাহলে সুবাহা এবং মেয়েটার ক্ষতি হবে।চয়েজ ইজ ইওরস”
“নিজেকে জানোয়ারের পর্যায়ে নিয়ে যাবেন না। এটা ভুলতে বাধ্য করবেন না যে আমি আপনাকে ভালোবাসতাম।আপনার সকল কাজ ক্ষমা করেছি।তাই বলে মাথায় উঠবেন না আরিয়ান।”
“মাত্র ২৪ ঘন্টা।তারপর এগুলো ভাইরাল।ভেবেচিন্তে ডিসিশন নিবে।”
,
,
,
মেহেরিমাকে বুকে নিয়ে দোলনায় দুলছে সুবাহ।শান্ত,স্থির দৃষ্টি।রাতের অন্ধকারে চোখগুলো চকচক করছে।নিজের বৃদ্ধা অঙুলি মুখের ভেতর রেখে ঘুমিয়ে আছে মেহেরিমা।
“বাবু ঘুমিয়েছে?”
“হুম।”
আরিয়ানের দিকে তাঁকালো না সুবাহ।আস্তে ধীরে বাচ্চাটাকে বুকে নিয়ে দুলছে।
“বাবুকে নিয়ে ভেতরে যাও সুবাহ।বাবু নর্মালে হয়েছে তাই তোমার এত বাহাদুরি।যদি সি সেকশনে হতো তখন বুঝতে।”
“আরিয়ান!”
“বলো।”
“আপনি না জীবনে অনেক বড় একটা শাস্তি পাবেন।”
“কেন?আমি আবার কি করলাম?”
“জানিনা।”
“তাহলে এরকম কথা কেন বলো?বাবুকে আমার কোলে দেও।”
“উহু।থাকুক।আমার শরীরের ওম নিচ্ছে।যেটা ওকে ভবিষ্যতে শক্তি দিবে।যখন আমি না থাকবো।”
“কেন তুমি কোথায় যাবে?”
“অসীমে!”
“অসীমে” দীর্ঘ তিন ঘন্টা যাবত এই শব্দটা আরিয়ানের মস্তিষ্কে বারি দিয়ে চলেছে।এখন চলছে বসন্তকাল।তাও পরিবেশটা যেন কেমন গুমোট ধরানো।মেহেরিমা অনেকক্ষণ যাবত কান্না করে চুপ হয়ে গিয়েছে।তাকেই বুকে জড়িয়ে গেটের একপাশে বসে আছে আরিয়ান।সামনের খোলা মাঠে কারো জানাযা পড়নো হচ্ছে।যার ইমাম তার নিজের বাবা।কিন্তু তাকে জানাযায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি।ছোট্ট মেয়েকে বুকে নিয়ে জানাযার শেষ দৃশ্য পর্যন্ত দেখে গেল আরিয়ান।
যে বাড়ীতে আনন্দের জোয়ার ছিল সে বাড়ীতে আজ বিয়োগের ছায়া।ঘুরেফিরে সমস্ত কিছু দেখছে আরিয়ান।প্রাচীন আমলের বাড়ী হওয়াতে অনেক বড় একটা উঠান।উঠানের একপাশে কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে আরিয়ানের শাশুড়ী আফিয়া।বুকে একমাসের ছোট ছেলেকে নিয়ে শাশুড়ীর শুশ্রূষা করছে মায়া।তার পাশে দিহা বসে আছে।যে মৃত মানুষটাকে দেখার পর এক চিৎকার দিয়ে আর কিছু বলেনি।পুরো বাড়ীতে কান্নার রোল পরে গিয়েছে।
আজ সকালে স্বাধীন বাগান বিলাস করতে বের হয়েছিল।ছাদের কাছে বাগানের মধ্যে আসতেই দেখতে পেলো রক্তের স্রোতধারা।হন্তদন্ত করে রক্তের উৎসের কাছে গেলে দেখতে পায় উল্টো হয়ে সুবাহ শুয়ে আছে।একদম নিথর।রক্তগুলো জমাট বাঁধতে শুরু হয়েছে অনেকক্ষণ।চিৎকার করে লোক সমাবেত করেও কিছু করতে পারেনি কারণ ততোক্ষণে দেহ ঠান্ডা হতে শুরু হয়েছিল।
অদ্ভুত মোহনীয় উচ্চারণে কালেমা পড়ে সুবাহার লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।দিহানের ইচ্ছা অনুযায়ী এখানের পারিবারিক কবরে সুবাহকে দাফন করা হবে।কারণ শহরে যেতে অনেকসময়।এতসময় লাশ রাখা ঠিক হবেনা।খাটিয়ার একপাশে দিহান ধরেছে অন্যপাশে সুবাহার বাবা মাসুদ সাহেব।লোকটা একটা কথাও বলেনি সুবাহার লাশ দেখে কিন্তু তার চোখদুটো অন্যকিছু বলে দিচ্ছে।প্রাণপ্রিয় বোনের বিয়োগব্যাথা সইতে পারছেনা দিহান।কবরস্থানের দিকে এগিয়ে চলেছে সমস্ত সমাবেত।মেহেরিমাকে কোলে নিয়ে উঠে দাড়ালো আরিয়ান।ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে সুবাহার অসীমযাত্রার সাথে।পিছন থেকে মায়ার ডাকে ফিরে তাকালো আরিয়ান।বাচ্চা কোলে দাড়িয়ে আছে মায়া।চোখে আলাদা ধরণের ঘৃণাভাব।
“ও ছোট বাচ্চা।আপনার যেখানে যাওয়ার সেখানে চলে যান কিন্তু বাচ্চাটাকে দিয়ে তারপর যান।”
আরিয়ান কোন প্রতিবাদ করলো না।চুপচাপ মেহেরিমাকে মায়ার কোলে দিয়ে দিল।মায়ার একপাশে আবরিশাম।তো অন্যপাশে মেহেরিমা।
মেহেরিমা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পিছন ফিরে সামনে এগিয়ে যাওয়া জনসমাগমের দিকে এগিয়ে চলল আরিয়ান।দুই বাচ্চা কোলে নিয়ে সেদিকে এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে থাকলো মায়া।কেন যেন তার মনে হচ্ছে কারো প্রায়শ্চিত্ত শুরু হয়ে গেল।অন্ততকালের প্রায়শ্চিত্ত।
,
,
,
দিহান ভাই,
এ ম্যাসেজটা যখন পাবে তখন হয়তো আমি রুহু হয়ে আর্তনাদ করছি।বিশ্বাস করো আমি বিয়ের আগ পর্যন্ত জীবনে অনেক সুখ পেয়েছি।কিন্তু বিয়ের রাত থেকে আরিয়ান আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতো।প্রথম প্রথম ভাবতাম এগুলো ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু সময় যায় তা আর ঠিক হয়ে উঠেনা।বাবাকে বললে বাবা নিজের ইলেকশন এর দোহাই দিতো।মা কে বললে মা নির্বিকার থাকতো।বাবার জন্য হয়তো।দিহা এবং তোমাকে বলতে পারতাম না।তোমাদের নিজেদের জীবন তখন ঝড়ের কবলে।হায়!তখন যদি জানতাম সেই ঝড়টা আরিয়ান।আমি আত্নহত্যা কখনো করতাম না।কিন্তু আজকে তোমাদের এবং আরিয়ানের কথায় করতে বাধ্য হলাম।বাবু যখন পেটে আসে তখন প্রথম সে আমাকে মারে।তুমি আর মায়া ভাবী তখন ইতালিতে।আমি নিয়তি মেনে চুপ করে ছিলাম।তারপর থেকে প্রায়ই হাত তুলতো আমার উপর।আমি বিভিন্নভাবে মাইন্ড টর্চার করে তার থেকে আরিয়ানের উপর প্রতিশোধ নিতাম।হাতে মারতে পারতাম না এজন্য।তাই বলে আরিয়ান যে আদর করতো না এমন নয়।বেশ কেয়ার করতো আমার।মেহেরিমা জন্ম নেওয়ার পর খুব খুশী ছিল।ভেবেছিলাম মেয়েটার জন্য হয়তো সবঠিক হবে।তার আর মায়া ভাবীর সম্পর্কটাকেও মেনে নিয়েছিলাম।কিন্তু নিয়তি অন্যটা ছিল।আমি কম্প্রোমাইজ করলেও আরিয়ান করেনি।মায়া ভাবীকে পাওয়ার জন্য কি জঘন্য শর্ত দিলো আরিয়ান।নিজের সন্তানকে অস্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করলো না।তুমি বলবে আমি শিক্ষিত মেয়ে।চাকরী করি। আরিয়ানকে ছেড়ে দিলে কিছুই হতোনা।উহু!আত্নহত্যা শিক্ষিত আর অশিক্ষিত দিয়ে হয়না।মানুষের যখন মনের মৃত্যু হয় তখন আত্নার মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে।মেহেরিমাকে কখনো ওর বাবার কাছে যেতে দিওনা।পারলে তোমার কাছে রেখো।
ম্যাসেজটা এখানে শেষ হয়ে যায়।আরো কথা হয়তো সুবাহ লিখতে চেয়েছিল।কিন্তু লিখতে পারেনি।গত আঠার বছরে এই ম্যাসেজটা রোজ নিয়ম করে পড়ে দিহান।তাও কষ্টটা ঠিক প্রথমবারের মতো মনে হয়।জানালার পাশে বসে আছে দিহান।পাশে মায়া।দুজনের চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্টত।পিছনে বসে আছে আবরিশাম এবং মেহেরিকা।দুজনেই এখন আঠার বছরের যুবক-যুবতী।তার পাশে মায়া ও দিহানের দ্বিতীয় সন্তান মওফি বসে রয়েছে।তারা চলছে মায়ার নানুর বাড়ী।যেখানে সুবাহার কবর রয়েছে।প্রায় দশ বছর পর সুবাহার কবর দেখবে তারা।এতোদিন সকলে লন্ডনে ছিল।
“মেহের বিলাই!”
“রিশাম!ছাগল আপনি যদি ওখানে গিয়ে বিলাই বলেন তাহলে আপনার কপালে হকিস্টিকের বারি আছে।ঠিক যেরকমভাবে স্বাধীন আঙকেলকে মা দিয়েছিল।পটাশ,পটাশ।”
“আমার শখের পার্শিয়ান ধলা মেহের বিলাই।”
“দিহান!আবরিশামকে কিছু বলেন।ছেলেটা ঠিক আপনার মতো হয়েছে।”
“আমার মতো হবে না তো তোমার মতো হবে মায়া বিলাই?”
“ঢং করেন।আবরিশাম বেশী বুঝলে মেহেরের বিয়ে এক বিল্লুর সাথে দিয়ে দিবো।”
“এই না মা।আমাকে বিয়ের আগে সতানের ভয় কেন দেখাও?”
পাশে থেকে খিটমিট করে হেসে দিলো ত্রয়োদর্শী একটা মেয়ে।
“ওইযে হাসে মেহেরের চামচা মওফি ম্যাঠাম।”
“ভাইয়ের বাচ্চা ভাই।তুমি তো এটাও জানোনা ওটা সতীন নাকী সতান।মেহেরজান তুমি জানো ইন্সটাতে না অনেক সুন্দর একটা ছেলেকে দেখেছি।তুমি দেখবে?”
“অবশ্যই মওফিজান।”
“চুপ।বেশী কথা বলিস দুটো।দুটোর কান ধরিয়ে রাস্তায় দাড়া করিয়ে রাখবো।চুপ করে বস।”
আর একটা কথাও কেউ বলেনা।চুপচাপ গাড়ী চলতে থাকে পথ চিঁড়ে।
মেহেরিমা দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে এক কেউ একজন তার মায়ের কবরের পাশে দাড়িয়ে আছে।তার পড়নে প্রাচীনকালের ব্রিটিশদের মতো পোশাক।পকেটে হাত রেখে তার মায়ের কবরকে দেখে চলেছে।
নিকষ কালো অন্ধকার চারপাশে।ছোটোবেলা থেকে মেহেরিমার রাতে বের হওয়ার স্বভাব।একা একা।ঠিক একা একা নয়।তার আশেপাশে সবসময় আবরিশাম থাকে।এজন্যই মেহেরিমা সাহস পায়।আজকেও পেয়েছে।এত রাতে কবরস্থানে একটা লোক দাড়িয়ে আছে বিষয়টা বোধগম্য হলোনা মেহেরিমার।হুট করে তার মনে হলো এটা তার বাবা হতে পারে।বাবাকে সে কখনো দেখেনি।লোকে বলে তার মা যেদিন মারা যায় সেদিন তার মায়ের লাশের সাথে তার বাবাও বের হয়ে যায়।আর ফিরেনি।সবাই জানে তার বাবা ডেনমার্কে আছে।তার দাদুর আহাজারিতেও সে আর দেশে আসেনি।একা একা ওখানে থাকে।মাঝেমধ্যে তার রিশা ফুপ্পি গিয়ে দেখা করে আসে।কিন্তু আজ পর্যন্ত মেহেরিমার সাথে দেখা করতে আসেনি।মেহেরিমা সব জানে তার বাবা সম্পর্কে।তারপরও কেন যেন বাবার সাথে দেখা করার কথা বলার তার প্রবল ইচ্ছা।তার মামী-মামা কোনকিছু কখনো কম রাখেনি।তবুও বাবা-মা আলাদা হয়।
সাহস করে এগিয়ে গেল মেহেরিমা।কবরস্থানের গেট ধরে দাড়িয়ে পড়লো।একটু দূরে লোকটা দাড়িয়ে আছে।চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পারছে মেহেরিমা।
“মেহেরিমা!মাই ডটার!”
নিস্তব্ধ রাতে এই পুরুষালী কণ্ঠস্বরে কেঁপে উঠলো মেহেরিমা।চোখে নোনাজলের আবাস।সে ঠিক ভেবেছিল।এটা তার বাবা।তাও কাছে গেলনা।চুপচাপ গেট ধরে দাড়িয়ে থাকলো।কোন জবাব না পেয়ে আরিয়ান আবার বলল,
“মেহেরিমা!মাই ডটার।কেমন আছো সোনা?”
কথাগুলো আরিয়ান মেহেরিমার দিকে এগোতে এগোতে বলল।
অস্পষ্টত স্বরে মেহেরিমার মুখ থেকে বের হয়ে আসলো,
“বাবা!”
“হুম বাবা।”
আরিয়ান গিয়ে মেহেরিমার মাথায় হাত বুলালো।মেয়েটা দেখতে একদম ওর মায়ের মতো হয়েছে।সুবাহ!আজকে বেঁচে থাকলে আর ভাবেনা আরিয়ান।হাসিমুখে মেয়েরদিকে তাকায়।
“কেমন আছো?”
“আপনি কি সত্যি আমার বাবা?”
“হুহ।তোমার মাকে দেখতে প্রতিবছর আসি।এবার তোমরা এসেছো জানতাম না।”
পিছনে একটা শব্দে সেদিকে ঘুরে তাকায় আরিয়ান ও মেহের।মায়া,দিহান ও আবরিশাম দাড়িয়ে রয়েছে।আরিয়ান ওদের দেখে কিছু বলল নাহ।
“মেহেরিমা।আমি প্রায়শ্চিত্ত করছি।তোমার মায়ের সাথে করা পাপের শাস্তি কখনো হয়তো শেষ হবেনা ইহজন্মে।আমি এখন আবার চলে যাবো।আমার নিজের জাহান্নামে।বিশ্বাস করো একাকিত্বের থেকে বড় শাস্তি এ দুনিয়াতে আর কিছু নেই।”
সকলে চুপ করে শুনছে আরিয়ানের কথা।দিহান কিছু বলছেনা।হয়তো কিছুর বলার নেই।আঠারো বছর আগে হলে খুন করে রাখতো আরিয়ানকে।দিহানের দিকে এগিয়ে এসে আরিয়ান বলল,
“দিহান ভাই।আমি আজকেও বলবো আমি সারাজীবন মায়াকে ভালোবেসেছি।কিন্তু কাঁদছি এবং কাঁদবো সুবাহার জন্য।তা আজীবন।মায়া তোমাকে কিছু বলবো না।তোমাকে পাওয়ার নেশাতে আমি এমন করেছিলাম।এদিকে যে আমার কহিনুর আমাকে রেখে চলে যাবে তা বুঝিনি।”
আর কোন কথা বলল না আরিয়ান।মেহেরিমার কাছে এসে তার মাথায় আরো একবার হাত বুলিয়ে দিল।
“আবরিশাম।ওকে ভালোবেসো সবসময়।”
কথাটা বলে সুবাহার কবরে কিছুসময় তাকিয়ে থেকে হাঁটা শুরু করলো আরিয়ান।পিছন থেকে অনেকবার ডাকলো মেহেরিমা কিন্তু একবারও থামলো না।অন্ধকারে মিলিয়ে গেল আরিয়ান।মেহেরিমা একবার তার পিছনে যেতে নিলে আবরিশাম তাকে থামিয়ে দিল।
“আবরিশাম!মেহেরকে নিয়ে বাড়ীতে যাও আমি আর তোমার মা পরে আসবো।মওফি বাড়ীতে একা।”
“জ্বী বাবা।”
আবরিশাম মেহেরিমাকে নিয়ে চলে গেলে।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল দিহান।
“বিলাই বউ চলো হাঁটি।”
গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে চলেছে দিহান ও মায়া।আকাশে শুক্লপক্ষের চাঁদ।চারপাশে মৃদুমন্দ বাতাস।
“দিহান।মেহের কাঁদবে আমাদের উচিত বাড়ী ফিরে যাওয়া।”
“আবরিশাম ওকে সামলে নিতে পারবে।”
“বেশী পেতে গেলে জীবনে কিছুই পাওয়া হয়ে উঠেনা তাই নাহ?”
“হুম।আরিয়ান তার সবথেকে বড় উদাহরণ।ও ওর জীবনে অনেক বড় শাস্তি ভোগ করছে।”
“হুম।আচ্ছা দিহান আপনি ভেনিসে থাকতে বলেছিলেন একবার আমাদের বিয়ের বিশতম বছরে আপনি বলবেন কেন আপনি এসেছিলেন আমার কাছে সেদিন রাতে।”
“শুনতে চাও মনোহরোণী?”
“হ্যাঁ।”
“জানো সেদিন রাতে আয়শা আমার স্বপ্নে এসেছিল।এবং আমার হাতে হলুদ এবং গোলাপি চন্দ্রপ্রভা দিয়েছিল।দিয়ে বলে যেকোনো একটা রাখতে আরেকটা সে নিজের কাছে নিয়ে যাবে।আমি হলুদটা রেখেছিলাম।তখন আয়শা বলে খুব দ্রুত আমি কাউকে হাড়াবো এবং কাওকে পাবো।তখন তুমি অসুস্থ ছিলে।তাই ঘুম ভেঙে গেলে তোমার কাছে গিয়েছিলাম।এবং সে রাতের মিলনের ফল হলো আমাদের আবরিশাম।”
“হলুদ চন্দ্রপ্রভা ছিল আবরিশাম এবং গোলাপি চন্দ্রপ্রভা ছিল সুবাহ।”
“হয়তো।”
হুট করে দিহান থেমে গেল।মায়াকে সামনে এনে তার মুখের দিকে দৃষ্টিবন্ধ রাখলো।
“মাধুরীলতা!আমার জীবনে মধুর বর্ষণ করতে এসেছিলে।তোমাকে প্রথম দেখায় নিজের করে নেওয়ার তীব্র বাসনা সৃষ্টি হয়েছিল।তা এখনো বহমান।আজও প্রতিরাতে আমি তোমাকে নতুন করে আবিষ্কার করি।এ জন্মে হয়তো কোনোনা কোন দূরত্ব থেকে গেল।ওয়াদা করো জন্মের অপরপাশে কোন দূরত্ব থাকবেনা।”
“ওয়াদা রইলো। আজীবনের ওয়াদা”
(সমাপ্ত)