#ছদ্মবেশ (পর্ব ৬৪)
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ
এতো খোজাখুজির পর হুট করে আজ ফারিহাকে দেখে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো নিবিড়। ফারিহা বলে ডাক দিলেও সেই ধ্বনি ফারিহার কান অব্দি স্পর্শ করতে সক্ষম হয়নি।
নিবিড় এতোক্ষন তাকিয়ে থাকা মুহুর্তটায় রিক্সা অনেক দুরে চলে গিয়েছে। গাড়ির ভেতর থেকে কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে তুষার,
– ফারিহা আবার কে?
কিন্তু নিবিড় তুষারের কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে বলে,
– পাঁচ মিনিট দাড়া আমি একটু আসছি।
বলেই দৌড়ে রিক্সাটার দিকে ছুটলো নিবিড়। কিছুক্ষনের মাঝে রিক্সার কাছে পৌছে যায় সে। রিক্সার সামনে দাড়িয়ে রিক্সা থামিয়ে বড় বড় কয়েকটা নিশ্বাস নিলো।
নিবিড়কে দেখে চিনতে পারলো ফারিহা। তাই এমন আচরণে কোনো রিয়েক্ট করেনি সে। এতোক্ষন দৌড়ে নিবিড়কে হাঁপাতে দেখে ব্যাগ থেকে পানির বোতল টা বের করে নিবিড়ের দিকে বাড়িয়ে দিলে কিছু পানি পান করে স্বাভাবিক হয় নিবিড়।
ফারিহা বোতলটা নিয়ে বলে,
– আর ইউ ওকে?
নিবিড় অস্থিরতায় প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলে,
– তোমার বাসা কি এখানে?
ফারিহা বলে,
– হুম, এইতো কাছেই। সেদিন তো মা বলেছিলো আপনাকে বাসায় নিয়ে আসতে। কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলেন?
নিবিড় এবার কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলে,
– ওসব অনেক কাহিনি পরে বলবো। এখন তোমার এড্রেস টা দাও।
মা বলেছিলো ছেলেটাকে আবার খুজে পেলে বাসায় নিয়ে যেতে। এরপর ফারিহা নিজেও অনেক খুজেছে তাকে। তাই এড্রেস না দিয়ে বলে,
– এড্রেস দেওয়ার দরকার কি? আমার সাথেই চলুন। আমিও কোচিং শেষ করে বাসার দিকে যাচ্ছি।
কোচিং এর কথা শুনে নিবিড় বলে,
– কোন ক্লাসে পড়ো?
ফারিহা বলে,
– ইন্টারে।
– এবার পরিক্ষা দিয়েছো?
– না সামনের বার দিবো।
নিবিড় আর কিছু জানতে চাইলো না। সব পরেও জানা যাবে। ওদিকে রাজ, তুষার এরাও অপেক্ষা করছে। তাই তাড়া নিয়ে বলে,
– এখন একটা ঝামেলায় পরেছি। তাই তোমার সাথে যেতে পারছি না। এড্রেসটা দাও তারাতারি। বিকেলের দিকে আসবো আবার। তোমার আম্মুকে বলে দিও।
ফারিহা এড্রেস দিলে এর মাঝে তুষারও এসে দাড়ায় তার পাশে। একবার ফারিহার দিকে আরেকবার নিবিড়ের দিকে তাকাচ্ছে সে। কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে হতাশা ভঙ্গিতে বলে,
– নীলা ও নিরা দুজনই একসাথে গাড়ির মাঝে বসে আছে।
তুষারের কথায় ফারিহা কিছু বুঝতে না পারলেও নিবিড় বুঝতে পেরে কিছুটা নিচুস্বরে বলে,
– ও আমার বোনের মতো। ফালতু বকবি না।
তুসারও এবার সিরিয়াস ভাব নিয়ে বলে,
– মেয়েটা কে?
ফারিহার থেকে বিদায় নিয়ে তুসারকে নিয়ে হাটা ধরে নিবিড়৷ ফারিহা অবাক হয়ে চেয়ে রইলো দুজনের কান্ডে। মনে টেনশন ঢুকে গেলো তার। কাকে এড্রেস দিয়েছে? কোনো বাটপারের খপ্পরে পরতে যাচ্ছে না তো সে? এড্রেস দিলো আর একদিন হুট করে দেখবে বাসার সব কিছু নিয়ে গায়েব। ফারিহার মনে এমন দুশ্চিন্তা জেগে উটলেও আবার নিজেকে বুঝ দেয় যে, না ছেলেটাকে দেখে ভালোই মনে হয়।
নিবিড় হাটতে হাটতে তুষার বলে,
– মেয়েটা কে সেটা পরে বলবো তোকে।
তুসারও তার সাথে হাটতে হাটতে বলে,
– ভাই আমি বুঝতে পারছি না কি করছিস। এবার কোনো ঝামেলায় পরলে কিন্তু আমি নিজেও গিয়ে তোর পিঠে কয়েকটা দিয়ে আসবো মনে রাখিস।
দুজন হাসতে হাসতে চলে গেলো গাড়িটার সামনে। নীলা তখন সবার সামনে চুপ করে রইলো। এসব মেয়ে সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলো না তাকে।
,
,
নীলা ও নিরাকে নিয়ে বাসায় প্রবেশ করলো তারা। নীলাকে দেখে ফরিদা আন্টি ও নীলার বাবার মন খুশিতে নেচে উঠলেও, নিরাকে দেখে তাদের হাস্যজ্জল মুখে আধার নেমে আসে। ফরিদা আন্টি রেগে গেলে রাজ তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
নিলয় অনেক আগেই বাসায় চলে এসেছে। মুখটা গোমড়া হয়ে আছে তার। যেন আজও খুব বড় একটা ক্ষতি হয়ে গেলো। তবে তার এমন বিষণ্নতা বাইরে প্রকাশ করছে না। নিরাকে দেখে রাজের দিকে চেয়ে বলে,
– তাকে কেন বাসায় নিয়ে এসেছো?
রাজ নিরার অসহায়ত্বের কথা বললে নিলয় কিছুটা রাগি দৃষ্টিতে নিরার দিকে চেয়ে বলে,
– এদের তিন জনকেই সহজ সরল পেয়ে ইমোশনাল বানিয়ে আবার কোন কাহিনি সাজাতে এসেছো এখানে?
নিলয়ের কথা শুনে এবার নিরার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সবাই নিলয়ের দিকে তাকালো। আর নিরা খুব অসহায় দৃষ্টিতে রাজের দিকে তাকালো।
যা দেখে নিলয় আবার বলে,
– তোমার এমন মায়া ভরা করুন চাহুনিতে ওদের মন গলানোর চেষ্টা করবে না। আমার দিকে তাকাও। তোমার মত এমন মেয়েদের আমার ভালো করেই চেনা আছে। তাই আমার সামনে বেশি ইনোসেন্ট সাজার চেষ্টা করবে না।
নিলয়ের মুখে এমন কঠোর কঠোর কথা শুনে সবাই হা করে চেয়ে আছে তার দিকে। এটা কি সত্যিই নিলয়?
ফরিদা আন্টি সহ সবাই অবাক হলেও শুধু নিবিড়ের কানের কাছে গিয়ে তুষার ফিসফিসিয়ে বলে,
– হালার উপর মনে হয় আবার জ্বিন ভর করছে।
,
,
অনেক বছর ধরে একটা জিনিস প্যাকেটিং করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলো। সেটা একটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ব্যাগটা কাধে নিয়ে রওনা দিলো ফারিহার থেকে নেওয়া ঠিকানাটার উদ্দেশ্যে।
নিবিড়কে এমন ব্যাগ নিয়ে কোথাও রওনা দিতে দেখলে বাকিরা জিজ্ঞেস করলে নিবিড় বলে, একটা জরুরি কাজে যাচ্ছে। শেষ হলে এসে সব বলবে।
সবাই অল্পতেই বুঝে গেলেও তুষারের মনে ঘটকা লাগলো বিষয়টা। তার মতে, নিবিড় নিশ্চই আবার কোনো মেয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। কথায় আছে, আমি পাপকে ছারলেও পাপ আমাকে ছারে না। বিষয়টা অনেকটাই এমন। এই নিবিড়ের সাথে থাকলে একদিন না একদিন হয়তো ভাগ্যটা খুলেই যাবে।
তাই কোনো কথা ছারা তুষারও বলল তার সাথে যাবে। নয়তো নিবিড়কে যেতে দিবে না সে। মনে মনে বিরক্ত হলো নিবিড়। এই বন্ধু জিনিসটাই এমন। কখনো উপকারি, কখনো মিষ্টি, কখনো হালকা ঝাল, আবার কখনো তিতার চাইতেও বিরক্তিকর। দিন শেষে আবার বিপদে তারাই পাশে থাকে।
তুষারকেও নিয়ে যাওয়ায় একটা শর্ত দিলো নিবিড়। ওখানে গিয়ে যেন আবার কোনো অঘটন না ঘটায়।
,
,
ঠিকানা অনুযায়ি একটা বাড়িতে পৌছে গেলো দুজন। রুশান ও রাজদের মত এতো বড় বাড়ি না। গেট পেড়িয়ে ছোট একটা জায়গার মাঝে একটা তিন তলা বাড়ি। নিচ তলায় তারা থাকে আর উপরের দুই তলা ভাড়া দেওয়া।
তুষার বাড়িটার দিকে একবার চেয়ে অবাক হয়ে বলে,
– এখানে আবার কোথায় আসলি? তুই না বললি তোর কোনো রিলেটিভ নেই?
নিবিড় বাড়ির সামনে গিয়ে বলে,
– চুপচাপ থাকবি। কারণ অনেকেই বকবক পছন্দ করে না। তাছারা আমি নিজেও জানিনা এই বাড়ির মানুষ কেমন?
কেন জানি আজ খুব নার্ভাস ফিল হচ্ছে নিবিড়ের। মানে কোনো কারণ ছারাই যেন আজ হাত-পা কাঁপছে তার। কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি।
দরজার সামনে দাড়িয়ে কলিং বাজালে একটু পর দরজা খোলে ফারহা। নিবিড়কে সেদিন দেখলেও আজ মনে করতে না পেরে বলে,
– তোমরা কারা, আর কাকে চাও?
নিবিড় চুপ করে দাড়িয়ে রইলে পাশ থেকে তুষার একটা চিমটি কাটলে একটু কেঁপে উঠে স্বাভাবিক হয় নিবিড়। যা দেখে ফারহা আবার বলে,
– কারা তোমরা?
নিবিড় এবার কিছুটা নার্ভাস চেহারা নিয়ে বলে,
– জ্বি আমি নিবিড়।
এর মাঝে ফারিহা রুম থেকে বেড়িয়ে মায়ের পাশে এসে দাড়ায়। নিবিড়কে দেখে বলে,
– আরে মা, তোমাকে একটা ভাইয়ার কথা বলেছিলাম না? আবার আজ সকালে তোমাকে বললাম না যে একটা ভাইয়া আসবে। এই হচ্ছে সেই ভাইয়াটা।
ফারহা এবার বুঝতে পেরে তাদের ভেতরে আসতে বলে।
নিবিড় ও তুষার দুজনই ভেতরে এসে সোফায় গিয়ে বসলো।
কিছুক্ষন ওভাবেই বসে রিলো দুজন। তুষার বার বার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে একটু আগে আসা মেয়েটাকে দেকা যাচ্ছেনা বলে। তুষারের এমন হাব ভাব দেখে নিবিড় কারণ জিজ্ঞেস করলে তুষার বলে,
– মেয়েটা কিন্তু দেখতে শুনতে খারাপ না।
নিবিড় একটা হাসি দিয়ে বলে,
– শুনলি না একটু আগে আমাদের ভাইয়া ডেকেছে সে। তাই আমাদের বোন হয়। ওটা কি ভুলে গেলি?
তুষার মাছি তাড়ানোর মতো করে কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বলে,
– ভাইয়া তোকে ডেকেছে। আমাকে তো আর ডাকে নি।
এর মাঝে ভেতর থেকে আবরার-ফারহা দুজনই আসলো সেখানে। তাদের পাশের সোফাটায় বসলো তারা। ফারিহাও নাস্তা নিয়ে তাদের সামনে রেখে মায়ের পাশে গিয়ে দাড়ায়। দুজনের সাথে পরিচিত হয়ে দুজনকে চা নিতে বলে আবরার নিজেও চা হাতে নিলো। সবাই পরিচিত হওয়ার মত কথা বলছে আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে।
এর মাঝে সবার দৃষ্টির আড়ালে তুষার হাতের আঙুল নাড়িয়ে ফারিহাকে ‘হায়’ সূচক একটা ইঙ্গিত জানালো। কিন্তু তেমন একটা পাত্তা না পেয়ে আবার নিচের দিকে তাকিয়ে গোমড়া মুখে চায়ের কাপে চুমুক দিলো।
নাস্তা ও পরিচয়ের পার্ট শেষ হলে আবরার বলে,
– ফারিহার কাছে আমি সব শুনেছি। কিভাবে তোমাদের পরিচয় হয়েছে। আর কেনোই বা আমাদের সাথে দেখা করতে চাইছো। সবই বলেছে আমার। যাই হোক, আমাদের ছেলেটা সেই ছোট বেলায় হারিয়েছে। যখন তার আড়াই বছর বয়স ছিলো। এখন বেচে আছে কিনা তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু তুমি নাকি ফারিহাকে বলেছো আমাদের ছেলেকে খুজে দিতে পারবে। এটা কিভাবে পসিবল?
আবরারের কথা শুনে পাশ থেকে তুষার বলে,
– আঙ্কেল নিবিড়ের নিজেরই তো কোনো বাবা মা নেই। তার বাবা-মা কে সেটা সে নিজেও জানেনা। তাহলে সে কিভাবে আপনার হারিয়ে যাওয়া ছেলে খুজে দিবে?
আবরার এবার কিছু না বলে ফারিহার দিকে তাকালে ফারিহা বলে,
– সে নিজেই তো আমাকে নিশ্চয়তা দিয়েছে যে ভাইয়াকে খুজে দিতে পারবে। আপনাদের সাথে দেখা করতে চায়। তাই তো আমি নিয়ে আসলাম।
এবার নিবিড় চুপ থাকা অবস্থায় ব্যাগ থেকে সেই প্যাকেটিং করা জিনিসটা বের করে আবরারের হাতে দিয়ে কিছুটা জড়তা মাখা গলায় বলে,
– এটা খুলে দেখুন তো কিছু চিনতে পারেন কি না।
আবরার এবার তা হাতে নিয়ে তা আনবক্স করতে লাগলো। খুলে ভেতরে দেখে একটা জামা, একটা প্যান্ট, এক জোড়া ছোট ছোট জুতা, আর একটা হাত ঘড়ি।
আরবার আর ফারহা ওসব দেখে অবাক ভঙ্গিতে দুজন একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। ফারহা সেগুলো হাতে নিয়ে বলে উঠে,
– এগুলো তো আমার সেই ছোট ফাহাদের গায়ে ছিলো সেদিন।
নিবিড় আবার কিছুক্ষন চুপ করে রইলো। কয়েক ফোটা জল গাল বেয়ে ফ্লোরে আছড়ে পরলো। এক মুহুর্তের জন্য যেন নিস্তেজ হয়ে রইলো। কিছু বলার জন্য যেন সেই বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে। কি এক অদ্ভুত অনুভূতি।
কিছুক্ষন নিশ্চুপ হয়ে রইলো সে। চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পরছে তা সে নিজেই বুঝতে পারেনি এতোক্ষন। একটা ঘোরের মধ্য থেকে বেড়িয়ে হটাৎ বুঝতে সক্ষম হলো যে তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। আর আবরার-ফারহা দুজনই চেয়ে আছে তার দিকে।
নিবিড় চুপচাপ মুছে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে তাদের দিকে চেয়ে বলে,
– আমাকে যেই মানুষটা কুড়িয়ে পেয়েছিলো এগুলো তার কাছেই ছিলো। আমি জানার পর এগুলো যত্ন করে এতো বছর নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম।
To be continue………….
#ছদ্মবেশ (পর্ব ৬৫)
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ
সেদিন শপিংমলে আবরার-ফারহার থেকে ছোট্ট ফাহাদ কিভাবে হারিয়েছিলো গল্পটা প্রায় সকলেরই অজানা।
সময়টা ছিলো আজ থেকে বিশ বছর আগে। নির্জনের সাম্রাজ্য তৈরির শুরুর দিকটা। তখন ছেলে ধরা নামে একটা জাল ছড়িয়ে গিয়েচিলো সমগ্র দেশ জুড়ে।
৫-৬ বছরের বাচ্চাদের নিয়ে তাদের ড্রাগসে আসক্ত করা হতো। হাত-পা যে কোনো একটা ভেঙে দিয়ে বিভিন্ন শহরে ছেড়ে দেওয়া হতো। হাত-পা একটা ভাঙা, তার উপর মায়াবি চেহারায় এই বাচ্চাগুলোকে দেখে অনেক মানুষই তাদের সাহাজ্য করতো। সারাদিন তাদের দিয়ে শহরে ভিক্ষা করিয়ে রাতের বেলায় এক জায়গায় নিয়ে রাখতো।
এর মাঝে যারা এসবে পারদর্শী নয় তদের বেচে দেওয়া হতো বিবিন্ন পার্টির কাছে।
তার এই পাচার বিজনেসটা বাইরের দেশের সাথে শুরু হয় কয়েক বছর আগে থেকে। ধীরে ধীরে এখন এরাকে প্রপেশনাল বিজনেস বানিয়ে ফেলেছে সে। কারণ বিনা পুজিতে শত শত কোটি টাকা ইনকাম।
সেদিন আবরার-ফারহার চোখের আড়াল হতেই ফাহাদকে নিয়ে যায় ঐ দলের কজন লোক। মুখ বাধা ছিলো দেখে কেও তাকে চিনতে পারেনি।
আবরার-ফারহা সারা শপিংমল খুজেও আর পায়নি সেই ছোট্ট ফাহাদকে।
ফাহাদকে নিয়ে লোকটা তাদের আস্তানায় গেলে ওখানকার লিডার এই ছোট্ট ছেলেটাকে দেখে তুলে আনা লোকটার উপর ক্ষেপে যায় অনেকটা।
– কোন বাচ্চাকে ধরে নিয়ে এলি? এতো এখনো ঠিক ভাবে মুখে কথাও উচ্চারণ করতে পারে না। আর না একনো ঠিক ভাবে হাটতে শিখেছে। তোদের বলা হয়েছে ৫-৬ বছরের বাচ্চাদের নিয়ে আসতে। যাদের সব কিছু সেখানো যাবে। আর এটার বয়স তো খুব জোড়ে দুই বছর হবে। একে পালতে পালতে বড় করতেও তো আরো দুই তিন বছর লাগবে। নিজের নাম কি সেটাও এখনো বলতে পারবে না। একে দিয়ে কি হবে আমাদের? একটা কাজ ঠিক ভাবে করতে পারিস না।
ফাহাদকে কোলে নিয়ে থাকা লোকটা মাথা নিচু করে বলে,
– মাফ করবেন ভাই। আর এমনটা হবে না। এখন এটাকে কি করবো?
লোকটা আবার বলে,
– কোনো রাস্তায় গিয়ে ছেরে দিয়ে আয়। রাস্তার কুকু’রদের এক বেলা পেট ভরবে। এছারা আর কি বা কাজে আসবে আমাদের।
এরপর ফাহাদকে রাস্তায় ছেরে দিয়ে তারা চলে যায়। একা একা একটা ছেলেকে কাঁদতে দেখে একজন মহিলা সেখান দিয়ে যাওয়ার মুহুর্তে এগিয়ে এসে ফাহাদকে কিছু জিজ্ঞেস করলেও ফাহাদ কিছু বলতে পারেনি। শুধু চিৎকার করে মা মা বলে কাঁদছিলো। মহিলাটার কোনো সন্তান ছিলোনা। মাঝ রাস্তায় এই ছোট ছেলেটাকে দেখে নিজের মাঝে মায়া হলো অনেকটা।
সেই হারানোর দির্ঘ বিশ বছর পর আর সেই ছোট্ট ফাহাদ তাদের সামনে। তবে ফাহাদ পরিচয়ে নয়। তার নতুন পরিচয়, নিবিড়।
নিবিড়ের কথা শুনে নিছুক্ষন নিশ্চুপ হয়ে ছিলো সমস্ত ঘর। তুষার এবার কিছুটা বুঝতে পারছে নিবিড়ের সাথে এদের কিসের সম্পর্ক। তাহলে কি এরাই নিবিড়ের বাবা মা?
কিছুক্ষন নিরব থাকার পর, মায়ের পাশ থেকে মায়ের দিকে তাকিয়ে ফারিহা বলে,
– সব নাহয় বুঝলাম, কিন্তু তোমরা কিভাবে শিউর হলে যে এটাই ভাইয়া?
ফারিহার প্রশ্নে আবার চুপ করে রইলো সবাই। শুধু নিবিড়ের পাশ থেকে তুষার বলে উঠে,
– এ আধুনিক যুগে এসে এমন বোকার মত প্রশ্ন করলে হয়? বাবা আর ছেলের দুজনের DNA টেষ্ট করালেই তো রেজাল্ট পজেটিভ নয়তো নেগেটিভ যেকোনো একটা আসবে।
এতোক্ষন চুপ থেকে হুট করে এমন একটা কথা বলায়, আবরার, ফারহা, নিবিড় সকলের দৃষ্টি কিছুক্ষনের জন্য তুষারের দিকে স্থির রইলো। সবাইকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তুষার কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
– আমি কি কিছু ভুল বললাম?
সবাই চুপ থাকলেও একজন তার কথার সাথে সহমত প্রকাশ করলো। সে হলো ফারিহা। নিরবতা ভেঙে ফারিহা বলে,
– আসার পর থেকে আপনাকে দেখে কিছুটা ফালতু টাইপের মনে হলেও আপনাই এই কথাটায় যুক্তি আছে। আমাদের তো আগে শিউর হয়ে নিতে হবে যে, এটা কি সত্যিই আমার ভাইয়া নাকি। তাই এই ক্ষেত্রে আপনার বুদ্ধিটা খারাপ না।
তুষার বুঝে উঠতে পারছে না, ফারিহা কি তাকে অপমান করলো নাকি তার বুদ্ধির প্রশংসা করলো। বিষয়টা যেন জু’তা মে’রে গ’রু দানের মত হয়ে গেলো।
,
,
বিকেলে রাজের ফোনে একটা কল আসে। ফোনের স্কিনে ভেষে উঠলো রেজওয়ানের নাম। রাজ ফোন রিসিভ করে শান্ত ভাবে বলে,
– কাজ হয়েছে?
রেজোয়ান ওপাশ থেকে বলে,
– জ্বি বস, আপনার অনুমানই সত্যি ছিলো। সাতটা মেয়ে ও ছয়টা ছেলেকে উদ্ধার করতে পেরেছি। তাদেরকে যার যার ঠিকানা মত পৌছে দিয়েছি। যেটুকু বলেছে গতকাল রাতেই সব শেষ করে দিয়েছি। এরপর আপনাকে ফোন দিয়েও পাইনি। মনে হয় বিজি ছিলেন।
রাজ বেশি কিছু না বলে ছোট্ট করে বলে,
– ভেরি গুড। লক্ষ রাখবে যেন কেও কিছু বুঝতে না পারে।
রেজোয়াম ওপাশ থেকে আবার বলে,
– আপনি যেমনটা বলবেন তেমনটাই হবে বস।
ফোন রেখে আবার লেপটপে চোখ রাখে রাজ। ওদিকে বিকেলের হালকা বাতাসে ছাদোর এক পাশে দাড়িয়ে আছে নিলয়। অস্থিরতা যেন ভেতরটা গ্রাস করে নিয়েছে তার।
রুশান তো এখন ঘর থেকেই বেড় হয় না। আর অন্য পুলিশরাও এমন অভিযান চালালে এ’রেষ্ট করে নিয়ে যেত। আর পালাতে চাইলে গুলি করতো।
কিন্তু এখন প্রত্যেকটা লোককে খুব নির্মম ভাবে মা’রা হচ্ছে। সেদিন একটা ছেলে এসে এতোগুলো লোককে, আর গতকাল রাতে আবার কতগুলো লোককে কারা মে’রে চলে গেলো?
কে করাচ্ছে এসব তা এখনো বুঝে উঠতে সক্ষম হচ্ছেনা নিলয়। সারা বছর অন্যদের নিয়ে গেম খেলা নিলয়কেই নিয়ে এখন গেম খেলছে কেউ। এতোদিন নির্জন কোনো প্রয়োজন ছারা দলের লোকদের খোজ খবর নিতো না। কারণ সে ভালোই জানতো যে, নিলয় সব পরিচালনা করছে মানে সব ঠিকঠাকই আছে। বাট এখন হুটহাট করে দলের লোকদের শুধু লা’শের খবরই পাচ্ছে সে। যা নিয়ে সে নিজেও অনেক চিন্তিত আর নিলয়ের উপর ক্ষিপ্ত।
,
,
নিবিড়ের পিঠে কাঁটা দাগ সাথে ছোটবেলায় তার গায়ে থাকা কাপর গুলো সব মিলিয়ে ফারাহার মাঝে আর সন্ধেহ রইলো না নিবিড়কে নিয়ে। এতো বছর পর ছেলেকে খুজে পাওয়ার অনুভূতিটা কেমন তা যেন ফারহা ব্যাতিত আর কারো বোঝার শক্তি নেই।
এতো বছর ধরে যেই ছেলের জন্য চোখের জল ঝড়েছে আজ সেই ছেলে তার সামনে। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে এটা কোনো স্বপ্ন। এই বুঝি চোখ খুললে তা আবার হারিয়ে যাবে।
এটা কি সত্যিই তার ছেলে। মুহুর্তটা কি সহ্যিই বাস্তব? নাকি কল্পনা? একটু পর আবার সব শেষ হয়ে যাবেনা তো?
এতো বছর পর ছেলেকে কাছে পেয়ে অশ্রু শিক্ত চোখে ছেলের কপালে গালে অজস্র চুমু এঁকে দিলো ফারহা। নিবিড়ও কাঁদছে। ফারহা হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিচ্ছে তার।
আবরারও নিজের আবেগকে দমিয়ে রাখতে না পেরে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন নিজের সাথে।
আজ বিশ বছর পর বাবা-মা তার ছেলেকে খুজে পেয়েছে। তাদের এই প্রাপ্তির মুহুর্তটায় শাক্ষি হিসেবে পাশ থেকে অপলক ভাবে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তুষার ও ফারিহা। যেনো প্রথম কোনো কল্পনা আজ তাদের সামনে বাস্তবে রুপ নিয়েছে।
বেশ কিছুক্ষন এভাবে কেটে গেলে নিবিড় অশ্রু মুছে বাবা মায়ের দিকে চেয়ে বলে,
– আমার জীবনের একটাই ইচ্ছে ছিলো আমার বাবা-মা কে কাছ থেকে একবার দেখার। আমার চাওয়াটা পুরণ করেছে সৃষ্টিকর্তায়। আমার আর জীবনে কোনো দুঃখ থাকবে না। কিন্তু তোমরা এতো বছর অপেক্ষা করেছো, আর কিছুদিন কি অপেক্ষা করতে পারবে?
ফারহা এখনো ইমোশন নিয়ে বলে,
– আর অপেক্ষা করতে চাই না। আজ থেকে এখানেই থাকবি তুই। আমার পাশে পাশে থাকবি। যেন সারাদিন তোকে চোখের সামনে দেখতে পাই।
নিবিড় আবার বলে,
– তোমরা না পারলেও তোমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে মা। আরেকটা কথা, আমার ব্যাপারে যেন এখন তোমরা ছারা আর কেও না জানে। সময় হলে সবাই এমনিতেই জানতে পারবে। তোমাদের সবার সাথে আমার যোগাযোগ থাকবে। শুধু যতদিন না আমি বলবো, ততদিন আমি যে তোমাদের ছেলে এটা যেন কেও না জানে। কারণটা তোমাদের পরে বলবো আমি। আমার জীবনের সবটা বলবো তোমাদের। আর তুষার ও ফারিহার কথা রাখতে আমি DNA টেষ্ট করতে রাজি আছি। আমি চাইনা কারো মনে কোনো সন্ধেহ থাকুক।
পাশ থেকে ফারিহা বলে,
– আমায় ভুল বুঝো না ভাইয়া। তোমার এই ফালতু বন্ধুটাই তো DNA টেষ্টের কথা উঠালো। আমিতো সব সময় চাইছিলাম যে আমার ভাইয়াকে খুজে পাই। প্লিজ ভাইয়া আমার কথায় তুমি মন খারাপ করো না। সব কিছুর জন্য স্যরি ভাইয়া।
শেষের স্যরি শব্দটা খুব করুন ভাবে বললো ফারিহা। ফারিহা কথায় কথায় তুষারকে খোচা দেওয়ার তুষার নিজের মাঝে বিড়বিড় করে বলে,
– উপকার করতে চাইলেও এখন সব দোষ আমার।
এতো বছর পর ফ্যামিলিকে কাছে পেয়ে কে বা ছারতে চাইবে তাদের। তবুও নিবিড়কে চলে যেতে হচ্ছে আজ। সবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হতে হতে সন্ধা পার হয়ে গেলো।
ফেরার সময় তুষার বলে,
– এতো বছর পর ফিরে পেলি তাদের। আজই আবার চলে যাচ্ছিস কেন?
নিবিড় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
– আমার লাইফ এখন একটা রিস্কের মাঝে চলছে। তোর কি মনে হয় আমি যার মা’থা কে’টেছি তার দলের অন্যান্যরা আমাকে এমনি এমনি ছেড়ে দিবে? ওরা কোনো না কোনো ভাবে আমার ক্ষতি করবেই। আর আমি চাই না এটার সূত্র ধরে কেও আমার ফ্যামিলির ক্ষতি করুক। তাই না চাইতেও দুরে সরে যাচ্ছি কিছু সময়ের জন্য। তবে বাবা-মাকে তো খেজে পেয়েছি। আমার আর দুঃখ কিসের? এখন ম’রে গেলেও আমার আফসোস থাকবে না।
তুষার এবার বিষয়টা বুঝতে পেরে আর কিছু বললো না। নিবিড়ের মন খারাপ দেখে টপিক চেঞ্জ করে বলে,
– আর যাই বল তোর বোনটা কিন্তু এতো সুবিধার না।
নিবিড় ভ্রু-কুচকে বলে,
– সে আবার কি করেছে?
তুষার বলে,
– যতবার আমায় নিয়ে কথা বলেছে ততবার একটা করে খোচা দিয়েছে। ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি কোন সময় ওর পাকা ধানে মই দিয়েছি।
নিবিড় একটু মুচকি হেসে বলে,
– এমনটা কেন করবে না? চিনিস না জানিস না একটা মেয়েকে দেখেই সেখানে যাওয়ার পর থেকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিলি। আবার মাঝে মাঝে দেখলাম হাত নাড়িয়ে হাই হ্যালো করছিস। তখন ওর জায়গায় আমি হলে তো তোকে জু’তা খুলে মার’তাম।
তুষার এবার একটা ঢোগ গিলে বলে,
– তুই কিভাবে দেখলি এসব!
নিবিড় আবারও হালকা হেসে বলে,
– তোকে আগা গোড়া আমার চেনা আছে। আমার কাছে সাধু সাজতে আসিস না।
তুষার একটা দির্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
– মেয়েটাকে আমার প্রথমে ভালো লাগলেও এখন মনে হচ্ছে যে ওর জামাই হবে তার জীবন তেজপাতা বানিয়ে ছারবে।
নিবিড় হাটতে হাটতে স্বাভাবিক ভাবে বলে,
– রাগী মেয়েদের ভালোবাসাও অনেক গভির হয়।
বলেই সামনে একটা গাড়ি দেখে ডাক দিলো নিবিড়। আর তুষার শেষের কথাটা শুনে চুপ করে রইলো। আসলেই কি তাদের ভালোবাসা গভির হয়?
,
,
বেশ কয়েক দিন পর স্বাভাবিক ভাবে বাইরে বের হলো রুশান। বাড়ির সামনের দোকানটা থেকে দুজন মিলে দু’কাপ চা খেয়ে রাস্তার এক পাশ ধরে হাটছে।
হাটতে হাটতে তাদের কথোপোকথনের মাঝে রুশান বলে,
– আমি ভালোই বুঝতে পারছি নির্জনের লোকদের পাখির মতো মা’রা লোকটা আর কেও না, তুই।
রাজ কিছু না বলে চুপচাপ সামনের দিকে পা বাড়াচ্ছে। রুশান আবার বলে,
– এক দিক দিয়ে ভালোই করছিস। যেমন কুকুর তেমন মুগুর হতে হয়। সারা দেশে ওর পপুলারিটি অনেক বলেই তাকে সরাসরি কিছু করতে পারছি না। প্রথমে তার সম্পর্কে সব কিছুর প্রমান বের করতে হবে। এরপর এ্যা’রেষ্ট ওয়ারেন্ট আসলে সরাসরি তাকে এ্যা’রেস্ট করতে পারবো।
এর মাঝে রুশানকে থামিয়ে দিয়ে রাজ বলে,
– তার মানে বলতে চাইছিস, সব কিছুর মুল সেই নির্জন? আমি তো ভেবেছিলাম সে অন্যের হয়ে কাজ করে।
রুশান এক চিলতে হাসি দিয়ে বলে,
– ও এসব খারাপ কাজ গুলো অন্যদের দিকে করিয়ে নিজে ভালো কাজ গুলো নিয়ে থাকে। তাই ওর ব্যাপারে কেও কিছু জানতে পারেনা। সবাই তার পজেটিভ দিকটাই ভাবে। আর নেগেটিভ কিছু ধরা পরতে গেলেও তা সহজেই আবার ধামাচাপা দিয়ে দেয়। বড় বড় পলিটিক্যাল ব্যাক্তিরাও তার সাথে জড়িত। চাইলেও তার বিরোদ্ধে সরাসরি কিছু করাটা বোকামি। আর করলেও কোনো লাভ হবে না। ও শুধু কিং না, সে কিল ম্যাকার।
রাজ চুপচাপ কিছু না বলে হাটছে। তার মানে আরোহির মা যা বলেছে সবই সত্যি?
রুশান আবার বলে,
– তবে তুই যা করছিস তা আমার মতে ঠিকই করছিস। আইনের তো কিছু লিমিট’স আছে, তাই না? তোর তো আর নেই। যা খুশি করতে পারিস। তবে কেও যেন বুঝতে না পারে। ওসব কিছু তদন্তের সময় বাকিটা আমি সামলে নিবো।
To be continue………..
#ছদ্মবেশ (পর্ব ৬৬)
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ
আজ টিউশনিতে গিয়ে অনেকটাই চমকে গেলো রাজ। ঐ দিন আরোহি হালকা সাজুগুজু করেলেও রাজের কড়া করে কিছু কথা শুনার পর আর এমনটা করেনি।
ইদানিং মেয়েটার উদ্দেশ্য ভালোই বুঝতে পারছে রাজ। তবে এমনটা কিভাবে পসিবল? এতোদিন বিষয়টাকে স্বাভাবিক বাবে নিলেও এখন আরোহির বাবাই তার প্রধান শত্রু হয়ে দাড়ালো।
শত্রুর মেয়েকেই টিউশনি করানো আবার ঐ মেয়ে তার প্রতি দুর্বল হয়ে পরা। আবার আরোহির বিয়ে তার বাবার সাথে কাজ করা একটা ছেলের সাথে ঠিক হওয়া।
সব মিলিয়ে আরোহির শেষটা কোথায় গিয়ে দাড়াবে এটা নিয়ে রাজ নিজেও কনফিউজড। বয়স হিসেব করতে গেলে এখনো বাচ্চা একটা মেয়ে। সবে ১৮ তে পা দিয়েছে। এই বয়সে এসব ফিলিংস যার-তার উপর ইফেক্ট ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। আবেগের বয়স এটা, বিবেক দিয়ে ভাবাটা খুবই কঠিন। নয়তো এত বড় ঘরের মেয়ে হয়ের রাজের কিছু নেই যেনে তার প্রেমে ধরা দিতো না।
নীল শাড়ি পরিহিত এক মেয়ে টেবিলে বসে অপেক্ষা করতে তার টিচারের জন্য। হাতে নীল চুড়ি, একটু পর পর ইচ্ছে করে হাত নাড়া দিলে ঝুমঝুম ধ্বনি তৈরি করে। জীবনে নির্দিষ্ঠ কাউকে উদ্দেশ্য করে প্রথম সাজের অনুভূতি গুলো ভালো ভাবেই নাড়া দিচ্ছে মনের ভেতর।
সেই সাথে টিপটিপ করে হার্ট বিট এর শব্দের সাথে মুখে মিশে আছে অনেকটা ভয়ের ছাপও।
আরোহি কোথায় যেন শুনেছিলো, মানুষ তার পছন্দের জিনিসকে চাইলেও মন থেকে অবহেলা করতে পারেনা। তার এই সাজও তো সবটাই রাজের পছন্দ মতই। নিশ্চই আজকে চাইলেও তাকে অবহেলা করতে পারবে না রাজ। একটা মানুষকে আর কত ভাবে নিজের অনুভূতি গুলো বুঝালে সে বুঝবে?
প্রতি দিনের মত আজও চুপচাপ গিয়ে নিজের আসনে আসলো রাজ। আরোহির এমন অবস্থা দেখেও সেদিকে তেমন একটা গুরুত্ব দিলোনা সে।
রাজের কোনো মনভাব না বুঝে এবার আরোহি নিজে থেকেই বলে,
– আমাকে কেমন লাগছে স্যার?
রাজ বই হাতে নেওয়ায় ব্যাস্ত থেকে বলে,
– হুম ভালো।
আরোহির হাসি মুখটা কিছুটা কুচকে গেলো। কিছুটা বিষণ্নতা মিশ্রিত চেহারায় বলে,
– না দেখেই কিভাবে বুঝলেন সুন্দর? নাকি শুধু মন রক্ষার্থে বললেন? আমাকে কি খুব খারাপ লাগছে যে ভালো মত তাকাচ্ছেনও না।
রাজ এবার বরাবর আরোহির চোখের দিকে চেয়ে কিচুটা বিরক্তি নিয়ে বলে,
– এখানে কি তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতে এসেছি নাকি তোমায় পড়াতে এসেছি? আর তুমিও কি পড়তে বসেছো নাকি নিজের সৌন্দর্য দেখাতে বসেছো?
আরোহির মনটা আরো বিষণ্ন হয়ে গেলো। রাজকে এভাবে চোখের দিকে চেয়ে তাকতে দেখে সে মাথা নিচু করে নিয়ে নরম স্বরে বলে,
– এভাবে রাগি দৃষ্টিতে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। আমার কেমন যেন লাগে। আর আপনার পছন্দকেই আমি সব সময় প্রাধান্য দিই। শুধু আপনার মুখে একটু হাসি দেখার জন্য। এমন গম্ভিরতায় আপনাকে একদম ভালো লাগে না।
রাজ এবার কিছুটা স্বাবাবিক ভাবে তাকিয়ে বলে,
– তোমাকে এক দিন নিষেধ করেছি না আমার সামনে কখনো সাজুগুজু করে আসবে না।
আরোহি এখনো মাথা নিচু অবস্থায় বলে,
– ভেবেছিলাম আপনি খুশি হবেন। আর আপনাকে হাসিখুশি দেখতে আমার খুব বালো লাগে।
রাজ কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,
– তোমাকে হাজার বলেও কোনো লাভ হবেনা দেখছি। কয়েকটা কথা বলবো কান খুলে শুনবে আর চটপট উত্তর দিবে।
আরোহি মাথা এক কাত করে বলে,
– আচ্ছা।
রাজ খুব শান্ত ভাবে বলে,
– তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?
আরোহি কিছুক্ষন চুপ থেকে উপরে নিচে ‘হ্যা’ সূচক স্বম্মতি জানায়। আবার কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাজকে শান্ত দেখে বলে,
– ভা,,, ভালোবাসি আপনাকে।
রাজ হয়তো আগে থেকেই জানতো আরোহি এমন কিছুই বলবে। তাই কিছুটা স্বাভাবিক ভাবে বলে,
– ভালোবাসার মানে বুঝো?
আরোহি কিছুক্ষন চুপ থেকে এখনো মাথা নিচু করে রাখা অবস্থায় বলে,
– ভালোবাসার মানে বুঝি কিনা জানিনা। তবে আমি ভালোবাসি। আপনার সাথে সারাটা জিবন একসাথে পার করে দিতে চাই। একে অপরের ছাঁয়া হয়ে থাকতে চাই সব সময়। এর চেয়ে বেশি কিছুও যদি ভালোবাসার ভেতরে পরে, তাহলে সেটা আমি বুঝতেও চাই না। আমি যতটুকু বুঝি, আপনার সাথে একটি জীবন পার করার জন্য আমার ততটুকুই যথেষ্ট। বেশি কিছু চাই না, শুধু আপনি পাশে থাকলেই হবে।
আরোহির কথা শুনে কিছুক্ষন তার দিকে চেয়ে রইলো রাজ। কিছুক্ষণের নিরবতা ভেঙে রাজ আবার বলে উঠে,
– আমাকে ভালোবেসে জীবনে কি পাবে? সাধারণ জীবন আমার। তোমার এই বিলাশ বহুল জীবন ছেড়ে সাধারণ জীবনে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে? ওবাবে সুখি হতে পারবে?
আরোহি সময় না নিয়ে ঝটপট বলে দেয়,
– আমার বাবা-মায়ের জীবনও তো অসাধারণ। কোনো কিছুর অভাব নেই তাদের। তবুও তো তারা সুখি না। তাহলে আপনিই বলুন শুধু বিলাশ বহুল জীবনেই কি সুখ থাকে? তাহলে আমার মায়ের চোখে কেন আমি পানি দেখতে পাই? জীবনে সুখে থাকার জন্য বেশি কিছু লাগে না। বিশ্বস্ত দুটো হাত হলে কোনো না কোনো ভাবে সারা জীবন পার করে দেওয়া যায়। আর আমি চাই শুধু তেমনই একজন বিশ্বস্ত মানুষ। যে আমায় নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবে। শুধু অসাধারণ জীবনেই যদি সুখ থাকতো তাহলে আমাদের ফ্যামিলিও অনেক হ্যাপি হতো।
রাজ এবার নিজের মাঝেই কনফিউশান-এ পড়ে গেলো। আরোহি কি আবেগেই এসব বলছে? তার কথা বার্তায় তো শুধু আবেগ মিশে নেই। চোখে মুখে ভালোবাসার ছাপও স্পষ্ট।
এর মাঝে কাজের মেয়েটা নাস্তা নিয়ে রুমে হাজির হলো। ট্রে রেখে চলে যাওয়ার মুহুর্তে রাজ তাকে ডেকে বলে, ম্যাডামের মানে আরোহির মায়ের সাথে দেখা করতে চায় ইমারজেন্সি।
মেয়েটা কিছুক্ষণ গম্ভির ভাবে আরোহির দিকে তাকালো। হুট করে এতো সাজ, আবার এভাবে মাথা নিচু করে বসে থাকা, টিচার আবার ম্যাডামের সাথে দেখা করতে চাইছে।
গম্ভিরতা ভেঙে মেয়েটা বলে,
– স্যারের থেকে অনুমতি নিতে হবে।
রাজ বলে,
– অনুমতি নেওয়ার কি আছে। বেশি না, যাষ্ট দু’মিনিট কথা বলেই বেড়িয়ে যাবো৷
মেয়েটা আবার কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,
– আচ্ছা আমার সাথে চলুন। তবে বেশি সময় নিবেন না।
আরোহির মায়ের সাথে রাজের কথা বলার মুহুর্তটায় পুরোটা সময় কাজের মেয়েটা তাদের পাশে দাড়িয়ে আছে। আরোহি দরজার ওপাশে দাড়িয়ে আছে রাজ কেন তার মায়ের সাথে কথা বলতে এসেছে তা জানার জন্য।
বুকের ভেতর হার্ট ধুক ধুক করে বিট হচ্ছে তার।
রাজ খুব শান্ত ভাবেই কথা গুলো বললো যে সে কালকে থেকে আর আরোহিকে পড়াতে আসতে পারবে না। কারণ সে পড়াতে আসলে আরোহির পড়ায় মন বসবে না। সে নিজের মাঝে নিজের আবেগ কে প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছে। সারাক্ষন এসব নিয়ে পরে থাকলে পড়াশুনার অবনতি ছারা কিছুই হবে না তার।
এটা বয়সের দোষ। প্রথম কয়েকদিন খারাপ লাগলেও এরপর মায়া কেটে যাবে।
রাজ চলে যাওয়ার পর থেকে চুপচাপ নিজের রুমে এসে বসে রইলো আরোহি। অনুভূতি গুলো খুব বেশিই বাজে মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে। কাঁন্না গুলো যেন গলায় আটকে যাচ্ছে বারংবার।
হয়তো হুট করে ঘটে যাওয়া এই সিচুয়েশনের জন্য সে একটুও প্রস্তুত ছিলো না।
নীল শাড়ি পরিহিত নিজের সাজ। হাতে নীল কাঁচের চুড়ি গুলোর দিকে তাকালো সে। হাত নাড়ালেই ঝুমঝুম শব্দ করে উছে।
কিছুক্ষন হাত দুটুর দিকে তাকিয়ে থেকে চুড়ি গুলো খুলে ফ্লোরে ছুড়ে ফেলে দিলো সে। এতোক্ষন আটকে রাখা অনুভূতি টা এবার আর আটকে রইলো না। শরির কাঁপিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠে সে।
এদিকে কাজের মেয়েটা ফোন নিয়ে এক পাশে গিয়ে সামিরের নাম্বারে ফোন দের। যার সাথে আরোহির বিয়ে ঠিক করা। ওপাশ থেকে রিসিভ করতেই সে উত্তেজনা নিয়ে বলে,
– আরোহি আপা আজ তার টিউশন টিচারকে মনে হয় প্রপোজ করছে। তাই সে আজ টিউশনি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে।
কথাটা শুনে ওপাশ থেকে সামির বলে উঠে,
– তুমি কি শিউর হয়ে বলছো?
কাজের মেয়েটা তৎক্ষনাৎ বলে উঠে,
– জ্বি ভাইজান।
,
,
হন হন করে রাজের রুমে প্রবেশ করলো রাজ। আজ মনটা বড্ড ফুরফুরে তার। কারণ নিরা নামক ঝামেলাটা মাথার উপর থেকে বিদায় হয়েছে।
নিরার বয়ফ্রেন্ড রাহাতের সাথে কথা হয় রাজের। প্রথমে মানতে না চাইলেও পরে নিজে থেকেই নিরাকে নিয়ে গেলো সে। রাজ এটাও বলে রেখেছে আজকের পর থেকে নিরার কোনো সমস্যা বা ক্ষতি হলে সব দ্বায়-ভার তাকেই দিতে হবে। সব প্রমানই আছে তাদের। রাহাতের ফ্যামিলির সাথেও কথা হয়েছে। দুই দিনের ভেতর বিয়ের ব্যাবস্থা করবে তারা।
এবার নিরার জীবনে কিছুটা সুখ ধরা দিলে তো ভালোই। আর কষ্ট থাকলেও সবই তার কর্মের ফল হিসেবে থাকবে।
ফুরফুরে মন নিয়ে রাজের পাশে বসলো নিবিড়। রাজকে বিষণ্ন দেখে প্রশ্ন করে,
– মুখটা এমন বাংলা পাঁচ এর মত করে রেখেছো কেন?
রাজ বিষণ্নতা নিয়ে কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,
– টিউশনি টা ছেড়ে দিয়েছি। চাইনি বাধ্য হয়েই এমনটা করেছি। চাইনা আরোহির কোনো সমস্যা হোক। হয়তো কয়েকদিন কষ্ট পাবে। এরপর সব কষ্ট দুর করে দিবো। তবুও ওর জন্য খারাপ লাগছে খুব।
নিবিড় কিছুটা সিরিয়াস ভাব নিয়ে বলে,
– একটা জিনিস আমি বুঝলাম না। তোমার এতো কিছু দেখলাম, তবুও কেন তুমি সামান্য টিউশনির ভান করে ব্যাচেলর বাসায় আছো? চাইলে তো কত ভালো ভাবেই থাকতে পারো।
রাজ একটু মুচকি হেসে বলে,
– বলেছিনা, সময় হলে একদিন সব জানতে পারবে, এখন না।
নিবিড় আর কথা না বাড়িয়ে বলে,
– তুমিও কি ঐ মেয়েটার প্রেমে পরেছো?
রাজ আর কিছু বললো না। হাসতে হাসতে প্রশ্নটাকে উড়িয়ে দিলো।
,
,
রুশান সুস্থ হওয়ার পর আবার পূর্বের মত কাজ করে চলছে। গতকাল রাতেও তার টিম নিলয়ের বেশ কয়েকটা লোককে অ’শ্র সয় আটক করেছে। দুজন মা’রাও গেলো গতকাল রাতের মিশনে।
রুশানকে সেদিন রাতে বাসায় ফিরতে না দেখে নিলয় ধরেই নিয়েছিলো আগামি কাল কোনো না কোনো নিউজ তার কানে আসতে চলছে। তাই দেরি না করে বারংবার পিন্টুর নাম্বারে ফোন দিতে থাকে, সব কিছু আজকের রাতের জন্য অফ রাখতে। বাট পিন্টু রিসিভ করেই জানায়, সব চালান আটক হয়ে গেছে। সাথে কয়েকজন লোকও।
ফোনটা মুঠো করে ধরে কিছুটা রাগ নিয়ন্ত্রন করায় ব্যস্ত হলো নিলয়। এবার মনে হয় কিছু একটা করতেই হবে। এভাবে ইমোশন নিয়ে চুপচাপ বসে থাকলে চলবে না।
———-
এক্সামের বেশ কয়েকদিন পার হয়ে যাওয়ায় রিমারা বান্ধবিরা মিলে প্ল্যান করলো বিকেলে সবাই এক সাথে হয়ে সময় কাটানোর। অনেক কষ্টে বাসা থেকে অনুমতি পেয়ে বান্ধবিদের সাথে গেলো রিমা।
সব মিলিয়ে বিকেল টা ভালোই কেটেছে আজ। সন্ধা হলে বাসায় উদ্দেশ্য চলে যায় সব বান্ধবিরা। রিমা বান্ধবির থেকে বিদায় নিয়ে একটা রিক্সা ডাক দিলো।
রিক্সা আসার আগেই একটা কালো গাড়ি এসে দাড়ালো তার সামনে। কিছু বুঝে উঠার আগেই রিমাকে গাড়িতে তুলে উধাও হয়ে গেলো তারা।
মুখ বাধা অবস্থায় ড্রাইবিং করছে নিলয়। পেছনে অন্য আরেকজন রিমার মাথায় একটা পিস্তল ঠেকিয়ে রেখেছে।
রিমা চিৎকার করলে নিলয় বলে,
– লাভ নেই। চিৎকারের শব্দ গাড়ির বাইরে কেও শুনবে না।
গাড়িতে এসি থাকলেও বিন্দু বিন্দু ঘামে থরথর করে কাঁপছে রিমা। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে,
– আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? কারা আপনারা। কি চান আমার কাছে?
নিলয় ড্রাইবিং করতে করতে বলে,
– তোকে এখন আমরা রে’প করবো। এরপর কে’টে ডাস্টবিনের সামনে ফেলে দিয়ে যাবো। কেও বুঝতেও পারবে না। তা যদি না চাস, তাহলে রুশানকে ফোন দিয়ে বলবি আজকের মাঝেই নিজের চাকরি থেকে রিজাইন নিতে। যদি তোকে সুস্থ ভাবে দেখতে চায়।
রিমা চোখ দুটু বড় বড় করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। নিলয়ের মুখ বাধা অবস্থায় থাকায় নিলয়কে চিনতে পারছে না সে।
রিমার পাশে থাকা ছেলেটা রিমার ফোনটা নিয়ে রুশানের নাম্বারে ফোন দেয়।
ওপাশ থেকে রুশান রিসিভ করলেই রিমার কান্না শুনতে পায় সে। উত্তেজিত হয়ে বারংবার ওপাশ থেকে একের পর এক প্রশ্ন করছে রুশান।
আর ছেলেটা একটা ভিলেন হাসি দিয়ে বাজে ভাবে রিমার গাল স্পর্শ করতেই খুব জোড়ে চিৎকার করে উঠে রিমা। ফোনে যে চিৎকার রুশানের কান ভেদ করে ভেতরটাও চুরমার করে দিচ্ছে।
রুশানকে না ছুলো, না ধরলো, না মা’রলো,,,,
তবুও একেবারে ভেতরটায় আ’ঘাত করলো তারা।
To be continue…….