Home "ধারাবাহিক গল্প "চিরদিনই তুমি যে আমার চিরদিনই তুমি যে আমার পর্ব-০৩

চিরদিনই তুমি যে আমার পর্ব-০৩

0
1

#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূরা_ফাতেহা
||০৩||

খাওয়া-দাওয়া পর্ব শেষ হতে ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

আযরাফ খালি ট্রে-টা টেবিলের একপাশে রাখল। তারীন তখনো ওর কোলেই বসে আছে—ঠিক যেন কোনো বিপন্ন, ভীত ছোট পাখি। আযরাফ তারীনের মুখের দিকে তাকাল। তারীনের ফর্সা দুটি গালে এখনো কান্নার শুকিয়ে যাওয়া দাগ। আযরাফ একটু ঝুঁকে নিজের ডান গালটা তারীনের গালে হালকা করে ঘষল। তারীনের শরীরটা শিউরে উঠল। আযরাফ তারীনের কপালে গভীর একটি চুমু খেলো।

তারীন মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল,

— “আমি একটু আব্বু-আম্মুর কাছে যাবো।”

আযরাফ তারীনের পিঠে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে শান্ত গলায় বলল,

— “যাবে তো, সো*না পাখি। কিন্তু তার আগে তোমার শরীরটা তো একটু সুস্থ হতে হবে। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছ একবার? ঠিকমতো হাঁটাচলাও তো করতে পারছ না।”

— “তবুও আমি যেতে চাই,আমার মা-বাবার সাথে কথা আছে।”

আযরাফ সে কথায় কান না দিয়ে বলল,

— “এখন অত জেদ করে না। আগে নিজেকে একটু গুছিয়ে নাও, ফ্রেশ হয়ে নাও। এসো, আমি তোমাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ভালো করে গোসল করিয়ে দিই। গায়ের জ্বরটাও কমবে।”

কথাটা শোনামাত্রই তারীনের যেন গায়ে আগুন ধরে গেল। সে আযরাফের বুক থেকে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চিৎকার করে উঠল,

— “গোসল করব না! একদম ছুঁবেন না আমাকে! নিজের হাত সরান আমার ওপর থেকে!”

আযরাফ তারীনের এমন অবাধ্যতা দেখে রাগল না, বরং তার সিগারেট খাওয়া পুরু ঠোঁটে ফুটে উঠল হাসি। সে তারীনের থুতনিটা আলতো করে ধরে বলল,

— “ওরে আমার জাদুপাখিরে! রাগলে তোমাকে যে কী অদ্ভুত সুন্দর লাগে, তা কি তুমি জানো? আর শোনো আমি না ধরলে তোমাকে কে ধরবে বলো তো? তুমি তো শেষ পর্যন্ত আমারই বউ, তাই না?”

তারীন চোখ দুটো বড় বড় করে তাকাল। আযরাফের এই স্বাভাবিক, শীতল ভাবভঙ্গি তাকে ভেতর থেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারছে। সে দন্তকপাটি চেপে বলল,

— “জোর করে একটা মেয়েকে তুলে এনে বিয়ে করেছেন। গায়ের জোরে স্বামীর অধিকার ফলাচ্ছেন। এসব করলেই কি আমি মনের দিক থেকে আপনার বউ হয়ে গেলাম? কখনোই না!”

আযরাফ তারীনের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার ধূসর চোখের গভীরতা যেন মুহূর্তে বেড়ে গেল বহুগুণ। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে খুব নিচু আর বিষণ্ণ এক কণ্ঠে বলল,

— “হ্যাঁ, তুমি আমারই বউ। জন্ম-জন্মান্তরের বউ। তুমি মানো আর না মানো, তোমার এই রূপ, তোমার এই কান্না, তোমার এই অস্তিত্ব সবকিছুর ওপর কেবল আমারই অধিকার। এই অধিকার আমি পৃথিবীর কাউকে ভাগ দিতে পারব না। অনেক কথা হয়েছে। এখন একদম চুপচাপ থাকবে। আমি তোমার ফ্রেশ হওয়ার ব্যবস্থা করছি। এই জামাকাপড়গুলো বদলে নতুন কাপড় পরা দরকার। শরীরের ওপর দিয়ে যা গেছে, তাতে বিশ্রাম আর পরিচ্ছন্নতা খুব জরুরি।”

তারীন কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই আযরাফ তার ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরে বলল,

— “আর একটা কথাও নয়, শ্রাবণকন্যা। আমার কথা না শুনলে কিন্তু শাস্তি দেওয়ার অন্য উপায়ও আমার জানা আছে।”

তারীন আর কথা বাড়াল না। তার চোখ দিয়ে নীরব জলের ফোটা গড়িয়ে পড়ল। আযরাফ তাকে আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। ঘরের কাঠের মেঝেতে তাদের পদক্ষেপের শব্দ আর বাইরে জানালার বাইরে ঝরতে থাকা হালকা বৃষ্টির শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত করুণ সুর তৈরি করল।

————–

বাথরুম থেকে বের হওয়ার পর ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত, ভারী নিস্তব্ধতা জমে রইল। তারীন বিছানার এক কোণে হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। তার লম্বা ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। সেই পানির ফোঁটাগুলো পিঠের সূতি কাপড়ে পড়ে ছোট ছোট ভেজা ছোপ তৈরি করছে। শরীরটা এখনো দুর্বল, কান দুটো কেমন যেন ভোঁ ভোঁ করছে।

আযরাফ একটি শুকনো, বড় তোয়ালে হাতে নিয়ে তারীনের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। তোয়ালেটা তারীনের মাথার ওপর মেলাতেই এক চিলতে ভেজা চুলের সুবাস আযরাফের নাকে এসে লাগল একদম বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধের মতো। আযরাফ খুব ধীর গতিতে, তোয়ালে দিয়ে তারীনের চুলগুলো মুছতে লাগল। সে তাড়াহুড়ো করছে না। তার হাত খুব সাবধানী, যেন সামান্য একটু জোরে টান লাগলেও এই কাচের পুতুলের মতো মেয়েটা ভেঙে যাবে।

তারীন নিঃশব্দে চোখ দুটো বুজে রইল। আযরাফের এই নীরব যত্নটুকু তাকে স্প*র্শ করছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরের জমে থাকা অভিমান আর অপমানের মেঘটুকু কাটতে দিচ্ছে না। মাঝে মাঝে মানুষের অতিরিক্ত ভালোবাসাও দমবন্ধ করা এক ধরনের কারাগার মনে হয়। তারীনের কাছে এখন এই ঘরটা, এই মানুষটা ঠিক তেমনই এক কা*রা*গা*র।

তোয়ালের ঘর্ষণে তারীনের মাথাটা হালকা এপাশ-ওপাশ দুলছে। আযরাফ চুলে তোয়ালে পেঁচাতে পেঁচাতে খুব নিচু স্বরে বলল,

— “চুল ভালো করে না শুকালে আবার ঠান্ডা লেগে যাবে। তোমার গা কিন্তু এখনো হালকা গরম।”

তারীন কোনো উত্তর দিল না। সে বিছানার চাদরের একটা কোণা শক্ত করে মুঠোর ভেতর চেপে ধরে রইল।

এদিকে নিচতলার ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত গম্ভীর পরিবেশ।

সোফায় চশমা হাতে বসে আছেন আশরাফ চৌধুরী। ওনার ঠিক সামনেই অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন ওনার বোন লোকসানা চৌধুরী। কিছুক্ষণ পরপরই লোকসানা বেগম সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। ওনার মুখে চিন্তার স্পষ্ট রেখা। নতুন একটা মেয়ে কাল রাতে এই বাড়িতে এসেছে, তাও শুনলেন নাকি মেয়েটার শরীর ভালো নেই, হালকা জ্বর। বাড়ির বড় মানুষ হিসেবে ওনার মন মানছে না।

লোকসানা বেগম দাঁড়িয়ে পড়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— “দাদাভাই, আমি একটু ওপরে গিয়ে মেয়েটাকে দেখে আসি? আহা রে, নতুন পরিবেশ, শরীরটাও নাকি খারাপ। আমি গিয়ে একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে মেয়েটা হয়তো একটু ভরসা পাবে।”

আশরাফ চৌধুরী চশমাটা চোখের ওপর বসিয়ে বোনের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর মৃদুভাবে মাথা নাড়িয়ে বললেন,

— “না লোকসানা, এখন ওপরে যাওয়ার দরকার নেই।”

লোকসানা বেগম একটু অবাক হয়ে বললেন,

— “কেন দাদাভাই? বাপের বাড়ি ছেড়ে এসেছে, অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, আর আমরা নিচে বসে থাকব? আযরাফ ছেলেটা তো গম্ভীর, ও কি আর এসব সেবা-যত্ন বোঝে?”

আশরাফ চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার অভিজ্ঞ চোখ দুটো অনেক কিছু দেখতে পায় যা সাধারণ মানুষ দেখে না। তিনি চায়ের কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে নিচু কণ্ঠে বললেন,

— “সব সেবা ডাক্তার আর ওষুধে হয় না লোকসানা। ওদের ওপর দিয়ে গতকাল ঝড় গেছে। আযরাফ যেভাবে মেয়েটাকে আঁকড়ে ধরেছে, তাতে ওদের দুজনের মধ্যে একটা নিজস্ব বোঝাপড়া তৈরি হওয়া খুব দরকার। এই নিভৃত সময়টুকু ওদের নিজেদের। আমরা মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালে দূরত্বটা কমবে না, বরং আরও বাড়বে। আযরাফকে ওর নিজের মতো করে সামলাতে দাও।”

লোকসানা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। ভাইয়ের যুক্তির সামনে উনি আর কোনো কথা খুঁজে পেলেন না। তবে ওনার মন বলল, এই বন্ধ দরজার ওপাশে দুটো মনের যে টানাপোড়েন চলছে, তা অত সহজে মেটার নয়। উনি ধীরে ধীরে সোফায় গিয়ে বসলেন এবং নিঃশব্দে এক অজানা আশঙ্কায় ওপরতলার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ওপরের ঘরে,

আযরাফ তোয়ালেটা পাশে সরিয়ে রেখে তারীনের ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে ছড়িয়ে দিল। তারপর হালকা ঝুঁকে তারীনের কানের কাছে গিয়ে খুব ধীর আর গভীর স্বরে ফিসফিস করে বলল,

— “এই নিস্তব্ধতা আমার ভালো লাগছে না, শ্রাবণকন্যা। তুমি অন্তত একটা কথা তো বলো তা সে গা*লিগা*লা*জ*ই হোক না কেন।”

তারীন ধীরেকান্নে ভেজা চোখ দুটো তুলে আযরাফের চোখ বরোবর তাকাল। তারপর বলল,

— “আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারচ্ছি না আর কথা বলার ইচ্ছে শক্তিটাও আমার নেই।” তারীন খুব ক্ষীণ কণ্ঠে বলল।

আযরাফ সামান্য হাসল। তারপর সে বলল,

— “ক্ষমা চাওয়ার জন্য তো ভালোবাসা শুরু করিনি, পাখি। ভালোবেসেছি সারাজীবন এই আ*গু*নেই পুড়ে ছাই হওয়ার জন্য।”

ঘরের কাচের জানালার বাইরে ততক্ষণে হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।

—”তুমি বসো আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসি। চা খেলে শরীরের ব্য*থা কমে।”

—”শরীর ক্ষ*ত তো বাইর হতে দেখা যায় আর ভীতরের কষ্ট কি করে মুছে?”

চলবে,,