#ছায়াবর্ণ
#মোহনা_মিম
#পর্বঃ২২
নিরাবতার মাঝে সকলে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নানাভাই এর দিকে। আমার হৃদস্পন্দন একপ্রকার থমকে আছে। বর্ণ ভাইয়ের হাত সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় আশ্বাস দিলেন। তবুও শান্ত হতে পারলাম না। ছোট মামা ধৈর্য্য হীন কন্ঠে বললেন–
— আপনি কি সীমান্ত নিয়েছেন বাবা? আমার খুব চিন্তা হচ্ছে, আপনি আবারও একবার ভেবে দেখুন বাবা। বর্ণ খুব ভালো ছেলে, আমাদের ছায়া সুখী হবে।
নানাভাই হাত উঁচিয়ে মামাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন–
— আমার যা সীদ্ধান্ত নেওয়ার তা নেওয়া হয়ে গিয়েছে। আমি সকলের উদ্দেশ্যে বলছি, আগামীকাল আমার বড় ছেলের মেয়ের বিয়ে। আর সেই বিয়ের সাথেই আওসাফ ও তাহসীনার আবার বিয়ে হবে। আমরা সবাই উপস্থিত থেকে তাদের বিয়ে দেব। যারা মন থেকে তাদের জন্য দোয়া করতে পারবেন তারা আসবেন। আর বাকিরা না এলেই আমি খুশি হবো।
আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। নানাভাই মেনে নিলেন! এতো সহজে! সবাই নানাভাই এর সীদ্ধান্তে খুশি হলেন। শুধু মাত্র মুখ কুঁচকে রইলেন সামিয়া আপুর মামি ও তার মামাতো বোন। নানাভাই আবার বললেন–
— এখন যে যার বাড়িতে যেতে পারেন। আগামীকাল বিয়েতে সবার আমন্ত্রণ রইল।
সকলে ধীরে ধীরে স্থান ত্যাগ করলেন। আমি কৃতজ্ঞতার সাথে নানাভাই এর দিকে তাকালাম। নানাভাই এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত রেখে মুচকি হাসলেন মাত্র। অতঃপর চলে গেলেন। মা এবং আন্টি আমাদের টেনে রুমে নিয়ে গেলেন। আন্টি উৎসাহিত হয়ে বললেন–
— বর্ণ! এবার বল তো কবে কীভাবে বিয়েটা হলো?
বর্ণ ভাই সূক্ষ্ম শ্বাস ফেললেন। ক্লান্ত কন্ঠে বললেন–
— মা! তোমাকে এখনই সব শুনতে হবে?
আন্টির দৃঢ় কন্ঠ–
— হ্যাঁ, এখনই সবটা শুনতে চাই আমি।
বর্ণ ভাই বাধ্য হয়ে সবটা বললেন। আন্টি শুনে চোখ বড় বড় করে বললেন–
— তার মানে তুই ছায়াকে জোর করে বিয়ে করেছিস! হায় আল্লাহ্!
বর্ণ ভাই ভাবলেশহীন। তিনি গমগমে কন্ঠে বললেন–
— তোমরা দুই বেয়াইন মিলে গল্প করো। ছায়ার সাথে আমার কিছু দরকার আছে।
— কিন্তু!
তিনি শুনলেন না। আমার হাত ধরে টেনে বের হয়ে এলেন। সোজা টেনে নিয়ে চললেন ছাদে। এতোক্ষণ আমি নির্বাক ছিলাম, মুখ খুললাম–
— মায়েদের সামনে এভাবে টেনে নিয়ে আসলেন কেন? কি ভাবলেন তারা?
— আমার বউকেই তো এনেছি। অন্য মেয়েকে টেনে নিয়ে এলে তখন নাহয় কিছু বলতো।
কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে বললেন–
— এতো ছিঁচকাদুনে কেন তুমি? কে না কে তোমার নামে আজে বাজে কথা বলছে আর তুমি কেঁদে ভাসাচ্ছ! দুই একটা কথা বলতে পারলে না?
আমি মুখ কালো করে বললাম–
— উনি গুরুজন। আমি কীভাবে বলতাম?
— কি পরিমান রাগ উঠেছিল জানো? উনি বড় না হয়ে অন্য কেউ হলে আমি কিছু একটা করে ফেলতাম। এখনও আমার মাথা দপদপ করছে। এতোটা খারাপ কেউ কীভাবে হতে পারে?
আমি ওনার বুকে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। ধীর কন্ঠে বললাম–
— যা হয় ভালোর জন্যই হয়। আজ ওনার জন্যই তো আমাদের বিয়ের কথাটা সবার সামনে এলো। তাই না?
বর্ণ ভাই আর কোনো বাক্য ব্যয় করলেন না। দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করে নিলেন। চেপে ধরলেন বুকের মধ্যিখানে। তার হৃদস্পন্দনের ছন্দের তালে হারিয়ে গেলাম। এভাবেই কাটল কিছু মুহূর্ত কিছু সময়।
—
বউ সেজে বসে আছি। খুবই সাদামাটা সাজ আমার। ছোট মামা কোথা থেকে যেন কিনে এনেছেন আমার পরনের লাল রঙা বেনারসী শাড়ি টা। শাড়ির সাথে হালকা সেজেছি, ভারি সাজ আমার কোনোকালেই পছন্দ ছিল না। অপরদিকে সামিয়া আপুকে টুকটুকে বউ লাগছে। খুব সুন্দর লাগছে তাকে। গ্রামে ক্যামেরা ম্যান পাওয়া যায় না। যে যা পারছে নিজের ফোন দিয়ে ছবি তুলছে। কখনও সেলফি কখনও বা আমাদের দুজনের ছবি। বুকের মধ্যে দুরুদুরু করছে। এতো দিন যে শুধু আমার চোখে আমার স্বামী ছিল সে এখন সবাইকে সাক্ষী রেখে সবার সামনে আমার স্বামী হবে! আমার অর্ধাঙ্গ! এমনকি তার ঘরে উঠতেও হবে আমায়। ঘরে আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকে। এরই মধ্যে বড় মামা এবং ছোট মামা কাজী নিয়ে প্রবেশ করলেন। বয়স্ক কাজী, চোখে পাওয়ার ওয়ালা চশমা। তিনি প্রথমে আপুর সামনে বসলেন। তিন বার কবুল বলা এবং সই করার মাধ্যমে আপুর বিয়ে সম্পন্ন হলো। এবার কাজী বসলেন আমার সামনে। একই ভাবে সব বলে বললেন–
— বলো কবুল।
কন্ঠ জড়িয়ে এলো। ঢোক গিলে কাঁপা কন্ঠে বললাম–
— ক কবুল।
পরপর আরও দুবার বলে আবারও বর্ণ ভাইয়ের সাথে আমার নাম জুড়ে গেল সারাজীবনের জন্য। সকলকে সাক্ষী রেখে হলাম তার অর্ধাঙ্গিনী।
বিয়ের শেষে সামিয়া আপুর বিদায় হয়ে গেল। কেঁদে কেটে বাপের বাড়ি ত্যাগ করলেন তিনি। সাথে কাঁদলাম আমিও, চোখের কাজল লেপ্টে দফারফা অবস্থা।
নিয়ম অনুযায়ী আজ আমাদের বাসর! ভাবতেই লজ্জায় কুঁকড়ে উঠছি। একটা রুমে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। সাধারণ একটা ঘর, বাসরের জন্য ঘটা করে সাজানো নয়। অনেক আগেই আমাকে রুমে বসিয়ে রাখা হয়েছে। বিয়ের পর তার সাথে আর দেখা হয়নি আমার। অজানা আতঙ্কে মৃদু মৃদু কেঁপে উঠছি। অস্থিরতায় হাঁসফাঁস করছি। বুকের মধ্যে দুরুদুরু করেই যাচ্ছে! তার থামার নাম নেই। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে গুটিয়ে গেলাম। হৃদস্পন্দন দ্রুত বেগে ছুটতে লাগল। বর্ণ ভাই দরজা বন্ধ করে এগিয়ে এলেন। বসলেন সামনে। গভীর দৃষ্টিতে আমাকেই দেখে চলেছেন তিনি। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো। শুকনো ঢোক গিলে সালাম দিলাম–
— আসসালামু আলাইকুম!
তিনি জবাব দিলেন–
— ওয়ালাইকুম আসসালাম!
দৃষ্টি সরালেন না। আমি জড়সড় হয়ে বললাম–
— কি দেখছেন এভাবে?
তিনি কন্ঠে মুগ্ধতা ঢেলে বললেন–
— আমার ছোট্ট বউকে দেখছি।
লজ্জায় গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ঠোঁট কামড়ে চোখ খিচে বন্ধ করে নিলাম। ওনার দিকে তাকানোর সাহস নেই। উনি হেঁচকা টানে কাছে টানলেন। হুমড়ি খেয়ে পড়লাম বুকে। মুখ উঁচিয়ে ওনার চোখে তাকালাম। অদ্ভুত ঘোর ওনার চোখে। হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা আসতেই জিজ্ঞেস করলাম–
— নানাভাই এতো সহজে আমাদের বিয়েটা মেনে নিলেন! ব্যাপারটা কেমন যেন লাগছে, তাই না?
উনি আমার মাথা থেকে ওড়না ফেলে দিলেন। আমার পেছনে বসে নিজের বুকের সাথে আমার পিঠ মিশিয়ে নিলেন। চুলে লাগানো অজস্র ক্লিপ একটা একটা করে খুলতে খুলতে বললেন–
— এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।
— কেন?
— তোমার নানাভাই অনেক আগেই আমাদের সন্দেহ করেছিলেন। তবে বিয়ে করে ফেলেছি এটা ভাবেননি। তুমি নিশ্চয়ই দেখেছ উনি প্রথম প্রথম আমাকে এক প্রকার সহ্য করতে পারতেন না, তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন।
আমি সায় দিয়ে বললাম–
— হ্যাঁ তাই তো!
ইতোমধ্যে ওনার ক্লিপ ছাড়ানো শেষ। উঠে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে চিরুনি নিয়ে আলতো হাতে চুল আঁচড়াতে লাগলেন। আমি মানা করলেও শুনলেন না। বলতে লাগলেন–
— রনির সাথে ঝামেলা হওয়ার পর থেকে তিনি নরম হয়েছেন। এবং সুযোগ বুঝে আমিই তাকে আমাদের কথা বলেছিলাম। তিনি গম্ভীর ছিলেন তখন, কিছু বলেননি। তবে গতকাল জানিয়ে দিলেন তার মতামত।
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম–
— তাহলে নানাভাই সবটা আগে থেকেই জানতেন!
— হ্যাঁ।
লম্বা শ্বাস টেনে বললাম–
— আমিই বোকা! আমাকে আপনি বলেনও নি যে আপনি নানাভাই কে সব বলে দিয়েছেন।
ওনার কাজ শেষ। চিরুনি জায়গায় রেখে দিয়ে বললেন–
— তোমাকে বলার প্রয়োজন মনে করিনি।
মুখ ফুলিয়ে বসে রইলাম। হুট করেই লাইট নিভিয়ে দিলেন। ঘর পুরোপুরি অন্ধকার হলো না, জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে ওনাকে। খুব কাছে এলেন আমার। দম বন্ধ হয়ে এলো। ঠান্ডা হাত গালে ঠেকালেন। এগিয়ে কপালে শুষ্ক ওষ্ঠদ্বয় স্পর্শ করলেন। চোখ বন্ধ করে নিলাম। অধরে আলতো অধর স্পর্শ করলেন। আমাকে বুকে নিয়েই শুয়ে পড়লেন। বললেন–
— ক্লান্ত তুমি, ঘুমাও। আজ থেকে এখানেই ঘুমাবে তুমি।
মনের মধ্যে প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেল। এ কেমন শান্তি ওনার বুকে! এমন শান্তি কখনও কোথাও পাইনি। ছোট্ট বিড়াল ছানার মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়লাম আমার জন্য আজীবন বরাদ্দকৃত জায়গায়।
চলবে..
#ছায়াবর্ণ
#মোহনা_মিম
#পর্বঃ২৩
পর দিন আমরা গ্রাম ছেড়ে শহরে ফিরে এলাম। এবার নদী পথে এসেছি। নানাভাই ছাড়তে চায়ছিলেন না, কিন্তু ক’দিন পর ওনার জয়েনিং ডেট বলেই বাধ্য হলেন। তবে এটাও বললেন আমরা যেন খুব শীঘ্রই আবারও গ্রামে বেড়াতে যাই। বর্ণ ভাই নানাভাই কথা দিয়ে এসেছেন যে তিনি ছুটি নিয়ে অবশ্যই আবার যাবেন। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। বাড়িতে পৌঁছে লম্বা শ্বাস নিলাম। ফিরে এসে ভালো লাগছে। বাবা মা রা সবাই আমাদের আগে ওপরে উঠে গেলেন। পিছে রইলাম আমরা দুজন। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে বর্ণ ভাইদের ফ্লাট রেখে উঠতে গেলে তিনি গলার স্বর উঁচিয়ে বললেন–
— কোথায় যাচ্ছ তুমি?
আমি থেমে ওনার দিকে ফিরে বললাম–
— বাসায় যাচ্ছি।
তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন–
— এটা তোমার শশুর বাড়ি। ভুলে গিয়েছ? এখানেই থাকবে তুমি।
রোজ ওনার সাথে এক ঘরে এক বিছানায় থাকতে হবে ভেবেই বুক কেঁপে উঠল। শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বললাম–
— আ আমি পরে আসি? আমার সব জিনিস পত্র তো ওপরে। ওগুলো নিয়ে আসি।
উল্টো ঘুরে সিঁড়িতে পা রাখতে নিলেই উনি কর্কশ কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন–
— খবরদার! আর এক পা এগিয়েছ তো!
আমি অসহায় মুখে ওনার দিকে তাকালাম। কি মুশকিল! বাবা মাও আমাকে একা ফেলে চলে গেল! এখন এই শশুর বাড়িতেই ঢুকতে হবে মনে হচ্ছে। এক দৌড়ে ওপরে চলে গেলে কেমন হয়? আমার পালানোর চিন্তা উনি ধরে ফেললেন। লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এসে খপ করে হাত ধরলেন। টেনে নিয়ে চললেন ভেতরে। চেঁচিয়ে আন্টিকে ডাকলেন। আন্টি রুম থেকে বের হয়ে এলেন। বর্ণ ভাই বললেন–
— ছেলের বউকে ফেলে চলে এলে! ছেলের বউ তো আর একটু হলে বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছিল। তখন তোমার ছেলে বউ ছাড়া কীভাবে থাকত?
আন্টি হতভম্ব। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করলাম। আন্টি হতবাক কন্ঠে বললেন–
— বর্ণ! তুই কি বউ পাগল হলি বাবা?
তিনি কন্ঠে বিরক্তি ঢেলে বললেন–
— পৃথিবীর সব ছেলেরা বউ পাগল মা। এখন তুমি যদি বলো বাবা বউ পাগল না, সেটা আমি মোটেও বিশ্বাস করব না। তোমার ছেলের বউকে রুমে নিয়ে গেলাম।
আন্টিকে বিস্ময়ে ফেলে দিয়ে আমাকে টেনেই রুমে নিয়ে গেলেন। ওনার কার্যক্রম দেখে অবাক আমিও কম হচ্ছি না। রুমে এনে দরজা চাপিয়ে হাত ছেড়ে দিলেন। আমি কাঁচুমাচু হয়ে বললাম–
— বাবা মাকে না জানিয়ে এখানে থাকা কি ঠিক হবে।
উনি এমন ভাবে তাকালেন যেন ভয়ংকর কোনো ভুল কথা বলে ফেলেছি। ওনার চাহনি দেখে জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করলাম। উনি ওয়ারড্রবের দিকে এগিয়ে তা খুললেন। জামা কাপড় নিতে নিতে বললেন–
— আমি আগেই ওনাদের বলেছি। কোনো আপত্তি নেই তাদের। তোমার মতো বোকা নই আমি। বুঝেছ?
মুখ গোমড়া করে বিছানায় পা উঠিয়ে বসলাম। সত্যিই আমি খুব বোকা। এখন আমার করনীয় কি? তিনি জামা কাপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে প্রবেশ করলেন। চুপচাপ বসে রইলাম। ওনার এই ঘরে আমি আগেও এসেছি। সবটা আগের মতোই আছে, কোনো পরিবর্তন হয়নি। মাথা থেকে ওড়না ফেলে দিলাম, গরম লাগছে। শাওয়ার নিলে মন্দ হতো না। কিন্তু উনি আমাকে আমার বাসায়-ই যেতে দিলেন না।
কিছুক্ষণ পর উনি শাওয়ার নিয়ে বের হলেন। আমি তাকালাম। ভাবতেই অবাক লাগে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে থাকা স্নিগ্ধ পুরুষটি আমার। একান্তই আমার! মুগ্ধ হলাম। উনি আমার সামনে এসে তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে বললেন–
— যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। চায়লে শাওয়ারও নিতে পারো।
কোনো কিছু না ভেবেই ওয়াশ রুমে চলে গেলাম। তার কথা ভাবতে ভাবতেই কখন যে শাওয়ার অন করে ফেললাম টের পেলাম না। যখন বুঝলাম, তখন আমি ভিজে জবজবে। আমার মাথায় হাত। এখন কি হবে? এখানে তো পরনের কিছুই নেই। চিন্তিত হয়ে কিছুক্ষণ ভেবে দরজা একটু খুলে উঁকি দিলাম। ওনাকে দেখতে পেলাম না। মৃদু আওয়াজে ডাকলাম–
— শুনছেন? বর্ণ ভাই!
তিনি আসলেন। বেলকনিতে ছিলেন হয়তো। ভ্রু কুঁচকে বললেন–
— এ ঘরে কি আমার কোনো বোন টোন ঢুকে পড়ল? ভাই ডাকল কে?
আমি জিভে কামড় দিলাম। আমতা আমতা করে বললাম–
— ইয়ে না মানে! আমি ডেকেছি। আমি সমস্যায় পড়েছি।
— দুঃখিত আমি তোমার ভাই না। তাই কোনো উপকার করতে পারলাম না।
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম–
— আরে! আপনি ভাই না, কিন্তু অন্য কিছু তো না কি? আপনি ছাড়া কে হেল্প করবে?
বুকে হাত গুজে বললেন–
— আমি তোমার কি?
অসহায় ভঙ্গিতে বললাম–
— পরে বলি? আমি ভুল করে শাওয়ার অন করে ফেলেছিলাম। এখন ভিজে জবজবে হয়ে আছি। এখানে আমার কোনো জামা কাপড়ও নেই। আগেই বলেছিলাম জিনিস পত্র গুলো নিয়ে আসি। কি করব?
পর পর দু’বার হাঁচি দিয়ে ফেললাম। ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে। উনি কিছুক্ষণ ভেবে ওয়ারড্রব থেকে ওনার একটা টি শার্ট এবং ট্রাউজার এনে এগিয়ে দিলেন। আমি চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে বললাম–
— আপনার জামা কাপড় আমার মতো বাচ্চার গায়ে হবে?
ওনার নিরুত্তাপ কন্ঠ–
— তাহলে ওয়াশ রুমে এভাবেই থাকো।
আমি তড়িঘড়ি করে বললাম–
— না না দিন। নেই মামার থেকে কানা মামাই ভালো।
জামা কাপড় নিয়ে দরজা লক করলাম। বাধ্য হয়ে টি শার্ট আর ট্রাউজার পরলাম। টি শার্ট হাঁটুর কিছুটা ওপরে পড়ল আর ট্রাউজার মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মনে হচ্ছে প্লাজু পরেছি। গুটিয়ে ওপরে তুললাম। ছোট হাতার সবুজ রঙের টি শার্ট, সমস্যা হলো না। তবে কাঁধের এক পাশ দিয়ে নেমে যাচ্ছে বারংবার। ওনাকে আমার জামা কাপড় নিয়ে আসার কথা বলতে পারি না, কেমন দেখাই। আর নিজেও যেতে পারব না এই অবস্থায়!
ধীরে ধীরে দরজা খুলে বের হলাম। উনি বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন চালাচ্ছেন। এক পলক আমার দিকে তাকালেন। আবার ফোনের দিকে নজর দিয়ে বললেন–
— চুল ভালো করে মুছে ফ্যালো। আর জামা কাপড় বেলকনিতে মেলে দাও।
গুটি গুটি পায়ে বেলকনিতে গিয়ে জামা কাপড় মেলে দিলাম। চুল ভালো করে মুছে তোয়ালেও মেলে দিয়ে রুমে এলাম। আবারও তাকালেন। ঠোঁট চেপে হাসলেন মনে হলো! আমি মুখ কুঁচকে বললাম–
— আমাকে অদ্ভুত লাগছে তাই না? এখনও এর মধ্যে আর একটা আমিকে ঢোকানো যাবে।
তিনি ডাকলেন–
— এদিকে এসো। আমার পাশে বসো।
বিছানায় উঠে তার পাশে বসলাম। হাত বাড়িয়ে এলোমেলো ভেজা চুল কানের পিঠে গুজে দিলেন। মৃদু হেসে বললেন–
— তোমার এক নতুন রুপ দেখলাম। না জানি তোমার আর কত রুপ আছে!
বাইরে থেকে আন্টি ডাকলেন। রাতে খাওয়ার জন্য ডাকছেন তিনি। আমি টি শার্ট টেনেটুনে কাঁধের ওপরে তুলে বললাম–
— আমি এই অবস্থায় কিছুতেই বাইরে যাব না। আপনি যান। আর সন্ধ্যায় খেয়েছিলাম তখন, এখন আর খাব না।
তিনি চেঁচিয়ে বললেন–
— খাব না মা। ক্লান্ত লাগছে খুব। তোমার ছেলের বউও খাবে না।
আন্টি কিছু বললেন না। লজ্জায় মরিমরি অবস্থা আমার! না জানি আন্টি কি ভাবছেন? উনি উঠে দরজা লক করে এলেন। বিছানায় উঠে আমার কোমর জড়িয়ে কাছে টানলেন। বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। ফিচেল কন্ঠে বললেন–
— আপনি বলো কেন? তুমি করে বলতে পারো না?
আমি ঢোক গিলে বললাম–
— আপনি আমার কতটা বড় জানেন? এতো বড় একজন কে তুমি করে বলব!
আরেকটু কাছে টেনে নিলেন। হাত ঠেকে গেল ওনার বুকে। বললেন–
— তোমার মা আর তোমার বয়সের ডিফরেন্স কত?
— বাইশ বছর।
— তাও তাকে তুমি করে বলো। আর বাবার বয়সের ডিফরেন্স কত?
— ত্রিশ বছর।
— তাকেও তুমি করে বলো। তাহলে আমাকে বলতে সমস্যা কোথায়?
তার লজিক ঠিকই আছে। তবে আমিও একটা লজিক দিলাম–
— আমার মা থেকে বাবা আট বছরের বড়। মা বাবাকে এখনও আপনি করে বলে। আর আপনি তো আমার থেকে দশ বছরের বড়। বুইড়া ব্যাটা! আপনাকে দেখে কেউ বলবেই না যে আপনার বয়স সাতাশ। আমার তো মনে হয় বাইশ তেইশ বছরের যুবক।
শেষের কথাগুলো বলেই মুখ চেপে ধরলাম। সর্বনাশ! মনের কথা মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল। উনি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–
— কি বললে তুমি!
— ইয়ে মানে, না মানে।
কাঁধ বেয়ে টি শার্ট আবারও নেমেছে। তিনি মুখ নামিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। জমে গেলাম। কাঁধের উন্মুক্ত অংশে মুখ ঘষে ফিসফিস করে বললেন–
— ভয়ংকর অপরাধ করেছ তুমি। এখন সেই অপরাধের শাস্তি দেওয়া হবে। ভয়ংকর অপরাধের জন্য ভয়ংকর শাস্তি।
থরথরিয়ে কেঁপে উঠলাম। উনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে টান টান হয়ে শুয়ে পড়লেন। গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ করলেন–
— এখন স্বামী সেবা করো। ঘাড়, মাথা ব্যথা করছে খুব। টিপে দাও। আমি যতক্ষন না বারণ করব ততক্ষন টিপতে থাকবে।
আমি চোখ রসগোল্লার আকার করে বললাম–
— আমি এখন আপনার ঘাড় মাথা টিপব?
— হ্যাঁ। দ্রুত শুরু করো।
আমি মুখ গোমড়া করে আলতো হাতে মাথা টিপে দিতে লাগলাম। উনি চোখ বন্ধ করে নিলেন। স্নিগ্ধ মুখ খানির দিকে তাকালাম। এখনও আমার ভাবতেই অবাক লাগে এই সুদর্শন পুরুষটিকে একান্তই আমার!
চলবে..